২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র বিভাগের সদর দপ্তরে পাঠানো গোপনীয় তারবার্তার ভাণ্ডার থেকে ৭৩টি নির্বাচিত তারবার্তার হুবহু বাংলা অনুবাদ রয়েছে এ বইতে। আছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত একটি পর্ব ২০০৭ ও ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও তার নেপথ্যের অনেক অজানা কথা। এই তারবার্তাগুলো রাজনীতি-অর্থনীতিসহ বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের প্রামাণ্য দলিল।
Mashiul Alam was born in northern Bangladesh in 1966. He graduated in journalism from the Peoples’ Friendship University of Russia in Moscow in 1993. He works at Prothom Alo, the leading Bengali daily in Bangladesh. He is the author of a dozen books including Second Night with Tanushree (a novel), Ghora Masud (a novella), Mangsher Karbar (The Meat Market, short stories), and Pakistan (short stories).
' ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রধানমন্ত্রীর ( শেখ হাসিনা) কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এমনকি অভিজ্ঞতা চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। ' - ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের গোপন তারবার্তা
২০০৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো ৭৩ টি গোপন তারবার্তা নিয়ে মশিউল আলমের বই 'উইকিলিকসে বাংলাদেশ'। 'প্রথমা' প্রকাশিত বইটিতে জুলিয়ান আ্যসাঞ্জ ও উইকিলিকস নিয়ে অনবদ্য একটি ভূমিকা লিখেছেন মশিউল আলম।
যে তারবার্তাগুলো নিয়ে এই বই তা কখনো ফাঁস হওয়ার কথা ছিল না। তাই ধরে নেওয়া যায়, মোটামুটি খোলামেলা মনে মার্কিন দূতাবাস নিজ দেশে এখানকার পরিস্থিতি ও ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে কথা বলেছেন।
তারেক রহমানসহ জোট সরকারের প্রভাবশালী সকল সদস্যকে নিয়ে মার্কিনিদের মূল্যায়ন পাবেন। এখন ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত হলেও জোট সরকারের তখনকার একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কনডমের চালান আটকে দিয়ে দুর্নীতি করার ঘটনা উল্লেখ তারবার্তায় রয়েছে। সরকারের ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বয়ান তারবার্তাগুলোতে রয়েছে। যেমন: তারেক জিয়াকে আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ ও উদ্ধতস্বভাবের ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এইচ টি ইমাম সম্পর্কে লেখা হয়েছে,
' দুর্নীতিবাজ হিসেবে ইমামের খ্যাতি রয়েছে। '
বাংলাদেশের গুণীজনের অনেকেই মার্কিন দূতাবাসে দৌঁড়ান। বেগম জিয়ার আমলে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ছিলেন ড. কামাল সিদ্দিকী। তিনি নিয়মিত মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করতেন। খোলামেলাভাবে সরকারের অনেক তথ্য দিতেন। শুধু বেসরকারি আমলাশ্রেণি নয়, সাবেক সেনাপ্রধানসহ সামরিক আমলাদের ভিড় থাকতো ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে। ঘরের বউয়ের সাথ লোকে এত সরলভাবে কথা বলে না, যত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে আমাদের নামিদামি রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ীশ্রেণি কথা বলতেন মার্কিনিদের সাথে। তাতে রাষ্ট্রের কোনো গোপন খবর তাদের অজানা থাকত না।
তত্ত্বাবধায়কের সময় সেনাবাহিনীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো দূতাবাসের। সেনাবাহিনীর বড় কর্তারা মন খুলে কথা বলতেন মার্কিনিদের সাথে। তাতে তাদের চিন্তাজগৎ অনেকটাই জানা যায়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে একধরনের 'মৌন সমর্থন' দেয় সেনাকর্তৃপক্ষ। ড. গওহর রিজভীর মধ্যস্থতায় সজীব ওয়াজেদ জয় ও ডিজিএফআইয়ের মধ্যকার বৈঠকের কথা মার্কিন নথির মাধ্যমে জানা যায়। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. রিজভীকে ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সরকারের ওপর মার্কিনিদের চাপ ছিল। দুই নেত্রীকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে একাধিক দূতাবাস মার্কিনিদের ভূমিকা রাখার অনুরোধ করে। তারবার্তায় দেখা যায়, বিএনপির ব্যাপারে ভারত একদম উৎসাহী নয়। মোটকথা , দলটিকে তারা ক্ষমতায় দেখতে চায় না - এমন মনোভাব স্পষ্ট।
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী যে-কোনো পাঠকের জন্য একটি রত্ন বিবেচিত হতে পারে 'উইকিলিকসে বাংলাদেশ'। ভূমিকার কলেবর সংক্ষিপ্ত করে আরও বেশি তারবার্তা যুক্ত করলে ভালো হতো। সবগুলো তারবার্তা সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। একবসায় পড়ার মতো বই না এটি। তবে, বেশ তথ্যবহুল।
বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ আর সামরিক কর্মকর্তারা হলো বিচ্ছু শিশু, ঝগড়াঝাটি করে মধ্যস্থতার জন্য সকাল-বিকাল বিজ্ঞ গুরুজন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দ্বারস্থ হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ আর বিএনপিকে চেক এন্ড ব্যালেন্সের মাঝে রাখার জন্য তৃতীয় শক্তি হিসেবে আছে মার্কিন দূতাবাস, জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার ব্যাপারটা কাজীর গরুর মতোই শুধু কেতাবে আছে।
বাংলাদেশে যে বিরোধীতার-স্বার্থে-বিরোধীতার রাজনীতি, প্রবল পারস্পরিক বিদ্বেষের রাজনীতি - খুব প্রকট ও করুণভাবে ফুঁটে উঠেছে এসব ফাঁসকৃত কূটনৈতিক তারবার্তায়।