Buddhadeva Bose (also spelt Buddhadeb Bosu) (Bengali: বুদ্ধদেব বসু) was a major Bengali writer of the 20th century. Frequently referred to as a poet, he was a versatile writer who wrote novels, short stories, plays and essays in addition to poetry. He was an influential critic and editor of his time. He is recognized as one of the five poets who moved to introduce modernity into Bengali poetry. It has been said that since Tagore, perhaps, there has been no greater talent in Bengali literature. His wife Protiva Bose was also a writer.
Buddhadeva Bose received the Sahitya Akademi Award in 1967 for his verse play Tapaswi O Tarangini, received the Rabindra Puraskar in 1974 for Swagato Biday(poetry) and was honoured with a Padma Bhushan in 1970.
সমালোচনাও কখনো সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে যদি সমালোচক হন বুদ্ধদেব বসুর মত যুক্তিনিষ্ঠ ও বাস্তবতাঘনিষ্ঠ কিন্তু একই সাথে অনুভূতিপ্রবণ কোন লেখক। তার প্রবন্ধ পড়ার সময় আক্রান্ত হই সেই বোধে যেই বোধ পাই জীবনানন্দের কবিতায় কিংবা মানিকের উপন্যাসে; সেই বোধ একটা তীব্র নেশাতুর আবেগের দ্বারা তাড়িত করে পাঠককে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু বুদ্ধদেবের রচনার সংহতি পরিমিতি এবং বস্তুনিষ্ঠতা এতটাই প্রবল যে পা-কে মাটিতেই রাখতে হয়। চিন্তা এবং আবেগের এই যুগপৎ ক্রিয়াশীলতা অন্য কোন সমালোচকের লেখা পড়ার সময় এতটা অনুভব করিনা, করতে পারি না।
আধুনিক কবিদের অনেকে হয়ত জনপ্রিয়তার আড়ালেই থেকে যেতেন, যদিনা বুদ্ধদেব একা সমগ্র আধুনিক কবিতার পৌরহিত্যের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে না নিতেন। বিশেষভাবে জীবনানন্দকে প্রতিষ্ঠার যে নিরলস এবং অধ্যবসায়ী চেষ্টা সারা জীবনধরে বুদ্ধদেব করে গেছেন তা সত্যিই দুর্লভ। তার লেখায় দেখি ঝরা পালক, ধূসর পান্ডুলিপি'র বনলতা সেন বের হয়ে যাওয়ার পরও তৎকালীন পাঠকসমাজে জীবনানন্দের তেমন কোন গ্রহণযোগ্যতা গড়ে উঠেনি। কিন্তু বুদ্ধদেব বারেবারে সবাইকে মনে করিয়ে দেন কী অভূতপূর্ব অনুভূতিপ্রবণতার জন্ম দিয়ে চলেছেন এই নতুন কবি, একের পর এক! বাঙলা কবিতায় সম্পূর্ণ নতুন এক ভাষা এবং আবেগের জন্ম দেওয়া এই জীবনানন্দের প্রশংসা করতে গিয়ে বুদ্ধদেব আবেগী হয়েছেন ঠিক, কিন্তু একই সাথে তিনি রীতিমত হিশেব কষিয়ে দেখিয়েছেন কেন জীবনানন্দ শ্রেষ্ঠ, কেন জীবনানন্দ ছাড়া আধুনিক বাঙলা কবিতার আলোচনা অসম্ভব! এ কারণেই বুদ্ধদেবকে ভালো লাগে এতটা- স্তুতিবাক্য রচনায় কার্পণ্য নেই তার, কিন্তু তাই বলে অন্ধবিশ্বাসে দেবতাজ্ঞানে পুজো করাও তার স্বভাববিরুদ্ধ; তাই তার স্তুতির পেছনে খেলো আবেগ নেই, আছে লক্ষ্যভেদী যুক্তি!
'কবি' বুদ্ধদেব প্রিয় আগে থেকেই, 'কালের পুতুল' পড়তে পড়তে 'সমালোচক' বুদ্ধদেবকেও মস্তিষ্কের ভেতরের প্রিয় একটা জায়গায় রক্ষিত করে রাখলাম।
"সত্যি বলতে, কবিতা ‘বোঝা’টাই যে সমস্ত কথা, এমনকি মস্ত কথা, তা আমি মানতে ইচ্ছুক নই। কোনো কবিতায় হয়তো ছন্দের দোলাটাই শুধু উপভোগ করি; কোনো কবিতা বিশেষ-একটা উপমা কি রূপক-ব্যঞ্জনার জন্যই মূল্যবান মনে হয়। কোনো কবিতার দুটো লাইন হঠাৎ মনের মধ্যে এমনভাবে গাঁথা হয়ে যায় যে পথে চলতে চলতে হঠাৎ নিজেকে তা গুনগুন করতে শুনি। তখনই বুঝতে পারি সে-কবিতায় কিছু সারবস্তু আছে"
একটি বইয়ে যদি অনেক বিখ্যাত কবির আলোচনা, পর্যালোচনা পেয়ে থাকেন তাহলে কেমন হবে?? এই বইটি হলো তেমন একটি বই! এই বইয়ে জীবনানন্দ, সমর সেন, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নজরুল ইসলাম ইত্যাদি কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন বুদ্ধদেব বসু।। প্রতিটি কবির বিশেষ কিছু কবিতার অংশ ছিলো এবং তা নিয়ে উনি আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ উনার সময়ের একগুচ্ছ বিশেষ, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, বিখ্যাত কবিদের নিয়ে উনি আলোচনা করেছেন, যারা কিনা আস্তে-আস্তে বাংলা কবিতার ফরমেটে বিপ্লব নিয়ে আসছিলেন।। সত্যি বলতে অনেক কবিকে চিনেছি এই বই দ্বারা এবং তাদের কবিতা পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠেছি! (যারা কবিতা পড়তে ভালবাসেন, কবিতা চর্চা করেন তাদের একবার এই বইটা পড়ে দেখা উচিত বলে মনে করি)
কোন কবির কোনটি বিশেষ গুণ, কোন কবি কোন শব্দের ব্যবহার বেশি করেন এবং কেন করেন, কোন কবির ছন্দ কেমন বা ধরণ কেমন, কোন কবি কোন কোন বর্ণ বা আকার বেশি ব্যবহার করেছেন,, এমন অসংখ্য বিষয় নিয়ে কবিদের কবিতার সূক্ষ্ম নিয়ে এই "কালের পুতুল"
তবে প্রথম অধ্যায় পড়ে বেশ অবাক হয়েছি! প্রথম অধ্যায়ে উনি লেখকদের অবস্থার কথা বলেছেন। লেখকরা যে পেশাদার না সেটা নিয়ে বলেছেন, বিখ্যাত হওয়ার জন্য লেখেন তা নিয়ে বলেছেন। এই অধ্যায়ের অনেক কথা বর্তমান লেখকদের সাথে মিলে যায় এবং লেখকদের নিয়ে মানুষের যা চিন্তাভাবনা সেসবের সাথে মিলে যাচ্ছিলো..... উনি বলেছেন, "জীবিকার জন্য অন্য কাজ ক'রে, অবসর সময়ে লেখার প্রস্তাব গ্রাহ্য নয় এই কারণে যে লেখা একটা উঁচুদরের ‘hobby’ নয়, তা এক কঠোর কর্ম, যাতে সমস্ত সময়, সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তি নিয়োগ করতে হয়, রাজ্যশাসন বা বাণিজ্যবিস্তারের চাইতে তার প্রকৃতিগত গুরুত্ব একটুও কম নয়। যে-লেখা পড়তে অতি সহজ ও সুন্দর, তা ঝরঝর ক'রে ফাউন্টেনপেনের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে না, তা কত কঠিন শ্রমসাপেক্ষ তা শুধু সৎলেখকরাই জানেন"
তবে কবিতার আলোচনা করতে গিয়ে উনি লেখার দিকে লক্ষ্য রেখেছেন। লেখাতে ছিলো সাহিত্যের ছোঁয়া। পাঠক কখনো পড়তে পড়তে বোর হবেন না। যেমন জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উনি বলেছেন "ছন্দের বাঁকাচোরা গতিতে, সূক্ষ্ম ধ্বনিতে ও বিরতিতে, পুনরুক্তিতে ও প্রতিধ্বনিতে, মনে হয়, যেন এই কবিতাগুলি আঁকাবাঁকা জলের মতোই ঘুরে-ঘুরে একা একা কথা বলছে। এদের আবহতে আছে একটি সুদূরতা ও নির্জনতা; আমাদের পরিচিত পরিবেশ ছাড়িয়ে, এই আকাশ আর পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য কোনো আকাশে, অন্য কোনো জগতে এক সম্পূর্ণ রূপকথা তিনি রচনা করেছেন। জীবন ক্ষয়শীল ও পরিবর্তনশীল, মৃত্যুতে সব-কিছুরই সমাপ্তি, এই আদিম বেদনা জীবনানন্দর কাব্যের ভিত্তি"
আমি কবিতার পাঠক নই। আর কালের পুতুল মূলত কবি ও কবিতার সমালোচনামূলক প্রবন্ধসংকলন। তাই এখানে যাদের রিভিউ করেছেন বুদ্ধদেব বসু তাদের প্রায় সবার কবিতাই আমি পড়িনি, শুধুমাত্র জীবনানন্দ দাশ পড়েছি, আর কিঞ্চিত কাজী নজরুল ইসলাম; বাকি কবিদের আমি পড়িনি। তারপরও বুদ্ধদেবের সুস্পষ্ট, সহজবোধ্য, চিন্তা-উদ্দীপক সমালোচনা পড়তে আকর্ষণীয় লাগে।
শুধুমাত্র জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা একাধিক প্রবন্ধ আছে বলেই কালের পুতুল শুরু করেছিলাম। সে প্রবন্ধগুলি থেকে জীবনানন্দ সম্পর্কে কিছু জেনেছি, তাঁর কবিতার বিষয়েও কিছু জানতে পেরেছি। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটা নজরুলের পাঠক-শ্রোতার জন্য উপাদেয়। নজরুলকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে এই প্রবন্ধটা।
বিশেষভাবে ভালো লেগেছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটা। কমরেড কবি বলেই মনে হয় প্রবন্ধটা এমন আকর্ষণীয় লেগেছে। সামনে তাঁর কবিতা পড়তে হবে।
আধুনিক বাংলা কবিতার আলোচনা-সমালোচনার (এবং স্বল্প আঙ্গিকে অথচ তাৎপর্যপূর্ণ পরিধিতে বাংলাসাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের ধারা, গতিবিধি ইত্যাদির প্রতি দৃষ্টিপাত) এই আকরগ্রন্থ- বাংলাসাহিত্যের যে কী অমূল্য ঐশ্বর্য তা অনুধাবন করা যায় প্রতিটি প্রবন্ধে। কিছু-কিছু বাক্য এতই শক্তিশালী ও অন্তর্ভেদী যে বার-বার পড়ে আত্মস্থ করতে হয়, তবুও যেন তৃপ্তি হয় না।
বুদ্ধদেব বসু'র প্রবন্ধের গদ্যশৈলী, বাক্যবিন্যাস, শব্দচয়ন, বক্তব্যের সুস্পষ্টতা নিয়ে নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। জীবনানন্দ দাশ'কে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ তিনটিতে ব্যবহৃত "শব্দবন্ধ" নিয়ে কিছু না বললে অপরাধবোধ কিছুতেই ঘুচবার নয়। প্রবন্ধগুলো প্রধানত জীবনানন্দ'র কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা (এবং কিঞ্চিৎ সমালোচনা) হওয়া সত্ত্বেও বক্তব্যে শৈথিল্য আসেনি কেবল শব্দবন্ধ ব্যবহারের চমৎকার নৈপুণ্যে। একই রচনায় এত সুচতুর, বলিষ্ঠ-সৌষ্ঠব, সার্থক শব্দবন্ধ ব্যবহারের দৃষ্টান্ত বেশি নেই। বেশি শব্দবন্ধ ব্যবহারে গদ্যের গতিশীলতা কমে যায়, জড়ত্ব আসে। কিন্তু এক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু অনন্য, উজ্জ্বল ব্যতিক্রম— তাঁর গদ্যের গতিময়তা তো কমেইনি, বরং পেয়েছে এক ওজস্বী দৃঢ়তা (গুরুগম্ভীর নয়)। জীবনানন্দ'র কবিতা যখন সীমিত কিছু পাঠকের মাঝে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধদেব বসু তখন কলম ধরলেন। সাধারণ পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিলেন জীবনানন্দ'র গূঢ়, বিস্ময়কর, "চিত্ররূপময়" কবিতার সঙ্গে। জীবনানন্দ'র আজ প্রভূত জনপ্রিয়তা ও চর্চার পেছনে (একইসাথে আধুনিক বাংলা কবিতার দিকনির্দেশনায়) বুদ্ধদেব বসু'র ভূমিকা ও প্রভাব কোনো মাপকাঠিতে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে-র অনন্য কাব্যপ্রতিভার ভূয়সী প্রশংসার সঙ্গে-সঙ্গে তাঁদের অতি দুর্বোধ্যতার সমালোচনা উঠে এসেছে। এখানে একটি উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না— "এঁদের (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে) রচনার কঠিন উজ্জ্বলতা আমার ভালো লাগে— যদিও স্বীকার করব এঁদের কোনও-কোনও কবিতা আমি ভালো বুঝতে পারি না। শক্ত হয়ে চেয়ারে বসে নানা পুঁথিপত্র ও অভিধান ঘাঁটলে তবে হয়তো এই জাতের কবিতা সম্পূর্ণ বোঝা যায়..."
বিষ্ণু দে এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্ত-র কিছু পঙ্ক্তির উল্লেখ না করলে লেখা পূর্ণতা পাবে না।
বিষ্ণু দে: "প'ড়ে থাকে সেই যক্ষপ্রশ্নকণ্টকিত রুক্ষ দেশ।" (জন্মাষ্টমী)
"সে কবে গেয়েছি আমি তোমার কীর্তনে কৃতার্থ দোহার। পদাবলী ধুয়ে গেছে অনেক শ্রাবণে; স্মৃতি আছে তার। রৌদ্রে-জলে সেই-স্মৃতি মরে না, আয়ু যে দুরন্ত লোহার। শুধু লেগে আছে মনে ব্যথার স্নায়ুতে মর্চের বাহার।।" (সে কবে)
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত:
"একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে ভর করে ছিলো সাতটি অমরাবতী" (শ্বাশতী)
বুদ্ধদেব বসু। যিনি ঔপন্যাসিক, কবি এবং অনুবাদক হিসেবে খ্যাত। এসব ছাড়িয়ে কালের পুতুল বইয়ে উনার যে পরিচয়টি বড় হয়ে উঠেছে সেটি হলো বাংলা সাহিত্যের একজন দক্ষ সাহিত্য সমালোচক। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, ''যেগুলো সর্বসাধারণের অভিজ্ঞতা, এগুলো যে হঠাৎ এক জায়গায় এসে বিশেষ হ'য়ে ওঠে, যেন তুলনাহীন, এইটেই শিল্পপ্রক্রিয়ার মূল রহস্য। জীবনের অতি সাধারণ তথ্যের রূপান্তর ঘটে সেখানে; তারা অর্থ পায়, দ্যোতনা পায়, দূরস্পর্শী ইঙ্গিতে আলোকিত হয়ে ওঠে। আমরা যখন সাহিত্য পড়ি তখন আমাদের দৈনন্দিন অস্তিত্বের তথ্যগুলোকেই চিনতে পারি সেখানে কিন্তু ঠিক সেগুলোকেও নয়। সেইসব তথ্য, যা বাস্তব জীবনে অস্পষ্ট, এলোমেলো, যোগসূত্রহীন, কিংবা অভ্যাসে পরিজীর্ণ, সেগুলোকে যেখানে সুসংবদ্ধরূপে দেখতে পাই, স্বচ্ছ এবং সম্পূর্ণ করে উপলব্ধি করি, তাকেই আমরা বলি আর্ট, বলি শিল্পকর্ম। " উনার এই কথাটি আমার খুব প্রিয়। কালের পুতুলের ভূমিকা লিখতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় লেখক জাকির তালুকদার বুদ্ধদেব বসুর এই লেখাটি লিখেছেন। কালের পুতুল বইতে মোট পঁচিশটি প্রবন্ধ কিংবা বলা ভালো সাহিত্য সমালোচনা রয়েছে। যেখানে তাঁর নানান সময়ে লেখা প্রবন্ধগুলোকে একত্রিত করা হয়েছে। তার অসামান্য সাহিত্য জ্ঞান প্রতি পাতায় পাতায় মুগ্ধ করেছে আমাকে। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করেছে। এই সমালোচনায় তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন কবি এবং তাদের কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা স্থান পেয়েছে। উঠে এসেছে জীবনানন্দ দাশ, যিনি সেই সময়ে অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে গিয়েছিলেন। লেখক জীবনানন্দ দাশের ধূসর পান্ডুলিপি এবং বনলতা সেন এই দুইটি গ্রন্থের আলোচনা করেছেন। তারপর তার মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে 'জীবনানন্দ দাশ-এর স্মরণে' নামক প্রবন্ধটি রচনা করেন। 'জীবনানন্দ দাশ : বনলতা সেন' এই সমালোচনায় লেখক জীবনানন্দ দাশকে বাংলা সাহিত্যের নির্জনতম কবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, অন্নদাশঙ্কর রায়, বিষ্ণু দে, প্রমথ চৌধুরী, নিশিকান্ত, নজরুল ইসলাম সহ বিভিন্ন কবিদের এবং লেখকদের লেখার আলোচনায় মুখরিত করেছেন কালের পুতুলের প্রতিটি পাতা। কালের পুতুল নামক প্রবন্ধে এই এই সমালোচক বলেছেন, "রসের ক্ষেত্রে কিছুই প্রমাণ করা যায় না, কিছুই প্রমাণ করবার থাকে নেই। চৈত্রের দুপুরে যে-কবিতা পড়ে মুগ্ধ হলাম, কোনও এক শ্রাবণের বৃষ্টি-ঝরা রাত্রে সে-কবিতা বোবা হয়ে রইলো। অবসরে শান্ত অপরাহ্ণে যে-লেখা মনকে ছুঁতে পারল না, কোনও এক উদ্ব্যস্ত বেলা-দশটায় ট্র্যাম ধরবার জন্য ছুটতে-ছুটতে হঠাৎ তারই দুটি লাইন মনে পড়ে দাঁড়াতে হলো থমকে।" লেখক এ-ও বলেছেন যে, সমালোচনা স্থির নয়। আজকে যা ঠিক দশবছর পর যে সেটাই ঠিক থাকবে এমন কোনো কথা নেই। কিংবা সমালোচনা করতে বসে যে নিন্দা করতে হবে এমনও কথা নেই, কারণ সবসময় নিন্দা করার বিষয় থাকে না। লেখক আরো বলেছেন "অনুরাগই তো সেই আগুন, যাতে মনের শিখায় আলো জ্বলে- আর অনুরাগের মতো পক্ষপাতী আর কী। নিন্দাই যে নিরপেক্ষ তা তো নয়, সেটা বিপক্ষ পক্ষ মাত্র, অথচ আশ্চর্য এই যে বাংলাদেশে নিন্দা করলে সাধুতার জন্য বাহবা পাওয়া যায়।"
বুদ্ধদেব বসুর এই বইটি চমৎকার সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। শেষ পৃষ্ঠায় এসে মনে হচ্ছিলো আরো কিছু পৃষ্ঠা থাকলে ভালো হতো। কালের পুতুল বইতে উনার নতুন একটি গুণের সাথে পরিচিত হলাম। যেটি আগেই বলেছি। তা হলো, সমালোচক হিসেবে একজন দক্ষ এবং বোদ্ধা সমালোচক। তৎকালীন লেখকদের লেখা কিংবা কবিতার যে ব্যাবচ্ছেদ তিনি করে করে দেখিয়েছেন সেটা খুবই চমৎকার এবং উপলব্ধির। বাঙালি একজন লেখকের এত গুণ নিঃসন্দেহে বাঙালির সম্পদ যা তিনি বাংলা সাহিত্যকে দিয়ে গিয়েছেন।
সমালোচনা গ্রন্থ। গত শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের আধুনিক কবিদের কাব্যের সমালোচনা। এসেছে প্রমথ চৌধুরী থেকে শুরু করে সমর সেন, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, অন্নদাশঙ্কর রায়, বিষ্ণু দে, কাজী নজরুল ইসলামসহ ঐ সময়ের আধুনিক কবিদের কথা যাঁরা রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে বের হয়ে নতুন কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন।
‘সমালোচনা এমনই হয়' বলা যায় বইটা শেষ করে। লেখক নিজেই বলেছেন তাঁর নিজের পছন্দের কবিরাই মূলত এখানে স্থান পেয়েছে কিন্তু সমালোচনার ক্ষেত্রে কবি কাউকেই ছাড় দেননি। আবেগের ছড়াছড়ি করে কাউকে তেল দেননি তিনি বরং অনেকক্ষেত্রেই চাঁছাছোলা সমালোচনা করেছেন ; কারও ছন্দ নিয়ে, কারও বিষয়বস্তু নিয়ে, কারও আবেগের বাড়াবাড়ি নিয়ে।
সাথে প্রথম আর শেষের আগের পরিচ্ছেদে কবি ও কবিতার অনেক মৌলিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। কবি কারা, কবিরা কোথায় থেকে অনুপ্রেরণা নেবেন, কি হবে তাঁদের বিষয়বস্তু, নিজের সমালোচনার সমালোচনাও এসেছে এই আলোচনায়। দারুণ একটা বই।
বইয়ের নাম: কালের পুতুল ধরন: প্রবন্ধ লেখক: বুদ্ধদেব বসু প্রকাশনী: নিউ এজ পাবলিশার্স, কলকাতা, ভারত গায়ের মূল্য: ১৫০/- প্রথম প্রকাশ: ১৯৪৬
♣ লেখক বইটি অর্পণ করেছেন শিল্পী যামিনী রায়কে।
মশহুর কবি, প্রথিতযশা প্রবন্ধকার ও তীক্ষ্ণধীশক্তিসম্পন্ন সমালোচক বুদ্ধদেব বসুর ২৩ টি প্রবন্ধের মলাটবদ্ধ রূপ হলো 'কালের পুতুল'। এ প্রবন্ধগ্রন্থটিতে গত শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের সেরা কবিদের কবিতা, কবিত্বশক্তি, জনপ্রিয়তা প্রভৃতি বিষয়কে পাঠকের করকমলে নিবেদন করেছেন তিনি।
বুদ্ধদেবের প্রবন্ধ তাঁর কাব্যের মতো গভীর, দ্যোতনাময়, সাবলীল ও মনোমুগ্ধকর। অসূয়াপন্ন নিন্দার বেদিতে দাঁড়িয়ে কর্ণমূল আরক্ত করে তিনি একপেশে সমালোচনায় মন ভেজাননি, অবগাহন করেননি ঘৃণার সুইমিংপুলে। তাঁর সূক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, ঈর্ষণীয় অধ্যয়ন, ঐন্দ্রজালিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা, অপূর্ব শব্দচয়ন এ প্রবন্ধগুলির হৃদয়।
বইটির প্রারম্ভে 'লেখার ইস্কুল' নামক প্রবন্ধটি চোখে পড়ে যেখানে তিনি জীবনদর্শনকে এত নিখুঁত ও সূচারুভাবে উপস্থাপন করেছেন যা পাঠকমাত্রই অনুধাবন করতে পারে। বুদ্ধদেব তাঁর সমসাময়িক প্রিয় কবি ও লেখকদের সম্পর্কে বাক্য ব্যয় করেছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। তাঁর স্বচ্ছ উপলব্ধি, সূচাগ্র দৃষ্টিভঙ্গি, চুলচেরা বিশ্লেষণ ও অগাধ পাঠের অপূর্ব মেলবন্ধন এ প্রবন্ধটি। বড় লেখকদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ''আমরা সাধারণত বলি যে বড়ো লেখক ভবিষ্যতের জন্য লেখেন। কথাটা এ হিশেবে সত্য যে বড়ো লেখকের দৃষ্টি এতদূরে প্রসারিত হয় যে তাঁর স্বকালের বহুযুগ পরেও তাঁর লেখা মূল্যহীন হ'য়ে পড়ে না; অনেক সময় তাঁর মধ্যে আমরা ভবিষ্যতের অগ্রদূতকে দেখতে পাই, অবশ্য তাঁর মৃত্যুর পর কিছুকাল কাটলে; চিরকালের পটভূমিকায় যখন আমরা তাঁকে দেখি তখনই তাঁর অগ্রগামিতা উপলব্ধি করা সম্ভব, তার আগে নয়।'' লেখকদের জন্য দীর্ঘজীবন নানা কারণেই বাঞ্চনীয় বলে মনে করেন তিনি। শেলী, কিটস কিংবা ডি. এইচ. লরেন্স এর মতো খ্যাতিমান সাহিত্যিকরা দীর্ঘ আয়ু পেলে অগাধ প্রতিপত্তি অর্জন করতে সক্ষম হতেন।
যে যুগের সাহিত্যের সাথে আমাদের মনের মিলন ঘটে সে যুগের সাহিত্যকে আমরা প্রিয় মনে করি। অবশ্য বর্তমানকে জয় করতে লেখকদের প্রাণপণ চেষ্টা বুদ্ধদেবকে ভাবিয়ে তোলে। ইংরেজি সাহিত্যের দুই বোদ্ধা লেখক উইলিয়াম শেক্সপীয়র ও চার্লস ডিকেন্সের নাম উল্লেখ করে বুদ্ধদেব বলেন, "খদ্দের ধরবার ও রাখবার জন্য এমন কিছু নেই যা না করেছেন তাঁরা। ভাঁড়ামি, রক্তারক্তি, হৈ-হুল্লা, যা-কিছু এলিজাবেথীয় দর্শকের প্রিয়, শেক্সপীয়র কোনোটাতেই কার্পণ্য করেননি; ডিকেন্স উপন্যাসের কিস্তি বাজারে ছেড়ে উদ্বিগ্নভাবে কাটতি লক্ষ করতেন, কোনো-একবার বিক্রি কম হ'লেই পরের সংখ্যায় কিছু-একটা কারসাজি করতেন কাটতি বাড়াবার জন্যে; সে-উদ্দেশ্যে গল্পের প্লট বদলাতে কি চরিত্রের চেহারা ফেরাতেও তাঁর আপত্তি ছিলো না। খদ্দের খুশি করবার এই ব্যবসাদারি ইচ্ছে থেকেই লেডি ম্যাকবেথের, ফলস্টাফ-এর, পিকউইক-এর জন্ম। ড্রাইডেন ইংলণ্ডের প্রথম পেশাদার লেখক, যিনি প্রধানত নাট্যকার নন, এবং এলিজাবেথীয় লেখকদের তুলনায় ঢের বেশি আত্মসচেতনও বটে। যে-সব রচনা সে-যুগের তুমুল খবর, সেগুলোই তাঁর রচনার বিষয়, এবং তাড়াহুড়ো ক'রে লেখা শেষ ক'রে ঠিক সময়টি বুঝে তিনি গরম-গরম বাজারে ছেড়েছেন, যাতে সকলেই কেনে ও পড়ে। ড্রাইডেনের যে-সব ব্যঙ্গকবিতা আজও আদরণীয়, সেগুলোকে উঁচুদরের সাংবাদিকতা বললে একটুও ভুল হয় না। বর্তমানই লেখকের উপজীব্য ; ভবিষ্যতে যদি কোনো আলো তিনি ফেলতে পারেন, সে-আলো পড়বে বর্তমান প্রসঙ্গে প্রতিহত হ'য়েই; নিজের কালকে তিনি যদি ভালোরকম বুঝে থাকেন তাহ'লেই তাঁর লেখায় হয়তো ভবিষ্যতের কোনো ইঙ্গিত ধরা পড়বে। শেষ বিচারে মানতেই হবে যে লেখকের ধর্মই সমকালীনতা।" বহু লেখক ভুরিভুরি লিখে খ্যাতিমান হয়েছেন, পয়সা রোজকার করেছেন। এতে অনেকেই সকরুণ অবজ্ঞা দেখিয়ে সূক্ষ্ণ আত্মপ্রসাদ উপভোগ করেন। এ প্রেক্ষিতে বুদ্ধদেব জনসনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, "Only a blockhead will write except for money."
জীবনকে গভীরভাবে দেখতে শেখাই লেখকের প্রধান দায়িত্ব যা কোনো স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখানো হয় না। এ ক্ষেত্রে লেখকের উক্তি প্রণিধানযোগ্য, "সমস্ত জীবনই লেখকের কাঁচা মাল; কিন্তু জীবন বিশৃঙ্খল ও স্বেচ্ছাচারী, সেই উত্তাল আবর্ত থেকে কোন সময়ে কতটুকু নিবেন, এবং কী-ভাবে সেটা ব্যবহার করবেন, তার জন্যে নিজের রুচি ও বিচারবুদ্ধি, তাছাড়া স্বোপার্জিত শিক্ষার উপরেই, তাঁকে নির্ভর করতে হবে। ভাষা ও কলাকৌশলের উপর মোটামুটি দখল না-জন্মালে লেখক হওয়া যাবে না; কিন্তু জীবনকে কে কত ব্যাপক ও গভীরভাবে দেখতে পেরেছেন, এবং তার প্রকাশই বা কতটা সত্য হয়েছে, লেখকদের- আপেক্ষিক মূল্যের এ-ই হয়তো মানদণ্ড।''
প্রবন্ধকার প্রমথ চৌধুরীকে নিয়ে দুটি মূল্যবান প্রবন্ধ লিখেছেন যেখানে প্রমথ চৌধুরীর মেধা-মনন-যোগ্যতা বিচারে তাকে 'লেখকদের লেখক' অভিধায় অভিহিত করেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের উপর কোনো বয়োকনিষ্ঠ লেখকের প্রত্যক্ষ প্রভাব যদি থাকে তবে তা প্রমথ চৌধুরীর ছিলো। বাংলা ভাষায় চলিত রীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী প্রবল মেধা ও মননের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও যে তথাকথিত বোদ্ধাদের দ্বারা সম্মানিত ও অভিনন্দিত হননি সে জন্য বুদ্ধদেব আক্ষেপ করেছেন। তিনি প্রমথ চৌধুরীকে নিয়ে এমন মন্তব্য করেছিলেন, "... এই দুর্ভাগা দেশের মূঢ় সমাজে আজও তিনি অপুরস্কৃত, কিন্তু যত দিন যাবে, ততই ফুটবে তাঁর রচনার দীপ্তি, ভবিষ্যতের বাঙালি লেখকদের জন্য হবেন অন্যতম প্রধান শিক্ষক। খাবার ঘরে তাঁর ডাক পড়বে দেরিতে, কিন্তু ঘরটিতে থাকবে উজ্জ্বল আলো, আর সঙ্গীরা হবেন সংখ্যায় অল্প, কিন্তু সুনির্বাচিত। ভ্রমণের শেষে হয়তো রবীন্দ্রনাথ ও মধুসূদনের সঙ্গে তিনি আহারে বসবেন।"
তিমির হননের কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে প্রবন্ধকার তিনটি প্রবন্ধ লেখার প্রয়াস পেয়েছেন। এ গ্রন্থটিতে জীবনানন্দকে নিয়ে লেখকের গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে। তিনি 'জীবনানন্দ দাশ: ধূসর পাণ্ডুলিপি' প্রবন্ধে জীবনা��ন্দকে নিয়ে বলেছেন, ''আমাদের কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ সবচেয়ে কম 'আধ্যাত্মিক', সবচেয়ে বেশি 'শারীরিক'; তাঁর রচনা সবচেয়ে কম বুদ্ধিগত, সবচেয়ে বেশি ইন্দ্রিয়নির্ভর।''
জীবনানন্দের 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' ও 'বনলতা সেন' কাব্যের সমালোচনা করেছেন অত্যন্ত দক্ষ ভঙ্গিতে। 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' তে লেখক জীবনানন্দের সৃষ্টিপ্রেরণারই পরিচয় পেয়েছেন। রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত জীবনানন্দের কলমে সামান্য হয��ে ওঠে অসামান্য। তাইতো তিনি এমনভাবে বলেন, "বলি আমি এই হৃদয়েরে সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!" জীবনানন্দ সেই চিন্তাশিল্পী যিনি চিন্তার গভীরে ডুবে নির্মাণ করেন চিন্তাসেতু। তিনি তাঁর উপমার জাদুতে মুগ্ধ করেছেন বুদ্ধদেবের উর্বর চিত্ত। বনলতা সেনের চোখের সাথে পাখির নীড়ের উপমা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও কৌতুহলোদ্দীপক। 'মোরগ ফুলের মতো লাল আগুন', 'কাঁচা বাতাবির মতো ঘাস', 'শিশিরের শব্দের মতোন সন্ধ্যা' - উপমাগুলি পাঠক হৃদয়ে ভিড়াই প্রবল ভাবাবেগের সাম্পান।
পয়ার ছন্দের শৈল্পিক রূপকার জীবনানন্দ পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত আগাগোড়া রোমান্টিক। বুদ্ধদেব বলেন, ''বিপজ্জনক শব্দও তাঁর আদেশে বিশ্বস্ত ভৃত্যের মতো কাজ ক'রে গেছে।'' শেলী, কীটস, ইএটস, সুইনবার্ন প্রমুখ কবিদের দ্বারা তিনি প্রভাবিত ছিলেন কিন্তু তাঁর স্বকীয়তা নজর কাড়ে যেন। তাইতো বুদ্ধদেব বলেন, "সহজেই প্রমাণ করা যায় যে ইএটস-এর 'O Curlew'-র তুলনায় তাঁর 'হায়, চিল' অনেক বেশি তৃপ্তিকর কবিতা, আর 'The Scholars' সঙ্গে 'সমারূঢ়ে'র সম্বন্ধ যেমন স্পষ্ট, তার স্বাতন্ত্র্যও তেমনি নির্ভুল।''
সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে তিনটি মূল্যবান প্রবন্ধ এ গ্রন্থটিকে মহিমান্বিত করেছে। সুধীন্দ্রনাথের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ 'অর্কেস্ট্রা' লিখতে গিয়ে বুদ্ধদেব বলছেন, ''তিনি কবি যতটা, তার চেয়ে কারিগর ঢের বেশি; এবং কারিগরিতে তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের প্রমাণ 'অর্কেস্ট্রা'র প্রতি পাতায় প্রকাশ পেয়েছে।'' সুধীন্দ্রনাথের কবিতায় আবেগের চেয়ে শব্দের ঝংকার যথাযথ। তাঁর শব্দচয়ন চিন্তা ও যত্নপ্রসূত, শিক্ষিত ও যথাযথ, জটিল ও গাম্ভীর্যময়। শব্দ ব্যবহারে তিনি নিখুঁত, ছন্দে সচেতন ও বাক্য বিন্যাসে অভিজাত। তিনি যখন লেখেন - " একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে ভর ক'রে ছিলো সাতটি অমরাবতী।'' তখন পাঠক মুগ্ধতার প্রস্রবণে বালিহাঁসের মতো ভাসতে থাকে। বুদ্ধদেবের ভাষায়, "সুধীন্দ্রনাথ কুশলী নির্মাণ, তাঁর কবিতা ঘন ও সাকার, ইংরেজিতে যাকে বলে সলিড। আঠারো মাত্রার পয়ারে আট-দশের নিখুঁত ভারসাম্য তিনি এমনভাবে বজায় রেখে চলেন যা হুবহু পোপ ও ড্রাইডেনের অ্যান্টিথিসিস -নির্ভর 'হিরোয়িক কাপলেটে'র কথা মনে করিয়ে দেয়।" তিনি সুধীন্দ্রনাথের 'অর্কেস্ট্রা' ও 'ক্রন্দসী'কে অনন্য গ্রন্থ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তবে বলতে দ্বিধা করেননি যে তাঁর কবিতা ভীষণ দুর্বোধ্য, জটিলতার পঙ্কিলতায় আচ্ছন্ন ও ভাবের প্রাবল্যে অতলস্পর্শী।
পঞ্চপাণ্ডবের বিষ্ণু দের 'চোরাবালি' নিয়ে বুদ্ধদেব একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন (মূলত এটা বিষ্ণু দে কে লেখা বুদ্ধদেবের চিঠি) যেখানে তিনি 'ঘোড়সওয়ার' কবিতায় তাঁর মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন। এটিকে তাঁর কালের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পাঠকের জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করছি চারটি চরণ, "কাঁপে তনুবায়ু কামনায় থরোথরো। কামনার টানে সংহত গ্লেসিআর। হালকা হাওয়ার হৃদয় আমার ধরো, হে দূরদেশের বিশ্ববিজয়ী দীপ্ত ঘোড়সওয়ার!" বুদ্ধদেব বিষ্ণু দের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাঁর কাব্যের জটিলতার স্বরূপ উন্মোচন করেছিলেন। বিষ্ণু দে কিভাবে এ সমালোচনা গ্রহণ করেছিলেন জানি না। বাংলা সাহিত্যে বুদ্ধদেব বসু ও আব্দুল মান্নান সৈয়দ বিশ্লেষক ও সমালোচক হিসেবে দুর্দান্ত। তারা যেমন শব্দ নিয়ে খেলতে জানতেন, ঠিক তেমনি সমালোচনা করতেন যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, মনন দিয়ে। বুদ্ধদেব বসু বিষ্ণু দে কে পাঠানো চিঠিতে 'ক্রুতুকৃতম', 'অপাপবিদ্ধমস্নাবির', 'সোৎপ্রাসপাশ' প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করার হেতু জিজ্ঞেস করেছিলেন।
“ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত” এই চরণের রূপকার খ্যাতিমান কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'পদাতিক' কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা করতে গিয়ে প্রবন্ধকার বলেন, ''তিনি অভিনব শুধু এই কারণে যে সমর সেনের পরে, এবং আরো প্রবল ও স্পষ্টভাবে, তিনি ব্যক্তিবাদের বিরোধী; তাঁর মুক্তিকামনা একলার জন্য নয়, কোনো বিধাতানির্বাচিত মনীষীসম্প্রদায়ের জন্যও নয়, সমগ্র মনুষ্য-সমাজেরই জন্য। সাম্য ও সংহতি ছাড়া মুক্তির অন্য কোনো সংজ্ঞার্থ তাঁর মনে নেই।'' সুভাষ যে সাম্যবাদের সুবাস ছড়িয়েছেন তা তাঁর কবিতায় দৃশ্যমান। সুভাষের ভাষায়, " কৃষক, মজুর! তোমরা শরণ- জানি, আজ নেই অন্য গতি; যে পথে আসবে লাল প্রত্যুষ সেই পথে নাও আমাকে টেনে।" সুভাষের কলাকৌশল অত্যন্ত নিখুঁত ও নবীন কবিদের জন্য অনুকরণীয়।
শীর্ষস্থানীয় আধুনিক কবি 'অমিয় চক্রবর্তী' কে নিয়ে 'কালের পুতুল'- এ রচিত হয়েছে তিনটি প্রবন্ধ। অমিয় চক্রবর্তীর 'খসড়া'-কে বুদ্ধদেব 'বিস্ময়কর বই' বলেছেন। বহির্মুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে সাঁতরে বেড়ানো অমিয় চক্রবর্তীর মন ছিলো আধুনিক ছাঁচে ঢালাই করা। কলাকৌশলের আঙ্গিকে তাঁর কাব্য দুঃসাহসিকতার গীত রচে। তাঁর ভাষায়- "দ্বীপ ভাঙে; পাহাড়, প্রবালপুঞ্জ, নূনযন্ত্রে ঘর্ঘর ঘোরায়। ধোঁয়া নেই। নব্যতন্ত্রী ঐটুকু। আকাশের কারখানা ঢাকা-ডাইনামো, শব্দ নেই। রাত্রে বারান্দায় ভাবি সমুদ্র কখন হব্র শম।'' যে বছর 'খসড়া' আলোর মুখ দেখেছিলো সেই একই বছরে আলো দেখেছিলো 'এক মুঠো' কাব্যগ্রন্থটি। অল্প সময়ের মাঝে দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়াটা অস্বাভাবিক ঠেকলেও তা কবির যোগ্যতা, মেধা ও পরিশ্রমের স্মারক। তাঁর হৃদয়ে সর্বদেশীয় ভাবধারা প্রস্ফুটিত রূপ লাভ করেছিলো। তিনি লিখেছেন এভাবে: "আছি এখন মার্স-এ। দেউলে লাল বাতি জ্বালা মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ। দূরে শনির সোনার থালা; নির্বাণপথের শূন্য। এখানে কই রেফ্রিজরেটরের দই।'' বৃষ্টির চিত্র এতো সুনিপুণভাবে তিনি এঁকেছেন যে পাঠকহৃদয়ে তা শব্দাখ্যজ্যোতি ছড়ায়। তাঁর লেখা কয়েকটি চরণ এখানে ফুটিয়ে তোলার লোভ সামলাতে পারছিনা। তিনি বলেন, "অন্ধকার মধ্যদিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে। বৃষ্টি ঝরে রুক্ষ মাঠে, দিগন্তপিয়াসী মাঠে, স্তব্ধ মাঠে, মরুময় দীর্ঘ তিয়াষার মাঠে, ঝরে বনতলে, ঘনশ্যামরোমাঞ্চিত মাটির গভীর গূঢ় প্রাণে শিরায় শিরায় স্নানে, বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।" বুদ্ধদেব অমিয় চক্রবর্তীকে সমকালীন বাংলার সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক কবি হিসেবে দেখেছেন। কলাকৌশলের নতুনত্ব ও ভাষার চমকপ্রদ ভঙ্গিমা তাঁর লেখার প্রাণশক্তি যুগিয়েছে।
উজ্জ্বল মনোহর গদ্যরীতির ধারক অন্নদাশঙ্কর রায়কে নিয়ে 'অন্নদাশঙ্কর রায়: নূতনা রাধা' শিরোনামে একটি চমৎকার প্রবন্ধ লিখেছেন বুদ্ধদেব বসু। 'পথে-প্রবাসে' গ্রন্থে অন্নদাশঙ্কর যেভাবে নিজেকে ফুটিয়ে তুলেছেন কাব্যে তাঁর পদচারণা ঠিক ততটাই দুর্বল ও বালখিল্য। বুদ্ধদেবের ভাষায়, ''অন্নদাশঙ্করের বিশেষত্ব তাঁর ভাষার লাবণ্য, তাঁর ভঙ্গির কমনীয়তা, তাঁর আনন্দিত কৌতুকোজ্জ্বল দৃষ্টি। শুধু প্রিয়ার নয়, সমস্ত পৃথিবীর প্রেমেই তিনি পাগল, আপন সুখ-নীড় ও বিশ্বপ্রকৃতির ঐশ্বর্য নিয়ে তিনি এত সুখী যে সেই সুখ কবিতায় প্রকাশ না-ক'রে তাঁর মন শান্ত হ'তে চায় না।"
'নজরুল ইসলাম' শিরোনামে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের উপর একটি প্রবন্ধ লিখেছেন বুদ্ধদেব। নজরুলকে নিয়ে এমন নির্মোহ আলোচনা ও সমালোচনা তেমন চোখে পড়ে না। বুদ্ধদেব মনে করেন, বাংলা কাব্যের ইতিহাসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পর সবচেয়ে বড় কবিত্ব শক্তি নজরুলের। তিনি নজরুলকে ভালো কবি ও লোকপ্রিয় কবি অভিধায় অভিহিত করেছেন। কিন্তু নজরুল তাঁর মেধার অপচয় করেছেন অনুভব করে বুদ্ধদেবের হৃদয় ব্যথিত হয়েছে। নজরুলের বোহিমিয়ান জীবন বুদ্ধদেবকে ভাবিয়ে তুলেছিলো, নাড়া দিয়েছিলো তাঁর গভীর সত্তাকে। বুদ্ধদেবের ভাষায়, ''সে-কালে বোহিমিয়ানদের চাল-চলন অনেকেই অভ্যাস করেছিলেন- মনে-মনে তাঁদের হিশেবের খাতায় ভুল ছিলো না- জাত-বোহিমিয়ান এক নজরুল ইসলামকেই দেখেছি। অপরূপ তাঁর দায়িত্বহীনতা।'' কবিতাঙ্গনে নজরুল যেন জুলিয়াস সিজারের মতো জয় করলেন। এটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। অনর্গল অচেতন বাক্যবিন্যাসের রুদ্ধস্রোতে তিনি ভাসতে থাকলেন। বুদ্ধদেবের ভাষায়, "অদম্য স্বতঃস্ফূর্ততা নজরুলের রচনার প্রধান গুণ- এবং প্রধান দোষ।'' লর্ড বায়রন সম্বন্ধে গ্যেটে বলেছিলেন, "The moment he thinks, he is a child." নজরুলের ক্ষেত্রেও এ কথা সমভাবে প্রযোজ্য। তিনি পরিপক্ব হননি, তাঁর প্রথম দিকের কবিতা ও শেষের দিকের কবিতা প্রায় সমজাতীয় ধীশক্তির শিখা প্রজ্জ্বলিত করেছে। গানে নজরুল সমুজ্জ্বল, এমনকি রবীন্দ্রনাথের চেয়েও। কিন্তু সমস্যার দিক হলো তাঁর দুরতিক্রম্য রুচির দোষ। কোথায় থামতে হবে এটা যদি নজরুল জানতেন তবে তিনি মহাকালের মহানায়ক বনে যেতেন। যদিও বাংলা কাব্যের মহান আসরে তাঁর আসন নিঃসংশয় কারণ তাঁর অভাবনীয় কবিত্বশক্তি তাকে মহিমান্বিত করেছে।
'কালের পুতুল'-এ অনেক অজানা বিষয় উঠে এসেছে যা পাঠককে ভাবাতুর করে তোলে, পাঠক হৃদয়ে প্রেরণার জল সিঞ্চন করে। এ গ্রন্থটির 'কালের পুতুল' নামক প্রবন্ধটি পাঠকহৃদয়ে দারুণ ছাপ ফেলবে। এ প্রবন্ধটিতে লেখক বলছেন, "যে-কোনো সময়ে, কবিকে জয়ী হ'তে হবে মানুষের উপর, নয়তো কবিতা সম্ভব হবে না।''
বুদ্ধদেব বসু ছিলেন বিশ্বসাহিত্যের নান্দনিক পাঠক, শিক্ষক ও সমালোচক। ধ্যান, চিন্তা, মনন, গবেষণা প্রভৃতির মেলবন্ধনে তিনি সমালোচনার যে গাঁথা রচনা করেছেন তা যুগের পর যুগ ধরে পাঠকদেরকে অনুপ্রাণিত করবে। বুদ্ধদেবের অকাট্য যুক্তি, নির্ভুল তথ্য, ঈর্ষণীয় পরিমিতিবোধ, হিমালয়সয় জ্ঞান তাঁর আসনকে সমুন্নত করেছে। তিনি তাঁর নামের মতোই সমুচ্চ ও ভাবনার মতো বিশাল। 'কালের পুতুল' আমার অতিপ্রিয় বইয়ের তকমা পেলো, যুক্ত হলো সেরা বইয়ের তালিকায়।
আমাকে চিন্তার অজস্র বিকল্প পথ দিয়ে ঋণী করেছে এ বই। সাহিত্যের পথে আরো নিবেদিত হওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে। অকপট সুন্দর সমালোচনা সাহিত্য লিখতে শেখায় এ আমার গুরুপাঠ। সর্বোপরি কবিতাকে নতুন চোখে দেখছি। বুদ্ধদেব বসুর কাছে কৃতজ্ঞতা। আর কী কাণ্ড, তাঁর বাণী যেন ভবিষ্যৎবীণা! যা যা বলে গেছেন, ফলেছে তার সিংহভাগ। প্রায় সাত দশক পর দেখছি বিধায় জানছি।