Kamal Kumar Majumdar (Bengali: কমলকুমার মজুমদার) (17 November 1914 – 9 February 1979) was a major fiction-writer of the Bengali language. The novel Antarjali Jatra is considered his most notable work.
বাংলা সাহিত্যে লেখকদের লেখক বলা হয় কমলকুমার মজুমদারকে। সাহিত্যে নতুন এক ধারার প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। 'অন্তর্জলী যাত্রা' লেখার পূর্বে গদ্য সাহিত্যে কাহিনীনির্ভর রচনার প্রাধান্য ছিল। তবে তিনি সেই পথে না গিয়ে ভাষানির্ভর রচনায় মনোনিবেশ করেন। বাংলা সাহিত্যের চিরাচরিত রূপকে গ্রহণ না করে, ইউরোপীয় ভাষার আদলে সাহিত্য রচনা করেছেন। এজন্য তাঁর লেখাগুলো অনভ্যস্ত পাঠকের কাছে জটিল মনে হতে পারে।
সনাতন ধর্মে মৃত্যু আসন্ন ব্যক্তির পরকালের মঙ্গলের জন্য গঙ্গার পানিতে শরীরের নিম্নাংশ ডুবিয়ে রেখে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, তাকে অন্তর্জলী যাত্রা বলে। হিন্দুধর্মে একসময় পরিবারসহ স্বর্গলাভের আশায় বৃদ্ধ কুলীন ব্রাহ্মণের সাথে কুমারী মেয়ের বিয়ে দেওয়া ও সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল। সতীদাহ প্রথার মাধ্যমে মৃত স্বামীর সাথে জীবন্ত স্ত্রী চিতায় উঠতো। আর এই সতীদাহ প্রথার বলি নারীদের ভাগ্যবান মনে করা হতো। হিন্দুধর্মের এই প্রথাকে উপজীব্য করেই কাহিনি নির্ভরতাকে পাশ কাটিয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন কমলকুমার মজুমদার। মাত্র কয়েকদিনের ব্যাপ্তিকাল ও অল্প কয়েকটি চরিত্রের মাধ্যমে শ্মশানঘাটে উপন্যাসটির ঘটনাগুলো চিত্রায়িত হয়েছে।
সীতারাম চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু আসন্ন। তাঁকে অন্তর্জলী যাত্রার জন্য গঙ্গার পঞ্চমুন্ডীর শ্মশান ঘাটে নেওয়া হয়েছে। কুল পুরোহিত কৃষ্ণপ্রাণ, কবিরাজ বিহারীনাথ, জ্যোতিষী অনন্তহরি, বড় ছেলে বলরাম ও ছোট ছেলে হরেরাম সকলেই অপেক্ষায় রয়েছে কখন প্রাণবায়ু ত্যাগ করবেন সীতারাম। কিন্তু অবস্থার উন্নতি বা অবনতি কোনোদিকেই যাওয়ার নাম নেই। বলরাম ও হরেরামের মধ্যে নীরব দ্বন্দ্ব চলছে সীতারামের কোমড়ে বাঁধা সিন্দুকের চাবি নিয়ে। পিতার মৃত্যুর পরেই চাবি হস্তগত করে সম্পত্তির মালিক হতে চায় দুই ভাই। আর এদিকে শ্মশান চন্ডাল বৈজুনাথ অপেক্ষায় রয়েছে সীতারামের মড়া পোড়ানোর জন্য। নিম্ন বর্নের হিন্দু হওয়াতে সকলেই তার সাথে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আচরণ করে।
আরো একজন ব্যক্তি এই যাত্রায় শামিল হয়েছিল; তিনি হলেন কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা লক্ষ্মীনারায়ণ। তাঁর ইচ্ছা সীতারামের সাথে নিজের ষোড়শী কন্যা যশোবতীকে বিবাহ দিয়ে পুণ্য অর্জন করা। তাই জ্যোতিষি অনন্তহরিকে ফুঁসলিয়ে বলতে বলেন যে, সীতারাম একা স্বর্গে যাবেনা। তাঁর সাথে দোসর নিয়ে যাবে। কিন্তু দোসর হিসেবে কাকে নেবেন সীতারাম? তখন অনন্তহরি প্রস্তাব করেন লক্ষ্মীনারায়ণের কন্যাকে বিবাহ করে সীতারাম তাকেই দোসর হিসেবে নেবেন।
সবার আলোচনার পর যখন বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় তখন যশোবতীকে শ্মশানঘাটেই কনের সাজ দিয়ে আনা হয়। সীতারাম যেখানে প্রায় অচেতন, সেই অবস্থাতেই সীতারাম ও যশোবতীর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর সীতারাম ও যশোবতীকে শ্মশানে রেখেই বাকিরা চলে যায়। এদিকে বৈজুনাথ একটি মেয়ের জীবন্ত দাহ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনা। বৈজুনাথই একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে সীতারাম-যশোবতীর সাথে থেকে যায়। বিয়ের পরেই সীতারামের অবস্থা উন্নতির দিকে আসে। তাহলে কি সীতারাম আবার নতুন করে সংসার পাতবে যশোবতীকে নিয়ে? সীতারাম যেখানে মৃত্যুশয্যায় সেখানে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া যশোবতী তার স্বামীকেই বা কীভাবে মেনে নেবে? নাকি সতীদাহ প্রথার বলি হিসেবে আরেকটি নাম যুক্ত হবে? পরবর্তী ঘটনায় বৈজুনাথেরই বা ভূমিকা কী?
বইটির ভূমিকাতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন যে, কমলকুমারের অনভ্যস্ত লেখায় পাঠক হোঁচট খেতে পারে। প্রথম কিছু পৃষ্ঠায় আসলেই একটু জটিল মনে হয়েছে। তবে সেই অনভ্যস্ততা বেশিক্ষণ থাকেনি। বইটার ভাষা মুগ্ধ করেছে। বইটার বিষয়বস্তুও বেশ কৌতহূলদ্দৌপক ছিল। এরপর কী হতে পারে, এমন একটা আগ্রহ ছিল জানার। নতুন পাঠকের জন্য বইটা কঠিন মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। হয়তো শেষও করতে পারবেনা। তবে আমি মনে করি নতুন এক ধরনের রচনার সাথে পরিচয়ের নিমিত্তে বইটি আপনার পাঠ করা উচিত। হ্যাপি রিডিং।
"আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে।"
কমলকুমার মজুমদার এর এই উপন্যাসের প্রথম এই ৩ লাইনের ভেতর কি আছে আসলে? ১৬৬ পৃষ্ঠার পুরো বই পাঠ শেষেও স্পষ্ট ২ টা ভাগ করতে পারি। এই ৩ টা লাইন ও বাকি উপন্যাস। কী অদ্ভূত, সত্য, সুন্দর, গভীর ভোর যেন এখানে!
১৯৫৯ সালে উন্মুক্ত হয় যখন এই উপন্যাস তখন কমলকুমার মজুমদার এর বয়স ৪৪ বা ৪৫ বছর। তাঁর ৮ টি উপন্যাসের মধ্যে সবচেয়ে সার্থক উপন্যাস নাকি 'অন্তর্জলী যাত্রা।'
"আমাদের স্নেহের এ জগৎ নশ্বর, তথা চৈত্ররুক্ষ অগণন অন্ধকার সকলই, মৃন্ময় এবং অনিত্য; তথাপি ইহার, এই জগতের, স্থাবর ও জঙ্গমে পূর্ণিমা;"
এই ৩ লাইনেও কি যেন আছে, জানি না। তবে টানেলের ভেতর নিয়ে যায় কেমন নিখাদ সৌন্দর্য সমেত, এইটুকু বুঝি।
প্রথম দিকে পাঠে মনে হচ্ছিলো, কোন মঞ্চ নাটক দেখছি যেখানে রিয়েলিস্টিক অভিনয় হচ্ছে। স্টেজের অপজিটে দর্শকদের ডার্ক সাইটে বসে কিছু বুঝতে পারছি, কিছু বুঝতে পারছি না কাহিনী। তবে এই বোঝা না বোঝার অনুভূতিটাও ভিন্নরকম যত্নের আর মধুর লেগেছে।
"একথা সত্য যে, মৃত্যুর গভীরতায়, এক মুহূর্তের জন্য চন্দ্র সূর্য্যকে হারাইবার মত স্থিরতা তাহার নাই। যদিচ, সবুজতা তাহার কাছে নিশুতি রাত্রের ঝিঁ ঝিঁ স্বর এমত, যদিও আপনার নিঃশ্বাস পরিদৃশ্যমান আলোকে আড়াল করিয়াছিল, যদিও স্পর্শবোধ ভোরের পাখির কণ্ঠস্বরে উধাও।"
তো অনেকটা পড়েই খেয়াল করি মঞ্চ নাটক না। আমিই কখন চরিত্রগুলোর একজন হয়ে গঙ্গার ধারের শ্মশানে বসে আছি চরিত্রগুলোর সাথে। হাভাতে অবস্থা যেন আমার এবং বুড়ো সীতারামের মৃত্যুর অপেক্ষা করছি যেন। কখন জ্বলবে চিতা?
"বৈজুনাত যশোবতীর দিকে তাকাইল। ঘাসে মুখ রাখিয়া হরিণী যেমত চাহিয়া থাকে, সেইরুপ দৃষ্টি দেখিতে পাইয়া সে থ' হইয়া গেল।"
কিছুক্ষণ পর পড়তে পড়তে খেয়াল করি, আমি উপন্যাসে নাই। উপন্যাসের পাশ দিয়ে হাঁটছি। বার-বার খেই হারিয়ে ফেলছি। আরেকটু পর দেখি চেষ্টা করছি আপ্রাণ মিশে যেতে উপন্যাসে কিন্তু লেখক এই মিশতে দিচ্ছেন এই বের করে দিচ্ছেন উপন্যাস থেকে। তখন মনে হল উপন্যাসটা কী তাহলে কোন মঞ্চ নাটকের দলের রিহার্সেল রুমের মত যেখানে যা খুশি করতে পারবে শুধুু অভিনেতা-অভিনেত্রীরা?
ততক্ষণে কাহিনী বুঝতে আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। কিশোরী বধূ যশোবতীর আগমন আরও আগে হয়ে গিয়েছে। আমি মত্থিত হচ্ছি তখন এই বইয়ের সুরে। যে নিজস্ব স্বর, বলয় একমাত্র কমলকুমার মজুমদার এর।
কীভাবে একজন এভাবে একটা সার্কেলের ভেতর পাঠককে রেখে দিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে থামালেন? প্রাকৃতজনেরা কত স্পষ্ট চরিত্র হয়ে নিজস্ব কংক্রীট ধর্মবিশ্বাস নিয়ে এসেছে! অঅনুকরণীয় নিজস্ব এই স্বর যেন কাঠ খোদাই শিল্পীর ন্যায় নিমগ্ন কাজ। পুরো উপন্যাস ফ্লোলেস পড়া অসম্ভব। খেই হারাতেই হবেই খানিক বাদে বাদেই। একটা সময় কাহিনী আমি আর খুঁজি নাই। থেকে গেছি এর নিদারুণ বহতা সুরে। হঠাৎ হঠাৎ এক পশলা ভরাট বৃষ্টির পরের আবহ��ওয়ার মত কী গহীন সুন্দর উপমা, বর্ণনা এই বইতে!
আচ্ছা, উপন্যাসও তাহলে এমন হতে পারে? আমার কাছে মনে হয়েছে, যে টিপিকাল ধারণা আছে উপন্যাস, নাটক, কবিতা নিয়ে তার কিছুই না 'অন্তর্জলী যাত্রা'। 'অন্তর্জলী যাত্রা' বা শেষ যাত্রা আসলে অন্তর্জলী যাত্রাই। 'অন্তর্জলী যাত্রা' যেন একাধারে উপন্যাস, নাটক, কবিতাও এবং একদম দেশজ!
এখন শেষ করি দীর্ঘ এই বাক্য দিয়ে। বার বার ফিরে আসতে চাই "অন্তর্জলী যাত্রা" তে।
"তাঁহার আজন্ম সযত্নে রক্ষিত অভিমান, দেহের মধ্যে পলকেই কুম্ভকের সৃষ্টি করিল, প্রথমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস এবং তদনন্তর নেত্রে অশ্রু দেখা দিল, এখন বিগলিত হয়; তবু এ সত্য অনস্বীকার্য্য যে, অষ্টলক্ষণ সমুদয় প্রভাবসম্পন্ন, ফলত ললাটে স্বেদবিন্দু ও অন্তরের পুলক আকল্প-নবীন একভাবের সূচনা-নয়নে উন্মীলন আকাঙ্ক্ষায়, কৃষ্ণ মেঘোদয়ে ময়ূরসমান; এবং ধীরা, নবোঢ়া, লাজুক, শীলা, বিহবলা, বিড়ম্বিত, মুহ্যমান-বিষাদময়ী যশোবতী প্রগলভা হইলেন, আপনকার দেহ হইতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হইল; তিনি মুহুর্মুহুঃ বলিতে লাগিলেন, 'সত্যিই...সত্যিই মায়া হয়" বলিতে বলিতে আপনার ভগ্নস্বরে আপনি সম্মোহিত হইয়া, জরাজীর্ণ কালাহত স্বামীর কণ্ঠ ঝটিতি আবেষ্টন করত রমণী জীবনের, প্রকৃতির জীবনের, প্রথম, মধ্য এবং শেষ এবং শ্রেষ্ঠ আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। __________
সত্যি কথা বলতে আমি ঘটনা পরম্পরা বর্ণনা করা উপন্যাস পড়তে অভ্যস্ত। তাই আমার কাছে উপন্যাসের কাহিনীই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। হ্যাঁ, ভাষার সৌন্দর্য যুক্ত হলে সেই কাহিনী পাঠ আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যখন ‘ভাষার সৌন্দর্যের’ জন্য উপন্যাসের কাহিনী ধরতেই অসুবিধার সৃষ্টি হয় তখন আর কোনো রসাস্বাদন করা সম্ভব হয় না।
এই বইটা আমার কাছে তেমনি মনে হয়েছে। লেখকের ভাষা এত সংস্কৃতবহুল আর বাক্যগুলো এত দীর্ঘ যে বইয়ের কাহিনী ধরতেই আমার অসুবিধা হয়েছে। অবশ্য ভূমিকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এটা জানিয়েছেন যে বাংলা ভাষাতেই এই ধরনের ভাষার প্রয়োগ প্রথম এবং সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার করতে একাধিকবার পড়া প্রয়োজন। কিন্তু এরপরে যে কথাটা বলেছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে যারা বইটা পড়তে অসুবিধা অনুভব করে তারা কমলকুমার পড়ার যোগ্য হয়ে ওঠে নি।
তো, সেইটাই। এখনও যোগ্য হয়ে উঠতে পারি নি। ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারলে আরেকবার পড়ার ইচ্ছা রইল।
অশীতিপর বৃদ্ধ সীতারাম গঙ্গার ঘাটে জলে পা দিয়ে খাটিয়ায় শুয়ে আছেন। প্রাণবায়ু যখন তখন বের হয়ে যাবে। এমত সময়ে কন্যাদায়গ্রস্থ একব্রাহ্মণ পিতার কিশোরী কন্যার সাথে সীতারামের বিবাহ হয়। কন্যার পিতা স্বর্গ প্রত্যাশী। কন্যা মৃতস্বামীর চিতায় সহমরণে গেলে তার পিতাও অখন্ড স্বর্গ লাভ করিবেক। সহজে স্বর্গ পাওয়ায় জন্য যশোমতীর পিতা এই সর্টকাট পথ ধরিয়াছেন।
ভাষার কি কারিকুরি! ভাষার ওপরে খুব ভালো রকমের দখল না থাকলে এই বই মাথার ওপর দিয়ে চলে যাবে। স্বল্প পরিসরের বইখানি পড়ার সময়ে মনে হবে যেন কি জানি বুঝিলাম আর কি জানি বুঝিলাম না। তবে পাঠক খেয়াল করলে একটা অনুভূতি প্রাপ্ত হবেন। জীবনের প্রতি তাকানোর নজরটুকুতে হয়তো একটু পরিবর্তন আসবে।
হিন্দুদের প্রথা, মানুষের মনের গহনে বয়ে চলা নানা স্রোত, কমলকুমারের কলমে উঠে এসেছে অন্যভাবে। বক্তব্য যাই হোক, এই বইয়ের মূল বিষয় 'ভাষা'। খুব ছোট একটা উপন্যাস কিন্তু অনুধাবনে সময় লাগে অনেক।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক আগ্রহ জাগানিয়া কাহিনি থাকার পরেও, এই উপন্যাস পাঠের সময়ে পাঠকের দৃষ্টি মূলত লেখকের গদ্যের গঠনের দিকেই নিক্ষিপ্ত হয়। হেলাফেলা করে পড়তে গেলে, কমলকুমার-এর ভাষাকে কঠিন বলে বোধ হবে, কিন্তু, মনোযোগ দিয়ে পড়তে সময়, শুষ্ক-সম এই সাধু ভাষার সৌন্দর্য আবিষ্কার করা যায়।
নাম শুনিলেম তার; হবে সে ক্ষণ, কোনকাল? মহাকাল একটু উঁকিঝুঁকি দিতে চায়, বলিতে চায়, হ্যাঁ রে, ঘটে বসুধার কালই। এর বাইরে তো নয়ই কেউ। সেইটুকু আগে একদা জানিলেম, কমলকুমার হইল লেখকদের লেখক। ভাবিলাম, কী জানি না লেখে? জানার কথা ছিল যেমন সত্যি বলিয়া মানা যায় দিবাকরের আলাপ। ওঠে, নামে। ইহা এক ধ্রুবক।
শুরু করিতেই খেই হারাইলাম, ঝড় উঠিল যেন। মাঝি দিক না পায়, এমনতরের স্বাক্ষী সে অনেক। কিন্তু, তার সহিত যে এক যাত্রী রইয়াছে, তাহাই মস্তিষ্কে আঘাত হানিতে লাগিল। বাতেলা হইল অনেক দুয়ের মাঝে। চুপ হইয়া ছিল একজন, এইবার অন্যজন। আন্ধার নামিয়া আসিল। এরই মাঝে উপর হইতে আকাশ চিড়িয়া যে ঝলক নামিল, যাত্রী বুঝিল ইহাই সম্বল। মাঝি। সন্তরণে বড়ো ভালো। আমিও বুঝিলাম, কথা বলা যাইবে না, তীরে উঠতে হইবে। রস আস্বাদন না করিলে কেমনে শিখিব সন্তরণ?
জল খাইলাম ঢের। ডুবিলাম, ভাসিলাম। মনে হইল আদতেই এ যাত্রা অন্তর্জলী। রাস্তা নাহি নিকলা। বৈজু হইয়া গান ধরিলাম, সীতারাম হইয়াও। সুর উঠিল বটে টপ্পা নয়, পুঁথি হইবেক। পড়িলাম সেমত। অন্তরীক্ষ পরিষ্কার হইল এই মতে।
সন্তরণে সমস্যা রহিল না পুস্করিণীতে। জোয়ারে ভাসিয়া যাই আরকি।
তাও কমতি নেই চাহিবার। খিল দিয়া বসিয়া রইলুম। সীতারাম মরে মরে। এককভাবে হইলে এক কথা ছিল। লোল পড়ে, মাড়ি নাই। জ্যোতিষ সময় ঠিক করিল, যেমতে লাল হইবেক, সেই ক্ষণ। অন্তরীক্ষ ওদিকে সতেজ হইতে লাগিল। একেবারে জাগিয়া যায় বুঝি! হাওয়ার সঞ্চার হয়, সাধুসঙ্গ যে হাওয়ায় বসত করে। আলো ঝলমল করে সে রঙ্গে, সেই আনন্দের মাত্রা যোগ হইল মখমল, কোমল, হিরেমতি যশোবতীর স্পর্শে। লজ্জাবতীর ঘুম ভাঙিয়া গেলে বলে, বাচ্চা দুব! লোল পড়িতেই থাকে।
চাঁড়াল বৈজুর পূর্ণিমা। নরকপাল লইয়া সে রসবোধে, সঙ্গী যশোবতী। সহমরণে পাঠাইতে রাজি নয়। মরলে মরুক বুড়ো, কাম জেগে উঠে তার। ছুঁয়ে দিয়ে জাত গেলে যদি মতিভ্রম হয়।
যশোবতী স্থিতিস্থাপক সীমায় বাস করে। একদিকে বৃদ্ধ সোয়ামি, মরে মরে। জাতপাতের চিন্তায় আগুনে পুড়িতেও রাজি। অন্যদিকে বৈজুও তারে ডেকে যায়, সে ও পাক খায়, গোঁত্তা খাইয়া পড়ে।
বান আসে গঙ্গায়। গগন ডাকিয়া উঠে। কোকিলও। ট্রেন চলিয়া যাইবে কোথাও, তবু সেই শব্দ এই গঙ্গায় আসিবে না। ময়ুর পেখম মেলিবে হয়ত। মোহনায় ভাসিয়া যায় বৈজু-যশোবতী। পরক্ষণেই খেয়াল হয় জল মিলিয়া যাইতে পারে বটে, কিন্তু গঙ্গা আর সমুদ্র এক হইতে পারে না। যশোবতী ছুটিয়া যায় গঙ্গাপানে৷ সীতারাম যে ভাসে, অবশেষে সে ও হড়কায়। ভাসিয়া যাইতে থাকে তাহারা।
কমলকুমার প্রাচীনপন্থী হইতেই পারে। তবে, উনি যেই ছাঁচে উপন্যাসকে ফেলিতে চাহিয়াছেন, নিজস্ব একটা রূপ দেওয়ার প্রয়াসে তিনি হয়ত মিস করিয়া গেছেন অতীব জরুরি সময়কে।
রূপসজ্জা নিয়ে আদিখ্যেতা নেই। তবে, সেই রূপ দেখিবা মাত্র ধরিতে না পারিলে বোধহয় একটু সমস্যাই হইবে। এইজন্য বোধহয়— গঙ্গা থুইয়া আমাজনে গিয়া ডুবাইতে হয় পাঠকদের।
প্রথমেই বলে নেয়া ভাল যে এই উপন্যাসের নাম 'অন্তর্জলী যাত্রা' মানে কি তা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না, চন্দ্রায়ন শুনেছি কিন্তু এই জার্গন জানতাম না। গুগলে সার্চ করে দেখতে পারতাম এবং তারপর পড়া শুরু করতে পারতাম। কিন্তু না, আমি তো এগোইস্টিকাল, শুনেছি কমল কুমার মজুমদার এর লেখা বোঝা দুষ্কর এমনকি অসাধ্য। তিনি তো লেখকের লেখক।
পড়া শুরু করলাম শান্ত ভাবেই, প্রথম স্তবক ক্যাচি। ভাবলাম আরে এ তো সহজই মনে হচ্ছে। যাইহোক পড়ে শেষ করতে হবে। কিন্তু একটু পরেই আমার ভুল ভাঙলো । সীতারাম তার পুত্র বলরাম এবং হরেরাম, একজন কবিরাজ, জ্যোতীষ, চন্ডাল, কন্যা এবং তার কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা এদেরকে নিয়ে কাহিনী। কখন যে সে অনশ্রুত কাহিনীতে আছি আর কখন যে বাহিনীতে (মধ্য পথে পড়া ছেড়ে দেয়া পাঠক-বাহিনী) আছি কিছুই তো বুঝতে পারলাম না মনে হলো। লেখক ভাল খেলা খেলছেন, এদিক দিয়ে সে দক্ষ উইংগার। কয়েকটি জায়গায় আমাকে থামতে হয়েছে এবং আবার পিছন থেকে শুরু করতে হয়েছে, ফ্লো নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
আমার জন্য এ এক এডভেঞ্চার ছিল, সুখকর ছিল, বয়স আমার ২২ এর শেষ প্রান্তে, রবীন্দ্রনাথের এ বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তথাপি অদ্যবধি আমি একখানি রমনী-হৃদয়ও জয় করিয়া আমার সাফল্য-গাঁথার জয়জয়কার রবে স্থল-জল-নভোমন্ডল ধ্বনিত করিতে যখন পারিলাম না তখন পেডিয়াট্রিক্স পরীক্ষার পূর্বের রাত্রে বইখানা পড়িয়া মনে হইল 'প্রেম অতি বিষম বস্তু' তার আমার কাছে অনবগুন্ঠিতা না থাকাই শ্রেয় যেমন এই বইখানিও অপাঠকের কাছে আনরিড থাকাই ভাল। নেগেটিভিটি ছড়াবে, তারা গৌতম ঘোষের মুভি দেখুক, তারা প্রেম করবে, সময় কই তাদের???
আর হ্যাঁ, সম্পূর্ণ বই পড়ার পর কাহিনী ধরতে পারলেও, জ্যোতীষের কথা(দোসর তত্ত্ব) ফলে যাওয়ায় পরও বা চন্ডালের চেষ্টা ব্যর্থ হবার পরেও যত না দুঃখ পেলাম তারচেয়ে বড় দুঃখ এই যে অন্তর্জলী যাত্রা মানে আমি তখন বুঝতে পারিনি। প্রটাগনিস্ট যে শেষে জলের ভেতর ওঠানামা ঝাঁপাঝাঁপি করে এই জন্য??? গুগলে সার্চ করার পর বুঝলাম এই যাত্রা আসলে একটা পরলৌকিক ধর্মীয় ক্রিয়া, চন্দ্রায়ন সিস্টেমের মতই, যেখানে মৃতবৎ ব্যাক্তির পায়ের কিছু অংশ গঙ্গার জলে ডুবিয়ে রাখা হয়। গঙ্গা পাপ ধুয়ে নেয়, অক্ষয় স্বর্গবাস কে ঠেকায়! অনেক কিছু জানলাম!!!