যিরূশালেমকে কেন্দ্র করে “অভিশপ্ত নগরী” উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে। কিন্তু এর কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুতে রয়েছে ইহুদী জাতির পতনের সময়কার তার সমাজব্যবস্থা, ধর্ম, রাজতন্ত্র এবং সর্বোপরি রাজতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্রের মধ্যে বিরোধের নিগূঢ় ভাষ্য। ইহুদী জাতি কালের আক্রমণে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে দেশে দেশে সমুদ্রের মধ্যে ক্ষুদ্র দ্বীপের মত এক স্বতন্ত্র জগৎ গড়ে তুলেছে। বস্তুত ইহুদীদের ঐ দ্বৈপায়ন চরিত্র অনুধাবন তাবৎ বাইবেলের নির্যাসকে আত্মস্ত করা থেকেই সম্ভব। উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে এখানেই লেখকের কৃতিত্ব। “অভিশপ্ত নগরী” যিরূশালেমের পতনের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু একখানি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। এখানে ইহুদী সমাজের ধারাবাহিক ট্র্যাজেডির পেছনে সমাজের কোন কোন শক্তি কিভাবে কাজ করেছে; রাজতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্রের মধ্যে ক্ষশতার দ্বন্দ্ব; ধর্মের আচার অনুষ্ঠানসর্বস্ব অন্তঃসারহীনতার বিরুদ্ধে বিবেকের বিদ্রোহ-এখানে যা নবী যেরেমিয়ার প্রত্যাদেশে উচ্চারিত; সংক্ষেপে রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও নবী-এই ত্রিমুখী সংঘাত ইহুদী সমাজের বৈশিষ্ট্য-তার নিখুঁত বিশ্লেষণ এখানে সমুপস্থিত।
সেন, সত্যেন (১৯০৭-১৯৮১) সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক। ১৯০৭ সালের ২৮ মে মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ি উপজেলার সোনারঙ গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতৃব্য ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব আচার্য।
সত্যেন সেন সোনারঙ হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস (১৯২৪) করে কলকাতা যান এবং সেখানকার একটি কলেজ থেকে এফ.এ ও বি.এ পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ (ইতিহাস) শ্রেণীতে ভর্তি হন। কিন্তু যুগান্তর দলের সদস্য হিসেবে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি ১৯৩১ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন এবং জেলে থেকেই বাংলা সাহিত্যে এম.এ পাস করেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের (১৯৩৮) পর বিক্রমপুরে ফিরে তিনি কৃষক আন্দোলনে যোগ দেন এবং আমৃত্যু বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। সত্যেন সেন ১৯৪৯, ১৯৫৪, ১৯৫৮ ও ১৯৬৫ সালে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেন।
সত্যেন সেন ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদ-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে সত্যেন সেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সংগঠক এবং উদীচী (১৯৬৯) সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত ও গণসঙ্গীতের সুকণ্ঠ গায়ক এবং গণসঙ্গীত রচয়িতা।
সত্যেন সেন সাহিত্যচর্চা শুরু করেন পরিণত বয়সে এবং অতি অল্পসময়ের মধ্যে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ: উপন্যাস ভোরের বিহঙ্গী (১৯৫৯), অভিশপ্ত নগরী (১৯৬৭), পদচিহ্ন, (১৯৬৮), পাপের সন্তান (১৯৬৯), কুমারজীব, (১৯৬৯), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯), পুরুষমেধ (১৯৬৯), আলবেরুনী (১৯৬৯), মা (১৯৬৯), অপরাজেয় (১৯৭০), রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ (১৯৭৩); ইতিহাস মহাবিদ্রোহের কাহিনী (১৯৫৮), বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম (১৯৭৬), মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে (১৯৬৯), ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা (১৯৮৬); শিশুসাহিত্য পাতাবাহার (১৯৬৭), অভিযাত্রী (১৯৬৯); বিজ্ঞান আমাদের এই পৃথিবী (১৯৬৭), এটমের কথা (১৯৬৯); জীবনী মনোরমা মাসীমা (১৯৭০), সীমান্তসূর্য আবদুল গাফফার খান (১৯৭৬) ইত্যাদি।
চিরকুমার সত্যেন সেন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রগতিশীল ও গণমুখী চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্যসাধনা করেন। তাঁর রচনায় ঐতিহ্য, ইতিহাস, দেশের মাটি ও মানুষের শ্রেণী-সংগ্রাম প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি উপন্যাসের জন্য ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৭০) লাভ করেন।
১৯৮১ সালের ৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনএ তাঁর মৃত্যু হয়।
রিকমেন্ডেশনে আমার লাইব্রেরিয়ান ভাই। এর আগে সত্যেন সেনের 'পদচিহ্ন' উপন্যাসটি পড়েছিলাম। ভাইকে পাঠানুভুতি প্রকাশ করার সাথে সাথে হাতে ধরায় দিল এই জিনিসটা। বেশ সাচ্ছন্দেই পড়তে থাকলাম। কাহিনী এমনভাবে ছুটছিল ইচ্ছাই হচ্ছিল না বইটা রেখে অন্য কাজ করি।
অভিশপ্ত নগরী যিরূশালেমের পতনের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু একখানি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। ইহুদী সমাজের ধারাবাহিক ট্র্যাজেডির পেছনে সমাজের কোন কোন শক্তি কিভাবে কাজ করেছে; রাজতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্রের মধ্যে ক্ষশতার দ্বন্দ্ব; ধর্মের আচার অনুষ্ঠানসর্বস্ব অন্তঃসারহীনতার বিরুদ্ধে বিবেকের বিদ্রোহ-এখানে যা নবী যেরেমিয়ার প্রত্যাদেশে উচ্চারিত; সংক্ষেপে রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও নবী-এই ত্রিমুখী সংঘাত ইহুদী সমাজের বৈশিষ্ট্য-তার নিখুঁত বিশ্লেষণ এখানে সমানভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক।
ইহুদী জাতি তথা তাদের কেন্দ্রীয় নগরী জেরুজালেম বহু নবী প্রাপ্ত হয়ে আশীর্বাদধন্য, আবার একই সঙ্গে সীমাহীন অবাধ্যতার কারণে অভিশপ্ত। স্বর্ণময়ী কিন্তু কদর্য অনাচারে লিপ্ত জেরুজালেমের ওপর তাই বারবার নেমে এসেছে শাস্তির খড়্গ। মিসরীয়, বাবিলীয়, ক্যালদীয় বাহিনী যুগে যুগে অত্যাচার চালিয়েছে এর ওপর। সত্যেন সেনের এই উপন্যাসের মর্মবস্তু ইহুদী জাতির পতনের সময়ে এর সমাজে রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও জিহোভার নবীর মধ্যে যে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব চলছিল সেই বিরোধের স্বরূপ ও পরিণতি। মিসর ও বাবিল, দুই চিরশত্রু পরাশক্তির মাঝখানে ফাঁদে পড়া জেরুজালেমের রাজনীতিও এর উপজীব্য। মূল চরিত্র নবী জেরেমিয়ার একনিষ্ঠ জিহোভাপ্রেম, শেষ জীবনে অন্তর্দ্বন্দ্ব গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুর। লোকপ্রধান অহিকম, তাঁর পত্নী জিল্লা, পুত্র গেদালিয়া, এরাও অন্যতম প্রধান চরিত্র। কাহিনীর ব্যপ্তি বিশাল, রাজা যিহোয়াকীমের সময়ে বাবিলরাজ নেবুকাডনেজারের যুগে যুগে ইয়াহুদা অভিযান থেকে অবশেষে বাবিলের সেনাবাহিনীর নির্মম হাতে জেরুজালেম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত চিত্র এঁকেছেন লেখক। জটিল প্রবাহগুলোকে মাঝেমাঝে ছেদ করে গেছে ক্রীতদাস বিদ্রোহের সূত্র। মনে রাখতে হবে, ঐতিহাসিক উপন্যাস শেষ পর্যন্ত উপন্যাসই। বাইবেলীয় চরিত্রগুলোকে ঔপন্যাসিক যে দৃষ্টিকোণ তাঁর উপন্যাসের জন্য প্রয়োজন সেভাবে এঁকেছেন।
To be honest , I did not enjoy reading this book .However , it is a historical novel which is written by Satyen Sen . This book has not been edited dexterously .I figured out a lot of spelling mistakes in this book . I am highly frustrated with editor . Looking forward to reading "Alberuni "
জেরুজালেমে আর ইহুদি জাতিকে জানার জন্য একটু হলেও সাহায্য করবে। কিভাবে পুরোহিতরা সাধারণ জনগনকে ধোঁকা দেয় নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য সেটাও এই বইতে দেখানো হয়েছে ।