কারোর কাছে তিনি নাস্তিক,কারোর কাছে প্রিয় কবি/লেখিকা,কারোর কাছে তিনি নির্বাসিত ঘৃণিত ব্যক্তি,অপ্রিয় লেখিক। তবে কার কাছে তিনি কেমন,তার পুরোটাই নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের ওপরে।তবে,তিনিও একজন মানুষ,আর দশটি সাধারণ মানুষের মতো তারও রয়েছে একটি ব্যক্তিজীবন,যার সাথে লেখিকা জীবনের রয়েছে ভিন্নতা।তসলিমা নাসরিন ব্যক্তিজীবনে কীরকম তা জানা যায় তার আত্মজীবনীমূলক বইগুলোতে,যেখানে তার ছোটবেলা থেকে আজকের নারীবাদী,বিতর্কিত লেখিকা হবার বা তার ডাক্তার হবার অনেক কাহিনি উঠে আসে।তার আত্মজীবনী গুলো সাজানো আছে সাতটি খন্ডে,যার দ্বিতীয় খন্ডটি হলো উতল হাওয়া।
উতল হাওয়া বইটিতে তার মাধ্যমিক থেকে মেডিকেল জীবনের কাহিনি উল্লেখিত হয়।এবং তার লেখালেখির অনুপ্রেরণার কাহিনিও রয়েছে।রয়েছে তার কিশোরীজীবনে আসা সেই পুরুষটির কথা যার উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা তাকে সাহিত্যজগতে স্থান করে দেয়।তিনিও অনেকের কাছে দেবতা,কারোর কাছে প্রেমের কবি আবার অনেকের কাছেই প্রতিবাদী কবি।সেই পুরুষটি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।তবে,সকলের কাছে তার এইরূপটি যেমন,ব্যক্তি রুদ্র হিসেবে তার অনেক অজানা তথ্য আছে এই বইটিতে যা পড়ে হয়তো কারোর কাছে মনে হতে পারে,খ্যাতিমান এই কবির সাথে অবিচার করা হচ্ছে।কিন্তু,এটাও মনে রাখা উচিত ব্যক্তি রুদ্র আর কবি রুদ্র দুটি সত্তা একদম ভিন্ন,তেমনি ব্যক্তি তসলিমা আর লেখিকা তসলিমার দুই ক্ষেত্রে ভিন্নতা বিরাজমান,তাই কাউকে ভিন্নতার মাধ্যমে বিচার করা উচিত নয়।একটি রক্ষণশীল পরিবারে থেকেও ভালোবাসার টানে সব ছেড়ে চলে আসা সেই রুদ্রর কাছে থেকে যা কিছু উপহার পেয়েছিলো তা ছিল যেমন খুবই সুখকর,তার চেয়েও অনেক বেদনাদায়ক।
তার রক্ষণশীল পরিবার তাকে নারীবাদী করে তুলতে বাধ্য করে।তার পুরুষতান্ত্রিক পরিবারে বাবা তাকে ও তার ছোটবোনের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা দিয়েছিলেন তা নিতান্তই নামেমাত্র বাবার ইচ্ছা পূরণের মাধ্যম হিসেবে ফুটে ওঠে।কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ইচ্ছা,স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দেয়নি।পরিবারে তার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে সর্বদা লাঞ্ছনার স্বীকার হতে হয়।এমনকি তার বাবার পরনারী প্রীতি বহুবার হাতেনাতে ধরা পরে তার মায়ের কাছে।কিন্তু তবুও মুখ ফুটে কিছু বলে প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছেন।তাকে,তার মা ও বোনের ওপর ভাইদের পাশাপাশি যেভাবে নিপীড়িত আচরণের সাক্ষীদার করে,তার প্রতিফলনের ফলাফল পরবর্তীতে নারীদের নিয়ে তার মত প্রকাশ অনেককে গভীর ভাবে নারীজাগরণের পাশাপাশি শ্রুতিকটু হিসেবেও অভিহিত করে।
তারপর আসে তার প্রেম ও বিয়ের প্রসঙ্গ।উতল হাওয়া বইটিতে তার প্রেম ও বিয়ে অংশটি দেখা যায়।যেখানে একটি রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও,তারচেয়েও বড়কথা একটি নামকরা পরিবারের মেয়ে হয়েও শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে সব খ্যাতি,মান যশ ছেড়ে চলে আসে সেই রুদ্রের কাছে।সেই রুদ্র,যে কিনা যৌনরোগে আক্রান্ত ছিল,সেই রুদ্র যার জীবনটা নানারকম বদঅভ্যেসের কারণে শেষ পর্যায়ে তিলেতিলে শেষ করে দিয়েছিল,সেই রুদ্র যে মদ ও পতিতালয় ছাড়া একমুহূর্তের জন্যও স্বাভাবিক থাকতে পারতোনা।শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে চালচুলোহীন একটি বিশৃঙ্খল মানুষকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসে সে চলে এসেছিল রুদ্রর কাছে।চেয়েছিলেন একটি সুন্দর পরিবার,একটি ভালোবাসার জগৎ,একটি ফুটফুটে সন্তান।যে মায়া ও স্বপ্নের বাঁধনে তসলিমা রুদ্রকে বেঁধে সংসার গড়তে চেয়েছিল,তাতে দুরত্ব আর অবহেলার দেয়াল তৈরি করে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাকে খানখান করে ভেঙে ফেলে সেই রুদ্র।
তিনিও আর সাধারণ অন্য মেয়েদের মতোই মেয়ে আর তার জীবনেও রয়েছে অনেক সুখকর ও দুঃখজনক মুহুর্ত।আমাদের উচিত নয় একজন মানুষের ভিন্ন চরিত্র গুলোকে একত্রে করে ফেলা।তাই কবি হিসেবে রুদ্র/তসলিমাকে আর ব্যক্তিগত জীবনে ব্যক্তি হিসেবে তাদেরকে এক করে দেখা।ব্যক্তি হিসেবে তসলিমার বিস্তারিত জানতে হলে অবশ্যই তার আত্মজীবনী গুলো জেনে তারপর বিচার করাকে আমি অধিক শ্রেয় মনে করি।