দু'টি পরপর খুন। আপাতভাবে সরল সমাধান। তদন্তে নেমে এস আই দর্শনা বোস আবিষ্কার করেন, যা সহজ, তা সত্য নয়।সাধারণ জীবনযাপনের আড়ালে ওঁত পেতে আছে অবিশ্বাস, প্রতারণা ও অপরাধের ধূসর জগৎ। সামনে আসে তিরিশ বছরের পুরোনো এক অমীমাংসিত কেস, বীভৎসতায় যা কুঁকড়ে দেয় সমস্ত মানবিক মূল্যবোধকে। চরম ধূর্ত প্রতিপক্ষকে বুঝে নিতে নিতে দর্শনা মুখোমুখি হন এমন এক সত্যের, যার জন্য তিনি নিজেও প্রস্তুত ছিলেন না।নিষাদ, শুধু গতিময় আর রুদ্ধশ্বাস অপরাধকাহিনী নয়— এটি আসলে একটি প্রশ্নচিহ্ন। অপরাধ না অপরাধী, কে বেশি ঘৃণ্য?এস আই দর্শনা বোস সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস ও দ্বিতীয় গ্রন্থ নিষাদ। এবারের প্রেক্ষাপট পুরুলিয়া ও কলকাতা। চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠা শহুরে অপরাধকাহিনির আড়ালে নিষাদ আসলে এক মানবিক গল্প।
নিষাদ পিয়া সরকার অন্তরীপ প্রচ্ছদ: সুবিনয় দাস মুদ্রিত মূল্য: ৪৫০/-
ট্রু ডিটেকটিভ, মেয়ার অফ ইস্টটাউন বা আমাদের দেশের পাতাল লোক, এই প্রত্যেকটা ক্রাইম থ্রিলার সিরিজের মধ্যে একটা বিশেষ গুন লক্ষ্য করা যায়। এখানে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা চরিত্রগুলি শুধুমাত্র রহস্য সমাধানের জন্য ক্লুএর পিছনে ছুটে বেড়ায় না, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য বা ব্যাক্তিগত জীবনের প্রতিচ্ছবিও ফুটে ওঠে সিরিজগুলির মধ্যে। তারা প্রত্যেকেই যে সুপারম্যান নয়, আমাদের মতো রক্ত মাংসের মানুষ সেটাও বারবার দেখা গেছে। তাই এখানের ক্রাইমগুলিও সাধারণ মানুষেরই কথা বলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু কথা হচ্ছে, বই নিয়ে দু চার কথা লিখতে বসে হঠাৎ কেন ওয়েব সিরিজ নিয়ে পরলাম! কারণটা খুব সিম্পল। উপরে যে কয়েকটি গুনের কথা লিখলাম তার প্রত্যেকটাই নিষাদ বইটির ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। এখানে আমাদের মূল চরিত্র দর্শনা বোস রাজ্য পুলিসের একজন সাব ইনস্পেক্টর। পুরুলিয়ায় পোস্টিং হলেও একটি তদন্তের সূত্রে তাকে এসে পড়তে হয় কলকাতায়। পুরো ইনভেস্টিগেশান চলাকালীন দর্শনা চরিত্রটির উত্থান পতন, মানসিক টানাপোড়েন সবটাই খুব সযত্নে বোনা হয়েছে। পড়তে পড়তে সত্যিই একটা সময় দর্শনা বোস আর বইয়ের কেবল একটি চরিত্র হিসেবে থাকেন না, বরং তিনি যেন আমাদের আশেপাশে থাকা সাধারণ একজন মানুষ হয়ে ওঠেন। কঠোর ডিউটির ফাঁকেও কোন ক্ষেত্রে তিনি ভিক্টীমের প্রতি সহানুভুতিশীলও হয়ে ওঠেন। একটা কেস মানে কতগুলো সাসপেক্ট, টেস্টিমনি বা চার্জশীটই তার কাছে সবকিছু নয়। মূল চরিত্রের মতো এখানকার ক্রাইম এবং সহ কলাকুশিলবরাও খুব সাধারণ। তাদেরকে আমরা সবাই চিনি। তাদের মধ্যে উচ্চবিত্ত ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে একেবারে নিম্নবিত্ত বস্তির মানুষও বর্তমান। এটাই এই বইয়ের অন্যতম ইউএসপি। মানবমনের বিভিন্ন রিপু, অবদমিত বিকৃত কাম*মনস্কতা, বয়ঃসন্ধির চাপান উতোর, সন্দেহবাতিক, ব্ল্যাক*মেলিং মানে প্রায় সমাজের অন্ধকারাছন্ন সবগুলি দিক নিখুতভাবে ফুটে উথেছে উপন্যাসে। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, উপন্যাসে ড্রা*গ পেডলিং, ময়না*তদন্তের বিবরণ, বিডি*এস*এম, পে*ডো*ফি*লিয়া এবং নৃ*শং*স যৌ*ন অত্যাচারের বেশ কিছু বিবরণ উঠে এসেছে। কাজেই দুর্বল চিত্তের পাঠক প্রয়োজনে বইটি এড়িয়ে যেতে পারেন। এছাড়াও, পুরুলিয়া ছেড়ে আসার পর কলকাতা শহরের বর্ণনা, লালবাজারের অন্দরমহলের খুঁটিনাটি প্রমাণ করে, লেখিকার পরিশ্রমের প্রাচুর্য। অবশ্য এটা কোন নতুন ব্যাপার নয়। বৃশ্চিক সিরিজ যাদের পড়া আছে তারা বিলক্ষন জানেন পুলিশ অনুসন্ধানের প্রতিটা বিষয়ে নিয়ে লেখিকা কিভাবে গবেষণা করে থাকেন। এক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। রাজ্য পুলিশের বিভিন্ন প্রক্রিয়া, পধতি নিয়ে যত সুন্দর গবেষণা ছিল এবার লালবাজার এবং কলকাতা পুলিশের ক্ষেত্রেও ততটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বইয়ের শেষে সহায়ক গ্রন্থাবলীর তালিকাও এটিকে নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে। শহরের বর্ণনা এবং সাবলীল গদ্যের মাধ্যমে উপন্যাসোপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিও বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। পার্শ্ব চরিত্রগুলিকেও যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটা চরিত্রের নিজস্ব একটা আর্ক রয়েছে যা তাদের একে অপরের থেকে পৃথক করে। এতক্ষণ ধরে এত ভালো ভালো কথা দেখে অনেকের হয়তো মনে হবে তাহলে কি বইটায় সবই ভালো? খারাপ বলতে কিছুই কি নেই! যদিও এই কথাটা বৃশ্চিকচক্র বইয়ের ক্ষেত্রে খাটতে পারে। কিন্তু এই বইতে বেশ কিছু জিনিস মিসিং বলে আমার মনে হয়েছে (যদিও এটা আগের বইয়ের সাথে তুলনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। যেমন, দর্শনার ব্যাক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনটা যেভাবে আগের দুটো লেখায় উপন্যাসজুড়ে চোখে পড়েছিল সেটা এবারে অনেকটাই ম্রিয়মান। এছাড়াও, কোথাও না কোথাও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা আরও কিছুটা জোরালোভাবে দেখানো যেতে পারত। হয়তো বৃশ্চিকচক্র উপন্যাসের ক্ষেত্রে রাজনীতি একটা বিশাল অংশ অধিকার করেছিল বলে, এখানে রাজনৈতিক সমীকরণকে কিছুটা লঘু করে মানবমনের অন্ধকার দিকগুলির ক্ষেত্রে বেশী জোর দেওয়া হয়েছে। যদিও, এই মতামত একান্তই আমার ব্যাক্তিগত। এবার, ইতি টানার পূর্বে বইটির প্রোডাকশান কোয়ালিটি নিয়ে সামান্য কিছু কথা বলি। অন্তরীপের বইয়ের প্রোডাকশান যথেষ্ট ভালো। বাধাই মজবুত, ঝকঝকে পাতায় ফন্টও খুব আরামদায়ক। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে থাকা অলংকরণগুলিও মনোগ্রাহী। তবে, সামান্য কয়েকটি মুদ্রন প্রমাদ শুধরে নিলে বইটি যে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে তাতে কোন দ্বিমত নেই।
মোটের উপর এটি এমন একটি উপন্যাস যা একটি সফল পুলিশ প্রসিডিউরালের পাশাপাশি সমাজের দর্পণ হিসেবেও যথাযথ হয়ে উঠেছে। কাজেই এটি শুধুমাত্র গোয়েন্দা উপন্যাসই নয় বরঞ্চ তার চেয়েও গভীরে গিয়ে হয়তো সামাজিক উপন্যাসেই পরিণত হয়েছে। গোয়েন্দা কাহিনির নামে বস্তাপচা কিছু উপন্যাস পড়ে যারা এই জনরা থেকে দূরে সরে যেতে চাইছেন তাদের কাছে অনুরোধ একবার এই উপন্যাস হাতে তুলে দেখুন। এরকম গোয়েন্দা উপন্যাস যা তদন্তের আড়ালে, সমাজের নগ্ন চিত্রগুলিকে চোখের সামনে মেলে ধরে, বাংলায় রোজ রোজ লেখা হয় না।
পুলিশ প্রসিডিওরাল থ্রিলার হিসেবে দারুণ।তবে এন্ডিং টা নিয়ে স্যাটিসফাইড না।মনে হচ্ছে লেখিকা "শেষ করতে চেয়েও শেষ করল না"।বাদ বাকি তদন্ত প্রক্রিয়া,শেষ দিকে গিয়ে সব সুতা জোড়া লাগানো সবকিছু ছিল একদম টপ নচ।সমাজের অন্ধকার দিকগুলো এত বিশদভাবে বাংলা সাহ্যিতে খুব কম ই দেখেছি কোন রাইটার কে তুলে ধরতে।দর্শনা বোস কে নিয়ে আরো লিখা যাই এমন।
কলকাতার বালিগঞ্জের পেয়ারাবাগান বস্তিতে বসবাস করা চুমকি নামের এক তরুণী গৃহপরিচারিকা খু*ন দিয়ে 'নিষাদ' এর শুরুটা হয়। 'নিষাদ' দর্শনা বোস সিরিজের ৩য় বই। আজকে সিরিজের লেটেস্ট এ বইটা পড়ে কেমন লাগলো সেটা নিয়ে দু চার কথা লিখি।
পিয়া সরকারের এ সিরিজের আগের দুটো বই হচ্ছে 'বৃশ্চিক' ও 'বৃশ্চিকচক্র'। 'বৃশ্চিক' বছর তিনেক আগে পড়া হলেও 'বৃশ্চিকচক্র' পড়া হয়নি কোনো এক বিচিত্র কারণে। এমন না যে 'বৃশ্চিক' ভালো লাগেনি। 'বৃশ্চিক' প্রায় নিশ্ছিদ্র থ্রিলার। বাংলায় নিশ্ছিদ্র থ্রিলার তো খুব বেশি দেখি না। তারওপর কলকাতায়, যেখানে থ্রিলারের বেশ বড় একটা অংশ দখল করে রেখেছে তন্ত্র মন্ত্র সংক্রান্ত বই। যাই হোক, 'নিষাদ' পড়ার আগে দর্শনা বোসকে আরেকটু ভালো করে চেনার জন্য 'বৃশ্চিকচক্র' পড়লাম। আর তারপরে পড়লাম 'নিষাদ'। 'বৃশ্চিকচক্র' পুরোনো বই, আপনারা অনেকেই পড়েছেন, তাই বরং নতুন বই 'নিষাদ' নিয়েই কথা বলি।
শুরুতে যেমন বললাম, চুমকি খু*ন দিয়ে নিষাদ শুরু হয়। বস্তির পাশের একটা পুকুরের জায়গা ভরাট করে সেখানে প্রপার্টি বানানোর প্রমোটারের সাথে বস্তিবাসির ঝামেলার লিড দিত চুমকি, যে কারণে স্বাভাবিকভাবে সন্দেহের তীর সেই প্রোমোটার মেহতার দিকেই যায়। সন্দেহের লিস্টে থাকে চুমকির বয়ফ্রেন্ড সাগরও। ঘটনার পরে কলকাতা থেকে ভেগে যায় সাগর। তাকে খুঁজতে কলকাতা পুলিশের কর্মকর্তা বিজন যায় সাগরের গ্রামের বাড়ি পুরুলিয়াতে, আর সেখানেই দৃশ্যপটে আসেন পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি থানার দর্শনা বোস। গিয়ে দেখেন সেখানে খু*ন হয়েছে সাগরও।
জোড়া খু*ন রহস্য নিয়ে মাঠে নামেন বিজন আর দর্শনা বোস। নেমে বুঝতে পারেন চুমকি আর সাগরের খু*ন, স্বাভাবিক কোনো অপরাধ নয়, এর পেছনে আছে বড় কোনো শক্তি। যেদিক দিয়েই এগোয় না কেস, সামনে শুধু দুর্ভেদ্য দেয়াল এসে দাঁড়ায়। কী যেন একটা চোখে পড়ি পড়ি করে পড়ে না দর্শনার।
ব্যপ্তির দিক থেকে বিশাল এবারের কেসটা। সেই সাথে চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি। উপন্যাসের শুরুটা একটু স্লো লাগলেও লাগতে পারে। তবে প্রপার পুলিশ প্রসিডিউরালের টেস্টটা পাঠক পাবে। ধুম ধাড়াক্কা থ্রিলার যারা পড়েন তার অর্ধেকের আগেই বিরক্ত হবার চান্স আছে, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে গল্পের ফ্লো ঠিক আছে। লেখকের বর্ণনাভঙ্গীর ভক্ত আমি একদম প্রথম বইটা থেকে৷ দ্বিতীয়টাতেও সেটা অক্ষুণ্ণ ছিলো আর তৃতীয়টাতেও আছে। সেই সাথে পুলিশের যে একটা কেসে অসংখ্য দিক খেয়াল রেখে এগোতে হয়, সেটাও খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন লেখক। কানাইকে ইন্টারোগেট করেছেন, স্নিগ্ধাকে করেছেন, টুম্পার কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জেনেছেন, সাকিবের পেছনে ছুটেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এসব করে ধীরে ধীরে একটা গোটা ছবি মিলিয়েছেন।
তবে এগুলোর বাইরে এবারের বইটা যেদিক থেকে এক্সক্লুসিভ মনে হয়েছে সেটা হলো অপরাধের পেছনের যে গল্পটা সেটার সিলেকশনে। লেখক বেশ ভালো পড়াশোনা করেছেন, আটঘাট বেঁধে তবেই উপন্যাস রচনায় নেমেছেন। মেজর একটা ঝামেলাই চোখে পড়েছে, সেটা হলো ২২৪ পৃষ্ঠায় সাকিব ছেলেটার ফোন নাম্বারটা পাওয়া যাচ্ছিলো না, আবার তার ২০-২৫ লাইন পরে একই সিনে সাকিবের ফোন নাম্বারটা দিয়ে অ্যাড্রেস ট্র্যাক করানোর রিকোয়েস্ট রাখা হলো। হ্যাঁ, সাকিবের ফোন নাম্বার পাবার একটা উপায় আছে, তবে সেটা প্রোপার এক্সপ্লানেশান, সিন ব্রেকের দাবীদার।
কিন্তু এটা বইয়ের দুর্বল দিক মনে হলেও আমি মূলত খানিকটা হতাশ হয়েছি শেষটায়। না, ছড়ানো লুজ এন্ড মেলেনি, এমন না। তবে যে বিশাল জিনিসটার পেছনে দৌড়োচ্ছিলেন দর্শনা, সেটা কি তার ফোকাসপয়েন্ট ছিলো না? স্রেফ এই দুটো খু*ন এর রহস্য উদঘাটনই তাকে স্বর্গসুখ দিলো? নিদেনপক্ষে এর সাথে জড়িত র্যাকেট দুটোকে তো ধরবেন অথবা পরের বইতে ধরার ইঙ্গিত দেবেন, নাকি? মাঝে মাঝে গল্প লেখককে কনজিউম করে নেয়। লেখক গল্পটা যেভাবে লিখতে চান সেভাবে গল্পটা শেষ হয় না। এখানেও কি সে জিনিস হয়েছে কিনা কে জানে। কারণ যে লেখক এ বইতে জায়গায় জায়গায় ম্যাসেজ দেবার চেষ্টা করেছেন, বিস্তর ঘাটাঘাটি করে বেশ কম্পলেক্স একটা প্লট বুনেছেন, তার শেষটায় মিলিয়ে ফেললেও আরো যে এলোংগেশনটা দাবী করে, সেটা ফুলফিল হয়নি।
এটুকু বাদ দিলে 'নিষাদ' এ হতাশ হবার মতো কিছু নেই বললেই চলে। বরং মুগ্ধ হবার মতো দর্শনার ফিলোসফি আছে, ভাববার মতো কিছু উক্তি আছে, বিষণ্ণ সুন্দর কিছু দৃশ্য আছে। একটা বলে শেষ করি-
'আমাকে আশ্চর্যজনকভাবে এসব ঘোর পাটিগণিত— চার্জশিট, ক্লজ, টেস্টিমনি, অ্যালিবাই আর আকর্ষণ করে না। আমি মোকাম্বোর লাল আলোয় মাখামাখি অভ্যন্তর থেকে বাইরের কলকাতার দিকে তাকাই। সুবেশ, সরেশ, সমুজ্জ্বল কলকাতা। অথচ যার সামনে নিজের আসল চেহারাটা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করার মতো বোকামি আর দ্বিতীয় হয় না। নিজের ক্ষত, দ্বন্দ্ব, প্রবৃত্তি থেকে নিষ্কৃতি চাইতে কারওর দিকে হাত বাড়ানো যায় না। থালায় নুনের বদলে নির্মমতার স্বাদ পেতে পেতে মানুষ ভেবে নেয়, ওই একটি প্রবৃত্তি নিয়েই সে জন্মেছে।
মোকাম্বোর লালচে কমলা আলোয় দুলতে থাকে বিনোদনের পশরা। প্রায় অলৌকিক মাপের খাটে শুয়ে থাকা কৃষ্ণমোহনকে মনে পড়ে আমার। ফিরিঙ্গি পানির ফুল মনে পড়ে। মনে পড়ে কতবার, দেখা হলে বলেছেন, “কলকাতা আর আগের মতো নাই রে ছেমড়ি। বদলে গেসে বিলকুল। পচে গেসে।"'
বৃশ্চিক যদি পাওয়ারপ্লে তে খেলা দমকা ইনিংস হয় নিষাদ কিন্তু নিটোল টেস্ট ম্যাচের ধৈর্য সহ ছোট্ট ছোট্ট সূত্রগুলি কে যত্ন করে দানাপানি দিয়ে গল্পের মূল মঞ্চে নামিয়ে লড়িয়ে দেওয়ার আত্মবিশ্বাসের খতিয়ান ।
চরিত্র হিসাবে দর্শনা ব্যক্তিগত খাদ পেরিয়ে আরো শক্তপোক্ত তবে চটপটে চাবুকের মতো জিভের হাইস্টে এ হৃদয় কিন্তু তন্ময় দার হোস্টেজ।
পিয়া সরকারের কলম থেকে উঠে আসা 'নিষাদ'—এই নামটি শুধু একটি উপন্যাসের শিরোনাম নয়, বরং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অমীমাংসিত প্রশ্নের প্রতীক। মহাভারতের নিষাদরাজের মতো, যিনি সত্যের সন্ধানে নিজেকে বিসর্জন দেন, এই গ্রন্থটিও অপরাধের জটিল জালে জড়িয়ে পড়ে মানুষের মনের অন্ধকারকে উন্মোচিত করে। এস আই দর্শনা বোস সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস এটি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে অন্তরীপ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই ৩৫০ পৃষ্ঠার বইটি (মূল্য ৪৫০ টাকা) শুধু একটি পুলিশ প্রসিডিউরাল নয়, বরং একটি সামাজিক দর্পণ, যা পড়তে পড়তে আপনার হৃদয়কে নাড়া দেবে এবং মনকে চিন্তায় মগ্ন করে ফেলবে।
গল্পের সূত্র: পুরুলিয়া থেকে কলকাতার অন্ধকার গলিতে পুরুলিয়ার ধুলোমাখা রাস্তা থেকে শুরু হয়ে কলকাতার গড়িয়াহাটের চকচকে আলোয় পৌঁছে যাওয়া এক তদন্তের যাত্রা। 'নিষাদ' শুরু হয় দু'টি পরপর খুনের রহস্য দিয়ে—একটি কলকাতা পুলিশের এলাকায়, অন্যটি রাজ্য পুলিশের। আপাতভাবে এগুলো সাধারণ অপরাধ মনে হলেও, তদন্তের গভীরে নামতেই উন্মোচিত হয় অবিশ্বাসের জাল, প্রতারণার ছায়া এবং ৩০ বছরের পুরোনো এক অমীমাংসিত কেসের স্মৃতি। চুমকি নামের এক তরুণী গৃহপরিচারিকার খুন থেকে শুরু হয় সব, যার সাথে জড়িয়ে পড়ে তার বয়ফ্রেন্ড সাগর, প্রমোটার মেহতা, এবং এক অজানা ধূর্ত প্রতিপক্ষের ছায়া।
পুলিশের জুরিস্ডিকশনের জটিলতা, ব্ল্যাকমেলিংয়ের চক্র এবং সমাজের নিম্ন-উচ্চ স্তরের মানুষের জড়িত থাকা—এসব মিলিয়ে গল্পটি একটি স্লো-বার্ন থ্রিলারে রূপ নেয়, যেখানে প্রত্যেক পাতায় লুকিয়ে থাকে একটি নতুন টুইস্ট। কিন্তু স্পয়লার এড়িয়ে বলি, এটি শুধু খুনের রহস্য নয়; এটি একটি মানবিক গল্প, যা অপরাধের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমাজের বিকৃত প্রবৃত্তিকে তুলে ধরে। পড়তে পড়তে মনে হয়, কলকাতার ব্যস্ততার মাঝে এমন কতগুলো গল্প চলছে, যা আমরা দেখেও দেখি না।
চরিত্রের জগৎ: সাধারণ মানুষের অসাধারণ যাত্রা উপন্যাসটির সবচেয়ে মায়াময় দিক হলো চরিত্র গঠন। মূল চরিত্র এস আই দর্শনা বোস—একজন সাধারণ পুলিশ অফিসার, যিনি পুরুলিয়ায় পোস্টেড, কিন্তু কলকাতার তদন্তে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর মানসিক টানাপোড়েন, উত্থান-পতন এবং ভিকটিমের প্রতি সহানুভূতি এতটাই বাস্তব যে, তিনি সুপারহিরো নন, বরং আমাদের মতোই একজন মানুষ—যিনি দায়িত্বের ভারে ক্লান্ত হয়েও সত্যের পেছনে ছুটছেন। এবারের গল্পে দর্শনার ব্যক্তিগত জীবন কিছুটা পটভূমিতে সরে গেলেও, তাঁর অনুসন্ধানী মনের তীব্রতা পাঠককে আরও কাছে টেনে নেয়। পার্শ্বচরিত্ররা যেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি: চুমকি এবং সাগরের মতো নিম্নবিত্ত যুবক-যুবতী, যাদের স্বপ্নগুলো অপরাধের ছায়ায় ম্লান হয়; বিজনের মতো কলকাতা পুলিশের কর্মকর্তা, যিনি ব্যবস্থার জটিলতায় আটকে পড়েন; এবং উচ্চবিত্ত প্রমোটার মেহতার মতো চরিত্র, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কানাই, স্নিগ্ধা, টুম্পা বা সাকিবের মতো সাইড চরিত্রগুলির নিজস্ব আর্ক আছে—যেমন একজন ইউটিউবারের মাধ্যমে সমাজের স্টিগমা বা একজন দরোয়ানের প্রতিবাদের ছায়া। এরা শুধু গল্পের স্তূপ নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন অংশকে প্রতিফলিত করে, যা পড়তে পড়তে আপনাকে নিজের চারপাশের মানুষদের স্মরণ করিয়ে দেয়। অপরাধের চেয়ে অপরাধীর মন বেশি ভয়াবহ 'নিষাদ' শুধু থ্রিলার নয়, এটি একটি সামাজিক প্রশ্নপত্র। মূল থিম হলো—অপরাধ না অপরাধী, কে বেশি ঘৃণ্য? গল্পের মাধ্যমে উঠে আসে ড্রাগ পেডলিং, পেডোফিলিয়া, নৃশংস যৌন অত্যাচার, ব্ল্যাকমেলিং এবং মানসিক অসুস্থতার উপেক্ষার মতো সমস্যা। এগুলো শুধু ঘটনা হিসেবে নয়, বরং সমাজের অন্ধকার দিকের দর্পণ—যেখানে উচ্চবিত্তের কামনা এবং নিম্নবিত্তের হতাশা মিলে এক বিষাক্ত চক্র তৈরি করে। পুলিশ প্রসিডিউরালের বাস্তবতা—ময়নাতদন্ত থেকে জুরিস্ডিকশনের ঝামেলা—এতটাই গবেষণা-ভিত্তিক যে, মনে হয় লেখিকা নিজেই তদন্তে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে মনোজ্ঞ অংশ হলো মানবিকতার স্পর্শ: শিশু-নারী শোষণের পেছনে পারিবারিক সম্মানের অন্ধতা বা আইনের ফাঁকফোকর কীভাবে সমাজকে খায়—এসব নিয়ে লেখিকা যেন এক অদৃশ্য আয়না ধরে দিয়েছেন।
ব্যাক্তিগত ভাবে গল্পের বেশ কয়েকটি তাত্ত্বিক স্তর রয়েছে বলে মনে হয় —সামাজিক, মানসিক, ন্যারেটিভ এবং নৈতিক। সেই বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করলাম।
তাত্ত্বিক থিম: সমাজ, অপরাধ এবং মানব মনের অন্ধকার। 'নিষাদ'-এর কেন্দ্রীয় থিম হলো সমাজের অন্ধকার দিক—যা অপরাধের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়। তাত্ত্বিকভাবে, এটি সম্ভবত ফুকোর 'পাওয়ার-নলেজ' ধারণার সাথে যুক্ত। অপরাধ কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ফল? উপন্যাসে ড্রাগ পেডলিং, পেডোফিলিয়া, নৃশংস যৌন অত্যাচার এবং ব্ল্যাকমেলিং-এর মতো উপাদানগুলো শুধু প্লট ডিভাইস নয়, বরং সমাজের বিকৃত প্রবৃত্তির প্রতীক। নিম্নবিত্তের স্লাম থেকে উচ্চবিত্তের হাই-রাইজ পর্যন্ত, অপরাধ সব স্তরে ছড়িয়ে আছে, যা দেখায় কীভাবে 'সভ্য' সমাজের অন্ধতা (যেমন পারিবারিক সম্মানের নামে মানসিক অসুস্থতার উপেক্ষা) ভিকটিমদের নীরব করে। এটি সামাজিক থিয়োরির দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সমালোচনা: শিক্ষিত অভিজাতের হিপোক্রেসি এবং সিস্টেমের ফাঁকফোকর কীভাবে শিশু-নারী শোষণকে প্রশ্রয় দেয়। মানসিক তাত্ত্বিক স্তরে, উপন্যাসটি ফ্রয়েডিয়ান 'রিপ্রেসড ডিজায়ার'-এর ধারণা অনুসরণ করে বলে মনে হয়েছে । চরিত্রগুলোর মনে লুকিয়ে থাকা পরিত্যক্ত কামনা, কৈশোরের চাপ এবং নৈতিক অস্পষ্টতা—এইসব অপরাধের উৎস। সাধারণ মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নৃশংসতা, যা তারা নিজেরাই উপলব্ধি করে না, এটি একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে রূপ নেয়। দর্শনা বোসের চরিত্র এখানে কেন্দ্রীয়, তাঁর মানসিক চাপ, ভিকটিমের প্রতি সহানুভূতি এবং পেশাগত চ্যালেঞ্জ (যেমন মিসোজিনি এবং ভিকটিম-ব্লেমিং) তাঁকে একটি রিয়ালিস্টিক প্রোটাগোনিস্ট করে তুলেছে । দর্শনার মানসিক উত্থান-পতন, ফুকোর 'সাবজেক্টিভিটি' দেখায় —কীভাবে সামাজিক ব্যবস্থা একজন ব্যক্তিকে গঠন করে এবং ভাঙে। পার্শ্বচরিত্ররা—যেমন প্রমিত (উচ্চবিত্ত), গোবিন্দ নস্কর (নিম্নবিত্ত, সামাজিক স্টিগমা-যুক্ত), ইউটিউবার (সমাজের এক অংশের প্রতিনিধি, প্রতিবাদী) এবং দরোয়ান—সমাজের ডেমোগ্রাফিক রিপ্রেজেন্টেশন করে। এরা শুধু সাসপেক্ট নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের আর্ক বহন করে, যা সেট থিয়োরির মতো ওভারল্যাপ করে গল্পকে জটিল করেছে। কিছু ক্ষেত্রে স্লো মনে হয় বটে, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বেশ ইন্টারেস্টিং। টু সামারাইজ উপন্যাসের তাত্ত্বিক কাঠামো ট্র্যাডিশনাল ডিটেকটিভ স্টোরির কাঠামোকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করেছে বলে মনে হয়েছে।
লেখনীশৈলী: ধারালো এবং হাস্যরসের ছোঁয়া, সহজ, সাবলীল ভাষায় লেখা, কিন্তু প্রত্যেকটি বাক্যে গবেষণার এবং পরিশ্রমের ছাপ। সংলাপগুলো বুদ্ধিদীপ্ত, মেটাফরগুলো কলকাতার রাস্তার মতো জীবন্ত। হাস্যরসের ছোঁয়া—যেমন পুলিশের অভ্যন্তরীণ কথোপকথন—গম্ভীর থিমের মাঝে স্বস্তির নিশ্বাস দেয়, কোনো আলাদা কমিক চরিত্র ছাড়াই। প্রচ্ছদের সৌন্দর্য এবং প্রিন্ট কোয়ালিটি বইটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সামগ্রিকভাবে, এটি সামাজিক থিওরি এবং রহস্যকে মিশিয়ে এক অসাধারণ স্বাদ দেয়।
যদি আপনি শুধু রহস্য চান, তাহলে 'নিষাদ' আপনাকে রুদ্ধশ্বাস রাখবে; কিন্তু যদি সমাজের সত্যিকারের ছবি দেখতে চান, তাহলে এটি আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।বইটি পড়ে শেষ করলে মনে হয়, অপরাধের জাল ছিঁড়ে ফেলার জন্য শুধু পুলিশ নয়, আমরা সকলেই দায়ী। কারণ 'নিষাদ' শুধু বই নয়, একটি যাত্রা—সত্যের সন্ধানে।
পিয়া সরকারের দর্শনা বোস সিরিজের তৃতীয় বই "নিষাদ"। প্রথম দুটো বই পড়ার ভালোলাগা থেকে স্বাভাবিকভাবেই এই বই প্রকাশ হবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। সেই আগ্রহের অবসান বিফলে গেল না। পিয়া সরকার এই বইতেও তাঁর অসাধারণ ক্ষুরধার লেখনীর সাক্ষর রেখেছেন অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভঙ্গিতে। কোনো কঠিন শব্দ প্রয়োগ বা কোনো ভাষার জটিল তথ্যের প্রয়োগ না রেখেও যে মানব প্রবৃত্তির অতীব জটিল ও নৃশংস দিককে পাঠকের সামনে তুলে ধরা যায়, তারই প্রমাণ এই বই।
এবারের ঘটনা পুরুলিয়া ও কলকাতা কেন্দ্রিক। কলকাতায় এক অতি সাধারণ গৃহ পরিচারিকার মৃত্যুর তদন্তের অভিযুক্তকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে কলকাতা পুলিশের ইন্সপেক্টর পুরুলিয়ায় এলে আবিষ্কৃত হয় আরেক রহস্যের। সেই রহস্য উদঘাটনের দায় বর্তায় স্থানীয় থানার সাব- ইন্সপেক্টর দর্শনা বোসের উপর। এর পরবর্তী পর্যায়ে পুরুলিয়া এবং কলকাতার আপাত দুই সাধারণ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে কলকাতার বুকে ঘটে চলা কয়েক যুগের এক নারকীয় ক্রিয়ার অন্ধকার পৃথিবী উন্মোচিত হয়ে পড়ে। যে পৃথিবীর মানুষ মুখোশধারীদের অন্তরালে একদল নরপিশাচের সন্ধান পাওয়া যায়। যারা সভ্যসমাজে তথাকথিত উঁচু মহলের ভদ্র সম্প্রদায় গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন। এই জীবন্ত নরকে রেহাই পায়না শিশুরাও। রিপুতারিত মানুষের চরম বিকৃতির প্রকাশ যে কত নৃশংস ও ভয়ঙ্কর হতে পারে তা আমরা কল্পনাই করতে পারিনা। আমাদের চারপাশের অত্যন্ত ঘনিষ্ট ও বিশ্বাসের মানুষগুলোই যে আমাদের জীবনে দুর্বিষহ যন্ত্রণার কারণ হতে পারেন, তাই বা ভাবার ক্ষমতা কোথায় আমাদের!! অথচ এটাই চরম ও কঠোর বাস্তব হয়ে ধরা পড়েছে এই বইয়ে। এই বইয়ের কোনো একটা পৃষ্ঠা এমন নেই যা পরবর্তী পৃষ্ঠা পড়তে বিরক্তি তৈরি করে। এক নিঃশ্বাসে পরপর পড়ে যেতে যেতে কখনও ঘেন্নায় গা গুলিয়ে ওঠে, কখনও কষ্টে যন্ত্রণায় হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে, আবার কখনও আইনের বিভিন্ন ফাঁক - ফোকরের দুর্বলতা দেখে প্রবল রাগে সারা শরীর নিশপিশ করে ওঠে বিধ্বংসী কিছু করার জন্য।
এই বই শুধু রহস্য উপন্যাস নয়। এই বই ভারতের বর্তমান সমাজের এমন এক অবক্ষয়কে তুলে ধরেছে যার উপস্থিতি প্রতিটি নাগরিক জানেন, বোঝেন কিন্তু চিরকালীন প্রাচীন সংস্কারে জড়িয়ে উচ্চারণ করতে দ্বিধা বোধ করেন। এই কাহিনী বর্তমান নাগরিক সভ্যতার এমন এক দিক উন্মোচন করেছে, যেখানে সদা ব্যস্ত অতি শিক্ষিত উচ্চবিত্ত বাবা মা তাঁদের সন্তানের দিকে লক্ষ রাখার সময় পান, প্রয়োজন বোধ করেন না শিশুর শারীরিক বা মানসিক সমস্যার সমাধানের রাস্তা খোঁজার। সহজেই উপেক্ষা করেন মানসিক অসুস্থতাকে এবং আঁকড়ে ধরেন চিরাচরিত বস্তাপচা পারিবারিক সম্মানকে। আর এই উপেক্ষা - অবহেলার কারণে চিরকালের জন্য হারিয়ে যায় লক্ষ কোটি 'প্লাবন' ও ' টিটো'-রা। সত্যকে লোকচক্ষুর সামনে তুলে ধরে উঁচুতলার ভদ্র সমাজের প্রতিনিধিকে কাঠগড়ায় তোলার চেষ্টা করে প্রাণ দেয় কত শত 'চুমকি'রা। নরপশুর হিংস্রতার কাছে সমাজের উঁচু ও নিচু দুই তলাই সমান হয়ে যায়। লেখিকাকে কুর্নিশ জানাতে হয় যে, লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে যাওয়া সমাজের অত্যন্ত ঘৃণ্য,বিকৃত, পাশবিক ও অনুচ্চারিত অপরাধের দিকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। শিশুর জন্ম দিয়ে তার জন্য অফুরন্ত অর্থব্যয় করাটাই যে শুধু এ��জন বাবা মায়ের কর্তব্য নয়, একটি শিশুর দৈনন্দিন ব্যবহারের দিকে নজর রাখা এবং তার চারপাশের মানুষদের সাথে তার যোগাযোগ ও প্রতিক্রিয়ার খুঁটিনাটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকাও যে বাবা মায়ের অতি প্রয়োজনীয় কর্তব্য হয়, তাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। শিশু ও নারী শোষণ যে বর্তমান সমাজে বিপুলরূপে বিদ্যমান, তাও পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন। খুব ভালো লাগে এই সমস্ত বিষয়ে সামঞ্জস্য পূর্ণ লেখিকার দার্শনিক উক্তিগুলো।
বইয়ের কাহিনীর সাথে সাথে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের। অন্ধকারময় এই কাহিনীর সাথে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ। যা বইয়ের প্রতি পৃথক আকর্ষণ তৈরি করে। শুধু সামান্য আক্ষেপ রয়ে যায় বইয়ের স্বল্প কিছু বানান ভুল ও ছাপার ভুলের জন্য। আশাকরি পরবর্তী সংস্করণে এই ভুল ত্রুটি শুধরে নেওয়া হবে। লেখিকার কলমে দর্শনার আরও কাহিনীর মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন জটিল ও ধামাচাপা দেওয়া দিকের উন্মোচন ঘটার অপেক্ষায় রইলাম। রইল আগাম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
রাজর্ষি দাস ভৌমিকের "কানাইচরণ" সিরিজের মতনই পিয়া সরকারের "দর্শনা বোস" সিরিজ একই ঘরানার হার্ড বয়েল্ড, রিয়েলিস্টিক পুলিশ প্রসিডিউরাল।
নিষাদ স্লো বার্ন এবং চমৎকার গবেষণা সমৃদ্ধ। কেসটাও মালটিডাইমেনশনাল। গল্পে কোথাও লেখিকা মারাত্মক টুইস্ট দেওয়ার চেষ্টাই করেননি, বরং পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মত কেসের আরও ভেতরে ঢোকা হয়েছে আর যত ঢুকেছেন, তত পচে গলে নোংরা হয়ে যাওয়া অস্বস্তিকর জিনিস সামনে এসেছে।
এ বই পড়ে কোনো চরিত্রের জন্য ভিন্ডিকেশনের ফিলিং মনে আসে না। বরং তৈরি হয় এক অদ্ভুত বিষাদ। এ গল্পে কেউই জয়ী নয়। এখানে কোনো হ্যাপী এন্ডিং নেই।
ভাল লাগল পড়ে।
বইয়ের প্রোডাকশন চমৎকার। প্রচ্ছদও বেশ সুন্দর। সম্পাদনা হয়েছে কিনা জানি না। হয়ে থাকলে আরেকটু মার্জিনালি বেটার হতে পারত।
এই বইয়ের রিভ্যু দেওয়া কঠিন। বিশেষত গোয়েন্দা উপন্যাস নিয়ে কিছু বাতিকগ্রস্ততার কারণে। অসামান্য গবেষণা, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ, কলকাতা শহরকে নিজের হাতের তালুর মতো ব্যবহার করে ফেলা, সবই খুব ভালো লেগেছে। তবে সবথেকে ভালো লেগেছে দর্শনাকে এত বাস্তব, এত সৎভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। পুরুষ সহকর্মীদের অবিশ্রান্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিসোজিনির বদলে ভিক্টিম ব্লেমিং নয়, উচ্চকিত ডায়ালগ নয় (যা খুব সহজেই জনপ্রিয় করে ফেলার উপায়), স্রেফ কাজের জোরে ও কব্জির জোরে সাফল্য পাওয়া দেখানোর জন্য কুর্ণিশ। ভাষা ও প্লটের প্রয়োগে বৃশ্চিকচক্র থেকে তিনশ ষাট ডিগ্রি ঘুরে গেছে এই উপন্যাস, বৃশ্চিকচক্রের কাব্যময়তার বিপরীতে কয়েকটি জায়গায় কথ্য ভাষা এবং বর্ণনা এত 'র' যে পড়তে কষ্ট হচ্ছিল। প্লট বিল্ডাপ এত চমৎকার যে সেই কষ্ট গিলতে বাধ্য হয়েছি। এত সৎ আর নিখুঁত পুলিশ প্রসিডিওরাল বাংলায় আর লেখা হয়েছে কিনা জানি না। এই রিভ্যু পাঠককে প্রভাবিত না করাই ভালো। লেখিকাকে বিপুল শুভেচ্ছা।