’বাবর’ উপন্যাসটি রচিত হয়েছে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, প্রাচ্যে সুপরিচিত গীতিকবি ও প্রবলপ্রতাপান্বিত সম্রাট জাহিরুদ্দিন বাবরের জীবন ও কাব্যসম্ভার নিয়ে। একই ব্যক্তির চরিত্রের মধ্যে কবি ও শাসক এই দুই বিপরীতধর্মী গুণের মিলন কী করে সম্ভব তা এই উপন্যাসে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন পিরিমকুল কাদিরভ। উপন্যাসটি পড়ে পাঠক বুঝবেন নিজের হৃদয়কে দ্বিধাবিভক্ত করতে গিয়ে কী প্রচণ্ড মূল্য দিতে হয়েছে বাবরকে আর শেষ পর্যন্ত তা কি দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে আসে তাঁর জীবনে। উপন্যাসের প্রায় প্রতিটি চরিত্রিই ঐতিহাসিক, একমাত্র ব্যতিক্রম--কৃষক তাহির, যে পরে বাবরের দেহরক্ষী হয় আর বাবরের চরম দুর্দশার দিনে ও তিনি যখন বিরাট ক্ষমতাসম্পন্ন শাসক হন তখনও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী। তাহিরের চোখ দিয়েই আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে মহান উজবেক কবি ও শাসকের প্রতিমূর্তি।
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সুপারিশ না করলে, 'রাজা-বাদশাহদের জীবন কাহিনীতে আর কী থাকবে যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়া!' জাতীয় কিছু একটা ধরে নিয়ে এই বইটা হয়তো পড়াই হতো না কখনও।
বিষয়বস্তু নিয়ে খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনা না করাই ভালো। তবে যতটুকু না বললেই নয় ততটুকু বলেই ফেলি! পুরোপুরি 'সুখপাঠ্য' না হলেও অত্যন্ত 'সুপাঠ্য'। কারণ বাবরের জীবনীতে যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকবে না তা তো সম্ভব নয়। সহিংসতার বিবরণও আছে বেশ কিছু। তাই সুখের খানিক হানি ঘটে। তবুও পৃথিবীর তাবৎ রাজ-রাজড়াদের তুলনায় বেশ কিছু বিচারে মুঘল সম্রাট বাবরের জীবনকথা অবশ্যই আলাদা। কারণ সম্রাট বাবর একজন কবিও বটে।
যুদ্ধের ইতিহাস তো সাধারণত বিজেতারাই লিখে থাকে। ফলে সেগুলি প্রায় সবক্ষেত্রেই বিজয়ীর প্রশস্তিতে ভরপুর হয়। কিন্তু বাবরের জীবনী লিখতে গিয়ে তেমনটা হবার খুব উপায় নেই। কেননা প্রত্যাখ্যাত এবং প্রতারিত হওয়ার যন্ত্রণা, বারংবার যুদ্ধে পরাজয়, স্বপ্নভঙ্গ, মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হবার অপমান-অসহায়ত্ব এসব কিছুর বর্ণনাই বাবর নিজেই তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধ জয়ের না হলেও, আত্মজীবনী রচনায় এই মৌলিকত্ব রক্ষার প্রশংসাটুকু অবশ্যই বাবরের প্রাপ্য।
তবে মনে রাখতে হবে যে এই বইটা কিন্তু জীবনীগ্রন্থ না। ইহা একখানা ঐতিহাসিক উপন্যাস। জীবনী যতই আকর্ষক হোক না কেন শুধু একটার পর একটা ঘটনা বিবরণী লিখে গেলেই তো আর উপন্যাস হয় না। দরকারী বাড়তি আঠাটুকু সেজন্য অবশ্যই পিরিমকুল কাদিরভের কৃতিত্ব।
আরেকটা ব্যাপার। পড়তে পড়তে প্রায় শেষ দিকে এসে খেয়াল হয়েছে যে কোথাও তো আটকাইনি ভাষার কারণে। কাব্যংশগুলির ক্ষেত্রেও নয়। বাদবাকি প্রগতি, রাদুগার বইগুলির মতোই অসাধারণ অনুবাদ!
এই বইটা যেন সমরখন্দের বিখ্যাত রুটি ছিড়ে ছিড়ে হরিণের মাংস, টক দই আর শস্য দিয়ে বানানো উজবেক সুরুয়া "মাস্তাভা"য় ভরিয়ে খাওয়ার মতন।
১১ দিন ধরে এই মহাকাব্যের অর্ধেকটা শেষ করলাম। জাহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, তিনি কি একজন শাসক? নাকি তিনি একজন কবি? নাকি তিনি সেই কতিপয় মানুষদের একজন যারা কিনা দুটোই আত্মস্থ করতে চেয়েছেন এবং অনেকাংশেই পেরেছেন।
পিতার আকস্মিক মৃত্যু, মাত্র ১২ বছর বয়সে ফরগানার শাসনভার হাতে এসে পড়ার মতো বিনা মেঘে বজ্রপাত, বালক শাসককে নিজের মতো চালানোর জন্য মহলের বেগদের দুরভিসন্ধি ও চক্রান্ত, যুদ্ধ, তখতের জন্য পরিবারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়া কি নেই এতে?
বইটার প্রায় সব চরিত্রই ঐতিহাসিক। ব্যতিক্রম, কুভার কৃষক যুবক তাহির, নিয়তি যাকে নিয়েও মেতে ওঠে নিষ্ঠুর খেলায়। তার চোখেই অনেকাংশে দেখানো হয়েছে সবকিছু।
এত সব স্বার্থপরতা, শঠতা, বিপদে একা ফেলে দেওয়া, ক্ষমতার জন্য মানুষে মানুষে হীনতা বাবরকে কষ্ট দেয়, তাই তিনি মুক্তি খোজেন শায়েরির খাতায়। তার মনোকষ্টের পুরোটা পরিষ্কার হয় এই ভাবনায়,
"হায়, খালি পায়ে হাটলেই যদি সব মিটে যেত"
আসে জয়, পরাজয়, বিপদ, মানবতা, আত্মত্যাগ, মানু্ষের বিচিত্র দিক। সবকিছু পেরিয়ে এখানে বাবর শুধুই শাসক নন, এছাড়াও তিনি হয়ে ওঠেন, "শায়ের বাবর"
এত সুন্দর অনুবাদ আমি আগে কখনো পড়িনাই, পড়বোও না মনে হয়। Must read at its peak level.
বাবরের জীবনী ভিত্তিক উপন্যাস। বাবরের পিতার মৃত্যু থেকে ক্ষমতালাভ, এরপর সমরখন্দ আক্রমণ, পরবর্তীতে সব দখল হারানোর সময়টুকু এখানে দেখানো হয়েছে। পড়ে বেশ ভালো লাগলো।
মির্জা উমর শেখ এর আকস্মিক মৃত্যুতে সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী জাহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর কিশোর বয়সেই বাদশাহ হওয়ার সুযোগ পায়। সুযোগ না বলে বরং দুর্ভাগ্যও বলা যেতে পারে। অপরিপক্ক বয়সে বিরাট দায়িত্ব নেওয়ার মতো পক্বতা বাবরের ছিল না, পাশাপাশি শত্রুরা ওৎ পেতে ছিল চারিদিকে। কিছুক্ষণ আগে যার বন্ধুদের সাথে হেসে খেলে দিন যাচ্ছিলো, পর মূহূর্তেই তাকে বিশাল দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হলো ঠিক এমনটাই ছিল কিশোর বাদশাহ বাবরের অবস্থা।
আন্দিজান ছেড়ে ওশ, ওশ থেকে সমরখন্দ শয়বানির দখল থেকে ছিনিয়ে বিজয়ের মুকুট অর্জন করা, আবার সমরখন্দ শয়বানির অধিকারে চলে যাওয়া,তারপর সমরখন্দ পেরিয়ে শূন্য হাতে স্বদেশ ছেড়ে যাযাবর জীবন বেছে নেওয়া এই ছিল একজন বাদশাহের কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত হওয়ার ফল। অর্থাৎ এটি এমন একটি চক্র যেখানে মৃত্যু ছাড়া থেমে থাকার সুযোগ নেই, ক্ষমতার চক্র এক হাত থেকে আরেক হাত বদল হতে থাকে কিংবা টিকিয়ে রাখতে দরকার হয় অফুরন্ত শক্তি আর রক্তের ছড়াছড়ি। জন্মসূত্রে বাদশাহ হওয়ার অধিকার বাবরকে চরম ভোগান্তিতে ফেলবে তা বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে উপলব্ধি করতে পারে। এই পথে অর্জনের সংখ্যা যেমন ছিল ব্যর্থতার সংখ্যাও ছিল বরং বাবরের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ওজন মাপা দুষ্করই ছিল বটে। কেননা ব্যর্থতার দিকে তার প্রিয় বোন খানজাদা বেগমের উৎসর্গ ছিল, ছিল সন্তান হারানোর বেদনা ও বিবাহ বিচ্ছেদ, ছিল প্রিয়জনদের অপঘাতে মৃত্যু, ছিল বেগদের বিশ্বাসঘাতকতা।
বাদশাহরা চিরকাল নিমজ্জিত থাকে কীভাবে ক্ষমতা বর্ধিত করা যায় তা নিয়ে কিন্তু বাবরের আরেকটি দিক ছিল তার সৃষ্টিশীলতা, সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। নতুন ভবন, মাদ্রাসা, মসজিদ নির্মাণে ছিল তার অসীম আগ্রহ। তৈমুর বংশের এই শাসকটির ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি দিক।
ইতিহাস পাঠ করলে বোঝা যায় কোনো শাসক নিষ্ঠুরতার উর্ধ্বে নয়। নিজের দখলদারিত্ব বজায় রাখতে হলে তাকে নৃশংস হতে হয়। তবে বইটির সবচেয়ে আতঙ্কের দিক হলো সে সময়কার পরাজিত দলের রাজা বাদশাহদের স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে যাদের বিজয়ী দলের রাজা ও দলের অন্যারা নিজের পছন্দ মতো বেছে নিতেন স্ত্রী হিসেবে এবং ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে এই রীতি বহাল থাকতো যেন তখনকার মেয়ে মানুষেরা ছিল একেকটি খেলনা যার মালিকানা বদল হতো কেবল। তবে সেই সময়কার এই জঘন্যতম ���ীতিটি কিন্তু লেখক কেবল বাবরের বিপরীত দলগুলোর বেলায় উল্লেখ করেছেন , তাহলে কি বাবরের হাতে শাসনভার এলে বাবর ও তার দলের লোকেরা এই রীতি অনুসরণ করতেন না? নাকি লেখক বাবরকে নিয়ে কিছুটা পক্ষপাতী ছিলেন। উল্লেখ্য বাবরের দলের বেগরা যে লুটপাট করতেন এবং বাবর তা অপছন্দ করতেন তা অবশ্য বইয়ে বলা আছে।
জহিরউদ্দিন বাবর কি শুধু ভারত বিজেতা যোদ্ধা নাকি এক রিক্ত হৃদয় কবি? বাবর নিজেই বাবর নামায় অনেক কথা লিখে গেছেন, পিরিমকুল এর লেখা চমৎকার ঝড় ঝরে ও অতিরিক্ত বর্ণনা মুক্ত। দারুন পাঠ।