রবীন্দ্রনাথের সহধর্মিণী মৃণালিনীর আত্মকথনের ভঙ্গিতে লেখা এই উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বিয়ের রাত থেকে শুরু করে নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্বামী রবিবাবুর সংগোপন জীবনের নানা কথা অকপটে তুলে ধরেছেন মৃণালিনী। সবলতা-দুর্বলতায় মেশা রবীন্দ্রনাথের জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায় আটপৌরে ভাষায় উঠে এসেছে এই উপন্যাসে।
Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.
রবী ঠাকুরের যারা ভীষণরকম ভক্ত, আমার মতো... তাদের এই বই পড়া উচিত না! উনার উপর রাগ হয় খুব!! পড়া শেষে মৃণালিনীর সাথে হওয়া সব অবিচার-অবহেলা এবং সংসারে রবী ঠাকুরের উদাসীনতার জন্য মনটা ভারী হয়ে থাকে বেশ ক'দিন!
তারপর একদিন সেই মন খারাপ থেকে গা ঝাড়া দিয়ে বেরিয়ে এসে প্রকৃত ভক্তের মত বলতে হবে- "উনি ব্যক্তি জীবনে কেমন ছিলেন তা তো আমার দেখার বিষয় না! উনার লেখা আমার ভাল্লাগে, লেখা পড়বো। দ্যাটস্ ইট!"
বইটা খুব সুন্দর! লেখনি চমৎকার, তথ্যবহুল। অন্তত ঠাকুরবাড়ির কালচার সমন্ধে বেশ ধারণা পাওয়া যায়।
ক্রমে ক্রমেই এই লেখক আমার প্রিয় লেখকের লিস্টে জায়গা করে নিচ্ছেন। তার লেখার স্টাইল,শব্দগঠন সবকিছুই জাস্ট পারফেক্ট। এই বইটা ওনার আর যে কয়টা বই পড়েছি তার মতো না। পুরোপুরি সাবলীল। এত ছন্দময় লেখনী যা পাঠককে এক অধ্যায় থেকে আরেক অধ্যায়ে নিমেষেই নিয়ে যায় এবং শেষ হয়ে গেলে আফসোস জাগায়,"ইশ! আরেকটু যদি বড় হতো।"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে যারা একবিন্দু পরিমাণও আগ্রহী তারাই এই বইটা উপভোগ করবে। নতুবা বাকিদের কাছে এটাকে অর্থহীন বা কাঠখোট্টা মনে হতে পারে। আর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমি অতি আগ্রহী বিধায়ই বোধহয় আমার এটাকে অমৃতসম লেগেছে।
লেখার ক্রুটি, সেটা আগে বলে নিই। রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কে প্রথম জেনেছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'প্রথম আলো' পড়ার মাধ্যমে। সুনীল তো সুনীলই! রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এত জেনে এত গবেষণা করেও তিনি যখন লিখতে বসেছেন রবীন্দ্রনাথকে পূর্ণ সম্মান দিয়েছেন। কাদম্বরী-রবীন্দ্রনাথ,ইন্দিরা-রবীন্দ্রনাথ এমনকি মৃণালিনী-রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়েও অন্তরঙ্গ বা রসালো একটা শব্দ লেখেননি সুনীল। তার প্রেজেন্টেশন ছিল চমৎকার। পড়লে কেউ রবীন্দ্রনাথকে ঘৃণা করবে না, বরং রবীন্দ্রনাথের সব কাজের পেছনেই একটা ব্যাখ্যা খুঁজে পাবে। কিন্তু এই লেখক তা করেননি,তিনি সরাসরি লিখে দিয়েছেন, ইন্দ্রিয়ের ওপর দখল হারিয়ে সেটার পক্ষে যুক্তি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজের দূর্বলতা ঢাকতে চাইতেন। সংসারের ছোট-বড় প্রতিটা ঘটনায় রবীন্দ্রনাথকে মৃণালিনীর তরফ থেকে বারবার দোষী সাব্যস্ত করার এই চেষ্টাটা ভালো লাগেনি। আর এর পেছনে রেফারেন্সও উল্লেখ করেননি,যেটা করা দরকার ছিল।
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, বইয়ের নাম মৃণালিনীকে নিয়ে যার আসল নাম ভবতারিণী। শ্বশুরবাড়িতে আসার পর রবীন্দ্রনাথ তার নাম পরিবর্তন করে দিলে সেটা তার একটুও ভালো লাগেনি। স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের মনে হবে নামকরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে মৃণালিনীর পেছনের ভবতারিণী চিৎকার করে আত্নপ্রকাশ করতে চাইছে। কিন্তু বস্তুত,এটা কিন্তু শুধুই মৃণালিনীর জীবনের গল্প না। এটাতে ঠাকুরবাড়িতে সে আসার আগের,বা তার বুদ্ধি উদয় হবার আগেরও অনেক গল্প তার মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে যার থেকে মনে হয় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লেখক যা জানতেন সবটাই জানাতে চাইছেন এই মৃণালিনীর মুখ দিয়েই। এমনকি কাদম্বরীর সাথে সম্পর্ক নিয়েও রবীন্দ্রনাথ নাকি তার সাথে সরাসরি গল্প করতেন!
রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবনের গল্প রেফারেন্স ছাড়া মানায় না। মৃণালিনী যেভাবে রবীন্দ্রনাথের মুখের ওপর যুক্তি দিয়ে কথা বলে তাকে পরাস্ত করতো এটা কেমন অবাস্তব বলে মনে হয়েছে আমার।
ভালো দিকও কিন্তু আছে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এত ভেতরের কিছু কথা বলা হয়েছে যা কেবল তার জীবনসঙ্গীনি যে প্রতিটা রাত তার পাশে কাটায় সেই বলতে পারবে। যেমন হঠাৎ হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের রেগে যাওয়া, ঘুমের ঘোরে কাদম্বরীর সাথে সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা নিয়ে কবিতা বানিয়ে পড়ে যাওয়া,তাকে নিয়ে একের পর এক কবিতা লিখে যাওয়া,কাদম্বরীর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথের মনের অবস্থা সবচেয়ে কাছ থেকে দেখার সুযোগ যার হয়েছিলো তার মুখ থেকেই এই কথাগুলো যেন মানায়।
সর্বোপরি গল্পে মৃণালিনীর একাকিত্বের কথা বারবার যেন চিৎকার করে বলতে চেয়েছেন তিনি। যিনি রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী হতে পারলেও মনের সঙ্গী হতে পারেননি,যিনি চাইতেন রবীন্দ্রনাথ তার চমৎকার কথাগুলো ইন্দিরাকে না বলে তাকে বলুক। রবীন্দ্রনাথ তার মধ্যে নলীনিকে না খুঁজে ভবতারিণীকেই ভালোবাসুক। রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই তার স্ত্রীকে ভালোবাসতেন কিন্তু সেই ভালোবাসায় স্ত্রী যে সন্তুষ্ট ছিলেন না সেটাই লেখক বারবার বোঝাতে চেয়েছেন।
ভালোমন্দের মিশেলে উপভোগ করার মতো একটা বই। ননফিকশন খুব বেশী পড়িনি। তবে এটার মতো উপভোগ করিনি বাকিগুলো। কিছু ক্রুটি গল্পে থাকলেও লেখনী বা স্টাইলের ত্রুটি কোথাও নেই। হরিশংকর জলদাসকে আবারও শ্রদ্ধা ফিকশনের কায়দায় চমৎকার নন ফিকশন এই বইটার জন্য।
মোটামুটি আজকের দিনের নানারকম বিরক্তি আর disgusting জিনিসের মাঝে এটা একটা। কয়েকদিন আগে শুরুতে যতটা সহজাত মনে হয়েছিল লেখাটা ক্রমশ সেটা বিরক্তি তে রূপ নিল । synopsis টা আরেকবার পড়ে দেখলাম "বাস্তবতা এবং কল্পনায় মেশানো" - এই কল্পনাপ্রসূত অংশগুলোই মেজাজ টা খারাপ করে দিল।
বছর দুই আগে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের " কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট " টা পড়েছিলাম। বেশ ভালো লেগেছিল। আজ আরেকবার চেক করে দেখলাম ওটাও উপন্যাস, এটাও উপন্যাস। " কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট " টা যে উপন্যাস ছিল সেইটা মনে হয় আজই সচেতনভাবে খেয়াল করলাম, কারণ লেখাটা এত সহজাত ছিল উপন্যাস বলে মনেই হয়নি, মনে হচ্ছিল সত্যিই কোন নোট পড়েছিলাম।
এই বইটা দিয়ে ভালো একটা কলকাতার সিনেমা হতে পারত/ পারে। বেশ একজোড়া এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার/ এট্রাকশনের কনটেন্ট আছে :/ জ্ঞানদা বউদি- জ্যোতি আর জ্যোতির বউ কাদম্বরী আর রবি। লেখক যে মৃণালিনী কে স্বরব দেখাতে চেয়েছিলেন, তার সবই যেন এই দুই এক্সট্রাম্যারিটাল এফেয়ারের বোঝা মৃণালিনীর মাথায় চাপিয়ে দিয়ে তাকে স্বরব দেখানো। এই দুইয়ের চিন্তা ছাড়া যেন মৃণালিনীর আর কোন এক্সিস্টেন্স নেই। আর মৃণালিনীর যেই মানসিক টানাপোড়েন সেটা আমার একজন পুরুষ লেখকের আরোপিত টানাপোড়েন মনে হয় :/ হ্যাঁ আমি অস্বীকার করছি না যে তার মানসিক দ্বন্দ্ব থাকতে পারে , কিন্তু আমার কেন যেন সবই লেখক আরোপিত মনে হয়েছে, সহজাতের বদলে।
কিছু কিছু জায়গায় মৃণালিনীর যে desperation দেখানো হয়েছে তার প্রকাশ ভঙ্গি টা আমার খুব লেইম আর লুথা লাগছে। যেমন, জোর করে যেন মৃণালিনীকে দিয়ে রবিঠাকুরকে লেখা তাঁর বাবার চিঠির একটা এই মানে ঐ মানে বের করা। সব মানেই খুব forced , চাপানো মনে হয়। আবার লিখতিছে রবিঠাকুর তাঁর আর কোন প্রেমিকার নাম বদলায় নি, তাঁর বউয়ের নাম কেন বদলাল - হেন, তেন। নিচের প্যারাতেই আবার লিখল, আনা তড়খড়ের নাম দিয়েছিল সে নলিনী। কী যে লিখছিল খেয়াল ছিল কিছু ! :/
আমার মনে হল মৃণালিনীর সব অস্তিত্ব তাঁর নিজের রেসপেক্টে আসে নাই, নিজেকে ভিকটিম দেখানোর যেন একটা চেষ্টা জোর করে তার উপর চাপিয়ে দেওয়া, লেখকের বাস্তবতা-কল্পনায় মেশানো এই উপন্যাস পড়ে আমার সত্যিই সিক লাগছে :/
যেহেতু লেখক লিখেছেন ভবতারিনীর নাম বদলে মৃণালিনী করায় তার অন্তরাত্মা বিরোধ করে উঠেছিল। কিন্তু যদি লেখক লিখত���ন ভবতারিণীর আত্মকথনে, " তিনি আমাকে ভালোবেসে ডাকলেন মৃণালিনী বলে " , তখন আমরা পাঠকেরা কি ভেবে দেখতাম মানুষটাকে তার বাবা মায়ের দেওয়া পরিচয় থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে ?
প্রায় ১০ বছরের ভবতারিণীর মৃণালিনী হয়ে জীবন কাটানোর গল্প।
রবি বাবুকে নিয়ে ভবতারিণী দেবীর অভিমান-অভিযোগ ছিলো বেশ। নয় বছর বয়সের বউ হয়ে যখন ঠাকুরবাড়িতে ঢুকেছিলেন তখন চোখে ছিলো ভয়, এতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষজনের মাঝে নিজের জড়তা, হীনমন্যতা। প্রায় ২০ বছরের সংসারের শেষের দিনে ভবতারিণী দেবীর চোখে ছিলো শুধুই কষ্ট, নিজের সন্তানদের দেখার আকুতি। বইটা আমি যখন পড়েছিলাম তখন বেশ কিছু জায়গায় চমকে গিয়েছি ভবতারিণী দেবীর ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে জীবনের বেশ কিছু ঘটনা কে কাটতে দেখে। কিছু জায়গায় আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে ভবতারিণী দেবীর 'Overthinking'. পুরোটা সত্তা দিয়ে রবিবাবু কে ভালোবেসে যেই অবহেলা, মানসিক পীড়ন, কাদম্বরী বউঠানের প্রতি রবিবাবুর যে অগাধ ভালোবাসা, রবিবাবুর আরো বেশ নারীঘটিত ব্যপার নিয়ে সেই বয়সে ভবতারিণী দেবী যে কষ্ট পেয়েছিলেন, সেই কষ্ট সহ্য করতে পারার ক্ষমতা ভবতারিণীর ধৈর্য্যের ই চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। ভবতারিণী দেবী কতটা মৃণালিনী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তা জানতে হলে বইটি পড়তে হবে।
বি.দ্র. : রবিবাবু এক মৃত্যুশয্যায়ী মা কে তার সন্তানদের শেষবারের মত মুখ দেখার থেকে বঞ্চিত করেছেন পড়ে আমার মন টা একদম বিষিয়ে উঠলো.. এতো নির্দয়তা, এতো নির্লিপ্ততা কেনো!
আমি মৃণালিনী নই বইটিতে রবি ঠাকুরের স্ত্রীর বয়ানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নিজের জীবনের অনেক উত্থান পতন দেখানো হয়েছে । বিয়ের পিড়ি থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছোটখাট দুক্ষ কষ্টের কাহিনী এতে লিপিবদ্ধ আছে । সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের তারপ্রতি ভালোবাসাহীনতা । কখনো নিজের নাম বদলানোতে কখনো কাদম্বরীর সাথের রবি ঠাকুরের সম্পর্কের গল্পে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে ভবতারিণীর মন । জানি না , এ গল্পে কতটুকু সত্য আছে না কি মিথ্যার সাথে কিছু সত্য মিশিয়ে এই বইটি রচনা করেছে লেখক ? কিন্তু লেখক এক দিক প্রশংসার দাবিদার । এমন চমতকার লেখনী খুব কমই দেখতে মেলে । এক ধরণের আকর্ষনীয় ক্ষমতা আছে লেখায় যা থেকে চোখ ফেরানো যায় না । আর এ বইয়ের কিছু অংশও যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে রবীন্দ্রনাথের উপর থেকে যে এক ভক্তি শ্রদ্ধা ছিল তার অনেকাংশই কমে গিয়েছে আমার ।
আমার এই লেখাটি একটু অগোছালো,নিজের মত করে পড়ে নেবেন।
রবীন্দ্রজীবনে নিরন্তর নারীপ্রবাহের পেছনে ছিলেন তার আক্ষেপ, তার নিঃসঙ্গ স্ত্রী,মৃণালিনী। রবীন্দ্রনাথ তার স্ত্রীকে ডাকতেন ছুটি নামে। কিন্তু কি হত, যদি মৃত্যুর পর মৃণালিনী চিঠি লিখতেন স্বামী রবীন্দ্রনাথ কে? তা হত হয়ত এমন- "প্রিয় রবিবাবু, ধরণীর আর কোন কবি কি তার স্ত্রীকে ছুটি বলে ডাকতে পেরেছেন?তুমি এ ব্যাপারেও অনন্য। কিন্তু সত্যি করে বলত, কিসের থেকে,কার থেকে ছুটি চেয়েছিলে তুমি? আমি জানি,ছুটি চেয়েছিলে,তোমার আমার সম্পর্কের সকল স্বাভাবিক বেড়াজাল থেকে।"
রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে দেবতার মত। আমি তার গানে কিসের ছোয়া পাই,সে আমি জানি না। শুধু জানি,আমার মাঝে যে শান্ত আমিটা আছে,লোকের অগোচরে যে সুন্দর,যুক্তির ধ্যান করা নিত্য প্রবাহমান একটি ধারা, সেটা অনেকটাই তার গান দিয়ে গড়ে তোলা।
আমার নমস্য ব্যাক্তিটি যে আসলে পার্থিব জীবনে খুব বেশি দেবতাসম নন,তা আমি জেনেছি তাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়েই৷ তার রবীন্দ্রসংগীত এর গৎবাঁধা সুরের মত তার জীবনও ছিল অনেক টা বাধা, ঠাকুর বাড়ির নিয়ম আর অনেক বিধিনিষেধ এর বেড়াজালে। বিধি ভাঙ্গার আনন্দ তিনি পাননি তার মেজ বৌদি জ্ঞানদানন্দিনীর মত, কারণ কেউ তার সাপোর্টে ছিল না।
নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর সাথে তার যা সম্পর্ক,তাকে মাধুর্যময় পরকীয়াই বলা চলে, কিন্তু সমাজকে এড়িয়ে কাদম্বরী যেমন তার রবির সাথে একাত্ম হতে পারেননি, তেমনি রবিঠাকুরও পাননি তার নতুনবৌঠানকে নিবিড়ভাবে। কিন্তু মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে... এই দ্বিধা দুইজনের মনেই ছিল, তার মূল্য শোধ হয়েছে কাদম্বরীর আত্মহননে আর মৃণালিনীর করুণ মৃত্যুতে।
মৃণালিনী যে রবীন্দ্রনাথ কে ছুতেঁ পারবেন না, সে তো আগেই বোঝা গিয়েছিল। যতই উদগ্র বাসনা নিয়ে কালাকোলা ভবতারিণী তার রবিবাবুর অপেক্ষা করুন না কেন,রবি কোনদিন পুরোপুরি তার ছিলেনই না!
হরিশংকর জলদাসের আমি মৃণালিনী নই এই বইটি সেই আত্মাভিমানী ভবতারিণীর গল্প,যিনি হারিয়ে গেছেন রবিঠাকুরের দ্বিধায়, হারিয়ে গেছেন একটি সাধারণ মেয়ে ঠাকুরবাড়ির অসাধারণ কিন্তু জটিল ঘূর্ণাবর্তে। রবীন্দ্রনাথ কিছুতেই এর দায় এড়াতে পারেন না।মৃণালিনীর আত্মকথার ধরণে তার ক্ষোভ,অসহায়ত্ব নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তার সাথে দেয়া হয়েছে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে চলমান এক জটিল সম্পর্ক জালের বর্ণনা। নিয়ম ভাঙ্গতে গিয়েও রাখতে যাবার বিড়ম্বনার ছাপ লেগে থাকত ঠাকুরবাড়িতে, তাদের স্বাভাবিক আভিজাত্যই তাদের খোলা মনে একটি আস্তরণ ফেলে দিয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির কেউই নতূন নিয়মকে যেমন অবজ্ঞা করতে পারেননি, তেমনি পুরাতনকে একেবারে ত্যাগও করতে পারেননি। সেই দ্বিধার বলি হয়েছেন অনেকেই,মৃণালিনী শুধু নন, রবি,জ্যোতি সব ভাইও।
আমি ভাবি,কি হত যদি মৃণালিনী রবীন্দ্রনাথ এর বউ না হতেন? রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ,কাদম্বরীও অসাধারণ ছিলেন। তাই আকর্ষণ দুইজনের মধ্যে ছিলই,দুজনই দুজনকে খুঁজে পেতেন নিজেদের মধ্যে। মৃণালিনী অতিসাধারণ, তাই অসাধারণ রবীন্দ্রনাথ তার মৃণের মূল্যায়ন করতে পারেন নি।
রবীন্দ্রনাথ এর ভালবাসার শেষ অঞ্জলি পেয়েছিলেন মৃণালিনী হয়ত তখন,যখন পুড়ছে তার দেহ,চিতায়। শ্মশানের কোথাও ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ। হয়ত এই কবিতাটিই লিখছিলেন বসে- " বেদনার দ্বীপ হতে কখনো নীরবে, অগ্নিশিখা নিভে গিয়ে থাকে যদি কভু, ক্ষমা কর তবে!"
একটিবার একটিমাত্র চিঠিতে একটি চুমু পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর সারাচিঠিতে সেই চুমুটিকেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন তার কলমের আঘাতে। এই করুণ নিষ্ঠুরতা তার পক্ষেই সম্ভব ছিল,তিনি যে শব্দের ঈশ্বর!
একদিকে নতুন বৌঠান কাদম্বরীর প্রতি রবীন্দ্রনাথ এর টান আর মেজ বৌঠান জ্ঞানদানন্দিনীর তীব্র প্রভাবে নিঃস্ব,রিক্ত,ধ্বংস হয়ে গেলেন, রবিঠাকুরের মৃণালিনী,তার ছুটি।
তার মৃণালিনী,তার ছুটি, ঈশ্বরের দ্বিধা বা আক্ষেপ হয়েই থেকে গেলেন!
আমাদের সমাজে,মেয়েদের বিয়ে হয়,ছেলেরা বিয়ে করে। আমরা কি কোনদিন সেই মেয়েটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা তার নিজস্বতা দেখে তাকে নির্বাচন করেছি?নাকি অসম একটি সম্পর্কে নিজেকে আত্মবলিদান দিয়ে নিজেও দ্বিধায় ভুগছি,আর মেয়েটিকেও মানিয়ে নিতে বাধ্য করছি? মৃণালিনী যদি অসাধারণ হতেন, তাহলে তার অযত্ন হত না, রবিঠাকুরও তার দ্বিধা থেকে হয়ত মুক্তি পেতেন। অন্তত,কাউকে কারো আক্ষেপ বা ভুল হয়ে থাক���ে হত না।বিয়েটাতো একটা সামাজিক বন্ধনের পাশাপাশি হৃদয়েরও বন্ধন,তাই নয় কি?
রবীন্দ্রনাথ সাহেব আবার জ্যোতির স্ত্রী অসহায় কাদম্বরী ভাবীর পাশে দাঁড়ায়! ভাই রা দেখি ভালোই অসহায় ভাবী দের দেখাশোনা করতেন। রবীন্দ্রনাথের বউ মৃণালিনীর বয়ানের তার নিজের কষ্টের আখ্যান লিখে গেছেন লেখক।
'আমি মৃণালিনী নই, ভব। ভবতারিণী। কেন আমার পিতৃপ্রদত্ত নামটাকে পরিবর্তন করে ফেলা হলো?'-সারাটাজীবন ধরে এই একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে গেছেন ভবতারিণী থুক্কু মৃণালিনী। হুট করে মৃণালিনীর নাম বললে কম বেশি সবাই একটু থমকে যাবে। চোখ-মুখ কুঁচকে ভাবতে থাকবে, আচ্ছা! উনি যেন কোন বইয়ের চরিত্র..! আরেহ!
একটু ক্লু দেই, কেমন? বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এইতো! এখনই অনেকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেছে। হ্যা। এই রমনী আর কেউ নন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী। যতটা না ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে নাক গলানোর লোভে তার চেয়ে বেশি হরিশংকর জলদাসের লেখার লোভে পড়ে ফেললাম 'আমি মৃণালিনী নই'। বইটা পড়ে কিছুটা মন খারাপই হয়েছে। পুরোটা বই লেখা হয়েছে মৃণালিনীর ব্যক্তিগত ডায়রির ঢঙে। বইটা শুরুই হয় আফসোস দিয়ে.. বাবা-মায়ের আদুরে মেয়ে ছিলেন ভব। ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য বৌ-ঝিদের মতো অতো সুন্দরী বা বিদুষী ছিলেন না তিনি। নেহায়েত সাদামাটা একটা গ্রামের মেয়ে, ঠাকুর বাড়িতে ছোটখাটো চাকুরী করা এক বাবার সন্তান। রবীন্দ্রনাথ তখনও অতো বিখ্যাত হয়ে উঠেননি। পারিবারিকভাবেই সাত পাকে বাঁধা পড়ে গেলেন তারা। জন্মজন্মান্তরের এই বাঁধনে আদৌ কি সুখী ছিলো এই দম্পতি? বিয়ে কিংবা সংসার-কথাগুলো বোঝার জন্য বেশ ছোটই ছিলেন মৃণালিনী। রবীর উপযুক্ত করে তোলার জন্য দায়িত্ব নেন রবির মেজ বৌদি জ্ঞানদানন্দিনী। বিশাল ঠাকুরবাড়ির হাবভাব বুঝে উঠতে না উঠতেই ঘটে যায় একটা দুর্ঘটনা.. জ্যোতিরিন্দ্রের স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা। সংসার জীবনের জটিলতাগুলো তখনও বুঝেন না ছোট্ট মৃণালিনী। সুপুরুষ রবিকে পেয়েই তার সব তৃপ্তি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝতে পারেন.. রবিকে তিনি হয়তো দৈহিকভাবে পেয়েছেন কিন্তু কবির মনটা তিনি কখনোই ছুঁতে পারেননি। চেষ্টা যে করেননি তা নয়.. কিন্তু যেখানে কবির মানসপটে নতুন বৌঠান, আনা কিংবা লুসির জায়গা সেখানটাতে অতি সাধারণ মৃণালিনী দেবীর স্থান কোথায়। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ আর কবি রবীন্দ্রনাথ-এ দুইয়ে যে তফাত আছে বেশ, বইটায় মোটামুটিভাবে উঠে এসেছে সেই আখ্যান। পুরোটা লেখায় উঠে এসেছে তাদের সাংসারিক জীবন, পাওয়া-না পাওয়া, তার অপূর্ণতা আর হাহাকার আর ঠাকুরবাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরাঘুরি করা ফিসফাস করা কিছু কথাবার্তা বা ঘটনা। প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ, কবি রবীন্দ্রনাথ, স্বামী রবীন্দ্রনাথ কিংবা পিতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ... মোটামুটি সব কিছুই উঠে এসেছে এই বইটিতে। কথায় আছে, কবি-সাহিত্যিকরা নাকি দূর থেকেই ভালো। বেশি কাছে এলে আশাহত হতে হয়। এরকমটাই ঘটেছে রবী আর মৃণালিনীর জীবনে। সন্তান-সন্ততি নিয়ে বাইরে বাইরে বেশ সুখী একটা দম্পতি, কিন্তু সুখ কি আদৌ ধরা দিয়েছিল? কবি হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মান রবি বাবু পেয়েছিলেন (এখনও পাচ্ছেন) কিন্তু দিন শেষে একজন ব্যর্থ স্বামী কিংবা ব্যর্থ পিতা হিসেবেই রয়ে যাবেন মৃণালিনী দেবীর কাছে।
#বিদ্র আগেও বলেছি, এখনও বলছি বইটা হরিশংকর জলদাসের লেখা নেহায়েত একটা ফিকশন বই। বইয়ের সব ঘটনাই যে এক শ'তে এক শ' ভাগ সত্যি তা-ও নয়। আবার কিছু ঘটনা সত্যি। উপরের লেখাটা কেবল জলদাসের লেখা 'আমি মৃণালিনী নই' বইটির উপর ভিত্তি করে লেখা, এর বেশি কিছু নয় 🐸
পুরাটা বইয়ে মোটামুটিভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভিলেন হিসেবেই দেখানো হয়েছে। অবশ্য ইতিহাসও কিন্তু সেরকম সাক্ষ্য-ই দেয়। যেহেতু টাইম মেশিন আবিষ্কার হয়নি, আমাদের দেখার কোন উপায় নাই সেহেতু সত্য-মিথ্যার ব্যাপারটাও আর জানার উপায় নাই। যার যেরকমটা খুশি বিশ্বাস করে নিতে পারেন। :)
অসাধারণ একটা বই পড়ে শেষ করলাম। পড়ার সময় যেন ঠাকুর বাড়ির অন্দরমহলে হারিয়ে গেছি। মৃণালিনী ঠাকুরের সাথে কবিগুরু রবিন্দ্রনাথের দাম্পত্যজীবনের ফিকশনাল উপস্থাপনা মৃণালিনী ঠাকুরের জবানিতে। কতটুকু সত্য আর কতটুকু ফিকশন ছিলো সেটা নির্ণয় করতে হলে ঠাকুর পরিবার সম্পর্কে যতটুকু জ্ঞান থাকা দরকার, সেটা আমার নেই। ফলে সত্য-মিথ্যা বিবেচনার ভাল থেকে নিজেকে মুক্ত করে উপন্যাস হিসেবেই উপভোগ করলাম।
নয় বছর নয় মাস বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বউ হয়ে ঠাকুর পরিবারে আসেন ভবতারিণী দেবী। বালিকা বয়সে বিয়ে-সংসার না বুঝলেও সে সময়ের রীতি অনুসারে বাল্যবিবাহ হয় তার। রবীন্দ্রনাথ তখন বলিষ্ঠ যুবক। শারিরীক ও মানসিক দিক থেকে অনুপযোগী ভবতারিণীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে প্রথমেই তিনি তার নাম পরিবর্তন করে রাখলেন 'মৃণালিনী'। বাবা-মা প্রদত্ত নাম পরিবর্তন করার ব্যাপারটি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি ভবতারিণী দেবী। কিন্তু রবিবাবুর বিরুদ্ধে যাবার মত সাহস তার হয়নি। তাই চাপা ক্ষোভ নিয়েই সংসার জীবন শুরু করেন তিনি।
বিয়ের রাতে গান গেয়ে অভিবাদন জানালেও রবিবাবু কখনোই তার স্ত্রীকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেননি। জৈবিক চাহিদা পূরণ ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ছাড়া তাকে কিছুই ভাবেননি রবিবাবু। তার মনে ছিল অন্য রমণীরা। ভাইয়ের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী ছিলেন তার জীবনের প্রথম প্রেম। নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করলে তিনি নতুন করে প্রেমে মজেন বিলাত ফেরত আনা তড়খড়ের। এরপর বিলাতে যেয়ে বিলাতী মেম লুসি স্কটের সাথেও প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন রবিবাবু। এসব কিছুই ভবতারিণীর অজানা থাকেনি। বিলাত থেকে ফিরেও তিনি পরনারী আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারেননি। এবার প্রেক্ষাপটে আসে তাঁর ভাইঝি ইন্দিরা। নিজের স্ত্রীর সাথে প্রয়োজনের বাইরে চিঠি চালাচালি না করলেও ভাইঝির কাছে রসপূর্ণ চিঠি লেখায় রবিবাবুর অরুচি ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই একজন স্ত্রীর পক্ষে এগুলো মেনে নেয়া কষ্টকর। কারণ, "নারীরা স্বামীকে যমের হাতে তুলে দিতে রাজি, কিন্তু অন্য নারীর হাতে নয়।"
এরকম স্পর্শকাতর কিছু তথ্য, ঠাকুর পরিবারের গোপন ঘটনা, সংসার জীবনের অপ্রাপ্তি, যৌতুকপ্রথা, স্বামী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল্যায়ন প্রভৃতি বিষয় নিয়ে এ সময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস 'আমি মৃণালিনী নই' উপন্যাসটি লিখেছেন। এই বইয়ের কাহিনী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী ভবতারিণী দেবীকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। হরিশংকর জলদাসের লেখার বিশেষত্ব হচ্ছে, তিনি খুব সাবলীল ভঙ্গিতে কাহিনী বর্ণনা করেন। এজন্য তাঁর লেখা বইগুলো সুখপাঠ্য হয়। এই উপন্যাসটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। উপন্যাসটি পড়তে যেয়ে মনে হবে যেন স্বয়ং ভবতারিণী দেবী সামনে বসে গল্প শুনাচ্ছেন।
এতসব কিছুর পরেও উপন্যাসটির কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে। প্রথম দুর্বলতা, লেখক কোন রেফারেন্স ব্যবহার করেননি। ফলে উপন্যাসটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অমূলক নয়। হয়তো বলা যেতে পারে, এটি জীবনী নয়, শুধু উপন্যাস- বাস্তবতা এবং কল্পনার মিশ্রণ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত এ��জন ব্যক্তির পারিবারিক জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে এই যুক্তিকে খোঁড়া বলেই মনে করছি।
বইটির পড়তে যেয়ে যত পাতা গড়িয়েছে, ততই বিরক্তি এসেছে আরেকটি কারণে। একপাক্ষিকভাবে ভবতারিণী দেবী রবিবাবুর সম্পর্কে কটুকথা বলে গেছেন। মাঝে মাঝে ভালো কিছু কথাও বলেছেন, কিন্তু তা নগণ্য। রবিবাবুর বিভিন্ন কথা কিংবা লেখা থেকে তিনি ভিন্নার্থ উদ্ধার করায় ব্যস্ত ছিলেন পুরো উপন্যাস জুড়ে। এ যেন অনেকটা "যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা"। সন্দেহ আর অবিশ্বাস ভবতারিণী দেবীর মনে বাসা বেঁধেছিলো, যার জন্য হয়তো রবিবাবুও দায়ী। উপন্যাসের শেষের চার পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ ও ভবতারিণী দেবীর বড় ছেল রথীন্দ্রনাথের কিছু কথা থেকে এটুকু বুঝা যায়, "যা রটে, তার কিছুটা হলেও ঘটে"। রেফারেন্স থাকলে হয়তো এ বিষয়গুলো যাচাই করা যেতো। যতটুকু আশা নিয়ে উপন্যাসটি পড়া শুরু করেছিলাম, যত পৃষ্ঠা গড়িয়েছে ততই কেন যেন আশাহত হয়েছি। এ বোধটুকু একান্তই ব্যক্তিগত। শুধু উপন্যাস ভেবে পড়লে হয়তো এরকম ধারণা নাও হতে পারতো!
২০২০ এর ৩০তম বই শেষ করলাম। এই বইটা পড়ে রবীন্দ্রনাথের অনেক কাহিনী জানা গেছে। উনি যে আখলাকের মানুষ ছিল সেটা আর না বলি। খারাপ লেগেছে উনার বৌ এর জন্য। উনি কিছু পাইনি এই মানুষ কে বিয়ে করে। ভালো লেগেছে বইটা।
বুঝতে শেখার পর যদি বাবা মায়ের দেওয়া নামটা পাল্টে প্রিয় মানুষের দেওয়া নাম নিজের করে নিতে হয় তবে হয়তো খুব বেশী অস্বস্তি হয় না। সে নামটা যদি হয় প্রিয় মানুষের কোন এক সময়ের প্রিয় বা একান্ত কোন মানুষের তবে তা যথেষ্ট অস্থির ব্যপার। সব সময় মনে হবে অন্যকে নিজে বয়ে নিয়ে বেড়ানো।
নয় বছর নয় মাস বয়সে বিয়ে হয়ে ঠাকুর বাড়ীতে আসেন মৃনালিনী দেবী। আর সে দিন রাতেই ভবতারিণী নাম পাল্টে মৃনালিনী নাম রাখেন রবিবাবু। হাজারো নাম থাকার পরেও রবিবাবু কেন মৃনালিনী নামটা রাখলেন সেদিন তিনি বোঝেন নি বা বুঝতে চেষ্টাও করেন নি। কিন্তু অনেক বছর পর তিনি এ সত্যটা জানতে পেরে ভেতরে ভেতরে মুষড়ে পড়েন।
মৃনালিনী দেবী ছিলেন যশোরের মেয়ে। তিনি কোন ভাবেই ঠাকুর বাড়ীর মেয়েদের সাথে মেলেন না , তাই রবিবাবুর মেজো বৌদি জ্ঞানদা দেবী তাঁকে ঠাকুরবাড়ির উপযুক্ত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেন। তবে ঠাকুর বাড়ীর অন্যান্য বৌরাও বিয়ের পরেই ঠাকুরবাড়ির লোকদের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া শিখে নিজেদের ঠাকুরবাড়ির উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন।
মৃনালিনী দেবী লেখা পড়া শিখে আর বয়সের সাথে সাথে বিবেচনা বোধের ফলেই বুঝতে পারেন ঠাকুরবাড়ির ভিতরের ঘটনা। তিনি জানতে পারেন মেজো বৌদি জ্ঞানদা দেবীর সাথে সেজো দাদা হেমেন্দ্রনাথের সম্পর্কটা ঠিক কি! আবার সেজো বৌদি কাদম্বীনি দেবীর সাথে রবিবাবুর সম্পর্কটা ঠিক কি!
এছাড়াও অনেক তুচ্ছ ঘটনা যা তিনি উপলব্ধি করতে পারলেও কখনও কাউকে বলতে পারেন নি, এমনকি রবিবাবুকেও না।
"আমি মৃনালিনী নই" হরি শংকর জলদাস এর লেখা একটি উপন্যাস। যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী মৃনালিনী দেবীর আত্মকথনের ভঙ্গিতে লেখা। রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর বিয়ের রাত থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবনের নানা কথা অকপটে তুলে ধরেছেন। সহজ সরলর ভাবে রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবনের কাহিনী আটপৌরে ভাষায় উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। উঠে এসেছে ভবতারিণী থেকে মৃনালিনী হয়ে ওঠা। আছে চাওয়া- পাওয়া পূর্ণতা - অপূর্ণতা এবং তার নারী জীবনের হাহাকারের কথা।
কবিগুরু, ‘বিশ্বকবি’, ‘গুরুদেব’ সহ নানান শ্রদ্ধাবনত সম্ভাষণে অভিষিক্ত বাংলা সাহিত্যের গর্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমাদের অহংকার আর বিশ্ব সাহিত্যের অলংকার এই প্রবাদপুরুষ নিয়ে অপরাপর মনিষীদের উক্তি এরকম – “বাংলা সাহিত্যের চৌকাঠে আড়াআড়ি হয়ে অবস্থান করছেন রবী ঠাকুর, তাকে ডিঙ্গিয়ে যাবার কোন সাধ্য রাখেননি তিনি আর কারও জন্য!” আমরা ও সবাই মানি এ কথা। কিন্তু সারা বিশ্বের চোখে এরূপ তাপসসুলভ ব্যক্তিত্ব কি তাঁর ব্যক্তি এবং সংসারজীবনেও অনুরুপ ছিলেন? তার পরিবার, সংসার স্ত্রী সন্তান সবাইকে নিয়ে তিনি কেমন ছিলেন? তিনি কি সাংসারিক জীবনে, স্ত্রীর সাথে প্রত্যাহিক জীবনেও আলো জ্বালতে পেরেছেন?
ভবতারিণী থেকে মৃণালিনী হয়ে উঠার গল্পই 'আমি মৃণালিণী নই'। কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথের সহধর্মিণী ভবতারিণীর বয়ানে বিয়ের দিন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সময়ের ঘটনার পর ঘটনা প্রায় অনুপুঙ্খ বিবরণ সমেত তুলে ধরেছেন। পুরো উপন্যাসে এসব কথাই ডায়েরি আকারে লেখেন মৃণালিনী তথা ভবতারিণী। হরিশংকর বাবুর প্রসাদগুণসম্পন্ন লেখনীর গুণে সেই ডায়েরি হয়ে উঠেছে এক নারীর দলিত ব্যক্তিসত্তার দুঃখ ভারাক্রান্ত দিনলিপি।
কাহিনী সংক্ষেপঃ রবীন্দ্রনাথের সংসার জীবন যখন শুরু হয়, তখন তিনি বাইশ বছরের যুবক। বাইশ বছর বয়সে যশোরের ফুলতলি গ্রামের নয় বছরের মেয়ে ভবতারিণীকে বিয়ে করেন তিনি। সেই ভবতারিণীই আমাদের মৃণালিনী। বিয়ের রাতে রবি ঠাকুর তার স্ত্রী ভবতারিণীর নাম বদলে মৃণালিনী রাখেন। কিন্তু কেন তার স্ত্রীর পৈত্রিক নাম বাদ দিয়ে অন্য নাম রাখলেন, তাও দুনিয়ার এতো নাম থাকতে মৃনালিনীই বা কেন রাখলেন? রবিবাবু তার স্ত্রীকে বলেছেন এভাবে -"মৃণালিনী অর্থ পদ্ম আর রবি মানে সূর্য। ভোরবেলার সূর্যের আলো পদ্মের উপর পড়লে পদ্ম পূর্ণভাবে বিকশিত হয়। রবি ছাড়া মৃণালিনী যেমন অপ্রস্ফুটিত থাকে তেমনি মৃণালিনী বিহীন রবিও অপূর্ণ।'" কিন্তু এ নাম রাখার পিছনে আরও একটা কারন আছে যা আপনারা জানতে পারবেন বইটা পড়ার মাধ্যমে।
মাত্র নয় বছরে মৃণালিনী জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির বউ হয়ে আসেন। সেই ছোট্ট বালিকাটিকে ভবতারিণী থেকে রবি ঠাকুরের মৃণালিনী করার দায়িত্ব নেন রবীন্দ্রনাথের মেজো বৌদি জ্ঞানদা দেবী। গেঁয়ো খোলস ছাড়িয়ে ভবতারিনীর ভেতর থেকে মৃনালিনীকে নির্মান করতে না পারা পর্যন্ত জ্ঞানদা বউদির মনে শান্তি নেই। পড়াশোনা শিখানো থেকে শুরু করে শাড়ি পড়া শিখানো- সবকিছু ঘষে মেজে তৈরি করে দেন জ্ঞানদা বৌদি। একটা সময় এই মৃণালিনীই হয়ে যান বাড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
দীর্ঘ এই সংসার জীবনে পাওয়া না পাওয়া, পূর্ণ অপূর্ণ সমস্ত কথা লিখে রেখে গেছেন মৃণালিনী। শুধু তার নিজের কথাই না জ্ঞানদা বৌদিসহ অনেকের কথাই লিখে গেছেন। এমনকি কাদম্বরী দেবীর কথাও বাদ দেননি তিনি। কাদম্বরী দেবী কে নিয়ে লিখেছেন- "কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে জ্যোতিদার বিয়েকে মেনে নিতে পারে নি জ্ঞানদা বউদি। প্রকাশ্যে জ্ঞানদা বউদি আর পরোক্ষ্যে সত্যেনদা নতুন বউঠানের বিরোধিতা করে গেছে। আর একটা সময় এসে চরম অবহেলা করেছে জ্যোতিদা। মৃনালিনী দেবী রবিবাবুর সাথে যে নতুন বউঠানের সম্পর্ক ছিল সে কথা বলেছেন অকপটে যেমন- "কাঠের পাটাতনে মুখোমুখি বসেছে তিনজন। রবিবাবু, নতুন বউঠান, আর জ্যোতিদা। জ্যোতিদা জোসনায় বিভোর, বউ��ান জলে আর রবিবাবু বইঠানে"। বউঠানের মৃত্যুর বহু বছর ধরে ঘুমন্ত রবিবাবু বউঠান বউঠান বলে ডেকে উঠতো। মৃনালিনী দেবী নিজে বলেছেন- " রবিবাবু আর নতুন বউঠানের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গভীর, ব্যাপক এবং সংস্কারমুক্ত"।
মৃনালিনী দেবী রবিবাবুর উপর আক্ষেপ করে বলেছেন- "তিন কন্যা আর দুই পুত্রের জন্ম দিয়েছি আমি। বাইরের মানুষ জানে রবিবাবু আর মৃনালিনীর দাম্পত্য জীবন অনেক সুখের। কিন্তু প্রকৃত সত্য এটা নয়? রবিবাবু আমাকে কখনো কাদম্বরী দেবীর মত ভালবাসেনি, আনার মত পছন্দ করে নি, আর ইন্দিরার মত মর্যাদা দেয় নি। এরপরও আমি আজীবন রবিবাবুর মৃনালিনী হতে চেষ্টা চালিয়ে গেছি। রবিবাবু ভালবেসেছে আনা তড়খড়কে, ভালবেসেছে তার নতুন বউঠানকে, আমাকে ভালবাসেন নি। এতো সবের পরে প্রশ্ন রবিবাবুর হৃদয়ে মৃনালিনীর স্থান কোথায়? আমি সারাজীবন তার সয্যাসঙ্গিনী, প্রয়োজনসঙ্গিনী হয়ে থাকলো হৃদয় সঙ্গিনী হতে পারলাম না"।
এই লেখায় যেমন তুলে ধরেছেন তিনি ঠাকুর বাড়ির আধুনিকতা তেমনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন দিকটি তুলে ধরতেও দ্বিধা করেননি। দ্বিধা করেন নি রবিবাবুর মনে সব সময় কি চলে তা ব্যক্ত করতে। যেমন তিনি বলেছেন- রবিবাবুর সব কিছু আছে, কিন্তু কি যেন নেই? তার পিতা, কন্যা, স্ত্রী, পুত্র প্রাচুর্য্য আছে, খ্যাতিও আছে। তারপরও নাই এর অপৃপ্তিতে মূহ্যমান রবিবাবু"।
পাঠ পর্যালোচনাঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার পরিবার নিয়ে বিস্তারিত জানতে হলে বিস্তর পড়াশোনা করার প্রয়োজন হয়। সামান্য এই ক্ষুদ্র বই পড়ে আমি তার সম্পর্কে মন্তব্য করার মত কতটুকুই বা জানতে পারলাম জানি না, তবে যতটুকু জেনেছি তাতে আমার মনে হয়েছে রবিবাবুকে নিয়ে তার স্ত্রী মৃনালিনী দেবী যে সব কথাগুলো বলেছেন তা অতি রঞ্জিত। অবশ্য মৃনালিনী দেবীর বয়ানে এ বইটা লিখিত, সেখানে সত্য কথা বেশী থাকার কথা কিন্তু তারপর ও মনে হয়েছে - লেখক হরিশঙ্কর জলদাস ও কিছু কিছু কথা যোগ করে বইটার মাধুর্য্য বাড়াতে চেয়েছেন। যদিও হরিশংকর জলদাসের চুম্বক লেখনীতে আর মৃণালিনীর জবানীতে এ উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে জোর ঝাঁকুনি দেয়ার মত, কিন্তু তারপরও কিছু কথা থেকেই যায়।
বইটার আর একটা দিক আমার নজর কেড়েছে, তা হলো সে সময়ের বাল্যবিবাহ। একটা মেয়ে ঋতুমতি হবার আগেই স্বামীর গৃহে প্রবেশ করতো। তারপর জীবনের বাকী সময় সে অতিবাহিত করতো সন্তান জন্মদানে আর লালনপালনে। মৃনালিনীদেবীর জীবনেও এ রকম ঘটনা ঘটেছে। জীবনের অর্ধেক সময় তার কেটেছে আতুরঘরে আর ছেলেমেয়ে মানুষ করতে। আর একটা বিষয় লক্ষনীয় তা হলো- ঠাকুর পরিবারে মেয়েদের অবরোধবাসিনী করে রাখা। বিয়ের পর তাদের অন্দরে থাকতে হয়েছে সারাজীবন। এতো কিছুর পরও সে পরিবারের ছেলেমেয়েরা যেমন হয়েছে চরিত্রবান, তেমনি হয়েছে চরিত্রহীন।
মোট কথা সকাম এবং নিষ্কাম রবীন্দ্রনাথ, অর্থহিসেবী রবীন্দ্রনাথ, কন্যাদায়গ্রস্ত রবীন্দ্রনাথ, গৃহী রবীন্দ্রনাথ- এরকম ভিন্ন ভিন্ন অনেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথকে আমাদের মত সাধারন মানুষ পাওয়া যায় এ কাহিনির প্রতিটি বুননে ।
বইটা পড়তে গিয়ে কাদম্বরী বউঠানের প্রতি রবিবাবুর ভালবাসার কথা জানতে পারি এবং তার আত্মহত্যার কথা। এজন্য এ বইয়ের পর পড়ার লিস্টে রাখছি - "কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট" এবং "ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল"।
এত সুন্দর! এত্ত সুন্দর!! বড় মানুষদের জীবনে আমার প্রায়ই উঁকি দিতে ইচ্ছে হয়।বড়র খোলসে ঢাকা সাধারণ মানুষটাকে বোধহয় সবসময় না দেখাই ভালো।বড় মানুষের ছায়ায় যে মানুষগুলো ঢাকা পড়ে যায়,তাদের গল্প আর দেখার সুযোগ হয় কই? মৃণালিনীও এক ছায়ায় পড়ে যাওয়া মানুষ।বটবৃক্ষের ছায়ায় গুল্মের মত জীবন কাটিয়ে যাওয়া তার কথাগুলো উঠে আসা প্রয়োজন ছিল।প্রথম আলো পড়বার সময়ই বারবার মনে হচ্ছিল মৃণালিনীর কথা, তার আবেগটুকু খুজছিলাম।সহজ এবং অনর্গল ভাষায় মৃণালিনীর কথা জলদাস তুলে ধরেছেন,পড়তে পড়তে বিরতি নেবার কথা মাথাতেও আসেনি।রেটিং এ ৫ই সর্বোচ্চ,নইলে এ বই তো আর রেটিং দিয়ে মাপা যায়না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃণালিনী দেবীর কাছে রবি বাবু।আর আমার কাছে আমার ভালোবাসার রবিঠাকুর। ব্যক্তিগত জীবনে আমার পরীক্ষার খাতায় রবি,প্রেমের চিঠিতে রবি,নাচে জন্ম থেকে বিরহের অন্তরালে আমার প্রাণের রবিঠাকুরকে আমি ধারণ করি। কিন্তু স্বামী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ আমার চক্ষুশূল। অন্য পুরুষদের মতো রবীন্দ্রনাথও স্ত্রীকে অবজ্ঞা করেছে।তার কবি মন যাকেই ভালোবেসেছে তার নাম পরিবর্তন করেছেন সেটা ভালোবেসে করেছেন হয়তো তিনি,কিন্তু এর অধিকার কি তার আছে?এই বই পড়ে বহুনারীতে আসক্ত কবিকে আমি ঘৃণা করেছি। রবিঠাকুরকে আমরা সবাই চিনি।এখন না-হয় এই বই পড়ে মৃণালিনী দেবীকে চিনি...
সকালে ক্যান্টিনে নাস্তা করার সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য মোবাইলে থাকা শত শত পিডিএফ থেকে র্যান্ডমলি একটা খুলে যে বসলাম,শেষ না করে সেই পিডিএফ আর বন্ধ করা হয়ে উঠেনি।মাত্র ৩ ঘন্টার মধ্যে ১৭০ পেজের বই পড়া শেষ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর দৃষ্টিকোণ থেকে তার এবং ঠাকুরবাড়ির জীবনচরিত বর্ণনা করা হয়েছে বইটিতে।ভবতারিণী আমাদেরই বাংলাদেশের যশোরের ফুলতলী গ্রামের এক সাধারণ মেয়ে,নেই শিক্ষা,নেই অর্থ,নেই রূপ।কিন্তু এই অতিসাধারণ মেয়ের বিয়ে হলো তার পিতার মনিব জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত দেবেন ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র রবির সাথে।ফুলশয্যার রাতে রবি তাকে নাম দিলো "মৃণালিনী", ৯ বছরের শিশু ভবতারিণী বুঝে উঠতে পারলোনা কেন তার আজন্ম পরিচয় এই বাড়ির আঙিনায় পা দেয়ার সাথে সাথে ঘুচিয়ে দেয়া হচ্ছে,কিন্তু বয়সে ১৩ বছরের বড় স্বামীর ইচ্ছার প্রতিবাদ করার মতো সাহসটুকুও নেই ছোট্ট ভবর।শাশুড়ি সারদা দেবী তখন পরলোকগত হয়েছেন,নতুন বউকে সব শেখানো-পড়ানোর দায়িত্ব বড়-জা জ্ঞানদা দেবীর (সত্যেন ঠাকুরে স্ত্রী),যিনি একের পর এক ঠাকুরবাড়ির সংস্কার ভেঙেছেন,ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বউদের সূর্যের আলোতে বের করে এনেছেন।কিন্তু ছোট্ট ভব বুঝে পায়না জ্ঞানদার কী এমন শত্রুতা মেঝ-জা কাদম্বরী দেবীর (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী) সাথে যে তার ছায়াও সহ্য করতে পারেন না তিনি,আর তার স্বামীর সাথে কাদম্বরী দেবীর কী এমন সম্পর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে ঠাকুরবাড়ির মানুষ।সেই রহস্য উদঘাটন করার আগেই কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করে সবাইকে যেন বাঁচিয়ে দিয়ে গেলেন,দেবেন ঠাকুর মোটা টাকা খাইয়ে সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ করলেন।আস্তে আস্তে মৃণালিনী বড় হতে লাগলো,সংসারটাই ত���র পৃথিবী হয়ে উঠলো,২১ বছর বয়সেই সে ৫ সন্তানের জননী।কিন্তু বিখ্যাত স্বামীর মন পেলেন না।" আমি সারাজীবন তার শয্যাসঙ্গিনী আর প্রয়োজনসঙ্গিনী হয়েই থাকলাম,হৃদয়সঙ্গিনী হতে পারলাম না।" স্বামীর হৃদয়সঙ্গিনীর স্থান যে আগেই দখল করে রেখেছে তার বৌদি এবং পরে তার ভ্রাতুষ্পুত্রী! স্বামী দ্বারা মানসিকভাবে উপেক্ষিত মৃণালিনী পূর্ণ মনোযোগ ঢেলে দিলেন সন্তান-সংসার এবং শান্তিনিকেতনে,নিজের গয়না ভেঙে গড়ে তুলতে সাহায্য করলেন শান্তিনিকেতন,এখানকার প্রত্যেকটি ছাত্রের মা তিনি।বইটি পড়ে আরো জানা যাবে চোখধাঁধানো আলোকিত ঠাকুরবাড়ির প্রদীপের নিজের সংস্কারের অন্ধকারটুকু। কতটুক সত্য আর কতটুক মিথ্যা সেটা জনবিশেষে বিচার এক না হওয়াটাই স্বাভাবিক,তবে এতটুক বলা যায় বইটি অবশ্যই সুখপাঠ্য,এবং পড়তে গিয়ে মনেই থাকেনা যে এটি মৃণালিনী দেবীর নিজহস্তে লিখিত দিনলিপি নয়,লেখক বইটি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে একশোভাগ সক্ষম হয়েছেন।
মৃণালিনীর চোখে ঠাকুরবাড়ি দেখতে গিয়ে লেখক ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের,বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন।ব্যাপারটা যৌক্তিক কি অযৌক্তিক সেটা গবেষকরা বলতে পারবেন,তবে কবিগুরুর অনুরাগী পাঠকদের জন্য বিষয়টা একটু দুষ্পাচ্য হয়ে দাঁড়ায়। হরিশংকর জলদাসের লেখনী নিয়ে বলার কিছু নেই,সবসময়কার মতই সাবলীল।
মাঝে মাঝে হুটহাট নিয়মিত যাদের লেখা পড়া হয় তার বাইরে কিছু লেখকের বই পড়ে ফেলি।বিষয়টা যে ইচ্ছাকৃত এমনও না,হয়ে যায় আরকি।মনে হতে পারে আমি নতুন লেখক কিংবা ভিন্ন ধাচের লেখা যারা লেখেন তাদের বই পড়তে আগ্রহী নই তবে মোটেও এমনটা নয়। সহজভাবে বলা যায় কম্ফোর্ট জোন থেকে বের হতে ভীষণ অনীহা,আরো একটা ব্যাপার হচ্ছে নতুন লেখকরা প্রায়সময়ই আশাহত করেন বা আমি তাদের লেখা পড়ে সেই তৃপ্তিটা পাই না যেটা ওই বইপড়ার সময়টুকুর বিপরীতে চাইছিলাম। আলোচনায় থাকা লেখকদের বইই বেশি পড়া হয়,তার মূল কারণ এখন যেহেতু বই পড়া অনেকটা কমে গেছে তাই সময়টুকু বই পড়ে আফসোস করে কাটুক এটা চাই না। একটা সময় নতুন,পুরাতন, আলোচিত এবং কখনো নাম শুনিনি এমন বইও গোগ্রাসে গিলেছি।তবে এখন পরিবর্তনের পরও যেটা হয়েছে বই এর আলোচনা-সমালোচনাগুলো খুব মন দিয়ে দেখি। আলোচনায় থাকা বইগুলোর প্রতি বিশেষ আগ্রহ থাকেই। সেভাবেই বেশ কয়েকদিন একটা বই এর নাম শুনছিলাম খুব।তবে লেখকের নাম তার আগে শুনিনি কখনো। এটা আমার অজ্ঞতা,লেখক আনফেমাস ব্যাপারটা মোটেও এমন না। বইটির নাম- "আমি মৃণালিনী নই" অনেকের মতন আমিও নামটা পড়েই বই এর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে গিয়েছিলাম।তবে বই কেনার ব্যাপারে আমি খুবই সাবধানী।টাকাগুলো আসলেই উশুল হবে কিনা এটা অন্তত বারকয়েক ভেবেটেবে কিনতে যাই। পরপর বইটির বেশ কয়েকটা রিভিউ দেখে আর ধৈর্য্য রাখতে পারছিলাম না আর যেই মূহুর্তে আমার এই অবস্থা তখন আমার হাতে ১০০টাকাও ছিলো না সুতরাং নতুন বই কেনা সম্ভব না। বইটার পিডিএফ এভেইলেবল দেখে ডাউনলোড দিয়েছিলাম।আমার বইপড়ার ব্যাপারে মাঝেমধ্যে কিছু লেখালেখি করা হয়,সেই সূত্রে এবং আমার কিছু বন্ধুদের জানা আছে পিডিএফ বিষয়টা আমার খুব একটা পছন্দের না।তবে অপছন্দ না মোটেও। পছন্দ নয় বলেই আমি কখনো পিডিএফ এ বই পড়িনি।লিস্টি করে রাখা বইখানা নীলক্ষেতের অলিতে গলিতে খুঁজে খুঁজে বেড়িয়েছি,কখনো কখনো সময় সূযোগের অভাবে একেক বই ২/৩ বছর অপেক্ষার পর কিনতে পেরেছি তবুও পিডিএফ পড়া হয়নি। এই বইএর রিভিউ,ফ্ল্যাপ এবং লেখকের লেখার ধরন সেই বাধ ভেঙে দিলো এবার। ডাউনলোডের পর গড়গড় করে পড়ে গেলাম প্রায় দু'শ পৃষ্ঠার কিছু বেশি বইখানা।দেড়দিনে শেষ করে মনে হলো অনেকদিন পর ঠিক এতোটা সময় শুধুমাত্র কোনো বই এর জন্য বাকি সব কাজ ফেলে রেখেছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক ভালো ভালো লেখা আমার পড়া হয়না কেননা গল্পের ভাষা মনমতো হয়না বলে।ব্যক্তিগত খুতখুতানি যাকে বলে। অনেক অনেক বই আমি বেস্টসেলার জেনে কিনে শেষ পর্যন্ত পড়া শেষ করিনি লেখকের গল্প বলার ভাষায় আরাম পাইনি বলে।এই বইটি যেনো একদম আমি যেমন লেখা খুজছিলাম তেমন করে লেখা। অসম্ভব সুন্দর লেখকের গল্প বর্ণনা।প্রতিটি মূহুর্তে পাঠককে বই এর সাথে আটকে রাখার বিশেষ ক্ষমতা আছে লেখকের। পড়া শেষ না করে থামতে পারিনি তাই। এবার আসা যাক উপন্যাসের ব্যাপারে। এক কথায় বলা যায় হতাশ হবেন না যদি না এই ঘরানার বই পছন্দ করে থাকেন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী মৃণালিনীর বয়ানে পুরোটা বই লেখা। হরিশংকর জলদাসের বর্ণনায় বারবার মনে হয়েছে ঠাকুর পরিবারে পুরোটা সময় তিনি প্রেতাত্মার মতো আশেপাশেই ছিলেন এবং আপনাকে টেনে ঠাকুরবাড়ির ভেতর নিয়ে যাবেন তিনি,স্বয়ং মৃণালিনী দেবীও হয়তো এভাবে বলতেন পারতেন না। যদিও বইটি পড়লেও অনেক ঘটনার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যাবে তবে বইটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি বিতৃষ্ণা ধারণ না করাই ভালো। তবে বলা যায় জীবনসঙ্গী বিখ্যাত কেউ হলে সাধারণ একজন মেয়ের জীবনটা এমন হওয়াটাই নিষ্ঠুর বাস্তবতা। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি যে এতো গুনী একজন লেখক হরিশংকর জলদাস এতোদিন ধরে লেখালেখি করে যাচ্ছেন অথচ এতোদিন তার নামটুকু পর্যন্ত জানতাম না! *পিডিএফ এর প্রতি রাগ এখনো আছে কেননা এতো সুন্দর বইটার হার্ডকপি আমার কেনা হবে না।*
মাত্র নয় বছর বয়সে সহধর্মিণী হয়ে আগমনকারী বালিকা বধূর ভবতারিণী নাম বদলিয়ে 'মৃণালিনী' নাম রাখলেন কবি রবীন্দ্রনাথ। নিজের নাম কার কাছেই না প্রিয়? তাই সেদিন বালিকা বধূটির মননে বারবার উঠছিলো একটি প্রশ্ন, আর তা, কেন এ নাম। পরবর্তীতে ভবতারিণী বা ভব জীবনে চলার পথে আবিস্কার করেছিলেন সেই গূঢ় রহস্য। আমরা চোখের সামনে যা দেখি তা কি সবসময় সত্যি হয়, নাকি কখনো কখনো একটা মিথ্যা আচ্ছাদনে আবৃত হয়ে লোক দেখানো হয়ে যায়- জীবনকে বারবার এ প্রশ্নের সম্মুখীন করেছিলেন ভবতারিণী। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে কখনোবা আপনার মনে হতে পারে কেউ আপনার পাশে বসে তাঁঁর জীবনের অব্যাক্ত অপূর্ণতার গল্প বলছেন আপনাকে, যিনি 'মৃণালিনী' নন- 'ভবতারিণী'।
হরিশংকর জলদাসের মাইলফলক এই উপন্যাস 'আমি মৃণালিনী নই' এর একটি বিশেষ নৈপুণ্য হলো এটি রবীন্দ্রনাথের সহধর্মিণীর আত্মাকথনের ধারায় রচিত হলেও এর সাথে সাথে যেকোনো ঘটনাকে প্রত্যেকের প্রেক্ষিতে তথা দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। হতে পারে, বইটি হৃদয় দিয়ে পড়ার পরমুহূর্তে নতুন রুপে পাওয়া রবিঠাকুরের সংগীত আপনার কাছে সাময়িকভাবে ভালো না-ও লাগতে পারে। তবে, পাঠকের কাছে অনুরোধ, দুটিকে মিলাতে যাবেন না। সবশেষে বলা য��য়, এরকম একটি উপন্যাসের জন্য যেকোনো সত্যিকার পাঠক হৃদয় বছরের পর বছর প্রতীক্ষা করতে পারবেন।
রবীন্দ্রনাথ, তাঁর স্ত্রী ভবতারিণী (মৃণালিনী) ও তাঁর বউঠান কাদম্বরী এর সম্পর্ক নিয়ে বইটি লেখা। গল্পের সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথ এর সকল বিবাহ বহির্ভূত সকল সম্পর্ক নিয়ে লেখক বেশ রসিয়ে রসিয়ে লিখেছেন। বইটির মূল চরিত্র মৃণালিনী দেবী কতটা অসুখী, অবহেলিত ও উপেক্ষিত ছিলেন পারিবারিক জীবনে সেটাই বইটির মূল বিষয় ছিল, সাথে হয়ত পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য সত্য আর কল্পনা মিলিয়ে লেখক বইটির মূল প্রতিপাদ্য থেকে অনেকখানি সরে গেছেন; ফলাফলস্বরূপ বইটির গ্রহনযোগ্যতা কমে গেছে। প্রতিটি চয়নে রবীন্দ্রনাথ কে ছোট করার সকল চেষ্টাই করা হয়েছে। যেহেতু বেশিরভাগ অংশই স্বরচিত এবং কল্পিত ছিল লেখকের এবং ব্যক্তিগতভাবে গসিপ পছন্দ না করার জন্য, আমার মাঝপথে বিরক্তি ধরে গিয়েছিল!
কিন্তু বইটির শেষে ভবতারিণীর এর জন্য প্রচন্ড দুঃখবোধ হতে বাধ্য। লেখক যদি এত না রসিয়ে নিজের মূল বার্তায় অটল থাকতেন বইটি সহজেই ৫ তারকা পেত।
জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে কেবল একটা বই পড়েছি।বইটি একাধারে বেশ মজার, আবার এর অপজিটে বলতে গেলে দুঃখে ভারাক্রান্ত হবার মতোই।
হরিশংকর বাবুর বই আমি এর আগে কখনো পড়িনি।"আমি মৃণালিনী নই"দিয়েই শুরু হলো। উপন্যাসটির পরতে পরতেই একজন দুঃখিনী স্ত্রীর গল্পে ঠাসা। সেই দুঃখিনী স্ত্রী অন্য কেউ নন,স্বয়ং আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী ভবতারিণী রায় চৌধুরী (পিতৃপ্রদত্ত নাম) কিংবা মৃণালিনী ঠাকুর।
উপরে মজার বলেছি এই কারণে যে,হরিশংকর বাবু কিংবা মৃণালিনীর মাধ্যমে আমি কলকাতার জোঁড়াসাকোর ঠাকুর পরিবারকে পড়ে ফেলেছি কিংবা দেখেছি।হ্যাঁ আমি মৃণালিনী কিংবা হরিশংকর বাবুর কল্যাণে জোড়াঁসাকোর ঠাকুর পরিবারের লোকেদের জেনেছি, চিনেছি। এটাই-বা কম কিসে!
তবে হরিশংকর বাবু এই বইয়ের কোনো রেফারেন্স দেন নি।ভেবেছিলাম হরিশংকর বাবু উপন্যাসের শেষ পেইজে দিয়ে দিবেন হয়তো কিন্তু..!
রবীন্দ্রনাথ ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের গল্প বলছেন ভবতারিণী দেবী, যার নাম দেয়া হয়েছিল মৃণালিনী। এটা তো আর ননফিকশন বই না, তাই এতো সত্যাসত্য বিবেচনা করা উচিৎ না। কিন্তু লেখকের লেখনী বরাবরের মতোই জলবৎ তরলং। কিছু লেখা থাকে দ্রুত পড়ে শেষ করা যায়, কিছু লেখা থাকে ধীরে না পড়লে কিছু বুঝব না। আর উনার লেখা দ্রুত পড়ে শেষ করা যায় ঠিকই, কিন্তু আমার মনে সায় দিলো না বিধায় ধীরে ই পড়লাম। মানুষের রিভিউ দেখে অবাক হইছি একটু। মানে আপনারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ই ফিকশন আকারে পড়েন আলসেমি করে আর জ্ঞান কপচান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এর জীবন নিয়ে আসল ইতিহাস লিখলো নাকি না এই নিয়ে এতো বিতং করার কি আছে!
বাস্তবতার সঙ্গে স্থুল কল্পনা মিশিয়ে একটি তিক্ততার জন্ম দেওয়া হয়েছে। সুনীলের প্রথম আলো না পড়া থাকলে এটা পড়ে ঠাকুর পরিবার সম্পর্কে ভুল ধারনাই হতে পারে। এই বইটি এবং কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট দুটিই কাল্পনিক এবং সম্ভবত প্রথম আলো থেকে ইন্সপায়ারড। প্রথম আলোতে নেই, এমন কোন তথ্য এই ২টির কোনটিতেই নেই। নট রিকমেন্ডেড।