"বলছি, দাদার কি কান্ডজ্ঞান লোপ পেলো নাকি?"
"কই? না তো? এই তো দিব্যি ঝা-চকচকে বইটি ধরে বসে আছি। নগদ চারশো টাকার হিসেব! অত সহজে, হাতছাড়া করা যায়? কিস্যু লোপ পায় নি, বই থাকবে বইয়ের তাঁকে, আপনি নিজের চরকায় তেল দিন গিয়ে। যান!"
আমার এই ভীষণ ডিসগাস্টিং রদ্দি-মার্কা জোকটি শুনে যদি আলোচনা সভা ত্যাগ করে উঠে চলে যান, তাহলে আপনাকে খুব একটা দোষারোপ করতে পারি না। দিনশেষে, মিস্টার তারাপদ রায় ওই একটিই ছিলেন। আমরা শুধু রসিক পাঠক মাত্র। রসিকতার আস্পর্ধাই আছে কেবল। ক্ষমতা কিছুই নেই। (হাতিয়ার কি আর সবার হাতে বাগ মানে? সবাই কি আর আদিত্যনারায়ণ হয়?)
আচ্ছা থাক। বিশপ লেফ্রয় রোডে আচমকা ঢুকে না পড়ে, 'কাণ্ডজ্ঞান' নিয়েই ভ্যারেন্ডা ভাজি। বছর এক-দুই আগের কথা। ফেসবুকে বই কিনতে বসে এক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হয়। পড়ুয়া দিগ্গজ মানুষ, পুরোনো বই বেচাকেনা করে থাকেন। ওনার তুলনায়, আমি নেহাতই গবেট গোবিন্দ। একটি কাঙ্খিত বইয়ের সফল লেনদেনের পর, উনি হঠাৎ আমাকে একটি প্রশ্ন করে বসেন।
"রম্য পড়েন?"
অমোঘ প্রশ্ন! আমি আমতা আমতা করি। খায় না মাথায় দেয়, কে জানে? কম্পিত হস্তে টাইপ করি, "খুব একটা আরাম পাই না পড়ে।" ইমেজ বাঁচানোর পাতি চেষ্টা, মিলর্ড! জিন্দেগীতে কোনোদিনও রম্য-রচনা না পড়া আমার আবার আরাম কিসের? অবশ্য, ভদ্রলোক খুব একটা পাত্তা দিলেন না ওতে। বুঝলাম ওনার ইন্টারেস্ট অন্যত্র ভেস্টেড। ধোঁয়াশা কাটলো শিগগিরই। খুবই কুশলী সেলস্ পিচের মাধ্যমে, আরো একটি বই কেনার প্রস্তাব এলো আমার কাছে। একখান ঢাউস সাইজের তারাপদ সমগ্র। ঐ আনন্দেরই জিনিস। রংচঙে প্রচ্ছদ, হৃষ্টপুষ্ট কলেবর। দামটাও...
এই ছিল তোর মনে? আমি নাকচ করে দিলাম। কেনার প্রশ্নই ওঠে না। মানুষটা অবশ্য এই প্রাথমিক রিজেকশনটুকু খারাপ ভাবে নিলেন না। স্রেফ অনুরোধ করলেন একটা। বেশ সিন্সিয়ার অনুরোধ। পরামর্শও বলা যায়।
"জীবনে একবার হলেও, তারাপদ রায় পড়ে দেখবেন।"
অগত্যা!
ইতিমধ্যে, রম্য-গদ্যে হাত পাকিয়েছি একটু। সঞ্জীব, নারায়ণ, উল্লাসদের পুকুরে পা-ডুবিয়েছি হালকা। সঞ্জীবের রম্য পড়ে নাকাল হওয়ার হিসেব আমার 'কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই' বইটির 'পাঠ-প্রতিক্রিয়া'তে দলিল-স্বরূপ রেকর্ড করা আছে। দলিলটি দুঃখের, বলাই বাহুল্য। কেউ চাইলে দেখে আসতে পারেন। আমি অপেক্ষা করছি। গাড়ি এখানে আধ-ঘণ্টা দাঁড়াবে। (সরি!)
তারাপদ রায়ের হিসেবটা কিন্তু এক্কেবারে আলাদা। কোথায় সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সেই কালান্তক ফ্রি-ফর্ম গদ্যশৈলী? কোথায় সেই ক্রুর শ্লেষবোধ? অমন তীব্র আগ্রাসন? কাণ্ডজ্ঞানের ফান্ডা ভিন্ন। এই বই, একেবারে সহজ-সরল একগুচ্ছ পুঁচকে রসিকতার সম্ভার। চালকের আসনে খোদ তারাপদ রায়। কাকা-জ্যাঠা গোছের মজলিশি কান্ডারী। ভুলভাল খেজুরে আলাপে, আসর জমান ক্যাজুয়ালি। নৌকো চলে, দুলকি চালে। তাড়াহুড়ো নেই, কিছু নেই। স্রেফ নরম-গরম বিনোদন। শুয়ে-বসে চেখে দেখলেই হলো। সাথে অহিভূষণ মালিকের অরিজিনাল কার্টুনগুলো তো রইলই।
এসব পড়ে আর কিছু না হোক, এক দণ্ড শান্তি মেলে বেশ। চাপহীন বলয়ে, মিটমিটিয়ে হাসি। হাসলেই কেল্লাফতে! দম না ফাটালেও চলে। নিজেকে নিয়ে ক্রমাগত মশকরা করে যান লেখক। নিজ-জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, ঘটনা ও মানুষদের হাড়িকাঠে চড়িয়ে জবাই করেন মনের সুখে। অবশ্য, সবটাই আসল-নকলের মিশেল। রসিকতার খাতিরে দিব্যিসে মিথ্যাচারে প্রবৃত্ত হন বইজুড়ে, আবার কাঠগড়ায় দাড়িয়ে আসামি ন্যায় দোষ স্বীকার করেন সাগ্রহে।
এই আলগা হিউমারই বইটির সেলিং পয়েন্ট। মনের সুখে পৃথিবীর হরেক প্রান্ত থেকে কাহিনী ঝেপেছেন লেখক। শিব্রাম থেকে সুনীল, বার্নার্ড শ থেকে লিকক, সাগরময় ঘোষ থেকে গোপাল ভাড়...সক্কলের ভাড়ার ঘেঁটে যথাসম্ভব ক্রেডিট দিয়ে 'জো তেরা হ্যা বো মেরা হ্যা' পন্থায় গপ্পো জুটিয়েছেন তিনি। সবটাই কাণ্ডজ্ঞানের অশেষ ডিমান্ডে। ঠিক যেন, নিজের পছন্দসই মিম শেয়ার করার প্রাচীন অনুরূপ। কেমন ইনোসেন্ট সবটা। দিব্যি লাগে। ভেরি কিউট!
আনন্দের পরিবেশনা নিয়ে অবশ্য একটু অভিযোগ থেকে যায়। আমার ভলিউমটি হালে কেনা। নতুন মুদ্রণ। নতুন দাম। চারশো টাকার হিসেব শুরুতেই দিয়েছি। এত দামে, এই বই আপনি কিনবেন কি না, সেটা একান্তই আপনার ব্যাপার। তবে এমন ক্লাসিক একটি বইকে আরও যত্ন নিয়ে পুনর্মুদ্রণ করাই যেত। এই চব্বিশ সালে দাড়িয়ে সেই প্রাগৈতিহাসিক থ্যাবড়ানো কালির টাইপফেসে বই পড়তে কাহাতক ভালো লাগে আর?
এছাড়াও, কান্ডজ্ঞানের প্রতিটি চ্যাপ্টার যে একদা রেগুলার ধারাবাহিক রূপে বেরোত সেটা বই পড়লেই বোঝা যায়। তবে, কোথায় একস্যাক্টলি প্রকাশ পেত, সেটা জানতে পারলাম না আর। আনন্দবাজারে কি? কেউ জানলে, আমায় জানাবেন প্লীজ। অজ্ঞতা মাপ করেই জানাবেন নাহয়। লেখাগুলোর নেপথ্য কাহিনী নিয়ে, অ্যাদ্দিন পর, একটা কি দুটো গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ-ফিচার যোগ করলে বইয়ের ভ্যালু বাড়ত বই কমতো না। এই আরকি।
(৩.৫/৫ || মে, ২০২৪)