শিশু-কিশোর সাহিত্যের পাঠকদের সঙ্গে অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর পরিচয় করিয়ে দেওয়া বাহুল্য মাত্র। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মায়োপিক সমালোচকেরা এই অসাধারণ লেখককে শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞান বা জঁর-ভিত্তিক ফিকশনের রচয়িতা হিসেবেই বর্গীকৃত করতে চান। অথচ, গত কয়েক বছরে এপার বাংলার প্রায় সবক'টি প্রথম সারির পত্রিকায় অভিজ্ঞান-এর যেসব যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে, তাদের পড়ার পর পাঠক কিন্তু ঠিক সেই অনুভূতিরই নাগাল পেয়েছেন, যা পাওয়া যায় জঁর-এর বেড়া ভাঙা সার্থক ছোটোগল্প থেকেই। আলোচ্য সংকলনটি সেই সার্থকতার এক অনবদ্য নিদর্শন। কী কী লেখা এই সংকলনে আছে, তা লেখার আগে বরং বলি আমার অতৃপ্তির কথা। এমন একটি চমৎকার সংকলনে দুটি জিনিস প্রত্যাশিত ছিল, যাদের আমি পাইনি: প্রথমত, লেখকের তরফে একটি পূর্বপাঠ, যা এই ধাবমান কালের জালে জড়িয়ে পড়া লেখক-প্রকাশক-পাঠক ত্রয়ীর অবস্থান, এবং সেই নিয়ে লেখকের নিজস্ব ভাবনাকে প্রকট করবে; দ্বিতীয়ত, কোন লেখা আগে কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল তার পরিচয়। এবার আসি গল্পের কথায়। (১) ভয়নিচের অজানা ভাষা: শারদীয়া "শুকতারা" ১৪২৫-এ প্রকাশিত এই বড়োগল্পটি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। এই আইসিস-জামাতি-চাড্ডি-ময়ূর অধ্যুষিত সময়ে দাঁড়িয়েও এত সহজ ভাষায় এমন করে আশা ও জীবনের গান গাওয়া যায়, একথা এই লেখাটি না পড়লে বিশ্বাস হতে চায় না। (২) আলো-ছায়া: পূজাবার্ষিকী "আনন্দমেলা" ১৪২৫-এ প্রকাশিত এই গল্পটা নিজেই কিয়ারসক্যুরো ঘরানার খাঁটি নমুনা, কারণ সেটা ভূতের, না ভয়ের, না ইতিহাসের, না শিল্পের, এই ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই গল্প শেষ হয়ে গেল। (৩) বাটারফ্লাই এফেক্ট: গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, এই গল্পটা আগে পড়া না থাকলে, বিশেষত লেখককে শুধুই কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের স্রষ্টা হিসেবে জানলে, পাঠক এখানে "দ্য সাউন্ড অফ থান্ডার"-এর মতো কোনো কাহিনি আশা করবে। এটা ঠিক যে এই গল্পটা আপাতদৃষ্টিতে কল্পবিজ্ঞানের। কিন্তু এটাও ঠিক, যে প্লট-ভিত্তিক কাহিনির বদলে এখানে আমরা পেয়েছি আত্মানুসন্ধানের এক গভীর আখ্যান, যেমনটা এর আগে পেয়েছিলাম "নিয়ম যখন ভাঙে"-তে। (৪) অ্যাকিনেটপসিয়া: "মায়াকানন" বার্ষিকী ১৪২৫-এ প্রকাশিত এই গল্পটার কেন্দ্রে আছে অনিলিখা, তবে এবারে সে কোনো বিজ্ঞানসুবাসিত অ্যাডভেঞ্চার করেনি, বরং করেছে রহস্যভেদ। দুঃখ একটাই, গল্পটা বড়ো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল। (৫) পরজীবী: বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য সচরাচর যে থিমগুলো এড়িয়ে চলে, তেমনই একটা থিম নিয়ে লেখা হয়েছে এই গল্পটি, যা গত বছর "শুকতারা" কল্পবিজ্ঞান সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পটা দারুণ, তবে ঠিক জুতসই হয়ে শেষ হল না। ডক্টর পাই-এর এই গল্পটা আরো বড়ো, প্রপার সাইফি-হরর করে কি লেখা যায় না? লেখক কি একটু ভেবে দেখবেন প্লিজ, কারণ এই থিম নিয়ে বাংলায় শেষ বড়ো লেখা ছিল স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কলমে স্যার সত্যপ্রকাশের অ্যাডভেঞ্চার "ভ্যাম্পায়ার আইল্যান্ড"। (৬) চড়াই-এর গল্প: এই গল্পটা পড়তে গিয়েও যেটা পাঠককে ছুঁয়ে যাবে, তা হল এর দৃষ্টিভঙ্গিগত সরলতা, এবং অনাবিল আশাবাদ। এক সময় প্রচেত গুপ্ত এইরকম লেখাই লিখতেন, যা পড়ার পর মনে হত, যেন মালিন্য আর হতাশায় গলা-অবধি পুঁতে থাকা আমার শরীর আবার কিছুটা মুক্তি পেল। প্রচেত প্রতিষ্ঠানের দশচক্রে ভূতায়িত হয়েছেন বলেই হয়তো অভিজ্ঞান তুলে নিয়েছেন তাঁর ব্যাটন। (৭) মারগ্যাম কাসলে খানিকক্ষণ: লেখকের নিজস্ব রসবোধ, কল্পনা, বাস্তব, আর সমকাল মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে এই চমৎকার গল্পটায়। হুড়মুড়িয়ে নয়, আয়েশ করে পড়ুন গল্পটা। (৮) পাথরের রাস্তায়: "বইমেলা" পত্রিকায় প্রকাশিত এই গল্পটা হল সেই বিন্দু, যার মধ্যে গত কয়েক বছরে সারা পৃথিবীকে ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া এক অমানবিক যুদ্ধের ফলে বয়ে যাওয়া রক্তের সিন্ধু ধরা পড়েছে। যাঁরা অভিজ্ঞান-এর লেখাকে শুধুমাত্র শিশু-কিশোর পাঠ্য ভেবে এড়িয়ে যান, এই গল্পটাও তাঁদের পড়ার বাইরে থেকে যাবে, তাই তাঁরা জানতেও পারবেন না, কতটা উষ্ণতা, কতটা স্পন্দন নিজের বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে এই ছোট্ট গল্পটা। (৯) আগে কোথায় দেখেছি: এই গল্পটা নিয়ে শুধু এটুকুই লেখার আছে যে, 'ভয়নিচের অজানা ভাষা', আর 'পাথরের রাস্তায়' ছাড়া যদি মাত্র একটা গল্প পড়েই এই বইটা সরিয়ে রাখতে চান তাহলে এই একটি গল্প পড়ুন। কেন? দয়া করে পড়ুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন। (১০) উলূপী: শারদীয়া "ম্যাজিক ল্যাম্প" ১৪২৫-এ প্রকাশিত এই গল্পটা পড়ে আমার মাথায় দুটো প্রশ্ন জাগল, আর সেগুলো হল: ক] বিশ্বাস-অবিশ্বাস-সংস্কার এই ভাবনার টানাপোড়েন নিয়ে বিস্তর তথাকথিত সিরিয়াস লেখা পড়েছি, কিন্তু লোককথা, পুরাণ, আর অঙ্ক মিশিয়ে এমন ভয়ের গল্প, সেও আবার অনিলিখাকে কেন্দ্রে রেখে, এর আগে বিশেষ পড়িনি। লেখক যদি এই ধারায় আমাদের আরো কিছু "ওরে মা রে!" উদ্রেককারী লেখা উপহার দেন, তাহলে ফিদা হই। খ] অনিলিখার সাজগোজ (নীল সালোয়ার কামিজ, চুলে ঝিনুকের ক্লিপ, এবং ঠোঁটে লাল লিপস্টিক) দেখে চিন্তিত হচ্ছি। এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যের একমাত্র ডাকাবুকো নায়িকাটি কি শীঘ্রই পাত্রস্থ হবে? সেটা হলে কিন্তু আমরা অবস্থান ধর্মঘট করব! (১১) বিশ্বাস: এই সংকলনের সার্বিক সুর যদি হয় "ভালো থেকো, ভালো রেখো", তাহলে এই গল্পটিও বেসুরো না হয়ে মরুতে সবুজের সাধনা করেছে। (১২) একটু অন্যরকম: এক-আধটা গল্প হয়, যেগুলোর বিশ্লেষণ হয় না, হয় শুধু পড়া শেষ হলে গলার কাছে জমে ওঠা গিঁটটা একটা ঢোক গিলে সরানোর চেষ্টা। এটাও তেমনই। (১৩) ছেলেটা এখনও বন্ধু খোঁজে: বাংলায় ভয়ের উপন্যাস লেখা খুব কঠিন কাজ। মানবেন্দ্র পাল, এবং কিছুটা (যেহেতু হরর বিষয়ে তাঁর টার্গেট পাঠক ছিলেন বড়োরাই) অনীশ দেব, এছাড়া শিশু-কিশোর সাহিত্যে এই নিয়ে সফল লেখকের সংখ্যা বড়োই কম। সৌভাগ্যক্রমে, ১৪২৫-এ দুটো পুজোসংখ্যায় আমরা ভয়ের উপন্যাস পেয়েছিলাম: শারদীয়া "কিশোর ভারতী"-তে সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর 'ওরা থাকে পাতালে', এবং "আমপাতা জামপাতা"-য় আলোচ্য উপন্যাসটি। ইতিহাস, গথিক হরর, এবং শ্বাসরোধী আতঙ্কের পরিবেশ তিলে তিলে গড়ে তোলায় লেখক এখানে যে ধরনের মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই দুর্বল হৃদয়ের পাঠকের জন্য বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ জাগানিয়া।
সব মিলিয়ে তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? দাঁড়াল এই যে মাত্র দু'শো টাকা দিয়ে এগারোটা মন-ভালো-করা, গা-ছমছমানো, বা স্তব্ধবাক করে দেওয়া গল্প, প্লাস গত বছরের অন্যতম সেরা দুটি উপন্যাস পড়ার এই সুবর্ণসুযোগ হাতছাড়া করলে খুব-খুব ঠকে যাবেন। দেব সাহিত্য কুটির এই চমৎকার বইটি আমাদের কাছে তুলে দিয়ে ধন্যবাদার্হ হলেন। আশা রাখি, আগামী দিনে এই সময়ের সেরা লেখকদের লেখা এমনি করেই তাঁদের মাধ্যমে সুমুদ্রিত হার্ডকভার হয়ে আমাদের কাছে আসবে। পাঠ শুভ হোক।
ভয়নীচের অজানা ভাষা গল্পসংকলনটিতে মোট ১৩টি গল্প আছে। লেখক মূলত শিশুকিশোরদের জন্য লিখলেও ওনার লেখা ছোটো বড়ো সবার কাছেই সমান জনপ্রিয়। নানান স্বাদের গল্প দিয়ে সাজানো এই বই, এর মধ্যে কিছু গল্পে আছে মানবিকতার ছোঁয়া। এখানের মধ্যে আমার কাছে সবথেকে বড় পাওয়া হল অনিলিখা-র গল্প, মোট ৩টি গল্প - অ্যাকিনেটপসিয়া, উলুপী, ছেলেটা এখনও বন্ধু খোঁজে। এতগুলো গল্পের মধ্যে আমার যেগুলো সবথেকে ভালো লেগেছে - আগে কোথায় দেখেছি, বিশ্বাস, পরজীবী, উলুপী।
ভয়নীচের অজানা ভাষা ও আরও বারো.. অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী..
1 . ভয়নীচের অজানা ভাষা: যা তুমি ভাবতে পারবে, মনে রাখবে কাল সেটাই সত্যি হতে চলেছে... এটাই ছিল রাজর্ষির জীবনের মূলমন্ত্র। এর ওপর ভিত্তি করেই সে শিখতে থাকে ভয়নীচের সেই অজানা ভাষাকে যার দ্বারা পুকুরের জলে লাফালাফি করা ব্যাঙাচি থেকে শুরু করে পাতার ওপর ঝিমিয়ে পড়া ফড়িং, বটগাছের ওপর খেলতে থাকা পাখি এমনকি ছোট ছোট লাল পিঁপড়েদের কথাগুলোকে ও বোঝা যায়। এছাড়া বন্ধুর স্বপ্নকে ও একনিমেষে পড়ে ফেলতে পারে সে। তাই এই ভাষা কে বুঝতে সবাই কে গল্পটি পড়ে দেখতেই হবে।
2. আলোছায়া : এই গল্পের প্রতিটি স্তরই একধরনের ভয়াবহ আবহের মোড়কে জড়ানো। কিন্তু সেই মোড়ক টিকে খুলতে খুলতে গেলে দেখা যাবে ভয়ের সাথে অসাধারণ ভাবে নৈতিক মূল্যবোধের মিশেল ঘটানো হয়েছে।
3. বাটারফ্লাই এফেক্ট : এই গল্পে স্বামী ও একমাত্র ছেলে রজত কে হারিয়ে রীমাদেবীর জীবনে আপন বলতে আর কেউই ছিল না। তাই নিজেও মৃত্যু কে বরণ করে নেবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তার জীবনে ঘটে যায় "বাটারফ্লাই এফেক্ট" অর্থাৎ এমন কিছু কারণ যা দেখতে ছোট হলেও তার প্রভাব হয় বিশাল। আর এখানে বিশাল প্রভাবটা হল একজন বাঁচবার আশা ছেড়ে দেওয়া মানুষ কে পুনরায় বাঁচতে শেখানো। আর কারণ টা কি সেটা জানতে সবাই কে গল্প টা পড়ে ফেলতে হবে।
4. অ্যাকিনেটপসিয়া : লন্ডনের বিখ্যাত ধনী স্যার ম্যাক্সের বাড়ি থেকে চুরি হয়ে যায় বিখ্যাত ডাচ শিল্পী রেমব্রান্টের পেন্টিং, যার দাম প্রায় ১০০ কোটি। সেই চোর কে ধরা এবং পেন্টিং টি অনিলিখা কিভাবে উদ্ধার করে, সেটা নিয়েই এই গল্প।
5. পরজীবী : মিস্টার পাই এর কাছে একদিন হঠাৎই এসে উপস্থিত হয় রাজর্ষি নামে এক স্কুল পড়ুয়া। তার দাবি ওর বন্ধু রোমিত কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তার কাছে সাহায্য চায় সে। সে এও জানায়.. এর জন্য নাকি দায়ী একটা কালো পাথর। গল্পটা পড়তে দুর্দান্ত লেগেছে। তবে গল্পটির শেষে মনে হবে এই প্লট টা থেকে ভবিষ্যতে একটা বড় গল্প বা উপন্যাস লেখকের কাছ থেকে পেলে আরও ভাল হয়।।
6. চড়াই এর গল্প : মা মারা যাবার পর থেকে তুতান আর তার বোন পালী ওদের মামাবাড়িতেই থাকে। তুতান স্কুল থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন একটি বইয়ের দোকান থেকে একটা করে গল্প পড়ে আসত। আর বাড়ি ফিরে সেই গল্পই তার বোন কে শোনাত। কিন্তু হঠাৎই দোকানটি বিক্রি হয়ে যাওয়ায় সে মহা সমস্যায় পড়ল। এখন কি করে রোজ সে তার বোন কে নতুন নতুন গল্প শোনাবে, এই নিয়েই ভীষণ মিষ্টি গল্প এটি।
7. মারগাম ক্যাসলে খানিকক্ষণ : সব মানুষেরই জীবনে কিছু অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটে থাকে। ভূতে বিশ্বাসীরা সেই সব ঘটনা কে ভৌতিক ও ভূতে অবিশ্বাসীরা তাকে নানান যুক্তির প্যাচে ফেলে নিজেদের মনকে শান্ত করে। এই গল্পটি ও তেমনই এক অভিজ্ঞতা যার শেষে লেখক পাঠকদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন যে এটিকে তারা কোনো যুক্তির মধ্যে ফেলবে নাকি ঘটনাটি যে 'সব লজিকের বাইরে' সেটাই মেনে নেবে।
8. পাথরের রাস্তায় : সমস্ত কিশোর কিশোরীরাই তাদের বুকের ভেতর আগলে রাখে নানান ধরনের ছোট বড় স্বপ্ন কে। কিন্তু বড় বড় মানুষদের হিংসা, ঝগড়া, লড়াই ওদের সেইসব স্বপ্ন গুলো কে কেড়ে নিয়ে ওদের কোমল নিষ্পাপ হৃদয় কে ঘৃণায় ভরা পাষাণে পরিনত করে। লেখক এর কথায়.. " আমরা পৃথিবীতে আসি ভালবাসার জন্য, কিন্তু যতদিন যায়, আমরা জীবনকে নানা রঙে দেখতে শুরু করি। আর সে রঙের আড়ালে হারিয়ে যায় আসল মনুষ্যত্ব।" তবে ওই পাষাণ মন কে বিগলিত করে আবার সেই হারিয়ে যাওয়া মনুষ্যত্ব কে ফিরিয়ে আনা যায়। আর তা সম্ভব বাবা মার দেওয়া শিক্ষা ও ভালবাসার হাত ধরে।
9. আগে কোথায় দেখেছি : একজন ভদ্রলোক স্ত্রী পুত্রের সঙ্গে কলকাতা থেকে বকখালি বেড়াতে আসেন। সেখানেই একটা ছোট চা তেলেভাজার দোকানে চা খেতে এলে সেই দোকানের মালিক তাকে ভালো করে চেনে বলে দাবি করেন। কিন্তু তিনি লোকটিকে কিছুতেই মনে করতে পারেন না। শেষ পর্যন্ত কি হয় তা জানতে গল্পটি অবশ্যই পড়ে দেখতে হবে।
10. উলুপী : অনিলিখা ও তার দুই বন্ধু দেরাদুন থেকে সাকারি যাচ্ছিল। কিন্তু ধস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের কে একটি নামহীন গ্রামে রাত কাটাতে হয়। আর এখান থেকেই রহস্যের শুরু। অনিলিখা কে যার বাড়িতে রাত কাটাতে হয়, সেই মনোজজীর ঘরের দেওয়ালে লেখা ফিবোন্যাচি নাম্বার সিকোয়েন্স আর তাঁর মেয়ে উলুপী... এই দুটি বিষয় পাঠকদের কে গল্প টি শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থির থাকতে দেবে না।
11. বিশ্বাস : ঠকতে ঠকতে মানুষ আজ কাউকে বিশ্বাস করাই ভুলে গেছে। কিন্তু কাউকে অবিশ্বাস করে, তাকে কোনরকম সাহায্য করলাম না আর পরে জানা গেল তার সত্যিই সাহায্যের দরকার ছিল। এবং সাহায্য না পাওয়ায় ফলে তার বড়রকমের কোন ক্ষতি হয়েছে তখন কিন্তু নিজেকেই নিজের চোখে খুব ছোট বলে মনে হয়। তাই এর থেকে বিশ্বাস করে ঠকলেও অন্তত আর কারুর কাছে না হোক নিজের বিবেকের কাছে বড় থাকা যায়।
12. একটু অন্যরকম : বাবা মা তাদের সন্তান কে সারাজীবন অনেক পরিশ্রম করে বড় করে তোলেন। কিন্তু সেই সন্তানই বড় হয়ে গেলে তাদের বাবা মার পরিচয় গোপন করে রাখে এই ভেবে যে তারা যে কাজ করত বা করে সেটা এই High Standard Society এর কাছে বলার অযোগ্য। কিন্তু তারা এটা বোঝেনা.. প্রকৃতপক্ষে সৎভাবে অর্থ উপার্জনের জন্য করা কোন কাজই ছোট নয়। আর সেই কাজ করে তারা তাকে আজ এই জায়গায় এনেছে সেটা সর্বসমক্ষে স্বীকার করা অত্যন্ত গৌরবের, লজ্জার নয়।
13. ছেলেটা এখনও বন্ধু খোঁজে : অ্যান্টিক শপ থেকে অনিলিখা নিয়ে আসে মেহগনি কাঠের সুন্দর কারুকার্য করা বুককেস। কিন্তু সেটা কে আনার পর থেকেই একটি বাচ্চা ছেলের শীতল উপস্থিতি টের পেতে থাকে সে। এছাড়া বুককেসের ভিতর থেকে পাওয়া যায় একটি ডায়েরি। সেই ডায়েরি থেকে জানা যায় বুককেসটি কে নিয়ে ডেভিড, তার স্ত্রী মেরি ও তাদের সন্তান হীউ এর অভিজ্ঞতার কথা। এই ভাবে এগিয়ে চলে গল্প। বলতে লজ্জা নেই এই গল্পটি পড়তে পড়তে মাঝেমধ্যেই গা ছমছম করে উঠছিল। যারা ভূতের গল্প পড়ে ভয় পেতে ভালবাসে তাদের অবশ্যই গল্প টি পড়া উচিত।
সবশেষে লেখকের কাছে একটাই আবদার.. এরকম আর ও অনেক অনেক দুর্দান্ত গল্প তোমার থেকে চাই ই চাই। আর আমি জানি তুমি সেটা পারবে ও। কেননা তুমিও রাজর্ষির মত বিশ্বাস কর.. "Everything you can imagine is real."
এই গল্প শুরু হয় একই স্কুলে পড়া দুই সহপাঠী, রাজর্ষি ওরফে রাজু এবং তার এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধুর বন্ধুত্বের কাহিনী দিয়ে। ছোটবেলা থেকেই রাজুর পাখি, কীট -পতঙ্গদের প্রতি প্রবল টান এবং তারা কি ভাষাতে কথা বলে তা শেখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। এভাবে চেষ্টা করতে করতে সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে তাদের হাব-ভাব , কথা-বার্তা, আচার আচরণ । যে ভাষা কোথাও শেখানো বা পড়ানো হয় না সেই সব ভাষাই সে ধীরে ধীরে রপ্ত করতে থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যেই এই ধরণের নানান অজানা ভাষার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে সে রীতিমতন পারদর্শী হয়ে ওঠে।
এইসময় তাদের গ্রামে এসে উপস্থিত হয় একদল সন্দেহজনক লোক। যারা রাজুর এই বিশেষ ক্ষমতার কথা জেনে তাকে কাজে লাগাতে চায় এক অসাধু উদ্দেশ্যে। কি সেই উদ্দেশ্যে? রাজু কি পারে তাদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচতে ? সেই সব কিছু জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে অভিজ্ঞান রায় চৌধুরীর লেখা উপন্যাস "ভয়নিচের অজানা ভাষা"।
মূল গল্পের সাথে খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে "ভয়নিচের ম্যানুস্ক্রিপ্টের" কথা। যে বইয়ের রহস্য বিগত ৮০০ বছরেও কেউ সমাধান করতে পারেনি। এই বই কি নিয়ে লেখা , কেন লেখা তা আজও অজানা রয়ে গেছে। একটা দুর্দান্ত বিষয়বস্তুকে তুলে ধরা হয়েছে এই কাহিনীর মধ্যে দিয়ে এবং যার সাথে খুব সুন্দর ভাবে মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে ইতিহাসের নানা অজানা ঘটনার। এছাড়াও সুকুমার রায়ের লেখা ছড়ার লাইনগুলো এতো সুন্দর ভাবে কাহিনীতে ব্যবহার করা হয়েছে, যে তা পড়তে গিয়ে পাঠকরা অত্যন্ত আনন্দ লাভ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
শিল্পী অনুপ রায়ের আঁকা অসাধা���ণ অলংকরণগুলি এই কাহিনীর অন্যতম শ্রেষ্ট সম্পদ। বিশেষ করে কাহিনীর শুরুর কভার পৃষ্ঠাতে আঁকা ছবিটি, যা দেখে মুগ্দ্ধ না হয়ে পারা যায় না।
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে একটি রহস্য উপন্যাস মনে হলেও, পুরো কাহিনী পাঠ করার পর এটিকে শুধুমাত্র রহস্য গল্পের গন্ডিতে আটকে রাখলে অত্যন্ত ভুল করা হবে। এই কাহিনী আসলে.... বন্ধুত্বের কাহিনী, প্রতিদানের কাহিনী , জীবন যুদ্ধের কাহিনী, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাহিনী।
একটি অসাধারণ মন ছুঁয়ে যাওয়া "গল্প" উপহার পেলাম অভিজ্ঞান রায় চৌধুরীর কলম থেকে। কাহিনীর দৈর্ঘ্যর দিকে তাকালে এটিকে উপন্যাস না বলে "বড়গল্প" বলাই ঠিক হবে বলে আমি মনে করি। কিন্তু এই স্বল্প-পরিসরেই লেখক যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তা এক কথায় "অনবদ্য" !
এই গল্পের পটভূমি লন্ডনের একটি পুরোনো ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়ি, যেখানে অনিলিখা একটি বিশেষ কাজের সূত্রে এসে উপস্থিত হয়েছে। এখানকার একটি antique shop থেকে অনিলিখা একটি পুরোনো বিশাল আকারের সুন্দর কাঠের কাজ করা বুককেস কিনে নিয়ে আসে নিজের বাড়িতে। আর তারপরই ঘটতে থাকে একের পর এক ভৌতিক কান্ডকারখানা। অনিলিখা অনুসন্ধান করে জানতে পারে এই সব কিছুর মুলে রয়েছে তার কিনে আনা এই antique বুককেসটি। কি রহস্য লুকিয়ে আছে এই বুককেসটির ভেতরে তা জানতে হলে অবশ্যই পড়ে ফেলতে হবে অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর লেখা এই উপন্যাসটি।
শুরু থেকে শেষ অবধি একদম টানটানা লেখা , যা একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে রাখা যাবে না। উপন্যাসের কিছু কিছু অংশে ভয়ের পরিবেশটা এমন অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে পড়তে গিয়ে যেকোনো পাঠক সর্বাঙ্গে একটা দুর্দান্ত শিহরণ অনুভব করবেন। সারা গল্পের মধ্যেকার এই সুপার-ন্যাচারাল থ্রিলটাকে হিচককের বিখ্যাত ছবিগুলির সাথে তুলনা করা যেতেই পারে এতটাই মুন্সিয়ানার সাথে লেখক সেটিকে এই লেখাতে ব্যবহার করেছেন।
গল্পের মধ্যে ইতিহাসের নানা অজানা ঘটনাকে এতো সুন্দর ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যা কাহিনীকে বিন্দুমাত্র ভারাক্রান্ত না করে বরং আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে পাঠকদের কাছে। সাথে উল্লেখ করতে হবে সাবলীল ভাষার ব্যবহার, যা লেখাকে অসম্ভব গতিময় করে রেখেছে শুরু থেকে শেষ লাইন অবধি।
"ছেলেটা এখনো বন্ধু খোঁজে" আমার পড়া অনিলিখা সিরিজের অন্যতম সেরা লেখা হয়ে রইল এবং আমি 100% sure অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর লেখা এই উপন্যাসটি সকলের পড়তে ভীষণ ভালো লাগবে।