গবেষকদের জন্য একটা ভালো সহায়ক গ্রন্থ। এটি দ্বিতীয় পর্যায়ের মৌলিক গ্রন্থ বলতে পারি। আব্দুল করিম সাহেব একজন বড় মাপের ঐতিহাসিক তা তাঁর গবেষণা দেখলেই বোঝা যায়। বইটিতে তিনি তাঁর নিজস্ব মত, যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।
বইটি পড়ার পর মনে হচ্ছে বাংলার ইতিহাস এই মুহূর্ত পর্যন্তও গতিশীল। একটা শিলালিপি বা তাম্রশাসন কিংবা একটি মুদ্রা বদলে দিতে পারে অনেক কিছু। বইটি পড়বার সময় মাঝে মাঝে বেশ শিহরণ জাগে, এই বাংলায়, এই তো এই শহরের পাশেই আনাগোনা ছিল দুর্ধর্ষ যোদ্ধাদের, মনেই হয়না, মালদহের মতো একটা জেলায় ছিল সমগ্র বাংলার রাজধানী। এই মালদহ বা হুগলী থেকে বসে সুলতানেরা দাপটের সাথে শাসন করেছেন বাংলা।
সুলতানদের সময়ে বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে এমন তিক্ত সত্যও মানতে হয়। কৃত্তিবাসকে রামায়ন লিখতে অনুরোধ করেছিলেন কোন এক গৌড়েশ্বর। কে সেই গৌড়েশ্বর? আব্দুল করিম মনে করেন, তিনি গিয়াশ-উদ-দিন আযম শাহ, যিনি সাহিত্য অনুরাগি ছিলেন, পারস্যের কবি হাফিযকে বাংলায় আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন।
বইটা ভালো। তবে দুটো বিষয় অনুপস্থিত ১. বখতিয়ার খলজির ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে বিশেষ আলাপ নেই ২. ধর্মপ্রচারে রাষ্ট্র কীভাবে ভূমিকা নিয়েছিলো সেটার আলাপ শুধু দান, মসজিদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। রেফারেন্সের জন্য বইটা সংগ্রহে রাখা যেতে পারে।
বখতিয়ার খিলজী নালন্দ আক্রমণ করেছেন, এসব ইতিহাস না পড়ে শুনে বলা লোকদের কথা। ওই সময়ের একমাত্র রেফারেন্স বই, ১২৫৭ সালে লেখা মিনহাজ ই সিরাজের তবকাত ই নাসিরীতে কোথাও নালন্দার উল্লেখ নেই। ইসলামে এ অঞ্চলে এসেছে মুসলিম বিজয়েরও আগে, আরব মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে ৭ম/৮ম শতকের দিকে। বখতিয়ার খিলজী ধর্ম প্রচারক ছিলেন না, ছিলেন বিজেতা। মুসলিম বিজয়ের পরে এসেছেন সূফী'রা। সূফী'র মুসলিম শাসকদের থেকে নিষ্কর জায়গা, জমি পেয়ে ইসলাম প্রচারের অনুকূল পরিবেশ পেয়েছেন। সূফী'রা শুধু ধর্ম প্রচারই করেননি পতিত বন জঙ্গল ও আবাদ করেছেন। যেটা রিচার্ড এম. ঈটন তার The Rise of Islam i n Bengal Frontier বইয়ে দেখিয়েছেন। ইসলামী পতিত জমি আবাদ করাও পূণ্যের কাজ। এজন্য দেখি খান জাহান শুধু ধর্ম প্রচারকই ছিলেন ছিলেন, সমাজ সংস্কারকও৷ জন কল্যাণে খনন করেছে দিঘী, নির্মাণ করেছেন অবকাঠামো, রাস্তা। এসব না জেনে কথা বলা উচিত না। আবদুল করিম সাহেব এসব জানেন বই বইটা লিখেছেন।