১৬৩৩ সাল। গ্যালিলিওকে রোমান ক্যাথলিক পোপরা বন্দী করে নিয়ে গেলো, তাকে দিয়ে মিথ্যা কনফেস করালো এই বলে যে : সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্র, এ কথা মিথ্যা, সে ভুলে এই কথা বলেছে। তারপর তাকে শর্ত দেয়া হয়, বেঁচে থাকতে চাইলে সারাজীবন তাকে তার ঘরে বন্দী থাকতে হবে - সে বিজ্ঞানসাধনা করতে পারবে, কিন্ত কাউকে তা প্রকাশ করতে পারবে নাহ। বেঁচে থাকার জন্যে সে তা মেনে নেয়। কিন্ত গোপণে তার বই " ডিসকোর্স " সে হল্যান্ডে পাঠায়ে দেয়।
১৯৫০ সাল। পাকিস্তান মাত্রই ক্ষমতা পেল বর্তমান বাংলাদেশের। নতুন এই দেশের শুরুতেই সরকার অনেক রক্ষণশীলতার আশ্রয় নিলো : প্রচলিত কথার বাহিরে কথা বলা সবাইকেই ধরে ধরে কমিউনিস্ট ট্যাগ দিয়ে জেলে ঢুকানো শুরু করলো।
এভাবেই একদিন বরিশালের এক পুলিশ থানায় ধরে আনা হলো প্রত্যন্ত গ্রামের এক কৃষককে। অভিযুক্ত করা হলো,সে সমাজে বিদ্রোহ করতেসে, অপ্রচলিত কথা বলে মানুষকে উত্তপ্ত করে তুলছে। তাকে বলা হলো রাষ্ট্রবিরোধী, কমিউনিস্ট।
থানার ওসি কৃষককে ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন। দরিদ্র, অতি সাধারণ এক চাষী। কতটুক পড়াশোনা করছে জিগেস করলে জানায়, মক্তবে ক্লাস টু পর্যন্ত পড়াশোনা হয়েছে, অক্ষরজ্ঞান আছে। মার্কস, এঙ্গেলসের লেখা পড়েছে কিনা জিগেস করলে জানায় সে এসব পড়েনি : কিন্ত রবীন্দ্রনাথ, বা সমসাময়িক লেখকদের লেখা পড়েছে, বরিশাল লাইব্রেরীতে পড়াশোনা করে। সত্যের অনুসন্ধান করে, জ্ঞান অর্জনের তীব্র আকাঙ্গা তার মধ্যে।
কথা বলে ওসি বুঝলেন, এ রাষ্ট্রবিরোধী নাহ। এলেমদার এক সহজ সরল নিরীহ মানুষ।মানুষদেরকে সে কেন বিগড়ায় জানালে সে জানায়, সে মানুষকে কোনোভাবে আঘাত করে নাহ, বরং তার প্রশ্ন শুনেই মানুষ আঘাত পায়। কিসব লেখালেখি সে করে,সেসব এর কথা শুনেই তারা তাকে মারতে আসে।
তখনকার সময়ে এক অখ্যাত কৃষক থেকে এসব শুনে ওসি ঘাবড়ায়ে যায়। বুঝে, মানুষটা নির্দোষ, কিন্ত হাকিম তহ ইতিমধ্যেই তাকে জেলে ভরার নির্দেশ দিয়ে গেসে। কোন ধারায় তাকে জেলে ভরবে সেটাও সে বুঝে পায় নাহ। তখন ওসি তাকে দিয়ে বন্ড সাইন লেখায়, পাকিস্তানে বসে সে যেন আর লেখালেখি নাহ করে - কিংবা করলেও প্রকাশ নাহ করে,কাউকে পড়তে নাহ দেয়।
এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম, তিনি হলেন আরজ আলী মাতুব্বর, একজন অখ্যাত অশিক্ষিত চাষা,যে পরবর্তীতে তৎকালীন বুদ্ধিজীবী সমাজের ভিতই নড়িয়ে দেয়।
আরজ আলী তার কথা রেখেছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেই তার লেখা বই "সত্যের দর্শন" প্রকাশ করা হয়।
" একজন আরজ আলী " বরিশালের লাউছড়া গ্রামের সেই অশিক্ষিত কিন্ত স্বশিক্ষিত চাষা আরজ আলীকে নিয়েই, তার জীবনী নিয়ে লেখা জীবনী উপন্যাস। উপন্যাসটিকে খুব গোছানো বলে আমার মনে হয়নি যদিও : তবে আরজ আলীকে চেনার জন্যে, তার লেখা পড়তে আগ্রহী করতে বইটির গুরুত্ব অনেক। ১৯৮০ - ৯০ এর দশকে যার লেখা পুরো শিক্ষিত সমাজের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিলো : একজন বাঙ্গাল অশিক্ষিত চাষীও যে নিজ থেকে পড়াশোনা করে এমন লেখা লেখতে পারে,তা কেউই কল্পনা করতে পারেনি। কিন্ত আফসোসের বিষয় এই যে,এখন কেউই তার কথা মনে রাখেনি।
একজন প্রথাবিরুদ্ধ বিনম্র মানুষ, প্রথম জীবনে বই কেনার টাকা ছিল নাহ, আগের ক্লাসের পাশ করে ফেলা পাড়া পড়শির বই মাঠে কাজ করার সময়ে বসে বসে পড়ে শিখেছেন, ১২ মাইল পথ পায়ে হেঁটে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়তেন, শেষ বয়সে গ্রামে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন, নিজের শরীর দান করে বিজ্ঞান সাধনায়। নতুন প্রজন্মের তার লেখা পড়ে শেখার আছে অনেক কিছুই।