প্রায় ১৫০ বছর আগের কথা। ঘটনার শুরু ১৮৬৫ সালে, শেষ ১৮৭২-এ। প্রেক্ষাপট, পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক হাজার বর্গমাইলের গভীর জঙ্গলাবৃত অঞ্চল। সেখানে বাস করে ‘তাউংথা' নামে পরিচিত কিছু আদিম জনজাতি। হাজার বছর ধরে সমভূমির মানুষের কাছে ওরা অসভ্য, হিংস্র, বর্বর বলে গণ্য। তার ওপর কারো কারো ধারণা, ওই ভূখণ্ডে সমতলের মানুষের প্রবেশে মানা। ফলে লোকমুখে ছড়ায় নানা উদ্ভট গুজব। ওখানকার অধিবাসীরা নাকি জলের স্পর্শ বাঁচিয়ে চলে, বাকি পৃথিবীর কোনো খবরও ওখানে আসে না! উনিশ শতকে নিজের প্রাণ বাজি রেখে সেই 'নিষিদ্ধ' দুর্গম এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন এক ব্রিটিশ অফিসার, থমাস হারবার্ট লুইন । দুঃসাহসী সেই অভিযানে উন্মোচন হতে থাকে একের পর এক বিস্ময়। গোরা লুইন পাহাড়িদের সঙ্গে আলাপ করেন, ঘনিষ্ঠও হন; সরেজমিনে দেখেন তাদের জীবনযাত্রা। লুসাই জনগোষ্ঠীর লোকেরা ভালোবেসে তাঁর নাম দেয় ‘থাংলিয়ানা'। তারপর একটা যুদ্ধের আয়োজন । তথাকথিত 'সভ্যতা' হানা দেয় পাহাড়ের নির্জনে। বাইরের দুনিয়ায় প্রথমবারের মতো পা ফেলে অচিন অঞ্চলের মানুষ । পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরল সব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিজের কুশলী কলমে লন্ডন থেকে ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা আ ফ্লাই অন দ্য হুইল-এ লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন লুইন। সেই বইয়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত অধ্যায়গুলোর বাংলা অনুবাদ নিয়েই থাংলিয়ানা।
ব্রিটিশ কর্মকর্তা থমাস হারবার্ট লুইন ১৮৬৫ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। বইয়ের বিজ্ঞাপনে যদিও লুইনের অভিযানকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে, বাস্তবে তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও কম জরুরি নয়।লুইন পাহাড়িদের সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পোষণ করলেও বাঙালিদের একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। এর কারণ তিনি মোক্তার বা মোড়ল জাতীয় বাঙালিদের সাথে পেশাগত সূত্রে মিশেছেন এবং দেখেছেন এদের সীমাহীন দুর্নীতি।
মনে রাখতে হবে, "থাংলিয়ানা " একজন ব্রিটিশের লেখা।তিনি সরাসরি সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের পক্ষে অংশ নিয়েছেন এবং দায়িত্বরত অবস্থায় পাহাড়ের তথাকথিত অসভ্য বর্বর নৃ-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এদিকে প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, চা বাগানের জন্য পাহাড় দখলের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়ের বাসিন্দারা ক্রমশ গৃহহীন হয়ে যায় এবং এর ফলস্বরূপ ঘনঘন বাঙালি বা বৃটিশদের ওপর আক্রমণ করে। তারপরও নিজের কাজে লুইনের সততা স্পষ্ট বোঝা যায়। নতুন ও ভালো যে কোনো কিছু তিনি উদারচিত্তে গ্রহণ করতেন। একটা ঘটনা আছে এমন-
"রতন পুইয়ার গ্রামের একটা ঘটনার কথা মনে আছে। একবার আমি তাদের গ্রামে রতন পুইয়ার সাথে কথা বলছিলাম, তখন কোথা থেকে এক হদ্দ মাতাল এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। কিন্তু রতন পুইয়া তাকে তিরস্কার করা দূরে থাকুক, একটা কথাও বলল না। যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে পাগড়িটা মাটি থেকে কুড়িয়ে ধুলো ঝেড়ে মাথায় বসিয়ে দিল। আমি বললাম, 'এটা কেমন ব্যাপার হলো? তুমি তোমার অনুসারীদের বেয়াদবির জন্য শাস্তি দাও না?' সে রীতিমতো আঁতকে উঠে বলল, 'বেয়াদবি? কী বলছেন সাহেব? সে একটা বদ্ধ মাতাল। তার কোনো হুঁশ নাই। সে কী করেছে নিজেই জানে না। ওটার কথা বাদ দিলে গ্রামে আমরা সবাই সমান। কিন্তু যখন যুদ্ধে যাই তখন সে যদি আমার কথা অমান্য করে সেটার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান আছে। এখানে সে নিজের বাড়িতে আছে। ওসবের কোনো বালাই নাই। যে কোনো লোক চিফের বাড়িতে ঢুকে যে কোনো জিনিস নিয়ে আসতে পারে। তাদের কথা হলো-তিনি হলেন আমাদের চিফ। তিনি আরো অনেক উপহার পাবেন। আমাদের কাছে যা আছে সেগুলোও তাঁরই। অতএব তাঁর যা আছে সেগুলোও আমাদের। চিফ যদি আমাদের না দেয় তা হলে আর কে দেবে?' অকাট্য যুক্তি-কোনো সন্দেহ নেই।"
তিনি নিসর্গ পছন্দ করতেন এবং প্রায়ই দুঃসাহসিক বিভিন্ন অভিযানে জড়িয়ে পড়তেন (অভিযানের বর্ণনা পড়ে লুইনকে বাস্তবজীবনের এলান কোয়াটারমেইন মনে হওয়া বিচিত্র নয়।) মাসের পর মাস ঘুরেফিরে একই পোশাক পরে, খাদ্য স্বল্পতা নিয়ে, বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পার হয়ে, দৃঢ় মনোবল সহকারে লুইন লুসাইসহ বিভিন্ন উপজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু একবার সন্ধি স্থাপিত হওয়ার পর তাদের সাথে লুইনের দারুণ সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরাই তার নাম রাখে "থাংলিয়ানা।" লুইন বিভিন্ন বিরূপ পরিস্থিতি তার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দ্বারা সমাধান করতেন। ব্রিটিশদের মধ্যেও কতো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পেশাগত ঈর্ষা কাজ করতো তার বর্ণনা পড়ে অবাক হতে হয়। সব মিলিয়ে, "থাংলিয়ানা " দারুণ একটি কাজ। হারুন রশীদের অনুবাদ ও ভূমিকা দুটোই প্রথম শ্রেণির।
হারবার্ট লুইনের দুঃসাহসিক ও রোমাঞ্চকর অভিযান যে কোনো অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের ভালো লাগবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। দিনের পর দিন এভাবে অরণ্যে ঘুরে বেড়ানো, আদিবাসীদের সাথে মিশে যাওয়া, আবার তাদের কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা; সবকিছুই অনেকটা রূপকথার মতো।
তবে আমার ভালো লাগেনি লুইন সাহেবের প্রভুসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি। তার কথায়, ব্যবহারে ফুটে উঠেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী চেহারা। বাঙালিদের তিনি বর্ণনা করেছেন নিকৃষ্টতম জাতি হিসেবে। নিজ গোরা সম্প্রাদায়ের হীন স্বার্থ হাসিলের জন্য আদিবাসীদের বর্বর, অসভ্য বলে তাদের নিকেশ করার জন্য অস্ত্রও ধরেছেন তিনি।।
সবকিছুর পরেও বইটা দারুণ, সেটা তৎকালীন পার্বত্য অঞ্চল তথা আদিবাসীদের জীবনধারা বোঝার জন্য এবং ব্রিটিশদের অভিযানের ফার্স্ট হ্যান্ড উপাত্ত পাওয়ার ব্যাপারেও।।
চমৎকার একটা কাজ। অনুবাদ দারুণ সাবলীল আর ঝরঝরে। এই গল্প থমাস হার্বার্ট লুইন ওরফে থাংলিয়ানার। তাঁর কলমে ফুটে উঠেছে উনিশ শতকের নিজের প্রাণ বাজি রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযানের কথা। গহীন অরণ্য, দুর্ধর্ষ পাহাড়ি জাতি। তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-আহার্য সমস্তই আলাদা। একজন ব্রিটিশ হয়ে তাদের সাথে মিশতে গিয়ে প্রায়ই তাদের খাবারদাবার খেতে হয়েছে তাঁকে। প্রাণের ঝুঁকি এসেছে কয়েকবার। এছাড়াও পাহাড়ি রোগ শোকও কম ছিল না। এই অভিযানে একটা স্বাদু ভ্রমণকাহিনীর পাশাপাশি স্বাদ পাওয়া যায় অদেখা ইতিহাসের। তৎকালীন প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কেও অনেক কিছু জানা যায়। যুদ্ধ বাঁধে। লুসাইদের সাথে সন্ধির পর লুইন তাদের প্রিয় মানুষেই রূপান্তরিত হন। লুইন পাহাড়িদের চাইতে বাঙালিদের বেশি অপছন্দ করতেন। মোড়লরা কীভাবে সরল নিরক্ষর পাহাড়িদের ঠকিয়ে সম্পত্তি হাতিয়ে নিত তার একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণও রয়েছে। আরো রয়েছে মেরি উইনচেস্টার ওরফে জোলুটির অপহরণ আর উদ্ধারের কথা। হারুন রশীদের ভূমিকাও চমৎকার।
একজনের ধার করা কথা দিয়ে লেখা শুরু করছি। কথাটা হচ্ছে, ‘এটাই বইয়ের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। কোনো পা নাড়ান ছাড়াই বই আপনাকে যেকোনো জায়গা থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে।’ কথাটা ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক ঝুম্পা লাহিড়ীর। কিন্তু আমি আমার বই পড়ার অভিজ্ঞতায় এ উক্তিটি অনেক অনেক বার রিলেট করতে পেরেছি। আজকে যে বইটা নিয়ে কথা বলব সেটা আমাকে গত কদিন ঘুরিয়ে এনেছে অতীতের রহস্যময় বাংলা থেকে, ঠিক ঝুম্পা লাহিড়ীর কথাটার মত। শুরুতেই ধন্যবাদ দিয়ে নেই অনুজ Rashed Swapnoকে, বইটা কেনার জন্য আর আমাকে পড়তে দেয়ার জন্য।
সময়কাল ১৮৬৫, ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার ‘থমাস হারবার্ট লুইন’ পা রাখলেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামে, ওহ সরি বাংলাদেশ না; পা রাখলেন ব্রিটিশ ভারতের চট্টগ্রামে। ওনার কাজ হবে এই অঞ্চলে আইন শৃঙ্খলার সুষ্ঠু প্রয়োগের দ্বারা শান্তি বজায় রাখা। তবে চট্টগ্রাম ওনাকে যতটা না টানতে পেরেছে তার চাইতে বেশি পেরেছে, হালকা নীলাভ মেঘের আবরণে ঘেরা রহস্যের আঁধার পার্বত্য চট্টগ্রাম। তার কৌতূহল অমোঘ আকর্ষণে রূপ নিল যখন পাহাড়ের কোলে বাস করা মানুষদের ব্যাপারে একের পর এক রহস্যময় কাহিনী তার কানে আসতে লাগল। অগত্যা, তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিস্তৃত পর্বত মাতার কোলে।
লুইন সাহেবের সেই অভিজ্ঞতা ঠাই পেয়েছিল তার লিখিত ‘আ ফ্লাই অন দ্য হুইল’ বইতে। তবে এ বইটিতে অবশ্য শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে তার অভিজ্ঞতাকেই মলাটবদ্ধ করেনি, ভারত উপমহাদেশে থাকাকালীন তার সকল অভিজ্ঞতাই ছিল এই ‘আ ফ্লাই অন দ্য হুইল’ বইতে। কিন্তু অনুবাদক হারুন রশীদ সাহেব করলেন কী? তিনি লুইন স���হেবের বইয়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশটুকুকে অনুবাদ করে ফেললেন আর নাম দিলেন ‘থাংলিয়ানা’। উদ্ভট এ নামটার পেছনে চমৎকার একটা গল্প আছে। কিন্তু এ গল্প আমি বলব না, আপনারা না-হয় বই থেকেই জেনে নেবেন। তবে জানার পর আমায় ধন্যবাদ দেবেন যে, বলে না দিয়ে ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স করতে দিয়ে আমি ভালোই করেছি। যাই হোক, আমি চলে যাই বইটা কী নিয়ে আর আমার কেমন লাগল সে বই।
প্রথম কয়েক প্যারা পড়েই বুঝে ফেলার কথা বইটা অ্যাডভেঞ্চারাস। তবে ‘আমাজনিয়া’, ‘গালিভারস ট্রাভেল’, ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘আরণ্যক’ ইত্যাদির সাথে এ অ্যাডভেঞ্চার উপাখ্যানের পার্থক্য হলো, ওগুলো ফিকশন আর এটা একদম সত্যিকারের অভিজ্ঞতার বুনন! লুইন সাহেব কী আগ্রহ নিয়ে জনমানবশূন্য ভীষণ বন্ধুর পাহাড়ি পথে চরাই-উৎরাই পার হয়েছেন, খেয়ে না খেয়ে ছেড়া বস্ত্রে গহীন জঙ্গলের মাঝে রাস্তা হারিয়ে জীবনের আশা জিইয়ে রেখেছেন, কী ভীষণ সাহস নিয়ে দুর্ধর্ষ পাহাড়ি জাতি সেন্দু, লুসাইদের সাথে সন্ধি করার চেষ্টা করেছেন, জীবন হাতে নিয়ে তাদের গ্রামে কোনোরকম সুরক্ষা ছাড়া প্রবেশ করেছেন; স্রেফ তাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য, তা উঠে এসেছে কালো কালিতে। এ অভিজ্ঞতা পাঠক হিসেবে আমাকে ব্যাপক অ্যাড্রেনালিন রাশ দিয়েছে। পড়তে পড়তে কখনও কখনও মনে হয়েছে লোকটা কী দারুণ কৌশলী! কেমন করে আপন করে নিলেন রতন পুইয়া নামের এক পাহাড়ি গোত্রপ্রধানকে! এ বই লুইন সাহেবের চোখ দিয়ে আমাদের দেখিয়েছে, লড়াকু পাহাড়িরা মানুষ হিসেবে কতটা সহজ-সরল, কতটা নির্লোভ। আর এই নির্লোভ মানুষগুলোকে বরাবর ঠকানোর চেষ্টা করেছে সমতলের মানুষেরা। এখানেও লুইন সাহেবকে আমরা দেখি, পাহাড়িদের প্রতি হওয়া আনজাস্টিস রোধ করার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হতে। তাদের প্রতি আনজাস্টিসের কারণেই হোক আর যে কারণেই হোক, বাঙালীদের তিনি অপছন্দ করতেন। আর ভীষণ ভালোবাসতেন পাহাড়িদেরকে। ভালো না বেসে শুধু শাসন করলে, লুইন সাহেব তাদের সাথে এক পাতে বসে খেতে পারতেন না, যা তিনি কোনোদিন খাননি তা ঐ পাহাড়িদের কৃষ্টি কালচারকে সম্মান করে খেতে পারতেন না। লুসাইদের কাছ থেকে মেরি উইনচেস্টার ওরফে জোলুটিসহ কিছু ব্রিটিশ নাগরিকদের উদ্ধারও করতে পারতেন না। পাহাড়িদের পরম বন্ধু হতে পারতেন না, তাদের আচার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণও পেতেন না। শুধু শাসক হলে এরকম অনেক কিছুই পারতেন না এবং মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি থমাস লুইন কখনও ‘থাংলিয়ানা’ হতে পারতেন না।
বইটা আমাকে এককথায় মুগ্ধ করেছে। শুধু অ্যাডভেঞ্চারের জন্য নয়। বইয়ে উঠে এসেছে ‘আরণ্যক’-এর সেই নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা, উঠে এসেছে পাহাড়ীদের বৈচিত্র্যময় জীবন ব্যবস্থার কথা।
আর অনুবাদ? এটা নিয়ে আসলে বলার ভাষা নেই, এতোটাই চমৎকার হয়েছে! হারুন রশীদ চমৎকার ভাষা প্রয়োগে এমনভাবে বইটাকে সাজিয়েছেন যে মনে হচ্ছে থমাস লুইন বর্তমান সময়ের একজন 'বাঙালী' হয়ে আমাদের তার অভিজ্ঞতা শুনিয়ে যাচ্ছেন। কেউ অনুবাদের স্ট্যান্ডার্ড কী জিজ্ঞেস করলে এ বইটি আমি ধরিয়ে দেবো আমি। তাই বলছি, 'আ ফ্লাই অন দ্য হুইল' বইটি থমাস হারবার্ট লুইন এর হতে পারে কিন্তু 'থাংলিয়ানা' আসলে হারুন রশীদের।
বইটি রেকমেন্ডেড সবার জন্য। যারা কিনতে চান তাদের উদ্দেশ্যে ইনফরমেশন হচ্ছে বইয়ের দাম ৫০০ টাকা (মুদ্রিত মূল্য)। ২০০ পেজ হিসেবে এটা বেশি কিনা এটা নিয়ে একটা আলোচনা হতেই পারে, কিন্তু এ বই আপনাকে যে অভিজ্ঞতার কথা জানাবে সেটা যে অমূল্য, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
চট্টগ্রাম ব্রিটিশ শাসনের আওতায় আসে ১৮৬১ সালে। আর আমাদের লুইন সাহেব পুলিশের চাকরি নিয়ে চট্টগ্রামে পোস্টেট হন ১৮৬৫ সালে। তিনি খুবই অ্যাডভেঞ্চারাস টাইপ মানুষ ছিলেন। একবার তো দু তিনজন লোক সাথে নিয়ে পাহাড়ী অরণ্যে চলে যান। জান নিয়ে কোনোমতে সে যাত্রা বেঁচে ফিরেন। সেই সময়ে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত তিনজন আদিবাসী নেতার অধীনে ছিল। লুইন সাহেবের ওপর দায়িত্ব বর্তায় এদের সাথে সমঝোতা করে এটা যে আসলে ব্রিটিশ রানির রাজত্ব সেই সত্য প্রতিষ্ঠা করা। তিনি স্বীকার করেছেন সমতলীদের তুলনায় পাহাড়ীরা ভীষণ সহজ-সরল। পাহাড়ের কোলে প্রকৃতির মাঝে বসবাস বলেই হয়তো তারা এই গুনগুলো পেয়েছে। অনেকগুলো আদিবাসী গোত্র শান্তি প্রেফার করলেও অনেকেই নিজস্বতা, স্বাধীনতা, স্বকীয়তার জন্য ...যুদ্ধ বেছে নেয়। আমাদের লুইন সাহেবকেও তখন বন্দুক, গোলাবারুদ নিয়ে যুদ্ধে নামতে হয়। আরো আরো অনেক কিছুই ঘটে কিছু ঘটনা মজার, কিছু দুঃখের, কিছু বিদায়ের। অবশেষে লুইন সাহেব যাকে আদিবাসীরা থাংলিয়ানা নামে ডাকতে শুরু করে। তিনি ১৮৭২ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ইংল্যান্ডে বসে তিনি ১৮৮৫ সালে ’আ ফ্লাই অন দ্য হুইল‘ নামে স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন। আমাদের এই বইটি হচ্ছে ১৮৬৫ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত লুইন সাহেবের লেখা স্মৃতিকথার অনুবাদ। হারুন রশীদের অনুবাদ ভীষণ চমৎকার ও সাবলীল। সব্যসাচী হাজরার প্রচ্ছদ বরাবরই পছন্দ করি, এটাও খুবই সুন্দর হয়েছে। বইয়ের বিষয়বস্তু, অনুবাদ, প্রচ্ছদ, বাঁধাই, কাগজ সব মিলিয়ে কথাপ্রকাশ দারুন একটা কাজ করেছে।
থাংলিয়ানা, আদ্যোপান্ত একজন এডভেঞ্চার প্রিয় মানুষের অভিযানের কাহিনি বললেও সম্ভবত ভুল হবে না। ব্রিটিশ রাজের আমলে থমাস হারবার্ট লুইন নামক এক ব্যক্তির আগমন ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশে। চাকরি করে ব্রিটিশ রাজের অধীনে। এডভেঞ্চার প্রিয় এই সুচতুর মানুষটি সরকারের কাজ করতে গিয়ে যেমন বিচক্ষণতার পরিচয় দেন তেমন ভাবেই প্রিয় হয়ে ওঠে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের কাছে। তৎকালীন সময়ে তার অভিযানের বদৌলতে তিনি ভারতের মিজোরাম পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। করে এসেছিলেন লুসাইদের সাথে চুক্তি। নিয়ে এসেছিলেন তাদেরকে ব্রিটিশ রাজের ছত্রছায়ায়। সবকিছুকে ছড়িয়ে যে জিনিসটা সামনে আসে তা হলো লুইনের ভ্রমণ বৃত্তান্ত। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায় নিজের অফিস তৈরি করেছিলেন। যার পাশে প্রবাহমান কর্ণফুলী নদী। পাহড়ের পর পাহাড় চষে তিনি নিজের মনের খোরাক যেমন জুগিয়েছিলেন তেমন ভাবে পাঠকদের উপহার দিয়েছেন এক অসাধারণ ভ্রমণবৃত্তান্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠার ফলে এই অঞ্চল নিয়ে জানার অধির আগ্রহ কাজ করে আমার মধ্যে। আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছরেরও আগে একজন ভিনদেশির চোখে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে বইয়ের পাতা উল্টাতে হয়। পরিবর্তন যে হয়েছে তা তো বলার বাইরে, কিন্তু যে বুনো আর আদিম পার্বত্য অঞ্চলের কথা পড়ি তা কল্পনারও বাইরে। অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্য পা বাড়াতে থাংলিয়ানার যে প্রবল আগ্রহ তাতে করে পাঠকের তাকে ভালো না বেসে উপায় নাই। লুইন তৎকালীন সময়ের পার্বত্য অঞ্চলের রাজাদের জব্দ করতে নেয় বিচক্ষণ পদক্ষেপ। মাঝে মাঝে তার এই পদক্ষেপ কপটতায় পূর্ণ মনে হলেও সে যে তার সরকারের সেবায় নিয়োজিত তা মনে করিয়ে দিতেও ভুলেন না। তার থাংলিয়ানা নামটিও এক কূটনৈতিক চাল বললে বোধহয় ভুল হবে না।
ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা থমাস হারবার্ট লুইনের ভারতবর্ষের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা A FLY ON THE WHEEL -এর পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, প্রশাসনিক দায়িত্ব, পাহাড়ের গহীনে দুর্ধর্ষ অভিযান, পাহাড়ের আদিবাসীদের সারল্য, তাদের জীবনযাপন, একজন ব্রিটিশদের দৃষ্টি ভঙ্গিতে বাঙালি -বিদ্বেষী মনোভাব ঠাঁই পেয়েছে হারুন রশীদের অনুবাদ "থাংলিয়ানা" তে। থাংলিয়ানা নামের গল্পটাও ইন্টারেস্টিং। পাহাড়ের মানুষেরা ভালোবেসে লুই কে থাংলিয়ানা ডাকতো।তাদের বিশ্বাস থাংলিয়ানা সাহস আর শৌর্যের প্রতীক।
সালটা তখন ১৮৬৫, চট্টগ্রাম শহরে পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন এক ব্রিটিশ তরুণ অফিসার 'থমাস হারবার্ট লুইন'। চট্টগ্রামে কাজ শুরু করতেই তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করে শহরের পূর্বদিকের নীলাভা ধূসর দিগন্ত রেখায় ভেসে থাকা পার্বত্য অঞ্চলগুলো। খবর নেওয়া শুরু করতেই কানে আসে অদ্ভুত বিচিত্র অবিশ্বাস্য অতিলৌকিক গুজবে ভরপুর সব গল্প। ওই পার্বত্যভূমিতে নাকি যারা বাস করে তারা হিংস্র,বর্বর, অসভ্য। তারা সাপ,ব্যাঙ, কীটপতঙ্গ থেকে শেয়াল, কুকুর, হাতি, অজগর হেন কিছু নাই ওরা খায় না। কোনো কোনো জাতি নাকি জ্যান্ত মানুষও কাঁচা খেয়ে ফেলে। এ অঞ্চল তাই সমতল মানুষদের জন্য নিষিদ্ধ এক অঞ্চল।
অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমি লুইন এসব গালগল্প শুনে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেন। তাঁর বুকে নতুন করে একটা অঞ্চল আবিষ্কারের নেশা জাগতে শুরু করে। একসময় যেখানে ফ্রান্সিস বুকাননের পা পড়েছিলো, এবার তাঁকে ছাড়িয়েও আরো এগিয়ে যাওয়ার আশায় বুক বাঁধে থমাস হারবার্ট লাইন।
লুইন তার আশার পরিপূর্ণতা দিতেই দক্ষিণে বান্দরবানের পাহাড় জঙ্গলাকীর্ণ পথ কেটে, পায়ে হেটে, স্রোতস্বিনী নদীতে নৌকা বেয়ে কালাদান নদীর ওপারে এক নিষিদ্ধ অঞ্চলে গিয়েছিলেন, যেখানে বাস করতো এক দুর্ধর্ষ জাতি সেন্দু, সেই এলাকায় প্রবেশ করে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার সঙ্গী হয়েও ফিরে আসতে হয়েছিলো দুই দুইবার বহুকষ্টে প্রাণ নিয়ে চট্টগ্রামে।
চট্টগ্রামের আরেক দুর্ধর্ষ জাতি ছিলো লুসাই, যাদের আগ্রাসনে তটস্থ হয়ে থাকতো পাহাড় কী সমতল সব জায়গারই বাসিন্দারা। এরা হুট করে এসে কোনো এক পাহাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর পুড়ে ছারখার করে দিতো, ধরে নিয়ে যেতো সব নারী, শিশু, তরুণদের আর ব্যবহার করতো দাস হিসেবে। এই দুর্ধর্ষ লসাইয়েরই এক সর্দার রতন পুইয়াকে লুইন জয় করে নিয়েছিলেন নিজের কূটনৈতিক বুদ্ধি দিয়ে। যে গল্প আরেক দারুণ উপখ্যান।
এই পার্বত্য অঞ্চলের গহীনের নানান জাতির সাথে পরিচয় হওয়ার ফলে লুইন জানতে পেরেছিলো তাদের নানান সব আচার সংস্কারের, তাদের খাদ্যাভাসের সাথেও পরিচয় ঘটেছে লুইনের। এই যেমন লুসাই জাতির কথাই ধরা যাক, এদের কেউ মারা গেলে তাদের আত্মীয়স্বজনরা ঐ লাশকে বসিয়ে ভালো কাপড় পরিয়ে তার সামনে খাবারদাবার, অস্তপাতি রেখে তামাকের পাইপ দিয়ে এক কফিনের মধ্যে ভরে কোনো গাছের নিচে পুঁতে দেয়। কিছু কিছু জাতির কিন্তু আরো অদ্ভুত রীতিনীতি রয়েছে। যখন কোনো গোত্রপ্রধান মারা যায়, তখন তারা মৃতদেহ আগুনের উপর রেখে শুকিয়ে তারপর একটা গাছে ঝুলিয়ে রাখে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব নানান অভিজ্ঞতার ফুলঝুরিতে ভরপুর এই 'থাংলিয়ানা' বইটি। বইটিকে আপাদমস্তক একটা ভ্রমণবৃত্তান্ত মনে হলেও প্রতিটা ভ্রমণের কাহিনি পড়ে মনে হয়েছে এক একটা রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পড়ছি। থমাস হারবার্ট লুইনের পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিদের সাথে যে আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো তার বর্ণনা পড়েও হয়েছি মুগ্ধ। ভদ্রলোকের এই বইটি পড়ে স্বীকার করতেই হবে তিনি একই সাথে যেমন দুর্ধর্ষ সাহসী এবং কৌশলী ছিলেন আবার একই সাথে পাহাড়ী এই অঞ্চলে থাকা সহজ-সরল মানুষগুলোর প্রতি ছিলেন আন্তরিক। একই ভাবে তার এই পাহাড়ি মানুষদের জন্য কিছু করার প্রচেষ্টা সেই মানুষগুলোর নিখাত ভালোবাসা জয় করে নিয়েছিলো।
তাই যেকোনো উৎসবেই পাহাড়ী গোত্রপ্রধান বন্ধুর মতো নিমন্ত্রণ করতো লুইনকে, তার সাহসিকতার প্রতি যেমন সম্মান করতো, আবার তার কাছে সহযোগিতাও করতো। তবে সবগল্পই যে সুখকর তেমন কিন্তু না। সব গোত্রপ্রধানই যে তাঁকে পছন্দ করতো এমন কিন্তু না, সেই কাহিনিও বইটিতে স্থান পেয়েছে। আছে এসব গোত্রদের নানান বিশ্বাস, মিথ আর অদ্ভুত আচার, খাদ্য অভ্যাসের বর্ণনা।
বইটি থমাস হারবার্ট লুইনের A Fly On The Wheel এর অনুবাদ বলা যায় না, মূল বই থেকে সম্পাদনা করে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখা ভ্রমণ বৃত্তান্তগুলোই স্থান নিয়েছে এই বইটিতে। অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখা বলেই আমারও বইটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। বইটির নামটাও বেশ চমৎকার, এই নামের পিছনেরও আছে একটা গল্প। অবশ্য সেটা আমি এখানে উল্লেখ করছি না, কেউ বইটি পড়লে তাঁকে বিষয়টা দারুণ আমোদিত করবে বলে মনে করি।
শেষদিকে এসে লুসাইসহ কয়েকটা গোত্রের কার্যক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে ব্রিটিশদের চালানো এক অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ আছে বইটিতে যেখানে থমাস হারবার্ট লুইনও ছিলেন, তার কুটনৈতিক দক্ষতা আর পাহাড়ি সহজসরল মানুষগুলোর তার প্রতি বিশ্বাসের ভিত্তিতে অভিযান সফল হয়েছিল, উদ্ধার করা হয়েছিলো কিছু অপহরণ করা ব্রিটিশ মানুষদের। মূলত এই অভিযানটা করা হয়েছিলো এক ছয় বছর বয়সি মেরি ওয়ইনচেস্টার বা জেলুটির জন্য, তার সেই অপহরণ হওয়া নিয়েও বিস্তারিত আছে বইটিতে।
সেই অভিযানের পরে লুসাই জাতির সাথে এক ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো লুইন বা থাংলিয়ানার সাথে। যাকে পাহাড়িরা নিজের গোত্রপ্রধানের মতোই বিশ্বাস করতো। এবং কী পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস কাজ করে যাওয়া, নানান সব আইন পদ্ধতির সংস্কারসহ পাহাড়ি মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই বইটিতে। সত্যি বলতে বইটি পড়ে লুইনের পাহাড়িদের প্রতি যে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে তা খুবই বিরল এখনকার সময়েও।
থাংলিয়ানা আমার পড়া চমৎকার একটা বই, যা হৃদয়ে দাগ কেটে গেছে। বইটি ভ্রমণ কাহিনি হলেও এক একটা অধ্যায় যেনো গল্পের বই থেকে তুলে আনা টানটান উত্তেজনাকর কোনো গল্প মনে হয়েছে আমার। ফ্রান্সিস বুকাননের বইটি পড়ে যতটা না বিরক্ত হয়েছি, থাংলিয়ানা পড়ে ঠিক তার চেয়েও বেশি হয়েছি মুগ্ধ। কেননা ফ্রান্সিস বুকাননের ভ্রমণ ছিলো বাণিজ্যিক, যার ফলে তার বর্ণনায় রসকষহীন ভৌগোলিক অবস্থাই স্থান পেয়েছে বেশি। কিন্তু থাংলিয়ানার পার্বত্য অভিযান স্বপ্রণোদিত হওয়ায় ছিলো স্বতস্ফূর্ত বর্ণনা। যেখানে পাহাড়ি মিথ, আচার, খ্যাদাভাস, উৎসব, তাদের জীবনধারাসহ নানান দিকও উঠে এসেছে গল্পের ছলে।
বইটি বের হয়েছে কথাপ্রকাশ থেকে, তাদের প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে আসলে বলার কিছু নেই। অনুবাদ একেবারে ঝরঝরে, বানানভুলও চোখে পড়েনি একদম। সব্যসাচী হাজরার প্রচ্ছদও আমার কাছে দারুণ মনে হয়েছে, তবে মূদ্রিত মূল্যটা বেশি মনে হয়েছে ২০০ পৃষ্ঠা একটা বইয়ের। যদিও বইটি পড়ে যাকে বলে পয়সা উসুল করা বই মনে হয়েছে আমার।
১৮৬৫ সাল। ব্রিটিশ তরুণ অফিসার থমাস হারবার্ট লুইন চট্টগ্রামের পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিতেই শুনতে পেলেন পার্বত্য অঞ্চলের রহস্যময় সব গল্প। পাহাড়ের ওপারে নাকি বাস করে হিংস্র, বর্বর জাতিগোষ্ঠী, যারা সাপ, ব্যাঙ থেকে শুরু করে বিশাল অজগর পর্যন্ত সবকিছুই খায়। এমনকি কিছু জাতি নাকি মানুষও কাঁচা খেয়ে ফেলে! সমতলের মানুষের কাছে সেই অঞ্চল ছিল এক নিষিদ্ধ ভূখণ্ড।
তবে এসব কল্পকাহিনি লুইনের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে তোলে। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের অজানা ভূখণ্ডে পা রাখার সিদ্ধান্ত নেন। বান্দরবানের দুর্গম পথ পেরিয়ে, কালাদান নদীর স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে, তিনি পৌঁছে গেলেন এক বিপজ্জনক এলাকায়—যেখানে বাস করত সেন্দু জাতি। দু’বার প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে সেই নিষিদ্ধ অঞ্চল থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে।
চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে আরেক দুর্ধর্ষ জাতি ছিল লুসাই। তাদের হঠাৎ আক্রমণে তটস্থ থাকত পাহাড়ি ও সমতলের গ্রামবাসীরা। এক রাতের মধ্যে তারা গ্রাম জ্বালিয়ে দিত, নারীদের বন্দি করত, আর তরুণদের দাসে পরিণত করত। এই ভয়ঙ্কর লুসাইদের সর্দার রতন পুইয়াকে লুইন কূটনৈতিক বুদ্ধি দিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে আসেন—এক দুর্দান্ত উপাখ্যান যা এই বইতে উঠে এসেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে লুইন বিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন তাদের নানান অদ্ভুত রীতি। লুসাইদের কেউ মারা গেলে তার মৃতদেহ বসিয়ে কাপড় পরানো হতো, সামনে খাবারদাবার ও অস্ত্র রাখা হতো, তারপর সেটিকে একটি কফিনে ভরে গাছের নিচে সমাধিস্থ করা হতো। আবার কিছু জাতি ছিল, যারা গোত্রপ্রধানের মৃতদেহ আগুনে শুকিয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখত!
এই অভিজ্ঞতাগুলোই উঠে এসেছে ‘থাংলিয়ানা’ বইতে। এটি নিছক ভ্রমণকাহিনি নয়, বরং একের পর এক রোমাঞ্চকর অভিযানের ধারাবিবরণী। থমাস হারবার্ট লুইনের সাহস, বুদ্ধিমত্তা এবং পাহাড়িদের প্রতি গভীর আন্তরিকতার প্রতিচ্ছবি এই বই। পাহাড়িরাও তাকে বন্ধু, এমনকি তাদের আপনজন বলে মনে করত। তাদের উৎসবে তিনি নিমন্ত্রিত হতেন, তাদের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে।
তবে সব সম্পর্কই যে মধুর ছিল, তা নয়। কিছু গোত্রপ্রধান তাকে শত্রু ভেবেছে, তার উপস্থিতি সন্দেহের চোখে দেখেছে। এই সংঘাত, এই টানাপোড়েনও বইটির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক।
মূলত, ‘থাংলিয়ানা’ থমাস হারবার্ট লুইনের A Fly on the Wheel বইয়ের সরাসরি অনুবাদ নয়। বরং সম্পাদনা করে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ভ্রমণকাহিনিগুলোই রাখা হয়েছে। সেই কারণেই এটি আরও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বইটির নামের পেছনেও রয়েছে এক দারুণ গল্প, যা পাঠকদের আনন্দিত করবে।
বইয়ের শেষাংশে রয়েছে এক ঐতিহাসিক অভিযান, যেখানে ব্রিটিশরা লুসাইদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এক ছয় বছর বয়সি ব্রিটিশ মেয়ে মেরি উইনচেস্টারকে অপহরণের ঘটনাই ছিল এই অভিযানের মূল কারণ। লুইনের কৌশল ও পাহাড়িদের প্রতি তার বিশ্বস্ততার কারণেই এই অভিযান সফল হয় এবং অপহৃতদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
এরপর লুসাইদের সঙ্গেও তার সম্পর্ক বদলে যায়। তারা লুইনকে বন্ধু বলে মেনে নেয়, এমনকি তাদের নিজস্ব গোত্রপ্রধানের মতোই শ্রদ্ধা করত। পাহাড়ের মানুষের জন্য তার কাজ, আইনপ্রণয়ন, এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাগুলো এই বইতে দারুণভাবে উঠে এসেছে।
বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়, এটি শুধু ইতিহাস নয়—একটা টানটান গল্প, যেখানে প্রতিটি অধ্যায় রুদ্ধশ্বাস অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর। ফ্রান্সিস বুকাননের ভ্রমণবৃত্তান্ত যতটা শুষ্ক, ‘থাংলিয়ানা’ তার ঠিক উল্টো—প্রাণবন্ত, আবেগঘন, গল্পের মতো সহজপাঠ্য। পাহাড়ি জীবন, সংস্কৃতি, উৎসব, খাদ্যাভ্যাস—সবকিছুই এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে পড়ার সময় পাহাড়ের গহীনে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি আসে।
এই বই শুধু ভ্রমণের দলিল নয়, বরং এক অজানা জগতের সন্ধান। যে কেউ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রোমাঞ্চ ভালোবাসে, তার জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা।
থাংলিয়ানা! থাংলিয়ানা! ...এখন ওরা আমার ইংলিশ নামটাকে নিজেদের ভাষায় রুপান্তর করে নিয়ে স্লোগানে পরিণত করেছে অনন্য এক ভালোবাসা আর বিশ্বাসে।"
কখনো সখনো নতুন বইয়ের পাতার ভাঁজেও ভেসে আসে অতীতের গন্ধ। হুট করে মনে হয় এ যেন আমার আগেই পড়া বা আগে কখনো দেখা। অনেকটা দেজা ভ্যু এর মতো। থাংলিয়ানা আমাকে চাঁদের পাহাড়ের কথা মনে করিয়েছে। থানচির গহীনে কাটানো ৪৮ ঘন্টার স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছে। ১৮৬১ সালে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিভাগের প্রথম ডেপুটি কমিশনার হিসেবে ১৮৬৭ তে দায়িত্ব নেন থমাস হারবার্ট লুইন। তার আত্মজীবনী "A fly on the wheel" এর চাকায় চড়ে অন্য সময়ে উড়ে যাওয়ার সুযোগ "থাংলিয়ানা"।
১৭৯৮ সালে ফ্রান্সিস বুকাননের আগে বা পরে ইউরোপীয়দের পা পড়ে বাংলার পূর্ব অংশ জুড়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রামে। এতে বাস করে খিয়াং থা (নদীর সন্তান) ও তাউং থায়েরা (পাহাড়ের সন্তান)। সমতলের মানুষের কাছে এ নিষিদ্ধ অঞ্চল। অবিশ্বাস্য অলৌকিক গুজবের আধার। ১৮৬৪ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ প্রধানের দায়িত্ব নেওয়া লুইনের মনে দাগ কাটে জেলার পূর্বে থাকা নীল পাহাড়ের সারি। তাই পরের বছরই বেরিয়ে পড়েন মায়ানমারের কালাদান উপত্যকার টানে। মাতামুহুরি আর সাঙ্গুর গতিপথ ধরে তার যাত্রাপথের বর্ণনা দেখে মনে হয় তা ছিল এখনকার অমিয়াখুম, নাফাখুম জলপ্রপাতের কাছেপিঠেই। অবশ্য তার প্রথম কালাদান অভিযান শেষ হয় এক পাহাড়ির গুলিতে আহত হয়ে। আরো একবার চেষ্টা করেও কালাদানের দুর্ধর্ষ সেন্দু উপজাতিদের হাতে নাস্তানাবুদ হন লুইন।
১৮৬৭ সালে লুইন তার স্বপ্নের পার্বত্য চট্টগ্রামকে আরো কাছ থেকে দেখবার সুযোগ পান। পান এই জেলার প্রশাসকের দায়িত্ব। জেলা হেডকোয়ার্টার সরিয়ে নেন পাহাড়ের আরো গহীনে, রাঙ্গামাটিতে। সেকেন্ড বেস গাড়েন ডেমাগিরিতে (মিজোরাম)। কিন্তু যতই প্রকৃতিপ্রেমী ইংরেজ যুবক হোন তার লেখায় উপনিবেশবাদী গন্ধ লুইন লুকোতে পারেন নি। লুসাইরা ছিল সেইসময় সীমান্তবর্তী ব্রিটিশ প্রজাদের বড় হুমকি। এদের সাথে যখন কূটনৈতিক সখ্যতার চেষ্টায় এদের গ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিলেন লুইন তখন তার চোখে আমরা দেখতে পাই সেসময়কার আদিবাসীদের জীবন প্রণালী আর পাহাড়ের প্রকৃতি। আবার যখন বোমাং সার্কেল বা কালিন্দী রাণীর ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রশ্ন আসে বা ১৮৭১ সালে লুসাইদের বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের কথা তখন তার মাঝে বেরিয়ে আসে ইংরেজ প্রশাসকের খাঁটি চরিত্র।
অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্রিটিশ সম্রাজ্যের ভিতের প্রতিষ্ঠা থমাস হারবার্ট লুইন। পাহাড়িদের সরলতা, সাহসের প্রশংসা তার কলমে এসেছে বারবার, বাঙালিদের নীচতা নিয়ে লিখেছেনও খোলামেলাভাবে। পরাজিত লুসাইরা তাকে নাম দিয়েছিল থাংলিয়ানা। কিন্তু পাহাড়ের আদিবাসীদের কাছে কেমন ছিলেন তিনি? অন্য আরেকটি বইয়ের ক্রস রেফারেন্স জানাচ্ছে নিজের নামে একটা আলাদা মহল বানিয়ে তার চীফ হওয়ার ইচ্ছে ছিল লুইনের। কালিন্দী রাণী বেশ ক'বার লুইনের বিপক্ষে কলকাতায় অভিযোগ দেয়ার কথা লুইন নিজেই লিখেছেন, সাফাই জানিয়েছেন এসব ষড়যন্ত্র বলে। ১৮৭২ সালে লুইন অভিযানের সময় পাহাড়ি গ্রামের বিপুল পরিমাণে খাদ্যশস্য ধ্বংসের বর্ণনা আছে। পাহাড়ের মতো এক ফসলি জায়গায় এমন ফসল ধ্বংস দুর্ভিক্ষকে নিমন্ত্রণ করারই নামান্তর।
যদিও লুইনের দুঃসাহসী অভিযান এই বইয়ের বড় বিজ্ঞাপন। তবে অভিযাত্রী লুইনকে ছাড়িয়ে প্রশাসক লুইনও কম যান না। প্রকৃতির চমৎকার সজীব বর্ণনা আর যুদ্ধের দামমা বইয়ের আখ্যানে বিপরীতধর্মী দ্যোতনা তৈরি করেছে। বইয়ের শুরুর ১৮৬৫ তে লুইনের চোখে দেখা পর্বতের বিমুগ্ধতায় আর শেষ যুদ্ধের নামে তথাকথিত সভ্যতার নির্জন পর্বতে হানা দেওয়ায় মধ্য দিয়ে। আর এই যাত্রায় আপনার বাহন হারুন রশীদের মেদহীন অনুবাদ।
বই: থাংলিয়ানা (পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার রোমাঞ্চকর অভিযান ১৮৬৫-১৮৭২) অনুবাদক: হারুন রশীদ প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৪ মূল বই: A Fly on the Wheel লেখক: Lt. Col. T. H. Lewin প্রথম প্রকাশ: ১৮৮৫ অনুবাদ প্রকাশনা: কথা প্রকাশ দাম: Tk. 400 পৃষ্ঠা: 200 ধরন: অভিযান
আমি প্রথমেই অবাক অরিজিনাল বইটি প্রকাশিত হইছে ১৮৮৫ সালে। এই ধরনের বই পড়ার মজাই আলাদা। অনুবাদটি অসম্ভব ভালো হয়েছে। বইটি যারা পাহাড় পছন্দ করে, আদিবাসীদের জীবন ধারার প্রতি আগ্রহ আছে, ইতিহাস জানার ইচ্ছে আছে তাদের জন্য উপযুক্ত একটি বই। বইটি মূলত ১৮৬৬-১৮৭২ সাল পর্যন্ত একজন ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারেরপাহাড়ের প্রতি ভালবাসা থেকে পাহাড়ের মানচিত্র উদঘাটনের কাহিনী। উনার নাম ছিল থমাস হারবার্ট লুইন এবং পরবর্তীতে উনার নাম কিভাবে থাংলিয়ানাতে পরিবর্তিত হলো জানতে হলে বইটি পড়তে হবে।
বইটি পড়তে পড়তে আদিবাসীদের নিয়ে অনেক অদ্ভুত তথ্য জানলাম যেমন: আমাদের এই অঞ্চলে এমন আদিবাসী ছিল যারা কুকুরের মাংস রান্না করতো। নেংটি পরে থাকতো। ঐ উপজাতির নাম খুমি উপজাতি। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে নদীপথে ৬ দিন। মি: কক্স একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তার নাম থেকেই কক্সবাজার নামকরণ। মুরং প্রজাতির ধারণা ঈশ্বর যখন মাঝে মাঝে ঘুমায় তখন মানুষ মরে যায়। ঈশ্বর একটু কম ঘুমালে তারা অনেকদিন বাচতো। ঐসময়ও এই অঞ্চলের পাহাড়ে দাসপ্রথা ছিল। এইধরনের আরো অনেক আকর্ষণীয় তথ্য।
মহামনির মেলাতে তখনও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সব দোকান বাঙালিদের হাতে থাকতো অর্থাৎ বোঝা যায় তখন থেকে বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলের চিন্তায় ছিল। বাঙালিররা ওটংকে বনমানুষ হিসেবে দেখিয়ে ভালো একটা প্রদর্শনী আয়োজন করেছিল। এই বইয়ে লেখক তথা থাংলিয়ানা চেয়েছেন পাহাড়ের ঐতিহ্যকে ঠিক রেখে তাদেরকে আইনের মাধ্যমে তাদের মানবিক অধিকার গুলো ফেরত দিতে। সমতলের মানুষজন তখনও পাহাড়ীদের ঠকানোর চেষ্টা করতো এখনো করে। আমরা সবসময় চেষ্টা করেছি তাদের বাঙালি জাতি বানাতে কিন্তু আমরা কি কখনো তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে বাংলাদেশী নাগরিকের সুবিধা দিতে চেয়েছি? হয়তো বইটি পড়তে একসময় আদিবাসীদের আচরণ পাঠকের কাছে বর্বর মনে হবে কিন্তু আপনি কি কখনো চিন্তা করেছেন আপনার আচরণ তার কাছে বর্বর মনে হতে পারে। তারা শুধুমাত্র তাদের মতো থাকতে চায়। #ধূসরকল্পনা
অসাধারণ একটা বই।আমি পাহাড়ে বান্দরবান রাংগামাটি বহুবার গিয়েছি কিন্তু এভাবে হয়তো অনুভব করিনি।আমরা যাই থাঞ্চি রেমাক্রি নাফাকুম রোডে,কিন্তু সেই আমলে গিয়েছিল নাফাখুম রেমাক্রি থানচি রোড।লুসাই দের সম্পর্কে জানতাম না,এই বই পড়ে জানলাম।রতন আর ফজুল্লা খুব ইম্পর্ট্যান্ট ক্যারেক্টর থ্যাংলিয়ান এর জীবনে।বই এর শেষ বাদি বাকি পুরোটাই অনেক সুন্দর।এই বই পড়লে বুঝা যায় বৃটিশ রা কাজে কতটা গুছানো।
যথেষ্ট ইনফরমেটিভ একটি বই আবার কিছু কিছু ফেজ এ লেখক তার অভিজ্ঞতাও অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ব্রিটিশ ভারত এর চট্টগ্রামের সম্পর্কে বেশ ভালো একটা ধারণা এই বই থেকে জানা যাবে। হয়তো সেখানকার মানবজাতিদের জীবনে বাঙালীদের পদচারণা, প্রবেশ কিংবা অনুপ্রবেশ যাই বলি না কেনো তার আগে সেখানকার জনপদ ঠিক কেমন ছিলো তা লেখক এর ভাষায় সুস্পষ্ট।
আমি মূল বই ‘A FLY ON THE WHEEL’ এর কিছু অংশ পড়েছি। অনুবাদকারী মূল লেখকের লেখার অনেক অংশ ‘থাংলিয়ানা’ বইতে তুলে ধরেন নি। পরিপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা উচিত ছিল। মূল বইটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সঠিক ইতিহাস অনেকাংশে তুলে ধরেছে।
থাংলিয়ানা উরফে থমাস হারবার্ট লুইন, একজন এডভেঞ্চারপ্রেমী ব্রিটিশ কর্মকর্তার " A fly on the wheel " লেখনীতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর জঙ্গলাবৃত অঞ্চল আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর অভিযানের এক চমকপ্রদ বিবরণ হারুন রশিদের দারুণ অনুবাদে সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে।
এডভেঞ্চার প্রিয় রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্প..বেশ ভালোই লেগেছে...তবে ব্রিটিশ সরকার যদি রবার্ট লুয়ের পাহাড়ি পরিকল্পনা গুলো এক্সেপ্ট করত তাহলে হয়তো এই পাহাড়ি গোষ্ঠী গুলো অনেক উন্নত থাকত বাঙালিদের থেকে.
সাগর বেশি পছন্দ না পাহাড় বেশি পছন্দ "- খুব কৌতূহলোদ্দীপক একটা প্রশ্ন। আপনার যদি পাহাড় একটু হলেও পছন্দ হয়, পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে বা পাহাড়ে থাকতে ভালো লাগে, তবে এই বই আপনার জন্য দারুণ সুন্দর স্মৃতি তৈরি করতে পারে। এই বইটায় মূলত বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ইন্ডিয়ার বর্ডার ও তৎসংলগ্ন এলাকা, বান্দারবান, রাঙ্গামাটি, কাপ্তাই, খাগড়াছড়ি, আরাকান এরিয়া জুড়ে বিস্তৃত পাহাড়ী এলাকাতে সমতলের মানুষের প্রথম পা পড়বার সময়গুলোকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
আপনি যদি পাহাড় ভালোবাসেন, একবার হলেও আপনার মাথায় চিন্তা এসেছে, অতীতে কেমন ছিলো এই সমস্ত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা? ব্রিটিশ শাসনামলে পাহাড়ের মানুষগুলোর জীবন, সমতলের মানুষদের দুর্ধর্ষ অভিযান আর পাহাড়ের প্রকৃতির নৈসর্গিক বর্ণনা আপনাকে মুগ্ধ করবে। আপনি অবাক হবেন এই সমস্ত পাহাড়ের অনেকগুলোতে আপনার পা পড়েছে। অনেকগুলো পাহাড় আর এলাকার নাম আজো সেই আগের নামই আছে। আমার জন্য আনন্দের একটি স্মৃতি।