🍂"এক অসীম শোক, অসহায়ত্ব আর সংশয় নিয়ে মধ্য রাত্রে উপন্যাস টা শেষ হয়ে গেলো।
রাত বারো'টা বেজে তিন মিনিট। ভিতর টা ঘামে ভিজে উঠেছে। শোক, সন্তাপ আর বেদনা। ভিতরটা ঝাঁ ঝাঁ করছে! কি এক ভীষণ অচেনা দুর্বলতা দিয়ে কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে বুকের চোরাগলি। শ্বাসকষ্ট!! বই টা এমন ভাবে শেষ না হলেও পারতো.....!! সোহম গাঙ্গুলী...... সাইনিং অফ!!!! শুভরাত্রি। আজ রাতে আর ঘুম আসবে না...."
গতকাল রাতে নিজের ডায়রির পাতায় এটুকু লিখে ঘুমাতে গিয়েছিলাম।
মনে আছে সেদিন বৃষ্টি পড়ছিলো। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম সমস্ত আকাশ মেঘে ঢাকা। সেখান থেকে অনবরত অবিরল ধারায় জলের ফোঁটা নেমে আসছে। বুঝলাম আজ আর পড়ায় মন বসবে না। কলেজ ছুটি। তাড়াহুড়ো নেই। বইটা লাইব্রেরী থেকে এনেছিলাম। আর খুব অদ্ভুত ভাবে তার ঠিক পরদিনই প্রফুল্ল রায় চলে গেলেন। অবশেষে "কেয়া পাতার নৌকো" খুলে বসলাম। তারপর ভেসে গেলাম.....
গত সাতটা দিন আমার কেটেছে এই বইয়ের সাথে। এক অসম্ভব ঘোরের মধ্যে আমার সেই পথ চলা.......
🍂 মনে আছে বছর দুয়েক আগে কালকূটের "কোথায় পাবো তারে" যখন পড়েছিলাম, তখন এক বুক দরিয়া নিয়ে ভেসে গিয়েছিলাম। আর এবার ভাসলাম পদ্মা- মেঘনা- ধলেশ্বরী তে।
পূর্ববঙ্গের রমণীয় রাজদিয়া কে কেন্দ্র করে এ কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। ভরা আশ্বিন মাস। নীলাকাশ। তার মধ্যে হালকা পালকের মতো মেঘ সমগ্র চরাচর জুড়ে ভেসে চলেছে। সামনের বাগান পেরিয়ে গেলেই পুকুর। তারপর জলে নিমজ্জিত আবিস্তৃত ধানক্ষেত। এখানে বর্ষার পর থেকেই মাঠে জল জমে থাকে। তখন আর নদী, পুকুর, মাঠ কিছুই আলাদা করে চেনা যায় না। কার্ত্তিক মাসের পর থেকে জলে ভাটার টান ধরতে শুরু করে। এ হলো গিয়ে জলের দেশ। যাতায়াতের অবলম্বন একমাত্র নৌকো। দুরে দুরে আশে পাশের গ্রাম গুলো একাকী বন্দিনীর মতো শামুখের মতো মাথা টুকু তুলে অথৈ জলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। জায়গায় জায়গায় পদ্মবন, শাপলা বন, কচুরিপানা। তার ওপরে জেগে থাকা কাউফলের গাছ, দুরে নলখাগড়ার ঝোঁপ, মূত্রাঝোঁপ। তার ওপর সারাদিন অসংখ্য পাখির গান গেয়ে চলা......!
পুজোর ছুটিতে অবনীমোহন তার রুগ্ন স্ত্রী সুরমা আর ছেলে মেয়ে সুধা-সুনীতি আর বিনু কে নিয়ে পাড়ি দেন তার মামাশ্বশুড়ের বাড়িতে। তারপর থেকেই বিশাল জল-বাংলার বুকে এক অচেনা অজানা ছোট্টো গ্রাম কে ঘিরে শুরু হয়ে যায় এই কাহিনীর বুনন। কাহিনী যতোই এগোয়, সময়ের সাথে সাথে জল বাংলার সাথে পরিচিতি ততই বাড়তে থাকে। ভরা আশ্বিন, বিজন হেমন্ত, প্রসন্না বর্ষা কে বুকে নিয়ে জল-বাংলা চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। অনেকেই বলে থাকে "কেয়া পাতার নৌকো" তে দেশভাগের বর্ণনা খুব কম, তাই কোনোভাবেই এই উপন্যাস দেশভাগের ওপর রচিত আকর দলিল নয়। সেসব বিষয় অনেক পরের, আমি কেবল বলি জল-বাংলার আকর্ষণীয় রমনীয় রূপ কে জানবার জন্যই এ বই আপনার একবার হলেও পড়া প্রয়োজন।
🍂 শরৎচন্দ্রের "শ্রীকান্ত" উপন্যাস আমি তখন পড়েছিলাম, যখন আমি আমার কৈশোরে পা রাখিনি। তারপর থেকে বহুকাল সে বই আমার প্রিয় উপন্যাস ছিলো। সেই কম বয়সের আবেগে ইন্দ্রনাথ তখন আমার কাছে এক রঙিন চরিত্র। শ্রীকান্ত নয়, বরং ইন্দ্রনাথই আমায় বাধ্য করেছিলো শ্রীকান্ত উপন্যাসের পাঠ এগিয়ে নিয়ে যেতে। ঠিক তেমন এই "কেয়া পাতার নৌকো" - উপন্যাসে এসে আমি পেলাম যুগল কে। জল-বাংলার অসীম রহস্য, পদ্মা - মেঘনা - ধলেশ্বরীর জলের নীচের সমস্ত গোপন রহস্য যার জানা, তার কাছে কত মাছ ধরার কৌশল, সুন্দি কাউঠ্যা কিভাবে মারতে হয়.... সবকিছু যার হাতে মুঠোয়! সে চোখ বেঁধে দিলেও ভরা কুয়াশায় কিংবা হেমন্তের সন্ধ্যেয় সাত মাইল দূরের সুজনগঞ্জের হাটে গিয়ে ঠিক ঠিক নৌকা বেয়ে উঠতে পারে! বিনু মুগ্ধ হয়ে দেখে! জল বাংলার কত নাম না জানা ফুল-ফল, কত নাম না জানা পাখির ডাক, কত নৌকোর নামের সঙ্গে যে তার পরিচিতি ঘটে! একমাল্লাই, দো মাল্লাই, কোষা, মহাজনী আরও কত কি! জল-বাংলার যাবতীয় শেখার ভাঁড়ার যেন সে উপুর করে দেয় বিনুর ওপর। কাহিনীর এক জায়গায় এসে যুগল নিজেই স্বীকার করেছে যে সে জল ছাড়া বাঁচবে না। কেবল সেই তাড়নায় সে একসময় রাজদিয়া ছেড়ে ভাটির দ্যাশে পাড়ি দেয়.... দেশভাগ হওয়ার পর এপার বাংলায় এসেও কলকাতার কাছাকাছি জায়গা পাওয়া সত্ত্বেও দূরে মুকুন্দপুরে উঠে আসে কেবল সেখানে বিল আছে বলে!!
শুধু কি যুগল, কাহিনী এগোনোর সাথে সাথে প্রবল ব্যাক্তিত্বময় সেই প্রৌঢ় হেমনাথ, তার স্ত্রী স্নেহময়ী স্নেহলতা যার দুয়ার থেকে কেউ কোনোদিন দু মুঠো অন্ন না খেয়ে ফিরে যায়নি, ঝিনুক, ভবতোষ, রামকেশব, অধর সাহা, নিত্য দাস, মজিদ মিঞা, শিশির, ত্রৈলোক্যনাথ, আনন্দ, হিরণ, ঝুমা, আশু দত্ত, আরও কত মানুষ যে উপন্যাসের মধ্যে এসে মিশে গেছে সময়ের সাথে সাথে....! অবিরল মানুষ আর মানুষের মধ্যেকার সম্প্রীতি দেখতে দেখতে যাওয়া। নাহলে কেনোই বা মজিদ মিঞা অবনীমোহনের কলকাতা ছেড়ে রাজদিয়ায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে তাকে চাষবাস করার জন্য তিরিশ কানি জমি বিনামূল্যে দিয়ে দিতে চায়?
কামারপাড়া, কুমোরপাড়া, যুগীপাড়া, কমলাঘাটের হাট, সুজনগঞ্জের হাট এসব কে ঘিরে কাহিনী যতোই এগিয়েছে, সময়ের সাথে সাথে বড়ো হয়ে এসেছে..... বিনু। তার সাথেই চলেছে বিনুকে ঘিরে ঝুমা কিংবা ঝিনুকের মধ্যে টানাটানি, আনন্দ-সুনীতি অথবা হিরণ-সুধার ভালোবাসা।
🍂 তারপর তো কেবলই ভাঙন!! সব রমণীয় রূপ, সব ভালোবাসা, সব টানাপোড়েন অতিক্রম করে যুদ্ধ আসে। কোনো এক হেমন্তে সুরমা'র ঘোর জ্বর আসে। অবনীমোহন কে ডেকে বিজন সন্ধ্যেয় সে জানায়, "আমি আর এ বিছানা ছেড়ে উঠবো না, মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দাও!"। সুনীতি-সুধার বিয়ে হয়ে যায়! তার কিছুদিন পরেই হঠাৎ এক ভোরে সুরমা জল বাংলার মায়া ত্যাগ করে অনন্তের উদ্দেশ্যে মিশে যায়। পড়ে থাকে কেবল একটুকু ছাই! স্ত্রীর মৃত্যুর পর অবনীমোহন, যুদ্ধের কনট্যাক্টরি নিয়ে বার্মা চলে যান। সুনীতি তার শ্বশুরবাড়ি কলকাতায়। যুগল তো আগেই গিয়েছিলো! এমনকি হেমনাথের সাধের হিরণও একদিন রাজদিয়া কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে, যুদ্ধের বড়ো অফিসার হওয়ার জন্য সুধা কে নিয়ে কলকাতায় পাড়ি দেয়।
যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু কেউ ফিরে আসে না.... তারপর একসময় এসে পরে দেশভাগ। দ্বিতীয় পর্বের মধ্যভাগ থেকে এসে উপন্যাস নিদারুণ রঙ বদলায়। চেনা মানুষ দের অচেনা মানুষে বদলে যাওয়া, যেখানে ছিলো সম্প্রীতি, সেখানে জায়গা করে নেয় নিরঙ্কুশ ঘৃণা। যে হেমনাথের কথা রাজদিয়ায় কেউ ফেলতে পারতো না, তার কথা অমান্য করে আমেরিকান টমি আর নিগ্রো সৈন্য দের জন্য গড়ে ওঠে মদের দোকান। কালোবাজারি, মেয়ে পাচারে ছেয়ে যায় পুরো দেশ। কালো পয়সার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে নেমে আসা মন্দা। চারিদিকে হাহাকার, অভাব, সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণা। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, চোখের সামনে ফসল কেটে নেওয়া, যুবতী মেয়েদের লুন্ঠন। সে এক উত্তাল সময়!!
🍂 মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের "পদ্মা নদীর মাঝি" যখন পড়েছিলাম, তখন হোসেন শাহ কে দেখে আমার বড়ো রহস্যময় মানুষ বলে মনে হয়েছিলো। সমস্ত অবমাননা, সমস্ত অপমান, কথা চালাচালি কোনো কিছুকে ভ্রূক্ষেপ না করে সে আপন মনে নিতান্ত অকারণে তার স্বপ্নের দ্বীপ তৈরী করে চলেছে। উপন্যাসের শেষে এসে মনে হয়েছিলো, "ঈশ্বরও তো তাই!!"। তার কোনো কাজেরই কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। -- " ভাঙিছ গড়িছ নীতি ক্ষণে ক্ষণে../নির্জনে প্রভু নির্জনে" -- "কেয়া পাতার নৌকো"য় এসে.... তেমন আমি পেয়েছি লালমোহন কে। ভদ্রলোকের আসল নাম লালমোর, আয়ারল্যান্ডের অনাথ অধিবাসী সেই তিনি যুবক বয়সে এই জল-বাংলায় এসেছিলেন খ্রিস্টান ধর্ম প্রিচ করতে, তারপর এদেশের জল হাওয়া কে ভালোবেসে কাটিয়ে দিয়েছেন দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ টা বছর। প্রিচ করাও একসময় ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি, হেমনাথ বলেছিলেন, " তুমি তো ডাক্তার!! এদেশের মানুষের বড়ো অভাব, বিনা চিকিৎসায় তারা মারা যায়, তাদের সেবা করো, তার চেয়ে বড়ো ধর্ম নেই!" -- সেই থেকে শুরু হলো তার মানব সাধনা, দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে তিনি নিজের খেয়াল না রেখে অপরের খেয়াল রেখেছেন, বিনা পয়সায় চিকিৎসা করবার জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন, পাড়ি দিয়েছেন পদ্মা - মেঘনা - ধলেশ্বরী তে। কিন্তু যেদিন দাঙ্গায় এক নিরপরাধ মানুষ কে রক্ষা করতে গিয়ে হানাদার রা বললো, "পথ থেকে সরে যাও সাহেব, তুমি তো অবাঙালি, এ দেশের তুমি তো কেউ নয়" -- তিনি সহ্য করতে পারলেন না। হানাদার দের হাতে সড়কির বাড়ি খেয়ে মাথায় ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো। তারপর সেই যে তিনি বিছানায় পড়লেন আর উঠলেন না, মৃত্যু অবধি তীব্র জ্বরের মধ্যে বলে গেলেন, "হেমনাথ, ওরা বলেছে আমি নাকি এদেশের কেউ নই!!"
🍂 মনে পড়ে সেই জন্মদুখিনী মেয়েটার কথা যে নিজের মৃত্যুশয্যায় থাকা মা কে ঢাকায় দেখতে গিয়ে রায়ট থেকে ফিরে এলো বিধ্বস্ত হয়ে! তখন তার পরিচয় সে কেবল ধর্ষিতা। ছেলেবেলা থেকে সে ঘরে দেখে আসছে তার মা-বাবার মধ্যে মিল নেই। মা একরত্তি নিজের গর্ভের মেয়েটাকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন নিজের প্রেমিকের সাথে। তারপর'ই বাবা ভবতোষ এসে তাকে দিয়ে যায় হেমনাথ দের বাড়ি। সেখানেই সে বিনুর পাশাপাশি মানুষ হয়। উপন্যাসের প্রথম থেকে সে বিনুকে হিংসা করে গেছে ক্রমাগত। মুড়ি টা, গুড় টা, চিড়ে টা, দুধ ট���, মাছের বড়ো পিস টা এমনকি আদরের হেমনাথের ভাগ নিয়েও সে বিনুর সাথে যুদ্ধ বাঁধিয়েছে। খুব ভোরে হেমনাথ সূর্যপ্রণাম করতে বিনুকে ডেকে নিয়ে গেলে সে মুখ গুঁজে মাটিতে পড়ে থেকেছে তীব্র অভিমানে। হেমনাথ একসময় নিজেই ঝিনুকের প্রতি বলেছে, "হিংসের জ্বালা কত!!"। এমনকি ঝুমা যখন এসে কোনো আশ্বিনের নিভৃত দুপুরে বিনুকে নিয়ে নৌকো করে মাঝ জলে কাউফল পাড়তে গেছে, সে একাকী নিশ্চুপ হয়ে পুকুর পাড়ে বসে থেকেছে। দুপুরে স্কুল ছুটির পর বিনু যেন ঝুমাদের বাড়ি তার সাথে দেখা করতে না যায়, তার মধ্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দশমীর রাতে যুগলের সাথে সুজনগঞ্জের হাটে রাত জেগে যাত্রা দেখতে গেলে সেখানেও সে বিনু আর ঝুমার আগে আগে গিয়ে নৌকায় উঠে বসেছে। বিনুকে নিয়ে সে ঝুমার সাথে এক অসম সংগ্রামে নেমেছে। তীব্র হিংসায় ভিতর থেকে জ্বলে পুড়ে গেছে, কান্নাকাটি করেছে, ভয় দেখিয়েছে। কাহিনীর এক পর্বে গিয়ে ঝিনুকের প্রতি বিরক্তই হয়েছি হয়তো!!..... সমগ্র কাহিনী জুড়ে ঝিনুক- বিনু - ঝুমার এক ত্রিকোণ অস্তিত্বের সংগ্রাম। ঝুমার প্রতি বিনুর অসীম আকর্ষণ, আরেকদিকে ঝিনুকের প্রতি তখর মমত্ববোধ, এই দুইয়ের মধ্যে টাল মাটাল পায়ে উপন্যাস এগিয়ে চলেছে।
🍂 কিন্তু যে রাতে সুরমা মারা গেলো, মিশে গেলো রাজদিয়ার জল হাওয়া মাটিতে, ভাসতে ভাসতে নিজের অস্তিত্বের সবটুকু মিলিয়ে দিলো পদ্মায়, সে রাতে পুরো রাজদিয়া ভেঙে পড়লেও আসে নি কেবল ঝুমা। বিনুর মায়ের মৃত্যুতে ঝিনুক যেখানে কেঁদে ভাসিয়েছে, ঝুমা সেখানে নিরাসক্ত, সে জানিয়েছে... এসব তার ভালো লাগে না!! উপন্যাসের এ জায়গা থেকে এসেই জানি না কেনো, ঝিনুকের প্রতি আমার পাঠক হিসেবে অসীম মমত্ব এবং ঝুমার প্রতি ঘৃণা বাড়তে থাকে!!
রায়টের ঘটনার পর থেকেই ঝিনুকের জীবন বদলে যায়। স্নেহলতা কে সে কেঁদে বলে, "আমার যে আর কিছুই নেই!" মোমের পুতুলের মতো মেয়েটা তখন শীর্ণ, জীর্ণ, বিধ্বস্ত, তাকে যেন খেয়ে রেখে গেছে অসংখ্য কিছু ঘৃণ্য জীব। তার বাবা ভবতোষ রায়াটেই মারা যায়, দিন পনেরো পর কোনো খোঁজ খবর না আসায় ঢাকা পুলিশের সাহায্য নিয়ে গিয়ে হেমনাথ তাকে রক্ষা করে! তারপর থেকেই তার ভয়, শঙ্কা.... বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, সারাক্ষণ একটা ঘরের কোণায় সে নিজেকে বন্দী রাখতো, অবিরল কান্না আর যন্ত্রণা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এরমধ্যে রাজদিয়া আবারও উত্তপ্ত হতে শুরু করে! ঝিনুক স্নেহলতা কে জানায় যে সে এখানে থাকলে মরে যাবে!! হেমনাথ কোনো উপায়ন্তর না দেখে ঝিনুকের পূর্ব জীবনের স্মৃতি মুছে দিতে বিনুর সাথে ঝিনুক কে কলকাতায় পাঠানোর উদ্যোগ নেয়।
কিন্তু সে এক উত্তাল সময়। পথে পথে হানাদার দের বাধা, উদ্বাস্তু সমস্যা, ঘৃণা, নৃশংসতা, সরকারের অসহযোগিতা... এসবকে মাথায় নিয়ে ঝিনুক কে নিজের বুকের মধ্যে আগলে রেখে সে তারপাশায় পাড়ি দেয়। পথে হানাদার রা তাদের আক্রমণ করে। নৌকা চুরি হয়ে যায়। পাড়ে আশ্রয় নিলে সেখানেও মুসলিম রা তাদের আক্রমণ করে! তখন চারিদিকে দেশ ছাড়ার ঢল। আফজল খান নামের এক সহৃদয়বান মুসলমানের সাহায্য নিয়ে তারা অবশেষে তারপাশা পৌঁছে যায়। সেখান থেকে স্টিমারে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে ট্রেনে শিয়লদহ। এই যাত্রা পথের বিবরণী যতই পড়েছি, গায়ে কাঁটা দিয়ে গেছে, আরও নতুন নতুন চরিত্র আর তাদের জীবনের কাহিনী এসে যুক্ত হয়েছে উপন্যাসে। অধর ভুঁইমালী, ভুবন দাস, হরিন্দ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ দের উচ্চপদস্থ চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিশাল জল-বাংলার এক অনামা গ্রামে মানবসম্পদ গড়ার কাজে নেমে পড়া প্রবীন মাস্টারমশাই রামরতন গাঙ্গুলি পর্যন্ত, কারোর ঠাঁই হয়নি সেই হিংসার বাংলায়। পাকিস্তানি চেকিং, ভিড়, হিংসা, রক্ত, স্বেদ পেরিয়ে কেবল রামরতনের মৃতদেহ টুকুই ভারতে এসে পৌঁছলো, কান্নায় ভেঙে পড়া তার স্ত্রী র কন্ঠস্বর শোনা গেলো অমৃত বাণীর মতো, "তার দেহ এলো এপার বাংলায়, কিন্তু তার প্রাণ টুকু তিনি ছেড়ে রেখে এলেন ওপার বাংলায়"।
কলকাতায় এসেও মা বাবা হারা জন্ম দুখিনী ঝিনুকের ঠাঁই হলো না কোথাও। বিনুর বড়দি সুনীতির শ্বাশুড়ী তাকে অচ্ছুত করে রাখলেন আলাদা একটি ঘরে। বুঝিয়ে দিলেন একজন ধর্ষিতা মেয়েকে কখনো গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কলকাতায় আসার পর থেকে নতুন করে ঝিনুক - বিনু - ঝুমার অস্তিত্বের সংগ্রামের সূচনা। ঝুমা ধর্ষিতা ঝিনুকের প্রতি আন্তরিক নয়। বিনু যে মেয়েটাকে সুদুর রাজদিয়া থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বুকে জড়িয়ে কলকাতা নিয়ে এলো, সে এখানে এসেও শান্তি পেলো না। বড়দি সুনীতির বাড়ি ছেড়ে ছোড়দি সুধার বাড়ি তে গিয়ে উঠলে সাময়িক স্বস্তি পেলেও, সুধার কাকাশ্বশুড় অথবা হিরণের জ্যেঠীমা বাড়ি ফিরে এলে কেউই ঝিনুক কে বাড়িতে গ্রহণ করে নিতে স্বীকার করবেন না। এমনকি কাহিনীর শেষে যে অবনীমোহনের ভরসায় ছিলো বিনু, সেও জানায় ঝিনুক কে গভর্নমেন্টের স্টে তে দিয়ে আসতে।
🍂 আমার বারবার এই বিশাল মহাকাব্যিক উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, শেষে এসে আমি এতখানি দুঃখ পেলাম কেনো। দেশভাগের ওপর, যন্ত্রণার ওপর এর আগেও তো আমি অসংখ্য উপন্যাস পড়েছি। এর আগে কখনো আমার এতখানি অস্বস্তি হয় নি। বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বুঝলাম, এ মহাকাব্যিক উপন্যাসে প্রফুল্ল রায় যে সবচেয়ে অসামান্য কাজটি করেছেন, তা হলো অসামান্য বিনির্মাণ। যে কারণে সুরমার মৃত্যু, লারমোরের মৃত্যু, যুগলের ছেড়ে যাওয়া, হিরণের ছেড়ে যাওয়া প্রত্যেকটা ঘটনা কি নিখুঁত ভাবে ছুঁয়ে গেছে আমায়!! সবাই দেশ ছাড়লেন, কেবল হেমনাথ ছাড়লেন না। তিনি বললেন, "এ দেশে যদি মরতেও হয়, তবুও মরবো! কিন্তু পূর্বপুরুষের ভিটে ত্যাগ করবো না"। তিনি আশাবাদী যে ভাষা আন্দোলন কে ঘিরে হিন্দু-মুসলমান রা আবারও হাতে হাত মিলিয়ে লড়বে, উত্থান হবে নব জাগরণ বাদের। বড়ো জানতে ইচ্ছে হয়, কেমন আছেন সেই হেমনাথ রা? তাদের অলিখিত পরিণতি কি হয়েছিলো?
🍂 এক অসীম যন্ত্রণা, অসহ্য অপমান, অবমাননা আর লাঞ্ছনা কে বুকে নিয়ে কাহিনীর শেষে ঝিনুক হারিয়ে যায়। হেমন্তের রাত্রিতে বিনু পাগলের মতো খুঁজে বেড়ায় ঝিনুক কে। মহানগরীর বুকে পাতলা সরের মতো কুয়াশা জমে আসে, দুরে গাড়ির আওয়াজ, কসবার সারি সারি আলো, মানুষের কোলাহল সব নিস্তেজ হয়ে আসে....... ক্রমশ!!
🍂 পড়ুন, "কেয়া পাতার নৌকো" অবশ্যই পড়ুন। এ বই আপনার কাছে সারাজীবন থেকে যেতে পারে জন্মদুখিনী ঝিনুকের মতো এক অসহ্য উত্তাল সময়ের যন্ত্রণা নিয়ে...!
📚কেয়া পাতার নৌকো। ✒বরেণ্য সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়। 🍁করুণা প্রকাশনী। মূল্য:- 750।
©️সোহম গঙ্গোপাধ্যায়।