সেক্স, ড্রাগস আর রক এন রোল। উনিশ শ’ ষাট, সত্তুর আর আশির দশকের হতাশাগ্রস্ত আমেরিকান তারুণ্যের নিষিদ্ধ আশ্রয় ছিল এই তিনটি জিনিস। ভিয়েতনাম যুদ্ধ আর কোল্ড ওঅরে অস্থির, টালমাটাল তখন আমেরিকা। অভিমানী এক তরুণ ডাক্তারি পড়তে ঢাকা থেকে পাড়ি জমাল মার্কিন মুলুকে। অ্যাণ্টি-কালচার বা হিপ্পি আন্দোলনের রাজধানী সান ফ্রান্সিসকোতে যুদ্ধবিরোধী শান্তি আন্দোলনে শরিক হয়ে যুবকটি আবিষ্কার করে পুঁজিবাদের গভীর সঙ্কট আর বীভৎস রক্তাক্ত ক্ষতগুলো। দুই আদর্শবাদের ধারক দুই পরাশক্তির লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসা অন্ধকার রাজনীতি বিশ্ব-নাগরিকে পরিণত করে তরুণটিকে।
এরকম একটা সময়ে ছেলেটির জীবনে প্রেম হয়ে আসে মেলিনি নামের প্রখর রাজনীতি-সচেতন দেশপ্রেমিক এক মার্কিন নারী, যাকে রাশান স্পাই মনে করে হন্যে হয়ে খুঁজছে এফবিআই। শুরু হয় তাদের ফেরারি জীবন। প্রেমিকাকে নিয়ে টেক্সাস থেকে চোরাই পথে মেক্সিকো ঢোকার সময় চরম বিপর্যয় নেমে আসে ওদের জীবনে...
সত্তুর বছর বয়সে আবার ঢাকায় ফেরে সেই তরুণ। পরিচয় হয় এক তরুণীর সঙ্গে। সমস্যার শুরু তখনই...
পয়লা বৈশাখের এক কাকডাকা ভোরে জন্ম নিয়েই দেখে, বাংলাদেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ফুলছড়ি, বাহাদুরাবাদ ঘাটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনির অবস্থানের ওপর যখন ইন্ডিয়ান মিগ থেকে বোমা ফেলা হচ্ছিল, তখন মুক্তিযোদ্ধা বাবার সঙ্গে বাঙ্কারে বসে শিশুটি বলছিল, 'আল্লাহ্, রক্ষা কর'—গল্পটি শিবলীর মায়ের কাছে শোনা। তখন যুদ্ধ না বুঝলেও নব্বইয়ের দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের ভেতর দিয়েই তাঁর বেড়ে ওঠা। ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালেই স্বৈরশাসকের জেল জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে চলে আসেন নাটোর থেকে ঢাকায় । অভিনয়ের উপর এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্স শেষে গ্রুপথিয়েটার নাট্যচক্রের সঙ্গে মঞ্চনাটকে কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকেন শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে।অভিভাবকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একদল গানপাগল তরুণ ব্যান্ড সংগীতের মাধ্যমে বাংলা গানের ধারায় যে-পরিবর্তন এনেছে, শিবলী তাদেরই অন্যতম। যুগযন্ত্রণার ক্ষ্যাপামো মজ্জাগত বলেই প্রথা ভাঙার যুদ্ধে শিবলী হয়ে ওঠেন আপাদমস্তক 'রক'। আধুনিক জীবনযন্ত্রণাগ্রস্ত তারুণ্যের ভাষাকে শিবলী উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত সহজসরল 'রক' এর ভাষায়। তাঁর সাফল্য এখানেই । তাই অল্প সময়ের মধ্যেই শিবলী পরিণত হয়েছেন এদেশের ব্যান্ড সংগীতজগতের কিংবদন্তি গীতিকবিতে । শিবলীর লেখা (প্রায় ৩০০) জনপ্রিয় গানের মধ্যে কয়েকটি: জেল থেকে বলছি | কথা-সুর: শিবলী, ফিলিংস /নগরবাউল তুমি আমার প্রথম সকাল | তপন চৌধুরী-শাকিলা জাফর কষ্ট পেতে ভালবাসি | আইয়ুব বাচ্চু (এলআরবি) হাসতে দেখো, গাইতে দেখো | আইয়ুব বাচ্চু কত কষ্টে আছি | জেমস পালাবে কোথায় | জেমস একজন বিবাগি | জেমস রাজকুমারী | আইয়ুব বাচ্চু হাজার বর্ষা রাত । সোলস পলাশী প্রান্তর। মাইলস কী ভাবে কাঁদাবে তুমি (যতটা মেঘ হলে বৃষ্টি নামে) | খালিদ (চাইম) আরও অনেক অনেক গান......... 'কমপ্লিট ম্যান' খ্যাত ঝুঁটিবাঁধা সেঞ্চুরি ফেব্রিকসের দুর্দান্ত সেই মডেল শিবলী ছিলেন তাঁর সময়ের ফ্যাশন-আইকন।তিনি একজন সফল নাট্যকার। বিটিভির যুগে তাঁর লেখা প্রথম সাড়া জাগানো নাটক 'তোমার চোখে দেখি'(১৯৯৫)। আরও লিখেছেন- রাজকুমারী, হাইওয়ে টু হেভেন, গুড সিটিজেন, নুরু মিয়া দ্যা পেইন্টার, যত দূরে থাকো, বৃষ্টি আমার মা,রান বেইবি রান,আন্ডারগ্রাউণ্ড,শহরের ভিতরে শহরসেকেন্ড চান্স,স্পন্দন,মিলিয়ন ডলার বেইবি,দ্যা ব্রিফকেস।নিজের লেখা নাটক 'রাজকুমারী'তে(১৯৯৭) মির্জা গালিব চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় এখনও অনেকের মনে থাকার কথা।শিবলীর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো 'ইচ্ছে হলে ছুঁতে পারি তোমার অভিমান' (১৯৯৫), 'তুমি আমার কষ্টগুলো সবুজ করে দাও না'(২০১০), মাথার উপরে যে শূন্যতা তার নাম আকাশ, বুকের ভেতরে যে শূন্যতা তার নাম দীর্ঘশ্বাস'(২০১৪)।বাংলা একাডেমী প্রকাশ করেছে তাঁর 'বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত আন্দোলন'(১৯৯৭) নামে ব্যান্ড সংগীতের ওপর লিখিত প্রথম এবং একমাত্র গবেষণাধর্মী প্রবন্ধগ্রন্থ।শিবলী'র কাহিনী সংলাপ এবং চিত্রনাট্যে ও গীতিকবিতায় প্রথম পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্র 'পদ্ম পাতার জল'(২০১৫)।শিবলী'র প্রথম এবং বেস্টসেলার উপন্যাস- দারবিশ (২০১৭)।স্বভাবজাত বোহেমিয়ান, ঘুরেছেন ইউরোপে সহ পৃথিবীর পথে পথে।।
সেক্স, ড্রাগস, রক অ্যান্ড রোল। বইয়ের ফ্ল্যাপে শুরুতেই এই শব্দ তিনটে লেখা। কোন বাংলা উপন্যাসের শুরুতে এরকম আগে দেখিনি, তিনটির মধ্যে দুটো শব্দই যখন এখানে ট্যাবু। কিন্তু এখানকার প্রেক্ষাপট বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি তো, ব্যবহৃত হয়েছে ৬০, ৭০ আর ৮০ দশকের হতাশাগ্রস্থ অ্যামেরিকান তরুণদের অবস্থা বোঝাতে। নিজস্ব কালচারের বিরুদ্ধে, ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে সেখানে সেই সময় গড়ে উঠেছিলো হিপ্পী আন্দোলন। তবে সেই আন্দোলন কিন্তু রক্তক্ষয়ী কিছু ছিল না, ছিল রক মিউজিকের সাথে অসাধারণ গীতিকবিতার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা রক অ্যান্ড রোল কালচার, মৌন মিছিল আর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ। প্রতিবাদ করবেই না কেন? হতচ্ছাড়া অ্যামেরিকান সরকার যে ধরে ধরে ড্রাফটিং এর মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের পাঠাচ্ছিল ভিয়েতনামযুদ্ধে। জলজ্যান্ত মানুষগুলো ফিরছিলো কফিনে কিংবা ভাগ্য খুব প্রসন্ন হলে পঙ্গু হয়ে। সেই আন্দোলনেই জড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশি, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া জামশেদ। "দারবিশ" উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে সেই যুবকের গল্প। তার ভালোবাসা মেলিনির গল্প। মাত্র ১১০ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস, কিন্তু পুরোটা শেষ করে লক্ষ্য করলাম যে এই টুকুন ক্যানভাসেই লেখক সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনবোধ, ভীষণ মোহময়তার মাধ্যমে। শেষ করার পর একটু হাহাকারও যেন উকি দিচ্ছিল মনের এক কোণে। দারবিশ- ২০১৭ বইমেলার আলোচিত একটি বই, লেখক গুণী মানুষ। কিন্তু তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ এতদিন ছিল অসামান্য সব গীতিকবিতায়। প্রথম যখন তুলে নেই বইটা, সেরকম কোন এক্সপেকটেশন ছিল না- সত্য কথাটাই বললাম। এমনকি প্রথম বিশ ত্রিশ পাতা পড়েও মনে হচ্ছিল হঠাৎ খেয়ালের বশে লেখা কোন কিছু পড়ছি, কিন্তু এরপরেই জামশেদের গল্পের সাথে কিভাবে যেন জড়িয়ে গেলাম, পুরো কৃতিত্ব লেখকের- হ্যাটস অফ টু ইউ। এরকম কন্টেম্পোরারি কিছু পড়বো, বাংলাতে, সে শখ ছিল বহুদিনের। আপনি সেটা মিটিয়ে দিলেন। এরকম কিছু না, সামনের দিনগুলোতে আরো নতুনত্বে ভরপুর কিছু চাই। শেষ পাতা ওল্টানোর যা দারবিশের মতই ভাবনার খোরাক যোগাবে। কিছু টেকনিকাল ভুল ভ্রান্তি ছিল, ওগুলো ওভারলুক করে যাওয়ার মতনই। যারা এখনো দ্বিধায় ভুগছেন, বলছি, পড়তে পারেন। সময়টা হয়তো মন্দ কাটবে না। :)
‘দারবিশ’ পড়ে মন ভরে না। খুব ভালো ভালো কথা শুনে আশা নিয়ে বইটা শুরু করেছিলাম। পড়ে মনে হল খুব ভালো একটা প্লট পেয়ে লেখক কিছুটা আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন। খুবই বেমানান সংলাপ ও মেলোড্রামা মিশিয়ে তিনি খুব ভালো হতে পারতো, এমন একটা গল্পকে ঠিক কাঙ্খিত উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন নি। চরিত্রগুলোও যেন বড়ো বেশি নাটুকে! তারা কোনভাবেই হৃদয় স্পর্শ করে না। উল্টো কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিরক্তি উৎপাদন করে।
আরেকটা বিষয়ও বিরক্তি আনে তা হলো পুরুষ ও নারীর সম্পর্ক সংক্রান্ত লেখকের দৃষ্টিকোণ। তাও এই ভেবে মানা যায় যে নব্বই দশকে আসলেই এরকম অ্যাবিউসিভ আচরণকে হিরোইক বানানোর একটা প্রবনতা সিনেমা ও নাটকে ছিল। সেটাকেই ইতিবাচকভাবে ভালোবাসার বহির্প্রকাশ বানিয়ে এই যুগে উপস্থাপন করলেও পাঠক হিসেবে তা নিপাট ভালোবাসা হিসেবে মেনে নেয়া সম্ভব না।
বই জুড়ে ভুল বানানের বেসাতি দেখেও বইটির প্রতি অযত্নের বিষয়টি আরো প্রকট রূপে ধরা পড়ে। তাও বলবো যে বইটির কিছু অংশ বেশ ভালো। শুরুতে অতো পরিকল্পনাহীন না লাগলেও পরে গল্পে সেই চমক দেয়া সুরটা ধরে রাখতেও কিছু জায়গায় লেখক বেগ পেয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, প্লটটা এতোই চমৎকার ছিল যে অপরিপক্ব লেখনী সত্ত্বেও শেষ করে মনে হয় না যে সময় নষ্ট করেছি। বরং, টানটান উত্তেজনায় ঘেরা ঘটনাগুলোর বর্ণনা যথেষ্ট গোছানো ছিল। যদিও মেলোড্রামার ব্যবহারে অপটুতা সেই অংশগুলোও পড়ার সময়েও কিছুটা মেজাজ খারাপের কারন হয়ে পড়ছিল।
হিপি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এর আগে বাংলায় উপন্যাস লেখা হয়েছে কিনা জানি না। না হলে এটা নি:সন্দেহে নতুন একটা চেষ্টা ছিল। ‘নীলা তুমি কি চাও না, হারাতে ওই নীলিমায়’ যার কলম থেকে উৎসারিত হয়েছে, তার কাছ থেকে আরো ভালো কিছু আশা করেছিলাম। সেই আশা এখনো রাখতে চাই। সুযোগ পেলে তাঁর নতুন বইগুলোও পড়ে দেখতে চাই।আর সেগুলো সম্পর্কে খাঁটি পাঠমুগ্ধতা প্রকাশ করতে আগ্রহী। এই ঐটুকু ভালো এবং বাকিটুকু মাথা ধরিয়ে দেয়, এসব লিখতে ভালো লাগে না।
অসাধারণ। গল্পটা রবীন্দ্রনাথের ছন্দের মত "স্থির আঁখি তুমি ক্ষরণে শতত, জাগিছ শয়নে স্বপনে।" দর্শন আর জীবনবোধ দিয়ে লেখক যেভাবে আমেরিকা-ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কার মার্কিন তরুন প্রজন্মের রোল মডেল হিপ্পিদের লাইফস্টাইল তুলে ধরেছে, তা প্রশংসনীয়। গল্পটা জামশেদের স্মৃতিচারণ নিয়ে। পুরো গল্পটাই জামশেদের অতীত, মার্কিন জীবনের। যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে জোর করে ভিয়েতনামে পাঠানো হত যুদ্ধ করার জন্য। গল্পটা মেলিনির, যে স্বপ্ন দেখতো এক নৈতিক আমেরিকার। গল্পে রোদেলা-সঞ্জুর প্রেম আছে, আছে জামশেদ-মেলিনির পাওয়া-না পাওয়ার নেক্সাস, হিপ্পিদের স্বপ্ন, জামশেদের ফিলোসোফি, আর কিছু বিষাদ। আর সাথে লেখকের অসাধারণ লেখনী তো আছেই।
দারবিশ পড়ে আমার খায়েশ মিটলোনা। বইটা ঢের বেশি ব্যপ্তি ডিজার্ভ করে। মনে হলো লেখক অনিন্দ সুন্দর একটা প্লট পেয়ে আনন্দের আতিশায্যে ছেলেখেলা করলেন। যার হাত দিয়ে ''তোমার চোখে চেয়ে দেখি আমি জীবনটাকে... ওই সুদূর নীলিমায় মন হারিয়ে যেতে চায়, যেথায় সময় থেমে রয়, তোমারই আশায়... নীলা, তুমি কি চাও না, হারাতে ওই নীলিমায়?'' এর মতো কথা বের হতে পারে তাঁর কাছে আশার পারদ ফুলে ফেপে থাকাটা যৌক্তিক। এই সমস্ত বাউন্ডুলে আর রংবাজ গানগুলো জীবনকে রঙ্গিন করে রেখেছিলো একটা জেনারেশানের।
মনে হয়েছে, লেখক সুর দিয়ে গল্প লিখেছেন। গীতিকবিতার মতো। কবিতা আর গীতিকবিতার মতো উপন্যাসে বেধে দিয়েছেন সুর। জীবনের সুর। মানবতার জয় গান করা সুর। তাঁর লেখা জেমসের 'ছয়টি তারে লুকিয়ে আছে. ছয় রকমের কষ্ট আমার' এর মতই জীবনবোধ, বিষাদ, একাকীত্ব, মূর্ত ভালোবাসা, মানবতা, বিশ্বাস- বইটাতে লুকিয়ে আছে ছয় রকমের দীর্ঘশ্বাস। মনে হয়েছে কী যেনো কিছু একটা আছে এই উপন্যাসে। সেই কিছু একটা কিছু না। সুর। সুরটা হচ্ছে বিশ্বাস। পজেটিভিটি। যা ছড়িয়ে গেছে উপন্যাস জুড়ে।
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কিছুটা অভিমান নিয়েই সিটি অফ মিউজিক (ঢাকা) থেকে জীবন গুটিয়ে নেয় সে। নতুন গন্তব্য আমেরিকা। অথচ আমেরিকাতেও তখন টালমাটাল অবস্থা। আমেরিকান সরকার যথেষ্ট বিব্রত। একদিকে সৈন্য সঙ্কটের ফলে জোর করে যুদ্ধক্ষেত্রে অর্থাৎ ভিয়েতনামে পাঠাতে হচ্ছে নিজ দেশের তরুণদের৷ অপরদিকে, একদল মুক্তিকামী তরুণ-তরুণী.. তারা এই যুদ্ধবাজ আমেরিকান সরকারের বিপক্ষে, ওরা যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়৷ চলছে তুমুল আন্দোলন। সে এক অভিনব কায়দা। যা চলছে, যা স্বাভাবিক, যা কিছু প্রথা, রীতিনীতি.. সেই তরুণ তরুনীরা সম্পূর্ণ তার বিপরীত ভাবধারার। ঘটনাক্রমে সে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লো সেই অভিমানী যুবক জামশেদ।
কবি হেলাল হাফিজের একটা কবিতা আছে না? "ব্যর্থ হয়ে থাকে যদি প্রণয়ের এতো আয়োজন, আগামী মিছিলে এসো, স্লোগানে স্লোগানে হবে কথোপকথন। আকালের এই কালে সাধ হলে পথে ভালোবেসো, ধ্রুপদী পিপাসা নিয়ে আসো যদি লাল শাড়িটা তোমার পড়ে এসো।" আন্দোলনের সেই কঠিন সময়ে জামশেদের জন্য মেলিনি কবি হেলাল হাফিজের কথা অনুযায়ী লাল শাড়ি পড়ে মিছিলে এসেছিল কি না জানা যায়নি। কিন্তু ওদের জীবন একে অপরের সাথে ঠিক জড়িয়ে গিয়েছিল। তাই তো মেলিনির বিরুদ্ধে রেড এলার্ট জারি হলেও তার হাত ছাড়েনি জামশেদ...
গল্পটা ঠিক যতোখানি জামশেদের, ঠিক ততোখানি মেলিনিরও। কিংবা কে না জানে.. জ্যামি-মেলিনি আলাদা কিছু না একটাই গল্প ওদের। এ গল্পটা হাজার হাজার স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর.. যারা বদলে দিতে চেয়েছিল দুনিয়াটাকে, যুদ্ধ নয় শান্তি এই মন্ত্রে। সেক্স-ড্রাগ-রক এন্ড রোল... এ যেন এক অচেনা দুনিয়া।
লতিফুল ইসলাম শিবলীর লেখা দারবিশ, দুর্দান্ত একটা প্লট। বেশি সেরা প্লটটা বোধহয় জ্যামি আর মেলিনির সাবপ্লটটা। নাকি ওটাই মূল প্লট, রোদেলা আর সঞ্জু কেবল উপলক্ষ মাত্র। চারটা তারা কেবল ওই ইউনিক প্লট আর জীবনবোধে পূর্ণ অথচ সহজ সরল সাবলীল ফিলোসফিক্যাল কথাগুলোর জন্য।
অন্যায়ভাবে একটা তরুণ প্রজন্মকে জোর করে ভিয়েতনাম যুদ্ধে পাঠাচ্ছিলো যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ষাট থেকে আশির দশকের সেই দিনগুলোতে আমেরিকা সরকারের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিলো তখনকার তরুণ প্রজন্মের অনেকেই। রক্তক্ষয় আর অন্ধকার রাজনীতির বিরুদ্ধে দাড়িয়ে যায় সানফ্রান্সিসকো ভিত্তিক প্রথাবিরোধী হিপ্পী আন্দোলন। সেখানেই যোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক বাংলাদেশী তরুণ। শান্তির স্বপক্ষে ঘরে-বাইরের এ যুদ্ধে তরুণটির স্বক্রিয় অংশগ্রহণের সময়ই পরিচয় আরেক আন্দোলনরত আমেরিকান মেলানির সাথে। পরিচয় থেকে পরিণয়। ঘটনাক্রমে পুলিশের ওয়ারেন্ট পেয়ে মেলানি পালিয়ে যাচ্ছিলো মেক্সিকো, সাথে সে বাঙ্গালী তরুণ। পুলিশের ঝড়-ঝঞ্চা পেরিয়ে দুজন যখন মেক্সিকো সীমান্তে গিয়ে ঘটে দুর্ঘটনা, পরিণতি হয়ে অনৈচ্ছিক বিচ্ছেদে। অন্ধকার কুঠায় হারিয়ে যায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো বছর। তারপর ভাগ্য নিয়ে বাঙ্গালী তরুণের বাজি খেলা।
অনেকবছর পর সেই বাঙ্গালী তরুণ যখন বৃদ্ধ হয়ে গেল, এই ঢাকা শহরেরই অভিজাত এলাকায় তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। নিশ্চিত ভেঙ্গে যাওয়া সম্পর্ককে বাঁচিয়ে নিজেই কোথায় যেন চলে গেলেন। তিনি কি খুঁজে পেয়েছেন তার হারিয়ে ফেলা এতগুলো বছর? ফিরে পেয়েছেন তার সেই ভীনদেশী প্রেমিকাকে? নাকি জীবন দিলেন অন্য কোন যুগলকে?
চমৎকার এ কাহিনী নিয়ে প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি লতিফুল ইসলাম শিবলীর 'দারবিশ' উপন্যাসটা পড়তে পড়তে অনেক প্রশ্ন মাথায় আসে। যুদ্ধ, ভালবাসা, মমতা, সততা, বিশ্বাস, দেশপ্রেম - সব যেন এক মলাটেই বন্দী করেছেন। অন্য আট-দশটা কাহিনীর চেয়ে এখানে গল্পের মেসেজটাও তাই শিক্ষণীয়। ভাল লাগলো উপন্যাসটা।
spoilers?? may be. গল্পের শুরুটা হয় এভাবে, এক বয়স্ক লোক একটা মিউজিক ক্যাফেতে বসে গিটার বাজাচ্ছে। তার গিটারের সুরে সবাই মুগ্ধ। গিটার বাজানো শেষ হলে সে যখন একা বসে আছে তখন একটা ছেলে মেয়ে তার তারিফ করতে আর গিটার শেখাবার প্রস্তাব দিতে তার কাছে আসে বাট যখন শোনে যে সে আমেরিকার এক জেলখানায় বসে গিটার শিখেছে তখন ভয় পেয়ে চলে যায়। অনেক বেশি আগ্রহ হয় এটুকু পড়ে। গল্পটা যখন বাড়তে থাকে তখন ভাবতেও পারিনি এটা এমন একটা গল্প শোনাবে। ভালো লেগেছে জামশেদ ক্যারেক্টার টা। শুধু মাত্র এই একটা ক্যারেক্টার এর জন্যই বইটা পাচ রেটিং পাওয়ার যোগ্য। সঞ্জু ক্যারেকটারটা খুবই শ্যালো একটা ক্যারেক্টার। থাপড়াইতে মন চাইসে অনেকবার। আর মেলিনি। মেলিনি!!!!! আমারো জানতে ইচ্ছা করে ওর কি হলো শেষমেষ। আসলে বইটা পড়ে ভিতরটা খা খা করতেসিলো। তাই তখনি কিছু লিখিনি। আর সঞ্জুর জন্য এক রেটিং কমাইলাম এখন।
বইটা যত আগ্রহ নিয়ে পড়তে বসছিলাম ততটাই হতাশ হয়েছি। সংলাপ গুলো কেমন খাপছাড়া, চরিত্রগুলোতে কেমন যেনো কৃত্রিম, সাধারণ যে টান অন্যান্য বইয়ের চরিত্রের মধ্যে অনুভূত হয় তা একেবারেই পাইনি এই বইয়ের ক্ষেত্রে। তবে একটু ইতিহাস জানতে পারলাম। তাও কেমন অসম্পূর্ণ লেগেছে। কাহিনী বড্ড অবাস্তবিক!
কাহিনি সংক্ষেপঃ অনেকটা অভিমান থেকেই দেশ ছেড়ে আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোতে পাড়ি জমায় তরুণ জামশেদ। ৬০, ৭০ ও ৮০-এর দশকের আমেরিকার রাজনীতির তখন টালমাটাল অবস্থা। যুদ্ধংদেহী সরকার লম্বা সময় ধরে ভিয়েতনামের সাথে অযৌক্তিক ও অন্যায় যুদ্ধ নিয়ে মেতে আছে। আর আমেরিকার একটা বিরাট সংখ্যক যুদ্ধবিরোধী জনগোষ্ঠী ডুবে আছে হতাশায়। আর এরাই জন্ম দিলো হিপ্পি সংস্কৃতির। প্রচলিত সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতির বাইরে বিশ্বাস রাখা এই জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশই তরুণ-তরুণী। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া হতাশাগ্রস্ত এই তরুণ জনগোষ্ঠী তাদের জীবন বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তিনটা জিনিসের ওপর ভিত্তি করে। সেক্স, ড্রাগ অ্যান্ড রক এন রোল।
এমনই একটা টগবগে সময়ে তরুণ জামশেদের সাথে পরিচয় হলো আমেরিকার যুদ্ধনীতি বিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট স্প্যানিশ আমেরিকান তরুণী মেলিনি'র সাথে। হিপ্পিদের ওই আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে গেলো জামশেদ, আর জড়িয়ে গেলো মেলিনি'র সাথেও। প্রেমে পড়ে গেলো ওরা একে অপরের৷ গা ভাসিয়ে দিলো এই যুগল হিংসা-বিদ্বেষ বিহীন এক ভিন্ন আমেরিকার স্বপ্নের স্রোতে। নানা জায়গায় হিপ্পি ও যুদ্ধবিরোধী সাধারণ আমেরিকান জনগণ ভিয়েতনামে সরকারের অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করতে লাগলো। আর প্রায় সব জায়গাতেই এসব আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে রইলো উদ্যমী তরুণী মেলিনি আর তার প্রেমিক জামশেদ।
আমেরিকান তরুণ সমাজকে তখন জোর করে ভিয়েতনামের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দিচ্ছে সরকার। আর ঠিক এমনই একটা সময়ে মেলিনিকে রাশিয়ান স্পাই হিসেবে সন্দেহ করে ওর পেছনে লেলিয়ে দেয়া হলো খোদ এফবিআই-কে। বাধ্য হয়েই পালানো শুরু করলো মেলিনি আর জামশেদ। গন্তব্য পার্শ্ববর্তী দেশ মেক্সিকো। যাত্রাপথে নানা বিচিত্র মানুষ আর বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো তাদেরকে। আর কিছু অভিজ্ঞতা তো ছিলো ভয়াবহও।
বর্তমানের ঢাকা। একসময় জামশেদের সিটি অভ মিউজিক ঢাকা আর সেই সিটি অভ মিউজিক নেই। ৭০ বছর বয়সী 'তরুণ' জাম���েদ ফিরে এসেছে আবারো। তারই ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে সদ্য গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করা তরুণী রোদেলা আহমেদ তার চাকরিজীবন শুরু করলো বয়ফ্রেন্ড সঞ্জুর আপত্তি করা সত্ত্বেও। এরপর রোদেলা ক্রমশই আবিস্কার করতে লাগলো তার চাকরিদাতা জামশেদের রহস্য মোড়ানো ও ঘটনাবহুল জীবনের নানা অংশ। জামশেদের সংস্পর্শে ও সান্নিধ্যে মেয়েটা যেন জীবন আর বিশ্বাসের নতুন এক সংজ্ঞা লাভ করলো। পাল্টে যেতে লাগলো ওর জীবনবোধ।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে লতিফুল ইসলাম শিবলী সুপরিচিত ও অত্যন্ত জনপ্রিয় একটা নাম। জেল থেকে বলছি, হাসতে দেখো গাইতে দেখো, তুমি আমার প্রথম সকাল ও হাজার বর্ষারাত-এর মতো অনেক শ্রোতানন্দিত গানের গীতিকার তিনি। লিখেছেন বেশ কিছু কবিতার বইও। 'দারবিশ' তাঁর প্রথম উপন্যাস। এখানে তিনি ৬০, ৭০ ও ৮০-এর দশকের আমেরিকার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তন এবং সেই সাথে সঙ্গীতের নতুন ধারা রক এন রোলের কথা বলেছেন।
'দারবিশ'-এর মূল চরিত্র জামশেদ। হতাশাগ্রস্ত এক বাঙ্গালী যুবক আমেরিকার ওই পথহারা সময়ে কিন্তু ঠিকই নিজের লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছিলো মেলিনি নামের এক আদর্শবাদী মেয়ের হাত ধরে। আর এই গল্পটাই 'দারবিশ'-এর মূল উপজীব্য। প্রেম, বিপ্লব আর অপেক্ষা - এই তিনটা বিষয় এতো সুন্দর ভাবে শিবলী তাঁর এই উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন যে পড়ে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। লেখক এখানে যে আদর্শের কথা বলেছেন, যে জীবনদর্শনের কথা বলেছেন আর যেসব মেটাফর ব্যবহার করেছেন, সেগুলো এই উপন্যাসের কাহিনিটাকে করে তুলেছে আরো হৃদয়গ্রাহী। মূল চরিত্র জামশেদ ও রোদেলা'র মাঝখানের বিশুদ্ধ কেমিস্ট্রিটা ভালো লেগেছে। লেখকের লেখনীও ছিলো সহজসরল, যে কারণে ভারী কোন কিছু পড়ছি তা মনে হয়নি, আবার এটাও মনে হয়নি হালকা কোন প্লট নিয়ে লেখা কোন উপন্যাস পড়ছি। লতিফুল ইসলাম শিবলীর স্বার্থকতাটা আমার মনে হয় এখানেই।
'দারবিশ' প্রকাশিত হয়েছিলো ২০১৭ সালের অমর একুশে বইমেলায়। বেস্টসেলার হয়েছিলো বইটা। এমন অনেক বই-ই আছে যেগুলো পড়বো পড়বো করেও পড়া হয়ে ওঠেনা, 'দারবিশ'-ও তেমন একটা বই ছিলো আমার কাছে। অবশেষে বইটা পড়তে পারলাম এবং পড়ার পর ভালো লাগার অনুভূতিটাও টের পাচ্ছি। এটার পর ক্রমান্বয়ে লেখকের 'দখল', 'আসমান' ও ২০২০-এর বইমেলায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নতুন উপন্যাস 'রাখাল'। সবগুলোরই প্রকাশক নালন্দা৷ বাকি তিনটা বইও পড়বো আশা করি।
'দারবিশ'-এর প্রচ্ছদটা করেছেন সোহেল আনাম। আমার কাছে চমৎকার লেগেছে। লতিফুল ইসলাম শিবলীর পাঠকরা সবাই আপাতত তাঁর নতুন বই 'রাখাল' নিয়ে ব্যস্ত৷ কিন্তু যাঁরা এখনো 'দারবিশ' পড়েননি, চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন।
গল্পে গল্পে জার্নি টাইপের বই। কেমন যেন বিষাদের সুর জেকে বসে থাকে মনে। বই এর শেষ কয়েকটা লাইনে নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছিলাম। মানুষের জন্য কিছু করার অভিপ্রায়।
কি চমৎকার লেখকের লেখনী! আমি রীতিমত মুগ্ধ। না, তেমন কোন স্পেশাল প্লট না, কিন্তু লেখনী প্লাস জীবনবোধ নিয়ে ওনার চিন্তাভাবনা যেটা লেখায় ফুটে উঠেছে সেটা নিঃসন্দেহে স্পেশাল।
দারবিশ।মানে দরবেশ টাইপ লোক।সেইন্ট।এই উপন্যাসে এই লোকটি হলেন জামশেদ।মেডিকেলের চতুর্থ বর্ষে পাড়ি জমান সান ফ্রান্সিসকোতে।সেখানে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে গিয়ে ভর্তি হন।বিদেশে পাড়ি জমানোর কারণটাও দারুণ।জামশেদের কাছে তখন সিটি অব মিউজিক বিরক্তির এক শহর।ভ্রু কোঁচকে উঠার কিছু নেই।এখানে সিটি অব মিউজিক হল ঢাকা শহর। 'রিকশার টুংটাং পিয়ানোর সাথে দিনে পাঁচবার মুয়াজ্জিনের কন্ঠ যখন মিলে যেত তখন এই শহর হয়ে যেত সিটি অব মিউজিক' এভাবেই জামশেদ বর্ণনা করেন ঢাকা শহরকে।ঢাকা জামশেদের কাছে বিরক্তির শহর হল তখন, যখন তার প্রেমিকা আফরোজাকে নিয়ে পালাতে গিয়ে সে ধরা পড়ল।আফরোজা সেই মেয়ে যে জামশেদের সাথে পালানোর সময় স্যুটকেসভর্তি বই নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়েছিল। বিরক্তির শহর ঢাকাকে ত্যাগ করে জামশেদ তখন সান ফ্রান্সিসকো শহরে।তখন আমেরিকার কলেজ ক্যাম্পাসগুলো উত্তপ্ত হয়ে আছে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে।শত শত মৃত আমেরিকান সৈন্যদের কফিন দেশে ফিরত আর সেই আন্দোলন আরো বেশি জ্বলে উঠত।সে সময়টাতে বিশ বছরের যুদ্ধে প্রায় আটান্ন হাজার আমেরিকান সৈন্য নিহত হয়েছিল।সেইসব সৈন্যরা কি নিজ ইচ্ছায় যুদ্ধে যেত?না।তাদের বেশিরভাগকেই ড্রাফট সিস্টেমের মধ্যে ফেলে ফ্রন্ট লাইনে হাজির করা হত।আর যারা যেতে চাইত না তাদের নামে ওয়ারেন্ট ইস্যু হত।এই হল পরিস্থিত।সেই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তরুণ তরুণীরা।নিজস্ব কালচারের বিরুদ্ধে,পুজীবাদের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলনে মুখর হয়ে উঠে।সেই আন্দোলন কি রক্তক্ষয়ী? না।সেই আন্দোলন ছিল রক মিউজিকের সাথে অসাধারণ গীতিকবিতার সংমিশ্রণে গড়ে উঠা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ।আর সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝখানে এসে পড়লেন জামশেদ।তাকে সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে হাল চেনালেন মেলিনি।মেলিনি কে?তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি আন্দোলনের একজন ত্রানকর্মী।তারপর? তারপর মূল গল্পটা জামশেদ আর মেলিনিকে নিয়েই এগোয়।এবং উপন্যাসের সবটা জুড়েই মনে হয় মেলিনির ছোঁয়া লেগে আছে।সেখানে মাঝে মাঝে সঞ্জু,রোদেলার তিক্তমিষ্ট প্রেমের গল্পের আভাসও পাওয়া যায়।
শেষটায় গিয়ে একটা হাহাকার তৈরি হতে থাকে।কিন্তু সেই হাহাকারটা মিইয়ে যায় ফিনিশিংয়ে।হালকা বিরক্তির রেখা ফুটে উঠে কপালে।কিছু দিক বাদ দিলে সুখপাঠ্যই বলা চলে।
দারবিশ লতিফুল ইসলাম শিবলী সাধারন উপন্যাসের আবরণে অসাধারণ উপন্যাস. আগে পড়ে একজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে পড়তে বসেছিলাম পড়তে বসে আর ছেড়ে উঠতে পারিনি. রোদেলার বিশ্বাসের দোলাচল সঞ্জুর পাগলামি আর দারবিশের জামশেদ সব মিলিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে এক অনন্যসাধারণ কাহিনী। যদি বাংলাদেশের হত, কোন অঞ্চলে হতো, তবে কেমন হতো! গ্রামে গঞ্জের ভালোবাসার গল্প শুনি, কিন্তু সেই যখন ভিয়েতনামের যুদ্ধের সময় চলে যেতে হয়, চলে যেতে হয় সে সময় তরুণরা কিভাবে ভিয়েতনামের যুদ্ধের বিরুদ্ধে ত্যাগ করেছিল, কিভাবে এলাকা থেকে এলাকা ঘুরে বেড়াতো হিপ্পিরা আর তার সাথে এক ভালোবাসার কাহিনী পড়তে মন্দ লাগে না। হয়তো আমেরিকানদের কাছে পরিচিত আমাদের কাছে!!" কি ঘটেছিল দারবিশের, রোদেলা কিভাবে সাথে জড়িয়ে গেল? উত্তর দিতে চাইলে অনেক বড় হয়ে যাবে। তবে বলতে হয় কাহিনীটা ছোট। সমরেশ মজুমদার কালবেলাতে আমাদেরকে সেই সময়কার বিপ্লবের কথা বলে গিয়েছেন তিনি আমাদের অনেক বড় উপন্যাসটিতে ব্যাপিত রেখেছিলেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।অনেকটা কিন্তু সেরকমই। তাই দিন শেষ এবার আক্ষেপ থেকেই যায়। যতক্ষণ পড়েছি। পড়েই গিয়েছি। শুভকামনা লেখক এর জন্য
ভালো লাগে নি। মাঝের দিকে গল্প ঠিকঠাক ছিল। গল্পের প্লটও খারাপ না। তবে সবমিলিয়ে একটু বেশিই Lame. বাস্তবের ধারে কাছেও না। দার্শনিক কথাবার্তায় পরিপূর্ণ বই। যদিও অধিকাংশই বিরক্তির উদ্রেক জাগায়।
At first, I was really interested but after reading almost half of the book, i lose my interest. I think my expectations didn't match with the reality and that's the reason.
১১০ পৃষ্ঠার ছোট্ট উপন্যাস। পড়তে বিরক্ত লাগেনি। কাহিনীও বেশ। তবে লেখার মাঝে একধরনের অ্যামেচার গন্ধ আছে। বোঝা যায় কাঁচা হাতে লেখা। কিন্তু তারপরেও মধ্যবয়সী লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং জীবনবোধের ওপর ভর করে উপন্যাসটা উতরে গেছে। তবে সম্পাদনার অভাব বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় চোখে পড়ার মতো। ভুলভাল ইংরেজি বাক্যগুলো রীতিমতো দৃষ্টিকটু ছিল। পুরো বইতে বারবার লেখা হয়েছে “ইউ হ্যাভ ফেইথ অন মি” অথচ অন-এর স্থানে ইন হবে। ৩০০ টাকা গায়ের দাম, ৩০% ছাড়ে ২১০ টাকা দিয়ে কেনা; সেক্ষেত্রে ওভারঅল একটা গোছানো প্রোডাকশন তো আশা করতেই পারি। নবীন দেশি লেখকদের বইতে আমি প্রায়ই বাড়তি একটি স্টার যোগ করে দিই। এখানেও তা-ই দিলাম।
The good: - The plot from the past was truly captivating. Its narration was candid, plot was great, couldn't put down. Learned loads about the Hippie movement and Vietnam war.
The bad: - The characters were creepy and weird. The plot in the present was just awful. Dialogues were unnatural, phoney and cringe. Ruined the mood of the book.
বইয়ের নামঃ দারবিশ বইয়ের ধরণঃ উপন্যাস বইয়ের লেখকঃ লতিফুল ইসলাম শিবলী প্রচ্ছদঃ সোহেল আনাম প্রকাশকালঃ অমর একুশে বইমেলা ২০১৭ প্রকাশনীঃ নালন্দা পৃষ্ঠাঃ ১১০ মূদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা
সার-সংক্ষেপঃ বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা আছে অনেক কিছু। রিভিউ লেখার সময় সার-সংক্ষেপ হিসেবে সাধারণত আমি সেগুলোকেই তুলে ধরি। তবে এবার সেই নিয়মের ব্যতিক্রম করছি। আলোচ্য উপন্যাসটি শুরু হয় রোদেলা কে নিয়ে। রোদেলা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। বিনয়ী, সুন্দরী, বুদ্ধিমতি ও স্বাধীনচেতা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়েই সন্ধান শুরু করে চাকরীর। পেয়েও যায়। একজন পারসোনাল সেক্রেটারির কাজ। সেই সেক্রেটারি হতে হবে একজন ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধের। নাম মোহাম্মদ জামশেদ। তবে এই বৃদ্ধ যেন তেন লোক নন। বরং অসম্ভব বিচক্ষণ, অমায়িক ও প্রচুর জীবনীশক্তি সম্পন্ন মানুষ তিনি। রহস্যময় তাঁর চলাফেরা, বাচনভঙ্গি। তাই প্রথম প্রথম কিছুটা অদ্ভুতই লাগে তাকে রোদেলার। আর সেই ব্যাপারটি আরো ঘনীভূত হয় চাকরীর প্রথম ইন্টারভিউয়ের দিনেই। কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দিয়েই রোদেলা পেয়ে যায় ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিটি। তারপর একদিন রোদেলাকে খুলে বলেন তাঁর জীবনের কিছু সময়ের কথা। এমন কথা যা শুনে যেকোন মানুষই চমকে উঠবে। কি সেই কথা? জানতে হলে পড়তে হবে পুরো বইটি!
পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ
“এইখানে এই তরুর তলে তোমার আমার কৌতুহলে যেক’টি দিন কাটিয়ে যাব প্রিয়ে সঙ্গে রবে শূরার পাত্র অল্পকিছু আহার মাত্র আরেকখানি ছন্দ-মধুর কাব্য হাতে নিয়ে...”
মির্জা গালিবের এই কবিতাটি আমার খুব পছন্দের। পড়লেই জীবনটাকে খুব সহজ বলে মনে হয়। মনে হয়, জীবনযাপন করতে আসলেই বোধহয় কিছুই লাগে না। প্রিয় পাঠক, আপনি কি দারবিশ বা সেইন্ট শব্দের মানে জানেন? কি হয় মানে? সাধু, তাই না? আচ্ছা এবার বলুন তো, সাধু মানে কি? জানি, অনেকেই হয়ত বলবেন যে জীবনে কোন খারাপ কাজ করেনি, সেই সাধু। হ্যাঁ। কথাটা এক অর্থে ঠিক। তবে আসল সাধু কারা জানেন? যারা জীবনের আসল অর্থ বোঝার চেষ্টা করেন। জীবনটিকে তারা অন্যদের থেকে ভিন্ন ও ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। যার কাছে জীবন মানেই ভালোবাসা, প্রেম। হিংসা, বিদ্বেষ তারা এড়িয়ে চলেন। এবার আসি আলোচ্য উপন্যাসে। “দারবিশ” উপন্যাস নিয়ে এই রিভিউটি লেখার আগে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। কেন? কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম না যে এটিকে আমি কোনধরণের উপন্যাস বলবো। প্রেমের উপন্যাস? নাকি ঐতিহাসিক উপন্যাস? নাকি এডভেঞ্চার উপন্যাস? নাকি অন্যকিছু? আসলে উপন্যাস হিসেবে “দারবিশ”এ আছে অনেক কিছু। আছে ইতিহাস, আছে সমাজ, আছে রাজনীতি, আছে এডভেঞ্চার, আছে প্রেম। আবার এই সবকিছু ছাপিয়ে আছে এক গভীর জীবনবোধ। লেখক লতিফুল ইসলাম শিবলী ভাইয়ের প্রথম মৌলিক উপন্যাস এই “দারবিশ”। এর আগে তাঁর বেশ কিছু কবিতা ও গবেষণামূলক বই প্রকাশ হয়েছে। তবে শিবলী ভাইকে এদেশের মানুষ সাহিত্যিক হিসেবে কম, বরং গীতিকার হিসেবেই বেশি চেনে। ব্যান্ড দল এলআরবি’র “আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি”, জেমস’এর “জেল থেকে বলছি”, বিখ্যাত গান “তুমি আমার প্রথম সকাল”সহ অনেক জনপ্রিয় গানের গীতিকার তিনি। আলোচ্য দারবিশ উপন্যাসটি লেখকের প্রথম উপন্যাস হলেও, তিনি বেশ ভালোই কাজ দেখিয়েছেন। গল্পের কনসেপ্টটা অতটাও আলাদা না হলেও, লেখনীর ধরণটা অন্যদের থেকে বেশ আলাদা। তাছাড়া বেশ ম্যাচুরড লেখনী। কাঁচা হাতের কাজ বলে মনে হয়নি তেমন। বইটির আরো একটি মজার দিক হলো, লেখক যেহেতু ব্যান্ড সংগীতের সাথে জড়িত তাই গল্পেও বারবার তুলে এনেছেন মিউজিকের কথা। রক এন্ড রোলের কথা। তৎকালীন আমেরিকা’র জীবন ও হিপ্পিদের কথা। এছাড়া লেখক বইটিতে খুব সুন্দর সুন্দর কিছু উপমা এনেছেন। যেমন ঢাকা শহরকে তিনি বলেছেন, “সিটি অফ মিউজিক”! গল্প বলার সময় এনেছেন কিছু কাব্যিক ভঙ্গিও যা পাঠককে দিবে এক অন্য রকমের প্রশান্তির অনুভূতি। তবে কোন বইই নিখুঁত হয়না। তাই বইটি পড়ার সময় কিছু সূক্ষ্ণ ভুল চোখে পড়েছে। যেমন, বিরামচিহ্নের ব্যাবহার। বইটিকে উক্তি (“”) চিহ্নের ব্যাবহারে সমস্যা ছিল। লেখক লেখাগুলো বেশ ঢালাওভাবে লিখেছেন। তাই কাহিনীর বর্ণনা ও চরিত্রের সংলাপ আলাদা করতে বেশ কস্ট হয়। এছাড়া অনেক সংলাপের প্রথমে শুরুর উক্তি চিহ্ন ছিল। কিন্তু শেষে ছিল না। এছাড়া গল্পের দৃশ্যপট বর্ণনায় একটু সমস্যা ছিল। এত দ্রুত ঘটনা প্রবাহ হয়েছে যে পাঠক হিসেবে একটু সমস্যা হয়েছে সেগুলো পর্যায়ক্রমে সাজাতে। তবে এই দুটি সমস্যা ছাড়া আর কোন সমস্যা তেমন চোখে পড়েনি। বইয়ের বাঁধাই, কাগজের মান ও ছাপা ছিল দেখার মত। মোটা অফসেট পেপারে লেখাগুলো যেন ঝকঝক করছিল। বইয়ের প্রচ্ছদটিও অনেক সুন্দর ও ভিন��ন। দেখতে খুব আকর্ষনীয়। প্রচ্ছদশিল্পীকে ধন্যবাদ জানাই এত চমৎকার একটি প্রচ্ছদ বানানোর জন্য। সবশেষে বলতে চাই, যদিও আলোচ্য উপন্যাসে উঠে এসেছে ৬০, ৭০ দশকের আমেরিকা’র সমাজ, রাজনীতি, হিপ্পি ও তাদের গানবাজনার কথা। কিন্তু সেগুলোকে ছাপিয়ে উঠে এসেছে অনেককিছু। প্রেম, ভালোবাসা, জীবন, সংগ্রাম, ভাগ্য এবং সফলতার গল্প। এখানের উল্লেখিত স্থান সত্য, ইতিহাস সত্য, কাল্পনিক শুধু এর চরিত্রগুলো। তাই সুপ্রিয় পাঠক, বইটি পড়ে দেখুন। কথা দিচ্ছি, ভালো লাগবে। ধন্যবাদ! হ্যাপি রিডিং!
সেক্স, ড্রাগস এন্ড রক এন রোল ; গত শতাব্দীর মাঝামাঝিতে শুরু হওয়া প্রথাবিরোধী হিপ্পি সম্প্রদায়ের মূল চালিকা শক্তি। সমাজের তথাকথিত গুডবয় ইমেজকে ঝেড়ে ফেলে তারা গড়ে তুলেছিল এমন এক অ্যান্টি কালচার যা বিব্রত করে ফেলেছিল আমেরিকান সরকারকে। আমেরিকা যেখানে ভিয়েতনামে সশস্ত্র যুদ্ধ চালাচ্ছিল তখন দেশের ভিতরের এই ৬০ মিলিয়ন হিপ্পিরা শান্তিপূর্ণভাবে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। সেই উত্তাল সময়ে ত্রিশ বছরের এক টগবগে বাঙ্গালি যুবক জামশেদ যোগ দেয় তাদের সাথে। আর সেখানেই তার পরিচয় মেলিনির সাথে, যে প্রবলভাবে এক দেশপ্রেমিক হলেও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কারণে ট্যাগ পেয়ে গিয়েছিল রাশান স্পাই হিসেবে।
একদিকে বোহেমিয়ান হিপ্পিদের সাথে একাত্মতা আর অন্যদিকে মেলিনির প্রেম – জামশেদকে এই দুই টেনে নিয়ে যাচ্ছিল এক ভয়ানক পরিণতির দিকে। কিন্তু সে মেলিনির হাত ছাড়তে পারে নি। কিন্তু পুলিশের ধাওয়ায় পালাতে দিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ওরা ; মেলিনি হারিয়ে গেল মেক্সিকোর জনারণ্যে আর জামশরদের ঠাঁই হল জেলে।
সেই উত্তাল সময়ের দীর্ঘদিন পর সত্তর বছরবয়সী জামশেদ আবার ফিরে এসেছে সিটি অভ মিউজিকখ্যাত ঢাকাতে, মেলিনিকে আবার খুঁজে পেতে, মেলিনির সেই ভালোবাসাপূর্ণ হৃদয় খুঁজে পেতে। এখানেই তারসাথে দেখা হল সঞ্জু-রোদেলা জুটির সাথে। তারপর? জামশেদ পাবে কি সেই হৃদয়? এই বয়সে তাঁর উদ্দেশ্য কি? সঞ্জু কি মেনে নিতে পারবে রোদেলার এই পরিবর্তন? দারবিশটাই বা কে? তাহলে কি…
পাঠ প্রতিক্রিয়া :
অসাধারণ একটা বই পড়লাম। একজন বাঙ্গালি লেখকের পক্ষে এমনভাবে বা এই বিষয়ে লেখা সম্ভব তা ভাবতেও পারিনি। বইটার বিষয়বস্তু আর ইতিহাসের ধারা বর্ণনাভঙ্গি থেকেই এটা স্পষ্ট লেখক নিজে আমেরিকান হিপ্পি আন্দোলন আর মিউজিক নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। তাইতো অসাধারণভাবে তাদের আন্দোলন, জীবনযাত্রা, বিশ্বাসকে বর্ণনা করতে পেরেছেন ; সেখানে একজন বাঙ্গালিকে একাত্ম করতে পেরেছেন।
আর জামশেদ আর মেলিনি চরিত্র দুইটার কথা আর কি বলব! সত্যি বলতে দুইটা চরিত্রের উপরেই আমি প্রেমে পড়ে গেছি। জামশেদের গভীর জীবনবোধ আর দার্শনিকসূলভ দৃষ্টিভঙ্গিতে একদম মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। আর এ থেকে লেখকের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও একটা ধারণা খুব সহজেই পাওয়া যায় কেননা তিনি নিজেও তো সেই গানের মানুষ আর স্বভাবগতভাবে একজন বোহেমিয়ান। আর মেলিনির কথা কি বলব। বইটা শেষ করেও এখনও আমি জামশেদের মতোই মেলিনিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি! ওদের দু’জনের সম্পর্ক আমার কাছে একদম স্বপ্নীল মনে হয়েছে।
এছাড়া গতানুগতিক প্রেমিক সঞ্জু, সেই ভয়ানক সিরিয়াল কিলার যে মানুষকে গান শোনাতে হত্যা করে শুধু এটা জানার জন্য যে গান মৃত্যুপথযাত্রীর উপর কি প্রভাব ফেলে, সেই হিপ্পির দল যারা জীবনকে উৎযাপন করে নিজেদের মতো করে সবকিছুই রীতিমতো মুগ্ধ করেছে। আর গল্পের বৈচিত্র, থ্রিল, অভাবনীয় পরিণতি সবই অসাধারণ।
ঢাকা সিটি অব মিউজিক যে শহরে হাজার হাজার গ্র্যান্ড পিয়ানো নিয়ে বাদকেরা শহর জুড়ে ঘুরে ঘুরে দিনরাত পিয়ানো বাজায়। আর শুধু পিয়ানো না, তার সাথে শতশত গায়কও কোরাসে কন্ঠ মেলায়।
কি বিশ্বাস হচ্ছে না? এটা সেই সময়ের কথা যখন ঢাকার রাস্তায় হাজার হাজার রিকশা চলত। আর রিকশার বেলগুলো পিয়ানোর মত টুংটাং করে বাজত। আর তার সাথে দিনে পাঁচবার মুয়াজ্জিনের কন্ঠ যখন মিলে যেত তখন এই শহরটা হয়ে যেত সিটি অব মিউজিক।
এটা সেই সময়ের কথা যখন টগবগে তরুণ জামশেদ আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছিল। আমেরিকা তখন উদ্দাম। বিদ্রোহী বিট জেনারেশন আর লম্বাচুলো হিপিরা শাষন করছে আমেরিকান তারুণ্য। আর তাদের অনুসরণ করছে পুরো বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম।
সেই সময় আমেরিকান কলেজ ক্যাম্পাসগুলো উত্তপ্ত হয়ে ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে। এ রকম এক পরিবেশে জামশেদের দেখা হয় মেলিনির সাথে। স্প্যানিশ আমেরিকান মেডিক্যাল স্টুডেন্ট মেলিনি ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি আন্দোলনের নিবেদিত কর্মী।
প্রেমে পড়ল জামশেদ। মেলিনিকে ভালবেসে মেলেনির আদর্শে উদ্ভুত হয়ে একসাথে কাজ করতে লাগল। এমনি সময়ে রাশিয়ান স্পাই সন্দেহে মেলিনির পেছনে লাগে এফবিআই। শুরু হয় তাদের পলাতক জীবন। লম্বাচুলো হিপিদের সাথে মিশে পালায় তারা।
মেলিনিকে নিয়ে টেক্সাস থেকে চোরাই পথে মেক্সিকো ঢোকার পথে ঘটে যায় চরম বিপর্যয়।
প্রায় 70 বছর পর সে ফিরে আসে আবার সিটি অব মিউজিক, ঢাকায়। এসে দেখা পায় রোদেলার। এই সময়ে জন্মেও যার মন তৈরি হয়েছিল এলভিস প্রিসলি, বিটলস আর নির্ভানার সুরে সুরে। অদ্ভুতভাবে সে সেই লম্বাচুলো হিপির প্রেমে পড়ে যায়।
এই গল্প এই সময়ের। এই গল্প জামশেদের। এই গল্প রোদেলা আর সন্জুর।
আমার কথা :
প্রথমে ভাবতে পারিনি এই বইয়ের রিভিউ আমি লিখতে পারব। কয়েকবার চেষ্টা করে পিছিয়ে এসেছি। এইবার সাহস করে দু'লাইন লিখেই ফেললাম।
আমি এই সময়ের মানুষ। সিটি অব মিউজিকের কিছুটা আমার দেখা। সেই স্মৃতিকে কেউ এত সুন্দর করে উপস্থাপন করবে এটা কখনো কল্পনাতেও আসেনি। ফাকা রাস্তায় সাই সাই করে উড়ে চলা রিকশা তার সাথে মিস্টি মধুর টুংটাং বেল এখনকার কেও একমাত্র হরতাল ছাড়া অনুভব করতে পারবে বলে মনে হয় না। এই বইটা যেন আমাকে সেই দিনগুলোতে নিয়ে গিয়েছিল।
রক ব্যান্ড আর উদ্দাম যাযাবর জীবন কিছুটা হলেও যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি দিয়েছিল। ভেসে গিয়েছিলাম আমিও চির তরুণ জামশেদের বর্ণিল বর্ণনায়।
আর বইয়ের মান নিয়ে তো কোন প্রশ্ন করার অবকাশ রাখেননি লেখক প্রকাশক। অসম্ভব সুন্দর প্রচ্ছদ, ভালো মানের কাগজ, বাধাই, সবকিছুই অনেক মানসম্মত। বইটা শুরু করার আগে প্রায় মিনিট দশেক হাতে নিয়ে বসে ছিলাম। এত সুন্দর বইটা।।।
৬০-৭০ দশকের, সে ধারাবাহিকতায় ৮০’র দশকের উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপটে মর্মস্পর্শী একটা প্রেমের গল্প দারবিশ। শুধু প্রেমের গল্প বললে, বইটাকে খাটো করে দেখা হয়। বরং প্রেম, জীবনবোধ, মনস্তত্ব আর মানবিকতার গল্প দারবিশ।
হিপ্পিদের সময়ে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে যে প্রেম তৈরি হয়েছিল যুবক-যুবতী’র, তার ছায়ায় এই সময়ের আরেক জোড়া যুবক-যুবতীর প্রেম পূর্ণতা পায়, প্রতিষ্ঠিত হয়। না জানার সুযোগে যে যুগল আসলে ব্যার্থ প্রেমের দাঁড় টেনে নিজেদের সফল নাবিক ভেবে নিচ্ছে; তাদের বিপরীতে ভাঙা-��ড়ার ভেতর দিয়ে রোদেলা আর সঞ্জুর প্রেম জেনে-বুঝে সফল হল। আর এই প্রেম জানার, প্রেম বোঝার সুযোগ করে দিল “দারবিশ”।
পুঁজিবাদের কদর্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হিপ্পিদের গান-কবিতা, গীতিকবিতা, সমাজের-সামাজিক অনুশাসনের বাইরে নিজেদের নিয়ে যাওয়ার গল্পটা ছুঁয়ে যায়। বিশৃংখলার সেই দিনে মেলিনি আর জ্যামির বিচ্ছেদ কষ্ট দেয়। লতিফুল ইসলাম শিবলীর কোমল লেখনী যেন বইয়ের পাতায় বিষাদ মেখে রেখেছে। বিষাদমাখা কাগজ গুলো উড়ে বেড়ায় সানফ্রান্সিসকো, টেক্সাস, মেক্সিকো থেকে দ্য সিটি অব মিউজিক এ।
"মাথার উপর যে শূন্যতা তার নাম আকাশ বুকের ভেতর যে শূন্যতা তার নাম দীর্ঘশ্বাস"
যে গল্পের শুরুটা এত সুন্দর তার মাঝের অলিগলিতে কানামাছি খেলতে খেলতে শেষটা কেন এত ধূসর বিবর্ণ ?
পরিচয় থেকে প্রনয়কে পরিনয়ের পরিনতি দিয়ে নাই বা প্রতিষ্ঠিত করা হলো, কিন্তু জামশেদ মেলিনির গল্পে রোদেলার মেলবন্ধন ঠিক যেন খাপছাড়া সুরের সাথে কিছু গাঁটছড়া বাঁধা অর্থহীন প্রলাপের কাব্য।
সবটা বেশ হতে পারত, কিন্তু স্রষ্টাই সৃষ্টির সাথে সহাস্যে যখন পরিহাসে মত্ত,সাধারনের সেখানে মেনে নেয়া ছাড়া কি করার আছে সাধ্য?
লেখকের পড়া প্রথম বই। অসম বয়সী দুজন নরনারীর অভিজ্ঞতা ও সম্পর্ক নিয়ে মূলত গল্পটা এগিয়েছে। এই সম্পর্কটা কেমন সেটা বলছি না। তবে এই অনুভূতিটা অনেক বেশি ভালো লেগেছে। লেখার স্টাইল এতটাই সাবলীল, যে এক বসায় পড়ে ফেলা মত। কাহিনি খুব বেশি আহামরি না তবে লেখকের গল্প বলে যাওয়ার ক্ষমতা দারুন। বেশ ছোট বই, বইটিতে মন ছুয়ে যাওয়ার মত জীবন দর্শন কেন্দ্রিক বেশ কিছু লাইন ছিল। লেখকের আরো বই পড়ার আশা রাখি।
This entire review has been hidden because of spoilers.
অতি চমৎকার একটা বই, ভাষ্য ভীষণ আকর্ষক। সঞ্জু রোদেলার মতো মেয়েরে ডিজার্ভ করে না, বলাই বাহুল্য। অন্তত আমি "ভালোবাসা সব জয় করতে পারে" এই থিওরিতে বিশ্বাসী নই আর কী। তবু নায়িকারে একরকম গছানোই হইসে বলা যায়। তবু সুখপাঠ্য একটা বই। জামশেদের মতন পোড় খাওয়া চরিত্র আমার সবসময়ই পছন্দ।
★সংক্ষিপ্ত আলোচনাঃ ~~~~~~~~~~~~~ উপন্যাসটির শুরু হয় রোদেলা নামক এক মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ের একটি অদ্ভুত চাকরি পাওয়ার মাধ্যমে। কিছু অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দিয়েই সে চাকরিটি পেয়ে যান। সে ওখানে জামশেদ নামক এক সত্তুর বছর বয়সী বৃদ্ধের পার্সোনাল সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত হলেও তার কাজটাজ তেমন কিছুই করতে হয়না। অন্যদিকে রোদেলার প্রেমিক সঞ্জু তার এই চাকরিটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি এবং বারংবার তাকে চাকরিটি ছেড়ে দিতে জোর করতে থাকে। এদিকে বৃদ্ধের বিচক্ষণতা, রহস্যময় চালচলন ও ভাবভঙ্গি দেখে রোদেলার মনে তার সম্পর্কে জানার জন্য কৌতুহল জাগে। তারপর সে ধীরে ধীরে তার অতীত সম্পর্কে সবটা জানতে থাকে এবং আশ্চর্যান্বিত হতে থাকে। বইটির মূল আলোকপাতই হচ্ছে জামশেদের অতীতের স্মৃতিচারণ।
জামশেদ তার প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদের পর অনেকটা অভিমানী মন নিয়েই ঢাকা থেকে আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোতে পাড়ি জমায়। সেখানে তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধে পাঠানোর জন্য সরকার তরুন ছাত্র ছাত্রীদেরকে জোর করে বাধ্য করতো। তখন এন্টি-কালচার বা যুদ্ধবিরোধী একটি দল যা হিপ্পি নামে পরিচিত তারা এ যুদ্ধ ও রক্তপাত বন্ধের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবি ছিলো আমেরিকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। ঐ আন্দোলনেরই এক সাহসী দেশপ্রেমিক ছাত্রী মেলিনির সাথে জামশেদ এর পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে সম্পর্কটা প্রেম অব্দি পৌছায়। সেই আন্দোলনে জামশেদ ও মেলিনির প্রভাব ছিলো ব্যাপক। মেলেনিকে রাশিয়ান স্পাই হিসেবে সন্দেহ করে তার পেছনে এফবিআই লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারপর থেকে তারা পলাতক জীবন শুরু করে। পালাতে যেয়ে মেক্সিকোর সীমান্তে জামশেদ ধরা পড়ে যায় যার ফলে তাকে কয়েকবছর জেলে থাকতে হয় এবং অন্যদিকে মেলিনি যার পেটে ছিলো জামশেদের সন্তান সেও হারিয়ে যায় মেক্সিকোতে। জেল থেকে ছাড়া পাবার পর জামশেদ মেলিনিকে হন্য হয়ে খুঁজতে থাকে। তারপর কি হয়,কি কারণে জামশেদকে আবার ঢাকায় ফিরে আসতে হয় সেসব জানতে বইটি পড়তে হবে।
★পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ ~~~~~~~~~~~~ বইটিতে হিপ্পিদের কালচার,তাদের যাযাবর জীবনাচারণ এবং শান্তিপূর্ণ আমেরিকা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। লেখকের অনবদ্য লেখনীর কথা নতুন করে বলার কিছুই নেই। ওনার আসমান পড়ার পর লেখনীর প্রতি মুগ্ধ হয়েই তার বাকি বইগুলো পড়ার ইচ্ছা জেগেছিলো। জামশেদ চরিত্রটির দার্শনিক ও জীবনবোধে পরিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও কথাগুলো বেশ ভালো লেগেছে।