কর্নেল শওকত আলীর সত্য মামলা আগরতলা এমন একটি বই, যার পাঠের ভেতর দিয়ে আমরা জানতে পারব পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে বাঙালিবিদ্বেষী পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ সংঘটনের লক্ষ্যে কী ধরনের প্রয়াস চালানো হয়েছিল, তার প্রায় আদ্যোপান্ত বিবরণ । বইয়ের ভূমিকা - জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আমরা যাঁরা মামলাটিতে অভিযুক্ত ছিলাম, “ষড়যন্ত্র” শব্দটি তাঁদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। কারণ আমরা ষড়যন্ত্রকারী ছিলাম না। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে আমরা বঙ্গবন্ধুর সম্মতি নিয়ে একটি বিপ্লবী সংস্থা গঠন করেছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল একটি নির্দিষ্ট রাতে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমরা বাঙালিরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব কটি ক্যান্টনমেন্টে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অস্ত্র কেড়ে নেব, তাদের বন্দী করব এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করব ।
আগরতলা যড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরিচিত "রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যন্য" মামলাটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সত্য-মিথ্যার ব্যাপার নিয়ে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা চলে আসছে। লেখক এই তর্ক বিতর্কের সকল কিছুই পরিস্কার করতে চেষ্টা করেছেন। আমি প্রথমে বইটির নামকরণ নিয়ে কথা বলতে চাই, বইটির লেখক কর্নেল শওকত আলী ছিলেন 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য' মামলার ২৬ নং আসামী। পাকিস্তান সরকারের অন্যান্য সেক্টরের মতো সামরিক বাহিনীতেও বাঙালিদের প্রতি ছিল চরম বৈষম্য আর অবহেলা। তাই লেখকসহ উক্ত মামলার বাকী আসামীরা মিলে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে সশস্ত্র পন্থায় স্বাধীন করার জন্য গোপনে পরিকল্পনা করতে থাকেন, বিভিন্ন সময় মিটিং, যুক্তি পরামর্শ করে কর্মপন্থা ঠিক করে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে থাকেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁরা যোগাযোগ স্থাপন করেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয়, বিশ্বস্ত নেতা শেখ মুজিবের সাথে। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় মিটিং করেন, যেগুলোর বেশিরভাগই ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরে, স্পষ্ট করে বললে বেশিরভাগই ছিল সেনা ক্যাম্পে। তাঁরা আগরতলাতেও মিটিং করেন, তবে এই মিটিংয়ের গুরুত্ব ছিল অন্যান্য মিটিংয়ের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। কিন্তু তারপরেও পাকিস্তান সরকার এবং সরকারি প্রচার মাধ্যম 'আগরতলা' নামটায় গুরুত্ব দেয়। এর পিছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে দেশদ্রোহী এবং ভারতীয় চর/দালাল হিসেবে অভিযুক্ত করে বিচার প্রক্রিয়া নির্ঝঞ্ঝাট করতে জনসমর্থন আদায় করা। যেটাকে আগরতলায় বসে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে পরিচিত করানো। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেন, "আমরা ষড়যন্ত্রকারী ছিলাম না, আমরা ছিলাম দেশপ্রেমে উদ্বেলিত স্বাধীনতাকামী মানুষ। পাকিস্তান সরকার আমাদের ষড়যন্ত্রকারী বললেও স্বাধীন দেশে ষড়যন্ত্র শব্দটা আমাদের জন্য পীড়াদায়ক।"
লেখক ও তাঁর সঙ্গীদের কিছু অসতর্কতা আর পাকিস্তান গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারির কারণে তাদের কার্যক্রম প্রকাশ্যে চলে আসে। সকলকেই আটক করা হয়, কেউ কেউ প্রচন্ড নির্যাতনের মুখে রাজসাক্ষী হতে বাধ্য হোন। আইয়ুব খানের প্রধান বাধা শেখ মুজিবসহ গ্রেপ্তারকৃত সকলের সুবিধাজনক বিচারের জন্য আইনও সংশোধন করা হয়, ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে গোপনে বিচারও শুরু হয়। লেখক তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করেছেন। তখনকার জেল জীবন, জেলে তাদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন, বিচার প্রক্রিয়াসহ, কারা অভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলাপচারিতার বিভিন্ন স্মৃতিচারণও করেন। একটা ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয়, এই মামলা নিয়ে বাহিনীর সবাই আতঙ্কিত থাকলেও শেখ মুজিব একদমই নির্ভার ছিলেন। এ প্রসঙ্গে লেখকের কথা হবহু তুলে ধরছি, "বঙ্গবন্ধু একদিন একান্ত আলাপে আমাকে বলেছিলেন, 'এবার তো ধরা পড়ে গেলা, এরপর কি করবা?' নিজের প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজে দিয়েই বললেন, 'এখান থেকে বের হয়ে অামি জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়ার জন্য একটা নির্বাচন করব। সেই নির্বাচনে অামরা বিপুলভাবে জয়লাভ করব। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের হাতে ক্ষমতা দেবে না। তখন একটা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে। সেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থেকো।' আমি কিছুটা অাশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করেছিলাম, বঙ্গবন্ধুসহ আমাদের তো কঠিন শাস্তি হবে, তাহলে নির্বাচন করবেন কিভাবে? উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'তোমরা কিছু ভেবো না, আমাদের কিছুই হবে না'।"(পৃষ্ঠা ১৩২-১৩৩)
আগরতলা মামলার পরবর্তী কাহিনী তো আমাদের সবারই জানা, সবাই জেল থেকে ছাড়া পেলেন। ১নং আসামী শেখ মুজিব হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু। লেখক সেগুলোতেও দৃষ্টিপাত করেছেন
বইটা একটা মামলাকে কেন্দ্র করে হলেও লেখক তাঁর প্রথম জীবন, সৈনিক জীবনসহ বিভিন্ন কিছুর স্মৃতিচারণ করেছেন। তাছাড়া তৎকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়েও তাঁর মতামত তুলে ধরেছেন। সবশেষে যুক্ত করেছেন মামলায় সকল অভিযুক্তদের পরিচয়, রাজসাক্ষীগণের তালিকা ও অভিযোগপত্রের একটি কপি। আমার কাছে বইটিকে লেখকের স্মৃতিচারণ ব্যতীত আশানুরূপ তথ্যবহুল মনে হয়নি। তবুও আগরতলা মামলার ঐতিহাসিক এই রাজনৈতিক সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এই বইটি একটি জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।
This entire review has been hidden because of spoilers.
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং মামলায় অভিযুক্তদের বিস্তারিত জানার জন্য একটি তথ্যবহুল বই। রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্ব গুণাবলী, দেশপ্রেম, প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার ইত্যাদি ভালো অনুধাবন করা যায়। ধন্যবাদ লেখককে সত্য বিষয় আমাদের মাঝে উপহার দেওয়ার জন্য।