কি আছে এই বইটাতে ? বইটা আসলে আমাদের এই বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকা নানান মিথ বা কিংবদন্তী ছোট সমাহার । যার প্রায় সবটুকুই ঐতিহাসিক সত্য (সবটুকু অবশ্যই নয় ) । কিন্তু এইসব সত্য ঘটনা গুলোর বর্ণনা নেই কোন ঐতিহাসিক দলিলে বা বইতে । যা শুধু আছে মানুষের অন্তরে । আর চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যুগ থেকে যুগে । বইটিতে আছে মোট ১৪টি অসম্ভব সুন্দর ঘটনা । যা সবার মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য ।
শামসুল ইসলাম বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন লোককাহিনীর খোঁজে। এই বইয়ে যে ১৪টি কাহিনী সঙ্কলিত আছে, এগুলো এমন সব গল্পের একটা অমূল্য সংগ্রহ, যার দাম হয়তো তারাই জানবেন যারা দাদীর মুখে শোনা দুর্লভ গল্পগুলোকে পরে আর কোনও বইয়ে বা ইতিহাসের ছাপা অক্ষরে কখনো খুঁজে পান নি। গাজী-কালু-চম্পাবতীর পুঁথি এখন তাও তদবির করলে পাওয়া যায়, আরামবাগের নর্তকীর সাথে বাকের খাঁ'র প্রণয়গাঁথা বেশি পুরনো নয়। কিন্তু সুলতানি আমলে বিজয় নদী আর গোমতী নদীর তীরে ত্রিপুরার রাজার সাথে গৌড়ের সুলতানের সেনাপতির দ্বৈরথের কথা আমি কখনো জানিনি এই এলাকার বাসিন্দা হয়েও। তেমনি হয়তো দিনাজপুরের মানুষ খুব একটা জানেনি, জেলা পরিষদ ভবনের আঙিনায় বৃষের মূর্তিটির বয়স যে আড়াই হাজার বয়স, যার সাথে জড়িয়ে আছে বানরাজার প্রত্যক্ষ ইতিহাস, যার নাম কি-না সাক্ষাৎ তারামন্ডলীতে স্থান পেয়েছে!
পাবনা, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুন্দরবন, সাতক্ষীরা, নোয়াখালী, সিলেটের বানিয়াচং - এইসব এলাকায় ছড়িয়ে থাকা লোককথাগুলো লেখক সংগ্রহ করেছেন স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে। মাঝি, চা-ওয়ালা, বাউল ফকির থেকে পথচারী হেন কারো উল্লেখের বাকি নেই যাদের মুখ থেকে লোককাহিনীর সন্ধান আসেনি।
বইয়ের ওজন সম্পর্কে আমারচেয়ে লেখকই ভালো বলেছেন, বইয়ের মুখবন্ধে-
"মানব মনের স্বেচ্ছা-প্রবাহিনী ধারাই হচ্ছে কিংবদন্তী। লোক-কাহিনী কিম্বা লোক-গীতিকেও এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। লোক-কাহিনী বা লোক-গীতি গড়ে উঠতে পারে হয়ত কিংবদন্তীর উপর ভর করে। কিন্তু লোক-কাহিনী ও লোক-গীতির আগমন যে পথে, কিংবদন্তীর পদয়াচ্রণা সে পথে নয়। এমন কি কিংবদন্তী ইতিহাসও নয়। একান্ত ভাবে দ্রষ্টব্যাশ্রয়ী কিংবদন্তী। কোন দৃষ্ট বস্তুর উপর মানবের স্বভাব্জ ভাব, আবেগ, কল্পনা ও শ্রুতির সংমিশ্রণে যে বস্তুর সৃষ্টি, তাই কিংবদন্তী। তাই কিংবদন্তীর জগতের আয়তন বিশাল এবং বহুমুখী। এই বিশাল পৃথিবীর সকল দৃষ্ট বস্তুর উপর মানব তার ভাব, আবেগ ও কল্পনাকে ছড়িয়ে দিয়েছে; এই সকল কিছুর উপরই কার্যকারণ খুঁজতে গিয়ে অতঃপর স্বাভাবিক নিয়মে কোন ঘটনার কল্পনা করে আত্নপরিতৃপ্তি চেয়েছে এবং তৃপ্ত হয়েছে। এই তৃপ্তিই কিংবদন্তির প্রাণ। এজন্যেই দেশ-কাল-পাত্রের সকল সীমানা ডিঙ্গিয়ে কিংবদন্তী হয় কালজয়ী। সময় এবং জলের গতিধারার মতোই কিংবদন্তী চিরপ্রবহমান। কিংবদন্তী মৃত্তিকাশ্রয়ীও বটে এবং এ স্থানেই কিংবদন্তী পেয়েছে তার বিশেষ পূর্ণতা। স্থান, পোড়ো অট্টালিকা, দীঘি, মসজিদ, মন্দির, বৃক্ষ, খাল, নদী, মাঠ - তাদের ইতিহাসকে উপজীব্য করে, নিজস্ব বুদ্ধি, বিবেক ও কল্পনায় পল্লবিত হয়ে গড়ে উঠেছে কিংবদন্তী। এসব কিংবদন্তীগুলো ইতিহাস না হয়ে অর্ধ-ঐতিহাসিক। তবে কিংবদন্তির সঙ্গে ইতিহাসের মূল পার্থক্য এখানে - ইতিহাস যেখানে নিশ্চুপ, কিংবদন্তী সেখানে মুখর। আপন নিয়মে বাঙ্ময় হয়ে উঠে। কিংবদন্তী দেশ ও জাতির সম্পদ। গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন কিং-বদন্তী সংগ্রহ করে আমি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করে আসছি। এ পর্যন্ত প্রায় অরধ-শতাধিক কিংবদন্তী সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। কাজ আমার চলছে আরো। 'বাংলাদেশের কিংবদন্তী' এই পরিকল্পনার প্রথম খন্ড হিসেবে আত্নপ্রকাশ করলো। 'বুক সোসাইটি'র কর্ণধার ও সাহিত্যিক অগ্রজ প্রতিম মোস্তাফা কামাল সাহেবের সহৃদয় আহ্বানেই সম্ভব হয়েছে এটা। এই সুযোগে তাঁকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই লেখাগুলোর জন্যে যাঁরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য যুগিয়েছেন তাঁদেরও কৃতজ্ঞতা জানাই।"
এই অমূল্য সঙ্কলনটা অনায়াসে গল্পের মতো পড়া যায়, বরং বলা চলে, মুগ্ধ হয়ে পড়তে হয় তার সাবলীল মন-উতলা করা গ্রামীণ স্বাদের বর্ণনাভঙ্গির জন্য। আপনার মনে না হবার কারণ থাকবে না, আপনি বইটা পড়ছেন কোনো নিরাক-পড়া সন্ধ্যায়, যখন বৃষ্টি থামা ঘাসের ডগা ছুয়ে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, হারিকেনের সলতেটা আলতো উসকে দিয়ে রাত-পোকাদের ডাকের সাথে মিলেমিশে যাচ্ছেন বইয়ের পাতায় পাতায়।
মিথ বা বিভিন্ন কিংবদন্তীর গল্প আমাদের সবারই ভালো লাগে যার প্রমান গ্রুপে মিথ নিয়ে কিছু পোস্টে পড়লেই দেখা যায় । এতদিন শুধুই বিদেশের নানান মিথি পড়েছি আমরা । কিন্তু আমাদের দেশে যে কিংবদন্তীর এত ঘটনা আছে তা কি আমরা জানতাম । আমি নিজেও তো জানি না এত কিছু । গতকাল নীলক্ষেতে পেয়ে গেলাম " বাংলাদেশের কিংবদন্তী - শামসুল ইসলাম " নামটা শুনেই ইন্টারেস্টিং লাগলো তাই কিনে ফেললাম । বাসায় এসে রাত ১ টায় বইট হাতে নিয়ে সব্ধ হয়ে গেলাম । ভেবেছিলাম রাতে দুই একটা গল্প পড়ে দেখি কেমন । কিন্তু বইটা হাতে যে নিলাম আমার আর হুঁশ হইলো না । একবারে বিভোর হয়ে পুরো বইটা পড়লাম ।
কি আছে এই বইটাতে ? বইটা আসলে আমাদের এই বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকা নানান মিথ বা কিংবদন্তী ছোট সমাহার । যার প্রায় সবটুকুই ঐতিহাসিক সত্য (সবটুকু অবশ্যই নয় ) । কিন্তু এইসব সত্য ঘটনা গুলোর বর্ণনা নেই কোন ঐতিহাসিক দলিলে বা বইতে । যা শুধু আছে মানুষের অন্তরে । আর চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যুগ থেকে যুগে । বইটিতে আছে মোট ১৪টি অসম্ভব সুন্দর ঘটনা । যা সবার মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য ।
" কমল বাওয়ালীর উপাখ্যান " হচ্ছে কমল নামের এক বাওয়ালী কন্যার নীল চাষের জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উপাখ্যান ।
" বংশাই নদীর ধারে " এক জমিদার পুত্রের সাথে এক পাটানী কন্যার করুন প্রেমের কাহিনী ।
" চলন বিলের মহর " হচ্ছে এক সময়ের ভয়ংকর ডাকাত মহর ডাকাতের মহত্ত্বের নিদর্শন ।
" কবি পাগলা কানাই " হচ্ছে মরমী কবি পাগলা কানাই এর কবি হওয়ার ঘটনা ।
"আরামবাগের নর্তকী" হচ্ছে এক সময়ের সম্রাট কুলি খাঁর পালক পুত্র বাকের খাঁর সাথে নর্তকী খনি বেগমের এক করুন প্রেম উপাখ্যান ।
" পুন্যবতীর দীঘি " হচ্ছে এক জন দরদী শাসকের তার প্রজাদের প্রতি দেওয়া এক প্রতিশ্রুতির পূর্ণতার ঘটনা । যা পালন করার জন্য দরকার হলে প্রয়োজনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রতিরোধ করা হবে । আছে এক নাবালক বীরের কাহিনী যাকে ইংরেজদের কামান ও ভয় পাওয়াতে পারেনি ।
বইটিতে আছে এই রকম আরো সুন্দর সুন্দর গল্প যেমন -
"মাইচম্পা দরগা" , "নিশীথে বাঁশরী বাজে ", " ঘুঘুদেহের বিল " , " একটি প্রেমের জন্য ", " বড়বন্দরের বড়কুঠি " , " হরিদাসীর গান " , " গোমতীর বাঁকে" , " দুলাল ও মদিনা "
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে - " কমল বাওয়ালীর উপাখ্যান " , "মাইচম্পা দরগা" " বংশাই নদীর ধারে " , "আরামবাগের নর্তকী" , " পুন্যবতীর দীঘি " , " একটি প্রেমের জন্য " ।
কিংবদন্তী বা লোকগাথা টাইপ বইয়ের একটা কমন সমস্যা থাকে যে লেখক বেশিরভাগ সময়ই নিজে পর্যাপ্ত গবেষণা না করেই লিখতে বসে যান। ফলাফলস্বরূপ লেখা হয় গদ-বাধা কিংবা কিংবদন্তির সাথে রূপকথা মিলে এক জগাখিচুড়ির সৃষ্টি হয় । এই বইটি এদিক থেকেই অনন্য। লেখক যথেষ্ট পরিমাণ গবেষণা করেই লিখতে বসেছেন এবং এই কারণেই কিংবদন্তীগুলোকে এত সুন্দরভাবে ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সাথে সংযুক্ত করতে পেরেছেন। এই তথ্যগুলি লেখার গতিকে সামান্যতম বাধা দেয়নি বরং করে তুলেছে উপভোগ্য।
খুলনা, সাতক্ষীরা, টাঙ্গাইল, পাবনা, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, বরিশাল, কুমিল্লা ও হবিগঞ্জের মোট ১৪টি কাহিনি নিয়ে শামসুল ইসলামের ১৯৭৫ সনে প্রকাশিত বই 'বাংলাদেশের কিংবদন্তী।'
'কিংবদন্তী' বলতে যা বুঝি তার সব উপাদানই উপস্থিত এই বইয়ে; কিছুটা মিথ, কিছুটা বাস্তবতা। উপরিপাওনা হিশেবে পেয়েছি শামসুল ইসলামের চমৎকার ভাষার বুনন।