ঠিক যে-সময়ে মনে হচ্ছিল যে, বাংলা সাহিত্যের চলতি ধারা থেকে আজকের বিপর্যস্ত বাস্তবতা বুঝি খারিজ হওয়ার মুখে, ঠিক তখনই রমাপদ চৌধুরীর কলমে ঝলসে উঠল ‘খারিজ’।
যাকে আমরা সমাজ বলি, তার নকল আয়োজনের মাঝখানে একলা-মানুষের এমন ধূলাবলুণ্ঠিত বিপন্নতা, এবং চতুর্দিকের সাজানো সমারোহের প্রতি এমন অব্যর্থ ধিক্কার বাংলা উপন্যাসে বুঝি এই প্রথম!
‘খারিজ’ সাহিত্যের সঙ্গে জীবনের ভালবাসাবাসির এক নিবিড় আলেখ্য।
রমাপদ চৌধুরীর জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯২২। কৈশোর কেটেছে রেল-শহর খড়গপুরে। শিক্ষা: প্রেসিডেন্সি কলেজ। ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ.। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও রয়েছে একাধিক প্রবন্ধের বই, স্মৃতিকথা এবং একটি অত্যাশ্চর্য ছড়ার বই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডি লিট, ১৯৯৮৷ ১৯৮৮-তে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক ১৯৮৭। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র পদক ও পুরস্কার ১৯৮৪। শরৎসমিতির শরৎচন্দ্র পুরস্কার ১৯৯৭। রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৭১। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৩৷ তাঁর গল্পসমগ্র বইটিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃক পুরস্কৃত। হিন্দি, মালয়ালাম, গুজরাতি ও তামিল ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প। প্রকাশিত হয়েছে বহু রচনার ইংরেজি, চেক ও জার্মান অনুবাদ। তিনিই একমাত্র ভারতীয় লেখক, যাঁর গল্প সংকলিত হয়েছে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত লিটারারি ওলিম্পিয়ানস গ্রন্থে, অনুবাদ করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনটন বি সিলি৷ উপন্যাস খারিজ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে।
রমাপদ চৌধুরী নগ্নভাবে সমাজের অসংগতি তুলে ধরেন... একটু কাপড়-চোপড় দিয়ে যে সমাজের কোনো শ্রেণীর মানুষের অসংগতি/দোষ ঢেকে দিবেন সেই চেষ্টা নেই যেন।। উনি গল্পটা বলতে বলতে সাধারণভাবে বা বেশ rudeভাবে এমন কিছু কথা বলেন আমি তখন ভাবি "আরে এগুলো তো আমাকে নিয়ে বলছে" তাই হয়তো মধ্যবিত্ত নিয়ে বলেছেন----- "মধ্যবিত্ত মানুষগুলো কি ভয়ঙ্কর ক্রিমিন্যাল। বড়লোকদের মতই। বিশ্ব চরাচরে কোথায় কি অনাচার অবিচার চলছে সে বিষয়ে সব সময়ে সচেতন, শুধু নিজের গৃহকোণটির বেলায় একেবারে অন্ধ"
এই গল্পে ঘরের কর্তা জয়দীপ এবং উনার মুখে গল্পটা এগিয়ে যেতে থাকে, অর্থাৎ ফার্স্ট-পার্সন গল্পটি বলেন। তাদের বাসাতে যে চাকর ছিল পালান সে এক শীতের রাতে রান্নাঘরে ঘুমায়। সকালে উঠে যখন জয়দীপের স্ত্রী দেখলেন পালান দরজা খুলছে না, তখন জয়দীপ এসে দরজা ভেঙে আবিষ্কার করলো পালান মারা গিয়েছে।। এই নিয়েই ছোট একটি গল্প "খারিজ"
এখানে দেখা যাবে জয়দীপ নিজের সাথে অনেক কথা বলেন এবং নিজ থেকেই অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। এখানে তার আচার-আচরণ লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, পালান নামের চাকরটি মারা যাওয়ার কারণে সে শুধু ভাবতে থাকে সমাজ কি ভাবছে, তার দোষ আছে কিনা,, কিন্তু এতদিন তাদের সেবা করে আসা পালানের জন্য তার জন্য তেমন একটা শোক প্রকাশ পাচ্ছে না।। আমরা এখানে আরো দেখব জয়দীপবাবু বারবার একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে "দোষ কি আমার? আর কি কারো দোষ নেই?" আসলেই দোষটা কি তার একার?? নাকি তার স্ত্রীর, যিনি কিনা পালান যে এমন হাড়কাঁপানো শীতে পাতলা একটা কাতা গায়ে ঘুমিয়েছে সেদিকে লক্ষ্য রাখেনি?? নাকি তার বাড়িওয়ালার, যিনি কিনা ঐ রান্নাঘরে একটি ভেন্টিলেটর যে নাই সেদিকে লক্ষ্য ছিল না (ভেন্টিলেটর থাকলে হয়তো এমন হাওয়া-বাতাসের অভাবে পালানের মৃত্যু হতো না)?? নাকি পালানের বাবার, যিনি কিনা দারিদ্র্যের জন্য অল্প কিছু টাকার জন্য নিজ ছেলেকে অন্যের ঘরে থাকতে দিয়েছেন(অন্য কোনো কাজে লাগিয়ে ছেলেকে হয়তো তার সাথে রাখতে পারতো)??? বইটি পড়তে পড়তে এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি....
সর্বশেষে জয়দীপ এবং উকিল পরমেশ্বরবাবুর একটি কথোপকথন দিয়ে শেষ করছি::----- আমি ভেঙে পড়া গলায় বলে উঠলাম, "কিন্তু কাকাবাবু, দোষ কি শুধু আমার? আর কি কারো দোষ নেই?"
পরমেশ্বরবাবু, হেসে উঠলেন। বললেন, "জানো জয়দীপ, এই যে আমরা আইন নিয়ে লড়াই করি, খুজতে গেলে দেখবে যেকোনো ব্যাপারে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সবাই দায়ী। প্রথম যখন প্র্যাকটিস শুরু করি, আমার সিনিয়র বলে ছিলেন, দ্য লিগ্যাল লাই মাস্ট প্রিভেল আপন দ্য মর্যাল ট্রুথ"
বছর কয়েক আগে, এক লক্ষ্মী পুজোর সন্ধ্যায়, ইরানের চিত্রপরিচালক আসগার ফারহাদীর 'এ সেপারেশন' দেখেছিলাম। সেদিন থেকেই অস্কার বিজয়ী ছবিটা আমার সবচেয়ে পছন্দের তালিকার শীর্ষস্থানের দাবি ক্রমাগত জানিয়ে যাচ্ছে। আজকে রমাপদ চৌধুরীর এই ছোট্ট উপন্যাসখানি পড়তে বসে কেন জানি না ছবিটা বারংবার মানসপটে ভেসে উঠছে। দুটো গল্পের মূলেই সমাজ ব্যবস্থার প্রতি প্রচ্ছন্ন স্যাটায়ারের ছায়া। সম্পর্কের কূটনীতি যেখানে কোর্টপ্রাঙ্গণ অবধি গড়াতে পিছপা হয় না। মনস্তত্ত্বের সুচারু নগ্নতা যেখানে রীতিমত ভীতি উদ্রেককারী। গল্পটি তাই ভীষন সিনেমাটিক। মৃণাল সেন পরিচালিত 'খারিজ - দা কেস ইজ ক্লোজড' দেখা না থাকলেও, গল্পটির পুরোদস্তুর সিনেমাটিক সম্ভাবনা লেখকের গদ্যের নিজস্বতার জেরেই হোক, বা ঘটনাবলি সাজানোর মুন্সিয়ানার জোরেই, দিব্যি বোঝা যায়। মনে হয়, যেন কোনো সিনেমা পড়ে উঠলাম।
অবশ্য বলতে লজ্জা নেই, এই আমার প্রথম রমাপদ চৌধুরী। লেখকের নামের সাথেও পরিচিত ছিলাম না বেশ কয়েক মাস আগে। জীবনে এরকম শক্তিশালী একজন লেখকের প্রবেশ বেশ দেরিতে হলেও, খুব একটা ক্ষতি নেই। প্রবাদ বলছে, বেটার লেট দ্যান নেভার। এই উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৃত্যু। নাটকের প্রধান কুশীলব, জয়দীপ ও অদিতি এবং তাদের ছেলে টুকাই। দুশো টাকার, দেড় কামরার দুটো ঘর জুড়ে তাদের মধ্যবিত্ত অভাবের সংসার। প্রাথমিক ভাবে সৎ, কিন্তু ভীষন গতানুগতিক তাদের এই জীবনে প্রয়োজন পড়ে একজন ফাইফরমাস খাটবার ছেলের। ছোট হলেই ভালো, নিজেদের মতো করে শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া যায়। মঞ্চে তাই আবির্ভাব ঘটে, বারো বছরের গ্রাম্য বালক পালানের। কিন্তু বিপদ বাঁধে এক শীতের রাতে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে বারান্দা ছেড়ে রান্নাঘরে খিল দিয়ে শোয় পালান। এবং পরদিন আর ওঠে না।
উপন্যাসটি পুরোটাই প্রথম পুরুষে বর্ণিত, স্বয়ং জয়দীপের দৃষ্টিকোণে। তার চোখ দিয়েই আমরা উপলব্ধ করি, একঝাঁক চেনা হতাশা, ভীতি ও ক্রোধের সমন্বয়। অনুভুতিরা যেগুলো ভীষণ ভাবে মধ্যবিত্ত সমাজের একচেটিয়া। ভয় হয়। অনুভব করি অস্বাচ্ছন্দ্য। না চাইতেও যেন নিজেকে হঠাৎ দেখতে পাই উপন্যাসের আয়নায়। একটু হলেও, নিজে থেকে ইচ্ছে হয় অন্যায়গুলো কাধে নেওয়ার। মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, আত্মরক্ষনের এক সহজাত প্রবৃত্তি। জয়দীপ ও অদিতির জুতোয় না চাইতেও তাই আমাদের মত পাঠকদের পা গলাতেই হয়। এবং এখানেই উপন্যাসের সার্বিক সার্থকতা। It ends up hitting hard and close to home.
অপরাধী কে? কার হাতে ন্যায়ের বিচার? আদিম এই প্রশ্নের উত্তর নিদারুণভাবে খুঁজতে চায় আমাদের গল্পের তথাকথিত নায়কেরা। নানান দরজায় ঠোকর খেয়ে ওরা থিতু হয় না। বারংবার ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দ্বারা নিজেকে ভুলিয়ে রাখে মাত্র। এছাড়া যে কোনো উপায়ও নেই। Self preservation-এর এই ইদুর দৌড়ে, তাই একটা বাচ্চা ছেলের মৃত্যুর জন্য শোক জায়গা করে নিতে পারে না। তেরেফুরে বিরাজমান কেবল সেই ভয়। একেই বুঝি প্রকৃত অর্থে বলে সামাজিক উপন্যাস। চারপাশের সমাজকে নিংড়ে মানুষরুপি অপরাধীদের নির্যাসটুকু সঞ্চয় করে কালি কলমের জঙ্গলে হাজির করা। একাধারে ভীষন দার্শনিক, অপরপ্রান্তে সুনিপুণ লেখনীর নিবেদন। এক কথায় দারুন।
"আর আমার মনে হলো, আমি যেন একটা পোস্টমর্টেম কেস চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। অহঙ্কারী একটা মানুষ, একটা বাড়ির মালিক, একজন স্বার্থপর, অভদ্র ব্যবহারে অভ্যস্ত ব্যক্তি - তাকে ছুরি দিয়ে ফালা ফালা করে কেটে কে যেন আমার সামনে তার ছিন্নবিচ্ছিন্ন নগ্ন দেহটাকে মেলে ধরেছে। আমি তার ভিতরের সবকিছু যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।"
জয়দীপ একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত ভাড়াটে। স্ত্রী অদিতি আর একমাত্র সন্তান টুকাই কে নিয়ে বাড়িওয়ালার সাথে ভাড়াটেদের সাধারণ প্রাত্যহিক কলহবিবাদে বেশ দিন কেটে যাচ্ছিলো শুধুমাত্র অভাব ছিলো কাজের ছেলের একটা। তো কাজের ছেলে একজন জোগাড় হলো,ঘরে থাকতে ও দেয়া হলো কিন্তু একদিন সুবোধ বালক ঘরের স্বর্ণ গয়না নিয়ে পালালো। এরপর থেকে কাজের ছেলেদের রান্নাঘরের বারান্দা মূল ছ���ড়া ঘরে ঢুকতে দেয়া হলোনা। এভাবে একদিন পালান নামে বারো বছরের লাজুক কিশোরকে তার বাবা কাজ করতে দিয়ে গেলো। সব চলছিলো বেশ, হঠাৎ একদিন রান্না ঘরে পালান কে মৃত পাওয়া গেলো। এরপর থানা পুলিশ আর জয়দীপের ভিতর শুরু হলো এক দ্বন্দ্ব, সাথে সাথে এই উপন্যাসেরও।
রমাপদ চৌধুরী এই ছোট্ট উপন্যাসে মানব চরিত্রের বিশাল খুঁটিনাটি নিয়ে এসেছেন। একটা মৃত্যুর দায়বোধ থেকে শুরু হয় জয়দীপের soliloquy। ঘটনার আকস্মিকতার বিহ্বলতা কাটাবার জয়দীপের নিরাপত্তাহীনতা,সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য মরিয়া হওয়া, মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব, অতীত ঘটনার পুনরাবির্ভাব, শোক, ভয়, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ইত্যাদি সাইকোলজিক্যাল এনালাইসিসের সাথে সাথে সামাজিক রীতি, মানুষের পারস্পারিক নির্ভরশীলতা, সত্যিকার বাস্তবতা প্রভৃতি এই উপন্যাসে চমৎকার ভাবে চিত্রিত হয়েছে। উপন্যাস পড়ার পর পাঠক খারিজ হবে অনেক কিছু থেকেই কিংবা খারিজ করা হবেনা পাঠককে কোন কিছুই থেকেই!
রমাপদ চৌধুরী'র প্রথম বইটি যেটা পড়েছিলাম সেটা পড়ার অভিজ্ঞতা সুখকর ছিলোনা।কিন্তু এই বই পড়ে শ্রদ্ধা আসলো উনার প্রতি। রমাপদ চৌধুরী নিশ্চয় আরো পড়বো। Nayeemul Arefin ভাই কে ধন্যবাদ সাজেস্ট করবার জন্য।
বাড়ি বদলে যাওয়ার মতো বদলে যাওয়া মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার স্যাপার ছোট পরিসরে কয়েকটি পাতায় আঁকার মুন্সীয়ানায় মুগ্ধ রাখার এক আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে রমাপদ রায় সাতচল্লিশ বছর আগেই লিখে গেছেন চকচকে ফকফকা আলোর ভিতরকার অন্ধকারের আলোকচিত্র।
খিদের জ্বালা জুড়াতে একাল সেকাল সব কালেই কচি কচি হাতে হাড়ভাঙা খাটুনির দায়িত্ব পরিবার কিছুটা দায়ে পড়ে কিছুটা স্বভাব দোষে দুপয়সার দান দুহাত পেতে নিয়েছে।
আসছে বছর বাড়ি যাবে-এ প্রত্যাশার প্রতিশ্রুতি বরাবরই মাসান্তে বেতন সমেত বিদায় নেওয়া পালানদের পিতার প্রিয় বুলি হয়ে এই বিশ্ব চরাচরে যুগান্তরের দুর্বিপাকে ঘুরছে দিবারাত্রি।
জয়দীপরা হয়ত সামান্য মর্মপীড়ায় ভুগে এই মর্মান্তিক ঘটনাতে, কিছু দিন লোক বাঁচিয়ে চোখ এড়িয়ে চলতে থাকা জীবনে সন্তানহারা হারানের সাথে হায় প্রকাশ করে ঠিকই। কিন্তু টনক নড়তেই পলকের মধে্যই পথ পাল্টে উকিল বাড়ি মাড়িয়ে ডাঃ খানা পেরিয়ে খুনের খানাখন্দ থেকে পার পাওয়ার রাস্তাখানি ঠিকই পরিস্কার করে ফেলে দিনশেষে।
পালানের মৃত্যু কার্বন মনোঅক্সাইডের ধুঁয়ায় না অদিতির উপেক্ষায় অবহেলায় প্রবল শীতে ধুঁকে ধুঁকে প্রাণপ্রদীপ নিভে যায় তাতে কারো কি বা আসে যায়। কোর্টের it was a case of plain and simple accident রায়ের আড়ালেই চাপা পড়ে যায়।
এতদিনের অপরাধবোধের সমাপ্তি উপহাসে উপসংহার দেয়।কে জানে আরো কত যুগ ধরে এভাবেই খারিজ হয়ে যায় কতশত পালানের প্রস্থানের নেপথ্যে মূল হেতু।
বাঙালি মধ্যবিত্তের গা বাঁচিয়ে চলার পলায়নপর মনোবৃত্তিকে রমাপদ চৌধুরীর মতো আর কেউ বুঝতে পারেননি। তিনি এমনভাবে মধ্যবিত্তের দায় ও একমাত্র নিজেকে রক্ষা করার দরদকে বইয়ের পাতায় তুলে ধরেন যে, মনে হয় এর চাইতে বাস্তব আর কিছুই হতে পারে না। তারই একটি অত্যুত্তম দৃষ্টান্ত 'খারিজ'।
শিশু শ্রম নিষিদ্ধ। তবে তা গল্পের কাজির গরুর মতো কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। আর, অনেক বাড়িতেই গৃহকর্মী হিসেবে শিশুদের দেখা যায়। এমনই একজন শিশু গৃহকর্মী দশ কিংবা বারো বছরের পালান। তার বাবা দারিদ্র্যের যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে তাকে জয়দীপ স্যানাল-অদিতি স্যানালের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে দিয়ে গেছে। এক শীতের ভোরে এই পালানকেই দেখা গেল, পাকঘরের ছিটকিনি আটকে সেখানে মরে পড়ে আছে। রাতে সিঁড়ির নিচে ঘুমায় পালান। তবে শীতের তীব্রতায় সেখানে থাকতে পারেনি। তাই হয়তো ঘুপচি রান্নাঘরে দুয়ার আটকে ঘুমিয়েছিল। আর ওঠেনি। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই এক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয় গৃহকর্তা জয়দীপ স্যানাল, গৃহকর্ত্রী অদিতি স্যানাল ও তাদের বাড়িওয়ালা। এই মৃত্যুর ঘটনায় তারা দায়ী হতে পারে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়।
মানবিকতা নয় বরং মধ্যবিত্তের ভয় তাকে নিয়ে অপরে কী বলবে, পুলিশ ধরবে কি না, আদালতে কেমন হবে ইত্যাদি।
রমাপদ চৌধুরী এক অসামান্য লেখক। তাঁর উপন্যাসগুলোর কলেবর ছোটো। কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। ভাষার কারুকাজ নেই। সহজবোধ্য অথচ গভীর বার্তাবহন করে তাঁর উপন্যাসগুলো। এমনই একটি লেখা 'খারিজ'।
মধ্যবিত্ত সমাজের সেই মানুষগুলো যারা প্রতিনিয়ত মুখে ভদ্রলোকের মুখোশ আঁটার চেষ্টা করছেন লেখক রমাপদ চৌধুরীর সৃষ্টি খারিজ (১৯৭৪) বইটি সেই সমাজের সামনের বিবেকের দর্পণের মত।
পালান নামের একটি শিশু ভৃত্যের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কাহিনীর সূত্রপাত। বদ্ধ রান্নাঘরে একাকী দমবন্ধ হয়ে ধুকে ধুকে মারা যায় ১২ বছরের পালান। আর এই মৃত্যুকে ঘিরে মালিক জয়দীপের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণ এবং মানসিক দায়বদ্ধতাকে নিয়ে বিস্তার লাভ করেছে উপন্যাসটি।
পালানের মৃতদেহ আবিষ্কারের পর থেকে মালিক জয়দীপে চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ান কিভাবে এই মৃত্যুর সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সে নিষ্কৃতি পাবে। জয়দীপের এই চিন্তা বস্তুত পুরো সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করে। যারা মানুষের জীবন থেকে অভিযোগের ভয়কে বেশি আমল দেয়।
একটি শিশুর মৃত্যু হলে আর সে চাকর হলে, মালিকের মনে প্রথম যে চিন্তা উঁকি দেয় সেটা হলো কিভাবে এই ঝামেলা থেকে খুব সহজে মুক্তি পাওয়া যাবে। একটি শিশু, একটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একটি চিন্তার জগত হয়েছে বিলুপ্ত, মুছে একটি পার্থিব স্বত্বার অস্তিত্ব। তবুও মালিকের কাছে এই আবেগ মূল্যহীন। মৃতদেহটি তখন উটকো ঝামেলা। উকিল, ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে, প্রয়োজনে পুলিশকে টাকা খাইয়ে যত দ্রুত এই অযাচিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে তত তাড়াতাড়ি মিলবে শান্তি।
কত সহজে একটি মানুষের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায়। কারণ মালিক উঁচু শ্রেনী আর ভৃত্য নিচু শ্রেনীর। ভৃত্য মারা গেলেও কোন দুঃখ নেই অথচ মালিকের সন্তান মৃত্যু থেকে ভয় পেলেও প্রচণ্ড সতর্কতা। অথচ যে মানুষটি মারা যাও সেও কারও না কার সন্তান। কারও না কারও স্বপ্ন।
বাংলা সাহিত্যের সেরা সাহিত্যগুলো বেশিরভাগ রচনা হয়েছে গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে। গ্রামীণ জীবনের দারিদ্রতা কষাঘাতে যে নির্মমতা লুকিয়ে আছে সেটা যেমন উপেক্ষা করা যায় ঠিক নয় তেমনি শহর জীবনের ভাঁজে ভাঁজে যে অন্ধকার লুকিয়ে সেটাকেও অবজ্ঞা করার উপায় নেই।
লেখক রমাপদ চৌধুরী তাঁর খারিজ উপন্যাসে শহরের ভদ্র পরিবারগুলোর মনস্বত্তে লুকিয়ে থাকা সেই অন্ধকারের খোঁজ দিয়েছেন। যেখানে আমরা দেখতে পাই মানবিক হওয়া আর নিজেকে মানবিক ভাবা ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
কোনো অ্যাক্সিডেন্ট কি আসলেই অ্যাক্সিডেন্ট? নাকি কেউ বা কারা কোনো না কোনো ভাবে, কোনো কাল আগে ওই ঘটনার বীজ বপন করেই রাখে, এবং আমরা সবাই সেই বীজের ফসল দিনের পর দিন বহন করে চলেছি। আত্ম উপলব্ধির এক বড়ো প্রতীক হলো এই বইটা। সব থেকে সেরা ছিল এটার উপসর্গ - "পালান, তোরা যেদিন পড়তে শিখবি সেদিনের আশায়" এটা রমাপদ চৌধুরীর লেখা আমার প্রথম ���ই। অসাধারণ লেগেছে আমার ওনার লেখা।
পালান্ নামে বারো বছরের এক কাজের ছেলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে খারিজ উপন্যাসটি রচিত হয়। তবে খারিজ পালানের মৃত্যুকে ঘিরে যতটুকু না রচিত তার চেয়ে বেশি পালান্ যে লোকের(জয়দীপ) বাড়িতে কাজ করতো তাকে কেন্দ্র করে রচিত। জয়দীপ যেন প্রতিটা মধ্যবিত্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি। লেখক রমাপদ চৌধুরি তার লেখাতে মানুষের ভেতরে চলা অন্তর্দ্বন্দকে যেভাবে তার লেখায় ফুটিয়ে তোলেন তা পাঠকের অন্তরে আঘাত করতে বাধ্য। জয়দীপ যেন সমাজে বাস করা সকল মধ্যবিত্ত ভাড়াটে গৃহস্বামীর প্রতিরূপ। তাই তার ভৃত্যের মৃত্যু হেতু জয়দীপের মনে যে ভয়, কাপুরষতা, ক্ষোভ জমা হয় তা আর চারটা মানুষের মনেও জমা হয়। জয়দীপ যেন এইখানে তাদের প্রতিচ্ছবি। জয়দীপে বিপদে কাউকে অবলম্বন করতে চাও সেই দিকটাকেই প্রতিফলিত করে।
রমাপদ চৌধুরীর 'বনপলাশীর পদাবলীর' পড়ার অনেক দিন পর আরেকটা বই পড়লাম। খারিজ। ছোট্ট একটা উপন্যাস। কিন্তু কি গভীর ভাবে দাগ কেঁটে গেলো মনে। জয়দীপ-অদিতির আর তাদের ছেলে টুকাইকে নিয়ে তাদের মধ্যবিত্ত ছোট্ট সংসার। সেই সংসারে তাদের কাজের জন্যে আরেকটি প্রাণী আসে, নাম তার পালান। তার বয়েস এগারো কি বারো হবে। ঐ টুকাইয়ের বয়সী। টুকাইয়ের সঙ্গে তার ভীষণ ভাব। টুকাইও তাকে ভীষণ পছন্দ করে। হুট করে, এক শীতের রাতে পালান মারা যায়। তারপরই শুরু হয় মূল কাহিনী। পালানের মারা যাওয়াকে কেন্দ্র করে জয়দীপ-অদিতির মধ্যবিত্ত সংসারে শুরু হয় এক ঝড়, সে ঝড় যতটা না বাজ্যিক, তার চেয়েও বেশি মনস্তাত্ত্বিক। জয়দীপ আর অদিতির মনোজগতের এই তোলপাড়কেই রমাপদ চৌধুরী এক শৈল্পিক বয়ানের মাধ্যমে সমাজের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছেন কতগুলো প্রশ্ন। সে প্রশ্নই পাঠকের ভাবনার জগতে তুলবে এক কালবৈশাখী। পাঠক উত্তর খুঁজবে হন্যে হয়ে। হুট করে এমন একটা ভালো বই আবিষ্কার করতে পেরে বেশ ভালো লাগা কাজ করছে।
মাত্র ৬৭ পৃষ্ঠার একটা বই কিন্তু কি দারুণভাবে লেখা। অদিতি আর জয়দ্বীপের সংসারের কাজের ছেলে হলো পালান। একদিন সকালে রান্নাঘরে পাওয়া যায় তার মৃতদেহ। অতঃপর শুরু হয় তার মৃত্যুকে ঘিরে তদন্ত। সেই তদন্তে যা বেরিয়ে আসে তা থ্রিলারের এন্ডিং এর মত চটকদার না হলেও মস্তিষ্কের চিন্তাকেন্দ্রে আঘাত হানার মত অবশ্যই। আদতে সামাজিক ঘরানার উপন্যাস হলেও লেখকের লেখনী এমন যে পাতার পর পাতা না উল্টিয়ে পারা যায় না। সবাইকে পড়তে বলার মত বই এটা।
রমাপদ চৌধুরী কে চিনেছিলাম "বাড়ি বদলে যায়" পড়ে। তখন-ই বুঝেছিলাম,এই লোক রত্ন। আমার ধারণা ভুল নয়,তার প্রমাণ তার আরো একটা উপন্যাস শেষ করে। নাম "খারিজ"। অসাধারণ একটা উপন্যাস। মানুষের নিচুতা,নির্মমতা,স্বার্থ চিন্তার কি ভয়াবহ রূপ হতে পারে,তার ঝলক আমরা দেখতে পাই " খারিজে"।
একটি বারো বছরের কাজের ছেলের অস্বাভাবিক মৃত্যু দিয়ে গল্পের শুরু। আর তাকে কেন্দ্র করেই একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের নানা টানাপোড়েনের গল্প এই খারিজ। অদ্ভুত সুন্দর।
বারো বছর বয়সী গৃহকর্মী পালান এক রাতে মারা যায় জয়দ্বীপদের ফ্ল্যাটের ছোট্ট রান্নাঘরে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে আর কার্বন মনোক্সাইডের বিষাক্ত ধোঁয়ায়। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে যা হয়; পুলিশ আসে, পাড়াময় আলোচনা শুরু হয়। সাথে সাথে একদিকে শুরু হয় পালানের লাশ কাটাছেঁড়া আর দাহ করার আয়োজন ও পুলিশি তদন্ত আর অন্যদিকে জয়দ্বীপ-অদিতি দম্পতি ও বাড়ির মালিক নটবর রায়ের মামলা থেকে নিজেদের বাঁচানো ও সামাজিক অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখার যৌথ প্রয়াস। আর একপর্যায়ে এই দুই বিপরীতমুখী ধারা একে অপরের মুখোমুখি হয় করোনারের কোর্টে।
মাত্র ৬৬ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস। ‘ এতে লেখক আর কি বলবেন' এটা ভেবে যদি বইটা না পড়েন তাহলে বড় ধরণের ভুল করবেন। আমি এই ভুলটা করিনি কেননা আমি এর আগেই লেখকের শ’খানেক পৃষ্ঠার ‘ বাড়ি বদলে যায়' বইটা পড়েছিলাম। বলা বাহুল্য যে ঐ ছোট্ট বইটা পড়েই মুগ্ধ হয়েছিলাম লেখকের বিষয়বস্তু নির্বাচন, ভাষার শক্তি আর সমাজের ব্যবচ্ছেদ দেখে। আর তাই এই বইটা নিয়েও আমার খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল। আর সত্যি বলতে, পুরোপুরি মিটেছে সে প্রত্যাশা।
এককথায় বললে গেলে বইটা আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের মুখোশ উন্মোচন করেছে। মধ্যবিত্ত সমাজ যে কত ধরনের মুখোশ পরে থাকে তার প্রতিটা খুলে খুলে দেখিয়েছেন লেখক। রাস্তার ভিখারিটাকে নিয়ে তো আমরা চিন্তিত কিন্তু নিজের গৃহকর্মীকে নিয়ে? অপরাধমুক্ত সমাজ তো চাই কিন্তু নিজে অপরাধ করলে? ধনীরা আমাদের ঠকায় বলে চেঁচাই তো বটে কিন্তু গরীবদের আমরা কি করি? ধনীরা সিস্টেম ব্যবহার করে আমাদের উপরে উঠতে দিচ্ছে না বলে হতাশ হই কিন্তু গরীবদের জন্য কি আমরা রাস্তা ছেড়ে দিই? মানবিক বলে তো নিজেদের দাবি করি কিন্তু কতটা মানবিক আচরণ করি? বইটা পড়তে পড়তে এই প্রশ্নগুলোই বারবার মাথায় আসে।
নিজেকে দায়ী ভাবা, নিজেকে অপরাধী ভাবতে মানুষ যে কতটা অনিচ্ছুক সেটা দেখা যায় জয়দ্বীপদের মাধ্যমে। তাইতো চাকরের মৃত্যুর দায় সে নিতে চায় না ; দায় চাপাতে চায় স্ত্রীর উপর, বাড়িওয়ালার উপর, পালানের বাবার উপর বা সমাজের উপর। আর এই দায় চাপানোর রাজনীতি করতে গিয়ে সে পুলিশকে বা ডাক্তারকে হাত করতে চাওয়া, চিরবৈরী বাড়িওয়ালার সাথে জোট গঠন করা – কোনোকিছু করতেই সে পিছুপা হয় না। নিজের স্বার্থরক্ষায় মশগুল জয়দ্বীপ পালানের লাশটাকে লাশও ভাবতে পারে না, লাশটাকে তার কাঁধে চেপে বসা ভারী বস্তা মনে হতে থাকে তার। এই যে আমাদের নিজেকে দায়মুক্তি দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা – এটাই লেখক দেখিয়েছেন জয়দ্বীপের মাধ্যমে।
এক প্রচণ্ড শীতের রাতে দম বন্ধ হয়ে মারা যায় জয়দীপ সান্যাল ও অদিতি সান্যাল দম্পতির বাড়ির কিশোর পরিচারক পালান্। এই ঘটনার পর আসন্ন সংকট সম্বন্ধে জয়দীপের দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা আর ভয় থেকে উঠে আসে তার অতীত জীবনের নানা ঘটনা। আর আমাদের সমাজ সম্বন্ধে একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।
পালানের মৃত্যুর পর স্থানীয় থানার এসআই যখন পরিদর্শনে এসে বলেন,‘আই সি, ভেন্টিলেটর নেই?’, তখন জ���়দীপ উপলব্ধি করে, আসলে আমাদের সমাজের কোথাও কোনো ভেন্টিলেটর নেই যেখান দিয়ে একটু মুক্ত বাতাস আসতে পারে। পালানের তোষক তুলে এসআই যখন ঘৃণাভরে বলেন, ‘কী ডার্টি রে বাবা!’, সেটা আসলে প্রচ্ছন্নভাবে আমাদের সমাজব্যবস্থাকে ইঙ্গিত করে।
শেষমেশ এই কেসটা খারিজ হয়ে যায় কারণ আদতে কেউ দোষী নয়। এমনকি পড়ার সময় পাঠকও কারও দোষ বের করতে পারবেন না। কেস থেকে মুক্তির পরই জয়দীপ তার বাড়ির কিশোর চাকরের জন্য প্রকৃত দুঃখ অনুভব করে। পালানের মৃত্যুর পর জয়দীপ তাকে ভয় পাচ্ছিল এই ভেবে যে পালান্ তাকে বুঝি বড় কোনো বিপদের সামনে ফেলে গেল। কিন্তু বিপদ থেকে মুক্তির পরই তার মনে দুঃখবোধ আসে এবং করোনারের বলা শেষ কথা ‘দি কেস ইজ ক্লোজ্ড’ তার কাছে উপহাসের মতো মনে হয়।
এই কেস নিয়ে ছোটাছুটির সময়ই জয়দীপ এডভোকেট পরমেশ্বরবাবুর কাছে শুনতে পায় এক নির্মম সত্য, ‘একটা মানুষের মৃত্যু, আমাদের দেশে একটা মানুষের জীবনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
This has become my favourite Bangla book. Great social commentary. Maybe I am sensitive but I cried reading this 🤨 Who should we blame for Pathans death? This story will have a different perspective to different people.
#পাঠকের_চোখে বই ~ ♦#খারিজ♦ লেখক ~ #রমাপদ_চৌধুরী প্রকাশক ~ আনন্দ পাবলিশার্স মূল্য ~ ১০০ টাকা
শ্রদ্ধেয় রমাপদ চৌধুরী যখন এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন, তার দশ বছর বাদে আমি পৃথিবীতে আসি। আর তারও চৌত্রিশ বছর পর আজ পড়লাম "খারিজ"। বিশ্বাস করুন, একটুও বানিয়ে বলছি না, মনে হল আয়নায় নিজেকে দেখলাম অনেকদিন পর। এক নিশ্বাসে দু ঘন্টার মধ্যে পড়ে শেষ করে ফেললাম প্রায় ২২,০০০ শব্দের এই উপন্যাস, আর মনে হল লেখক ম্যাজিক জানতেন। নয়তো একটা গল্পের মধ্যে মানুষের এতগুলো ইমোশন এমন নিখুঁতভাবে এঁকে দেওয়া কোনও সাধারণ লেখকের পক্ষে সম্ভব নয়। "খারিজ" তাই হয়ে রইল 'সাহিত্যের সঙ্গে জীবনের ভালোবাসাবাসির এক নিবিড় আলেখ্য'।
যাঁরা এই উপন্যাসটি পড়েননি, তাঁদের মধ্যে অনেকেই হয়তো মৃণাল সেনের নির্দেশনায় ১৯৮২ সালে রিলিজ হওয়া সিনেমাটি দেখে থাকবেন, যা এই বইয়ের ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছিল। অঞ্জন দত্ত, মমতা শঙ্কর ও শ্রীলা মজুমদার অভিনীত সেই সিনেমাটি রিলিজের পরের বছরই জিতে নিয়েছিল তিনটি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ও কান ফিল্মোৎসবের জুরি সম্মান। রমাপদবাবুর লেখা পড়তে গিয়েই মনে হল যেন একটা সিনেমা দেখে উঠলাম।
"যাকে আমরা সমাজ বলি, তার নকল আয়োজনের মাঝখানে একলা-মানুষের এমন ধূল্যবলুণ্ঠিত বিপন্নতা, এবং চতুর্দিকের সাজানো সমারোহের প্রতি এমন অব্যর্থ ধিক্কার বাংলা উপন্যাসে বুঝি এই প্রথম।"
বইয়ের ব্যাক কভারে প্রকাশকের লেখা এই লাইন কটা দেখেই বুঝতে পারবেন যে ১৯৭৪ সালে এমন ঘরানার লেখা সেই সময়ের চলতি ধারার থেকে বেশ আলাদা ছিল। তবে প্রায় চুয়াল্লিশ বছর পর আজও মনে হল উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এভাবেই বোধহয় বড় লেখকদের আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়। তাঁদের সৃষ্টি যুগ যুগ ধরে অমর থাকে।
কাহিনীর মূল চরিত্র জয়দীপ সেন একজন সৎ চাকুরিজীবী। যারা ঘুষ খায়, তাদের মনে মনে ঘৃণা করেন। চটপট শুয়ে পড়েন আর দেরি করে ওঠেন৷ তবে সোয়া আটটার মধ্যে উঠে টুকাইকে স্কুলের জন্য তৈরি করতে জয়দীপের স্ত্রী অদিতিকে অনেক ভোরেই উঠতে হয়। টুকাই হচ্ছে জয়দীপ ও অদিতির একমাত্র ছেলে। দুশো টাকা ভাড়ায় দেড় কামরার এই ঘরে শান্তিতে সংসারযাপনে সাহায্য করে আর একটি বারো বছর বয়সী ছেলে। নাম তার 'পালান্'। জয়দীপদের বাড়িতেই সে থাকে, টুকাইয়ের দেখাশুনা করে, ফাইফরমাস খাটে, আর মাসের শেষে এই কাজের বিনিময়ে গ্রাম থেকে তার বাবা হারান এসে কুড়িটাকা পারিশ্রমিক নিয়ে যায়। পালান্-এর এই অদ্ভুত নামের মানে আমরা জানতে পারি ওর বাবা হারানের মুখে। "ছেলে ঐ একটাই। দু-দুটো হয়ে মরে গেল, ওর ঠাকমা বললে, নাম রাখ পালান্। তবে যদি ভগবান রাখে।তা জন্মের পর ওর মা'টাই পালালো। বড় আকাল যাচ্ছে, ঘরে ভাত নাই। আপনার ইখানে চাট্টি খেতে পাবে, মাইনা পাবে। এই বাজারে পাঁচ পাঁচটা হাঁ, নিজেরই ভাত মেলে না।"
বাড়িওয়ালা রায়বাবু মানুষটি এদিকে সুবিধের নন। তিনি বিস্তর চেষ্টা করে যান যাতে পুরনো ভাড়াটে তুলে দিয়ে নতুন কাউকে এনে বেশি ভাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু গল্পের আসল শুরু হয় যখন একদিন সকালে অদিতি পালান্-কে ওর রোজকার শোওয়ার জায়গা বারান্দায় খুঁজে না পেয়ে খেয়াল করে রান্নাঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কিন্তু অনেকবার "পালান্ পালান্" বলে চেঁচিয়েও যখন সাড়া মেলে না, তখন জয়দীপকেও ঘুম থেকে উঠতে হয়। বাড়িওয়ালা রায়বাবুও নেমে আসেন চেঁচামেচি শুনে এবং রান্নাঘরের দরজায় লাথি মেরে খুলতেই তিনজনেই হতবাক হয়ে যায়। ওদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে এক চরম বিপদ, যা উপন্যাসের বাকি অংশের চালিকাশক্তি হয়ে পাঠককে টেনে ধরে রাখে শেষ পাতা অবধি।
ঘটতে থাকা বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়েই জয়দীপের মনের নানান উপলব্ধি, চিন্তা, বুদ্ধি, ভয় যেন আমাদেরই মনের কথা বলে চলে। প্রত্যেক পাতায় মনে হয় জয়দীপ বা অদিতি কি আমি নিজেই? লেখক কিভাবে জানলেন যে আমরা বিপদের মুহূর্তে ঠিক এইভাবেই ভাবনাচিন্তা করি! ঘটনার মূল ইমোশন থেকে সরে এসে নিজের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করতে থাকি! অদ্ভুত দক্ষতায় লেখক একের পর এক এনে হাজির করেন উকিল পরমেশ্বরবাবু ও তার অধীনে কাজ করা শ্যামলীকে। কে এই শ্যামলী? কী সম্পর্ক তার জয়দীপের সাথে? অদিতিকে সে কি চেনে? বদলে যেতে থাকে চরিত্রগুলি। বদলে যেতে থাকে প্রত্যেকের চিন্তাধারা। পালান্-এর বাবা হারান কিভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন? জয়দীপের কলিগ রাধানাথের উপস্থিত বুদ্ধি কি পারে জয়দীপকে এক কালিমাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের হাত থেকে বাঁচাতে?
উত্তর পেতে হলে একবার অবশ্যই পড়ুন অসাধারণ এই উপন্যাস। নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন। বইটির ষষ্ঠ মুদ্রণ ২০১৬ তে। যখন কাহিনীর শেষ অনুচ্ছেদে জয়দীপ বুঝতে পারে পালান্-এর জন্য তার আবেগ কতটা, তখন পাঠক হিসেবে এক ফোঁটা চোখের জল হয়তো সেই বারো বছর বয়সী ছেলেটার জন্য নিবেদন করতে বাধ্য হবেন। আর তাই রমাপদ বাবু এই বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর গল্পের চরিত্রকেই, বা হয়তো পালান্-এর মতো ছেলেদের। বইয়ের শুরুতেই চোখে পড়বে সেই লাইন।
খারিজ রমাপদ চৌধুরী আনন্দ পাবলিশার্স মোট পৃষ্টা : ৫৯
অদিতি আর জয়দীপের মধ্যবিত্ত সংসারের গল্প! আর দশজন সাধারণ চাকুরীজীবী পুরুষের মত জয়দীপ নির্ঝঞ্ঝাট জীবন পছন্দ করে, পছন্দ করে শীতের সকালে বেলা পর্যন্ত লেপের ওম নিয়ে শুয়ে থাকতে! অদিতি আর জয়দীপ প্রেম করে বিয়ে করেছিলো আর টুকাই তাদের একমাত্র সন্তান, বিয়ের পর অদিতি অনেক গুছিয়ে জয়দীপের কাছে একটা কাজের ছেলে চায় ছোট্ট ছেলে, ফায়ফরমাস খাটবে ইত্যাদি ইত্যাদি! জয়দীপ কথা রাখে কিন্তু পর পর দুইজন কাজের ছেলে চলে যায় এর মধ্যে একজন আবার চুরি করে পালিয়ে যায়! এমতাবস্থায় প্রতিবেশীর সাহায্যে ছোট্ট এক গ্রাম্য ছেলে যার নাম পালান সে আসে জয়দীপ আর অদিতির বাড়িতে, ছেলেটির বৃদ্ধ বাবা অভাবের ঘরে ছেলেটিকে রাখতে না পেরে মাসিক ২০ টাকা মাসিক বেতনে রেখে যায় তার নতুন কাজের জায়গায়, বাবুদের বাসায় থাকবে কাজ করবে খাবে, চিন্তার কি আছে! পালান রয়ে যায়, বন্ধুত্ব হয় প্রায় তারই সমবয়সী টুকাইয়ের সাথে! এক শীতের সকালে অদিতি রান্নাঘরের দরজায় আঘাত করে পালানকে ডেকেও কোন উত্তর পায় না, ভয় পেয়ে সে জয়দীপকে ডেকে আনে, বাড়িওয়ালা এসে দরজা ভেঙে ফেলেন, এখান থেকেই মূল গল্পের শুরু।
আমার কথা : এত ছোট্ট পরিসরে যে এত কিছু প্রকাশ করা সম্ভব তা না পড়লে বুঝতেই পারতাম না, আবেগ, নিজের ভেতরের চাতুরী, নিজেকে বিবেকের কাঠ গড়ায় দাড় করিয়ে নিজের বিচার করা! এক কথায় আমি মুগ্ধ! জাদুকরী লেখনী! আমার রেটিং : ৪.৫। হ্যাপি রিডিং।