পড়তে বেশ প্রাঞ্জল। স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যাওয়া যায়। বইয়ের সুন্দর একটি দিক হলো এর পাতায় পাতায় পৃথিবীর নানা প্রান্তের ঝকঝকে ছবিগুলো। লেখক নিজেই সেসবের অধিকাংশ তুলেছেন।
'বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু। ' - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পায়ের তলায় সর্ষে না থাকলে ভ্রমণ করার সুযোগ মেলে না - এমন এক প্রবাদ বাক্য শুনি। সেই বিবেচনায় তারেক অণু পায়ের তলায় বুঝি সর্ষের ক্ষেত মাড়িয়ে এসেছেন! তিন শ ছত্রিশ পাতার বইটিতে ছোটো ছোটো পয়তাল্লিশটি ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন। যেখানে নদী, সাগর, পাহাড়, অরণ্য, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও শিল্পকলা - সবকিছুই স্থান পেয়েছে। বইটির প্রকাশক ছায়াবীথি।
এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর লেখা বোধকরি কিউবাকে নিয়ে। যেখানে এখনো কোনোক্রমে টিকে আছে সমাজতান্ত্রিক সমাজ। তারেক অণু থাকেন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র নরওয়েতে। কিন্তু তিনি মতাদর্শে বামপন্থার প্রতি সহানুভূতিশীল। কিউবা ভ্রমণ নিয়ে তিনি অত্যন্ত দরদি মন নিয়ে লিখেছেন। যেখানে শিশুরা পশু-পাখির প্রতি যত্নবান। কৃষক ক্ষেতে বাড়তি ফসলের লোভে রাসায়নিক সার ব্যবহার করে না। অন্যরকম সুন্দর একটা সমাজ। তারেক অণু একচোখা নন। তিনি কিউবার সমাজতন্ত্রের ভাঙনকে দেখতে পেয়েছেন। নতুন প্রজন্ম আর সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। যে কোনো সময় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে ফিদেল কাস্ত্রোর সমাজতন্ত্র কিউবা।
আর, এই কিউবার কোহিমার নামের এক জেলেপাড়ায় জীবনের একটি বড়ো সময় কাটিয়েছেন মহত্তম লেখক আর্নেস্ট হেমিংয়ে। তার নোবেল পুরস্কারের পুরো টাকা খরচ করেছেন জেলে পল্লীর কল্যাণে।
প্রথাগতভাবে তারেক অণুকে ট্যুরিস্ট বলতে হয়। কিন্তু তিনি গৎবাঁধা ট্যুরিস্ট নন। একধরনের মুসাফিরি তার চলনে-বলনে ও লেখায় পাই। যেখানেই গিয়েছেন, সেখানকার মাটি ও মানুষকে তিনি পরম শ্রদ্ধায় গ্রহণ করেছেন। অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন সেখানকার সংস্কৃতির প্রতি। এমন সংস্কৃতিবান ও প্রকৃতিদরদি মানুষের থেকে শেখার আছে অনেকটাই।
লেখক হওয়ার পূর্বশর্ত পাঠক হতে হয়। তারেক অণু এই সোনালি নিয়ম জানেন ও মানেন। প্রচুর পড়েছেন তিনি। তার পড়াশোনা বিস্তৃত করেছে দেখার জগতকে ও প্রভাবিত করেছে লেখাকে। ভ্রমণকাহিনি মানে তিনি শুধু বইয়ের সমস্তটা জুড়ে রঙিন ছবি দিয়ে ভরিয়ে রাখা বোঝেন না ; দরকারি ছবি আছে বটে। তবে তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তারেক অণু ভালো লেখেন। তারচাইতে বেশি ভালো বলেন। তাই তার লেখা পড়ার আগে কথা শুনলে প্রত্যাশা বেশি তৈরি হয়। আমার ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। নিঃসন্দেহে বইটা সুপাঠ্য ভ্রমণকাহিনি এবং বিস্তৃতি অনেক বেশি। তবুও আরও সমৃদ্ধ গদ্য আশা করেছিলাম।
বাঙাল মুলুকে বসে সারা দুনিয়া চক্কর দিতে চাইলে পড়ুন তারেক অণুর 'পৃথিবীর পথে পথে'।
বিশাল কৌতুহল নিয়ে প্রতিটি পাতা পড়েছি। তুষার পাহাড়, ইনকা সভ্যতা, মায়ান, কিউবার মানুষ, ডারউনের বাড়ি, ইংল্যান্ডের স্টোনহেঞ্জ, ক্যারাবিয়ান সাগরের অতল, ফ্রাঙ্কফুটের বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলা, ভ্যাটিকান সিটির জাদুঘর, মাইকেলঞ্জেলোর চিত্রকর্ম, ভিঞ্চির গ্রাম, যেন পুরো পৃথিবীটাই ঘুরে এলাম এই তিনশত পাতার মলাটে। নাম না জানা কত জায়গা যুক্ত হল স্বপ্নের বাকেট লিস্টে! আর অবাক হই, এক জীবনে মানুষ (লেখক) আর কত জায়গা ঘুরতে পারে! হয়ত কখনো পা রাখার সুযোগ হবেনা, বই পড়েই রোমাঞ্চিত হতে ক্ষতি কি?!
মানসিক মিল আছে এমন একজন লেখকের বই পড়তে পারা সবসময়ই আনন্দের। পাশাপাশি পড়ার রেফারেন্সগুলোতে যখন মিল পাওয়া যায় তখন জীবনবোধটা আরো পরিচিত ঠেকে। বইটা পড়তে পড়তেই ভাবছিলাম কত বড় লেখকের জীবনটা! কত বিস্তৃত, কত সুবিশাল! জীবন বড় হওয়াই জরুরি, লম্বা নয়। এই কথাটা অনু তারেকের ক্ষেত্রে পুরোপুরি মিলে যায়। মেক্সিকো উপসাগরে ডুব দেয়া বা আমাজনে হাউলার বানরের ছবি তোলা বা পেরুর মাচু পিচু দেখা এগুলো তো কয়েকটি ঘটনা মাত্র! পুরোটা সময় লেখকের সাথে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ালাম আর উপভোগ করলাম প্রাণ ভরে।
কিছুদিন আগেও কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করতো পৃথিবীর কোথায় কোথায় যাবার ইচ্ছা আছে আমার, মাথায় কেবল কয়েকটা নামই আসতো - প্যারিস, ভেনিস, ইজিপ্ট, কোলকাতা । এই চমৎকার বইটি পড়ার পর সেই তালিকায় যোগ হয়েছে আরও অনেকগুলি নাম- ফ্লোরেন্সের মিউজিয়ামগুলো, তিব্বতের আকাশছোঁয়া পর্বতসমূহ, রিওর ফাভেলা নামের বস্তি শহর, কিউবা, ইনকা ও মায়া সভ্যতা, ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা, আরও কত কি ! প্রতিটা চ্যাপ্টার-ই যথেষ্ট যত্ন নিয়ে লেখা । লেখকের সাথে আমিও রয়েছি এমন ইল্যুশনে পড়াটাও খুব অস্বাভাবিক নয় । আগ্নেয়গিরি থেকে তুষারপথ, অতল সমুদ্র থেকে পাহাড়চূড়া, মিউজিয়াম থেকে বস্তির জনপদ; ম্যারাডোনা, লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি, ডারউইন, ম্যান্ডেলা এমন সব কিংবদন্তীর নিজ বাসভূমি সবই স্থান পেয়েছে সাত অধ্যায়ের এই বইটিতে । আকর্ষণীয় এত সব জায়গায় লেখকের অবাধ বিচরণ পড়ে অনুভব হয় কিছুই দেখা হোল না, জানা হোল না । বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণকাহিনী যে নেই তা নয়, তবে তা খুবই সীমিত । লেখকের বইটি এতে নতুন সংযোজনা । আশা করি, নিজ অভিজ্ঞতার ঝোলা থেকে এমন আরও নতুন নতুন বই লিখে তিনি সমৃদ্ধ করবেন আমাদের সাহিত্যকে । ঘরকুনো বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে এই বইটি ।
এই বইয়ের ত্রুটি বলতে যেটা বেশী চোখে পড়ে তা হল এর প্রায় সব ছবিই সাদাকালো । মূল্যের কথা চিন্তা করেই হয়তো রঙিন করা হয়নি ( যদিও তা যথেষ্টই মনে হয়েছে !) ।
“এই ছেলেটার নাম কি জানো? -এই ছেলেটা তারেক। একসঙ্গে কাজ করে সে মাত্র গোটা চারেক!”
জনপ্রিয় ছড়াকার লুৎফুর রহমান রিটনের লেখা এই ছড়াটি “পৃথিবীর পথে পথে” বইয়ের ফ্লাপে শোভা পাচ্ছে। পুরো ছড়াটি পড়ে পাঠক আলোচ্য বইয়ের লেখক তারেক অণু’র ঠিকুজি জেনে যাবেন। সব্যসাচী তারেক অণু ‘পর্বত শিখর জয় করতে ভালোবাসেন, ডুব দেন সাগরতলে, তার চেয়েও বেশি উপভোগ করেন পাখির পিছনে দৌড়ে সকালকে বিকেল করে দিতে’। পর্যটক ও অভিযাত্রী তারেক অণু তাঁর বিভিন্ন ভ্রমণ এবং অভিযাত্রা নিয়ে লিখেছেন নানা পত্রিকায় এবং অনলাইন ব্লগে। বাংলা সাইবার জগতে বেশ জনপ্রিয় ব্লগার উনি। তাঁর লিখিত সমস্ত ভ্রমণ-গল্প এবং এডভেঞ্চার স্থান করে নিয��েছে “পৃথিবীর পথে পথে” বইতে।
আলোচ্য ভ্রমণ-সংকলনের একটি বৈশিষ্ট্য প্রথমেই উল্লেখ করা দরকার। সাধারণত ভ্রমণকাহিনীগুলোর বিস্তৃতি সীমিত কিছু অঞ্চলে আবদ্ধ থাকে এবং লেখকের প্রচেষ্টা থাকে সেসব দেশ কিংবা অঞ্চলের গল্প তুলে ধরা। কিন্তু তারেক অণু তাঁর বইকে অল্পস্বল্প অঞ্চলে আবদ্ধ রাখেন নি। তাঁর ভ্রমণ-গল্পের বিস্তৃতি হিমালয় থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর, ভিসুভিয়াস থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা, তিব্বত থেকে প্যারিস, এক্রোপলিস থেকে মাচু পিচু, চিতোয়ানের গহীন বন থেকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির গ্রাম পর্যন্ত। সর্বমোট ৪৫ টি ভ্রমণকাহিনী নিয়ে সাজানো ‘পৃথিবীর পথে পথে’ গ্রন্থকে লেখক বিষয় ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে সাতটি অংশে ভাগ করেছেন। এতে পাঠকদের সুবিধে হলো-একই গোত্রীয় কাহিনীগুলো একসাথে উপভোগ করতে পারে। মোটা দাগে বিভক্তিকরণ সঠিক বলেই মনে হয়, যদিও আমি মনে করি “মানুষের গল্প জনপদের গল্প” অংশে থাকা ‘ডারউইন তীর্থে’ এবং ‘কারাগারের মালি ম্যান্ডেলার পদক্ষেপে’ কাহিনী দু’টো বরং “পথের বাঁকে ইতিহাস” অংশেই মানায়।
বইয়ের শুরু “তুষার ও অগ্নির উপাখ্যান” দিয়ে। লেখক একজন অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। তাঁর এডভেঞ্চারগুলোর বর্ণনা মিলবে এই অংশে। লেখক তাঁর পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন, বেশ গুছিয়ে। তাঁর লেখা পড়ে পাঠকে ঘুরে আসে বিশ্বের উচ্চতম বেস ক্যাম্প থেকে, লেখকের কষ্টকর অভিজ্ঞতা থেকে ওখানকার জীবনযাত্রার কিছুটা ছোঁয়া পায়। প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ‘মঁ ব্লাঁ’ জয়ের গল্প পড়ে গর্বিত হয়েছি। আরো একটি প্রথমের সাথে লেখকের যোগ রয়েছে। অভিযাত্রী ইনাম আল হকের সাথে একত্রে উপস্থিত হয়েছেন একেবারে উত্তর মেরুতে,এখানেও বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রথম। উত্তর মেরুতে পদার্পণের সেই অসাধারণ গল্প পাঠককে মোহাবিষ্ট করবে, জেগে উঠবে মেরু ভালুকে দেশে ভ্রমণের ইচ্ছা।
কোনো ভ্রমণকাহিনীই সার্থক হয়ে ওঠে না যদি না ওতে মানুষের কথা উঠে আসে। মানুষ,সভ্যতা এবং সংস্কৃতি- ভ্রমণ-গল্পের অতি গুরুত্বপূর্ণ ক’টি উপাদান। তারেক অণুর গল্পে প্রায়ই উঠে এসেছে ভ্রমণাঞ্চলের মানুষের কথা,তাদের সংস্কৃতির কথা। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অংশটির নাম “মানুষের গল্প জনপদের গল্প”, যেখানে পৃথিবীর নানান রঙের-বর্ণের এবং প্রান্তের মানুষের চিত্র আঁকা হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক কলোনিগুলো ঘুরে ঘুরে লেখক সেখানকার বর্তমান চিত্র বোঝার চেষ্টা করেছেন। শ্বেতাঙ্গ ও ঔপনিবেশিকদের দ্বারা শোষিত, নিগৃহীত এবং বঞ্চিত আদিবাসীদের মুখের হাসির নিচে লেখক খুঁজে পেয়েছেন কান্নার শব্দ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আদিবাসীরা পৃথিবীর সর্বত্রই একই ভাগ্য বরণ করেছে। আলোচ্য অংশটিতে ফুটবলের শহর ব্যোকায় তারেক অণুর চরকির মতো ঘোরার খবর মিলবে; মিলবে নিশীথ সূর্যের দেশ নরওয়েতে কয়েকজন মিলে রোড ট্রিপের ঠিকুজি। ব্রাজিলের বস্তি শহর ফাভেলা,যা মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানকারীদের স্বর্গ, সেখানে লেখকের ভ্রমণের ইচ্ছা জ্ঞাপন পাঠককে একটু বিস্মিত করতে পারে যদি না লেখকে বিচিত্র খেয়ালের সাথে আগে থেকেই পরিচয় থাকে। একদিকে লেখক ঘুরে আসেন পবিত্র ক্রুশের পাহাড় থেকে, দর্শন নেন রিও’র যিশু’র; অন্যদিকে ডারউইনের বাড়ি ভ্রমণ নিয়ে থাকেন উচ্ছ্বসিত। আমরা পরিচিত হই এক উদার ও মুক্তমনা মানুষের সাথে। আলোচ্য অংশটুকুর সবচেয়ে সুলিখিত এবং আকর্ষণীয় দু’টি রচনা হলো ‘‘আমার কিউবা দর্শন’’ এবং ‘‘নাম না জানা ইনকা গ্রাম,লুকোচুরি-রত শিশু এবং আমার মুচি বন্ধু’’। কিউবা নিয়ে রচিত লেখাটি একটু বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
পুঁজিবাদী মিডিয়ার কল্যাণে সমাজতন্ত্রে বসবাসরত কিউবা নিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তেই আছে বিভ্রান্তি; কেউ ভাবে কিউবায় চলছে একনায়কতন্ত্র,আবার কেউবা সমাজতন্ত্রের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে কিউবার নাম নেয়। লেখক দ্বীপ দেশ কিউবায় ১৫ দিনের ভ্রমণে সেখানকার অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা, লৈঙ্গিক সমতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা, দুঃখকষ্ট এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই দেখে নিয়েছেন। লেখকের মতে, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত কয়েকটি রাষ্ট্র- স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর সাথে তুলনায় না গেলে বলা যায়- কিউবার মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য পুঁজিবাদী ও উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় ভালো আছে। তাদের দেশের আছে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা এবং শতকরা ১০০ ভাগ শিক্ষিত একটি জনগোষ্ঠী। কিউবায় থাকাকালীন অবস্থায় লেখক কোনো পথ-শিশুর সন্ধান পান নি জানিয়ে লেখক উন্নয়নশীল দেশ ভারতের সাথে কিউবার রাষ্ট্র-পরিচালনার তুলনা করেন। সমস্ত রচনায় লেখকের কিউবার প্রতি লেখকের এক ধরনের সহানুভূতির আভাস মেলে; নানা উদাহরণ টেনে এনে কিছুটা সমালোচনার চেষ্টা করলেও লেখকের কিউবার জন্য এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব একেবারে সুস্পষ্ট। রাষ্ট্র কর্তৃক সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও উঠে এসেছে লেখায়। আশ্রয়দাতা ডাক্তারের কম বেতন নিয়ে আক্ষেপের কথা পড়ে বুঝা যায় মানুষের জিনে মিশে থাকা উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা এবং অন্যের চেয়ে বেশি পাবার মানসিকতা কোনো তন্ত্রই এতো সহজে মুছে দিতে পারবে না; উর্বর জমি পেলে তা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইবেই।
“পৃথিবীর পথে পথে” গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়- ‘পথের বাঁকে ইতিহাসে’। আক্ষরিক অর্থেই লেখক ইতিহাসের পথে হেঁটেছেন এবং পাঠককে ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে ভ্রমণের স্বাদ দিয়েছেন। যদিও কয়েকটি রচনার পরিসর ছিলো খুবই অল্প; খুব অল্প বাক্যেই এসব ভ্রমণ-বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন তারেক অণু। এর কারণ হতে পারে- লেখকের ভ্রমণের সময়কালটিই স্বল্প ছিলো, যে কারণে আর বিস্তৃত বর্ণনা উঠে আসে নি। তবে পাঠকের প্রাপ্তি হতে পারে এই যে, একজন বাঙালি পর্যটক নিজ চোখে দেখে এসে এইসব ঐতিহাসিক স্থানের কাহিনী সামনে তুলে ধরছেন যা আগে কেবল দেখার উপায় ছিলো টিভিতে বা বিদেশি লেখকদের লেখা থেকে। ইনকা সভ্যতা নিয়ে লেখকের পর্বতপ্রমাণ আগ্রহ আমরা দেখি যখন তাঁর দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে বারবার ইনকা সভ্যতার নানা নিদর্শন ভ্রমণের গল্প আলোচ্য গ্রন্থে উঠে আসে। লেখক ঘুরে আসেন ইনকা সভ্যতার নিদর্শন সূর্যনগরী পিসাক, ইনকাদের সমাধিক্ষেত্র, ইনকাদের প্রাচীন দুর্গনগরী ওয়ানটাইটাইমবো এবং আধুনিক সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম মাঁচু পিচুঁ। শুধুমাত্র ইনকা সভ্যতাই নয়, অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতা এবং আদিবাসীদের জীবনযাত্রা চর্মচক্ষে দেখার ইচ্ছায় লেখক ঘুরে আসেন অ্যাজটেক শহর তেওতিহুয়াকান-যা পৃথিবীর সর্বপ্রথম মেট্রোপলিটন শহর। প্রমত্ত ভিসুভিয়াসের ক্রোধে ছাই হয়ে যাওয়া ভূমধ্যসাগরের ধ্বংস-নগরী এরকোলানো কিংবা রক্তাক্ত ওয়াটার মু’র যুদ্ধক্ষেত্র লেখকের ভ্রমণ পাঠককে ইতিহাসের মনোযোগী ছাত্র হয়ে উঠতে উৎসাহিত করবে। এসব ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন যুগের প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যগুলো ভ্রমণে লেখকের উৎসাহ প্রচুর; এর প্রমাণ মেলে যখন তিনি স্টোনহেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়ান কিংবা পিসার হেলানো মিনারের হেলে থাকার কারণ অনুসন্ধান করেন।
তারেক অণু একজন প্রকৃতি-প্রেমী, বিশেষ করে পাখির প্রতি তাঁর আগ্রহ এবং ভালোবাসার কথা উনি বারবারই বইয়ের বিভিন্ন রচনায় উল্লেখ করেছেন। যেখানেই গেছেন পাখির ছবি তুলেছেন। বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতা এবং উল্লেখযোগ্য স্থান ভ্রমণের পাশাপাশি তিনি অরণ্য ও সাগরে ভ্রমণের সুযোগ নিতে ভুল করেন না। ‘অরণ্য আড়ালে’ এবং ‘জলে কার ছায়া’ অধ্যায় দু’টিতে প্রকৃতিকে গভীরভাবে দেখার যে ইচ্ছা এবং প্রয়াস লেখকের আছে তা চোখে পড়ে। তারেক অণু অরণ্যশহর এবং মায়ান সভ্যতা নিদর্শন কালাকমুল ভ্রমণে গিয়ে অরণ্যের মা��ে হারিয়ে যান। আবার অদ্ভুত বাঁদরের চিৎকার শুনে গহীন বনে প্রবেশ করে শ্বাপদের মুখোমুখি হবার অভিযান পাঠককে নিশ্চিতভাবেই শিহরিত করবে। চিতোয়ানের গহীন বন কিংবা আফ্রিকার বুনো প্রান্তর- যেখানেই ঘুরতে যান না কেন, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে ভুল হয় না লেখকের। তারেক অণু যে কেবলই একজন পর্যটক নন তা তো আমরা তাঁর পর্বতারোহণের গল্প থেকে জানতে পারছিই, আরো নিঃসন্দেহ হই যখন মেক্সিকো উপসাগরে কচ্ছপ,পাখি ও ডলফিনের খোঁজে গিয়ে কিংবা ক্যারিবিয়ান সাগরে গিয়ে ডাইভিং-এ নেমে পড়েন। সাগরতলের ভ্রমণের রচনাগুলো খুবই সুলিখিত, এই গ্রন্থের মুক্তো বলা চলে।
পর্যটক, পর্বতারোহী, অভিযাত্রী এবং পাখি-প্রেমী তারেক অণুর আরো একটি বড়ো পরিচয়-তিনি বড়ো একজন বইপ্রেমী। সাহিত্য এবং শিল্পকলার ইতিহাসের মনযোগী পাঠক। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ভ্রমণ-গল্পে সাহিত্য এবং শিল্পকলা আলাদা জায়গা নিয়ে থাকবে। ‘সাহিত্য সাফারি’ এবং ‘কলাকেলি’ অধ্যায় দু’টি হলো লেখকের সাহিত্য ও শিল্পকলায় পরিভ্রমণের গল্প। বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বইয়ের দোকান শেক্সপিয়ার এন্ড কোম্পানি এবং ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলায় গিয়ে বই নিয়ে মেতে ওঠেন অণু। ভূ-গোলকের অন্য প্রান্তে অবস্থিত কিউবায় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্রিয় সাগর এবং বাসস্থানের চিত্র আমাদের জন্য নিয়ে আসেন তিনি। আনা ফ্রাংকের বধ্যভূমির গল্পে মনা ভারী হয়ে আসে, আবার হ্যামিলনের বাঁশি-ওয়ালার গল্পে পুলকিত হতে হয়। ভাস্কর্য ও চিত্রকলার শহর ফ্লোরেন্সে গিয়ে যখন সামনাসামনি মাইকেলেঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ দেখার বর্ণনা লেখক দেন তখন পাঠকের শুধু ঈর্ষান্বিতই হতে হয়। ঈর্ষান্বিত হবার ‘সুযোগ’ আবারো ঘটে যখন পাঠক আক্রোপলিসের চুড়োর খবর পান, বা মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্যের একটি হাজিয়া সোফিয়ার ভ্রমণকাহিনী জানতে পারে। কৌতূহলী লেখক এরপর পাঠককে ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চির গ্রাম এবং ভ্যান গগের জাদুঘর থেকে। এই গ্রন্থের শেষ এই দু’টো অধ্যায় পাঠ শেষে পাঠক নিজের মধ্যে সাহিত্য এবং শিল্পকলার ইতিহাস অধ্যয়নের একটি তাগিদ অনুভব করবে।
লেখকের ছবি তোলার হাত দারুণ। ভ্রমণ-গল্পের বইয়ে পাঠকের প্রথম যে চাহিদাটি থাকে সেটি হলো ভ্রমণ-স্থানের আলোকচিত্র। “পৃথিবীর পথে পথে” সেই চাহিদাটি খুব চমৎকারভাবেই পূরণ করেছে। অল্প কিছু ছবি রঙিন ছাপা হলেও বেশিরভাগ আলোকচিত্রই সাদাকালোতে ছাপা হয়েছে, যা পাঠককে সেগুলোর পূর্ণ-রস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত করবে। কিন্তু সব ছবি রঙিন ছাপাতে চাইলে বইয়ের মূল্য যে আকাশছোঁয়া হতো তাও আমাদের মাথায় রাখতে হয়।
তারেক অণু’র ভাষা সরল। যদিও কিছু কিছু লেখায় একটু জটিল শব্দ এবং জটিল বাক্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এসব লেখায় বাক্যের ফাঁকে ফাঁকেই কিছু অপ্রচলিত কিংবা কম প্রচলিত শব্দের আগমন ঘটেছে যা হয়ত -সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক নয়- এমন পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলবে। ধারণা করি- এসব লেখা তাঁর লেখক জীবনের প্রথম দিককার লেখা। পরের দিকে তাঁর ভাষা বেশ প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে যা পাঠকের জন্য যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক। যদি আলোচ্য গ্রন্থের সমালোচনা করতে হয় তাহলে একটা বিষয়ই বারবার মাথায় আসছে। আর তা হলো- এই ভ্রমণ-গল্পগুলোর অধিকাংশই খুবই ছোট্ট পরিসরে আবদ্ধ। যেসব জায়গায় তারেক অণু ভ্রমণ করেছেন সেখানকার জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতির গভীর পর্যবেক্ষণ এই গ্রন্থ থেকে আমি পাই নি। হয়তো এর কারণ হলো- ভিন্ন কোনো সমাজের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সেসব জায়গায় যতটুকু সময় অতিবাহিত করা প্রয়োজন তা লেখক করতে পারেন নি। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বলা যায়, এই গ্রন্থটি বাঙ্গালী পাঠকদের জন্য অনেক অসাধারণ স্থানের বর্ণনা একজন বাঙ্গালীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরেছে- যে কারণে এটি বাংলা ভ্রমণ-সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
বইয়ের সব চ্যাপ্টার একসাথে না পড়ে অনেক সময় নিয়ে অল্প অল্প করে পড়েছি। অনু তারেক এত জায়গায় গিয়েছেন এবং সে জায়গাগুলো যেভাবে অনুভব করেছেন এবং বর্ননা করেছেন সেটা অসাধারণ।
এসব জায়গায় কখনো গেলে জায়গাগুলোর বর্ননা এই বইতে একটু পড়ে নিতে হবে যাওয়ার আগে! কিছু কিছু অংশ (এই যেমন কিউবা নিয়ে লেখাগুলো) এত সুন্দর! আবার কোন কোন লেখা একটু এলোমেলো। সেটা অবশ্য লেখকের সমস্যা না। আমার ধারণা একটু তাড়াহুড়ো করে ছাপাতে গিয়ে এটা ঘটেছে।
অনেক লেখক একটা মাত্র জায়গায় গিয়ে সেটা নিয়েই অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে (যার বেশিরভাগই উইকিতে আছে) একটা বই বের করে ফেলেন! অনু তারেক অনেকগুলো জায়গা নিয়ে একটা বই লিখেছেন, অনেকটা সুনীলের 'পায়ের তলায় সর্ষে' টাইপ। অতিরিক্ত তথ্য না দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাগুলো শুধু শেয়ার করেছেন।
ভ্যাটিকানের ভেতরে ঢুকে আশ্চর্য চিত্রগুলি দেখতে ইচ্ছে করেছে, ক্যারিবিয়ানের জলের তলের জগৎটা দেখতে না পারার আফসোস হয়েছে, আশ্চর্য নিষ্ঠুর আর শীতল পাহাড়ের প্রতি জেগেছে সম্ভ্রম। তবে সবচেয়ে বেশি আবিষ্ট করেছে কিউবার অধ্যায়টা। এই পৃথিবীর মানুষেরা তাহলে কোথাও সত্যিই গড়ে তুলতে পেরেছে ক্যাপিটালিস্ট দানব আর কর্পোরেট প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত একটি প্রকৃতিবান্ধব সরল জীবন? দুর্ভাগ্যবশত, পরে শুনেছি এগুলি অনেকটাই অতিশয়োক্তি। তবে পাহাড় কত সুন্দর, সাগর কত বিশাল, পুরাকীর্তি কত বৈভবময় এসবের চেয়ে আমার মানুষ আর তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে পড়তে বেশি ভালো লাগে। সেই অংশটা এখানে অনেকটাই অনুপস্থিত।
কিছু কিছু বই আছে যেগুলো শেষ করতে ইচ্ছে করে না, যত ধীরেই পড়ি না কেন ছাড়া যায় না আবার শেষ হয়ে যাবার ভয়ে পড়াও যায় না। অসাধারণ একটা বই নিঃসন্দেহে, কয়েকদিনে যেন বিশ্বের ভু দেশ ঘুরে এলাম, বিনা পাসপোর্টে। বইটা পড়ার সময় নিজেকে গর্ধব মনে হচ্ছিল, কিছুই যে জানি না এ বিস্ময়কর বিশ্বের। তারেক অনু ভাই, আপনি আরো বহু বহু দিন বেঁচে থাকুন এবং আমাদের উপহার দিন এরকম বইয়ের, সেই আশায় থাকলাম :)
একাত্তর টিভির সবগুলো পর্ব আমি দেখেছি।আমার এত বেশি ভালো লেগেসে বলে বুজতে পারবো না। আপনার ভিডিও গুলা দেখে আমি নরওয়ে এর পরে গেসি।স্রষ্টার কাছে একটাই প্রার্থনা যেন একবার জন্য হলেও নরওয়ে গুঁড়ার জন্য যাইতে পারি সৌজন্যে smechportal