দৃষ্টির অগোচরে থাকা অতিপ্রাকৃত জগতের প্রতি আগ্রহের কমতি নেই আমাদের। কী লুকিয়ে আছে ওখানে? কারা লুকিয়ে আছে? রহস্য, রোমাঞ্চ, শিহরণ, আতঙ্ক আর শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় ঠাসা প্রতিটি আধিভৌতিক কাহিনি যেন একেকটি টাইম মেশিন। অধুনা হরর সাহিত্য মাতানো জনপ্রিয় সব লেখকদের নিখাদ মৌলিক গল্পগুলো একবার পড়তে শুরু করলে ঘড়ির কাঁটার অস্তিত্ব ভুলে যেতে বাধ্য হবেন আপনি। যাঁরা অতিলৌকিক কাহিনি ভালবাসেন, তাঁদের জন্য ‘নিশিডাকিনী’-র ডাক উপেক্ষা করা এক কথায় অসম্ভব!
তৌফির হাসান উর রাকিব (Toufir Hasan Ur Rakib) একজন কথাসাহিত্যিক, কবি এবং অনুবাদক। জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুমিল্লায়। পেশায় একজন চিকিৎসক।
রহস্যপত্রিকার তুমুল জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর থেকে সাহিত্য অঙ্গনে শুরু হয় তার দৃপ্ত পথচলা। সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে তার অতিপ্রাকৃত ঘরানার বইগুলো।
সেবা প্রকাশনীতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম প্রকাশিত হয় তার ‘ঈশ্বরী’ বইটি। এর পরে মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ এর সাথে যৌথ ভাবে লিখেন আগাথা ক্রিস্টির ‘সিরিয়াল কিলার’ এবং যৌথ ভাবে আরো দুইটি আগাথা ক্রিস্টির বই ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ (২০১৭) ও ‘গেম ওভার’ (২০১৯) প্রকাশিত হয় তার। তিনি অনুবাদ করেন বিক্ষাত লেখক হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড এর ‘ডক্টর থার্ন’। তার সম্পাদনায় বের হয় বেশ কিছু বই, যার সাথে আছে স্যার আর্থার কোনান ডয়েল ও আগাথা ক্রিস্টির ‘শার্লক হোমস ভার্সাস এরকুল পোয়ার’, কান্তজীউয়ের পিশাচ, দেবী, নিশিডাকিনী, শাঁখিনী, হাতকাটা তান্ত্রিক। কিছু অতিপ্রাকৃত ও হরর গল্পগুচ্ছ নিয়ে বর করেন ‘অপদেবী ’, ‘ট্যাবু’ সহ সব মিলিয়ে ৬টি বই। এছাড়া তৌফির হাসান উর রাকিব ও মারুফ হোসেন যৌথ ভাবে লিখেন এরিক মারিয়া রেমার্ক এর দুটি বই ‘স্পার্ক অভ লাইফ’ ও ‘হেভেন হ্যায নো ফেভারিট’। ওয়েস্টার্ন সিরিজের ২৯০তম বই ‘ডুয়েল’ এর লেখকও তিনি।
দৃষ্টির অগোচরে থাকা অতিপ্রাকৃত জগতের উপর লেখা গল্পগুলো বরাবরই প্রিয়। তাই নিশিডাকিনী পড়ার জন্য অত্যন্ত উৎসাহী ছিলাম। সেবার নতুন এই মৌলিক রোমাঞ্চ হরর বইটিতে ছোট - বড় মোট ১৬ টি গল্প রয়েছে। - অতিথি ( রতন চক্রবর্তী ) - এক লোকের বাসায় আসা এক অতিথির উপস্থিতির পর থেকে শুরু হওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নিয়ে কাহিনী ,খারাপ লাগেনি পড়তে। - আত্মা ( রিয়াজুল আলম শাওন ) - এক লোকের মৃত নানীর আবার ফিরে আসা নিয়ে কাহিনী। গৎবাঁধা কাহিনী হলেও পড়তে ভালো লেগেছে। - কুকুর ( ডা.রেজা আহমেদ ) - এক লোকের কুকুর নিয়ে প্যারানয়া নিয়ে কাহিনী। এ গল্পে আরেকটু ডিটেলিং আশা করেছিলাম ,যেন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল। - আবাহন ( মাহবুব আজাদ ) - গ্রামের বাংলোয় বেড়াতে এসে পাঁচজন বন্ধুর এক এডভেঞ্চার নিয়ে এ গল্প। আমার মতে সংকলনের সেরা কয়েকটা গল্পের ভিতরে একটা,দুর্দান্ত লেগেছে। - আয়না (প্রিন্স আশরাফ ) - এক মেয়ের আয়নায় নিজের বদলে আরেকজনকে দেখা নিয়ে কাহিনী শুরু। টিপিক্যাল লাগলো গল্পটা। - ছায়াশ্বাপদ ( আবুল ফাতাহ ) - এটাও কুকুর নিয়ে কাহিনী। এক লোকের পিছনে হঠাৎ তিনটা কুকুর চলতে শুরু করে ,এখানেও কিছু ডিটেলিং দেয়া যেতে পারতো বলে মনে হয়েছে। - নিশিডাকিনী (সুষুপ্ত পাঠক ) - এক গ্রামে স্কুল শিক্ষক নিয়োগ পাবার পরে জানতে পারে কোন এক কারণে এর আগের তিন জন শিক্ষক মারা গেছেন এবং এ নিয়েই গল্পের কাহিনী। হরর গল্প হিসেবে পারফেক্ট। - শেষ রাতের ট্রেন ( রাজীব চৌধুরী ) - এক লোকের শেষ রাতের ট্রেন ধরা নিয়ে এ গল্প। আসলে এ টাইপের গল্প অনেক পড়া হয়েছে দেখে প্লটটা সাদামাটা লাগলো ,তবে ওভার অল খারাপ না। - কালচৈত্রীর বজ্রপাত (মোঃ নাসির খান ) - বাবু নামের এক লোকের চৈত্র মাসের এক রাতকে ঘিরে এ গল্পের কাহিনী। প্লটটা একটু কনফিউজিং হলেও ইন্টারেস্টিং। - আত্মহত্যা (আফজাল হোসেন ) - হেলেন নামের আত্মহত্যা প্রবন এক মেয়েকে নিয়ে কাহিনী। প্রথম থেকে শেষ পুরোটাই দারুন। বেশ ভালো লেগেছে এ গল্পটা পড়তে। - অশুভের বিদায় (সাঈদ শিহাব ) - এক হোস্টেলে অপু নামের এক ছাত্রের সাথে ঘটা অদ্ভুত কিছু ঘটনা নিয়ে সাজানো। স্টোরিটেলিং কিছুটা ডিফারেন্ট লাগলো ,মোট কথা অন্যন্য গল্প থেকে কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের ,এ রকম গল্পই আশা করেছিলাম এ সংকলনে । - অভিশাপ (মিজানুর রহমান কল্লোল ) - এটার স্টোরিটাও একটু ডিফারেন্ট , গল্পটা ভালো লেগেছে বলা যায়। - নিষুপ্তি ( সৈয়দ অনির্বাণ ) - প্রথম দিকে টিপিক্যাল মনে হলেও শেষটা বেশ চমকপ্রদ। লেখকের শোণিত উপাখ্যান পড়া থাকলে এ গল্পটা আরো ভালো লাগবে । - পানিমুড়া ( শাহেদ জামান ) - বাংলাদেশের আরবান লিজেন্ড পানিমুৱা নিয়ে ছোটগল্প , ভালো হয়েছে। - নিতাই ফকির ( তৌফির হাসান উর রাকিব ) - নিতাই নামের এক অদ্ভুত লোককে নিয়ে কাহিনী। এই গল্পের ফিনিশিং পরে থ হয়ে গেছি ,দুর্দান্ত এক ফিনিশিং গল্পটাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। - এবার আসি সংকলনের সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে দুর্দান্ত গল্প নিয়ে। মুহম্মদ আলমগীর তৈমুরের " প্রাচীন মুদ্রা "।নাম দেখেই বোঝা যায় প্রাচীন মুদ্রা কে নিয়ে এই গল্পের কাহিনী।তবে বাকি গল্প গুলো থেকে একে আলাদা করেছে লেখকের অসাধারণ লেখনী। গল্পের সেটিং আর স্টোরিটেলিং দুটোই অনবদ্য লেগেছে। এক কথায় এ দেশের সেটিং এ অসাধারণ মানের এক নভেলা "প্রাচীন মুদ্রা " ।
সেবা থেকে প্রকাশিত মৌলিক হরর গল্পের বেশ কিছু সংকলন এর আগে আমার পড়া হয়েছে। সত্যি বলতে,বইগুলো পড়ার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয় আমার। বেশিরভাগ গল্পই নিতান্ত ছেলে ভোলানো কিংবা ছকে বাধাঁ অত্যন্ত গতানুগতিক প্রকৃতির। তাই সে-সব সংকলন আমার একেবারেই ভালো লাগেনি।
গুডরিডসে ভালো রিভিউ দেখে ' নিশিডাকিনী ' সংকলনটা পড়ার আগ্রহ হয়েছিলো। খুব বেশি প্রত্যাশা নিয়ে পড়িনি বইটা। যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনই,বইয়ের মাত্র চারটা গল্প— প্রাচীন মুদ্রা,আত্মা,আত্মহত্যা ও নিষুপ্তি ভালো লেগেছে। এগুলো বাদে বাকি একটা গল্পও জমেনি।
বিশেষ করে বলতে হয় মুহম্মদ আলমগীর তৈমুরের লেখা ' প্রাচীন মুদ্রা ' গল্পটার কথা। অসাধারণ ছিল! ইতিহাসের মিশেলে যে ভাবে কাহিনীটা তিনি দাঁড় করিয়েছেন সেটা মনোমুগ্ধকর। অনেক জিনিসের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন তিনি গল্পটাতে। আমার মতে সংকলনের সেরা গল্প এটাই।
শুধু মাত্র ' প্রাচীন মুদ্রা ' গল্পটার জন্যই এক তারা বেশি দিলাম।