পৃথক ঘরানার লেখক আবু জাফর শামসুদ্দীন রচনা করেছিলেন এপিকধর্মী উপন্যাস 'পদ্মা মেঘনা যমুনা' এবং 'ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান'। উনবিংশ শতকের শেষার্ধের পটভূমিকায় বাংলার এক বিশিষ্ট অঞ্চলের জীবনধারা তিনি সজীব করে তুলেছেন 'ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান' গ্রন্থে। ভারতে ব্রিটিশ শাসন যেসব পরিবর্তনময়তা বয়ে আনছিল তার মুখোমুখি হয়ে সমাজে সৃষ্ট আলোড়ন, প্রতিরোধ ও সংগ্রাম এখানে মূর্ত হয়েছে কাহিনীর বিস্তার ও ধারাবাহিকতায়। ঔপন্যাসিকের হাত ধরে পাঠক প্রবেশ করবেন ভাওয়াল গড়ের জীবনের গভীরে, অতীত জীবনযাত্রা জানবেন নিবিড়ভাবে এবং যুক্ত হবেন হাসি-কান্না, প্রেম-অপ্রেমের দোলাচলে মানবের চিরন্তন আকুতির সঙ্গে।
Abu Jafar began his career as sub-editor of the daily soltan. He also worked at the azad, ittefaq, Purbadesh and sangbad, for which he wrote a weekly column, 'Baihasiker Parshvachinta', under the pseudonym 'Alpadarshi'. From 1961 to 1972, he worked as assistant translator at the Bangla Academy.
ইংরেজ কোম্পানি আইন যখন অস্তমিত তখন উপমহাদেশ জুড়ে মহারাণী ভিক্টেরিয়ার শাসনের পর্দাপণ। কিন্তু তখনও ইংরেজ শাসন নিজেদের শক্তিতে ততটা শক্তিশালী নয় । তাদের ভিত এদেশীয় উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদারেরা। নিজ নিজ জমিদারিতে নিজেরাই শাসক নিজেরাই শোষক..... কিন্তু বাধ সাধলো মুসলমানেরা। কই দীর্ঘদিন তো বাইরের শক্তিই এদেশ চালিয়েছে কিন্তু জোর করে তো নীলের চাষ করায় নি! কিংবা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে নি!
ব্যস সূচনা হলো এক আন্দোলনের। যে আন্দোলনের মূল কথা মুসলমানদের ফরজ কাজগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করা এবং ধর্মের কুসংস্কারগুলো ঝেঁটিয়ে বিদায় করা আর এর পাশাপাশি স্বাধীনতার জন্য যুবসমাজকে প্রস্তুত করে তোলা। আর এজন্যই সৃষ্টি হয় নূর বকশ্, জাহান্দার শাহ, গুলাম নবীদের মতো চরিত্র আর সেই সাথে যুক্ত হয় হাসি-কান্না, প্রেম-অপ্রেমের দোলাচালে মানবের চিরন্তন আকুতি। উনিশ শতকের শেষার্ধে ওয়াহাবি ফরায়েজি আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাস আপনাকে হতাশ করবে না এটুকু বলতে পারি।
উনিশ শতকের শুরুর দিকে আরবের ওয়াহাবি আন্দোলন প্রত্যক্ষ করে হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলায় ফরায়েজি আন্দোলনের সূচনা করেন। ইসলামের অবশ্য পালনীয় কর্তব্যগুলো পালন করার পাশাপাশি নীলকর-জমিদারদের অত্যাচার ও সামাজিক রীতিনীতির সংস্কার করাই ছিল আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। ফরায়েজি আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে ব্রিটিশ সরকারের কর্মচারী ও স্থানীয় হিন্দু জমিদাররা ভালোভাবে নিতে পারেননি। তাই এই আন্দোলনের কর্মকাণ্ড গোপনে পরিচালিত হতো। উনিশ শতকের শেষদিকে আন্দোলনের ধার কমে আসে এবং ব্রিটিশ সরকার পাকাপোক্তভাবে দমন করে ফেলে। তবে ফরায়েজি দীক্ষায় দীক্ষিত অনেক ব্যক্তিই তখন ব্যক্তি উদ্যোগে আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছেন। তেমনই এক ঘোরলাগা সময়ের চিত্র অংকন করেছেন লেখক। টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা জেলার ভাওয়ালগড় অঞ্চলের ফরায়েজি আন্দোলন এবং সেই সাথে আন্দোলনে সম্পৃক্ত এক যুগলের প্রেম-গাঁথা 'ভাওয়ালগড়ের উপাখ্যান'।
ভাওয়াল অঞ্চলের শায়েস্তাবাদের দুই ভাই আলী বখশ ও ইজ্জত বখশ। আলী বখশ পড়ালেখা না করলেও ইজ্জত বখশ দিল্লির মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন এবং গ্রামে ফিরে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। দশ গ্রামের মানুষের দান ও প্রজা আয় হতে মাদ্রাসার খরচ ভালোমতোই চলে যায়। ইজ্জত বখশের মৃত্যুর পর মাদ্রাসার দায়িত্ব নেন পুত্র নূর বখশ। নূর বখশ যৌবন বয়স থেকেই ফরায়েজি আন্দোলনের সাথে যুক্ত এবং বছরের প্রায় পুরো সময়টাই বিভিন্ন এলাকা সফর করে থাকেন। সফরের সময় নতুন শিষ্য তৈরি, শিষ্যদের থেকে জিহাদের উদ্দেশ্যে অর্থ-সম্পদ সংগ্রহ এবং মানুষদের ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করেন। প্রথম পক্ষের সন্তান কমরুদ্দীনকে নিয়ে একদিন ভাওয়ালের বিস্তীর্ণ জঙ্গলে হাজির হন। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে চুরুলিয়ার পুরনো জরাজীর্ণ একটি মসজিদে এসে ওস্তাদ গুলাম নবীর সাক্ষাৎ নেন। গুলাম নবী ঐ অঞ্চলে ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতেন। গুলাম নবীর নিকট পুত্র কমরুদ্দীনকে রেখে যান, যাতে করে সে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং জিহাদের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে। গুলাম নবীর কন্যা নুরন্নাহারের বয়সও কমরুদ্দীনের কাছাকাছি। তাই দুইজনের মধ্যে অল্প সময়েই ভাব হয়ে যায় এবং গুলাম নবীর নিকট একত্রে শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকে।
রাজবাড়ীর জমিদার সত্যনারায়ণের পূর্বপুরুষ জমিদারের সেরেস্তায় নায়েবের কাজ করতো। কূটচালের মাধ্যমে জমিদারকে সরিয়ে নিজেই জমিদার বনে যান। তারই অধস্তন পুরুষ প্রজাপীড়নের মাধ্যমে নিজের জমিদারি টিকিয়ে রেখেছেন। কোম্পানির শাসন স্থগিত হয়ে রাণী ভিক্টোরিয়ার শাসনে ভারতবর্ষের মানুষজন স্বস্তির আশা করলেও বাস্তবক্ষেত্রে তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশরা জোরপূর্বক নীল চাষ করতে দিতো এবং রাজি না হলে নানাভাবে অত্যাচার চালাতো চাষীদের উপর। আবার নীলচাষ করেও মুনাফা ভোগের সুযোগ হতো না চাষীদের। এই নীলকরদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন স্থানীয় জমিদারেরা। চাষীদের উপর জুলুম করে নিজেদের ক্ষমতাকে জানান দিতেন তারা। নীলকর ওয়েটসন সাহেব ও সত্যনারায়ণের জমিদারি পাশাপাশি। সত্যনারায়ণ ওয়েটসনকে পছন্দ না করলেও, একই ঘাটের মাঝি হওয়াতে সমীহ করে চলেন। হাজারহোক দুইজনেরই আয়ের উৎস প্রজাপীড়ন। ওয়েটসন তার জমিদারির কাজ পরিচালনার ভার বলাইরাম ঠাকুরের হাতে দিয়ে রেখেছেন। সে যেন আরেক কাঠি বাড়া। কৃষকদের জোরপূর্বক ধরে এনে নানারকম শারীরিক শাস্তি দিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দিতে তার জুড়ি নেই।
লতিফপুরের পঞ্চায়েত প্রধান নসু জমিদারকে খাজনা দেন না এবং নীল চাষও করেন না। সফরকারে নূর বখশ লতিফপুরে আসলে তাঁকে কেন্দ্র করেই বিদ্রোহের দানা বাধে। এক বনে দুই বাঘ থাকতে পারেনা। একটা সময় তাদের মাঝে সংঘর্ষ অনিবার্য। একদিকে যখন নূর বখশ কৃষকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করছেন এবং ফরায়েজি আন্দোলনের বীজ রোপণ করছেন; অন্যদিকে ব্রিটিশ শাসক ও স্থানীয় জমিদারেরা এই আন্দোলন দমাতে বদ্ধপরিকর। নূরে বখশের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তিনিও বুঝতে পারেন একটা সময় জমিদারের সাথে সংঘর্ষ হবেই। তাই তিনিও প্রস্তুতি হিসেবে জাহান্দর শাহকে জানিয়ে রাখেন। জাহান্দর শাহকে কেউ চিনেনা। তিনি কোথায় থাকেন কিংবা কোথা থেকে এসে আক্রমণ করে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যান এই ব্যাপারে কোনো তথ্য বের করতে পারেনি নীলকরেরা। জাহান্দর শাহের ভয়ে জমিদারদের মনেও ভীতির সঞ্চার হয়। অধিকার সচেতন কৃষক এবং শোষক জমিদারদের সংঘর্ষের পরিণতি কী হবে? ইতিহাসের পাঠ আমরা জানি। উপন্যাসের লেখক কি নিজের স্বাধীনতা নিয়েছেন নাকি স্রোতের সাথেই নিজের লেখাকে মিশিয়ে দিয়েছেন?
আমি একটা ব্যাপার সবসময় বিশ্বাস করি একটি ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে শুধু ঘটনার কুশীলবরাই নন, এর আশেপাশের ছোট একটি চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলো সমষ্টিগত চিন্তা চেতনার ফলাফল। ঐতিহাসিক কিংবা এর কাছাকাছি ঘরানার উপন্যাসগুলোতে ঐ সময়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থাগুলোকেও টের পাওয়া যায়, যা ইতিহাসের বইতে পাওয়া যাবেনা। একটা মানুষ কীভাবে চিন্তা করছেন কিংবা তার সামাজিক অবস্থান তাকে কীরকম সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহ দিচ্ছে তার মানসিক চাপের চিত্র এই উপন্যাসগুলোতে পাওয়া যায়। এই উপন্যাসটিতে আমাদের মুসলিম সমাজের এক ক্রান্তিকালের চিত্র উপস্থাপন করে। বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল শুধু চাষের জমি। গ্রামগুলো ছিল অনেক দূরে দূরে। সেখানে শিক্ষার আলো বলে কিছু ছিল না। অধিকাংশ মানুষই ছিল কৃষিজীবী। এই কৃষকেরা ধর্ম তেমন একটা পালন করতোনা। সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে হিন্দুদের পূজাও দিত। পরনে ছিল কোনোরকম এক টুকরা কাপড়। শুধু অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই ধুতি পরতেন। কৃষকদের মাঝে শ্রেণি চেতনার বালাই ছিল না। তারা মনে করতেন তাদের পূর্বপুরুষেরা যেভাবে দাসত্ব করে এসেছে, তারাও একইভাবে জীবন কাটিয়ে যাবে। ফরায়েজি সমাজের আলেমরা এই কৃষকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে স্বভাবতই নীলকরদের চক্ষশূলে পরিণত হন। তবুও কৃষকদের সাথে নিয়ে নিজেদের আন্দোলন চালিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন তারা।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের ঐতিহাসিক ত্রয়ী উপন্যাসের প্রথম বই 'ভাওয়ালগড়ের উপাখ্যান'। লেখার বর্ননাভঙ্গি, চরিত্রায়ন, উপস্থাপন ইত্যাদিতে লেখকের মেধার প্রতিফলন ঘটেছে। সুন্দর একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। ফরায়েজি আন্দোলনের অন্তিমলগ্নের এই আখ্যান পাঠকের মনে বিদ্রোহের সঞ্চার করবে বলে আশা করি। হ্যাপি রিডিং।
এদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রীতিলতা-সুর্যসেন আর মঙ্গল পাণ্ডেদের নাম যেভাবে নেওয়া হয়, ঠিক ততটাই উপেক্ষিত তিতু-শরিয়তরা। সভ্যতা আর সংস্কৃতির নামে এদেশে ব্রিটিশদের দোসর উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের যতটা না ভয়ংকর দেখানো হয় তারচেয়ে ভয়ংকর ভাবে পাকিস্তান শাসনামলকে চিত্রিত করা হয়। ক্রমে ক্রমে এদেশে মুসলিমদেরকে পশ্চাৎপদ আর অনগ্রসর জাতীর তকমা লাগানো আর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে যেসব ষড়যন্ত্রের বীজ বোনা হয়েছিল, তারই কিছুটা চিত্রিত হয়েছে ভাওয়াল পরগণাকে উপজীব্য করে লেখা "ভাওয়ালগড়ের উপাখ্যান"-এ।
"গেল সারা রাত বৃষ্টি পড়ছে ঝমঝম!শাল বৃক্ষের চূড়া বেয়ে পড়েছে অজস্র পানি।মনে হয়েছে যেন অসংখ্য সৈনিক তালে তালে পা ফেলে রাতভর মার্চ করে চলেছে।মাঝেমধ্যে যখন বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসেরও বেগ বেড়ে বনভূমিকে করে তুলেছে শব্দায়িত তরঙ্গায়িত তখন মনে হয়েছে যেন মোকররী মৌরুসী স্বত্বে স্বত্ববান লক্ষ লক্ষ নর্তকী নূপুর পায়ে নৃত্যে মেতে কোনো মহাধ্যানীর ধ্যান ভাঙতে চেষ্টা করছে।" উনিশ শতকের শেষার্ধে ভাওয়াল মধুপুরের গড় এমনই ছিলো।সেই দূর্ভেদ্য বনে বাস করেন গুলাম নবী,তার কন্না নুরুন্নাহার,জাহান্দার শাহ প্রমুখ।যাদের বাইরের দুনিয়ার মানুষ ফরাজি বা ফরায়েজি নামেই চিনতো।সেই সময়ে তারা ছিলো জমিদার অ ইংরেজ সরকারের গলার কাঁটা।ফরায়েজিদের বিদ্রোহ দমনে তারা তৎপর।কিন্তু ফরায়েজি জনতার সংগঠনের অবস্থাও সুবিধার নয়।গোপনে,বনে,জঙ্গলে লুকিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে,তার মধ্যে বড় অসুবিধা হলো মুসলমানদের অজ্ঞতা।এজন্যও গ্রামে গ্রামে কার্যক্রম চালায় তারা,সংগ্রহ করে শিক্ষানবিশ সৈনিক। কিন্তু এরই মধ্যে অ্যামবুশ চালায় ইংরেজ রাজশক্তি।গুটিকয়েক ফরায়েজি সৈনিকের কাছে তা যুদ্ধের মতই।এক অসম যুদ্ধ।তাদের কাছে আছে শুধু লাঠিসোটা,দেশি গাদাবন্দুক আর প্রতিপক্ষ আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত।পলাশীর আম্রকুঞ্জও নয়,বারাসাতের বাঁশের কেল্লাও নয়,এ হলো ভাওয়ালের শালবন।বলা বাহুল্য এই খন্ডযুদ্ধে জয়ী হলো ইংরেজরা।আহত ও বন্দিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।দেশ শান্ত সমাহিত হয়।বাংলার ঊনবিংশ শতাব্দীর মুক্তি সংগ্রামের যবনিকা পড়ে।ইংরেজ সরকার স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে।
উপকথা,উপাখ্যান আমাকে বরাবর-ই আকৃষ্ট করে।এখানে চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ গুলো মিথ্যে নয়।
একজন নূর বখশ, একজন গুলাম নবী, একজন সত্যনারায়ণ, একজন ওয়েটসন, আর একজন বলাইরামের গল্প। সাথে দুই কিশোর-কিশোরীর চপল উপাখ্যান, তরবারি-গাদা বন্দুক হাতে জিহাদি মুসলিমের গেরিলা আক্রমণ, ইংরেজ রাজের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতির সুচারু বর্ণনা। ঊনিশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ঢাকা, নাসিরাবাদ, শিমুলিয়া, ভাওয়াল গড়ের বাঘ-ভাল্লুকময় লোকালয়ের কথা পড়তে কেমন একটা ভ্রম হয়, ছিপ নৌকা করে নীলকুঠির গুমঘর থেকে বন্দী ছিনিয়ে আনার রুদ্ধশ্বাস কাহিনী পড়ে অদ্ভুত রোমাঞ্চ জাগে। 'সেই সময়', 'প্রথম আলো' পড়ে ওপার বাংলা নিয়ে একটা ধারণা হয়েছিল বেশ, কিন্তু সামসাময়িক পূর্ববাংলা বা নিম্নবঙ্গের অবস্থা আন্দাজের কতটা যে বাইরে ছিল তা এই বইটা না পড়লে বুঝা যেত না। বইটা ইতিহাসের দলিল নয়, ঘটনা-কালক্রমে অসামঞ্জস্যতাও কিছুটা উপস্থিত। কিন্তু তবুও এই বইটা চেনা নামের চেনা জায়গাগুলোকে নতুন করে চেনাবে, ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সূর্যমনাদের নতুন করে পরিচিত করাবে। নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ক্ল্যাসিক!
আমরা বাংলাদেশী বাঙালিরা মোটামোটি মিডিওকোরদের স্তুতি শুনে অভ্যস্ত। বুদ্ধিজীবীরা মিডিওকোরদের উৎকর্ষতার উদাহরণ হিসেবে আমাদের গ্রহণ করতে শিখিয়েছে। “ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান” এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আবু জাফর শামসুদ্দীনের উপন্যাস। যতোদিন ধরে গল্পোপন্যাস পড়ছি, এটাকে একটা ভালো বই হিসেবে জেনে এসেছি। পাঠ্যবইয়ের উপন্যাস বিষয়ক আলোচনাতেও এ বইয়ের নাম পেয়েছি। প্রাবন্ধিকেরা , সাধারণত যা করেন, প্রচুর শব্দ খরচ করে এ বইয়ের উপরে গাদা গাদা প্রবন্ধ রচনা করেছেন। সমস্যা হলো, “ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান” আসলে মিডিওকোরও না, খুবই নিম্নশ্রেণির রচনা। রূঢ় শোনালেও, এটাই বাস্তবতা। বইটার প্রথম দশ পৃষ্ঠা পড়তেই আমাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। লেখক, আবু জাফর শামসুদ্দীন, লেখার সময় পাঠকদের নির্ঘাত অকাট মূর্খ, বেয়াক্কেল কিংবা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ভেবেছিলেন। তৎকালীন পাঠক ও সমালোচকেরা হয়তো ছিলেনও তাই। নয়তো এই বইটাকে এতো উচ্চ মর্যাদা দেবেন কেন? একটা উদাহরণ দিয়ে আমার বক্তব্যকে পরিষ্কার করি। উপন্যাসটার প্রেক্ষাপট ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন। শুরুতেই দেখা যায়, এক কিশোর আর তার আরবি-ফার্সিতে পণ্ডিত পিতা ভাওয়াল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলেছেন। তাদের গন্তব্য জঙ্গলের ভেতরে আস্তানা গেড়ে বসা এক ফকির। যখন তারা গন্তব্যের কাছাকাছি চলে আসে, হঠাৎ তাদের মুখোমুখি হতে হয় এক কিশোরের। কিশোরের হাতে তরবারি। সে পরিচয় না জেনে এক পা'ও এগুতে দেবে না তাদের। বাধ্য হয়ে পরিচয় দিতে হয়। পরিচয় পর্বের পর, তারা শত্রুপক্ষের নয় বুঝতে পেরে, কিশোর তাদের নিজেই নিয়ে যায় সেই ফকিরের কাছে। পরে কথায় কথায় ফকির প্রকাশ করে, যে কিশোর ছিলো আস্তানার প্রহরায়, সে আসলে তার নিজের মেয়ে! রূপকথায় মেয়েরা ছেলে সাজলে মেনে নেয়া যায়, শেক্সপিয়ারের নাটকে আমরা মেয়েদের ছেলে সাজতে দেখেছি। কিন্তু এটা কোন রূপকথা বা মধ্যযুগীয় নাটক নয়, রীতিমতো বস্তুনিষ্ঠ উপন্যাস! একজন কিশোরী মেয়েদের আওয়াজ লুকিয়ে ছেলের মতো আচরণ করবে, হাঁটাচলা করবে কিন্তু অন্যান্য চরিত্র বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারবে না, সন্দেহ করবে না এবং পরে নাটকীয় ভাবে জানতে পেরে বিস্ময়ে হতবাক হবে, এটা বাচ্চাদের গল্পে খাটে। উপন্যাসেও খাটে যদি চরিত্রেরা হয় উল্লুক। সমস্যা হলো, এই পিতা-পুত্র উল্লুক তো নয়ই, বরং পিতা এক মস্ত আলেম। অনেক সময় তিনি মানুষের মনের কথাও পড়তে পারেন! যে ব্যক্তি মানুষের মনের কথা পড়তে পারেন, তিনি একটা কিশোরীকে তরুণ ভেবে ভুল করবেন? করার কথা নয় তো! কিন্তু এই বইতে ভুলটা করেছেন সেই পণ্ডিত ব্যক্তি এবং আমরা তা বিশ্বাস করবো, এমন সরল বিশ্বাসও লেখকের ছিলো! এমন শিশুতোষ ব্যাপারস্যাপার থাকা সত্ত্বেও বইটা এতোদিন পর্যন্ত টিকে আছে, সমালোচক আর প্রাবন্ধিকদের কল্যাণে। লেখক পশ্চিমবাংলার লেখ্যরীতি থেকে তার লেখনীকে আলাদা করার জন্য এতো বেশি আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছেন যে পড়তে হলে আপনাকে আরবি-বাংলা ও আরবি-ফার্সি অভিধান নিয়ে বসতে হবে। আবু জাফর শামসুদ্দীন যদি এসব না করে গল্পটাকে পাঠযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করার দিকে মন দিতেন, তাহলে এমন খামখেয়ালি করতেন না। এমন একটা মোটামুটি নিম্নমানের অথবা পৌনে মধ্যমানের উপন্যাস নিয়ে আমাদের সমালোচেকেরা এতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন কেন? কেন বইটা পেয়েছে সেমি-ক্লাসিকের মর্যাদা? উত্তরটা সহজ। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর পাকিস্তানি বাংলা সাহিত্যিকেরা (সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও সৈয়দ শামসুল হক ছাড়া) খুব উন্নতমানের সাহিত্য রচনা করেছেন হাতেগোণা কয়েকটি। যতোটা না তারা মানুষের কথা লেখার জন্য কলম তুলে নিতেন, তারচেয়ে বেশি লিখতেন আলাদা ভাষা সৃষ্টির জন্য। উর্দুর মতো কৃত্রিম এক ভাষা সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা তাদের চালিত করতো। “বাঙালি মুসলিমেরা আলাদা জাতি” তত্ত্বে বিশ্বাস এনে, সে বিশ্বাস বাস্তবতায় পরিণত করতে নতুন ভাষা সৃজনের তাদের এই হাস্যকর প্রচেষ্টা। সেই আরবি-ফার্সি মিশ্রিত কৃত্রিম বাংলায় সাহিত্যিকরা সাপ-ব্যাঙ যা'ই লিখেছে, তারই প্রশাংসায় শতমুখ হয়েছিলো তৎকালীন বুদ্ধিজীবীরা। সেই ধারাটা এখনো চলমান। পূর্ববর্তী বুদ্ধিজীবীরা যেহেতু ভালো বলেছেন, পরবর্তীরাও অনুকরণ করেছেন তাদের। নিজেদের মতো দেয়ার সাহস করেননি কিংবা নিজেদের মত থাকার মতো মেধা তাদের ছিলো না। বাংলাদেশের অনেক বিখ্যাত উপন্যাসের বেলাতেই এমন কথা খাটে। সে সময়ে এসব চলেছে, কারণ ভালো বিকল্প ছিলো না, এখন চলছে কারণ পূর্ববর্তীরা তাদের ভালো বলেছে। বাংলাদেশের লিটলম্যাগ, পত্রিকা, ইদসংখ্যা ইত্যাদি প্রমোট করেছে এই মধ্যমানের লেখকদেরই। এখনও করে। লিটলম্যাগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যাবে বলে যারা কান্নাকাটি করে, তাদের সাথে তাই সুর মেলাতে পারি না।
১৮৬০ এর দশকে বাংলার ভাওয়াল এলাকার কাহিনী। মূলত সেই সময়কার জিহাদি ফরায়েজি আন্দোলনের একটি কল্পিত ছবি এঁকেছেন লেখক। তাঁর পিতৃভূমির প্রাচীন হাল হকিকত নিয়ে লেখকের এ লেখা সত্যি জনমানুষের বেশ কাছাকাছি যেতে সক্ষম। সাথে আন্তরিক পরিবেশনা ও বিভূতির স্টাইলে পরিবেশ-প্রতিবেশের পুঙ্খনাপুঙ্খ বর্ণনা উপন্যাসে এনেছে ভিন্ন মাত্রা। রচনার প্রাঞ্জলতাও উল্লেখযোগ্য। কাহিনী-পরিণতি বিচারে অভাবনীয় না হলেও বাস্তবসম্মত। চরিত্র চিত্রণে এনেছেন মুন্সিয়ানা। তবে ইংরেজ-জমিদার-কুঠিয়াল-মোসাহেব-নায়েব-দেওয়ান এদের সকলেরই স্টেরিওটাইপ রক্ষিত হয়েছে। জমিদারকে যদিও হালকা মানবিকতার আঁচড় বুলিয়েছেন লেখক (সরযূ ও নুরুদ্দিনের ঘটনা)। পাশাপাশি আছে ইংরেজ আমলে মুসলিমদের পিছিয়ে পড়া নিয়ে সর্বজনবিদিত কথার পুনরোক্তি। গুলাম নবী-নূর বখশ-জালন্দর এদের মাঝে লেখক আঁকেন চিরবিদ্রোহী-দুরন্ত মানসিকতার ছায়া। সাথে নুরুনাহার, কমরুদ্দিনের কাহিনীটা অবধারিতরূপে ট্র্যাজিক করার জন্যই ব্যবহৃত। চরিত্রগুলো থেকে যতটুকু গোঁড়ামি, সংস্কারবাদিতা ও অজ্ঞতা আশা করা যায় তা সবই আছে। ফলে নতুন কিছুর স্বাদ আমরা পাই না। কিছু চোখে পড়ার মত উক্তি হলঃ
কাপুরুষেরাই সহজলভ্য জিনিসের প্রতি ছুটে
অভাববোধটাই কষ্টের, অভাবটা নয়
কমজোরের উপরই পরগাছা সওয়ার হয়
তবে হ্যাঁ, উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র আসলে ভাওয়াল গড়। সেখানকার মানুষ প্রকৃতি - এদের বৈশিষ্ট্যই এর মূল উপাদান ও এই উপন্যাস বা উপাখ্যানের সারবস্তু। উপভোগ্য কিন্তু অকল্পনীয় নয়। প্রাঞ্জল কিন্তু অমৃত নয়। সুন্দর কিন্তু অপূর্ব নয়।
সিরাজ গেছে। তিতুমীরের কেল্লাও আর অটুট নেই। ৫৭ এ সিপাহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ভারত বর্ষের মাটি। টিকে থাকা কিছু অবাধ্য স্বাধীনতাকামী মুসলমানদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে মহারানীর সৈন্য সামন্তরা। এর মধ্যে ভাওয়ালের জংগলে ঘাঁটি স্থাপণ করে এক বৃদ্ধ জিহাদি। তাকে কেন্দ্র করে বেগ পায় ফরায়েজি আন্দোলন। নীল কুঠির সাহেব আর জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর সাথে দ্বন্দ্বের বর্ণনা নিয়ে জমে উঠে উপন্যাস।
কেউ রিভিউ দেখতে আসলে রেকোমেন্ড করবো বইটা পড়তে!ইতিহাস আশ্রিত কাহিনী আমার বরাবরই ভালো লাগে এবং লেখকের উপস্থাপন এবং লিখা খুবই ঝরঝরে ছিল। ইংরেজদের বিরুদ্ধে,জমিদারদের বিপক্ষে মুসলমানদের যুদ্ধ বা অবস্থান ছিল এর বিষয়বস্তু এবং এর মধ্যেই চলেছে খুবই সুন্দর একটি প্রেম কাহিনী।তখনকার বাংলার বিশেষত ভাওয়াল অঞ্চলের খুব সুন্দর বর্ণ না পাওয়া যায় বইটিতে। ভালো লেগেছে পড়ে।