কি? জীবনবীমার টাকাগুলো চাই-ই বুঝি তোমার? পারবে তুমি আত্মহত্যাকে খুন হিসেবে প্রমাণ করতে? সে খুনের দায় তোমার নিজের কাঁধে চাপবে না তো? যদি বাঁচতে চাও, পপি, লোভাতুর ওই শ্যেনদৃষ্টি সরিয়ে নাও তোমার স্বামীর টাকা আর আমার ব্যায়াম-পুষ্ট দেহের উপর থেকে। লোভ কোরো না পপি- লোভে পাপ হবে, পাপে মৃত্যু!
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
খান জাহাঙ্গীর। শহরের নামকরা চলচিত্র পরিচালক। ঘরে তাঁর সুন্দরী স্ত্রী পপি। বিশাল বাড়ি-গাড়ি। তবুও সুখে নেই জাহাঙ্গীর সাহেব। সবাই তাকে এক নামে চিনে। কিন্তু এখন মদ খেয়ে খেয়ে তাঁর জীবন নিঃস্ব হয়ে এসেছে। প্রচুর দেনা হয়েছে তাঁর। এর মাঝেই রোকন নামের একজন রোড অ্যাকসিডেন্ট থেকে বাচাল। এ জিনিসটা পছন্দ হল না পপির। কারণ জাহাঙ্গীর সাহেব যদি মারা যান তাহলে জীবনবীমার সাত লক্ষ টাকা পাবে সে।
কিন্তু সহজেই কি পপি পাবে সে টাকা, রোকন কি সব কিছু জেনে শুনে চুপ করে থাকবে। নাকি পপির রূপের কাছে ধরা দিবে সে। লোভ এবং পাব শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে? কারণ যদি প্রমাণ করা যায় যে খান সাহেব খুন হয়েছেন তবেই কেবল টাকা পাবে পপি।
রোকন। সৎ নিষ্ঠাবান ছেলে। যোগ্যতা অনুসারে চাকুরীর খোঁজ সে পাচ্ছে না। গল্পটা যদিও ৭০ দশকের বাট বাস্তবতা মনে হয় সব সময়ই একই রকম। শেষ পর্যন্ত ভাগ্যগুনে বিখ্যাত(!) চলচিত্রকার খান জাহাংগীরের সেক্রেটারি হিসেবে চাকুরী পায় সে। ভাবে যে ভাগ্যের চাকা এবার মনে হয় ঘুরল। কিন্তু তার চাকুরীদাতার নামে খোঁজ নিতেই জানতে পারল যে সময় বেশী নেই তার হাতে। গলা পর্যন্ত দেনায় ডুবে আছে, আর গলা পর্যন্ত মদ গিলে পড়ে থাকে সে। আছে এক আলিসান বাড়ি আর এক অসম্ভব রূপবতী স্ত্রী। কিন্তু স্ত্রীর লক্ষ্য যে খান জাহাংগীরের জীবন বীমার টাকার উপরে। রোকন এক অসম্ভব কাজ হাতে নিল খান জাহাংগীরকে বাচানোর। কিন্তু নিজেই ফেসে গেল এক এলাবোরেট জালে। যতই জাল ছিড়ে বের হতে চায় ততই যেন জাল আরো আকড়ে ধরে তাকে।
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধকর টান টান উত্তেজনা। প্রতি পেজে এমন কিছু না কিছু ঘটনা আছে যা শঙ্কায় রাখবেই যে এর পরে কি ঘটে। যদিও লাস্টে কিছুটা ড্রামাটিক বাট সময়ের চেয়ে লেখক অনেক এগিয়ে ছিলেন মানতেই হয়। সবচেয়ে মজা লেগছে ৭০ দশকের ঢাকার বর্ননা। অনেকটা টাইম ট্রাভেলের এক্সপেরিয়েন্স দিবে।
হ্যারল্ড রবিন্স আর জেমস হেডলি চেজের কাহিনিকে বঙ্গীকৃত করার কুটির শিল্পটি একসময় দুই বাংলাতেই রীতিমতো বিকশিত হয়েছিল। তবে এই ঘরানায় সেরা গদ্যশিল্পী হিসেবে নির্দ্বিধায় কাজী আনোয়ার হোসেন-কে চিহ্নিত করা চলে। দারুণ গতিময় গদ্যে ষড়রিপুর জালে বন্দি ছোটো-বড়ো মাকড়ষা আর তাদের শিকারদের ছুটোছুটির এই আখ্যানটি পড়তে বসলেও ছাড়া অসম্ভব। তবে শেষটা বেখাপ্পাভাবে মিলনান্তক। আসলে এই কাহিনি যেভাবে শেষ হওয়া উচিত ছিল, সেভাবেই শেষ করেছেন সমরেশ মজুমদার তাঁর 'জালবন্দি' কাহিনিতে। তবে এটা পড়তেই পারেন। লকডাউন মন্দ কাটবে না।
পুনর্পাঠ। বই পড়তে গিয়েও যে মাংশপেশি আড়ষ্ট হয়ে যায়, আবার টের পেলাম। দমবন্ধ উত্তেজনা আর তার সাথে পাতায় পাতায় বাঁক।
টুপিখোলা অভিনন্দন ফর কাজীদা।
তবে তিনি উপসংহারে কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রতি অতটা সদয় না হলেও পারতেন, আফটার অল, 'সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো' ব্যাপারটা রূপকথার সাথেই কেন যেন বেশি যায়। . . অফটপিকঃ সত্তরের দশকের গুলশান এলাকাটার কথা ভাবছি; কাঁচা রাস্তা, শুনশান পরিবেশ, জঙ্গল...... আর এখন.......!
সিনেমা জগতের সফল পরিচালক খান জাহাঙ্গীরকে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনলো রোকন। বিনিময়ে কপালে জুটলো খান জাহাঙ্গীরের ড্রাইভারের চাকরী। খান সাহেবের সুন্দরী স্ত্রী পপি, শুরু থেকেই সহ্য করতে পারছে না রোকনকে। কেন? জবাব মিলবে বইটি পড়লে। এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলার মতো একটি বই।
দ্বীপ বিভীষিকার পর পাপে মৃত্যু আমার 2nd সেবা ফেবারিট। অনেক সুন্দর ভাবে আস্তে আস্তে স্টোরিটা বিল্ড করা হয়েছে। লেখা অনেক আরামসে পড়া যায়। বইয়ের কাহিনী প্রথমে আচ করা যায় না, ধীরে ধীরে বোঝা যায় কী হচ্ছে। মাঝখানের টুইস্টটা একেবারে নকআউট পাঞ্চের মতো আমাকে আঘাত করেছে। পুরো বইটা আমি এক বসাতেই শেষ করে ফেলি। সবার জন্য মাস্ট রিড।😊