যদিও বিভূতিভূষণে বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে নতুন করে আপনারা তাঁর প্রশংসা শুনতে চাইবেননা৷ তারপরও আমার দিক থেকে কেমন লেগেছে তাঁর লেখার ভঙ্গি সেটা একটু তুলে ধরার চেষ্টা করি৷
আফ্রিকার জঙ্গের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বর্ণনাগুলো তিনি খুব চমৎকারভাবে দিয়েছেন। শঙ্কর যখন দুর্বোধ্য সেই জঙ্গলে পদে পদে বিপদে পড়ে তার বর্ণনা তিনি যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন তা যেন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো বারংবার। সত্যি কথা বলতে আমি বেশ উপভোগ করেছি লেখকের চমৎকার লেখনী৷
আফ্রিকা জঙ্গল সবসময় ভয়ঙ্কর; তার অন্যতম কারন হচ্ছে এই জঙ্গলের হিংস্র প্রাণী৷ লেখক কয়েকটা অদ্ভুত হিংস্র প্রাণী'র কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলো বেশ রোমাঞ্চিত করেছে আমায়৷ তাছাড়া কিছু পাহাড় পর্বতের কথাও খুব স্পষ্ট করে তিনি উল্লেখ করেছেন৷
গল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো বেশ চমৎকারভাবে সাজিয়েছেন লেখক বলতেই হয়। প্রধান চরিত্র হিসেবে শঙ্করের সাহসিকতা, উদ্যম, জেদ সবকিছু লেখক স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন—যা আমাকে খুব করে মুগ্ধ করেছে।
তারপর যে চরিত্রের কথা বলবো, সেটি হচ্ছে ডিয়েগো আলভারেজ৷ যে কি-না শঙ্করের রহস্যপুরী অভিযানের সঙ্গী হয়েছিলো । এই চরিত্রটি আমায় বেশ টেনেছে৷ ডিরেগো আলভারেজের মতো সাহসিক দূর্দুর্ষ ভ্রমণপিপাসুর গল্প শুনতে শুনতে বারবার আমার মনটা শ্রদ্ধায় বরে উঠেছিলো তার প্রতি ৷
আত্তিলিও গাত্তি নামক চরিত্রটি লেখক ছোট্ট করে গল্পে এনেছিলেন৷ কিন্তু এই এইটুকুতেই তার গল্প শুনে আমি বারংবার শিউরে উঠেছিলাম৷ সত্যি কথা বলতে—শঙ্কর, ডিয়েগো আলভারেজ, আত্তিলিও গাত্তি—এই তিনটি চরিত্রকে লেখক বেশ মাথা খাটিয়ে তৈরি করেছেন এবং বেশ সফল হয়েছেন বলা যেতে পারে। এই তিনটি চরিত্রই আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। শঙ্করের প্রতি আমার মুগ্ধতা, ডিয়েগো আলভারেজের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আত্তিলিও গাত্তি মনে দাগ কেটেছে আমার মনে।
বইটি ছিলো আমার কাছে বেশ সুখপাঠ্য—তা লাগার যথেষ্ট কারণ রয়েছে৷ বইটা পড়ার সময় একবারের জন্যেও বিরক্ত লাগেনি৷ যেন এক নিমেষেই পড়ে ফেলেছি এমন লেগেছে। লেখকের স্পষ্ট বর্ণনাশৈলী কী দূর্দান্ত ছিলো তার কথা তো বলেছিই আগে, তাছাড়া চরিত্রগুলো যেভাবে সাজিয়েছে—চরিত্রগুলোর সাথে যেন আমি আটকে গিয়েছিলাম৷ শঙ্করের পদে পদে বিপদ; আর সেই বিপদ তাঁকে যেভাবে গ্রাস করছিলো, আর অন্যদিকে শঙ্করের সাহসিকতা সবমিলিয়ে রোমাঞ্চিত করেছে আমাকে৷
এরকম ভয়ানক রহস্যপুরীর অভিযানের গল্প আমাকে পদে পদে মুগ্ধ করেছে। বারবার পড়ার মতো একটা বই৷ বইটা পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে আমি যেন শঙ্করের দূর্দুর্ষ অভিযানের সাথে আঠার মতো লেগে আছি; একটুর জন্য চোখ নড়াবার অবকাশ পাইনি।
সবমিলিয়ে আমার পাঠক জীবনের অন্যতম প্রিয় একটি বই হয়ে থাকবে—চাঁদের পাহাড় উপন্যাসটি৷
বইয়ের ভালো লাগার মতো একটি লাইন :
❝ছাঁদের আলসের দিব্যি চৌরস একখানা টালি হলে অনড় অবস্হায় সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকার চেয়ে স্ফটিক প্রস্তর হয়ে ভেঙ্গে যাওয়াও ভালো, ভেঙ্গে যাওয়াও ভালো, ভেঙ্গে যাওয়াও ভালো।❞