সিদ্দিক আহমেদের লেখায় সবসময়ই ঐতিহাসিক একটা আবহ থাকেই। তার এবারের থ্রিলার উপন্যাসেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। ঐতিহাসিক নটরাজ মূর্তির খোঁজে একদল লোক গেল বান্দরবানে। ভারত থেকে আসল আরেকটি অনুসন্ধানী দল। মাঝখানে মূর্তিমান দুষ্টগ্রহের মতো এসে দাঁড়ালো এক বিদেশী। শুরু হল এক জটিল থ্রিলার গল্প। টানটান উত্তেজনায় গল্পটা ক্লিফ হ্যাঙ্গার হতে গিয়েও যেন হল না। শেষ পর্যন্ত আমরা পেয়ে গেলাম একট পরিপূর্ণ থ্রিলার গল্প... জানতে পারলাম চোল সাম্রাজ্যের শেষ মূর্তিটির কি পরিণতি। সানপেন্স টেনশন আর অ্যাকশন মিলিয়ে একটা উত্তেজনাপূর্ণ থ্রিলার গল্প এই ‘নটরাজ’। পাঠকদের ভালো না লাগার কোনো কারণ নেই।
বইটায় ৩ টা কাহিনী ধরে আগায়।একটা অতীত আর দুটা বর্তমানের। বর্তমানের দুইটাতে খুব বেশি ইনফো ডাম্পিং আছে।এটা বিরক্তি লাগাতে পারে অনেকের তবে যে ইনফো আছে সেগুলো গল্পের সাথে কানেক্টেড না হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম আর আদীবাসিদের ইতিহাস বলে যায়।অতীতের কাহিনীটা সবচেয়ে বেশি অসাধারণ। যখনই অতীতের টাইমলাইনে চোল সাম্রাজ্য নিয়ে পড়ছি গ্রোগাসে গিলেছি সেখানের জায়গা। আদিত্য,ভাল্লা,মদুরান্তক এদের অনেকদিন মনে থাকবে। কূটনৈতিক চালগুলা দারুণ। বইয়ে প্রচুরউউউউ বানান ভুল। কত ভুল তা উ গুলা থেকেই বুঝে নেন।
ভারতবর্ষের মানচিত্র যদি খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করা হয়, তাহলে খুব সহজেই দক্ষিণ ভারত আর বঙ্গের মাঝের দূরত্ব স্পষ্টত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি কোনোভাবে জানা যায়, সেই দক্ষিণ ভারতের সাথে এই বঙ্গের সূক্ষ্ম একটা সংযোগ আছে, সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য?
তেমনই এক তথ্য যেন অবাক করেছে ভীষণ। তিন বন্ধু ঘুরতে গিয়েছিল বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায়। রক্ত গরম, তরুণ প্রাণ ভীষণ চঞ্চল— তাই সেনাবাহিনীদের পরামর্শ, গাইডের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও এমন এক জঙ্গলে ওরা প্রবেশ করে, যা হয়তো ইতিহাস পাল্টে দিবে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এক বন্ধুর চোখে এমন এক মূর্তি ধরা দেয়, যা ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন।
ইতিহাস তাকে নটরাজ বলে অভিহিত করে…
◾ইতিহাসের পাতা থেকে :
চোলা সম্রাজ্যের সাথে পাণ্ড্য সম্রাজ্যের সাপে নেউলে সম্পর্ক। যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকে। শেষ যখন যুবরাজ আদিত্য কারিকালান পাণ্ড্য রাজাকে দৌড়ানি দিলো, এক বিশেষ বস্তু সে নিয়ে গিয়েছিল। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি। আদিত্যের হাতে চলে আসে সেই মূর্তিটি। এবং সে এমনভাবে এই মূর্তিটি সংরক্ষণ করে, বিশ্বস্ত এক সহযোদ্ধা, সেনাপতি, বন্ধুতুল্য মানুষের হাতে তুলে দেয়— যা এমন এক জায়গায় লুক্কায়িত থাকবে, কেউ হয়তো খুঁজে পাবে না।
সাম্রাজ্য জুড়ে ষড়যন্ত্রের আভাস। আদিত্য তার বাবার দর্শন পাচ্ছে না। পাচ্ছে না কোনো সংবাদ। তাই বিশ্বস্ত সহযোগীকে পাঠিয়েছে, যে এমন কিছু তথ্য এনে দিয়েছে; যা নিজের ভাবনাকে অন্যদিকে ত্বরান্বিত করে। ক্ষমতার জন্য মানুষ রক্তের ক্ষয় করে হরহামেশা। এই যেমন নিজ চাচা, এতদিন যে মুখোশের আড়ালে নিপাট ভদ্রলোক ছিল, ক্ষমতার লোভে ষড়যন্ত্রের খেলায় মেতে উঠেছে। অন্যদিকে নিজ প্রজাদের রক্তের অপচয় রোধে কেউ যখন ক্ষমতা ছেড়ে যেতে চায়, তাকেই প্রকৃত রাজা বলা যায়।
ওদিকে নিজেদের বিশেষ বস্তু হারিয়ে থেমে থাকবে পাণ্ড্যরা, এটা ভেবে ওঠার কারণ নেই। ভারতীয় রাজা-বাদশারা নিজ নিজ ধর্মের কাছে নিজেদের সঁপে দেয়। দেবতাদের রক্ষা করাই প্রধান কর্তব্য। তাই নিজেদের কুলদেবতাকে হারিয়ে দিশেহারা পাণ্ড্য রাজা বিশেষ কয়েকজনকে প্রস্তুত করেছে। উদ্ধার করতে হবে সেই বাক্স, মরতে হবে আদিত্যকে। আর এই ষড়যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ যে নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরে, তা হয়তো আদিত্যও জানে।
রক্তের খেলা শুরু হয়ে গিয়েছে। আদিত্যের শেষ পরিণতি এভাবে মেনে নিতে পারে না ভান্দিয়াদেবন। নতুন খেলায় মেতে ওঠে সে। আদিত্যের দেওয়া কাজ যে সমাপ্ত করতে হবে। সাথে আছে আদিত্যের ছোটো ভাই। বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব আর ক্ষমতা দখলের এই লড়াইয়ে প্রচুর রক্তক্ষয় হবে। জিতবে তো এক পক্ষ। রাজত্ব করবে সম্রাজ্যের। কিন্তু এই সম্রাজ্যের বিস্তৃতি কী করে বাংলায় ছড়িয়ে পড়ল? সংযোগটা কোথায়? যখন সত্যটা জানা যায়, বিস্ময়ে চমকে উঠতে হয়!
◾এবারে বর্তমান :
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকে মূর্তির ছবি ছড়িয়ে পড়ে। খুব যে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে, এমন না। কিন্তু সঠিক মানুষের কাছে ঠিকই চলে যায়। যাদের কেউ কেউ প্রত্নতত্ত্বের এরূপ নিদর্শনে বিস্মিত হয়। নিজেদের জ্ঞানবুদ্ধি লাগিয়ে খুঁজে বের করে প্রাচীন কোনো সভ্যতা। আবার কেউ থাকে, অর্থের লোভে বিশেষ বিশেষ নিদর্শন আয় করে প্রচুর অর্থ কামাতে পারে। নিজেদের এই স্বার্থের খেলায় সবাই মিলিত হচ্ছে বাংলাদেশের পাহাড়ে।
রাশাদের স্বপ্ন ছিল প্রত্নতত্ত্ববিদ হওয়ার। কিন্তু ভাগ্যের খেলায় সেই সুযোগ তার হলো না। নৃতত্ত্বে পড়াশোনা করলেও এখন সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বান্ধবী জয়িতার এক ফোনকল তাকে নতুন উদ্যমে সম্ভাবনার সুযোগ এনে দেয়। ভারতের বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ বালামুরগান পান্ডিয়া এসেছে ঢাকায়। যার সাথে জয়িতা নিজে কাজ করে। গোপন এক মিশনে ভারত-বাংলাদেশের সমন্বয়ে বিশেষ কাজে লেগে পড়েছে, যা উদঘাটন হলে শোরগোল পড়ে যাবে।
সেই প্রত্নততবিদের প্রয়োজন বাংলাদেশের একজন চৌকষ ছেলের। সেই কাজেই রাশাদ জুটেছে ওদের সাথে। পাহাড়ি অঞ্চলে ভ্রমণ বা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ সহজ না। এই পাহাড়ের ইতিহাস জটিল। একদল সেনাবাহিনী নিয়ে ওরা তাই গহীনে প্রবেশ করেছে। পিছনে ফেউ লেগেছে। এই আয়োজনের কাগজপত্র চুরি হয়ে যায়, রাশাদের ফোন ছিনতাই হয়ে যায়। এত সহজে এই অভিযান সফল হবে না, তা বলাই বাহুল্য। তাই শত্রুপক্ষের মুখোমুখি অনিবার্য হয়ে পড়ে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের খুন হওয়ার কারণ কেউ বুঝছে না। খুন আরেকজন হয়েছে। বম গাইডের এই খুন নিয়ে কেউ তোড়জোড় না করলেও নিজ ভাইয়ের হত্যা মেনে নিতে পারে না বড় ভাই। তাই প্রতিজ্ঞা করে, এর বদলা নিবে।
রহস্যের এই খেলায় মিশে আছে ইতিহাস। যে ইতিহাস কেউ জানে না। জানে না এর পরিণতি। এই ইতিহাস বাংলা ও দক্ষিণ ভারতকে এক সুতোয় বাঁধবে। সমান্তরালে ছুটে চলা অতীত ও বর্তমান যে গল্পের বয়ান দিবে, বিশ্বাস হবে তো?
◾পাঠ প্রতিক্রিয়া :
সিদ্দিক আহমেদের “নটরাজ” বইটা এর আগেও প্রকাশ হয়েছিল। যে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১২০ এর আশেপাশে। নতুন করে প্রকাশিত এ বইয়ের কলেবর বেড়েছে। ৭২০ পৃষ্ঠার এই বইতে লেখক সমন্বয় ঘটিয়েছেন ইতিহাস ও বর্তমানের। দুই সময়ের সমান্তরালে ছুটে যাওয়ার মাঝে যেভাবে সংযোগ স্থাপন করেছেন, এখানে লেখকের কল্পনা, ভাবনাচিন্তা প্রশংসার যোগ্য।
ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস কখনও ইতিহাসের দলিল না। ইতিহাসের মূল বক্তব্যকে জানতে, সেই বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে ঐতিহাসিক উপন্যাস ভূমিকা পালন করে। আর যদি হয় ঐতিহাসিক থ্রিলার, তাহলে বেদবাক্য হিসেবে মেনে নেওয়াটা ভুল হবে। “নটরাজ” বইটি চোলা সম্রাজ্য সম্পর্কে জানতে পাঠককে আগ্রহী করে তুলবে।
যে বইয়ে ইতিহাস ও বর্তমান পাশাপাশি চলে, সেই বইয়ের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী কিছুটা এগিয়ে থাকে। হয়তো গল্পের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের বয়ানের কারণে হয়তো। এখানেও আমার কাছে ঐতিহাসিক উপাখ্যান বেশ ভালো লেগেছে। রাজ্য, রাজা, রাজনৈতিক ঘটনাবলী, ষড়যন্ত্র, যুদ্ধবিগ্রহ, প্রতিরোধ — সবকিছুর যে মিশেল লেখক উপস্থাপন করেছেন, পড়তে গেলে যেন চোখের সামনে সবকিছুর অস্তিত্ব ফুটে ওঠে।
আমি মুগ্ধ হয়েছি লেখকের বর্ণনাশৈলীতে। কত সাবলীলভাবে তিনি ঐতিহাসিক পটভূমি রচনা করেছে। যুদ্ধবিগ্রহের বর্ণনা দিয়েছেন। তলোয়ারের ঝনঝনানি, বর্শার গেঁথে যাওয়া, বুকে অসীম সাহস নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাগুলোকে লেখক নিজস্ব বর্ণনায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই সাথে তৎকালীন সময়ে রাজায় রাজায় যুদ্ধ, কত ষড়যন্ত্র, নিজেদের বিশেষ কোনো বস্তুর খোঁজে ছুটে চলা! সবকিছুই খুব অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলতে লেখক কার্পন্য করেননি।
এবার বর্তমা��ের কথায় আসা যাক। দুই টাইমলাইনের সমান্তরালে ছুটে যাওয়া গল্পে বরাবরই বর্তমান সময়টা একটু পিছিয়ে থাকে। এখানেও ঐতিহাসিক সময়কাল বেশ ভালো লেগেছে। বর্তমান সময়ের এই চলমান প্রক্রিয়ায় আলোচনা হয়েছে চোলা সম্রাজ্য নিয়ে। আলোচনা হয়েছে পাহাড়িদের নিয়ে। ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদের সাথে বাংলাদশের দুইজন, সাথে সেনাবাহিনীর যে যোগসাজশ। সেটা গল্পের গতি বাড়িয়েছে।
এখানে সাধারণ থ্রিলার জাতীয় গল্পের মতোই গল্প এগিয়েছে। যে মূর্তির খোঁজে এত বিশাল বাহিনীর জঙ্গলে প্রবেশ, সেই মূর্তির দেখা পেয়েছিল তিনজনের একটি দল। নিতান্তই আচমকা। তারপর ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার মাধ্যমে নজরে আসে একাধিক দলের। কেউ হয়তো ভালো চিন্তা ধারণ করে, কারো খারাপ। এখানে খুনও আছে। আর পাহাড়ি এক গাইডের খুনের কারণে বদলা নেওয়ার প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
লেখক এখানে বাঙালিদের সাথে পাহাড়িদের বিরোধের এক বিশাল রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। পাহাড়ে সেনা শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিবাহিনীর অবস্থান, কিংবা কেন সেনাবাহিনী এর বেশি কড়াকড়ি অবস্থানে রয়েছে তার যুক্তিতর্ক বেশ ভালই উপভোগ করেছি।
এখানে একটা কথা আছে, লেখক পাহাড়িদের ইতিহাস, তাদের সংগ্রামের যে চিত্র তুলে ধরেছেন তার তথ্য আমার কাছে একটু অতিরিক্ত মনে হয়েছে। আমরা যখন কারো সাথে আলোচনা করি, তখন সালের সংখ্যা কিন্তু এতবেশি স্পষ্টভাবে মনে থাকে না (যেভাবে বইয়ে দেওয়া হয়েছে)। সে যতই একাডেমিক হোক না কেন! এই জায়গায় চাইলে তথ্যের পরিমাণ লেখক কমাতে পারতেন।
তাছাড়া চোলা সম্রাজ্য নিয়ে যেভাবে আলাপ আলোচনা হয়েছিল, সেটাও একটু অতিরিক্ত মনে হয়েছে। মাথার উপর বিপদ নিয়ে এভাবে আলোচনা করার বিষয়টা অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে। এই বিষয়টা দশগ্রীব বইয়েও লক্ষ্য করেছিলাম। তবে তথ্য উপাত্তের পরিমাণ বেশি হলেও পড়তে অসুবিধা হয়নি। বরং গতিশীল ছিল লেখা।
একটা বিষয়ে লেখকের প্রশংসা করতেই হয়। যখন ইতিহাস ও বর্তমান পাশাপাশি চলে, তখন ভাষাগত ভিন্নতার দিকে নজর রাখতে হয়। বর্তমান সময়ের বর্ণনা বা সংলাপ এক ধারায় প্রবাহিত হয়, আবার অন্যদিকে ঐতিহাসিক উপাখ্যানের ভাষা ও সংলাপ ভিন্ন হতে হয়। এখানে লেখক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সংলাপের ক্ষেত্রে দুই সময়ের ভিন্নতা লেখক যেভাবে লিখেছেন, তারিফ করতেই হয়। আর এখানেই একজন লেখকের ভার্সেটাইল হওয়ার গুণ প্রকাশ পায়।
এখানে আদতে সমাপ্তি দুই ধরনের। এক সমাপ্তিতে ইতিহাসের শেষ হয়েছে। শেষ বলাটা আসলে ঠিক না। শেষের থেকেই তো নতুনের শুরু হয়। আরেক সমাপ্তিতে বর্তমান ঘটনার যবনিকাপাত হয়েছে। ইতিহাস অংশের ঘটনাপ্রবাহ টানটান উত্তেজনার, বর্তমানে যা তথ্য উপাত্তের চাপে কিছুটা ঝিমিয়ে থাকলেও শেষে এসে লেখক বেশ ভালোই চমক উপস্থাপন করতে পেরেছেন। দক্ষিণ ভারতের চোলা কিংবা পাণ্ড্য রাজ্যের সাথে এই বাংলার সংযোগ কীভাবে ছিল, তা জানার কৌতুহল লেখক পাঠকের মনে ধরে রাখতে পেরেছেন বলেই আমার বিশ্বাস। দুই অংশের সমাপ্তিও বেশ পরিপূর্ণ ও তৃপ্ত মনে হয়েছে। যার রেশ অনেকক্ষণ থেকে যায়।
◾চরিত্র :
চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রেও লেখক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। একদিকে ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো, অন্যদিকে বর্তমান সময়ের চরিত্র। তাদের বিশ্বাস, স্বভাব, ব্যবহার সবকিছুতেই পরিমিত ব্যবহার ছিল।
বিশেষ করে ঐতিহাসিক চরিত্রের মধ্যে ভান্দিয়াদেবন, কুন্দাভাই চরিত্রগুলো ভালো লেগেছে। বিশেষ করে অরুলমোজি তথা পন্নিয়ন সেলভান আকর্ষণীয় ছিল। চরিত্রগুলোর মধ্যে দৃঢ়তা ছিল। লক্ষ্য নির্দিষ্ট ছিল। তাই হয়তো হারার আগে হেরে না যাওয়া তাদের ইতিহাসে ওমর করেছে।
বর্তমান সময়ের চরিত্রের মধ্যে রাশাদ, জয়িতা বেশ মনে ধরেছে। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় কাউকে ছোট মনে হয়নি।
সেনাবাহিনী কিংবা পাহাড়ি প্রতিনিধিদের লেখক যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আড়ালে থাকা শত্রুপক্ষও বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছিল। লেখকের চরিত্র গঠনের দক্ষতা প্রতিটি চরিত্রকে গল্পে প্রাণ সঞ্চার করেছে। চরিত্রগুলোও মূলত তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের দুইটি অংশকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে।
◾পরিশেষে, আমি বইটা পড়েছি প্রকাশেরও পূর্বে। বইটি পড়ার পর মনে হয়েছে এই জাতীয় বই পড়ার পর দীর্ঘদিন কিছু না পড়লেও চলে। এই বইটি পড়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে। এত বিশাল বই স্ক্রিনে পড়া আমার জন্য কষ্টসাধ্য। তারপরও গতির স্রোতে মাত্র পাঁচদিনে শেষ করেছি। আমি কখনও কোনো বই রেকমেন্ড করি না। দুর্দান্ত এই বইটা আমি রেকমেন্ড করছি। আপনারা পড়তে পারেন, উপভোগ করতে পারেন, আলোচনা-সমালোচনা করতে পারেন।
ও হ্যাঁ, প্রচ্ছদটা মারাত্মক হয়েছে। এই বইয়ের ক্ষেত্রে এরচেয়ে মানানসই প্রচ্ছদ আর হয় না।
নটরাজ হলো হিন্দু দেবতা 'শিব' এর ঐশ্বরিক মহাজাগতিক নর্তক হিসেবে দেখানো রূপের ভাষ্কর্য। একেকজন ধর্মীয় ও শৈল্পিক বিশারদ একেক ভাবে এই রূপের ব্যাখ্যা করেন; কেউবা বলেন, ভাস্কর্যটি নৃত্য ও নাটকীয় শিল্পের অধিপতি হিসেবে শিবের প্রতীকী; আবার কেউ কেউ বলেন নটরাজ হলো শিবের সৃষ্টি ও ধ্বংস প্রতীক। দক্ষিণ ভারত তথা প্রাচীন তামিলনাডু সংলগ্ন এলাকায় নটরাজ এর পূজার চল শুরু হয়।
ঐতিহাসিক উপন্যাসটিতে একই সাথে তিনটি ঘটনা প্রবাহ বর্ননা করা হয়েছে। এক: আধুনিক সময়ের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের কাহিনী, দুই: প্রাচীন চোল এবং পাণ্ডব সাম্রাজ্যের দ্বৈরথ এবং তিন: পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক পটভূমি।
বিখ্যাত ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ রমন বালামুরগান পান্ডিয়া এবং তার শিষ্য বাংলাদেশের নবীন প্রত্নতত্ত্ববিদ জয়িতা বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে একটি যৌথ অভিযান করতে আসে অনলাইনে পাওয়া একটি ছবি উপর ভিত্তি করে। সাংবাদিক ও শখের প্রত্নতত্ত্ববিদ রাশাদ মাহামুদ এর জয়িতা যোগাযোগ করে অনলাইনে ছবিটি যে পোষ্ট করেছে তাকে খুজে বের করতে কিন্তু ছেলেটিকে খুন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সাহায্য ও রাশাদকে নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়।
পাশাপাশি রাজ্য চোল ও পান্ড্য'দের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই থাকতো, যুবরাজ আদিত্য বর্মন চোল বীরপান্ড্যকে হারিয়ে পান্ড্য রাজ্যের কোমড় ভেঙে ফেলেন, দখলে নেন অমূল্য এক সম্পদ। পান্ড্য রাজ্যের উত্তরসূরী একের পর এক কূটনৈতিক চাল চালাতে থাকেন পান্ড্য রাজ্যের সম্পদ ফিরিয়ে আনতে। চোল রাজ্যে শুরু হয় কূটনীতি, রাজনীতি আর বিশ্বাসঘাতকতার খেলা।
পালিয়ান বম তার ছোট ভাই পাতেং বম এর হত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রত্নতত্ত্ব অভিযানকারিদের পিছু নেয়। তথ্য ও প্রমাণ না থাকলে পালিয়ান এর দৃর বিশ্বাস এই অভিযাত্রীদের সাথে তার ভাই এর মৃত্যুর সংযোগ আছে। পালিয়ান বম এর স্মৃতিকথা প্রত্নতত্ত্ব এবং অভিযান চলাকালে রাশাদ ও মেজর কামরান এর তর্ক বিতর্কের মধ্যে দিয়ে আমরা জানতে পারি পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপেক্ষা আর বঞ্চনা থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ার ইতিহাস, যার জন্য বাঙ্গালী রাজনীতিবিদ ও ক্ষমতাশালীদের দায়ী করা হয়েছে। মূল কাহিনীর সাথে কোন প্রত্যক্ষ সংযোগ না থাকলেও লেখক কেন এই বিষয়টি বইয়ে নিয়ে আসলেন তা বোধগম্য হয়নি। আবার একটি ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহের ইতিহাসের মতো নন ফিকশন আলোচনা কেন টেনে নেয়া হলো, সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ।
ঐতিহাসিক পটভূমি ছিলো অনন্য। চোল, পাণ্ড্য সম্রাজ্যের সাথে বাংলার মেলবন্ধন নিয়ে লিখতে গিয়ে লেখককে বিস্তর গবেষণা করতে হয়েছে তা অনুমেয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়েও দ্বিপাক্ষিক বেশ ইন্টারেস্টিং আর্গুমেন্ট করেছেন। ক্যারেক্টার বিল্ড আপ তেমন আহামরি না। গল্প বলার ধরণ প্রাঞ্জল। থ্রিলার হিসেবে খুব উঁচু মানের বলার সুযোগ নেই, টুইস্ট প্রায় সবগুলেও অনুমেয় ছিলো। গল্প বেশি দীর্ঘায়িত হয়েছে কিনা সে আলাপ তোলা রইলো। বানান ভুলের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। ভাষার দক্ষতা এভারেজ বলা যায়, শব্দের ব্যবহার গতানুগতিক। শেষ দিকে এসে সিকুয়েন্স একটু এলেমেলো হয়ে অপ্রয়োজনীয় টুইস্ট দেয়ার প্রয়াস অল্প আছে বলে মনে হলো। সব মিলিয়ে ইন্টারেস্টিং প্লট নিয়ে গল্পের সাথে এগিয়ে যেতে ভালোই লাগছিলো বলতে হবে।
Wait!what a thriller! I couldn’t put this down,the history about hill tracks, the story line itself is captivating enough to keep you up all night to read.
বইতে দুইটা টাইমলাইন। একটা বর্তমান এবং আরেকটা অতীত। মূলত বর্তমানকে ঘিরে অতীতকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। প্রথম থেকে কাহিনী দ্রুত গতিতে এগিয়েছে, একটা বইয়ের সবচেয়ে বড় গুণ হলো শুরু থেকে পাঠককে কাহিনীতে আটকে ফেলা, এই বই কিন্তু সেই গুণ আছে। ঢাউস সাইজের বই তাই বইতে অনেক গুলো চরিত্র আছে, বিশেষ করে অতীতের টাইমলাইন দক্ষিণ ভারতের সাথে জড়িত থাকার কারণে চরিত্রগুলো নাম একটু ভিন্ন ধচের।
বইটি বিভিন্ন মিথ, হাইপোথিসিস আর ইতিহাসে সমৃদ্ধ, তাই মাথা ঠান্ডা রেখে বইটা পড়তে হবে, নাহলে জটপাকানোর সম্ভাবনা থাকবে। বইটাতে বেশ ভালোভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, মূলত বর্তমান টাইমলাইনে ফেলে ফিকশনের সাথে নন-ফিকশনে মিশেলে লেখক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। তাই এখানে বড় ব্যাপার হলো যারা নন-ফিকশন পড়ে না বা পড়ে অভ্যস্ত না তাদের কাছে বইটা পড়ার ক্ষেত্রে একটু জড়তা চলে আসার সম্ভাবনা আছে। তবে আমার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান থেকে অতীতের যে টাইমলাইন আছে ওইটাকে বেশী চমকপ্রদ এবং রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে।
সর্বোপরি বইটা ভালো, খুব কম সময়ে ঢাউস সাইজের বইটা শেষ করেছি। বইয়ে লেখকের নেতিবাচক দিক না থাকলেও প্রকাশনীর একটা নেতিবাচক দিক আছে। এ পর্যন্ত আমি বাতিঘর প্রকাশনীর যত বই পড়েছি সবগুলাতে বানান ভুলে দোষটা ছিলো না। কিন্তু এই বইটাতে কেন জানি বেশ কিছু বানানে ভুলটা লক্ষ্য করেছি, বিষয়যটা দৃষ্টিকটু লেগেছে।
কোনো কিছুর নেশা মানুষের মাঝে এমন তীব্র অনূভুতি তৈরি করে দেয় যে মানুষ নেশাগ্রস্তের মতো তার নেশার বস্তু হস্তগত করতে নিজের সক্ষমতার শেষ সীমা পর্যন্ত যেতে রাজি থাকে এবং কী কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের ব্যক্তিত্বও বিসর্জন দিতে কার্পণ্য করে না। হোক সেটা কোনো কিছু আবিষ্কারের নেশা, কিংবা ক্ষমতা পাওয়ার বা টিকিয়ে রাখার।
দক্ষিণ ভারতের একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সাম্রাজ্য ছিল চোলদের সাম্রাজ্য, যেটা প্রায় ৯ম শতক থেকে ১৩তম শতক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সাম্রাজ্য বিশেষভাবে তামিলদের এলাকায় রাজত্ব করতো যা দক্ষিণ ভারত, শ্রীলঙ্কা, এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশেও প্রভাব বিস্তার করেছিলো। সেই বিশাল সাম্রাজ্যের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদরাও এমন এক নেশায় আসক্ত হয়ে উঠেছিলো।
চোল সাম্রাজ্যের সোনালি সময় চলছিলো তখন, মহারাজ বর্মণ সুন্দর চোল চেভুর নদীর তীরে অসুস্থ শরীরেও উপস্থিত হয়েছেন নিজের সন্তান যুবরাজ আদিত্য চোলের সাথে চোলদের চিরশত্রু পান্ড্যুদের যুদ্ধ পরিলক্ষিত করতে। একজন বাবার কাছে সন্তানের অর্জন, জয় নিজের চোখে দেখতে পারাটা সুন্দর চোলের কাছে মনে হচ্ছে এর চেয়ে মহা আনন্দের আর কিছুই হয় না।
সেই যুদ্ধে একই সাথে বন্ধু এবং সেনাপতি ভান্দিয়াদেবনকে সাথে নিয়ে পান্ড্যুদের পরাজিত করে বিতাড়িত করে তাদের মহামূল্যবান কূলদেবতা হস্তগত করতে পারলেও আদিত্য ঘুনাক্ষরেও অনুমান করতে পারেনি ঘরের শত্রু বিভীষণের কথা। সবার অলক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী পেরিয়ারের কূটকৌশলে প্রাসাদের মধ্যে যে ষড়যন্ত্রের গাছ বটবৃক্ষের মতো মহীরুহ হয়ে উঠছিলো তা কেউ খেয়ালই করে উঠতে পারেনি। আর যখন ষড়যন্ত্রের প্রকাশ ঘটলো সময়রেখায় ইতিহাস টালমাটাল অবস্থায় চোলদের সাম্রাজ্যের রাজার ইতিহাসে আসতে চললো বিশাল পরিবর্তন, যে পরিবর্তন বদলে দিলো সবকিছু। যেখানে কেউ ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি আরো কারা কারা জড়িয়ে আছে ষড়যন্ত্রে।
একদিকে প্রাসাদের অন্দরের ষড়যন্ত্রে চোলদের টালমাটাল অবস্থা, অন্যদিকে পাণ্ডদের তাদের কুলদেবতা উদ্ধারে জীবনবাজি রেখে এগিয়ে যুদ্ধের পায়তারা আর তার মাঝখানে সিংহাসনে দাবি নিয়ে একাধিক পক্ষের দ্বন্দ্ব। রাজনীতি, বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষমতা সবকিছু যেন এক সিংহাসন মিলেমিশে একাকার করে দিয়েছে।
এই দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্যের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই জিতু, সিহাব আর নাবিলার। অজানাকে জানা আর নিষিদ্ধকে আবিষ্কার করার নেশায় তারা পাহাড় আর খরস্রোতা নদী পাড়ি দিয়ে এসেছে বান্দরবানের আন্ধারমানিকে, কিন্তু কে জানতো এক মহাবিপদে পড়ে জিতু গহীন অরণ্যে এমন এক 'নটরাজ' মূর্তিকে আবিষ্কার করে বসবে যা বদলে দিবে সূদুর দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্যের ইতিহাস! টেনে আনবে বিখ্যাত আর্কিওলজিস্ট রামান পান্ডিয়া, জয়িতাকে। বদলে দিবে সাধারণ জীবনযাপন করা রিপোর্টার রাশাদের জীবন, যে একদিন স্বপ্ন দেখতো আর্কিওলজিস্ট হওয়ার!
আন্ধারমানিকের গহীনে গল্পের শেষ চিত্রনাট্যটা জমে উঠেছে, যেখানে সেই নটরাজ মূর্তি অনেকদিন ধরে ধারণ করে আছে এক হারানো গল্পের শেষ পান্ডুলিপি হাতে নিয়ে। যে গল্পের আদি থেকে অন্ত পুঁতিত আছে আন্ধারমানিকে। সেই পান্ডুলিপির নেশায় ছুটে এসেছে জয়িতা, রাশাদ, রামান স্যাররা। আরো অনেকেই এসেছে, যারা গাছের আড়ালে নজর রাখছে সবার উপর। সব সুতোর প্রান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে, কেবল সময়, বিশ্বাসঘাতকতা আর রক্তে রঞ্জিত হওয়ার পর।
নটরাজ বিশাল পরিসরে লেখা একটা পুরোদস্তুর একই সাথে ঐতিহাসিক এবং এডভেঞ্চারে ভরপুর উপন্যাস। যেখানে লেখক ভারতীয় উপমহাদেশের দুই প্রভাবশালী সাম্রাজ্যের গল্প বলেছেন। যে সাম্রাজ্যের বর্ণনা পাওয়া যায় মহাভারত ও রামায়ণেও।
গল্পের শুরুটা বেশ ইন্টারেস্টিং, বিশেষ করে 'নটরাজ' মূর্তি আন��ধারমানিকের মতো জায়গায় খুঁজে পাওয়াটা লেখকের জায়গা বাছাইয়ের দূরদর্শীতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। মনে হয়েছে গল্পের সাথে এই জায়গাটা একেবারে বাস্তবের মতো খাপেখাপ মিলে গেছে। সেই সাথে রাশাদ, জয়িতা আর রামন পান্ডিয়া চরিত্রগুলোও আমার চমৎকার লেগেছে। সেই সাথে একদিকে রাশাদ, জয়িতা ও মেজর কামরান চরিত্র এবং গাইড পালিয়ান চরিত্রের মাধ্যমে লেখক গল্পের ভিতরে তিন পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক এবং রক্তক্ষয়ী নিজেদের মধ্যে ও সমতলের বাঙালিদের সাথে যে দ্বন্দ্ব তার ইতিহাসের গল্পে ব্যবহার বেশ উপভোগ করেছি। বিশেষ করে এখানে উঠে এসেছে মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা, সন্তু লারমাদের সংগ্রামের ইতিহাস, শান্তিবাহিনীর আবির্ভাব ও আন্তর্দ্বন্ব নিয়ে।
এক্ষেত্রে পাহাড়ি ইতিহাসের বিস্তার বর্ণনায় আমার আগে থেকেই আগ্রহ থাকার ফলে এসব বিষয় জানতে বেশ আগ্রহবোধ করলেও ইতিহাসের এই অংশের বিস্তারিত আলাপ অনেকেরই বোরিং লাগবে। মাঝেমাঝে তো এত দীর্ঘ আলাপ যে মনে হবে এ উপন্যাস না পাহাড়ি রাজনৈতিক ইতিহাসের নন-ফিকশন বই। তবে এই জায়গায় লেখক একই ইতিহাসের পাহাড়ি এবং বাঙালি দুই ন্যারোটিভে বর্ণনা বেশ ভালো লেগেছে।
যদিও গল্পে আন্ধারমানিকের মন্দিরের এক কক্ষে জয়িতা, রাশাদ আর মেজর কামরানের জীবন-মরণ সমস্যার মধ্যে জান বাঁচানো ফরজের জায়গায় নিজেরা পাহাড়ি ইতিহাসের আলাপ শুরু করে দেওয়ার ব্যাপারটা বিরক্ত লেগেছে। এছাড়াও এই অংশে লেখক রামান স্যারের গুপ্তধন আবিষ্কার এবং সেখানে ঘাতকদের পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টা কেন যেন এড়িয়ে গিয়েছেন যা ভালো লাগেনি।
তবে এখানে বর্তমান অংশে জয়িতা চরিত্রকে লেখক যেভাবে প্রথমে একজন মেধাবী এবং নিবেদিত আর্কিওলজিস্ট হিসেবে দেখিয়েছেন আমার মনে হয়েছে লেখক সেই ভাবটা রাশাদ চরিত্র দিয়ে ম্লান করে দিয়েছেন। যার ফলে জয়িতার থেকে স্পটলাইটে বেশি চলে এসেছে রাশাদ। অথচ কিছুটা হলেও জয়িতার আর্কিওলজিস্ট দক্ষতা গল্পে থাকলে বিষয়টা দারুণ হতো।
এই গল্পের আরো একটি চমৎকার অংশ হলো চোল সাম্রাজ্যের কথা। এই অংশের বর্ণনা আমি বরাবরই উপভোগ করেছি। লেখক সবকিছু একদম এতো বিস্তারিত লিখেছেন যে মনে হচ্ছিলো সব কেমন যেন চোখের সামনেই ঘটছে। বিশেষ করে সেনাপতি ভান্দিয়াদেবন এর সাহসিকতা, সততা, সারল্য এবং আনুগত্য যেমন মুগ্ধ করবে ঠিক তেমনি যুবরাজ আদিত্য, তার ভাই অরুলমোযীও মুগ্ধ করবে। এই অংশের ষড়যন্ত্রকারীদের যৌক্তিক অবস্থানও চমৎকার লেগেছে, যার ফলে পাঠক কার পক্ষে যাবে তা নিয়ে অল্প হলেও দ্বন্দ্বে পড়বে। এই জায়গায় এসে আরো একটা ব্যাপার উপলব্ধি হবে যে চোল আর পাণ্ড্যদের মধ্যকার যে দ্বন্দ্ব তা কতটা যৌক্তিক, অন্তত পাণ্ড্যুদের দিক দিয়ে।
সাধারণত এমন গল্পে দেখা যায় ঐতিহাসিক অংশের বর্ণনা লেখক চমৎকার ভাবে দিলেও বর্তমান অংশের সংযোগে এসে লেখক গোঁজামিল করে ফেলেছেন কিংবা লেখায় আনাড়িপনা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে লেখকের এতো সুবিশাল বইয়ে বর্ণনা ছিলো খুবই সাবলীল। তবে বই পড়তে গিয়ে আরো একটা বিষয় নজর কেড়েছে, বইটিতে প্রচুর মানে চোখে পড়ার মতো বানান ভুল আর টাইপিং মিস্টেক আছে, যা দেখলেই বুঝা যায় বইটা তাড়াহুড়ো করে প্রকাশ করে ফেলা হয়েছে। তবে এই বিষয়টা উপেক্ষা করলে বইটি ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে খুবই চমৎকার লেগেছে।
বইটার প্রচ্ছদ আর প্রোডাকশন বিশাল বই হিসেবে ভালো হয়েছে, যদিও এমন বড়ো সাইজের বইয়ে আমি রাউন্ড বাইন্ডিং পছন্দ করি। এছাড়াও বইটার দাম নিয়ে প্রশংসা করতেই হয়। ৭২০ পৃ্ষ্টা বইয়ের দাম রাখা হয়েছে ৯৫০ টাকা যা ছাড়ে একেবারে হাতের নাগালেই পাওয়া যাবে। এই বই বাতিঘর ছাড়া অন্য প্রকাশনী হলে নির্গত দামটা আমার মতো পাঠকের আয়ত্তের বাইরে হয়ে যেতো।
বিস্তারিত রিভিউ পড়ে লিখবো বলে রেখে দিচ্ছি। তবে হ্যা, জার্নিটা উপভোগ করেছি। যদিও ইনফো ডাম্পিং আছে প্রচুর। সাধারণ কোনো মানুষ বিপদের সময় এত এত তথ্য বা ইতিহাস, রাজনীতির আলাপ করেন কিনা আমার জানা নেই।
উপন্যাস বলেই এরুপ টা হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তবে হ্য, আমি প্রচুর পরিমাণে উপভোগ করেছি তথ্যগুলো। রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহ, আর প্রাচীন চোল সাম্রাজ্য নিয়ে হওয়ায় গ্রোগ্রাসে গিলেছি।
বইয়ের প্রিয় চরিত্র দু'জন, ভাল্লা ও রাজকুমারী কুন্দাবাই (সবদিক মিলিয়ে)। আর কি! বিস্তারিত লিখবো না বলেও সেদিকে এগোচ্ছি, এ নিতান্তই অন্যায়। তবে হ্যা, শেষের চমকগুলো মোটেও কম নয়, বরং বেশিই চমকপ্রদ। একেবারে 'সর্ষের ভেতর ভূত' যাকে বলে।
সবশেষে, রাশাদের চরিত্র হয়ে লেখকের সাথে আমার দ্বিমত আছে বেশ কিছু জায়গায়। সে আলাপ অন্যদিন।
This entire review has been hidden because of spoilers.
নটরাজ বইটা তিনটা কাহিনী ধরে সারিবদ্ধভাবে এগিয়েছে। একটা প্রাচীন, অন্য ২ টা বর্তমান সময় নিয়ে। বর্তমান সময়ের একটা কাহিনী অতীতের সাথে যুক্ত, অন্যটা জুম্মবাসী ও বাঙ্গালীদের মধ্যেকার রোষানল নিয়ে। অতীতের ঘটনাটা মস্তিষ্ককে সব সময় রোমাঞ্চ দিয়ে জাগিয়ে রাখলেও বর্তমান সময়ের কাহিনী বর্ণনায় বিরক্তির সৃষ্টি হতে পারে। ৭০০+ পৃষ্ঠার ইট সাইজের বইটা দেখতে ভয়ানক হলেও পড়তে কিন্তু একটুও আলস্য ভর করবে না। কাহিনী নিজেই আপনাকে প্রথমপাতা থেকে চম্বুকের মতো আকর্ষণ করে শেষ পাতায় নিয়ে আসবে। নটরাজ বইটা শিবের প্রলয়নৃত্যের মুর্তি উদ্ধারের মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করা ঘটনার বিশদ বর্নাণার। সময়ের ভিন্নতা থাকলেও লক্ষ্য সর্বক্ষেত্রে একই। চোল ও পান্ড্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে বইটা যুদ্ধাংদেহী মনোভাবে এগিয়েছে।
মানবজাতির ইতিহাস যে রক্ত আর ক্ষমতার লোভের ইতিহাস বইখানা তার বাস্তব প্রমাণ। বর্তমান সমানে রাজা রাজত্ব বিলুপ্ত হলেও সুদুর অতীতে ঘটে যাওয়া তাদের সিংহাসন দখলের ইতিহাস গা শিউরে উঠা। সিংহাসনের কোনো মিত্র থাকে না, রক্তের ভাই থাকে না- থাকে শুধুই শত্রু। সিংহাসন নিজের করতে শত সহস্র চক্রান্ত, পরিকল্পনা, হত্যা, যুদ্ধ রক্তে নিজের হাত রাঙ্গাতে হয়। অর্জন করা সিংহাসন রক্ষা করা বেশি কঠিন। তার চেয়েও বেশি কঠিন যুদ্ধে অর্জিত কোনো জাতির প্রাণাধিক প্রিয় কোনো প্রতীক যা উদ্ধারে ইতিহাসে নিজেদের নাম লেখানো বীর যোদ্ধারা যমদূত সামনে রেখেও পিছু হটেনি। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য এই বইয়ের ইতিহাস যাদের কথা বলে তাদের সাথে আমাদের এই ক্ষুদ্র দেশ জড়িত।
এতো বড় বইয়ের পাঠ অনুভূতি আসলে কয়েকটা লাইনে ব্যক্ত করা অসম্ভব। যুদ্ধ নামের সাথে সবাই পরিচিত থাকলেও যুদ্ধের ময়দানের পিছনের ইতিহাস কতখানি নির্মম নির্দয় কুচক্রী হতে পারে তা বইটা না পড়লে টের পাওয়া দুষ্কর।
বইটা পড়ার মহাসুযোগ পাইলে কোনোবস্থাতেই হাতছাড়া করা উচিত নয়।
একেবারেই অপরিচিত ছিল এই বইটা আমার। লাইব্রেরীতে অনেকগুলো বইয়ের মধ্যে হঠাৎ এই বইটার নামটা দেখে যথেষ্ট আকর্ষণ করে আমাকে। লেখক আমার কাছে অপরিচিত ছিলেন। উনার কোনো লেখায় এর আগে আমি পড়িনি। তবে লেখাটা পড়া শুরু করার পর থেকেই রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে একটানা পড়ে গিয়েছি এটা। ভিতরে কিছু ছোটখাট বানান ভুল বাদ দিলে চমৎকার হয়েছে পুরো লেখাটা। চরিত্র চিত্রায়ন থেকে শুরু করে প্লট নির্বাচন এবং ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থ্রিলার আবহে লেখাটা যেভাবে উনি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেছেন সেটার প্রশংসা করতেই হয়। গুডরিডস এ আমি সাধারণত আমার পড়া কোন বইতে চার তারকা দেই না। কিন্তু এই প্রথম সম্ভবত কোন বইতে সরাসরি দিলাম। কারন আমার কাছে মনে হয়েছে লেখাটা এটা ডিসারভ করে।
এই বইটার সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে মেদবিহীন এবং অযথা লেখা থেকে টেনে বড় করার কুৎসিত মানসিকতা বিবর্জিত একটা লেখা। প্রতি পৃষ্ঠায় ঠিক যতটুকু লেখা দরকার ঠিক ততটুকুই লিখে গিয়েছিলেন লেখক। সাধারণত খুব কম লেখকদের মাঝে এই অভিনব ক্ষমতাটা দেখা যায়। আমি মুগ্ধ হয়েছি লেখাটা পড়ে। লেখক আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে নাই দেখে ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাতে পারলাম না।
এতক্ষণ যা বললাম এটা হচ্ছে বইটা শেষ করার সাথে সাথে পাঠকের আচমকা পাঠ অনুভূতি। পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রতিক্রিয়া বইটা আরেকবার উল্টে পাল্টে দেখে লেখা হবে এবং সেটা বিস্তারিতভাবেই লেখা হবে।
উনার বাকি লেখাগুলো পড়ার ব্যাপারে প্রচন্ড আগ্রহ পাচ্ছি। সিদ্দিক সাহেবকে অসংখ্য ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা থ্রিলার বই বাংলাদেশী পাঠকদের উপহার দেয়ার জন্য।