ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় লেখকের ছদ্মনাম। তাঁর প্রকৃত নাম তারাদাস। জন্ম ১৯০৪ সালের ৭ মার্চ এবং মৃত্যু ১৯৭৫ সালের ২৫ এপ্রিল। বঙ্গলক্ষ্মী মাসিকপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে তিনি কাজ করতেন।
তাঁর উপন্যাস পড়েই সাহিত্যপাঠের সূচনা হয়েছিল অনেকের। তাঁর উপন্যাস এতোই জনপ্রিয় ছিল যে চলচ্চিত্রের কাহিনী হিসেবেও সমাদৃত হয়েছিল। 'চিতা বহ্নিমান' এবং 'শাপমোচন' এর জনপ্রিয়তা এখনও তুঙ্গে। পাঠকসৃষ্টিতে তিনি একটা বড় ভূমিকা পালন করেছেন।
'আকাশ বনানী জাগে' (১৯৪৩), 'আশার ছলনে ভুলি' (১৯৫০), 'বহ্নিকন্যা' (১৯৫১), 'ভাগীরথী বহে ধীরে' (১৯৫১), 'মন ও ময়ূরী' (১৯৫২), 'জলে জাগে ঢেউ' (১৯৫৪), 'মীরার বধূয়া' (১৯৫৬), 'স্বাক্ষর' (১৯৫৭), 'চরণ দিলাম রাঙায়ে' (১৯৬৬) তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। 'হিঙ্গুল নদীর কূলে' (১৯৩৫) এবং 'কাশবনের কন্যা' (১৯৩৮) তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ।
দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসের প্রারম্ভ যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক,যেখানে সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে দুর্ভিক্ষের চিত্র,মৃত্যুর কড়াল গ্রাসের সামনে ক্ষুৎপীড়িত মানুষের অসহায়ত্ব এবং পরিশেষে আত্মসমর্পণ! উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণ ও খারাপ নয়।উপস্থিত চরিত্রগুলোর মাঝে রাজু এবং বারুণী-এই দুই চরিত্রের কিছু বিশেষত্ব আমাকে যথেষ্ট আকর্ষণ করেছে।আরেকটি চরিত্রের কথা উল্লেখযোগ্য-রাজুর বিবেকস্বরূপ তারণ ঠাকুর।রাজুর মাঝে আমরা যে শিক্ষা সংস্কার ও উন্নত জীবনাদর্শের ছোঁয়া দেখতে পাই,তার উৎসরূপে প্রতিবার তারণ ঠাকুরের কথা বলা হয়েছে।এ যেন মানুষ ও তার বিবেক,যে বিবেক অন্যায় কাজ করতে গেলেই জাগ্রত হয়ে মানুষকে পাপকাজ থেকে বিরত রাখে।উদাহরণ পাওয়া যায় জবা অথবা কুন্তির ঘটনায়-ই!দুবারই রাজু আত্মসংবরণ করে একটা কথা মনে আসাতেই-"আমি তারণ ঠাকুরের সাগরেদ।" বারুণী চরিত্রে প্রচ্ছন্নভাবে মূর্ত হয়েছে স্বাধীনচেতা প্রতিবাদী নারীর প্রতীক,ললিত লবঙ্গলতারূপা পল্লীবধূ নয় সে।তাকে অসতী বা কলঙ্কিনী রূপে ঠাওরানো যায় না,কেননা সুদিনে সে স্বামীর অবিশ্বাসিনী হয় নি।কেষ্টর ঘর সে ছেড়েছিল কেষ্টর অভাবের তাড়নায়-ই,যাতে কেষ্টর কষ্ট কম হয়।বাপের বাড়িতেও যখন খাদ্যাভাব প্রবল তখন সে অবগুণ্ঠন ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে কাজের সন্ধানে,সুযোগসন্ধানী শেয়ালেরা তাকে ভুলিয়ে নিযুক্ত করে পতিতাবৃত্তিতে,অভাবের তাড়নায় সে তাই করতে থাকে।এখানে তার চরিত্রে কোন কলঙ্ক বা দোষ আমার চোখে পড়ে না,বরং সে স্বামী অনুরাগী,বাস্তববাদী এবং ত্যাগী চরিত্র! তার স্বাধীনচেতা মনোভাবের সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে মোড়লের বশ্যতা স্বীকার না করার মাধ্যমে।তার উপস্থিত বুদ্ধি,প্রতিবাদ ও দৃঢ়সংকল্পের প্রকাশ আমরা দেখতে পাই নাটুকে গোয়ালে আটকে রেখে পালানোর মধ্য দিয়ে।তার চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যাবলী অনন্য এবং প্রশংসনীয়। তবে উপন্যাসটি পড়ে একটু অপূর্ণতার অনুভুতি রয়ে গেছে,মনে হয়েছে রাজুর চরিত্রে যে জীবনদর্শন ফুটে উঠছিল তা পূর্ণতা পায় নি,কদমফুল আধফোটা রয়ে গেছে।শেষটা আমার ভালো লাগে নি। তবে উপন্যাসে আরো অনেক উল্লেখযোগ্য বার্তা ছিল,ছিল সমাজব্যবস্থা,দুর্ভিক্ষের চিত্র আর মৃত্যুর হাহাকারের পাশাপাশি জীবনের শাশ্বত জয়গান।মোটের উপর,খারাপ না :-)