কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
মাসুইদ্যার লগে গত মাসে হেব্বি একটা ঘুরান্টি দিয়া সবেমাত্র ছুটি কাটাইতে গেলাম সলোমন দ্বীপপুঞ্জের একটা দ্বীপ ইসাটাবুতে। একদম নিঝঝুম নিরালায় একখান ছুটি কাটামু। ও মা! এই জায়গায়ও দেহি ব্যাটা হাজির। যাউকগা, খারাপ না—রানা ব্যাটার লগে মৌজ-মাস্তি কইরা কাটায় দিমু কয়ডা দিন! ব্যাটারে দেইখাই একটু মজা নিলাম, জিগাইলাম তার শরীরের কুশলাদি। ব্যাটা তো চমকায়া উঠল! ফাল মাইরা খাড়ায়া গেল। কইল, 'আরে! ওস্তাদ যে! আপনেও এইখানে! ভালোই হইছে, আরামসে মৌজ-মাস্তি করুম দুইজনে মিল্যা। চলেন মাছ ধরতে যাই।' কীসের ছুটি কাটামু, রানার লগে নামতে হইলো নয়া মিশনে। গত মাসে শালার লগে দৌড়াদৌড়ি কইরা 'মেত্যুঘণ্টা' বাইজা গেছিল প্রায়। এইবার বোধ আর মরুম না। কিন্তুক মরতে না চাইলেও কি পারা যায়! সারা দুনিয়া দৌড়াদৌড়ি করা লাগতেছে না বটেক, কিন্তু ছোট এক দ্বীপ ইসাটাবুতেই যা দৌড়াদৌড়ি আর জান নিয়া টানাটানি শুরু হইলো তা আর বলার মতন না! রানার লগে ঘুইরা আর বইসা ঝিমানি চইলা আসার উপক্কম হয় হয় করে যখন, ঠিক তখনই অ্যাকশন শুরু হয়া একটু চাঙ্গা কইরা দেয় শরীরটা—তারপর আবার হালকা ঝিমানি, আবার অ্যাকশন।
সব মিলায়া হালকা ঝিমানি—তারপর অ্যাকশনের চক্রে ছুটির মুডে সময়টা খারাপ কাটে নাই। মাঝখানে কিছু গুটিবাজ, পল্টিবাজরে দেখলাম-চিনলাম—এগোর কাছ থিকা গুটিবাজি আশা করি নাই।
রানার ছুটি কাটানো কখনও সুখের হয় না। প্রত্যেকবারই ঘটনাবহুল। এবার ঘটনা শুরু সলোমন দ্বীপপুঞ্জের রাজধানীতে।
মৃত্যুমুখে পতিত একটা লোককে বাঁচাতে গিয়েই ঘটনা শুরু। তারপরও জাঙ্গাল অ্যাডভেঞ্চার। হারিয়ে যাওয়া এক গুপ্তধনের মিথ। কিছু টুইস্ট। এবং অবশেষে পরিসমাপ্তি।
কাহিনি গড়েপরতা। ক্যামিওতে সোহেল আর ববি মুরল্যাণ্ড জাস্ট ফাও। টুইস্ট প্রেডিকটেবল। টেনেটুনে বিশাল করা হয়েছে যেন কাহিনি। চাইলে কাটছাঁট করা যেতো অনায়াসে।
মোটকথা অ্যাডভেঞ্চার, জাঙ্গাল লাভারদের পছন্দের বই হবে।
ম্যাথিউ রাইলির বইগুলার ফিল ছিল। যদিও মাসুদ রানার সাম্প্রতিক বইগুলোর প্রায় সবগুলোই এই রাইলি, রোলিন্স সহ হিস্টোরিকাল থ্রিলার জনরাগুলোর এডাপশন বলেই মনে হয়। পাঠকদের সাম্প্রতিক চাহিদার যোগান দেওয়া বলে কথা। সব মিলিয়ে ভালো লাগছে। কাজী মায়মুর সহ ৪০০ সিরিয়ালের পরে সহযোগী হিসেবে যাদেরকেই নিছেন মাসুদ রানারে চটকে বিশ্রি করে তুলেছেন তারা। পড়াই বাদ দিয়ে দিয়েছিলাম নতুন বইগুলো। তবে সহযোগী হিসেবে সায়েম সোলায়মান ভালো। ইনি এসে কিছুটা হলেও যেন ত্রাণ কর্তার ভূমিকা পালন করেছেন।
ইসাটাবু... সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী। সেখানেই ছুটি কাটাতে গেছে আমাদের হিরো মাসুদ রানা। তো ছুটি কাটাবে কি ছাই! নিজের জান নিয়েই টানাটানি পড়ে গেল রানার।
একজন সাধারণ লোককে কুমিরের হাত থেকে বাচাতে গিয়েই জড়িয়ে পড়ল রানা। আস্তে আস্তে সন্দেহ বাড়ছে রানার... কিছু একটা কুকাজ চলছে ইসাটাবুতে। তবে সেটা যে সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের সরকারকে টলিয়ে দেয়ার মত এক গভীর ষড়যন্ত্র হবে, তা ভাবতে পারেনি ।
হালকার ওপরে ঝাপসা বলতে এই হলো বইয়ের কাহিনি।
অনেক অনেক দিন পর রানার এমন টানটান উত্তেজনার একটা কাহিনি পড়লাম। ইদানিংকার বইয়ে তো আমাদের রানা স্যার চারপাশে সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া চলা-ফেরা করেন না, (সিকিউরিটি গার্ড মানে সঙ্গী-সাথী) যা অ্যাকশন আর কাজ-কারবার করার দরকার, তা তার বন্ধুরাই করে দেয়। এতে তো আর আমাদের মত রানা ফ্যানদের মন গলবে না! আমাদের দরকার এমন রানা, যে একাই লড়বে, কিন্তু বাচাবে সবাইকে।
তেমনই একটা রানার বই এটি।
কাহিনিতে টানটান থ্রিল যেমন আছে, তেমনি সলোমোন দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী ইসাটাবু নিয়েও আছে ছোটখাট একটা থিসিস। কাহিনির ব্যাপকতা এতই বেশি যে, ক্ষণে ক্ষণে পাশার দান উল্টে যেতে সময় লাগে না।
আর লেখনিশৈলির কথা আর কি বলব! আহা, লেখা তো নয় যেন মাখন গিলেছি! একটা কাহিনিকে কিভাবে মাল্টিপ্লটে ভাগ করে একই সূত্রে গাঁথা যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এটি। কি নেই কাহিনিতে! রানার ব্যক্তিগত টানা-পোড়েন, ইসাটাবুর রাজনীতি, ট্রেজার হান্টিং, সাগরে স্কুবা ডাইভিং, রানার সেই চিরাচরিত নিশ্চিত মৃত্যুর মুখকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, সবই আছে এতে।
সবশেষে বলা যায়, একমাত্র 'দুরন্ত কৈশোর' বাদ দিলে গত কয়েক বছরের সেরা রানা এটি।
বইটা তুলনামূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় বর্ণনায় ভর্তি। বইটি আরো কিছুটা ছোট হলে আরো জমজমাট হত। দুই খণ্ডে প্রকাশ হলেও হয়তো তত খারাপ লাগত না। এ বইয়ে সবথেকে হতাশ হয়েছি সোহেলের কাছ থেকে। সেই চিরপরিচিত এক হাতওয়ালা সোহেল-যার বাম হাত নষ্ট, সেও দুহাতে সমানে গুলি চালাচ্ছে!