দুইখানি উপন্যাসিকা ও একটি বড়ো গল্প নিয়ে এই ‘মোহিনী মহাকালের ছায়া’। মোহিনী অর্থাৎ সম্মোহন, মহাকাল অর্থাৎ সময় এবং ছায়া মানে যা কায়াহীন, অশরীরী। নাহ, ভূমিকাতে এর চেয়ে বেশি কিছু বলব না। পাঠকই খুঁজে নেবেন এই নামের অন্তর্নিহিত অর্থ।
আর হ্যাঁ, ভয় মানে শুধুই ভূত নয়। ভয় একটা মানসিক ও সামাজিক সমস্যা যার থেকে এবং যার জন্য ভয়ের জন্ম হতে পারে। আর সেখান থেকেই শিউরে ওঠা কিছু অবয়বের জন্ম। তাদেরই হয়তো আমরা ভূত বলে থাকি।
মাঝেমধ্যেই আমার পাঠক ও ক্রিটিকস্বত্তার মাঝে যেই তুমুল ঝগড়াঝাঁটি লেগে যায়, তারই সাম্প্রতিকতম উদাহরণ অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের এই ছোট পেপারব্যাকটি। যেচে বই কিনে দোটানায় ভোগা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। তবে এই বইটির ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বটা কিছুটা অন্যরকম। একাধারে, আমার হরর-প্রেমী মনের পুরনোপন্থী গেঁয়ো ভালো-লাগা, অপর প্রান্তে আধুনিকতার যুগপৎ চোখ-রাঙানি!
লেখকের লেখা আমি আগে পড়িনি। তবে, ওনার যাবতীয় কাজ নিয়ে ভালো বই মন্দ কথা শুনিনি কখনও। কতকটা এই ট্র্যাক রেকর্ডের ভরসাতেই আলোচ্য সংকলনটি কেনা। অবশ্য, রংচঙে (উগ্র) প্রচ্ছদখানিও যে আমায় লোভাতুর করেনি, সেটা বলা অন্যায়। মিতদ্রু বিশ্বাস অঙ্কিত কভারটিতে মালায়ালম ছবি 'মণিচিত্রথার'-এর প্রভাব স্পষ্ট। যারা জানেন না, উক্ত ছবিটিরই হিন্দি রিমেক অক্ষয় কুমার ও বিদ্যা বালনের কাল্ট-ক্ল্যাসিক 'ভুল ভুলাইয়া'!
দুটো ছবিই ভারতীয় হরর ঘরানায় আমার ভীষণ প্রিয় কাজ। একইসাথে, তাদের ভীতিউদ্রেককারী আইকনোগ্রাফি নিয়ে আমি আজও ছেলেবেলার মতোই জেরবার। তাই বুঝতেই পারছেন, বইমেলায় বিভার স্টলে এই জিনিস মাত্র এক দেখায় কেনো আমি হঠাৎ হুজুগে বাড়ি নিয়ে আসি? (তবে, বইয়ের গল্পের সাথে সিনেমার কোনো সাদৃশ্য নেই, এটা বাঁচোয়া।)
আপনি বইতে পাচ্ছেন তিনটে বড় মাপের গল্প। যার মধ্যে, প্রথম দুটোকে উপন্যাসিকা হিসেবে দিব্যি দাগিয়ে দেওয়া যায়। লেখক ভূমিকায় স্বীকার করেছেন যে এই দুটিকে তিনি 'ইকোফ্রেন্ডলি প্রোডাকশন' নামক ইউটিউব চ্যানেলের অনুরোধে লিখেছেন। যা বই আকারে প্রকাশ পেলে যথানিয়মে পরিমার্জিত। তবুও, ফরমায়েশের সুবাস মুছে ফেলা যায়নি একেবারে। অনেকাংশেই, ওয়াচটাইম বাড়ানোর তাগিদে গল্পে স্থান পেয়েছে অতিকথন ও অহেতুক ফেনানি!
এই বাহুল্যের মাশুল যেই লেখাটি প্রাণ দিয়ে চুকিয়েছে, সেটার নাম 'মোহিনী মালঞ্চ'। বিরক্তি ও হতাশা সহিত গল্পটি আমায় ক্রোধান্বিত করেছে ক্রমাগত। কারণ ওই একটাই - সম্ভাবনার চূড়ান্ত অপমৃত্যু। অনেকেই আমার সাথে এখানে মতান্তর করতে পারেন। কারণ দিনের শেষে গল্পটি ভীষণ ক্লিশেড। প্রত্যন্ত গ্রামে নবদম্পতির আগমন, আঁধার কালো রেলস্টেশন, পুরোনো প্রাচীন অট্টালিকা, ওখানে কে হাটে রে, অভিশাপ, প্রতিশোধ...প্রভৃতি। তবুও, গল্পটি আমায় টেনেছিল অনেকদূর।
মাঝেসাঝে, এই পরিচিত ক্লিশে-কেত্তনেই খুঁজে নেওয়া যায় গা-ছমছমে ভালো লাগা। উপরন্তু, একটানা দাবদাহের পর যদি আপনার শহরে বৃষ্টি নামে শীতল, এবং পাঠক হিসেবে আপনার গায়ে থাকে একশো একের জ্বর, তাহলে চাদরের বেষ্টনীতে প্রেতিনীদের সঙ্গলাভেও মেলে নিষিদ্ধ স্বর্গসুখ। এখানেই লেখকের ভয়াল আবহ-সৃষ্টির ক্ষমতা ও আপাত-অর্থে সুখপাঠ্য গদ্যের প্রশংসা না করলেই নয়। তবে, একরাশ উগ্রতা, কার্টুনিশ ক্রিয়াকলাপ ও হাস্যকর ফ্ল্যাশব্যাকের নিষ্পেষণে গল্পটি ঢলে পড়ে অকালমৃত্যুর কোলে। ঘটে যায়, এক অদ্ভুত গল্পের অখাদ্য পরিসমাপ্তি।
তবে, ধৈর্য ধরা যায়। কারণ এর পরেই আপনি পড়বেন বইয়ের সেরা লেখা, 'মহাকালের গ্রাস'। আরেকটি অডিও-স্টোরি জাত গল্প ও অমন প্রাগৈতিহাসিক যুগের নাম শুনে আপনার মনে কু-ডাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে, ভরসা রাখুন। পুঁথিগত 'গ্রাম বাংলার হরর' হয়েও নভেলাটি 'মোহিনী...'র থেকে ভিন্নগামী, এবং নিজগুণে স্বতন্ত্র। যা আদ্যোপান্ত অলৌকিক হয়েও হিউম্যান হররে বিশ্বাসী। যার শিরা-উপশিরায় কিলবিল করে পুরুষমনের ঠুঁটো গুমোর, সেক্সীমের পচন ও বিকারের বহিঃপ্রকাশ। হয়ত বা সামান্য প্রেডিক্টেবল ও নাটুকে, তবুও ভীষণ মর্মস্পর্শী ও তীক্ষ্ম!
এই একটি কাহিনীর জেরেই, বইটি কেনা স্বার্থক হয়ে যায়।
বইয়ের শেষ কাহিনী, 'ছায়াসঙ্গিনী', এক সর্বনাশা প্ল্যাঁচেতের গল্প। যা বাকি দুটোর তুলনায় বেশ আর্বান ঘরানার। মানগত হিসেবে, লেখাটি উক্ত আলোচিত দুটো গল্পের মাঝবরাবর অবস্থান করে। অসামান্য নয় হয়তো। আবার অপাঠ্যও নয় একেবারে। তবে গল্পটি পড়তে গিয়ে নাকে এলো সামান্য ব্রাহ্মণবাদের গন্ধ। যা পাঠ-অভিজ্ঞতাকে সামান্য বিষিয়ে তোলে, এই আরকি।
বাকিটা এবার আপনার ওপর। বইটার রেটিং নিয়ে বেশ অশান্তিতে রয়েছি। মানতে হয় যে, এসব গল্প বাংলা হররকে এক ধাক্কায় অনেকটা পিছিয়ে নিয়ে যায়। সেই পুরোনো প্রাচীন গ্রাম-বাংলা, অভিসম্পাত, উগ্রতা, বাঁশঝাড়, ভ্যানগাড়ি। এসব জিনিস আর আজকের দিনে কোথায়? হালফিলের বুদ্ধিদীপ্ত, স্মার্ট, নির্মেদ আলৌকিকের বাজারে এসব লেখা, (বিশেষত প্রথমটি) একান্তই অবসলিট নয় কি? তবুও, ডায়েরিয়া গোছের তান্ত্রিকের হররের তুলনায় আমার এই 'খাড়া বড়ি থোর'ই সই, আর এখানেই আমি ঠ্যাটাস্ব ঠ্যাটা!