Helal Hafiz was a Bangladeshi poet. He is considered a true representative of poets of his generation having certain creative traits in an age when his nation and countries in the neighbourhood witnessed dramatic transitions particularly in the arena of politics. He won Bangla Academy Literary Award (2013).
কবি হেলাল হাফিজ ১৯৬৯ সালেই সারা দেশে আলোড়ন তৈরি করে ফেলেছিলেন। লিখেছিলেন,
“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”
যদিও তখনও তাঁর মলাটবদ্ধ কোন বই বের হয়নি। কবি হিসেবে তিনি পরিচিত নন। তাঁর প্রথম বই বেরুলো এরও প্রায় সতের বছর পর। ১৯৮৬ সালে। কাব্যগ্রন্থ যে জলে আগুন জ্বলের মাধ্যমে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কবির এই প্রথম কাব্যগ্রন্থই পাঠক মহলে তুমুল জনপ্রিয়তা পেল। ছিয়াশির বইমেলার সকল গল্প-উপন্যাসের চাইতেও অধিক বিক্রিত হলো এই বই। এতোটা জনপ্রিয়তার মুখে পড়ে, কবি পরবর্তী বই প্রকাশে বেশ খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। যদি নতুন বই পাঠক সমাদ্রিত না হয়?
অথচ সে সময় তিনি লিখে বসে আছেন,
“কে আছেন ? দয়া করে আকাশকে একটু বলেন – সে সামান্য উপরে উঠুক, আমি দাঁড়াতে পারছি না”
আমি যখন কবিকে চিনেছি ততদিনে এও জেনেছি কবি স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছেন। লেখালেখির সঙ্গে তিনি আর নিজেকে জড়াতে চাচ্ছেন না। কিন্তু অবশেষে ২০১২ সালে মোট একাত্তরটি কবিতা নিয়ে কবি নতুন বই প্রকাশ করলেন— কবিতা একাত্তর। এই বইতে প্রতিটি কবিতারই ইংরেজি অনুবাদ রয়েছে। রয়েছে যে জলে আগুন জ্বলের প্রতিটি কবিতা। কবিতা একাত্তরে তিনি লিখছেন...
“আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে মানুষের কাছে এওতো আমার এক ধরনের ঋণ। এমনই কপাল আমার অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।”
বিঃদ্রঃ শীঘ্রই কবির নতুন কাব্যগ্রন্থ বেরুতে যাচ্ছে। কবি বইয়ের নাম দিয়েছেন- বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা।
অনুবাদ প্রথম কয়েকটার পড়েছিলাম, এরপর আর পারি নি। আক্ষরিক অনুবাদই মনে হয় পীড়ার কারন। যদিও, রবীন্দ্রনাথ আক্ষরিক অনুবাদ খুব সমর্থন করতেন, কেন জানি মনে হয় কবির কবিতা অনুবাদ করতে হলে তাঁর অক্ষরে না গিয়ে কাব্যিক ভাবার্থের প্রতিই মনোযোগ দেওয়া দরকার। যাই হোক, হেলাল হাফিজকে যে জীবনেও কবিতা পড়েন নি, সেও চিনে। যেমন আমি। কবিতা পড়া শুরু করেছি বেশিদিন হয় নি। কিন্তু, ছোটবেলায়, সিতুচাচী হাতে তুলে দিয়েছিল, যে জলে আগুন জ্বলে। একটু আগে ফিল্ম স্কোর নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি দেখলাম। সেখানে এক কম্পোজার সিনেমা হলে তাঁর সুর করা ছবি দেখে এরপর বাথরুমে গিয়ে চেক করেন, কেউ গুনগুন করে তাঁর সুর ভাজছে কিনা! কবিতার লাইন নিয়েও এটা বলা যায়! "বুঝেছো উপেন, এ জমি লইব কিনে" "কেউ কথা রাখে নি" "এ হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ..." এরকম... হেলাল হাফিজের অশ্লীল সভ্যতা... "নিউট্রন বোমা বোঝো, মানুষ বোঝো না"। এসব লাইনই আসলে কবিকে অমর করে দেয়! এই লাইন ছোটবেলায় সারাদিন মাথায় ঘুরপাক খেয়েছিল। প্রিয় কবির আরেকটি বই পেয়ে একারনেই আপ্লুত। একটাই দুঃখ, সেটা হলো, যে জলে আগুন জ্বলের বেশ কিছু কবিতার পুনঃ সংকলন। আর অহেতুক অনুবাদ বইটির শুধু কলেবর বাড়িয়েছে, সৌন্দর্য নয়।
হেলাল হাফিজের কবিতা এক আধটু পিডিএফ আকারে পড়া হলেও সম্পূর্ণ পড়া হয় নি। চট্টগ্রাম বাতিঘরে কবিতা একাত্তর বইটি চোখে পড়ায়,পড়ে ফেললাম প্রায় অর্ধেকের মত। বইটি কেনার উদ্দেশ্য ছিল না, ভাবছিলাম গুগল মামার কাছ হতে পিডিএফ নিয়ে পড়ে ফেলব, কিন্তু গুগলে খোঁজে পাইনি। তারপর বিভিন্ন গ্রুফে পিডিএফ টি দিতে পারবে কিনা জিজ্ঞেস করলে কেন উত্তর না পেয়ে, আবার চলে গেলাম বাতিঘরে। কেমন যেন অস্থির লাগতেছিল পড়ার জন্য। যাইহোক অসাধারণ ছিল বইটি রোমান্স, বিরহ, যুদ্ধ ইত্যাদি আরো অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য নিয়ে ফুটিয়ে উঠেছে বইটি।
এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।।
মূলত যে জলে আগুন জ্বলে কাব্যগ্রন্থের ৫৬টা কবিতার সাথে নতুন ১৫টি ছোট কবিতা-সবমিলিয়ে ৭১টি কবিতা নিয়ে কবিতা একাত্তর। যে জলে আগুন জ্বলে বেশ কবার পড়া বা ইচ্ছা হলেই পড়ি, আবার কবিতা একাত্তরে নতুন যে ১৫টি কবিতা আছে সেগুলোও ফেসবুকে বারকয়েক পড়া হয়েছে। ফলে এ বইয়ের কোন কবিতাই আসলে অপরিচিত নয় এবং অধিকাংশ কবিতাই আমার পছন্দের।
যেহেতু, হেলাল হাফিজের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা মাত্র তিনটি (যদি ভুল না হয়), তাই যারা হেলাল হাফিজের কবিতা পছন্দ করেন তারা বইটি সংগ্রহে রাখতে পারেন।
"এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময় এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়।" - আমার ধারণা এই লাইন দুটির সাথে সবাই কমবেশি পরিচিত, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থণের সময়ে লেখা "নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়" কবিতার প্রথম দুই লাইন, যা একজন কবি হিসেবে হেলাল হাফিজকে রাতারাতি খ্যাতি এনে দেয়। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন "আপনাকে, তোমাকে ও তোকে", যেটা আমার মনে হয় তার কবিসত্ত্বার যথার্থ প্রকাশ, কেননা তার কবিতা সর্বস্তরের সব শ্রেণির মানুষের কথাই বলে, আমার-আপনার-তোমাদের-তোদের কথা-ই বলে। হেলাল হাফিজের কবিতার ভাষা ঠিক যতটুকু সাবলীল - তেমন ঠিক ততটাই গভীর, ঠিক যতটুকু প্রবল, প্রতিবাদী - ঠিক ততটাই বেদনাকাতর, শোকার্ত। ভারী ভারী শব্দের আদিখ্যেতা নেই, ছন্দের আড়ষ্টতা নেই, তবু যথেষ্ট পরিমাণ কাব্যিক, অনুভূতির প্রয়োজনে কখনো কঠোর, আবার কখনো প্রেমার্ত।
তার কবিতা "প্রত্যাবর্তনের পথে কিছু 'কস্টলি' অতীত থেকে যায়। কেউ ফেরে, কেউ কেউ কখনো ফেরে না, কেউ ফিরে এসে কিছু পায়, মৌলিক প্রেমিক আর কবি হলে অধিক হারায়" - এর মতো জীবনবোধের গভীর উপলব্ধি থেকে "এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালির তালপাখাটা খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিও" - এর মতো স্মৃতির হাহাকারের কথা বলে। তারপর নাগরিক জীবনের পাওয়া না-পাওয়ার হিসেব কষে 'ইদানীং জীবনযাপন" কবিতায় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়াঃ " আজকাল আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই থাকেন, অঙ্কুরোদ্গম প্রিয় এলোমেলো যুবকের অতৃপ্ত মানুষের শুশ্রূষা করেন। বিরোধী দলের ভুল মিছিলের শোভা দেখে হাসেন তুমুল, ক্লান্তিতে গভীর রাতে ঘরহীন ঘরেও ফেরেন, নির্জন নগরে তারা কতিপয় নাগরিক যেন কতো কথোপকথনে কাটান বাকিটা রাত, অবশেষে কিশোরীর বুকের মতন সাদা ভোরবেলা অধিক ক্লান্তিতে সব ঘুমিয়ে পড়েন। আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন, মোটামুটি সুখেই আছেন। প্রিয় দেশবাসী; আপনারা কেমন আছেন?" আবার বিদ্রোহের হুঙ্কার দেয়ঃ "মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার। নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে, কেবল তোমাকে। বিরোধী নিধন শেষে কতোদিন অকারণে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখেছি তোমাকে বারবার কতোবার। ...... যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন, যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে ভেঙে সেই কালো কারাগার আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।"
ভারিক্কী শব্দের আদিখ্যেতা না থাকলেও হেলাল হাফিজের ভাষার গাঁথুনি যে যথেষ্ট পরিমাণে মজবুত তার প্রমাণ পাওয়া যায় তার প্রায় সব কবিতাতেইঃ "স্বাধীনতা সব খেলো, মানুষের দুঃখ খেলো না" (যেভাবে সে এলো) "নিউট্রন বোমা বোঝো, মানুষ বোঝো না" (অশ্লীল সভ্যতা) "জলের আগুনে পুড়ে হয়েছি কমল কি দিয়ে মুছবে বলো আগুনের জল" (কোমল কংক্রিট) "মানবজন্মের নামে কলঙ্ক হবে এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই, উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের নমুনা হবো আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ যদি শুধু নারীকে সাজাই" (দুঃসময়ে আমার যৌবন)
হেলাল হাফিজের ভক্ত আমি যখন থেকে, তখন তার নামও জানতাম না, ছোটবেলায় বিটিভিতে একটা নাটক হতো, নাম মনে নাই, কিন্তু যেটা মনে আছে সেটা হলো, নাটকটা শুরু হতো একটা কবিতা দিয়ে, "কষ্ট নেবে কষ্ট হরেক রকম কষ্ট আছে কষ্ট নেবে কষ্ট?" তখন আমি নিতান্তই সাত-আট বছরের বাচ্চা, ওই বয়সের তুলনায় এই লেখা অনেক ভারী, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই যেমন নজরুলের কবিতা ভাল্লাগতো, এটাও তেমনি কিভাবে যেন ভালো লেগে যায়। এর প্রায় দশ-বারো বছর পরে সম্ভবত এই মানুষটার লেখার সাথে পরিচয়, তখন কলেজে পড়ি, হালকা-পাতলা লেখালেখি শুরু করছি তখন, 'সামহোয়্যার-ইন-ব্লগস" এর নিয়মিত পাঠক ছিলাম, সেখানেই কবিতা খুঁজতে খুঁজতে আমার পরিচয় হেলাল হাফিজের লেখার সাথে, নজরুল আর রুদ্র তখন সবচে প্রিয়, তার সাথে যোগ হল হেলাল হাফিজ। "যে জ্বলে আগুন জ্বলে" এর পড় এটা আমার পড়া হেলাল হাফিজের দ্বিতীয় বই। কবিতার প্রতি অনুরাগ থাকলে এই বইটা পড়ে ফেলতে পারেন একদিন এক ঘণ্টা টাইম নিয়ে, ভালো লাগবে বলেই আশা করা যায়।
পুনশ্চঃ ইংরেজি অনুবাদটা অতিমাত্রায় জঘন্য, ওইটা পড়ে অনুবাদকের জন্য দুয়েকটা গালাগালি মনে উঁকিঝুঁকি দিলে অবাক হওয়ার কিছু নাই।