'মহাবিদ্রোহের কাহিনী' সিপাহী যুদ্ধের শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে ১৯৫৭ সালে রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৫৭ কে নতুন করে সৃষ্টি করবার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন তাকে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের ইতিহাসবিকৃতি ও বিস্মৃতির গর্ভ থেকে উদ্ধার করার। ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ব্যাপকতা, তার সর্বশ্রেণীসমন্বয়ে গণচরিত্র, তার খ্যাত অখ্যাত নায়ক-নায়িকাদের আত্মত্যাগ, তার সচেতন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যজোট, সর্বব্যাপী বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খলমুক্তির এই অক্ষয় স্মারক আমাদের গর্বিত করে।
সেন, সত্যেন (১৯০৭-১৯৮১) সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক। ১৯০৭ সালের ২৮ মে মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ি উপজেলার সোনারঙ গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতৃব্য ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব আচার্য।
সত্যেন সেন সোনারঙ হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস (১৯২৪) করে কলকাতা যান এবং সেখানকার একটি কলেজ থেকে এফ.এ ও বি.এ পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ (ইতিহাস) শ্রেণীতে ভর্তি হন। কিন্তু যুগান্তর দলের সদস্য হিসেবে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি ১৯৩১ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন এবং জেলে থেকেই বাংলা সাহিত্যে এম.এ পাস করেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের (১৯৩৮) পর বিক্রমপুরে ফিরে তিনি কৃষক আন্দোলনে যোগ দেন এবং আমৃত্যু বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। সত্যেন সেন ১৯৪৯, ১৯৫৪, ১৯৫৮ ও ১৯৬৫ সালে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেন।
সত্যেন সেন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদ-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে সত্যেন সেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সংগঠক এবং উদীচী (১৯৬৯) সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত ও গণসঙ্গীতের সুকণ্ঠ গায়ক এবং গণসঙ্গীত রচয়িতা।
সত্যেন সেন সাহিত্যচর্চা শুরু করেন পরিণত বয়সে এবং অতি অল্পসময়ের মধ্যে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ: উপন্যাস ভোরের বিহঙ্গী (১৯৫৯), অভিশপ্ত নগরী (১৯৬৭), পদচিহ্ন, (১৯৬৮), পাপের সন্তান (১৯৬৯), কুমারজীব, (১৯৬৯), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯), পুরুষমেধ (১৯৬৯), আলবেরুনী (১৯৬৯), মা (১৯৬৯), অপরাজেয় (১৯৭০), রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ (১৯৭৩); ইতিহাস মহাবিদ্রোহের কাহিনী (১৯৫৮), বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম (১৯৭৬), মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে (১৯৬৯), ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা (১৯৮৬); শিশুসাহিত্য পাতাবাহার (১৯৬৭), অভিযাত্রী (১৯৬৯); বিজ্ঞান আমাদের এই পৃথিবী (১৯৬৭), এটমের কথা (১৯৬৯); জীবনী মনোরমা মাসীমা (১৯৭০), সীমান্তসূর্য আবদুল গাফফার খান (১৯৭৬) ইত্যাদি।
চিরকুমার সত্যেন সেন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রগতিশীল ও গণমুখী চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্যসাধনা করেন। তাঁর রচনায় ঐতিহ্য, ইতিহাস, দেশের মাটি ও মানুষের শ্রেণী-সংগ্রাম প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি উপন্যাসের জন্য ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৭০) লাভ করেন।
১৯৮১ সালের ৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনএ তাঁর মৃত্যু হয়।
আমি তখন ক্লাস থ্রি কি ফোরে পড়ি। জুলভার্নের একটা বই পড়তে যেয়ে ক্যারেক্টার হিসেবে নানাসাহেবের নাম পড়েছিলাম। সেই বর্ণনা অনুযায়ী ভেবেছিলাম নানা সাহেব না জানি কতো বড় বিদ্রোহী! কেমন খারাপ একটা মানুষ। কিন্তু আরও কিছু পরে যখন উপমহাদেশের ইতিহাস পড়লাম, তখন বুঝলাম ঝাঁসির রানী, নানা সাহেব, তাতীয়া টোপী প্রভৃতি মানুষদের গুরুত্ব। এই বইয়ে আরও অনেক নাম না জানা বিদ্রোহীর নাম পড়েছি। তাদের অধিকাংশই হয়তো এতো বড় ইংরেজ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সফল হননি কিন্তু পথ দেখিয়ে গেছেন। সত্যেন সেনের সাথে প্রথম পরিচয় মসলার যুদ্ধ পড়ে। সেখানে তার বর্ণনা, ডিটেলিং সব কিছু পড়ে ভালোই লেগেছিল, পরে জানতে পারি সোমেন চন্দ, রণেশ দাশগুপ্তের সাথে তার বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল। ইতিহাস, বিদ্রোহ নিয়ে তার যথেষ্ট জানাশোনা আর লেখা। ভালোই লাগল। তবে মসলার যুদ্ধ পড়ে যেমন আশাবাদী ছিলাম অতোটা প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের মানুষগুলোর সাথে পরিচিত হবার জন্য নট ব্যাড।
পাঠ্যবইতে অবিভক্ত ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামকে খুববেশি গুরুত্ব দেয়া হয় না।দু'চার পাতা নয়, ক্ষেত্রবিশেষে দু'চার লাইনের খালাশ।
আবার,বইতে মূলত ইংরেজ ঐতিহাসিকদের বর্ণনাকে প্রাধাণ্য দেয়া হয়। পরিণাম দাঁড়ায় লোকে সত্যটা জানতে পারে না বরং আধাআাধি যা জানে তা মোটামুটি প্রোপোগান্ডা বলা চলে।
সত্যেন সেন সিপাহী বিদ্রোহের শতবর্ষে ১৯৫৭ সালে এই বইটি লিখলেন ইংরেজ প্রোপাগান্ডার বাইরেও যে সিপাহী বিদ্রোহের একটি ইতিহাস থাকতে পারে সেটি ক্ষুদ্রাকারে পাঠকের কাছে পৌছে দিতে। এবং দিলেনও কিন্তু.....
তিনি শর্টাকার্টে লিখতে গিয়ে মোটামুটি লেজেগোবরে অবস্থায় পড়ে গেলেন কিংবা পাঠককে ফেললেন। কেননা ঘটনার কোনো আগা-মাথা ছিল বলে বোধ হচ্ছিল না। পাঠকের বোধশক্তি জাগবার আগেই যেন সব ঘটে যাচ্ছিল। স্রেফ ঘটনাবর্ণনে অপরিপক্কতা ও খানিকটা তাড়াহুড়াই যেন কাল হলো সত্যেন সেনের " মহাবিদ্রোহের জন্য"।
হ্যা, একদল অবশ্য একেও ইংরেজ প্রোপাগান্ডার কাউন্টার প্রোপাগান্ডা বই বলতে চাইবেন। উত্তর হতে পারে প্রতিরোধ তিনি করেছেন বটে, তবে রেফারেন্স হিসেবে সেই ইংরেজ সাধুদেরই দারস্থ হয়েছেন।
এই বইটার বড় সবলতা বলবো সত্যেন সেনের সহজসরল লেখনী।
সবাই সহজে পড়তে পারবে এমন চিন্তা থেকেই সত্যেন সেন সম্ভবত বইটা লিখেছেন এবং সেটার জন্য তাকে সাধুবাদ দিতেই হয়। বইটায় সিপাহি বিদ্রোহের কাহিনি থেকে বিদ্রোহের নায়কদের বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এজন্য সুপাঠ্য বই হলেও তথ্য তেমন কিছুই পাবেন না। স্কুলে পড়ার উপযোগী বই বলা চলে। বইটার নাম 'মহাবিদ্রোহের নায়কেরা/সিপাহিরা' রাখলেই বরং যুক্তিসঙ্গত হতো।
গোলামের মানসিকতা আমাদের আজো যায়নি। এখনো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসকে আমাদের পাঠ্যবইয়ে ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়। ১৮৫৭ সালের বিশাল সংগঠিত হিন্দু-মুসলিম মিলিত প্রতিরোধ যুদ্ধকে সীমাবদ্ধ রাখা হয় সিপাইদের চর্বিওয়ালা টোটাজনিত ক্ষোভে। সত্যেন সেনের এই বই ঠিক ইতিহাস গ্রন্থ নয়, দিনতারিখ মেনে সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনাপঞ্জি এতে তুলে ধরা হয়নি। লেখক তাঁর বইয়ে এই বিদ্রোহের কিছু ঘটনা, কয়েকটি স্ফুলিঙ্গ, কয়েকজন সংগঠক, নেতা, ও যোদ্ধার কথা বলেছেন। আজিমুল্লাহ খাঁ, মঙ্গল পাণ্ডে, মৌলবী আহমদ শাহ, ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মীবাঈ, তাঁতীয়া টোপী, অযোধ্যার বেগম হযরত মহল, বেণী মাধ্যো, শাহজাদা ফিরোজ শাহ, প্রমুখ নায়ক-নায়িকাদের জন্য রেখেছেন আলাদা আলাদা অধ্যায়। নানা সাহেব, বাহাদুর শাহ, এদের স্মৃতিতে নিবেদিত কিন্তু কোনো অধ্যায় নেই, কারণ এরা ১৮৫৭-র যুদ্ধে ছিলেন প্রতীক হিসেবে, সত্যিকার নেতা হিসেবে নয়।
পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা বন্দি হয় ইংরেজদের হাত। সেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে পেরোতে হয় প্রায় দুশো বছর। হয়ত এটাই ছিল বাংলার ভাগ্যে। তবে এই দুশো বছরেও অনেক বার মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই হয়েছে। অনেক মহৎ ও স্বাধীনতাকামী মানুষেরা লড়াই করেছেন তাদের অধিকারের জন্য। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। . বাংলার শেষ নবাবের পতনের পর ১৮৫৭ সালে সিপীহিদের মধ্যে বিদ্রোহ ঘটে সেটা ধর্মীয় ও শ্রেণী বৈষ্যম দুটো কারনেই হয়েছিল। তবে তারা সংঘটিত ছিল না। যদিও আজিমুল্লাহ খা, নানা সাহেব, লক্ষ্মীঈ বাঈ, তাতীয়া টোপি, ফিরোজ শাহ এরা সবাই চেষ্টা করেছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার। তবে তারা কেউ সেভাবে সংঘটিত ছিলেন না বলেই তারা স্বাধীনতা অর্জনে ব্যর্থ হন। . তবুও ইতিহাস তাদের নাম সেভাবে আমরা পাই না। তাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা খুব কম জানতে পেরেছি। সত্যেন সেনের লেখা মহাবিদ্রোহের কাহিনীতে ছোট করে হলেও আমরা সেই সময়ের ঘটনা গুলো স্বল্প আকারে জানতে পেরেছি। ইতিহাসের এই বীরদের প্রতি রইল অসীম শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।
১৮৫৭ খ্রীস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহ গোটা হিন্দুস্থানকে উত্তাল করে তুলেছিল যার প্রচন্ড আঘাতে কেঁপে উঠেছিলো সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের জয়স্তম্ভ। কিন্তু এর সূচনা হয়েছিলো ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে পলাশী যুদ্ধের মাত্র সাত বছর পরে।তারই সূত্র ধরে ৯৩বছর পর আবার সূত্রপাত হয় মূল বিদ্রোহের। সিপাহীবিদ্রোহের কথা প্রাথমিক ইতিহাস বইয়ে সামান্যকিছু ধারণা দেয়া আছে।সেখানে বিদ্রোহের কারণ হিসেবে দেখানো হয় দেশী ধর্মান্ধ সৈন্যদের এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ(যাতে গরু ও শুয়োয়ের চর্বি মাখানো টোটার গুজব উঠেছিলো) ব্যবহারে অসন্তোষ।আনুগত্যই একজন সৈনিকের সর্ববৃহৎ বৈশিষ্ট্য ও কর্তব্য।শৃঙ্খলিত জীবন থেকে সরে এসে এই মহাবিদ্রোহ ঘটানোর কারণ শুধুই এটুকু? ইতিহাস তারাই লেখে যারা বিজয়ী হয়।এক্ষেত্রেও সাম্রাজ্যবাদীরা তাই করেছে,তারা জয়ী হয়ে পরাজিতদের দেখিয়েছে হিংস্র,রাজদ্রোহী বিভীষিকা হিসেবে।দিল্লী,কানপুর,অযোধ্যা, লক্ষ্ণৌ,মীরাট,এলাহাবাদ,পাঞ্জাব,ঝাঁসি,পাটনা জুড়েই ছিলো বিদ্রোহের মূল পটভূমি।এছাড়াও পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে এর প্রভাব পড়লেও বড় বড় সংগ্রাম এই এলাকাতেই হয়।আজিমুল্লাহ খাঁ,শহীদ মঙ্গল পাণ্ডে,মৌলবী আহমেদ শাহ,মুহাম্মদ আলী,তাঁতিয়া টোপী,ঝাঁসির রানী,ফিরোজ শাহ,বেগম হযরত মহল ইত্যাদি ব্যক্তিত্বের কথা ইতিহাস ভুলে যায় কারণ তারা পরাজিত।বীরভোগ্যা বসুন্ধরা তাদের স্মৃতি রাখতে চায় না। সত্যেন সেনের "মহাবিদ্রোহের কাহিনী" ছোটো হলেও তথ্যসমৃদ্ধ।ভারত ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহকে বিস্মৃতি ও বিকৃতির গর্ভ থেকে উদ্ধার করার জন্যই বইটি রচিত।