হুয়ান কর্টেয ওরফে সাবাডিয়া। দুই জাতির রক্ত বইছে ওর শরীরে। চোখের তারায় পিস্তলবাজের কঠিন দৃষ্টি। কিন্তু সাবাডিয়া পিস্তলবাজ নয়। ওদিকে টেক্সাসের ছোট্ট এক শহরে দানা বেঁধে উঠেছে হিংসা - অপেক্ষা করছে বিপদ। সাবাডিয়ার জন্যে। আগাগোড়া অ্যাকশনে ভরপুর। রুদ্ধশ্বাসে পড়ে শেষ করার মতো বই।
রওশন জামিল বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন লেখালেখির করার অনুপ্রেরণা। জীবনে প্রথম লেখা ক্লাস ফাইভে। স্কুল ম্যাগাজিনে। এর পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আবার শুরু পত্রিকায় রিপোর্ট/ফিচার লেখার মধ্যদিয়ে, যখন তিনি মাস্টার্সে পড়েন। লেখালেখির পাশাপাশি তার আরো একটা পেশা আছে সেটা হলো সাংবাদিকতা। স্ত্রী গৃহিণী, দুই সন্তানের জনক তিনি। বড় ছেলে ও ছোট মেয়ে নিয়ে তার পরিবার।
সেবা প্রকাশনীতে তার প্রথম বই বই প্রকাশিত হয় কাজীদার সাথে যৌথ ভাবে ১৯৮৫ সালের জুন মাসে দাগী আসামী-১ দিয়ে। পরবর্তিতে দুইটি কিশোর ক্লাসিক হাকলবেরি ফিন প্রকাশিত হয় ফেব্রয়ারী ১৯৮৬ এবং দ্বিতীয়টি দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী নভেম্বর ১৯৮৭তে প্রকাশিত হয়। এছাড়া শিশু ক্লাসিক পিটারপ্যান-ও তিনি লিখেন ১৯৮৯ সালে।
তিনি ছিলেন ওয়েস্টার্ন সিরিজে একজন সফল লেখক। প্রথম ওয়েস্টার্ন বই "ফেরা" প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। ওসমান পরিবার এবং সাবাডিয়া নামের সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। সেবা প্রকাশনীতে তার একক ভাবে ৩৫টিরও বেশি ওয়েস্টার্ন বই বের হয়।
১৯৯৪ সাল পর্যন্ত নিয়মিত লিখলেও সে বছর আমেরিকায় প্রবাসী হলে বিরতিতে চলে যান তিনি। তবে সাবাডিয়ার ফেরা, না-ফেরা বই এর মধ্য দিয়ে তিনি আবার লেখায় ফিরেন ২৪ বছর পর ২০১৮ সালে। আর এর আগে ২০১২ সালের ঈদসংখ্যা ইত্তেফাকে ওসমান পরিবারকে ফিরিয়ে আনেন "সেই ওরিন ওসমান" নামে একটি উপন্যাসিকার মাধ্যমে।
সেবা ওয়েস্টার্নের অন্যতম একজন নায়কের আবির্ভাবের গল্প, এবং প্রথম গল্পেই বাজিমাত। সাবাডিয়া চরিত্রটির পরের গল্পগুলো যারা পড়েছেন, তারা জানেন যে, দুর্দান্ত একটা সিরিজের প্রতিশ্রুতি বৃথা যায়নি।
এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মত দুর্দান্ত এক ওয়েস্টার্ন! সাবাডিয়ার আগমন, আর প্রথম গল্পেই বাজিমাৎ। সচরাচর ওয়েস্টার্ন গুলোর মত খুব সাদামাটা ভাষাও না, ভাষা, শব্দ আর বাক্যের প্রয়োগ মিলিয়ে বেশ একটা সাহিত্যিক আমেজ আছে, বুঝতে পারা যায় রওশন জামিলকে কেন ওয়েস্টার্ন লেখকদের সেরাদের কাতারে ফেলা হয়। বাথান শুরু করতেই হচ্ছে।
'শয়তানের চেহারা সে নিজেই যখন শনাক্ত করতে পেরেছে তখন সাবাডিয়ার সামনে কি আর কোন পথ খোলা আছে? এই শয়তানের বিরুদ্ধে কি সাবাডিয়া চিরদিন লড়ে আসছে না! দেশ যাই হোক তার বিশ্বাসটা কি বদলে যাবে তাই বলে- হুয়ান কর্টেয সাবাডিয়া।'
নতুন বোতলে পুরনো মদ। সাবাডিয়াকে ফিরিয়ে আনার জন্য বেঙ্গল বুকসকে ধন্যবাদ।
যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলে না, তারা মুক্তির স্বাদ কখনো পায় না।
মানুষ মুক্তির খোজ করে থাকে। সব সময় ছুটে বেড়ায় ইচ্ছায় অথবা বাধ্য হয়ে। এই ছুটে বেড়ানোর জন্য তার নিজের কোন ঠিকানা হয় না। সে শুধু খুজে ফেরে নিজেকে নয়ত নিজের অস্তিত্বকে। আসলে জীবন কখন কিভাবে মোড় নেয় কে বলতে পারে না। হয়ত জীবনের নিয়ম হঠাৎ করেই বদলে যায়।
নিজেকে পরিবর্তন করতে হয় সময়ের প্রয়োজনে। সময়ের সাথে, অথবা সময়ের পথে চলার জন্য হলেও নিজেকে কিছুটা স্থির করতে হয়। যদিও স্থিরতার জন্য কারো কারো জীবনে অনেক পরিবর্তন চলে আসে। তবে সেই স্থিরতা সব সময়ের জন্য নয়, কিছু সময়ের জন্য মানুষ জড়িয়ে যায় অন্য কারো লড়াইয়ে।
এই লড়ায় বা যুদ্ধে সব সময় দুটি পক্ষ থাকে। কে সঠিক আর কে ভুল, আর কারটি ন্যায় বা কারটি অন্যায় সেটা আসলে সব সময় বোঝা যায় না। তবে হ্যা, ন্যায়ের সাথে সব সময় অবিচল অটল থাকে সত্য। তাই সত্যের পথে সব সময় বাধা বিপত্তি আসে। ন্যায়ের জন্য লড়াই করতে হয়, আর অন্যায় সব সময় সবার সামনে উজ্জল হয়ে থাকে। সত্যের জন্য, ন্যায়ের জন্য সব সময় মানুষকে লড়াই করেই বাচতে হয়েছে। প্রাণের বাজি ধরতে হয়েছে।
একজন বিপ্লবী বা একজন দেশ থেকে বিতাড়িত মানুষ। যে ন্যায়ের পথে চলছে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। মাথা উচু করে বাচতে চেয়েছে। যেখানে অন্যায় হয়েছে সেখানে সে প্রতিবাদী কন্ঠ হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু তবুও আজ তাকে নিজের দেশ, নিজের মানুষদের ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে। হারাতে হয়েছে সব কিছু, অথচ সবাই তাকে জানে, চেনে। ক্ষমতা আর টাকার কাছে যে হেরে গিয়েছে। যার ন্যায় ও সত্য হারিয়ে গিয়েছে ক্ষমতা আর টাকার কাছে। সেই মানুষটি খুজে চলেছে নিজের স্বত্ত্বাকে, হারিয়ে ফেলা মানুষটিকে। আর মানুষটি হচ্ছে হুয়ান কর্টেজ সাবাডিয়া।
কোলি একটা ছোট শহর যেখানে মানুষ শান্তিপূর্ন ভাবে বসবাস করে। সেখানেই হঠাৎ কে একটি খুনের ঘটনা ঘটে। যেই খুনটি করে দেশের বা শহরের অন্যতম ধনী ব্যক্তি স্যল পিটমানের ছেলে, লুকাস পিটম্যান। প্রায় ২৫ জন মানুষের সামনে এই ঘটনাটি ঘটে। তবুও যেন ক্ষমতা আর টাকার কাছে সবাই জিম্মি। তবুও এবার কোন ছাড় নয়। লুকাসকে ধরে জেলে দেয়া হয়।
জাজ আসবে তার বিচার হবে। তবে শহরের মানুষ সময় দিতে নারাজ। কিন্তু জো টম্পসন যেই শপথ নিয়েছে সত্য আর ন্যায়ের সেখান থেকে সে সরে আসতে পারে না। অপরাধীর শাস্তি শুধু মাত্র আইন এবং আদালতের। এখানে আবেগের কোন মুল্য নেই। শেষ পর্যন্ত ন্যায় বিচার হবে, কোলির মানুষ কি পারবে খুন হয়ে যাওয়া মেয়েটার জন্য সত্য এবং ন্যায় বিচার আনতে। নাকি এবারও ক্ষমতা আর টাকা জিতে যাবে।
অবশেষে শেষ করলাম “সাবাডিয়া” সিরিজের প্রথম বই “প্রত্যয়”। এটি লিখেছেন রওশন জামিল। মুলত এই গল্পটি নেয়া হয়েছে আমেরিকার লেখক ও চিত্রনাট্যকার রিচার্ড জেসাপ এর লেখা “সাবাডিলা” এই সিরিজ থেকে। বাংলায় এই লেখা এই ওয়েস্টার্নটির মুল নায়ক হচ্ছে হুয়ান কর্টেজ সাবাডিয়া, যে একজন বিপ্লবী ও প্রতিবাদী একজন মানুষ। যাকে তার দেশ মেক্সিকো থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে। এখন সে শুধু ছুটে বেড়ায়। খুজে চলে নিজের সাথীদের। হয়ত আবার সে ফিরে যেতে পারবে। নয়ত পারবে না। তার ছুটে চলার কোন অন্ত নেই।
হয়ত এটাই এখন তার জীবন। আর এই জীবনের সাথেই জড়িয়ে যায় কোলি শহর। যে অন্যায়কে প্রশয় দিতে জানে না। সে অন্যায় দেখে চুপ করেও থাকতে পারে না। এজন্যই হয়ত তার এই শহরে আসা। নিজের অস্তিত্বকে খোজার জন্য। নিজে আদর্শকে বাচিয়ে রাখার জন্য। তারা লড়াই না যেনেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় সে। হয়ত কিছুটা হলেও সে নিজে ফিরে পাবে এই আসায়।
সাবাডিয়া সিরিজের প্রথম গল্পটি চরিত্র তুলে ধরতে দারূণ। সাবাডিয়ার চরিত্র বা হুয়ান কর্টেজ সাবাডিয়া যে একজন মানুষ, তার চারিত্রিক দিক দারূণ ভাবে ফুটে উঠেছে। এছাড়া ক্ষমতা আর টাকার কাছে সব কিছুই যে নত হয়ে যাবে। হেরে যাবে সবাই টাকা এবং ক্ষমতার কাছে।
ওয়েস্টার্ন এর প্রধান বা মুল দিক হচ্ছে ঘোড়া, পোশাক, স্যালুন এবং বন্দুক। যেখানে আইন শুধু বন্দুক দিয়ে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। তবে তবুও কিছু মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। তাদের কাছে আইন ন্যায় এবং সত্য সব কিছুর মুল্য রয়েছে। তাই তারা দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সঠিক বিচার এবং ন্যায়ের জন্য লড়া করে থাকে। আর এই ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সাবাডিয়া জড়িয়ে যায়।
রওশন জামিল এর লেখা এই ওয়েস্টার্নটি এডভেঞ্চার এর মুল ধরা বজায় রেখেছে। তবে গল্পটি খুব ধীর গতিতে শুরু হয়। যাদের অভ্যাস নেই তারা কিছুটা বিরক্ত হবেন। এছাড়া গল্পের এডভেঞ্চার শুরু হতে বেশ সময় লাগে। তাই ধীর গতি পড়তে হয়। আপনি যদি ভেবে থাকেন একশন ভরপূর একটা থ্রিলার এডভেঞ্চার পড়বেন তবে কিছুটা হতাশ হতে পারেন। কিন্তু শেষের দিকে যত এগিয়ে যাবেন গল্প বেশ টানটান উত্তেজনা চলে আসবে।
কিছুটা সিনেমাটিক বা ড্রামাটিক মনে হবে কিছু কিছু জায়গাতে তবে সেটা গল্পের ধারা থেকে সরে যায়নি। মানবিকতা, মুল্যবোধ, অন্যায়ের সাথে আপোষহীন থাকা এই গল্পের অন্যতম দিক। এছাড়া অপরীধ হলেও তার ন্যায় বিচার পাবার অধিকার আছে।
যদি ন্যায়ের লক্ষ্যে জীবনও চলে যায় তবে সেটাই হোক। সত্য এবং ন্যায়ের পথ থেকে সরে যাওয়া যাবে না। যতই বাধা বিপত্তি আসুক, সত্য, ন্যায় এবং আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। এটাই জীবনের সত্য।