Jump to ratings and reviews
Rate this book

নদী ও নারী

Rate this book
দার্শনিক-কবি-লেখক-রাজনীতিবিদ হুমায়ুন কবিরের একমাত্র বাংলা উপন্যাস ‘নদী ও নারী'। এর প্রকাশ সাল নিয়ে সংশয় আছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে, হুমায়ুন কবিরের একটি ইংরেজি উপন্যাস 'Man and River' ছাপা হয়েছিল ১৯৪৫-এ। ‘নদী ও নারী' উপন্যাসটির পটভূমি পদ্মাপ্রকৃতি এবং তার উপর ভেসে ওঠা চর। এর সমস্যাপট সেই নতুন সীমিত ভূখণ্ডটিতে মানুষের বেচে থাকার আবর্তন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, এই উপন্যাসের পদ্মা “বর্ষায় প্রখর, শরতে সুন্দর, কালবৈশাখীর ঝড়ের সন্ধ্যায় ভয়াল, অপমৃত্যুর আধার, প্রাণের পালয়িত্রী- আবার সুদীর্ঘ অনাবৃষ্টির পরে হঠাৎ বর্ষণে বন্যাস্ফীতা সর্বগ্রাসিনী”। অনবদ্য ভাষা এবং নদী-মানুষ-প্রকৃতি একাকার হয়ে উপন্যাসটির সরল আখ্যান একটি দার্শনিক মাত্রা পেয়েছে। দীর্ঘকাল পরে উপন্যাসটির প্রকাশ। এটি সাহিত্য-প্রেমিক পাঠকদের কাছে এক অমূল্য উপহার।

192 pages, Hardcover

First published January 1, 1952

11 people are currently reading
104 people want to read

About the author

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
10 (20%)
4 stars
17 (35%)
3 stars
12 (25%)
2 stars
5 (10%)
1 star
4 (8%)
Displaying 1 - 13 of 13 reviews
Profile Image for Yeasin Reza.
525 reviews92 followers
December 1, 2025
হুমায়ুন কবির ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার আশ্চর্য উদাহরণ। ' চতুরঙ্গ ' পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, তাঁর লেখা ' বাঙলার কাব্য' বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের অন্যতম মূল্যবান সংযোজন, হয়েছিলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী। তবে দুঃখের ব্যাপার তিনি সাহিত্যের উপর রাজনীতি কে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ' নদী ও নারী ' হুমায়ুন কবিরের একমাত্র উপন্যাস। প্রায় বিস্মৃত এই উপন্যাসটি যখন বের হয়েছিলো তখন ভালোই আলোচনা আর সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। বুদ্ধদেব বসু বেশ সমালোচনা করে ' চতুরঙ্গ ' পত্রিকায় লেখা লিখেছি়লেন , মুর্তজা বশীরের চিত্রনাট্যে ১৯৬৫ সালে চলচ্চিত্রে চিত্রায়িতও হয়। কিন্তু কোন এক অদ্ভুত কারনে বাংলা সাহিত্য সমালোচকেরা নদী ভিত্তিক উপন্যাসের আলোচনা ও তালিকায় উক্ত গ্রন্থের কোন উল্লেখ করেন না।

সত্তর বছর আগে লেখা এই উপন্যাসের ভাষা আমার কাছে বিস্ময়করভাবে সজীব মনে হয়েছে। অন্যান্য নদী ভিত্তিক উপন্যাস থেকে বেশ ব্যতীক্রম মনে হয়েছে। গ্রীক ট্র্যাজিডির মতো সুসংস্থিত উপন্যাসের কাহিনী ও বেশ চমকপ্রদ। যদিও শেষের নাটকীয় পরিণতিটা অনেকের কাছে অতি নাটকীয় মনে হয়েছে। তবু মুসলমান সমাজের ওমন বিশ্বস্ত বিবরণ আর কাহিনীর স্বতস্ফুর্ত প্রবাহমানতা পাঠক হিসেবে আমাকে বেশ মুগ্ধ ই করেছে। হুমায়ুন কবির কেনো আরো উপন্যাস লিখলেন না এই খেদ মনে থেকে যাবে। ' নদী ও নারী ' উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের প্রাপ্যবঞ্চিত উপন্যাস।
Profile Image for Shadin Pranto.
1,488 reviews573 followers
October 13, 2019
প্রখ্যাত লেখক, শিক্ষাবিদ এবং রাজনীতিক হুমায়ুন কবির ১৯৪৫ সালে লিখেছিলেন উপন্যাসটি। মূল বইটি কিন্তু ইংরেজিতে রচিত। 'River and Woman' নামে প্রকাশিত হয় উপন্যাসটি। পূর্ববঙ্গের পদ্মাপারের চরাঞ্চলের এলাকা নিয়ে লেখা।সেখানকার মানুষের প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার ঘটনাই মূল উপজীব্য।

১৯৬৫ সালে সাদেক খান 'নদী ও নারী' নামেই উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়ন করেছিলেন। মূল কাঠামো এক রেখে অদল-বদল আছে ছবিতে। ষাটের দশকে ব্যবসাসফল হয়নি। কিন্তু অনেক প্রশংসিত হয়েছিল। নন্দিত নির্মাতা আলমগীর কবির তাঁর গ্রন্থ 'Film in Pakistan' এ সাদেক খানের 'নদী ও নারী'কে প্রথম উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়নের প্রয়াস বলে উল্লেখ করে লিখেছেন,

' Sadeq Khan was the first director to try to adopt for the cinema a popular novel. 'Nodi o Nari'(1965) written by Humayun Kabir was again based on the life in rural Bengali;'

আমি বাংলা অনুবাদ পড়েছি। বেশ সংক্ষিপ্ত অনুবাদ৷ জনাব মোবারক হোসেন খান বইটি ভাষান্তর নয়। বলা ভালো রূপান্তর করেছেন। হুমায়ুন কবির জীবিত থাকলে হনুবাদক, দুঃখিত অনুবাদক ভদ্রলোককে শূলে চড়াতেন। নিদেনপক্ষে কান ধরে উঠবস করাতেন নিশ্চিত। এমন সুন্দর একটি আঞ্চলিক উপন্যাসের সাড়ে সর্বনাশ করেছে ব্যাটা অনুবাদক৷

চরের জমির খাজনাদার নজু মিয়া৷ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানও সে। তাই কৃষক নজু মিয়াকে লোকে মান্যিগণ্যি করে৷ সর্বনাশা পদ্মাপারের বাসিন্দা নজু। পদ্মার ওপরই নির্ভর নজুদের জীবিকা।

হাটে যায় নজু মিয়া। এদিকে তার বছর দশকের কিশোর ছেলে মালেক আরেক কান্ড করে৷ মাছ ধরতে গিয়ে কুমির ধরে ফেলে। রীতিমতো 'বীরপুরুষ' বনে যায় গাঁয়ে। হাটবাসীর কাছেও নজু মিয়ার কদর বাড়ে।

গ্রামে প্রভাবশালী হলেও হাটএলাকায় ততো দাম নেই কৃষক নজু মিয়াদের। সেখানে শরিফ লোকেদের আলাদা আদরযত্ন। হাকিম সাহেবের কথা ভাবা যাক। যে নজু মিয়াকে সে কোনোদিন তার দোকানের বারান্দায় বসতে বলেনা। সেও আজ নজু মিয়াকে খাতির করে৷ কিন্তু সেই হাসিমুখে কথার পেছনে আছে স্বার্থ। স্বার্থ নেই তো হাসিমুখ নিমেষেই উধাও। তখন শরিফ আদমি হাকিম সাহেবদের কাছেও মূল্যহীন হয়ে পড়ে নজু মিয়ারা।

বাজারে এক পির আস্তানা করেছে ধুলদীর হাটে। নজুর আবার পিরবাবাদের ওপর বিশেষ ভরসা নেই। তবুও চাকর ইদ্রিসের কথা শুনে যায় দরবেশের কাছে৷ কিন্তু এই পিরের মুখে নিজের শত্রু আসগরের কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে নজু মিয়া। পিরও তাকে অভিশাপ দেয় পদ্মায় ডুবে মরবে। এদিকে তার শত্রু আসগর মিয়ার সাথেও ঝগড়া হয় নজুর।

আসগর আর নজু ছিল হরিহর আত্মা। একসাথে তারা চর পরিষ্কার করেছে। আবাদি জমি তৈরি করেছে। কিন্তু যখন আসগরের প্রেয়সী আমিনাকে বিয়ে করতে চায় নজু, তখনই হয় বিপত্তি। আসগরের মামাতো বোন আমিনা। সেই আমিনাকে অর্থের লোভে আমিনার মা বিয়ে দেয় নজুর সাথে৷ আসগর আর নজুর বন্ধুত্ব এখানেই শেষ। একে-অপরকে খুন করতে চায়। আসগর যায়ও একদিন খুন করতে। কিন্তু ততদিনে নজুর সন্তান মালেক আমিনার পেটে।

আমিনার আর নজুর সংসার টেকেনা। অত্যাচার সইতে না পেরে মরতে যায় আমিনা। তারপর...আমিনা আর নজু মিয়ার সন্তান মালেক। সে মানুষ হতে থাকে তার দাদি আয়েশার কাছে। নজু তার মা আয়েশাকে খুব ভালোবাসে। শ্রদ্ধা করে।

সর্বনাশা পদ্মা। এখন শান্ত। তক্ষুণই নেয় ভয়ালরূপ। চরের খাজনা আনতে যায় নজু মিয়া। আর ফেরা হয়না তার। মা আয়েশা পুত্রশোকে পাগলপ্রায়। ছেলে মালেক বাকরুদ্ধ । কীর্তিনাশা পদ্মার বুকে আশ্রয় খুঁজে নেন পুত্রশোকে কাতর মা। জগৎ সংসারে একেবারে একলা হয়ে যায় মালেক। নজু মিয়ার মৃত্যু কে যথেষ্ট চিত্রময়রূপে উপস্থাপন করেছেন ঔপন্যাসিক হুমায়ুন কবির৷ হঠাৎ ঝড় তোলা পদ্মার বিধ্বংসী শক্তির সম্যক বর্ণনা দিয়েছেন সুন্দরভাবে।

মালেকের দায়িত্ব নেয় তার চাচা। কিন্তু সে নিজেই বৃদ্ধ । ঘটনাক্রমে মালেকের আশ্রয় হয় পিতৃশত্রু আসগরের ঘরে। সেখানেই পিতৃস্নেহে আসগরের মেয়ে নুরুর সাথে বেড়ে উঠতে থাকে৷ কিন্তু পদ্মাপারের মানুষের ললাটে অখন্ড শান্তি নেই। আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শাপ। আছে অন্নকষ্ট। আছে ভিটেবাড়ি বিলীন হয়ে যাওয়ার দুঃসহ যন্ত্রণা। তবুও বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামের সৈনিক পদ্মার চরের বাসিন্দা আসগর, মালেকরা। তবুও স্বপ্ন দেখে নুরুকে নিয়ে। স্বপ্নমাত্রই কি পূরণ হয়? কাঙ্ক্ষিত মানুষকে চাইবা মাত্রই জীবনসঙ্গীরূপে পাওয়ার সৌভাগ্য সবার বরাতে জোটে? নাকী মালেক আর নুরুর জন্য অপেক্ষা করছে অন্য কোনো দুঃস্বপ্ন কিংবা ভয়ংকর কোনো সত্য লুকিয়ে আছে মালেক আর নুরুর জন্য?

হুমায়ুন কবির নিজে আদি এবং অকৃত্রিম পদ্মাপারের ছেলে। ফরিদপুরের সন্তান তিনি। তাই কীর্তিনাশা পদ্মার সর্বগ্রাসী আলোড়ন, ধ্বংসলীলা দেখেছেন। হুমায়ুন কবিরের স্মৃতিতে ছিল পদ্মাপারের চরাঞ্চলবাসীর নিত্যকার জীবনযুদ্ধ। অভিজ্ঞতায় আছে গ্রামীণ সুখকর অতীত। স্মরণে হয়তো রেখেছিলেন নিজেরই দেখা কোনো ঘটনা। যার বেদনার্তরূপ এসেছে উপন্যাসে।

হুমায়ুন কবিরের মূল লেখাটি পড়িনি। তাই বিশেষ মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কাহিনিবিন্যাস বলে 'নদী ও নারী' অঞ্চলকেন্দ্রিক উপন্যাস বটে। তবে 'পদ্মা নদীর মাঝি', 'তিতাস একটি নদীর নাম' কিংবা 'পোকামাকড়ের ঘরবসতি'র মতো সার্থক নয়। এই উপন্যাসের তুলনা হতে পারে 'কাশবনের কন্যা'র সাথে।
Profile Image for Chandreyee Momo.
224 reviews31 followers
July 27, 2025
পদ্মার ধারের চাষীদের জীবন, ভেঙে গড়ে ওঠা, মানব সম্পর্কের সুক্ষ্ম সব হিসাব সব কিছুই বইটায় উঠে এসেছে। শেষ পাতে যেই টুইস্ট, প্লটটা সব মিলিয়ে বেশ ভাল লাগলো।
Profile Image for Mosharef Hossain.
7 reviews2 followers
October 30, 2022
নদী ও নারী হুমায়ুন কবিরের একমাত্র উপন্যাস,মূলত ইংরেজিতে রচিত Man and River এর অনুবাদ। পদ্মা নদীর কূল ঘেষে টিকে থাকা মানুষের জীবনের সরল অথচ সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
বন্যা,খরা কিংবা আকালে পড়ে মানুষ তাদের বসতি হারায় কিংবা একটু সচ্ছলতা আনার আসার নতুন কোথাও গিয়ে পত্তন করে বসতি। রহিম বখসের নেতৃত্বে সেভাবেই পদ্মার পাড়ে বসতি গড়ে একদল মানুষ,নজু মিয়া,আসগর,আয়েশা,মালেক,নুরু,আজিজ,বসির মাঝি,কুলসুম, গোলাপিদের মাধ্যমে উপন্যাসের কাঠামো গড়া হয়েছে।
তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছে উপন্যাসকে,১. নজু মিয়া,২. আসগর, ৩. নুরু ও মালেক। মূলত এই তিন পর্বের নায়ক নায়িকাদের কেন্দ্র করেই পর্ব ভাগ করা হয়েছে।
পদ্মার বুকে চর জেগে উঠে যেমন সমৃদ্ধি দিয়েছে তাদের জীবনে আবার পদ্মাতেই সলিল সমাধি হয়ে বিনাশ। স্বাভাবিক জীবনযাপনের চিত্রই পাঠকের মনে চিত্রকল্প হিসেবে ধরা দিবে। নদীকেন্দ্রিক অন্যান্য উপন্যাস পড়া থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই পাঠকের কাছে এই জীবনধারার চিত্র একই মনে হবে।পঞ্চায়েত,মাতাব্বর,জমিদারি,খাজনা,কবিরাজ,হাকিম,পীর মুর্শিদি প্রথার সবকয়টিই আছে উপন্যাসে। শেষ পর্বে গিয়ে নুরু আর মালেকের মধ্যকার হৃদ্যতা যখন প্রেম থেকে বিয়ের দিকে যাবে তখনই লেখক হাজির করেছেন টুইস্ট। তারা যে একই মায়ের গর্ভের ভাই-বোন। পাঠক কোনোভাবেই পুরো উপন্যাসে এরকম কোনো ক্লু পাবে না যেটা শেষে এসে হাজির করা হয়েছে। এটা কিছুটা স্রোতের বিপরীত বলা চলে।।
আনন্দ-বেদনার মর্মকথার সাথে বন্ধুত্ব থেকে শত্রুতা নিয়ে আমাদের যে স্বাভাবিক ছকে বাঁধা জীবন তার সমাহার রয়েছে নদী ও নারী উপন্যাসে।।
Profile Image for Sanowar Hossain.
282 reviews25 followers
January 8, 2025
'The river must change its course and leave behind old familiar banks. But the river returns. It never forgets the old channels.'

বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সাথে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটা সময় নদীর খেয়ালেই মানুষের জীবনের উত্থান পতন ঘটতো। নদী তার আপন খুশিতে বাহিত হয়ে কখনো মানুষের বাসস্থান, ফসলের জমিকে গ্রাস করতো; আবার কখনো কখনো নতুন ভূমির উত্থান অর্থাৎ চর জেগে উঠলে মানুষের মনে নতুন ঘর বাঁধার আশা জাগতো। শিল্পায়নের ফলে নদীকেন্দ্রিক জীবনের বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। তবুও নদী পাড়ের মানুষের জীবনের চিত্র যে খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে সেটা বলার অবকাশ নেই।

অবিভক্ত ভারতের পদ্মা নদী আজকের দিনের মতো ছোট ছিল না। দিগন্ত বিস্তৃত সেই নদীর এপাড়ে দাঁড়িয়ে ওপাড়ের বস্তু দেখার উপায় ছিল না। সেই পদ্মার পাড়েরই এক চরে এসে উঠেছিল রহিম বখস। অবশ্য একা আসে নি। নিজেদের আদি গ্রামে কর্মসংস্থানের উপায় না হওয়ায় নতুন এলাকায় পাড়ি জমিয়েছিল দলবল নিয়ে। রহিম বখসের সাথেই এসেছিল নজু মিয়া ও আসগর। জঙ্গলাকীর্ণ ভূমিতে নতুন করে চাষ বসানোর কষ্ট সহ্য করেও টিকে গিয়েছিল তারা। গ্রামের নাম দিয়েছিল রহিমপুর। ঘরবাড়ি ও চাষের জমি ঠিকঠাক না হওয়া পর্যন্ত কারো স্ত্রীকে সেখানে আনার অনুমতি দেয়নি রহিম বখস। সেই কারণ খুঁজে বেড়িয়েছে তরুণ নজু মিয়া। পদ্মা পাড়ে দাঁড়িয়ে পুরনো স্মৃতির রোমন্থন করছিল গ্রাম পঞ্চায়েত নজু মিয়া।

পদ্মার পানি বহুদূর গড়িয়েছে। নজু মিয়া এখন গ্রামের প্রধান। যেকোনো বিষয়ে নজু মিয়াই শেষ কথা। ঘরের বাইরে সর্দার হলেও ঘরের ভেতরে মা আয়েষার হুকুম ছাড়া এক পা নড়ার অনুমতি নেই। আর আছে একমাত্র ছেলে মালেক। এই নিয়েই নজু মিয়ার সংসার। নতুন চর দখল, সেই চরে প্রজা বসানো, চাষবাস ও গ্রামের বিচার সালিশ করেই সময় কাটে তার। রাজা থাকলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীও থাকে। রহিমপুরে নজু মিয়ার সেই প্রতিদ্বন্দ্বী আসগর। একসময় নাকি তারা প্রাণের বন্ধু ছিল। সবাই তাদের মাণিকজোড় বলতো। কিন্তু কোন কারণে তারা আজ এমন শত্রুতে পরিণত হলো সেটা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না। কৈশোরের মালেকও বুঝে উঠতে পারে না সেই রহস্য। নজু মিয়ার পরে সম্পত্তির হাল ধরতে হবে মালেককেই। সেভাবেই ছেলেকে বড় করে তুলছেন নজু মিয়া। এদিকে আয়েষার ইচ্ছা নাতবউ দেখার। কিন্তু নজু মিয়া ছেলেকে এত কম বয়সেই বিয়ে দিতে নারাজ। একদিন নদীতে বড়শি ফেলেছিল মালেক এবং সেই বড়শিতে একটি কুমির আটকায় এবং নজু মিয়া সেই কুমিরকে মেরে ফেলে। আশেপাশের দশ গ্রামে তখন মালেকের কুমির মারার গল্প ছড়িয়ে পড়ে।

নজু মিয়া ও আসগরের রেষারেষি নতুন রূপ পায় ধুলদির হাটে এক ফকিরের আগমনে। চরাঞ্চলের মানুষ তারা, দৈব ঘটনায় বেশি বিশ্বাসী। ফকিরের আশ্চর্যজনক কিছু ঘটনায় নজু মিয়া যাচাই করতে সেখানে গেলে আসগরের সাথে কথা কাটাকাটি হয় এবং এক পর্যায়ে ফকির নজু মিয়াকে পদ্মায় ডুবে মরার অভিশাপ দেয়। নজু মিয়া অবশ্য এসবে খুব একটা বিশ্বাস করে না। কিন্তু মা আয়েষার অনেক জোরাজুরিতে অবশেষে ফকিরকে দাওয়াত করে এনে মিলাদের ব্যবস্থা করায় এবং নিজের ফাঁড়া কাটানোর জন্য ক্ষমা চায়।

আখ্যানের এক পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই নজু মিয়ার ছেলে মালেক ও আসগরের মেয়ে নুরু'র মধ্যকার প্রেমের চিত্র। ভাগ্যের ফেরে তাদের রাস্তা একজায়গায় মিলে গিয়েছে। কিন্তু বিয়ের প্রসঙ্গ উঠলেই বেঁকে বসেন আসগর। পুরনো শত্রুতার জেরেই কি এই সিদ্ধান্ত নাকি গূঢ় কোনো কারণ রয়েছে, যা দুই বন্ধুর বন্ধুত্বে ফাটল ধরিয়েছিল?

নজু মিয়া, আসগর এবং নুরু ও মালেক এই তিন খণ্ডে রচিত হুমায়ুন কবিরের 'নদী ও নারী' উপন্যাসটি পদ্মার পাড়ে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনের গল্প বলে। ভাগ্যান্বেষনে মানুষ একসময় নদীর আশেপাশেই এসে বসত গড়তো। কারণ নতুন মাটিতে ফসল ফলতো তুলনামূলক বেশি। তবে এই চরাঞ্চলকে বাস ও চাষের যোগ্য করে তুলতেও খাটুনি কম ছিল না। জমিদাররা নামমাত্র খাজনায় কিংবা কয়েক বছর বিনা খাজনায় এসব চরে প্রজা বসিয়ে আবাদ করাতেন। চর দখল নিয়ে ঝগড়া মারামারির ইতিহাসও কম না। এখনো দেখা যায় চরাঞ্চলের মানুষগুলো আদিম অভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করতে পারেনি। ফরিদপুরের পদ্মার ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষেরা নতুন জেগে উঠা চরে বসবাস শুরু করে; এমনটা বাংলাদেশের বড় নদীগুলোর প্রায় সবখানেই দেখা যায়। উপন্যাসে আমরা দক্ষিণাঞ্চলের মগ জলদস্যুদের উপস্থিতিও পাই। তারা নদীতে দস্যুতা করতো এবং মাঝেমধ্যে গ্রামের মধ্যে থেকে সম্পদ লুট এবং নারীদের অপহরণ করে বিক্রি করে দিতো।

নদীর বিচিত্র চরিত্র মানব চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে সবচেয়ে মিল বোধহয় নারীর মনোভাবের সাথেই মিলে যায়। তাই বোধকরি 'Men and Rivers' শিরোনামে লেখা উপন্যাসটি বাংলা সংস্করণে 'নদী ও নারী' শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে বাংলা সংস্করণটি লেখক নিজেই লিখেছিলেন নাকি অন্য কেউ অনুবাদ করেছিল সেই তথ্যটি কোথাও পেলাম না। বইতে যেহেতু অনুবাদকের নাম নেই এবং বাংলা সংস্করণটির প্রকাশকাল মূল বইয়ের প্রকাশের কিছু বছর পরেই; তাই ধরে নেওয়া যায় বইটি লেখকই লিখেছিলেন। এমন অনুমানের একটি শক্ত কারণ হতে পারে, লেখক বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। অবিভক্ত ভারতে নদীপাড়ের মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরার অভিপ্রায় নিয়েই মুসলিম সামাজিক চিত্রায়ণে উপন্যাসের গল্প ফেঁদেছেন লেখক।

বইটির বাংলা সংস্করণের চাইতে ইংরেজি সংস্করণ বেশি ভালো মনে হলো। কারণ এটি একটি আঞ্চলিক উপন্যাস কিন্তু বাংলা সংস্করণে সংলাপ কথ্য ভাষার পরিবর্তে লিখিত ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ইংরেজিতে পড়লে এই আঞ্চলিকতার ব্যাপারটা গৌণ হয়ে যায়। কিন্তু বাংলায় পড়তে গেলে আঞ্চলিক সংলাপের অভাবে উপন্যাসটি তার আঞ্চলিকতার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। চরিত্রগুলো ঠিকঠাক ফুটে উঠতে পারেনি। হুমায়ুন কবির ত পদ্মা পাড়ের মানুষ। তাহলে কেন এই বইয়ের সংলাপ লিখিত ভাষায় লিখলেন? তিনি যদি বাংলা সংস্করণটি লিখেও না থাকেন, তবুও এই আঞ্চলিক সংলাপের ব্যাপারটি তিনি বিবেচনা করতে পারতেন। কারণ বাংলা সংস্করণটি তাঁর জীবদ্দশাতেই প্রকাশিত হয়েছিল। তাহলে কি তিনি তাঁর শিকড়কে ভুলে গিয়েছিলেন? চরাঞ্চলের মানুষের মুখে লিখিত ভাষার সংলাপ বেমানান। পদ্মা পাড়ের মানুষ হয়েও দেশের অন্য প্রান্তের মানুষের কাছে নিজের সংস্কৃতিকে পৌঁছাতে বইটি কৃত্রিম ধারাতেই প্রবাহিত হ��়েছে; তবে বৈশ্বিক দিক বিবেচনায় ইংরেজি সংস্করণ দারুণ।

উপন্যাসের প্রথম দুই খণ্ডে নারী চরিত্র অপ্রধান হলেও শেষ খণ্ডে নারী চরিত্রের চিরাচরিত রূপ আমরা দেখতে পাই। একইসাথে উপন্যাসের শেষ ভাগে যে ক্লাইম্যাক্সের রূপায়ণ তা পাঠককে অভিভূত না করলেও চরিত্রগুলোর প্রতি সহমর্মি করে তোলে। শেষোক্ত ক্লাইম্যাক্স সচেতন পাঠক আগেভাগেই ধরে নিতে পারবেন কিন্তু সেই ক্লাইম্যাক্সের ইতিহাস জানাটা তখন তার কাছে পরম কৌতূহলের বস্তু হিসেবে দেখা দিবে। নতুন করে যদি গল্পের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আঞ্চলিক উপন্যাসের ঢঙে অনুবাদ করা যায় তাহলে বোধকরি উপন্যাসটি আরো বেশি প্রচারিত হবে। এই একটি ঘাটতিই বইটির পাঠকের মাঝে টিকে থাকার অন্তরায়। তবে বইটির গল্প নিরাশ হবার মতো না। সন্ধ্যার পরে কুপি জ্বালিয়ে বারান্দায় পুঁথি পড়তে যেমন গল্প লাগে, তেমনই এক গল্প 'নদী ও নারী'। হ্যাপি রিডিং।
Profile Image for রেজওয়ান আহমেদ.
12 reviews9 followers
July 23, 2021
'নদী ও নারী' - জীবনের সাথে মিশে থাকা সত্তা

মগ্নপাঠ শুরু করি মূলত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে। তাঁর লেখা আজ পর্যন্ত যতো পড়েছি, দেখেছি একই অভিজ্ঞতাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন কাহিনিতে তুলে আনছেন। এই ব্যাপারটি আরো একভাবে করা সম্ভব। বহুমুখী সাহিত্য রচনায় জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো। আরেকটু স্পষ্ট করে বলা যায় একই ধরণের ঘটনাকে সাহিত্যের আলাদা বিভাগে কাজে লাগানো। এই কৌশলে লিখেছেন হুমায়ুন কবির ('মেঘনায় ঢল' এবং 'নদী ও নারী')। লিখেছেন জসীম উদ‌্দীন ('কবর' এবং 'বোবা কাহিনী')। 'নদী ও নারী'র পাঠ বিশ্লেষণে তুলনায় 'বোবা কাহিনী' কেন প্রাসঙ্গিক সে কথায় পরে আসা যাবে। তিনটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত উপন্যাসটির বিষয়ের দিক থেকে ভাগ আসলে দুটি, তা নামেই স্পষ্ট।

যে নদীর কথা বলা হচ্ছে সেটি পদ্মা। পদ্মায়ও মেঘনার মতো প্রলয়দোলায় ঢল ওঠে। প্রাণনাশে পদ্মা মেঘনার চাইতে কম যায় না।

"... ভরবেলা গেলো, ভাটা পড়ে আসে, আঁধার জমিছে আসি,
এখনো তবুও এলো না ফিরিয়া আমিনা সর্বনাশী।
দেখ্ দেখ্ দূরে মাঝ-দরিয়ায়,
কাল চুল যেন ঐ দেখা যায়-
কাহার শাড়ির আঁচল-আভাস সহসা উঠিছে ভাসি?
আমিনারে মোর নিল কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী।"

'মেঘনায় ঢল' কবিতার তৃতীয় ও শেষ স্তবক।

নজু মিয়ার পর তার মা আয়েষাও পরলোকগত হয় পদ্মার জলধারায় মিশে।

নজুর ব্যাপারে আয়েষার আশঙ্কা ছিল পদ্মার ঝড়জলে ছেলে পাছে মারা পড়ে। 'মেঘনায় ঢল'-এর আমিনা চরিত্রকে নিয়ে তার মায়েরও একই আশঙ্কা ছিল।

উদ্ধৃত স্তবকে আমিনার যে পরিণতি তা 'নদী ও নারী' উপন্যাসে আয়েষাকে বরণ করতে হচ্ছে। রাতের আঁধারে পদ্মার তীরে ভেসে উঠেছে তার চুলের গোছা।

এককভাবে পদ্মাই সর্বনাশ করেনি মালেকের। সমুদ্রপাড়ে বসবাসে বিরূপতাও রয়েছে। 'নদী ও নারী' আমাদের ভূমিতে মগ-হার্মাদ জলডাকাতদের আক্রমণের গল্প বলেছে। এ ব্যাপারটি 'বোবা কাহিনী' উপন্যাসে আমীর সাধুর পুথির আড়ালে এসেছে। পল্লীকবির 'পল্লীবর্ষা' কবিতায় এসেছে এ ইঙ্গিত। এসেছে জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসে। ভেলুয়া সুন্দরীর সে পুথির শুরুটা এমন -

"শুন শুন বন্ধুগণরে, শুন দিয়া মন।
ভেলুয়ার কথা কিছু শুন সর্বজন।।
কি কহিব ভেলুয়ার রূপের বাখান।
দেখিতে সুন্দর অতিরে রসিকের পরাণ।।
আকাশের চন্দ্র যেন রে ভেলুয়া সুন্দরী।
দূরে থাকি লাগে যেন ইন্দ্রকূলের পরী।।"

উপন্যাসে নারীর রয়েছে সর্বগ্রাসী ভূমিকা। প্রথম অংশে নজু মিয়ার আখ্যানে আয়েষা চরিত্রে একাধারে একজন মা এবং দাদিকে পাই আমরা।

সন্তানের মুখ দেখে মনের কথা পড়ে নেবার প্রচ্ছন্ন ক্ষমতা মোটামুটি প্রত্যেক মায়েরই আছে।

'নদী ও নারী' উপন্যাসের প্রথম ভাগে নজু মিয়ার আখ্যানে আয়েষার মধ্যে এ ব্যাপারটি তুলে ধরেছেন হুমায়ুন কবির।

তাঁর 'মেঘনায় ঢল' কবিতার উপজীব্য আশঙ্কার জায়গাটিও আয়েষা চরিত্রে এসেছে। সত্যও হয়েছে আশঙ্কা।

এমন আশঙ্কাপ্রবণ মা দেখেছি হাসান আজিজুল হকের 'আগুনপাখি' উপন্যাসে। মেতর বউ খোকার অসুস্থতা নিয়ে যে কী পরিমাণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল, তা সচেতন পাঠকমাত্র বুঝতে পারেন।

আয়েষা নজু মিয়াকে কিছুতেই উত্তাল নদীতে যেতে দেবেন না‌। এর আড়ালে ছিল আশঙ্কামিশ্রিত মাতৃস্নেহের স্রোতধারা।

মালেক আর তার দাদির মধ্যে অটুট বন্ধন দেখেছি নজু মিয়ার অংশে। 'পথের পাঁচালী'র ইন্দির ঠাকরুণ চরিত্র নিয়ে আশা বেঁধে রাখলাম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসলে চরিত্র সৃষ্টির তাগিদ কম দেখা যায়। গ্রন্থমাধ্যম থেকে যত পর্দামাধ্যমে আগানো যায়, 'হিরোইজম' শব্দের মাহাত্ম্য চরিত্র সৃষ্টির প্রবণতাকে কমিয়ে দেয়।

আমরা নায়ক-নায়িকা/প্রেমিক-প্রেমিকার মানদণ্ডে সবকিছু বিচার করতে আগ্রহী।

মাঝে মাঝে ইরানের সিনেমার অগ্রসরমান পরিস্থিতি আমাকে ভাবায়। এ সেপারেশন, চিলড্রেন অব হ্যাভেন, কালার অব প্যারাডাইস এর মতো ছবিতে চরিত্রের কী অমিত শক্তি! এদিকে এদেশে 'নদী ও নারী'র মতো ক্লাসিকের প্রতিতুলনায় কোনো সমকালীন উপন্যাস পাওয়া ভার হয়ে যাচ্ছে।

হরিশংকর জলদাসের লেখায় ঠাকুরদা চরিত্র পাই প্রতিনিয়ত। 'বাতাসে বইঠার শব্দ' যে সততার প্রতিমূর্তি চন্দ্রনাথ হালদার, তিনি 'জলপুত্র'-এর নিখোঁজ চন্দ্রমণি। চন্দ্রমণি জলদাস হরিশংকর জলদাসের সত্য পিতামহ। তা‍ঁর সত্য নামেই তিনি 'জলপুত্র'-এ নিখোঁজ হয়েও উপস্থিত। একই উপন্যাসের বরদাসুন্দরী এবং চাঁপারানী কথকের দুই ঠাকুমা। অবশ্য ঠাকুমা হিসেবে এদের বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ কাহিনিতে ছিল না।

এদিকে রামগোলাম আর গুরুচরণের মধ্যে পূর্বপুরুষ-উত্তরপুরুষের সম্পর্ক নিকট ভবিষ্যতে প্রবাদতুল্য হবে বলে মনে করা যায়। কিন্তু দাদি-নাতির বন্ধন হরিশংকর জলদাসের লেখায় তেমন করে আসেনি। যদিও 'রামগোলাম'-এর অঞ্জলি চরিত্রে অল্প পরিমাণে দাদিসত্তা দেখা গেছে।

বাংলাদেশের সিনেমায় অল্প কিছু দাদি চরিত্রের উদাহরণ আছে। সেই 'সুজন-সখী' (সাদাকালো-রঙিন দুটোই) থেকে শুরু করে 'মায়ের অধিকার' অথবা 'অন্তরে অন্তরে' কিংবা 'দাদীমা' - দাদিরা ঘুরেফিরে আনোয়ারা-ডলি জহুর-ফেরদৌসী মজুমদারেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

কুসুমের মধ্যে একটা মাতৃপ্রতিম স্নেহ মালেকের জন্য দেখা গেছে। সেটি দিনে দিনে বেশ শক্তপোক্ত হয়ে যখন স্থির একটা বন্ধনে রূপায়িত, তখনই সমাজ দাঁড়ায় বাধার দেয়াল হয়ে।

আয়েষা আর নুরুর মাঝে কুলসুম মালেকের অস্তিত্ব ঘিরে থাকা নারী। প্রকৃতির নিয়মে আয়েষার মৃত্যুতে কুলসুমের সাথে সখ্য। নিজের ছেলের মতো পেলেপুষে বড়ো করতে করতে একসময় আসগরের পরিবারের চাপে আজিজের সাথে বিয়ে। এই জায়গাটা কষ্ট দেয়। নীরবতাই সম্মতি - কথাটাকে বাজেভাবে ব্যবহার করে বাৎসল্য রসকে করুণরসের দিকে ঠেলে দিতে হলো এভাবে?

নুরুর আখ্যানে মোটামুটি দুটো ভাগ - শিশু নুরু আর বয়ঃপ্রাপ্ত নুরু। শৈশবে দুজনের বন্ধনে সখ্যরস দেখা গেছে। এ সময় তাদের মধ্যে একটা চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক মিল দেখা যায়। শিশু মনস্তত্ত্ব এরকম মিলকে স্বাভাবিকই বলে। 'বোবা কাহিনী' উপন্যাসে বছির-ফুলী-নেহাজদ্দী-বড়ুদের বন্ধন এক্ষেত্রে যেমন তুলনীয়, তেমনি 'পথের পাঁচালী'র অপু-দুর্গার।

বয়সের সাথে নুরু, মালেক - উভয়েরই মনোজগতের পরিবর্তন ঢালাওভাবে দেখানোর প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। একপর্যায়ে তাদের প্রেমের ব্যাপারটিও স্পষ্ট হয়। এ প্রেমের সাথে মিল খুঁজে পেয়েছি 'শামুক' (হাসান আজিজুল হক) এবং 'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল' (কল্লোল লাহিড়ী) উপন্যাসদুটিতে চিত্রি�� প্রেমের। তিনটির কোনোটিরই মিলনান্তক পরিণতি না থাকলেও বেশ সৌম্য শান্ত আর স্নিগ্ধ ছিল এ সকল বন্ধন। মাহবুব-উল হক রচিত 'মফিজন' উপন্যাসে বয়ঃসন্ধিকালীন অব্যক্ত প্রেম দেখানো হচ্ছে -

"... মফি তাহাকে টানিয়া তুলিল। তাহাকে হাত ধরিয়া টানিল খেলিতে, তাহার গলার উপর বাহু বাঁধিয়া টানিল বেড়াইতে, আর নিজে গল্প বলিয়া তাহাকে বাধ্য করিল 'সায়' দিতে। ..."

এ লেখাটুকুও প্রতিতুলনায় অপ্রাসঙ্গিক বিচার করতে পারছি না।

হরিশংকর জলদাসের 'মোহনা' দেখিয়েছে কৈবর্তদের দুটো ভাগ - হালিক আর জালিক। তাহলে কুবেররা জালিক কৈবর্ত হলে মকবুল-মন্তুরা হালিক কৈবর্ত।

'নদী ও নারী'র নজু মিয়া, আসগরও সেই ভাগেরই মানুষ। গরুর অভাবে তাদের লাঙল কাঁধে তুলতে হয়। এ ব্যাপারটি জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে উপন্যাসে একটু অন্যভাবে এসেছে -

"বাড়ির ওপারের জমিটাতে লাঙল না দিলে নয়। অথচ হাল যে একটা ধার পাবে, সে সম্ভাবনা নেই। লাঙল অবশ্য যা হোক একটা আছে ওর। অভাব হলো গরুর। গরু না হলে লাঙল টানবে কিসে? আচ্ছা, এক কাজ করলে কেমন হয়! মকবুল ভাবলো, বউ দুটোকে লাঙলে জুড়ে দিয়ে.... দূর এটা ঠিক হবে না। লোকে গালাগাল দেবে ওকে। বলবে, দ্যাহো বউ দুইডা দিয়া লাঙ্গলও টানায়। ..."

বহদ্দাররা যেমন গঙ্গাদের, বড় সাহেব আবদুস ছালাম যেমন রামগোলাম-কার্তিকদের হন্তারক তেমনি হাকিমরা অথবা গঙ্গাচরণ চাটুজ্জেরাও কম যান না ছুৎমার্গ বিচার করে নিম্নবর্গের লোকজনদের কাঁধে চড়ে বেঁচে থাকতে।

হুমায়ুন কবিরের হাকিমের সাথে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গঙ্গাচরণের প্রভূত মিল পাচ্ছি স্বার্থপরতায়। দুর্ভিক্ষের আগে গঙ্গাচরণ চালটা কলাটা কখনোই কিনে খায়নি নতুনগাঁয়ে।

এদিকে ধুলদির হাটের গুজবে কান দিয়ে নজু মিয়ার কাছে কুমিরের কলজে-গুর্দা চেয়ে বসে হাকিম। হালচাষী পঞ্চায়েতকে গড়গড়ায় তামাক খেতে দেয় ছুৎমার্গ ভুলে। যখনই তার স্বার্থসিদ্ধি হলো না, দূর দূর করে তাড়াতে পিছপা হয় না হাকিম।

এই হাকিমের কাছ থেকে মায়ের জন্য মালিশ নেবে নজু মিয়া?

তার 'হাকিম না তোর মাথা' - সংলাপের এ অংশে এক ধরণের ক্রোধ স্পষ্ট।

আবার 'পদ্মানদীর মাঝি'তে গণেশ কুবেরকে গীত ধরতে বললে কুবের বলে - হ, গীত না তর মাথা‌।

এখানে এক ধরণের অবহেলামিশ্রিত বিরক্তি প্রকটিত। এতেও কি দূরদৃষ্টিতে আড়ৎদারের প্রতি ঘৃণার উপাদান নেই? নেই নিম্নবর্গীয় বঞ্চনার জীবনের প্রতি প্রচ্ছন্ন অভিশাপ?

অভিশাপ কি প্রকৃতি মানুষকে কম দেয়? 'নদী ও নারী' উপন্যাসে আকাল এবং বন্যার সহাবস্থানে মানুষের অসহায়ত্ব চিত্রিত হয়েছে।

তিন বছরের আকালে অভাবের চূড়ান্ত। 'অশনি সংকেত' উপন্যাসে বিশ্বাস মশায়ের কথা মনে পড়ে। অভুক্ত প্রতিবাদী গ্রামবাসীর আক্রমণে গ্রাম ছাড়তে হয় তাকে। এদিকে আসগর গোলা উপুড় করে দেখায় সকলকে - তার কাছে মজুদকৃত কোনো ধান নেই। খাবারের আশা, খরচের ভয় - যুগপৎ দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচার জন্য আথালের বলদ-গোরু জবাই করার ইতিহাস উঠে এসেছে।

'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসে জহির রায়হান লিখেছিলেন -

"সেই তেরশ' সনের বন্যা।
অমন বন্যা দু-চার জন্মে কেউ দেখেনি।
মাঠ ভাসলো, বাড়ি ভাসলো, ভাসলো কাজীর কুশান।
কিছু বাদ নাই। ঘর বাড়ি গোয়াল গরু সব। এমনকি মানুষ ভাসলো। জ্যান্ত মানুষ। মরা মানুষ। ..."

অনুরূপ একটা অবস্থায় 'নদী ও নারী' উপন্যাসে আসগর আলী তার পরিবার নিয়ে নৌকায় ভাসান দিয়ে ঘর ছাড়লেন।

এর পরই মালেকসংক্রান্ত জটিলতা। তার মাঝে মগ জলদস্যু সরদারের মধ্যে মানবতার ব্যাপারটি লক্ষ্যণীয়। ফিরে যখন আসে মালেক - তাকে ঘিরে সে কী উৎসব!

জিয়াফত, জোমাত, মেজবান, মাইট্ট্যাল প্রভৃতি নামে গ্রামবাসী খাওয়ানোর প্রথা এদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত আছে। বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পাওয়া যায় এসকল খাবার অনুষ্ঠানে। বেশ কয়েকটি গবেষণামূলক লেখা বাঙালির খাবারের অতীত-বর্তমানের ওপর পেলেও 'জিয়াফত' নিয়ে সেভাবে পাইনি কোথাও। অথচ এই ব্যাপারটি গ্রামবাঙলার বাঙালিদের প্রাণের আয়োজন বলা যেতে পারে।

নদী ও নারী উপন্যাস থেকে যেটুকু পেয়েছি এ বিষয়ে, তাকে প্রামাণ্য ধরা যেতে পারে। একটু ঘুরে আসি জিয়াফতের আয়োজন থেকে -

"উঠোনে দস্তরখানা পেতে সকলের খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। এত লোকের জন্য বাসন কোসন জুটবে কোথায়, তাই কলাপাতা কেটে তাতেই খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। মেহমানরা সবাই বসে গেলে আজিজ একটা বড় বাসন ভরে নুন নিয়ে এল-সকলের পাতে নুন পড়বার পর বড় বড় গামলা ভরা গরম ভাত এল। মোটা লাল চালের ভাত, কিন্তু খেতের ধানের চাল, তাতে তখনো ভাপ উঠছে। সে ভাতের গন্ধ আর স্বাদের তুলনা কোথায়? বাটি বাটি সালুন এল, গোস্ত দিয়ে রাঁধা ডাল, তারপরে মাছ ভাজা, রাঁধা মাছ, কত রকমের তরিতরকারি, শাকসবজি। সবাইর শেষে সেমাই, ঘন দুধ আর নতুন গুড়‌। গাঁয়ের লোক পেট ভরে খেল-আসগর মিয়া আয়োজনের ত্রুটি করেনি। এ রকম জিয়াফত সে তল্লাটে কখনো হয়নি।"

চল্লিশা প্রসঙ্গ এসেছে কোনো কোনো উপন্যাসে। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে Wadud Khan রচিত 'করুণাহীন করোনার দিন' উপন্যাসের কথা। এসেছে বিয়ের খাবারের বিবরণ - জহির রায়হানকে ডিটেইল করতে দেখেছি 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসে। আবু ইসহাকও সম্ভবত এ ব্যাপারটি এনেছেন 'সূর্য-দীঘল বাড়ী' উপন্যাসে।

গ্রামাঞ্চলে পীর-ফকিরের এন্তার প্রভাব ছিল তখনকার দিনে। ফকির চরিত্রে তারই ছাপ। তার আস্তানায় ইলম শিক্ষার ব্যবস্থা। আমরাও একটু সেখান থেকে ঘুরে আসি -

নজুমিয়া বলল, হাঁ ভাই, কোরান যে পড়ছ তা তো বুঝলাম, কিন্তু আমি জাহেল পাড়াগেঁয়ে মানুষ‍, আমি তো কোরানের অর্থ বুঝতে পারি না। যে সুরা পড়ছ, তার মানে বুঝিয়ে দাও না ভাই।

ছেলেটি বলল, মানে, কোরান শরীফের মানে? খোদার কালাম পড়ছি, হেফজ করে করে মুখস্থ করছি, তার আবার মানের কথা ভাবে কে?

এ রকম অবস্থার বিবরণ অন্যভাবে এসেছে 'বোবা কাহিনী' উপন্যাসে। সেখানে ভুলভাল তাফসীর করে মাওলানাদের ওয়াজ-নসিহতরত দেখা যায় গ্রামাঞ্চলে।

আসগর চরিত্রের মধ্যে ইতিবাচকতার লক্ষণ স্পষ্ট। বাস্তববাদী মানসও প্রখর। অন্যদিকে নজু মিয়ার জনপ্রিয়তা কম না হলেও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে তিনি পারেননি।

আসগরের শত্রুতা ভুলবার ইচ্ছে থাকলেও জীবদ্দশায় নজু মিয়া মিটমাটের আগ্রহ না দেখানোয় এগোতে পারেনি ব্যাপারটা।

বসির আর আজিজের চরিত্র দুটোও গুরুত্বপূর্ণ।

নজু মিয়ার মৃত্যুর পর মালেকের সাবালকত্ব অর্জন পর্যন্ত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল বসিরের ওপর। এ দায়িত্ব পালনে সচেতনতা আন্তরিকতার পরিচয় পাওয়া যায় তার।

আজিজ চরিত্রে পত্নীপ্রেম দেখানোর চেষ্টা ছিল। একটা পর্যায়ে কুসুমের শোকে মাথা খারাপ হয়ে যায় তার। এমন নিবিড় দাম্পত্যপ্রেম একটু ভিন্ন কৌশলে জসীম উদ‌্দীনের লেখায় এসেছে। 'বোবা কাহিনী' উপন্যাসে আজাহের-আয়েসার আখ্যানে আমরা দাম্পত্য-প্রেম পাই।

বিয়ে যেমন নতুন সম্পর্কের জাল বিস্তার করে, তেমনি পুরোনো সম্বন্ধের জাল ছিঁড়েও ফেলতে পারে কখনো সখনো। কখনো বা জাল বিস্তারই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তিন ধরণের বাস্তবতাই অম্ল-মধুর অনুভূতির জন্ম দেয় মানুষের মনে। এই বাস্তব জীবনবোধে পরিপূর্ণ চিরায়ত উপন্যাস 'নদী ও নারী'। নারী-পুরুষের চিরকালীন সহাবস্থানের এ কাহিনি আমার কাছে সুখপাঠ্য লেগেছে।

🅒 রেজওয়ান আহমেদ
শিক্ষার্থী,
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য (৬ষ্ঠ আবর্তন),
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
This entire review has been hidden because of spoilers.
Profile Image for Nahida Parvin.
15 reviews
February 27, 2023
[ ] রিভিউ:
ভাগ্য অন্বেষণে রহিম বখশের দল এসে বসত গেড়েছিল পদ্মাপারে। নজুমিয়া ও আসগর মিয়া ও ছিল সেই দলে। পদ্মাপারে জেগে ওঠা নতুন চরে তারা আস্তানা গাড়ে। সদ্য নদীগর্ভজাত জমিতে কঠোর পরিশ্রমে ফসল ফলায়, আবাদ করে, ধীরে ধীরে বিরান চরে জনবসতি গড়ে তোলে রহিম বখশের দল৷ কালের পরিক্রমায় রহিম বখশের পরে গাঁয়ের পঞ্চায়েত হয় নজুমিয়া। লোকে বলে, নজুমিয়া আর আসগর মিয়া ছিল জানের দোস্ত। কিন্ত কি এক কারণে সেই দোস্তি এখন দুশমনিতে রুপ নিয়েছে। নেপথ্য কারণ কেউ জানে না। তবে গাঁয়ের সবাই এটা জানে নজুমিয়া এখন যে পথে হাঁটে, আসগর মিয়া সে পথের ধুলাও তার পায়ে লাগায় না।
নজুমিয়া'র একমাত্র ছেলে মালেক। মালেক জানে তাকে জন্ম দিতে গিয়ে তার মা মারা গেছে, বড় হচ্ছে সে দাদি আয়েশা বেগমের কাছে। দাদি আয়েশা বেগম অন্দরবাড়ির সমস্ত কিছু তদারক করে, আর শ'খানেক বিঘাজমির মালিক নজুমিয়�� ব্যস্ত থাকে কাছারিঘরের কাজকর্ম আর জমিজিরাতের দেখশোন করা নিয়ে।
পদ্মাপারের মানুষ পদ্মাকে ডাকে রাক্ষুসী। কারণ বিস্তীর্ণ পদ্মার মতিগতি বোঝা ভার। এই পানি শুকিয়ে মরোমরো তো পরদিন বান ডাকে। বৈশাখ মাসে পদ্মা তো আরো সর্বনাশী। সেই সর্বনাশী পদ্মার বুকে একদিন বিলীন হয়ে যায় নজুমিয়া। পুত্রশোকে আয়েশা বেগম ও পদ্মায় হারিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে। ১০ বছর বয়সী বালক মালেক কে তাই বিশ্বস্ত চাকর বসির মিয়া তুলে দেয় নজুমিয়ার-ই চিরশত্রু আসগর মিয়ার হাতে। বসির মিয়া জানে আসগর মিয়া শত্রুপক্ষ হলেও পঞ্চায়েতে তার চেয়ে সৎ আর কেউ নেই। এতিমের দেখভাল সে ভালভাবেই করবে। মালেকের জায়গা মিলে তাই আসগর মিয়ার গেরস্তবাড়িতে। আসগর মিয়ার মেয়ে নুরু বয়সে মালেকের চেয়ে দুই কি তিন বছরের ছোট হবে। দুজন একসাথে বড় হয়। এরই মাঝে আকাল পরে পদ্মাপারে। তিন বছর অনাবৃষ্টি তে চাষীদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ঘরে চাল নেই, হালের বলদ না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছে। একমুঠা চালের বদলে চাষী তার দশ বিঘা জমি বেচে দিতে রাজি। কিন্ত কোথায় ধান? জমি শুকিয়ে গেছে, মাটির রস নেই। গ্রামের মেয়েরা বদনা মাথায় হাড় জিরজিরে দেহ নিয়ে শুকনো গলায় গান গায়
"আল্লা মেঘ দে, পানি দে
ছায়া দে রে তুই"
বৃষ্টি একদিন নামে। চাষী-চাষীবউয়েরা খুশিতে শোকর গুজার করে। কিন্ত এই চাওয়ার বৃষ্টি একদিনে থামে না। টানা সাতদিনের বৃষ্টিতে পদ্মা তখন সমুদ্দুর। বানের জলে ঘরবাড়ি হাঁসমুরগী পালের গরু ছাগলের সাথে সাথে মানুষ ও ভাসল। এক নিমিষে গেরস্তের গেরস্তবাড়ি আর চাষের জমি বিলীন হয়ে গেল পদ্মায়। আসগর মিয়া আবার বের হয় বুড়োবয়সে আরেকবার... ভাগ্যান্বেষণে! সাথে স্ত্রী, নুরু আর চিরশত্রু নজুমিয়ার ছেলে মালেক। নতুন চর জেগেছে, লোকে বলে বিয়ানচর। সময় এসেছে আবারো নদীগর্ভজাত জমি কে চাষাবাদী করার। কালের চাকায় এভাবেই পদ্মাপারের চাষীর জীবন আবর্তিত হতে থাকে। তার সাথে এসে যোগ হয় প্রেম ভালবাসা, হতাশা, বিষাদ, বিরহ, ক্রোধ, হিংসা অথবা রহস্য।

[ ] পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
একেবারে খাঁটি বাঙালি গল্প। পদ্মাপারের জেলেদের নিয়ে "পদ্মানদীর মাঝি" লিখে অমর হয়েছেন মানিক বন্দোপাধ্যায়। হয়ত হুমায়ুন কবির মানিক নন, তাই পদ্মাপাড়ের চাষী গেরস্তদের নিয়ে লেখা উপন্যাস "নদী ও নারী"র কথা তেমন শোনা যায় না। তবে উপন্যাস টি পড়ে কোথাও বিরক্ত হবেন না। লেখনশৈলী এত দৃঢ় ও প্রাণবন্ত যে পড়ার সময় মনে হবে আপনি বুঝি ঠিক পদ্মার পাড়ে বসে দূর গ্রামের জীবনযাত্রা একেবারে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছেন। গাঁয়ের মানুষের সহজ সরলতা, খোদাভক্তি আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। আবার নতুন করে জীবন গড়ে নেবার প্রত্যয় আর তার পেছনে তাদের অগাধ পরিশ্রম দেখলে মনে মনে ভক্তি না করে পারবেন না। পদ্মা যতবার তাদের জমিজীবন কেড়ে নেয়, ততবারই তারা দৃঢ় প্রত্যয়ে নতুন বসতি গড়ে অন্য কোন চরে, তবে পদ্মার পাড় ছেড়ে তারা যায় না। পদ্মার সাথে তাদের নাড়ির বন্ধন। একেবারে গ্রামীণ জীবন তুলে এনেছিলেন লেখক। এত সুন্দর বই, অথচ তেমন নামডাক শুনি নি। কেন, কে জানে!
This entire review has been hidden because of spoilers.
Profile Image for Deeya Hafiz.
12 reviews5 followers
April 30, 2021
আলোচিত এই উপন্যাসটি পরে আসলে অনেক মনঃক্ষুন্ন হয়েছিলাম। মাত্র একজনের রিভিউ পড়ে জানলাম উপন্যাসটি মূলত ইংরেজি তে লেখা। তাহলে বলা ভালো অনুবাদ টা পড়ে যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছি।
জানি না কোন আঙ্গিকে সংক্ষেপ করতে গিয়ে অনুবাদক পুরো বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। কাহিনি বিল্ড আপ হতে হতে হঠাৎ করেই প্রধান চরিত্র গুলো নাই হয়ে যায় বা লম্বা সময় অনুপস্থিত রেখে চরিত্রদের তড়িঘড়ি সমাপ্তি দিয়ে দেয়া লক্ক্য করেছি।
তবে শেষের টুইস্ট টি আমার ভালো লাগে নি। ভালো লাগে নি এই কারণে যে অনুভূতির প্রগেসন এত স্পষ্টভাবে করে তারা যে ভাই বোন এটা আমার কাছে বিট্রেয়াল লেগেছে। আমরা নাহয় না জানি। লেখক/অনুবাদক তো জানেন তারা ভাইবোন। ভাইবোনের মধ্যে এ ধরনের সম্পর্কের গতি দেয়ার যৌক্তিক কোন কারণ দেখলাম না। এন্টিক্লাইম্যাটিক সমাপ্তি।
Profile Image for Mizanur Rahman.
2 reviews
March 28, 2020
প্রথম দিকে বোর লাগছে। লাস্টে ভালোই টুইস্ট আছে।
Profile Image for Gain Manik.
383 reviews4 followers
June 5, 2024
কাহিনী ভাল, অনুবাদ দুর্বল
Profile Image for Abul Hossain Moon.
225 reviews
February 4, 2026
একসাথে অনেক বেশি টপিক হেটে বেড়ায় এই উপন্যাস জুড়ে
Profile Image for Mahfus.
18 reviews11 followers
November 21, 2022
বহুদূর থেকে দেখি যদি, গাছপালা-ফুল-পাখি-নদী, আর মানুষ আর মানুষের সুখ-দুঃখ-স্বপ্ন-মৃত্যু-গান, তবে আভাস হয়ত মেলে বটে, নির্যাস থাকে সামান্যই। গল্পটা অতি দূর হতে দেখা, দূর হতে লেখা তৃতীয় পুরুষে, আমারে স্পর্শ করেনাই তাই।
Profile Image for Tanvir KLION.
43 reviews6 followers
February 1, 2015
জনৈক মোবারক হোসেন খান বইটার একটা সংকিপ্ত ভার্শন প্রকাশ করেছেন আহমদ পাবলিশিং হাউজ থেকে। পড়ে কষ্ট পেলাম ব্যাপক। উপন্যাস সংকিপ্ত আকারে প্রকাশের আইডিয়াটা কথা থেকে আসলো তা আমার বোধগম্য না।
Displaying 1 - 13 of 13 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.