রামতারণের অভাবের সংসারে অন্ধের যষ্টি নিধিরাম রায়চৌধুরী। নামের ভার আর বংশীয় ব্রাহ্মণ পরিচিতি যতই প্রবল মনে হোক না কেন দারিদ্র্যের পরাকাষ্ঠায় ধূসর জীবনে রঙের আঁচড় লাগেনি কখনও। মোক্তারি পাশ করে সবেমাত্র কর্মস্থলে পদচিহ্ন রাখতে শুরু করেছে নিধিরাম। অভিষেকেই হাকিমের স্নেহভাজন হিসেবে তার সংসর্গ আদালতপাড়ায় জন্ম দেয় নীরব রটনা। এর নেপথ্যে রয়েছে নিধিরামের প্রতিবেশী লালবিহারী চাটুয্যের কন্যা ষোড়শী মঞ্জু। লালবিহারী চাটুয্যেও পেশাগত জীবনে ছিলেন একজন মোক্তার। সময়ের পালাবদলে প্রতিপত্তি লাভের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। পারিবারিক, মানসিক তথা সামাজিক জীবনে ধনী-দরিদ্রের এই অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের টানাপোড়েনকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শব্দের তুলিতে অঙ্কণ করেছেন দুই বাড়ি শীর্ষক উপন্যাসে।
Bibhutibhushan Bandyopadhyay (Bangla: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bangali author and one of the leading writers of modern Bangla literature. His best known work is the autobiographical novel, Pather Panchali: Song of the Road which was later adapted (along with Aparajito, the sequel) into the Apu Trilogy films, directed by Satyajit Ray.
The 1951 Rabindra Puraskar, the most prestigious literary award in the West Bengal state of India, was posthumously awarded to Bibhutibhushan for his novel ইছামতী.
"দুই বাড়ী" সরলরৈখিক প্রেমের গল্প। নায়ক নিধু গরিব, নায়িকা মঞ্জু জজসাহেবের মেয়ে। এটুকু পড়লে যে নাটকীয়তার আশঙ্কা পাঠক করতে পারে তার কিছুই উপন্যাসে নেই। কাহিনি পুরোটা এগিয়েছে নিধুর হাত ধরে। তার সংকোচ, ধীরে ধীরে প্রেমে পড়া, দ্বিধা, আশঙ্কা সবকিছু বিভূতি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর প্রতিটা মানুষ এতো জীবন্ত! আমার মনে হচ্ছিলো, বইটা আকারে অনেক দীর্ঘ হলেও ক্লান্তিহীনভাবে এদের বৃত্তান্ত পড়ে যাওয়া যেতো। তারপরও "দুই বাড়ী" যে মহৎ সাহিত্য নয়, তার কারণ শেষ অংশে বিভূতির "অ-বিভূতি"সুলভ তাড়াহুড়ো। কিন্তু নিধু ও মঞ্জুর অসহায়ত্ব পাঠক হিসেবে আমাদের আক্রান্ত করে। নিধুর মতো তীব্র এক শূন্যতা ঘিরে ধরে পাঠককে। এখানেই লেখকের সার্থকতা।
দুইটা বাড়ি। সেখানের মানুষজনের পোশাক আশাক, খাবার এক কথায় চাল চলনে আকাশ পাতাল তফাত। কিন্তু সেই দুই বাড়িকে একসাথে করেছে সে মানুষগুলোর ব্যবহার। মঞ্জু আর নিধুর এই সম্পর্কটা একটা সেতুবন্ধন হিসেবে ছিল পুরো সময়। দুদণ্ড গল্প করা প্রতি সপ্তাহের ঐ একটা দিনের জন্য অপেক্ষা, উদ্বেগ সবই যেন বুঝা যাচ্ছিলো প্রতিটা অক্ষরে। গ্রাম্য পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়া মোক্তার লালবিহারীর পরিবারের সাথে নিধিরামের পরিবারের সম্পর্কটা এতো ভালো লেগেছে।
অনেক জায়গায় দেখা যায় উল্টো চিত্র। সবলরাই যেন দুর্বলের উপর চড়াও থাকে। কিন্তু এখানে সেগুলো দেখিনি। বেশ উপভোগ করেছি গল্পটা। সমাপ্তিটাই শুধু বলে গিয়েছে 'শেষ হয়েও হইলো না শেষ।'
গরিবের ছেলের সঙ্গে ধনীর দুলালির ভাব-ভালোবাসা নিয়ে অগণিত বই লেখা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। সেই বিবেচনায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "দুই বাড়ী" উপন্যাসের কাহিনি অতিপরিচিত। তবুও ধনীর কন্যা মঞ্জুর সঙ্গে দরিদ্র সন্তান নিধুর সম্পর্ক নিয়ে এই উপন্যাস আশ্চর্যরকমের সুখপাঠ্য। সম্ভবত এই কৃতিত্বের সবটাই বিভূতিবাবুর সারল্যমাখা লেখনীর গুণ।
গাঁয়ের দরিদ্র ঘরের সন্তান নিধু। বামুন হলেও তাদের মান নেই। কারণ সংসারের অভাবের তাড়নায় নিধুর পরিবারকে হরহামেশাই লোকের কাছে ধার-কর্জ করতে হয়। সময়মতো তা শোধ করতে পারে না। তাই অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে। মোক্তারি পাস করে বসে আছে নিধু। এখনো আয়ের কোনো বন্দোবস্ত হয়নি।
নিধুর পাশের বাড়িটি মুনসেফ লালবিহারীবাবুর। তারা ধনাঢ্য। সরকারি কর্মকর্তা লালবিহারী গাঁয়ে আসেন না। তার বাড়িখানা খালিই পড়ে থাকে। একদিন সপরিবারে তিন মাসের ছুটি নিয়ে স্বগ্রামে এলেন লালবিহারীবাবু। তারই নবম শ্রেণি ( তৎকালীন সেকেন্ড ক্লাস) পড়ুয়া কন্যা মঞ্জু। পরমা সুন্দরী মঞ্জু ও তার পরিবার সহৃদয় আচরণ করল দরিদ্র প্রতিবেশী নিধুদের সঙ্গে। গড়ে ওঠে এক চমৎকার বন্ধন। সেই রসায়নে প্রত্যক্ষ ভালোবাসার তীব্রতা নেই বরং মৃদু এক ভালোবাসার সুঘ্রাণ আছে৷
মহকুমাশহর রামনগরের আদালতে মোক্তারি-চর্চা শুরু করে নিধু। এদেশের বিচারব্যবস্থার তমসামাখা দিকটি সৎ ও নির্লোভ তরুণ নিধুর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন ঔপন্যাসিক।
"দুই বাড়ী" নাতিদীর্ঘ উপন্যাস। শেষটুকু কতটা জমল তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবুও নামকরণের এক সার্থকতা আমি খুঁজে পেয়েছি। আকাশকুসুম সমাপ্তি টানেননি ঔপন্যাসিক। অনেকটাই বাস্তবধর্মী মনে হয়েছে শেষটুকু।
"পথের পাঁচালী" অথবা "আরণ্যক" -এর বিভূতিভূষণকে এই উপন্যাসে খোঁজা বৃথা। তবুও বেশ ভালো লেগেছে বইটি পড়তে। সহজসরল কাহিনির সঙ্গে বিভূতিভূষণের জাদুমাখা লেখার গুণেই উতরে গিয়েছে "দুই বাড়ী"। নিধুকে দীর্ঘকাল মনে রাখব। ভোলা যাবে না কিশোরী মঞ্জুকে।
সহজসরল অথচ সুন্দর লেখা পড়তে চাইলে উপন্যাসটি পড়তে পারেন।
পুরণো ধাচের সরলরৈখিক এক প্রেমের গল্প।দুইটা ভিন্ন বাড়ির কাহিনী লেখক এতোহহ সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন তার কালির আচরে।গরীব ঘরের ছেলে নিধিরাম বাবু,বড় ঘরের মেয়ে মঞ্জুরী।কিন্তু তা সত্ত্বেও মঞ্জুরীর নিধির প্রতি যে স্নেহ যত্ন তাহাই তার আনন্দানুভূতির উৎস ছিল যেন।গল্পটা ৫০ এর দশকের দিকের হবে হয়তো,কি নীরব ভাবে দুজনের মনের দিক দিয়ে এগিয়ে চলা।নিধু অপেক্ষায় থাকে শনিবারের। কখন সে বাড়ি যাবে আর মঞ্জুরীকে এক পলক দেখবে।মঞ্জুরীর বড় বড় কালো চোখের চপল চাহনিই নিধুকে প্রশান্তি দেয়।মঞ্জুরীকে দেখেই নিধুর একটাই কথাই মনে হয়"সে যেখানে থাকে তাহাই সৌন্দর্য্যে ও মাধুর্য্যে ভরিয়া তোলে।সে যেখানে নাই তাহা হইয়া উঠে প্রাণহীন।"তাহার বীণার ঝঙ্কারের মত সুমিষ্ট হাসি নিধুর হৃদয়কে উদ্বেলিত করে।মঞ্জুরীর বাড়িতে জল খাবার খাওয়া,আড্ডা দেওয়া,গল্প,তার গান,হাসি,স্নেহবর্ষী দৃষ্টির প্রসন্ন আলো সবই যেন নিধুকে টানে।কিন্তু ডেপুটি বাবুর কথা আসতেই নিধুর মনে গেথেই বসল তার হয়তো মঞ্জুরীর কাছে আর যাওয়া হবে না।তার মনে কেমন এক অব্যক্ত যন্ত্রণা।তার বারবার মনে হতে লাগল,সারাজীবন মঞ্জুর পাশে থাকিবেন কে?-সুনীল বাবু!কিন্তু মঞ্জুর ঘনিষ্ট আত্মীয়তায় মাখানো স্নেহপূর্ণ আচরণের কথা মনে পড়তেই নিধুকে আবারও কাছে টেনে নিল।"মঞ্জু চপলা বটে,কিন্তু সে গভীর,সে ধীর বুদ্���িমতী,অতলস্পর্শ তাহার মনের রহস্য।" সে সময়েও যে এতো সুন্দর প্রেম কাহিনী ছিল এই উপন্যাস তারই প্রমান।তবে শেষ টাতে এসে কেন জানি আর ভালো লাগেনি।বিভূতি বাবুর বড্ড তাড়াহুড়া এটাকে পূর্ণতা দেয় নি।।
বি.দ্র.বইটা আরও বেশি ভালো লাগার কারণ নিধু পড়ালেখা করেছে আমার নিজের জেলায় ফরিদপুরে তার মামার বাড়িতে।বাঙলাদেশ,ফরিদপুর, প্রকৃতির কি নিদারুণ সুন্দর বর্ণনা এ বিভূতি ছাড়া আর কারো লিখায় ই ফুটে উঠা সম্ভব না।ভালোলাগাতে ৪.৫ তারা।শেষটা ভালোলাগেনি নাহলে হয়তো ৫ তারা ই দিয়ে দিতাম।।
নিধুর অনুভূতি পড়তে পড়তে কেমন যেন মায়া লাগতে শুরু করলো। ভেবেছিলাম একটু বেশিই নাটকীয় হবে। তবে নিধুর দ্বিধা, সংকোচ, ভয় আবার সেসব কাটিয়ে দুই একটা কথা, সেই সব কথার জন্য আবার আফসোস সবই বেশ বাস্তব লাগছিলো এবং পড়তে মায়া লাগছিলো৷ তবে যেন শেষটা শেষের মতো হলো না। বিভূতিবাবুকে পেলাম না মনে হলো।
উপন্যাসটা খুব ছোট, অনেকটা গল্পের বৈশিষ্ট্য ধারন করে বলা যায়। এ উপন্যাসে মানুষের ভাঙা স্বপ্ন আর নরম স্মৃতির মধ্য দিয়ে লেখক এক এমন অবস্থান তৈরি করেন, যেখানে ভালোবাসা, অভিমান, বিচ্ছেদ সবকিছুই একই পল্লীবাতাসে ধীরে ধীরে মিশে যায়। চরিত্রগুলো বড় নয়, তাদের আঘাতও খুব প্রকাশ্য নয়; তবু হৃদয়ের ভিতরে তারা নিঃশব্দে দাগ কাটে। যেন কারো ঘরের মৃদু আলো নিভে যাওয়ার পরও সেই উষ্ণতা অনেকক্ষণ বাতাসে রয়ে যায়। কিন্তু ব্যথার স্তরগুলো গভীর; ঠিক সেই অন্ধকারের মতো, যা সন্ধ্যার মুখে নীরবে ঘন হয়ে ওঠে।
"যখন থামবে কোলাহল ঘুমে নিঝুম চারিদিক আকাশের উজ্জল তারাটা মিটমিট করে শুধু জ্বলছে"
আমার কাছে এমন মূহুর্তগুলোতে বই নিয়ে বসতে বেশ ভালো লাগে। মনটা খুব উদাসীন হয়ে যায় যেন। তখন কিছু এমন বই পড়তে ভালো লাগে যার গল্পটা হবে একদম সহজ সরলভাবে। স্নিগ্ধ ভাব থাকবে, বই দীর্ঘ হোক কিন্তু পড়তে পড়তে কখন শেষ হবে টেরই পাওয়া যাবে না।
রামতারণের অভাবের সংসারে অন্ধের যষ্টি নিধিরাম রায়চৌধুরী। নামের ভার আর বংশীয় ব্রাহ্মণ পরিচিতি যতই প্রবল মনে হোক না কেন দারিদ্র্যের পরাকাষ্ঠায় ধূসর জীবনে রঙের আঁচড় লাগেনি কখনও। মোক্তারি পাশ করে সবেমাত্র কর্মস্থলে পদচিহ্ন রাখতে শুরু করেছে নিধিরাম। অভিষেকেই হাকিমের স্নেহভাজন হিসেবে তাঁর সংসর্গ আদালতপাড়ায় জন্ম দেয় নীরব রটনা। এর নেপথ্যে রয়েছে নিধিরামের প্রতিবেশী লালবিহারী চাটুয্যের কন্যা ষোড়শী মঞ্জু।
কিছু সংকোচ, ধীরে ধীরে প্রেমে পড়া, দ্বিধা, আশঙ্কা একটা প্রেমের গল্প হয়তোবা এভাবেই এগিয়ে চলে। চরিত্র হয়ে ধরা দেয় কিছু নামধারী মানুষ। কিন্তু লেখক তাঁর লেখনীতে জীবন্ত করে তোলেন নামধারী সেসব মানুষগুলোকে। যেমন করে বলা যায় বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা "দুই বাড়ি" উপন্যাস কথা। এই গল্পটা নিধিরাম বা নিধুর, এই গল্পটা মঞ্জু বা মঞ্জুরির।
দুই বাড়ির সুখ, দুঃখ, হাসি কান্নার মাঝে ভালোবাসা নামক অনুভূতি নিধুর মনে কীভাবে অনুভূত হলো সেটা জানতে বড় কৌতুহল হবে। তখনকার যুগে বিয়ে না করে কাউকে ভালোবাসা তো সহজ কথা নয়। মঞ্জু কেনো সবসময় নিধির ভালো চাইতো? কেনো তাঁর মঙ্গল কামনায় কেটে যেত তাঁর দিন?সেও কী মনে মনে তবে নিধিকে ভালোবাসে? অবশ্য তখন ভালোবাসা ছিলো সহজ সরলভাবে। সেখানে কোনো নোংরামির জায়গা ছিলো না। মঞ্জুকে ভালোবাসার কথাগুলো কীভাবে জানিয়েছিল নিধু?
মঞ্জুকে পাবার স্বপ্ন দেখা আর তাঁকে সত্যি সত্যি নিজের করে পাবার মধ্যে অনেক পার্থক্য। যেখানে নিধিদের পরিবার অতি দরিদ্র সেখানে সে কীভাবে স্বপ্ন দেখবে মঞ্জুকে পাবার! মঞ্জুর জন্য সম্বন্ধ এসেছে খোদ আরো বড় ঘরের থেকে। সেখানে নিধির স্বপ্ন দেখাই অন্যায়।
তবুও মন কী আর মানতে চায়! ভালোবাসা তবুও এসে যায়। দুই বাড়ির ব্যবধান কী ভেঙে দিতে পারবে এদের এই অজান্তেই গড়ে ওঠা ভালোবাসার অনুভূতি? সময়ই আসলে বলে দেবে সব। দেখা যাক তবে কী হয় শেষ পরিণতি।
বিভূতির লেখার মাঝে আমরা খুঁজে পাই প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে। বিভূতি মানে বুঝি পথের পাঁচালী, আরণ্যক, চাঁদের পাহাড়। তবে যেহেতু অপরাজিত রয়েছে, তাহলে আশা করাই যায় দুই বাড়িও বড় স্নিগ্ধ রূপে বর্ণনা করবে এক ভালোবাসার গল্প। দুই প্রতিবেশীর গল্প। বিভূতির অনেক রূপ দেখেছি লেখায়, এডভেঞ্চার হোক কিংবা সামাজিক উপন্যাস সবখানে তিনি সেরা বলা যায়। দুই বাড়ি নিয়ে প্রত্যাশা ছিলো এটাও ভালো হবে। এবং মোটামুটি ভালো লেগেছে আমার।
আমার মতো একজন ক্লাসিক পড়ুয়ার কাছে বিভূতির লেখা যেমন পছন্দের তেমনি তাঁর বইগুলোও সেরা। এবং আনন্দের কথা হচ্ছে সতীর্থ প্রকাশনা থেকে দুই বাড়ি বইটি একদম দারুন প্রোডাকশন কোয়ালিটিতে বেরিয়েছে। যেমন দেখতে সুন্দর তেমনি সতীর্থ চেষ্টা করেছে প্রিন্ট ভালো রাখতে। ক্রাউন সাইজের বইগুলো দেখতে আসলেই সুন্দর।
পরিচিত পরিবেশকে নতুন করে দেখা ও দেখানোর আশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। বিভূতিভূষণের এখানেই সার্থকতা।পড়লেই যেন মনে হবে এই গল্পটা আমাদের চিরচেনা কোনো গল্পের মতোই এগিয়ে চলেছে। কিন্তু গল্পটা যখন বিভূতিভূষণ বলেছেন তখন বুঝতে হবে তা হয়ে উঠবে সাধারণের মাঝেও অসাধারণ। দুই বাড়ির দুই প্রতিবেশী কিসের টানে তাঁরা অদৃশ্যভাবে একজন আরেকজনের এত আপন?
দুই বাড়ি বইয়ের গল্প নিয়ে ১৯৬৩ সালে অসীম পাল নির্মাণ করেছিলেন সিনেমা। যেখানে অভিনয়ে ছিলেন সিনেমা জগতের বিখ্যাত কিছু অভিনেতারা। বিভূতিভূষণের দারুন লেখনী, গল্প বলার ধরণ, চরিত্রায়ন, প্রেক্ষাপট এই বইয়ের ক্ষেত্রে সবটাই আশা জাগানিয়া।
ভালোবাসার গল্প সবাই বলতে পারে না। ভালোবাসা আমার কাছে সহজ সরলভাবে তুলে ধরাই মূখ্য মনে হয় বইয়ের পাতায়। নিধু এবং মঞ্জুর কথা আরো জানতে পড়তে হবে "দুই বাড়ি"। বিভূতিভূষণ এই বইয়ে কী সব ছাপিয়ে অন্যরকম উপস্থাপনা দেখাতে পেরেছেন, নাকি সেই পুরনো গদবাঁধা ঢংয়ে তাড়াহুড়ো করে সব শেষ এটা স্পষ্টত বোঝার উদ্দেশ্যে সতীর্থ থেকে প্রকাশিত এই চমৎকার বইটি পড়তে পারেন ক্লাসিক প্রেমীরা।
🎠 বইয়ের নাম: "দুই বাড়ি" 🎠 লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় 🎠 প্রকাশনা: সতীর্থ প্রকাশন 🎠 ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.২/৫
অবশ্যই লেখক জানে কিভাবে শেষ অব্দি গল্পের সাথে আঁকড়ে ধরে রাখতে পাঠককে। কাহিনী ভালো এগিয়েছে, তবে শেষে যেন আরেকটু আশা করেছিলাম তাহলে ষোলোকলা পূর্ণ হতো। তবে বলা বাহুল্য, সব ভুলে সরল তবে আকৃষ্ট করে রাখার খোরক আছে এতে
অজপাড়া গাঁয়ের অভাবের সংসারে রামতারণ ও তার পরিবারের জন্য নিধিরামই একমাত্র অবলম্বন। ছেলে মোক্তারি করে পরিবারের হাল ধরবে, গ্ৰামে তাকে নিয়ে গর্ব করা হবে এই তো চাই রামতারণের। নিধিরাম অর্থাৎ নিধুর বয়স পঁচিশ, কর্মস্থলে কেবল পর্দাপণ করে কিছুটা দিশেহারা অবস্থায়, কেননা আদালতের ভেতরের রাজনীতি, মক্কেলদের মিথ্যে শিখানো তার স্বভাবের বাহিরে। তবুও শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্নেহের ��রুন এই পেশায় রোজগারের দ্বার একটু করে খুলতে শুরু করেছে , দ্বার খুলেছে জীবনের আরেকটি পর্দার।
প্রতি সপ্তাহে ছুটির সুবাদে গ্ৰামে যাওয়া হয় নিধুর। সংসারের হাল ধরে দাঁড়ানোর সুযোগটা হলো কেবল। এর মধ্যে নিধুদের প্রতিবেশী লালবিহারী চাটুয্যে তার পরিবার নিয়ে পূজার ছুটিতে গাঁয়ে আসে, সাথে নিয়ে আসে ষোড়শী কন্যা মঞ্জুকে। জীবনে মা-বোনরা বাদে অন্য নারীদের সান্নিধ্য পায়নি নিধু। মঞ্জুর কথার ভঙ্গি , বিনয়ী ও সকলকে আপন করার স্বভাব , সুযোগ পেলেই তাকে সেবা-যত্ন করা প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে নিধুকে। কিন্তু নিধু এটাও বুঝে যে সৃষ্টিকর্তা মোটাদাগে তাকে ইঙ্গিত-ইশারায় বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছেন তাদের দু'জনের মাঝের বিশাল আর্থিক বৈষম্যতা যা সমাজে চলে আসছে ও চলবে।
তৎকালীন কোর্টের ভিতরকার পরিবেশের পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎে চলতে থাকা সমাজের অসম আর্থ-সামাজিক চিত্রও লেখক তুলে ধরেছেন। সুন্দর ও সাবলীল একটি গল্প।
"করুণা ভালোবাসার সবচেয়ে মূল্যবান মসলা, তার গাঁথুনি বড় পাকা হয়।" - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
Rating: ৩.৭৫/৫
নিধু সবে মোক্তারি পাশ করা গরীব ঘরের বড়ছেলে। টাকা রোজগারের উদ্দেশ্যে বাসা হতে দূরে বসবাস করে মোক্তারি করে খুব সামান্য রোজগার করা শুরু করেছে। ছুটিতে হঠাৎ বাড়ি এসে দেখে তাদের সাধারণত শূন্য পাশের বাসা এখন মানুষপূর্ণ। সেখানে প্রথম দেখা হয় মঞ্জুর সাথে। বড়লোক পরিবারের মেয়ে হলেও তার সহজ সরল আতিথেয়তার কাছে কি না নিজের মনকে হারিয়ে থাকতে পারবে নিধু?
বইটি আসলে বাঙালী সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে যা এখনো খুব একটা বদলায় নি। বদলাবেও না। আর্থিক বৈষম্য। আমার ভালো লেগেছে বইটি practicality কারণে। It was an innocent, unfulfilling, and unrequited love story.
পড়তে গিয়ে মনে হলো যেন একটাই রাস্তা, কিন্তু তার দুই পাশে দুটো আলাদা দুনিয়া। একদিকে নিধিরাম রায়চৌধুরীর জীর্ণ, দরিদ্র সংসার। অন্যদিকে লালবিহারী চাটুয্যের সুরম্য অট্টালিকা। নিধিরামের জীবন সংগ্রাম, মোক্তারি পাস করে কর্মজীবনের শুরু, আর মঞ্জুর সঙ্গে তার সম্পর্ক সব মিলিয়ে এক নিঃশব্দ টানাপোড়েন। এই উপন্যাসে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূক্ষ্মতা খুবই সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। নিধিরাম আর মঞ্জুর সম্পর্কটা যেন এক অদৃশ্য সীমানার খেলা। লেখকের ভাষা ছিল সহজ, সরল, কিন্তু গভীর। প্রতিটি চরিত্র জীবন্ত, প্রতিটি ঘটনা বাস্তব মনে হয়। বইটা পড়ে মনে হলো, জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলোই আসলে সবচেয়ে বড়।
একশ বছর আগের সময়ের গতানুগতিক প্রেম কাহিনী নিয়ে এই উপন্যাস। এরকম স্টাইলে লেখা গত শতকের পঞ্চাশের দশকের আগে অনেক হয়েছে। তবুও গতানুগতিক এই উপন্যাসটি আমার ভালো লেগেছে এর সরলতার জন্য। হয়তো উচ্ছ্বসিত করেনি, তবে ভালো লাগিয়েছে বেশ। একটু অতি নাটকীয়তা আছেই, তবে সে আমলে বোধহয় প্রেমের উপন্যাস লেখা এতোটা সহজ ছিলো না, কেননা বিয়ে ছাড়া প্রেম করার সুযোগই বা ছিলো কই।
#বই_রিভিউ #দুই_বাড়ি লেখক: বিভূতি-ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় পৃষ্ঠা: ১৬৮ প্রকাশনী: Satirtho Prokashona মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ প্রচ্ছদ: আবু আনন্দ নিটু, তাহমিদ রহমান জনরা: চিরায়ত উপন্যাস রিভিউয়ার: জান্নাত
◽#ফ্ল্যাপ: ছায়াভরা পথে শরৎ-প্রভাতের স্নিগ্ধ হাওয়ায় যেন নবীন আশা, অপরিচিত অনুভূতি সারা দেহের ও মনের নব পরিবর্তন আনিয়া দেয়। গাছের ডালে বন্য মটরলতা দুলিতেছে, তিৎপল্লার ফুল ফুটিয়াছে-এবার বর্ষায় যেখানে সেখানে বনকচুর ঝাড়ের বৃদ্ধি অত্যন্ত যেন বেশি। নিধু আশ্চর্য হইয়া ডাবিল-এসব জিনিসের দিকে তাহার মন তো কখনো তেমন যায় না, আজ ওদিকে এত নজর পড়িল কেন?
শরৎ-প্রভাতের স্নিগ্ধ হাওয়ার সঙ্গে মিশিয়া আছে কাল বিকালে শোনা মঞ্জুর গানের সুর। সে সুর তাহার সারারাত কানে ঝঙ্কার দিয়াছে। শুধু মঞ্জুর গানের সুর নয়-তাহার সুন্দর ব্যবহার, তাহার মুখের সুন্দর কথা, ঘাড় নাড়িবার বিশেষ ভঙ্গিটি, বড় বড় কালো চোখের চপল চাহনি।
সত্যই রূপসী মেয়ে মঞ্জু। মহকুমার টাউনে তো কত মেয়ে দেখিল। অমন মুখ এ পর্যন্ত কোনো মেয়েরই সে দেখে নাই জীবনে। মঞ্জুর সঙ্গে দেখা না হইলে অমনধারা রূপ যে মেয়েদের হইয়া থাকে, ইহার মধ্যে অসাধারণত্ব কিছু নাই। ইহা সে ধারণা করিতে পারিত না।
মঞ্জু স্কুলে পড়ে। স্কুলে-পড়া-মেয়ে সে এই প্রথম দেখিল। মেয়েদের এমন নিঃসংকোচ ধরন-ধারণ সে কখনো কল্পনা করিতে পারিত না। এসব গ্রামের অশিক্ষিত কুরূপা মেয়েগুলা এমন অকালপক্ক যে বারো-তেরো বছরের পরে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বা পিতৃব্য সমতুল্য প্রতিবেশীর সামনে দিয়া চলাফেরা করিতে বা তাহাদের সম্মুখে বাহির হইতে সঙ্কোচ বোধ করো নিধুর কি ভালোই লাগিয়াছে মেয়েটিকে!
◽#কাহিনি_সংক্ষেপ:
রামতারণের অভাবের সংসারে অন্ধের যষ্টি নিধিরাম রায়চৌধুরী। নামের ভার আর বংশীয় ব্রাহ্মণ পরিচিতি যতই প্রবল মনে হোক না কেন দারিদ্র্যের পরাকাষ্ঠায় ধূসর জীবনে রঙের আঁচড় লাগেনি কখনও। মোক্তারি পাশ করে সবেমাত্র কর্মস্থলে পদচিহ্ন রাখতে শুরু করেছে নিধিরাম। অভিষেকেই হাকিমের স্নেহভাজন হিসেবে তার সংসর্গ আদালতপাড়ায় জন্ম দেয় নীরব রটনা। এর নেপথ্যে রয়েছে নিধিরামের প্রতিবেশী লালবিহারী চাটুয্যের কন্যা ষোড়শী মঞ্জু। লালবিহারী চাটুয্যেও পেশাগত জীবনে ছিলেন একজন মোক্তার। সময়ের পালাবদলে প্রতিপত্তি লাভের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। পারিবারিক, মানসিক তথা সামাজিক জীবনে ধনী-দরিদ্রের এই অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের টানাপোড়েনকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শব্দের তুলিতে অঙ্কণ করেছেন দুই বাড়ি শীর্ষক উপন্যাসে।
◽#পাঠ_প্রতিক্রিয়া:
" 'দুই বাড়ি’ বিভূতিভূষণের মধ্য পর্যায়ের রচনা (১৯৪১)। রামনগর কোর্টের পসারহীন অখ্যাত মোক্তার নিধু-নিধিরাম রায়চৌধুরি, পিতৃবন্ধু যদু বাড়ুঁয্যে নিধুর পৃষ্ঠপোষক। মফস্বলের-���োক্তারের নানা সমস্যা, আদালতের প্রচলিত প্রথা, হাকিমদের বিশেষ প্রতিপত্তি- এই সবের মধ্যে দিয়ে নিধুর দিনযাত্রা, প্রেম-জীবনের অপেক্ষা… দুই বাড়ির একবাড়ি নিধুদের জীর্ণ দরিদ্র সংসার, অন্যবাড়ি রাস্তার ওধারে ‘জজবাবু’ লালাবিহারী চাটুয্যের সুরম্য অট্টালিকা, তিনি বহুদিন পরে দেশে দুর্গাপুজোর জন্য এসেছেন।
‘দুই বাড়ি’ শুধু স্থাপত্য-শিল্পের নিদর্শন নয়, দুই বাড়ি প্রতীক বটে। ‘দুই’ কিনা ‘এক’ নয়। বাহ্য আকৃতি, পরিবেশ, অবস্থা, শ্রেণীপার্থক্য সমস্ত দিকেই দুই বাড়ি দুই পৃথক মহল। তারা কখনও মিলতে পারে না।
লালাবিহারী চাটুয্যে এককালে মোক্তারী করেছেন ও সামনের বাড়ির ছেলে বলে প্রথম সাক্ষাতে পল্লীগ্রামের ভদ্রতায় নিধুকে আহারে নিমন্ত্রন করেন। ও বাড়িতে নিধুর অবাধ প্রবেশ, জজবাবুর মেয়ে মঞ্জুর সঙ্গের অবাধ বন্ধুত্ব অনেকে সন্দিহান দৃষ্টিতে দেখবেন কিন্তু বিভূতিভূষণ তাঁর পল্লীগ্রামকে চিনতেন। বিভূতিভূষণ যা স্বাভাবিক, যা অনিবার্য্য তাই লিখেছেন, দুই বাড়ির মিলন সম্ভব নয় তিনি জানতেন।
অনবদ্য প্রেমের ইঙ্গিত পাওয়া যায় শরতের নীল আকাশের নিচে দুই বাড়িতে। তেমন প্রেম একমাত্র বিভূতিভূষণ লিখতে পারেন অর্থাৎ ‘রজকিনীর প্রেম নিকষিত হেম, কামগন্ধ নাহি তায়’। দুই বাড়ির সমস্ত মাধুর্য্য ও বিশেষত্ব এই অধরা রাগিণীর ছন্দে ছন্দিত। বিভূতিভূষণের এই অপ্রধান ছোট উপন্যাসখানি লিপিচাতুর্য্যে তুচ্ছ সুখদুঃখের গ্রাম্য বিকাশের মধ্যে আগাগোড়া রসোত্তীর্ণ।" কালেক্টেড।
উপন্যাস টার জনরা আসলে কি সেটা এক্সাক্টলি বলা সম্ভব না। নরমালি দেখলে মনে হয় অমীমাংসিত ভালোবাসার উপন্যাস যাতে সমাজের দুই শ্রেণির মানুষের নিরব ভালোবাসার অতি সত্য পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। আবার একটু পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় পেশাগত জীবনে এক শ্রেণির মানুষের স্বার্থান্বেষী ব্যবহার, একজন মাড়িয়ে আরেকজন টিকে রাখার লড়াই, কুটিলতা, দারিদ্র্যের বেত্রাঘাত। আরো লক্ষ্য করা যায় সমাজের ছোট বড় মানুষের ক্ষমতার অহংকার, বৈষম্য।
◽#পছন্দের_লাইন:
"কিছু ভাববেন না, নিধুদা। আমি ছেলেমানুষ নই। কষ্ট করতে পারব জীবনে। ও জিনিস কষ্টের জন্যেই হয়।আপনি আশীর্বাদ করবেন যেন সহ্য করতে পারি " - মঞ্জু
সবশেষে এটুকু বলা বাহুল্য, বইটা পড়ার সময় পাঠক হতাশ হবেন না, বিরক্ত বোধ করবেন না। লেখার মধ্যে সম্মোহনী জাদু শক্তি আছে যার প্রভাব পাঠককে বাধ্য করবে বইয়ের সাথে লেগে থাকতে।
❛এ জগতে যত চেষ্টাই করা হোক না কেন বৈষম্য দূর হবে না। ধনী-গরীবের বৈষম্য, সুন্দর-অসুন্দর, ভালো-খারাপের মাঝে আজীবন বৈষম্য থেকে যাবে। এক পাতে বসে খেলেও কোথাও না কোথাও বৈষম্য রয়েই যায়। হয়তো সেটা মানসিকতায়, কিংবা বেশভূষায়।❜
রামতারণের পুত্র নিধিরাম রায়চৌধুরী। নামখানা খাসা হলেও তাদের পরিবারের দশা খাসা নয়। দিন আনে দিন খায় থেকেও করুণ অবস্থা। নিধিরাম তথ্য নিধু সব মোক্তারি পাশ করেছে। মহকুমার রামনগরে আদালতে মোক্তারি শুরু করেছে বাপের বন্ধু যদু বাঁড়ুয্যের কৃপায়। আয় বেশি নয়। তবে ঠেকে চলছে আরকি। সপ্তাহান্তে বাড়ি দেখা করতে গিয়ে নিধুর পরিচয় হলো তাদের পাশের বাড়ির প্রতিবেশী লালবিহারী চাটুয্যে মশাইদের সাথে। এককালে তিনিও মোক্তারি করে বেশ পশার করেছেন। এখন সেই অবস্থা তাদের। পাশাপাশি দুটো বাড়ি অথচ তাদের অর্থনৈতিক অবস্থানে কত তফাৎ! সেই বাড়ির মেয়ে মঞ্জুর সাথে আলাপের পর যেন কেমন বদলে গেলো নিধুর জীবন। এত বড় বাড়ির মেয়ে, বড় বাড়ির লোক অথচ তাদের সাথে কী সুন্দর ব্যবহার। মঞ্জুর জন্য নিধুর মন কেমন করে! কিন্তু নিধুর সাথে কি ওমন ঘরের মেয়ের যায়? নিধু তো বলা যায় ঐ, ❛ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার❜। মঞ্জুরও এই সহজ নিধুর জন্য মন কেমন করে। কিন্তু এই প্রণয়ের পরিণতি তো খালি চোখেই দেখা যায় গড়ের মাঠ। কী হবে? বামন হয়ে চাঁদে হাত দেয়ার স্বপ্ন দেখা কি সাজে? আদালতপাড়ায় হাকিমের সাথে নিধুর সুন্দর সম্পর্ক নিয়েও বেশ কানাঘুষা। নিধুকে এত খাতির করার পিছে উদ্দেশ্য কি শুধুই স্বার্থের নাকি আদতেই স্নেহবোধ বলে কিছু আছে বৈকি? স্বার্থের এই দুনিয়ায় স্বার্থ ছাড়া কেউ এক পা নড়ে না। সাধন বাবুও টোপ ফেলেছিলেন। স্বার্থে মিলেনি টোপ তুলে নিয়েছেন। নিধু তো তাদের মতো হতে পারে না। কী হবে তার জীবনে? দুই বাড়ির পার্থক্যের মধ্যেও কত আন্তরিকতা। এই বা কম কী নিধুর জন্যে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝দুই বাড়ি❞ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটো এক উপন্যাস। এক সামাজিক প্রেমের কাহিনি বলা যেতে পারে। দুজন দুই প্রান্তের মানুষের অব্যক্ত মন কেমন করার মিষ্টি এক গল্প লিখেছেন প্রকৃতি প্রেমী লেখক। উপন্যাসের মূল নিধিরাম। গরীব ঘরের ছেলে সে। তার জীবনের বিভিন্ন দিক, ভালোলাগা আর সেই ভালোলাগাকে ভবিষ্যৎ হিসেবে না পাওয়ার যে চিন্তা তাই নিয়ে আবর্তিত হয়েছে উপন্যাস। একদিকে নিধুর জীবনের সাথে লেখক দেখিয়েছেন সমাজে ধনী-গরীবের মাঝের ফারাক। উঁচু মানুষের সামনে অপেক্ষাকৃত বা নিচু লোকেরা যে সবসময়ই কেমন কাচুমাচু করেন, সেই বৈষম্য হাজার চাইলেও যে দূর করা যায়না তার নিদর্শন ছিল এই উপন্যাসে। লালবিহারী বাবু আর তার স্ত্রীর সাথে নিধুর মা, বাবার আচরণ সেই মনোভাবকেই প্রকাশ করে। তবে লেখক এখানে বৈষম্যকে সেভাবে আনেননি। লালবিহারী বা তার স্ত্রীর আচরণ, সে বাড়ির অন্যদের আচরণে যে আন্তরিকতা ছিল সেটা বেশ লেগেছে। সুনীলের আচরণের মধ্যেও সে সুন্দর মনোভাব ছিল তাও ভালো লেগেছে। যদিও মনে হয়েছে সেও কিছুটা নিজ তাগিদেই একটু আন্তরিক ছিল। এই উপন্যাসে অন্যতম ভালো লাগার দিক ছিল নিধুর সৎ মা। সৎ মাও যে কখনো মায়ের থেকেও বেশি ভালবাসতে পারেন সেটা লেখক নিধুর মায়ের সরল চরিত্র এবং সৎ সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার সরলতার সুন্দরতম দৃশ্য ছিল সুন্দর কাঁচের শিশি পাওয়ার পর যে শিশুসুলভ খুশি বিরাজ করেছিল। এমন সরল মানুষের বিপরীত মানুষও ছিল। সাধন মশাইয়ের স্বার্থপরতাই দেখা যাক। যে চাকে মধু বেশি সে চাকে ঢিল দেয়ার প্রবণতা আবার সুবিধে করতে না পেরে কম মধুতে ফিরে আসার ঘটনাটা তার সুযোগ সন্ধানী চরিত্রকে উপস্থাপন করে। গল্পটা সাধারণ, নির্মল কিন্তু সুন্দর। তবে শেষটা মনঃপুত হয়নি। সুন্দর বা দুঃখের যেকোনো একটা ইতি টানা যেত। কোনোটাই না টেনে কেমন অসম্পূর্ণ রেখে দিলেন। হতে পারতো মঞ্জুর অন্যত্র বিয়ে হয়েছে কিংবা নিধুর বধূ হয়েছে। কিন্তু শেষটা এমন খাপছাড়া না হলে পড়ার পর অনুভূতি আরো ভালো হতে পারতো। উপন্যাসে তিৎপল্লার ফুল ফুটার বর্ণনা ছাড়া প্রকৃতির বিশেষ বর্ণনা ছিল না যেটা আক্ষেপ তৈরি করেছে।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
ভিন্টেজ প্রচ্ছদ বেশ সুন্দর। তবে ১৬৮ পৃষ্ঠার ক্রাউন সাইজের একটা বইয়ের গায়ের দাম ৪০০ টাকা মাত্রাতিরিক্ত। অনেক ব্যাখ্যা দেয়া যায় পক্ষে কিন্তু তারপরেও যেখানে লেখকের কপিরাইট নেই এখন আর সেরকম একটা বইয়ের দাম ভিন্টেজের তকমা দিয়ে এত রাখার যৌক্তিকতা নেই।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রা���বাংলার একখণ্ড নিসর্গ—খোলা আকাশ, আলুথালু মাঠ, নিঃশব্দ দুপুর আর সেই নরম অথচ গভীর অনুভবে ভেজা মানুষগুলো। তাঁর লেখা মানেই কোনো এক অদৃশ্য ক্যানভাসে জীবনের নিঃশব্দ রঙ লাগিয়ে যাওয়া। দুই বাড়ি সেই ক্যানভাসে আঁকা এক অনবদ্য রেখাচিত্র—যেখানে ঘর দুটি, কিন্তু গল্পটি যেন একই আত্মার দুই রূপ। এই উপন্যাসের কেন্দ্রে নিধুরাম রায়চৌধুরী। তিনি একজন মফস্বলের ক্ষীণপদাতিক মোক্তার, যাঁর জীবনে নেই চাকচিক্য, নেই সামাজিক অবস্থান, কেবল আছে পরিশ্রম, নিঃস্বতা আর আত্মমর্যাদার কঠিন ভার। তাঁর জীবনের বিপরীতেই অবস্থান করছে লালাবিহারী চাটুয্যের প্রাসাদোপম অট্টালিকা। এই দুই বাড়ি—একটি গরিবের, অন্যটি সম্ভ্রান্তের—শুধু দৃষ্টিগোচর ভিন্নতা নয়, তারা প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় সমাজের দুটি স্তরের, দুটি জীবনের, দুটি বাস্তবতার। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে একটি সম্পর্ক—নিধু ও মঞ্জুর বন্ধুত্ব, যা কখনো প্রকাশ্য প্রেম নয়, আবার ঠিক বন্ধুত্ব বললেও কিছু না কিছু রয়ে যায়। এই সম্পর্কের মধ্যে নেই কোনো উত্তেজনা, নেই নাটকীয় কোনো চূড়ান্ত মোড়। তবুও বুঝা যায়—এই না বলা কথার মধ্যেই আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে। এই উপন্যাসে আমরা আবারও ফিরে পাই সেই চিরচেনা গ্রামীণ বাংলাদেশ—যেখানে মানুষের জীবন কঠিন, কিন্তু মন সহজ; অভাব আছে, কিন্তু নিষ্কলুষতাও আছে। কোর্ট-কাচারি, এবং সমাজের এক শ্রেণির ওপর অন্য শ্রেণির প্রভাব—এসব বিভূতিভূষণ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন। জজবাড়ি এখানে শুধুমাত্র অর্থ-প্রতাপের প্রতীক নয়, এটি এক ‘অন্য’ জগতের প্রতিচ্ছবি, যেটির দরজা সবসময় খোলা থাকে না নিধুর মতো সাধারণ মানুষের জন্য। এবং এই দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে এক নিঃশব্দ আকাঙ্ক্ষা, যা না পাওয়া হলেও অস্বীকার করা যায় না। দুই বাড়ি উপন্যাসটি মূলত সমাজের শ্রেণীবিভাজনকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীলভাবে চিত্রায়িত করে। একটি গরিব মোক্তারের পরিবার এবং অপরদিকে একটি উচ্চবিত্ত জজবাড়ির জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন কতটা সূক্ষ্মভাবে গড়ে ওঠে সামাজিক প্রাচীর, যা সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগেই তাকে রুদ্ধ করে দেয়। নিধু ও মঞ্জুর মধ্যকার সম্পর্কটি কোনও প্রচলিত প্রেমের সংজ্ঞায় বাঁধা পড়ে না, কিন্তু তাতে গভীরতা ও আন্তরিকতার অভাব নেই। এই অসম প্রেম, হয়তো প্রকাশিত নয়, কিন্তু উপস্থিতি প্রবল। গ্রামীণ জীবনের নিস্তরঙ্গ, ধীর গতি—যেটা বাহ্যিকভাবে নিষ্প্রাণ মনে হতে পারে—তাও এখানে নিজের ভাষায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। মানুষের অন্তর্জগতের যেসব কথা উচ্চারিত হয় না, সেগুলিই যেন বিভূতিভূষণ তাঁর কলমে প্রাণ দেন। সম্পর্ক এখানে শরীরী নয়, শব্দেও নয়, বরং এক ধরনের দূরত্বেই তার সৌন্দর্য—এক অপূর্ণতা, যা হয়তো মিলনের থেকেও বেশি গভীর ও স্থায়ী। এই উপন্যাস পড়ার পর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়—নিরব, হালকা বিষাদের মতো, যেন কারও কথা মনে পড়ে। মঞ্জু আর নিধুর পরিণতি হয়তো অনেকের মনোঃপূত হয় না, কিন্তু তাদের মধ্যে যে ‘কিছু একটা’ ছিল, সেটা মনে রয়ে যায়। এটা কোনো বর্ণাঢ্য গল্প নয়, কিন্তু তাতে কী? জীবনও তো সবসময় নাটকীয় হয় না। দুই বাড়ি ঠিক সেই জীবনের কথা বলে—যেটা আমাদের চেনা, আমাদের খুব কাছের, খুব সত্যি। সত্যি বলতে, এই উপন্যাস পড়ে মনে হয়—সব গল্পের শেষ দরকার নেই। কিছু গল্প শুধু থেকে যাওয়ার জন্যই লেখা হয়। আর দুই বাড়ি সেই রকমই একটা গল্প।
পুরণো ধাচের সরলরৈখিক এক প্রেমের গল্প।দুইটা ভিন্ন বাড়ির কাহিনী লেখক এতোহহ সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন তার কালির আচরে।গরীব ঘরের ছেলে নিধিরাম বাবু,বড় ঘরের মেয়ে মঞ্জুরী।কিন্তু তা সত্ত্বেও মঞ্জুরীর নিধির প্রতি যে স্নেহ যত্ন তাহাই তার আনন্দানুভূতির উৎস ছিল যেন।গল্পটা ৫০ এর দশকের দিকের হবে হয়তো,কি নীরব ভাবে দুজনের মনের দিক দিয়ে এগিয়ে চলা।নিধু অপেক্ষায় থাকে শনিবারের। কখন সে বাড়ি যাবে আর মঞ্জুরীকে এক পলক দেখবে।মঞ্জুরীর বড় বড় কালো চোখের চপল চাহনিই নিধুকে প্রশান্তি দেয়।মঞ্জুরীকে দেখেই নিধুর একটাই কথাই মনে হয়"সে যেখানে থাকে তাহাই সৌন্দর্য্যে ও মাধুর্য্যে ভরিয়া তোলে।সে যেখানে নাই তাহা হইয়া উঠে প্রাণহীন।"তাহার বীণার ঝঙ্কারের মত সুমিষ্ট হাসি নিধুর হৃদয়কে উদ্বেলিত করে।মঞ্জুরীর বাড়িতে জল খাবার খাওয়া,আড্ডা দেওয়া,গল্প,তার গান,হাসি,স্নেহবর্ষী দৃষ্টির প্রসন্ন আলো সবই যেন নিধুকে টানে।কিন্তু ডেপুটি বাবুর কথা আসতেই নিধুর মনে গেথেই বসল তার হয়তো মঞ্জুরীর কাছে আর যাওয়া হবে না।তার মনে কেমন এক অব্যক্ত যন্ত্রণা।তার বারবার মনে হতে লাগল,সারাজীবন মঞ্জুর পাশে থাকিবেন কে?-সুনীল বাবু!কিন্তু মঞ্জুর ঘনিষ্ট আত্মীয়তায় মাখানো স্নেহপূর্ণ আচরণের কথা মনে পড়তেই নিধুকে আবারও কাছে টেনে নিল।"মঞ্জু চপলা বটে,কিন্তু সে গভীর,সে ধীর বুদ্ধিমতী,অতলস্পর্শ তাহার মনের রহস্য।" সে সময়েও যে এতো সুন্দর প্রেম কাহিনী ছিল এই উপন্যাস তারই প্রমান।তবে শেষ টাতে এসে কেন জানি আর ভালো লাগেনি।বিভূতি বাবুর বড্ড তাড়াহুড়া এটাকে পূর্ণতা দেয় নি।।
বি.দ্র.বইটা আরও বেশি ভালো লাগার কারণ নিধু পড়ালেখা করেছে আমার নিজের জেলায় ফরিদপুরে তার মামার বাড়িতে।বাঙলাদেশ,ফরিদপুর, প্রকৃতির কি নিদারুণ সুন্দর বর্ণনা এ বিভূতি ছাড়া আর কারো লিখায় ই ফুটে উঠা সম্ভব না।ভালোলাগাতে ৪.৫ তারা।শেষটা ভালোলাগেনি নাহলে হয়তো ৫ তারা ই দিয়ে দিতাম।।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আমার সবথেকে প্রিয় লেখক । তাঁর লেখার সরলতা , গ্রাম্য পরিবেশ পড়তে পড়তে মনে হয় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হয় সবাই আমার পরিবার । প্রথমেই দেখতে পাই ধনী গরীবের সংজ্ঞা- ভেদাভেদ মানসিকতা। দুই বাড়ির গল্প ফুটে উঠেছে লেখকের কলমে। গ্রামের দরিদ্র রামতারণের একমাত্র সম্বল ছেলে নিধিরাম। মোক্তারি পাশ করে রোজগার করা শুরু করেছে । সেখানে কত বাধা- বিপত্তি, কর্মস্থলের কূটকচালিতে নিধু অভ্যস্ত নয় , সে চায় সৎভাবে উপার্জন করতে। আস্তে আস্তে তার রোজগারের দ্বার উন্মোচন হয়। এদিকে নিধুর প্রতিবেশী বিখ্যাত মোক্তার লালবিহারী চাটুয্যে পুজোর ছুটিতে গ্রামে আসেন। সচ্ছল শিক্ষিত পরিবার। এখানে দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচার নেই , নেই কোনো করুণার সম্পর্কও। আছে শুধুমাত্র বন্ধুত্বপূর্ণ পারিবারিক সম্পর্ক। খুব সহজেই লালবিহারী বাবুর মেয়ে মঞ্জু আপন করে নেয় নিধুকে এবং তার পরিবারেকে। প্রতি সপ্তাহে নিধু বাড়ি আসে। আর সেই দু'দিনের সঙ্গ মোহিত করে তোলে মা বোন বাদে অন্য নারীর সঙ্গ না পাওয়া নিধুকে। নিধুর মঞ্জুর প্রতি দূর্বলতা , অভিমান , ভালোবাসা পরতে পরতে প্রকাশ পায়। প্রকাশ পায় সমাজের চিত্র। হয়তো প্রকাশ পায় নিধুর প্রতি মঞ্জুর ভালোবাসা - "আপনার জন্যে মন-কেমন করে ,আপনি এখান থেকে চলে গেলেই ...." পাঠ প্রতিক্রিয়া:- বরাবরের মতো এবারও লেখকের লেখা মুগ্ধের মত পড়ে চলেছি । গ্রামের পরিবেশ, সরলতার সাথে নিজেকে মিশিয়ে এক অন্যরকম অনুভুতি।কিন্তু শেষ হয়েও হইল না শেষের মতো আটকে রাখল কোথাও। নিধুর হঠাৎ অসুখ, মঞ্জুর বাবার কোর্ট খুলে যাওয়ায় তারা শহরে ফিরে যায় । আরো অনেক আশা ছিল, লেখক তার আগেই কলম থামিয়ে দিয়েছেন। শুধু জুড়ে রইল "দুই বাড়ি"ময় শূন���যতা।
🌿📖বইয়ের নাম - দুই বাড়ি📖🌿 ✍️লেখক - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
🍂🍁প্রথমেই বলা ভালো এই উপন্যাসটি আমার অসাধারণ লেগেছে!!😊 এই উপন্যাসটি আমার ভালো লেগেছে সরলতার জন্য!! বিভূতিভূষণের 'উপন্যাস সমগ্র-প্রথম খন্ড' থেকে উপন্যাসটি পড়েছি, পাতা উল্টিয়ে যখন দেখলাম উপন্যাস শেষ তখন কষ্টই পেয়েছি আমি অরো পড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু কি আর করা যাবে এখানেই থামতে বাধ্য হলাম..... কারন উপন্যাস শেষ !!😔 বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর আরো একটি অসাধারন সৃষ্টি! দুই টি ভিন্ন সামাজিক শ্রেণির মানুষের মধ্যে না বলা ভালবাসার যে চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তা সত্যিই অসাধারণ বললেও কম বলা হবে! পুরো উপন্যাসটি পড়ার সময় কখনো ভাবলেশহীন থাকা যায় না, হাসি, আনন্দ, কষ্ট কাহিনীর সাথে সাথে মন কেও ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। মঞ্জুরীর মতো আমিও আশায় ছিলাম যে লেখকের সাহায্যে একদিন নিধিরামবাবুর ভাগ্যের ঠিক পরিবর্তন হবে !!🍁🍂
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় হচ্ছেন সাধারণ মানুষের লেখক। সাধারণ মানুষের জীবনকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেন তাঁর উপন্যাসগুলাতে যেনো মনে হয় আরেহ! এই চরিত্রগুলা তো আমাদের চোখের সামনেই থাকে। সবকিছুই খুব স্বাভাবিকভাবে চোখে দেখা যায়।
আজ শেষ করলাম এই কালজয়ী লেখকের একটা নাম করা উপন্যাস 'দুই বাড়ি'। ভালোবাসার উপন্যাস। যারা এই জনরার বই পছন্দ করেন না তাদের আগেই বলি দয়া করে নাক সিঁটকাবেন না। আস্থা রাখুন বিভূতিবাবুর উপর! এই উপন্যাসে কোনো অতিরঞ্জন নেই, কোনো নাটকীয় মোড় নেই। উপন্যাসের সবচাইতে সুন্দর দিক হয়তো এইটাই। সবকিছু বেশ ছিমছামভাবে এগোয়।
উপন্যাসটা শুরু হয় নিধিরাম চৌধুরী বা নিধুকে নিয়ে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান নিধু। মোক্তারি পাশ করে সবেমাত্র কর্মস্থলে যাওয়া শুরু করেছেন। অন্যদিকে রয়েছেন, লালবিহারী চাটু্য্যের কন্যা মঞ্জু। লালবিহারী চাটুয্যে হচ্ছেন জজসাহেব, সাথে গ্রামীণ জীবনে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। কি হবে যদি এই গরীব নিধু আর আর জজসাহেবের মেয়ে একে অপরকে ভালোবাসে? জানতে হলে পড়ে ফেলুন চমৎকার বইখানা।
উপন্যাসটা শুরু থেকে শেষ অব্দি চমৎকার। যদিও শেষটা কেমন জানি তাড়াহুড়ো তাড়াহুড়ো বলে মনে হয়েছে। আরেকটু সময় দিলে হয়তো আরো চমৎকার হতো। তবে, বিভূতিবাবুর উপর কথা বলা চলে না। শেষ হয়েও যেনো হইলো না শেষ! এইটাই হয়তো তিনি চেয়েছেন। অবশ্যই পড়বেন। আশা করি ভালো লাগবে।
গল্পচ্ছলে প্রেমের আদলে বিভূতিবাবু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে যেন সমাজটাকেই দেখালেন। জীবনে প্রেম আসে, অনুভূতি আসে। কিন্তু জীবন চলে জীবনের মতোই।
মনে হলো শরৎবাবুর লেখা পড়ছিলাম। তবে বিভূতিভূষণ তার নিজস্বতা ধরে রেখেছেন। শরৎচন্দ্রের মতো নাটকীয়তায় যাননি। পাড়াগাঁয়ের সমাজের আর একই সাথে পেশাগত কিছু বাস্তবতা তুলে এনেছেন। বড়লোক আর গরিবের দুই বাড়ির গল্প হলেও মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ভালো খারাপের হিসেবে যাননি।
পাশাপাশি চলেও যে তেলে আর জলে সবসময় মেশে না তাই দেখালেন। একই সাথে দেখালেন দুটি মানুষের নিষ্কলুষ আবেগ। দুজনেই জানে, কেউ করো দোষ দেয়নি, বুঝেছে কি হচ্ছে। কেউ জোর করতে যায়নি। তা বড্ড নাটকীয় হতো।
তবে এই যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব, কতক সুখ, আবার এই যে বাস্তবতা মেনে নিয়ে জীবন চালিয়ে যাওয়া, এগুলো বড়ই রিলেটেবল। লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সুন্দর করে। শেষটাও আমার কাছে তাড়াহুড়া মনে হয়নি মোটেও। মনে হচ্ছে বিভূতিভূষণ যে গল্পটি আমাদের বলতে চেয়েছেন তা ততক্ষণে পুরোটাই শেষ হয়েছে।
সবশেষে এটাও বলতেই হয় যে সতীর্থ প্রকাশনার সুন্দর মলাট আর পাতায় গড়া বইটা যেভাবে হাতের মধ্যে সুন্দর করে এটে যায় এটাও বোধহয় ছোট্ট বইটা ভালো লেগে যাওয়ার অন্যতম একটা কারণ।
দুই বাড়ি’ পড়া আমার জন্য একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা ছিল। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার ভাষা, বর্ণনার ভঙ্গি, আর চরিত্রগুলোর নিঃশব্দ অথচ গভীর আবেগ সব কিছু মিলিয়ে যেন একটা নিঃশব্দ জগতে হারিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে, এই গল্পে কোনো অতিনাটকীয়তা নেই। খুব সাধারণ, যেন আমার-আপনার পাশের কারো জীবনের গল্প। বইটি পড়ে আমি কিছুটা নিঃসঙ্গতা অনুভব করেছি, আবার সেই নিঃসঙ্গতার মাঝেও এক ধরণের শান্তি। যেন নিজের শৈশব, হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো, বা পুরনো কোনো বাড়ির জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছি কোনো পুরনো দিনের আলোতে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও প্রমাণ করেছেন, জীবনের সবচেয়ে সাধারণ গল্পগুলোই সবচেয়ে গভীর হতে পারে।
📖 প্রিয় লাইন: "জীবন সব সময় এক জায়গায় থেমে থাকে না, ঠিক যেমন মানুষও সব সময় এক বাড়িতে থাকতে পারে না।" 🌿 রেটিং: 4.5/5 যারা নস্টালজিয়া আর নিঃশব্দ আবেগের গল্প পছন্দ করেন এই বইটা তাদের জন্য।