অল্প কথায়, স্বল্প রেখায় বড় ক্যানভাসের আভাস নিয়েই এ কাহিনী। বালিকার নারী হয়ে ওঠা এবং তার জীবনের বাঁক ফেরা ও পরিণতির কথা এখানে আছে; আছে আরও এক বালিকার বিকাশের কথা; দুই বালকের বেড়ে ওঠা ও জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের কথা; আছে একাধিক পার্শ্বচরিত্র যারা আখ্যানকে নানা মাত্রা ও গভীরতা দিয়েছে; আছে নারী ও পুরুষের দেহ ও মনে পরিণতি লাভের কথা; দেহজ কামনা ও অভিজ্ঞতা থেকে জীবনের পরিচয় লাভের কথা; আছে একদিকে নারী-পুরুষের সংযোগ-সহযোগের সার্থকতার কথা আর অন্য দিকে এর বন্ধ্যাত্ব ব্যর্থতার কাহিনী।
পড়ার সময় বারবার বইটার প্রকাশসালের কথা মনে পড়ছিলো। ১৯৪৬! ব্রিটিশ আমলে এক মুসলিম নারীর অবদমিত যৌনতার এমন বিস্ফোরণ, এমন শিল্পিত বহিঃপ্রকাশ হতবাক করে দ্যায়। ৭৯ বছর আগের লেখা অথচ এখনও কতো প্রাসঙ্গিক! "মফিজন"ফেসবুক জমানায় বের হলে বকধার্মিকদের ট্রলের তোড়ে নিষিদ্ধ হয়ে যেতো নির্ঘাত। মফিজনরা আজও ব্রাত্য ও ঘৃণিত।সুফিয়া কামালের মতো বলতে হয়, "সকলে সমালোচনা করিলো, কেহ মফিজনের বেদনাটা বুঝিলো না।" গল্পের শেষটায় তাড়াহুড়ো ও অযত্ন আছে, কিন্তু বিষয়বস্তু ও গদ্যশৈলীর গুণে "মফিজন" অবশ্যপাঠ্য।
বইটার প্রকাশকাল দেখলে অবাক হতে হয়। ১৯৪৬ সালে এমন লেখা বের হয়েছে সমাজের সকল গোঁড়ামি, ট্যাবুকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে, ভাবতেই আশ্চর্য লাগে। অশ্লীল বলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী আমরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিই সেগুলো আদৌ কতটুকু অশ্লীল, কতটুকু প্রাসঙ্গিক ভেবে দেখি না। 'মফিজন' বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক, ভবিষ্যতেও তেমন থাকবে বলে আশা করা যায়।
বেশ ভালো। এক বসায় পড়ার মতো একটা উপভোগ্য বড় গল্প। নারীদের সেক্সুয়াল ক্রেভিংস নিয়ে লেখালেখি এখনো ট্যাবু হিসেবেই দেখা হয়- এর সবচে বড় প্রমাণ এই যে এই ধরনের চমৎকার লেখা এখনকার সময়েও দুষ্কর। অথচ এটা ট্যাবু নয়, অশ্লীল তো নয়ই। অশ্লীলতার জন্ম তখন হয় যখন কোনো স্বাভাবিক ব্যাপারকে চাপাচাপি করে সেটাকে 'বিকৃত' বানিয়ে ফেলা হয়। পরম সত্যকে যদি সাহিত্যে তুলে ধরা না হয় তাহলে সেটা কোথায় তুলে ধরা হবে? ফেসবুকীয় খচ্চর মার্কা গল্পে?
বাংলা সাহিত্যে মুসলিম পুরুষদের জৈবিক চাহিদা সম্পর্কে বহু রচনা থাকলেও ঘরের মধ্যে থাকা বাঙালি মুসলিম নারীর জৈবিক তাড়না খুব কমই উপজীব্য হয়েছে। প্রায় সকল লেখকই চিরাচরিত 'লজ্জার বিষয়' বলে ব্যাপারটাকে এড়িয়ে গিয়েছেন। তাই স্বভাবতই যখন কেউ এই বিষয়ে কিছু লিখবেন সেটা প্রথাবিরোধী হবে ত বটেই, অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হওয়াটাও অস্বাভাবিক না। বাংলা লোকসাহিত্যে ত বরাবরই নারীর কামনাকে খোলাখুলিভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে, তাহলে কথাসাহিত্যে তার অনুপস্থিতি কি সাহিত্যিকদের রক্ষণশীল মনোভাবের প্রতিফলন!
ছবিরন ও মফিজন দুই বোন। ডাকনাম ছবি ও মফি। ছবি বড়, মফি ছোট। আকারে দুইজনকে সমান মনে হলেও চেহারা ও স্বভাবে আবার দুইজনের বিস্তর ফারাক। ছবি কথা বলে কম, মফি বলে বেশি। ছবির গায়ের রং ময়লা তো মফির রং খোলতাই। তবে মক্তবে তাদের সৌন্দর্য বোঝার মতো কেউ ছিল না। একদিন মক্তবে আগমন ঘটে মামুদের। মামুদ লাজুক স্বভাবের হলেও মফির সাথে তার সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠে। মফি সারাক্ষণ বকবক করে আর মামুদ নিবিষ্ট মনে তা শুনতে থাকে। এমন গুনবান শ্রোতা পেয়ে মফি গল্পের ঝুড়ি উজাড় করে দেয়। মামুদের নানীর বাড়ি বেড়ানোর সময় শেষ হয়ে গেলে মফিকে রেখে বিদায় নিতে হয়।
বাঙালি মুসলিম সমাজে তখন আশরাফ আতরাফ বিভক্তি চলমান। এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়েন না। ছবি ও মফির বাবা ছিলেন আতরাফ শ্রেনির। পাটের ব্যবসা করে বহু পয়সা উপার্জন করলেও মানুষ পেছনে দালাল বলেই ডাকে। তবে ভালো পুঁথি পড়ার সুবাদে সুনামও রয়েছে। আশরাফ শ্রেনির কারো সাথে সম্পর্ক করতে পারলে আরেকটু জাতে উঠা যায়। তাই তিনি মামুদের পিতা মীর তাজুদ্দীনকে বেয়াই সম্পর্ক পাতানোর জন্য রাজি করলেন। মামুদের সাথে ছবিরনের বিয়ে হয়ে যায়। আর নীরবে চোখের জল ফেলে মফিজন।
ছোটবেলায় পড়ার ভয়ে আকিয়াবে পালিয়েছিল বকশু। সেখানে কাজ নিয়েছিল। এখন সে মস্ত পয়সাওয়ালা। যদিও বয়স কিছুটা বেশি। কিন্তু নিজেদের পড়তি অবস্থার দিকে তাকিয়ে মফিজনের বাবা বকশুর সাথে মফিজনের বিয়ে ঠিক করে। মফিও পরিবারের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু বিয়ের দিনই আসে জরুরি টেলিগ্রাম। এখনই ফেরত যেতে হবে ব্যবসাক্ষেত্রে। নইলে সমূহ বিপদ। কি আর করার! বাসর শয্যার পরদিনই বকশু বিদায় নেয়। এদিকে শ্বশুর বাড়িতে শুধু বৃদ্ধ শাশুড়ি। সময় যেন কাটে না। এমন সময় মফির জীবনে আসে ভাগ্নে সম্পর্কের খোকা। প্রথমে এসেছিল পড়া বুঝতে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক ভিন্নপথে প্রবাহিত হয়। নারীর কামনা ও কৈশোরের কৌতূহল নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।
মফিজন উপন্যাস নাকি বড় গল্প সেই সম্পর্কে দ্বিমত থাকলেও আমার কাছে এটাকে বড় গল্পই মনে হয়েছে; যদিও উপন্যাস হওয়ার সকল উপাদানই রয়েছে। কিন্তু সবকিছুই কেমন সংক্ষিপ্ত আকারে চিত্রায়ণ করেছেন লেখক। ছোট পরিসরে লিখতে গেলে চরিত্রগুলো ঠিকঠাক ডানা মেলতে পারে না; এখানে লেখক অল্প বর্ননাতেই চরিত্রগুলোকে উপস্থাপন করেছেন। এতে করে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও যতটুকু না হলেই নয়, তা উপস্থিত ছিল। বইটি প্রকাশের পরে অশ্লীলতার অভিযোগে সমালোচকদের বাক্যবাণে বিদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু সমাজের কোনো একটি অবস্থাকে বর্ননা করতে যদি যৌনতাকে উপস্থিত করতে হয় তাহলে সেটাকে ঠিক কতখানি অশ্লীল বলা যায়; তা আলোচনার বিষয়। যৌনতাও যখন সাহিত্যিক গণ্ডিতে রেখে উপস্থাপিত হয়; তখন তা প্রাসঙ্গিকভাবেই গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া উচিত। হ্যাপি রিডিং।
মাহবুব-উল-আলম এর " মফিজন" বইটা প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৪৬ সালে। পড়তে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, যদি বইটা এই সময় এই ২০২৫ সালে লেখা হতো, তাহলে বইটা হতো নিষিদ্ধ এবং লেখক কে দেওয়া হতো নির্বাসনে।
তখনকার সেই সময়ে একজন মেয়ের নারী হয়ে ওঠা, সমাজ এবং পরিবারে তার অবস্থান, ধর্মীয় জীবনাচার এবং মুসলিম নারীর বিবাহিত জীবনের একটা অন্ধকার দিক প্রকাশ্যে এনেছেন যথেষ্ট শৈল্পিক ভাবে।
বইটা বেশ নিন্দিত হয়েছে আবার প্রশংসিত ও হয়েছে সেই সময়ে। সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থায় "মফিজন" টিকে থাকতে পেরেছে এটাই অনেক। লেখকের লেখা আগে পড়ি নাই, অসম্ভব সুন্দর লেখনী। তবে লেখক কি মনে করে শেষ করেছেন বইটা তা তো জানার উপায় নাই তবে আরও একটু বড় হতে পারতো কাহিনি।
আজকের দিনে এসেও নারীদের যৌন জীবন বিষয়ক যেকোনো কিছুকে আমাদের সমাজ খারাপ চোখে দেখে। যেন যৌনতা শুধু পুরুষদের জন্য। সেই জায়গায়, আজ থেকে দীর্ঘ আট দশক আগে প্রকাশিত এই বইটি, সমাজের মুখে চপেটাঘাতের মতো। বিষয়বস্তুর কারণেই হয়তো একে নিয়ে বেশি আলোচনা হয় না৷ এর প্রচার ও প্রসার কামনা করি।
'মফিজন' উপন্যাসের সবচেয়ে বড় দিক ছিল অল্পকথায় এর বিশাল ব্যাপ্তি। মফিজন নামের একটি মেয়ের অতৃপ্ত জীবনের গল্প। অথচ মোটাদাগে বইটির পরিচয় জানা গেল, এ মূলতঃ নারীর অবদমিত কামনা নিয়ে লেখা অত্যন্ত সাহসী বই। এখন যুগ হিসেবে সাহসী বইয়ের চলটাই বেশি, তাহলে ও বইয়ে আশ্চর্যের ব্যাপারটা কি? আশ্চর্যের ব্যাপারটা হলো এর প্রকাশের যুগ, প্রথম প্রকাশ ১৯৪৬!! ওরকম জামানায় এমন বিষয়ে বই, অবশ্যই একটা আকর্ষণ কাজ করে। কিন্তু পড়তে গিয়ে বোঝা গেল কলেবরে ৩৫-৪০ পৃষ্ঠার এই বইটি শুধু কামনা ছাপিয়ে বরং আরও অনেক কিছু।
যেমন উপন্যাস শুরুই হয় দুইবোনকে একটা তুলনামূলক আলোচনায় তোলার মাধ্যমে। খুবই অল্প কথায় বোঝা হয়ে যায় মফিজন নামের একটি মেয়ে আছে এই গল্পে, যেই মেয়েটি অত্যন্ত চঞ্চল, চপলা ও বাকপটু। কিছুতেই তার গল্প থামেনা। বইতে বিষয়টিকে লেখক বর্ণণা করেছেন এভাবে- 'মফি তাকায় মুহূর্ত; কিন্তু কথা বলে অনেক। ডিম-ভরা কৈ'র মতো; ভিতরে সব দানা বাঁধিয়া আছে। ছাড়িতে পারিলে বাঁচে।' অপরদিকে আছে তার বোন ছবিরন, যে স্বভাবচরিতে একেবারেই বিপরীত এবং আরও আছে মফিজনের একান্ত ঘনিষ্ট, মামুদ। প্রথম পাতাতেই তাদের তিনজনের অবস্থান সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাওয়া হয়ে যাবে। এবং কিছু বুঝতে না বুঝতেই গল্প থেকে ছবিরন ও মামুদের বিদায়ের দিন চলে আসবে। এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক বালিকার একটি অভিজ্ঞতা, মফিজন কপাল এবং ওষ্ঠ হইতে মুছিয়া ফেলিবার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাইয়া যাইবে।
এরপরও মফিজনের জীবন চলবে। মফিজন একের পর এক খোসা খুলবে জীবনের। লেখক মাহবুব-উল আলম চেয়েছেন একটি জীবনের অভিজ্ঞতাকে তুলে আনতে খুব অল্প শব্দ খরচ করে, কোনপ্রকার ভণিতা না করে কোনপ্রকার রঙ না চড়িয়ে, মার্জিত ভঙ্গিমায়। কারণ তিনি নিজেকে পরিচয় করাতে চান সাহিত্যের দিনমজুর হিসেবে। তার গল্পগুলো সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের গল্প। তিনি চান তার গল্পে উঠে আসুক রক্তমাংসের মানুষ ও তার প্রত্যক্ষ জীবন, সত্যের অনাবৃত রূপ। এবং লেখক ভালোই জানেন কোথায় থামতে হবে।সেকারণেই এত অল্পকথায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন পুরো চিত্র।
বইটিকে নিয়ে বলা হয়েছে এতে আছে নারীর অবদমিত কামনার কথা। অথচ আমি দেখলাম বইতে আছে এক নারীর ট্র্যাজিক লৌকিকতা। এখানে কৈশোরের প্রিয় মানুষটির খুব কষ্টের বিদায় ঘটে। তারপর মফির সংসার হয় এক কাজপাগল প্রবাসী লোকের সাথে, যাকে মফিজন ছুঁয়ে দেখবার ফুসরত মিলতে মিলতেই মিলিয়ে যায় সময়। তারপর এক বালকের আগমন ঘটে মফিজনের জীবনে। সেই বালকটি ধীরে ধীরে মফির চারিত্রিক বৈশিষ্টের মুগ্ধতা ছাপিয়ে সতেজ ছাউনি ফেলে আবিষ্কার করে পবিত্র গ্রন্থের মত এক তরুণী দেহের বিষ্ময়। বালকটির যৌবনের সোপান হয়তো মফিজনের অগোচরে বা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে তৈরি হয়ে গেলেও মফিজনের জীবনে এ সৌন্দর্যের কদর অপাত্যই রয়ে যায়। ওদিকে স্বামী পরদেশ থেকে পরপারে পাড়ি জমালে মফির জীবন বাঁক নেয় ভিন্ন ট্র্যাজেডিতে। সেই ট্র্যাজেডিতে শুধু কামনাই আছে, নেই কোনো মানবিক স্পন্দন। মফির মনের ভাষায় বিষয়টি এমন ভাবে বলা- 'যদি চোখে দেখিয়া বুঝিতে পারে; কাদা রুধিরে আপ্লুত করিয়া যে শিকারকে করা হইতেছে অর্ধভক্ষণ উহার প্রতিটি কণিকা দেবতার ভোগ।'
অর্থাৎ আমার মনে হয়েছে দাম্পত্য, কামনা, যৌবন কে উপজীব্য করে এই উপন্যাসিকা লেখা হলেও এটি মূলতঃ পুরুষের প্রভাবণাকে প্রস্তাব করে, যেখানে নারীর কামনার অংশটুকুই বরং গৌণ।
বইয়ের শুরুর অংশের আলাপ এবং বইটি পড়ার পর এর আকার দেখে সহজেই ধারণা করা যায় অশ্লীলতা ব্যতিত আরও একটি বিষয় নিয়ে এই বইটি সমালোচনার মুখে পড়েছিল। আর তা হল এটা কি ছোটগল্প হল না উপন্যাস? আমরা এটাকে উপন্যাসিকা বললেও এতে ছোটগল্প এবং একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হবার সকল বৈশিষ্টই বর্তমান। তাই সুশীলেরা বইটি নিয়ে মরলেন এর টাইপ নিয়ে, আর আবালবৃদ্ধবনিতা পড়লেন এর অশ্লীলতা নিয়ে। অথচ নারীর মনের অকথিত ব্যাথার পরিচয় এতো নিবিড় সন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে খুব কম লেখকই যে দেখেছেন, এটা কেউ দেখলেন না। বেগম সুফিয়া কামাল ভুল বলেননি-
'সকলে সমালোচনাই করিল, কিন্তু মফিজনের বেদনাটা কেহ বুঝিল না।'
বাংলা সাহিত্যে বড় গল্প, উপন্যাস হবার সার্থকতা কোথায় এই প্রশ্নে অনেক ভাল রচনা বা সাহিত্য বাদ পরে যায়। আবার এমন কিছু সাহিত্য আমাদের সামনে উঠে আসে যেটা আপনি আমি ভাবতেও পারিনি। অথচ আজকে থেকে বহু বছর আগে যারা সাহিত্য রচনা করেছেন তারা কতটা দূরদর্শী বা তাদের চিন্তাভাবনা কতটা বিস্তৃত ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷
বাংলায় যারা সাহিত্য রচনা করেন বিশেষ ভাবে মুসলিম সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে পুরুষ বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কথা উল্লেখ করা। সেখানে তাদের জৈবিক চাহিদার কথা বার বার উঠে এসেছে। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তাদেরও যে জৈবিক তাড়না রয়েছে। সেটিকে সাহিত্যের পাতায় উঠিয়ে আনার সাহস খুব কম মানুষ করেছেন। আবার বলা যায় এটাও যে সাহিত্যের উপজীব্য হতে পারে বা হবে সেটাও খুব কম সাহিত্যিক চিন্তা করে থাকেন।
এক্ষেত্রে বলা যায় যে এটা প্রথাবিরোধী বা সমাজের চোখে এটা অশ্লীলতা বলে গণ্য করা হয়েছে বা হয়। আবার অনেকেই আছেন এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেন না।
"জীবন যেখানে যেমন, হয়ত এটাই নিয়তি"
ছবিবর ও মফিজন দুই বোন। তাদের ডাক নাম হচ্ছে ছবি ও মফি। দুজনের মধ্যে ছবি বড় এবং মফি ছোট। যদিও শারিরীক গঠনে তা বোঝা যায় না। আবার ছবি কিছু শ্যাম বর্ণের অপর দিকে মফি ফর্সা বা উজ্জল। কিন্তু এই সৌন্দর্য মক্তবে বোঝার মত ক্ষমতা কারো ছিল না। ঠিক তখন ই আগমন ঘটে মামুদের। মফি এর সাথে মামুদের বোঝা পরার দিন শেষ হবার আগেই বিদায়ের ডাক চলে আসে।
এই দিকে তখন সমাজ ব্যবস্থা বিশেষ ভাবে মুসলিম সমাজ ব্যবস্তায় আশরাত আতরাফের ফারাক ছিল৷ এই দুজনের মধ্যে আত্মীয়তা কেউ মেন নিত না আবার কেউ করত না৷ ছবি এবং মফির বাবা হচ্ছে এই আতরাফ শ্রেনীর। যদিও পাটের ব্যবসায় টাকা পয়সা উপার্জন করেছেন। কিন্তু দালাল শব্দ তার পিছু ছাড়েনি। আশরাফ শ্রেনীর কারো সাথে আত্মীয়তা কতে জাতে ওঠার চেষ্টা করছেন। তাই তিনি মামুদের পিতা পীর তাইজুদ্দিনের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করেন। ছবির সাথে মামুদের বিয়ে হয়ে যায়, আর মফি আড়ালে কেদে ওঠে।
অপর দিকে বকশু ছোট বেলায় পড়ার ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে আকিয়াবে চলে যায়। সেখানেই তার অবস্থার উন্নতি ঘটে। বেশ পয়সাওয়ালা সে। যদিও বয়স একটু বেশি কিন্তু তাতে সমস্যা নেই। মফির বাবা বকশুর সাথে তার বিয়ে ঠিক করে। বিয়ের দিন ই বকশুর কাছে টেলিগ্রাম আসে তাকে চলে যেতে হবে। বাসর রাতের পর ই। বাসর এর পর দিন ই বকশু বিদায় নেয়। মফি আবার একা হয়ে যায়। ঘরে বলতে শুধু বৃদ্ধা শ্বাশুড়ি।
ঠিক এমন সময় মফির জীবনের মোড় ঘুরে যায় আবার। তার জীবনে আসে খোকা। সম্পর্কে ভাগ্নে হলেও, সেই সম্পর্ক ভিন্ন পথে চলে যায়। নারীর কামনা ও খোকার কৈশোরের কৌতুহল জন্ম দেয় নতুন অভিজ্ঞতার।
মনে রাখা দরকার যে এই উপন্যাসটি লেখা হয়েছে ১৯৪৬ সালে। তখন সমাজ ব্যবস্থা অন্য রকম ছিল। অনেকেই একে অশ্লীল বলে উপেক্ষা করেছেন অথচ ছোট কথায় এত সুন্দর করে বর্ণনা করা যায় তা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখে না। কাহিনী অনেক বড় নয় আবার একে উপন্যাসের অওতায় ফেলাও যায় না। বড় গল্প বলা যায়। কিন্তু কোথাও একটু বাড়িয়ে বা বাড়তি কথা নেই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন শব্দ বা বাক্য নেই৷ ছোট ছোট বাক্য আর শব্দে লেখক কাহিনী কে বর্ণনা করেছেন।
এখন এই যে অশ্লীল বলা হয়েছে তা আসলেই কতটুকু বা কতখানি অশ্লীল তা আলোচনা করা যেতেই পারে। কারণ এটা লেখকের উপর বর্তায় যে তিনি জৈবিক চাহিদা, যৌনতা আর কামনাকে কিভাবে উপস্থাপন করেছেন। যদি তিনি নিজের বা সাহিত্যের গন্ডির মধ্যে থেকেই সেটাকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করে থাকেন।তবে অব্যশই সেটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আমার মনে হয়। বাকিটা পাঠকদের হাতে।
১৯৪৬ সালে প্রকাশিত "মফিজন" আদতে বড় গল্প নাকি উপন্যাসিকা, সে বিষয়ে তর্কের সুযোগ থাকলেও সাহিত্যের সংহত ও শৈল্পিক রূপের উদাহরণ হিসেবে নি:সন্দেহে অনন্য। অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হওয়া সত্বেও, তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে যৌনতা কিংবা অন্দরমহলের মুসলমান নারীর মনস্তত্ত্বের যে দিকগুলো এই গল্পে উঠে এসেছে তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। নারীর কামনা, আকাঙ্ক্ষা, ও সামাজিক বাস্তবতার সংঘর্ষ এই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু। নারীর পরিপূর্ণতার জন্য পুরুষের স্পর্শের আবশ্যকতা তুলে ধরা হলেও, প্রেমহীন মিলনের শূন্যতায় উপন্যাসটিকে পাঠকের মনে গভীর বেদনাবিধুর অনুভূতির জন্ম দেয়। এর পাশাপাশি এড়িয়ে যেতে চাওয়া অস্বস্তিকর আরও একটা গল্পের সাথে পরিচয় ঘটে বইয়ের পাতায়। কিশোর মনে নারীর প্রতি আকর্ষণের অনুরণন; নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা, সৌন্দর্যের প্রতি দুর্নিবার মোহ, অপ্রাপ্তির হতাশা। সব আকাঙ্ক্ষার পরিণতি যে ভালোবাসায় রূপ নেয় না- এই নির্মম বাস্তবতা পাঠকের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। কবি সুফিয়া কামালের সাথে একমত হয়ে ভাবতে হয়, "সকলে সমালোচনা করিল, কেহ মফিজনের বেদনাটা বুঝিলো না।"
'মফিজন' কে কেউ কেউ অশ্লীল বললেও, আদতে এমন লাগেনি আমার।
এটি মূলত একটি নভেলেট। দৈর্ঘ্যে খুবই ছোট। এই অল্প সময়ে লেখক মাহবুব-উল আলম এর বর্ণনার নৈপুণ্য ফুটে উঠেছে বেশ ভালো ভাবেই।১৮শতকে গ্রামীন মুসলিম বাংলার অধিকাংশ মেয়ের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার প্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি "মাফি" নামক একটি চরিত্রের দ্বারা। যেখানে পাখির মতো ছটফটিয়ে ডানা ঝাঁপটা দেয়া মেয়েটাও কিভাবে শিকারীর দো'নলা বন্দুকের সামনে অসহায় হয়ে খাঁচায় পোষ মেনে যায়। লেখা খুবই সল্প হলেও কাহিনী সল্প নয়। সল্প কথায় কিভাবে দীর্ঘ বর্ননা করা যায় সেটা বরং এযুগের লেখকরা মফিজন পড়ে শিখুক।
যাই হোক, সর্বশেষ বলবো এটা আমার প্রায় একবছর পরে পড়া কোনো উপন্যাস / নভেলেট। আমি মূলত নন-ফিকশন রিডার। সে দিক থেকে 'মফিজন' সুপাঠ্য ছিলো।
‘মফিজন’ কে ২০২৫ সালে পড়ে তেমন একটা প্রথাবিরোধী বা রেবেলিয়াস নাই মনে হতে পারে, তবে মনে রাখতে হবে, আখ্যানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালে, দেশভাগেরও আগে! সেই সময়ে লেখক এমন সাহসী লেখা লিখতে এবং ভাবতে পেরেছেন এই জন্য তাকে সাধুবাদ দিতেই হয়। এই গল্প নিয়ে সবচেয়ে লাগসই কথা সম্ভবত বলেছেন কবি সুফিয়া কামাল, “ সকলে সমালোচনাই করিল, কিন্তু মফিজন-এর বেদনাটা কেহ বুঝিল না! ”