Jump to ratings and reviews
Rate this book

ঈশ্বরীতলার রূপোকথা

Rate this book
ঈশ্বরীতলার রূপোকথার মধ্যে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজৈবনিক উপাদান আছে অনেকটাই। কিন্তু সেই উপাদান আবছা। প্রকৃত অর্থে এটি শ্যামলের নিজস্ব সৃষ্টি। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনাথবন্ধুর সঙ্গে আমরাও জীবনের অর্থ খুঁজতে থাকি নির্জন প্রকৃতি আর জীবজন্তুর মাঝে। চিনতে পারি জীবনের নিস্পৃহ উদাসীন রূপটি। এমন অনন্য উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বিরল। রূপকথা হয়েও রূপকথা নয়। রূপোকথা।

192 pages, Hardcover

First published December 1, 1996

14 people are currently reading
265 people want to read

About the author

Shyamal Gangopadhyay

46 books19 followers
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম অবিভক্ত ভারতের খুলনাতে (অধুনা বাংলাদেশ)। খুলনা জিলা স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম জীবনে আনন্দবাজার পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন, ১৯৬১ সালে আনন্দবাজারে যোগ দেওয়ার পর তাঁর ছোটগল্প ‘হাজরা নস্করের যাত্রাসঙ্গী’, ‘ধানকেউটে’ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বৃহন্নলা’, কিন্তু দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ প্রকাশিত হওয়ার পরেই শ্যামলের লেখনী বাংলা পাঠকমহলে সমাদৃত হয়। ব্যক্তিজীবনে বোহেমিয়ান, সুরসিক ও আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর অন্যতম কর্তা সন্তোষকুমার ঘোষের সাথে তাঁর মনোমালিন্য হওয়ায় যুগান্তরে যোগ দেন। যুগান্তরের সাহিত্য পত্রিকা অমৃত সম্পাদনা করতেন। ১৯৯০ সালে অবসরের পরে আজকাল পত্রিকা ও সাপ্তাহিক বর্তমানে নিয়মিত লিখেছেন। গ্রামীণ জীবন, চাষবাস, সম্পর্কের জটিলতা ইত্যাদি শ্যামলের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১৯৯৩ সালে শ্যামল সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন ‘শাহজাদা দারাশুকো’ উপন্যাসটির জন্যে। এছাড়া তাঁর লেখা দেশ বিদেশের নানা ভাষাতে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
69 (81%)
4 stars
14 (16%)
3 stars
2 (2%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 30 of 44 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,667 reviews427 followers
October 1, 2022
কোনো বই পড়ে খুব বেশি ভালো লাগলে আমি সহসা সেটা নিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে পারি না।ব্যাপারটা অবশ্য স্বাভাবিক। মহৎ যে কোনো কিছুর সামনে পড়লেই নাকি মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়।
কিছু কিছু বই পড়লে মনে হয় ধরে ধরে সবাইকে পড়াই। সবাই সেই বইতে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়, আনন্দ আর বিশালতা উপলব্ধি করুক সেটা চাই।
"পথের পাঁচালী" যে অর্থে, "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা " ঠিক সে অর্থে ধ্রুপদী সাহিত্যকর্ম। জীবনের নিরন্তর প্রবাহমানতা; হাসি, কান্না, ব্যর্থতা, গ্লানি সবকিছুকে সঙ্গী করে আমাদের যে পথচলা তা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মহাকাব্যিক ঢঙে রচনা করেছেন। মহাকাব্যের রচয়িতা যেমন কোথাও থামতে জানেন না, যতো বড় ঘটনা হোক বাড়তি গুরুত্ব পায় না, যতো ছোট ঘটনা হোক বাদ যায় না, কোনোকিছুর প্রতিই বাড়তি আসক্তি বা বাড়তি বিরাগ নেই (কারণ সেটাই জীবনের নিয়ম) - অনাথবাবুর জীবনচক্র ঠিক সেভাবে বর্ণনা করেছেন লেখক।

ঈশ্বরীতলা কি অলীক? পৃথিবীতে কি সত্যিই ঈশ্বরীতলা বলে কিছু আছে? যেখানে অনাথবাবু আর তার ছোট্ট সংসার, যেখানে তার মাটিবর্তী জীবনের স্বপ্ন, যেখানে তার অজস্র গৃহপালিত পশুপাখি (লোকের ভাষায় চিড়িয়াখানা), যেখানে জীবন তার মঙ্গলময় হাত দিয়ে অনাথবাবুকে স্পর্শ করেছিলো, কিন্তু ... মানিকবাবু "জননী "উপন্যাসে যেমন বলেছেন -
"সংসারে শ্যামা মানুষ দেখিয়াছে অনেক,এরকম খাপছাড়া অসাধারণ মানুষ একজনকেও তো সে স্থায়ী কিছু করিতে দেখে নাই।সংসারে সেটা যেন নিয়ম নয়। সাধারণ মোটা-বুদ্ধি সাবধানী লোকগুলিই শেষ পর্যন্ত টিকিয়া থাকে, শীতলের মতো যারা পাগলা, মামার মতো যারা খেয়ালি,হঠাৎ একদিন দেখা যায় তারাই ফাঁকিতে পড়িয়াছে।জীবন তো জুয়াখেলা।"


কিংবা "একজন কমলালেবু"তে শাহাদুজ্জামান যেমন বলেছিলেন,
"কারণ তিনি জানেন মৌমাছি যত আনন্দেই উড়ুক, তাকে ঠুকরে খাবার জন্য আছে দাঁড়কাক, প্রজাপতি যে ফুর্তিতেই তার রঙিন পাখা মেলুক, তার সেই পাখা ছিঁড়ে ফেলবার জন্য প্রস্তুত আছে দুষ্ট ছেলের দল । একজনের আনন্দ, প্রেম নস্যাৎ করবার জন্য বরাবর ওত পেতে আছে কেউ । জীবন, জগৎ সবকিছুর ভেতর একটা গভীর অসহায়ত্ব আছে যেন, আছে আশ্রয়হীনতা, এমনই মনে হচ্ছে তাঁর।"


পৃথিবীতে অনাথবাবুদের আজীবন ঠকেই যেতে হয়। ঈশ্বরীতলার স্বপ্ন সফল হয় না, সফল হতে নেই!!
Profile Image for ORKO.
196 reviews198 followers
October 4, 2022
আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে জন্মের পর শৈশব নামের যে ঐশ্বর্যকে মানুষ একবার পায়, মালাকুল মওতের সাথে মোলাকাত হবার আগ পর্যন্ত নাকি তাকেই খুঁজে ফেরে বারবার। কিন্তু হাইওয়ে ব্যান্ডের "ঘোরগাড়ি" গানটার মতোই সেই কতশত মায়ার ছবি,রঙিন ছবির নেশায় হারিয়ে ফেলতে হয় সবকিছুকেই। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা ঈশ্বরীতলার রূপোকথার অনাথের মতে,
"ফেলে আসা সেই সময়টার ওপর এখন কতদিনের নতুন নতুন সময় এসে পুরোনো সময়টাকে চাপা দিয়েছে। খুঁড়ে খুঁড়েও সে সময়টাকে আর পাওয়া যাবে না।"  ঈশ্বরীতলার রূপোকথা আমাকে টেনে নিয়ে ফেলে সেই পুরোনো ছেঁড়া খোঁড়া সময়ের রিলে পেঁচিয়ে থাকা পারস্পরিক বিচ্ছিন্ন স্মৃতিতে। স্কাইস্ক্র্যাপারের চিবুক ছুঁয়ে থাকা শরতের রোদ্দুরে জাদুবাস্তব ঈশ্বরীতলার স্পর্শে  পাকস্থলীপরায়ণ এই জীবনের ডিলেমাগুলো নিভে যেতে থাকে, সয়ে যেতে থাকে,ম্লান হতে হতে এক সময় হারিয়ে যায়। অনাথবন্ধু বসু আর ঈশ্বরীতলার উপাখ্যানের পাশাপাশি আমার ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো নীরব থেকে চাপা শব্দ, ক্রমশ জোরালো হতে হতে সুতীব্র হয়ে ওঠে। 
কোনো এক ঝিম ধরানো দুপুরে ছাতিম গাছের নিচে দাঁড়ানো বাবাকে বলতে দেখি, "মনোযোগ দিয়ে শুনে দেখো, বাতাসে কাঁপতে থাকা পাতার আওয়াজ একেক রকম। নিমপাতা আর তালপাতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের সুর এক না। শুকনো পাতায় বিলি কেটে দেয়ার সময় মর্মরধ্বনি তুলে গাছেরা কথা বলে বাতাসের সাথে, এ এক অদ্ভুত যোগাযোগ।" এই কথাগুলো সেদিন থেকে আমার মাথায় অশ্বত্থের মূলের মতো বহুদূর পর্যন্ত শেকড়বাকড় ছড়িয়ে দেয়। তারপর থেকে পাকুড়, ছাতিম গাছ কিংবা শরবন যেখানেই হাওয়া ওঠে আমি শব্দ শোনার জন্য কান পেতে দাঁড়িয়ে পড়ি। বাতাসে গাছের পাতার এলিয়ে পড়ে লুটোপুটি খাওয়া দেখতে থাকি দু'চোখ ভরে। পাতাঝরা গাছগুলো বছরে নিয়ম করে একবার বৃদ্ধ হয়। তাদের শনের মতো পাকা চুলে হাত বুলিয়ে দিতে গেলে ঝরে যায় একটা দুটো পাতা। এভাবে এক সময় মাথাটা ফাঁকা হয়ে যায় ভ্লাদিমির লেনিনের মতো। তারপর আবার প্রাণের স্পন্দন জাগে তাদের শরীরে। কচি সবুজ পাতাগুলোকে রৌদ্রস্নান করিয়ে ঘুমপাড়ানি গান শোনাতে শোনাতে বড় করতে থাকে বাউলা বাতাস। আবার তরুণ হয়ে ওঠে তারা।
অভিজাত পাইন কিংবা আহারের দুনিয়ায় রাজাধিরাজ ধানগাছের পলকা,ক্ষুদ্র রেণুগুলো মায়ের গর্ভে যায় এই পবনকুমারের উপর সওয়ার হয়েই। শিমুলের ফলে ফলে টোকা দিয়ে তুলাকে দেশ-বিদেশ ঘুরাতে থাকে চৈতালি কিংবা বৈশাখী বাতাসেরা। রৌদ্রস্নানের সময় বাতাসের সুরে নাচতে থাকা ঝাঁকড়া গাছগুলোর তলায় দাঁড়ালে দেখতে পাই আলো-ছায়ার দুই রঙা ক্যালাইডোস্কোপ...পলে অনুপলে অবস্থান বদলাতে থাকে তাদের। এভাবেই একদিন তুমুল বর্ষণের কোনো দুপুরের শেষে দোতলার বারান্দায় উঠে আসা চামেলিফুলের লতায় খেলে যাওয়া জলো হাওয়ার স্পর্শের শিহরণ আমি অনুভব করতে শিখে যাই। তারপর এসব দেখতে দেখতে কখন যে আমার বুকের অলিন্দে গজিয়ে ওঠে বাঁশফুল আমনের ক্ষেত সেটা টেরও পাই না। আমের মুকুলের গন্ধে মাখা হাওয়ার আদরমাখা স্পর্শে মাটির কোলে নিজেকে সেই প্রথম আবিষ্কারের পর থেকে ধানক্ষেতটা মাথা তুলে বাড়তে থাকে আমার মাঝে। মাসের পর মাস রোদে পুড়ে,বৃষ্টিতে স্নান করে বৃদ্ধি ঘটে তার। মুখে-চোখে-ঠোঁটে-গায়ে ভোরের শিশির জমে,রোদে হীরের মতো চকচক করতে করতে মিলিয়ে যায়।
ধানক্ষেতের দুই আলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া সেচপাম্পের পানির গন্তব্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে আমি খেয়াল করতে থাকি, খাদ্য-পিরামিডের ভূমি পতঙ্গে ও ছোট মাছে, ঘাসের বীজে ও কীটে,প্লাংকটন আর শ্যাওলায় ভরে যায় তারপর। তার উপরের ধাপে সারস,শামুক-খোল, পানকৌড়ি, ডাহুক- কেউ গাছের খোলে, কেউ শরের বনে এসে বাসা বাঁধতে শুরু করে। তাদের বাচ্চাদের জন্য এখন খাবারের অভাব নেই। অবশ্য কিছু বাচ্চা যাবে পিরামিডের আরো ওপরের ধাপে যারা আছে— শিকারী পাখি, সাপ, নেউল, ভাম – ওদের পেটে। মৃত্যুকে ঢেকে দিয়ে জন্ম মাথা তোলে। চতুর্দিকে জন্ম, কেবলই জন্ম। শুকনো পাতার স্তূপ ঢেকে যায় প্রফুল্ল মাশরুমে। সেই স্তূপের নিচে শঙ্খচূড় তার বলয়ের মধ্যে ডিম নিয়ে শুয়ে থাকে। গাছের উপরের বাসা থেকে সবচেয়ে রোগা শামুকখোলের ছানাটাকে তার ভাইবোনেরা ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। গাছের নিচে ওঁৎ পেতে থাকে ধেড়ে ইঁদুর। সেই পাখির ছানা মুখে করে নিয়ে গিয়ে তার নিজের বাচ্চাকে খাওয়ায়। প্রতিটি রক্তের ফোঁটা,প্রতিটি নীবার কণা প্রবাহিত হয় জীব শরীরে। এই বিপুল প্রাচুর্যের মধ্যেও কোনো অপচয় নেই।

বিদ্যেধরী নদীর মরা বাঁকের বাঁওড়ের কাছের এক স্বর্গছেঁড়া গ্রাম ঈশ্বরীতলা। এই ঈশ্বরীতলা ভূগোলের বাইরে হলেও এর নিজের একটা ভূগোল আছে,ইতিহাস আছে। ঈশ্বরীতলাতে যেমন রেলস্টেশন-স্টেশনবাজার-ধানেরগোলা-ব্যাংকবাড়ি-গম ভাঙানোর কল-আলুর চপের দোকান-সিনেমা হল-পঞ্চানন অপেরা আছে তেমনি আছে অবারিত ফসলের মাঠ, মাছের ভেড়ি, পয়স্তি চর, জলভরা বাওড়, কোম্পানির ব���ঁধ, ইরিগেশন ক্যানেল, ঘন জঙ্গল, পঞ্চাননতলার জাগ্রত থান। এখানে ভেড়ির মালিক অক্রুর বিক্রম মজুমদার, জনতার লোক রিটায়ার্ড ম্যাজিস্ট্রেট দক্ষিণা চক্রবর্তী, আপস্টার্ট বংশী চন্দ্র কাপালি’র সাথে জেলখাটা ডাকাত সন্তোষ টাকি, জুতোর দোকানদার একই সাথে যাত্রাপাগল জগাই, মৎস্যশিকারী-কাম-দিনমজুর মদন-বদন, অপার্থিব জগতের মানুষ মহম্মদ বাজিকরও আছেন। কলকাতার খুব কাছের হয়েও একেবারে জগতবিচ্ছিন্ন, মফস্বল শহর আর গাঁয়ের সুবিধা-অসুবিধা, তার নানা রঙের মানুষ, কখনো সবাক জীবকুল কখনো সচল প্রকৃতি মিলিয়ে ঈশ্বরীতলা যা এমন ধারা স্থানের দেখা মেলে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘মাকোন্দো’তে,আর. কে.নারায়ণের ‘মালগুডি’তে। 

বইটা হাতে নিয়ে উলটে পাল্টে দেখার সময় একদম শুরুতে চোখে পড়ে আমার লেখা শিরোনামের প্রারম্ভিক দুটি লাইনে— 'কবে যে প্রথম অপমানিত হয়ে মনে মনে চুপ করে যেতে শিখেছিলাম তা এখন আর মনে নেই। তেমন অনেক আশা করে একদম কিছু না পেতে পেতেও আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম।'
এর আগে লেখকের কুবেরের বিষয় আশয়,চম্পাহাটি পর্ব, আলো নেই, শাহজাদা দারাশুকো পাঠের অভিযাত্রা থেকে জানতাম তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাই তাঁর উপন্যাসের প্রধানতম কাঁচামাল। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় জীবনকে যতটুকু দেখেছেন, জেনেছেন; সেটুকু খুব নিবিড়ভাবে কাছ থেকে দেখা ও জানা। আর সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে তাঁর এই উপন্যাসগুলো। এজন্য তাঁর উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলো মাটির এত কাছাকাছি, এত সজীব ও সরস। তাই এই চরিত্রগুলো ঘিরেই প্রকাশিত হয়েছে, লেখকের জীবন-ভাবনা বা জীবনদৃষ্টি। জীবনদৃষ্টি বলতে এখানে বলতে বুঝাচ্ছি জীবনকে তিনি যে দৃষ্টিতে দেখেছেন, জীবন সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা কিংবা অনুভব বা উপলব্ধি। তাই হয়তো লেখক বলেন,"ঘুরে ফিরে যার কথা লিখতে চেয়েছি সে আমারই জানাশুনো এক লোক। তার নাম শ্যামল গাঙ্গুলি।"

ঈশ্বরীতলা আখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনাথবন্ধু বসু গ্রাজুয়েশন করা, ছাত্রজীবনে রাজনীতি-ডিবেট-প্রেম করা, কলকাতায় চাকুরিকরা একজন মানুষ যিনি নিরিবিলি থাকার জন্য ঈশ্বরীতলায় বাড়ি করেন। তাঁর সেই বাড়িতে তিনি তাঁর স্ত্রী শান্তা, দুই কন্যা টুকু ও লিলি, গৃহকর্মী বলাই, উমা নামের গাভী, কানাই নামের বাছুর, বজ্জাত নামের বেড়াল, বাঘা নামের কুকুর, অরুণ-বরুণ নামের রাজহাঁস, আটটা পাতিহাঁস, এগারোটা ছাগল যার বেশিরভাগ শুক্লা নামের এক ছাগীর সন্তানসন্ততি আর একান্নটা সাদা লেগহর্ন মুরগি নিয়ে বাস করেন। অনাথ সকালে কাঁকড়াভাজা সহযোগে গেলাসের পর গেলাস হাঁড়িবাঁধা তাড়ি খান, কখনো কন্যা টুকুকেও তার ভাগ দেন। টাটকা মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে অফিসে যান, সেখানে একজনে তিনজনের কাজ করেন আবার অল্প সময়েই অফিস থেকে বের হয়ে যান। অনাথ নিয়মত অফিস কামাই করেন যেমন তার কন্যারা নিয়মিত স্কুল কামাই করে। ইচ্ছে হলে তিনি কাজ ফেলে দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমান। অবসরে তিনি ডায়েরিতে নিজের ভাবনা লিখে রাখেন, নিরালায় তিনি
কুকুর-বেড়াল-গরু-ছাগল সবার সাথে তাদের ভাষায় কথা বলেন, তৃষ্ণা মেটাতে আকাশ অথবা জ্যোৎস্না পান করেন, মহম্মদ বাজিকরের অপার্থিব জগতের আলোয় নিঃশ্বাস নেন। অনাথ একই সাথে ঘোরতর সংসারী ও উদাস সংসারবিরাগী, একই সাথে চরম বৈষয়িক ও হাতখোলা। অনাথের চরিত্রের সাথে, জীবনযাপনের সাথে পাঠক কখনো নিজের অংশকে কখনো নিজের স্বপ্নের খণ্ডকে আবিষ্কার করতে পারবেন। তাই অনাথ পাঠকের কাছে মোটেও অজানা কেউ নন, বরং নিজের খুব চেনা, নিজের ভেতরের খুব একান্ত একটি চরিত্র। মার্কেজের বুয়েন্দিয়ারা যেমন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রবাহিত হন, ক্যানভাস সংক্ষিপ্ত হওয়ায় শ্যামলের অনাথবন্ধু বসু এক জন্মেই এক জীবন থেকে অন্য জীবনে প্রবাহিত হন। বার বার পরাজিত হতে হতে ঘুরে দাঁড়ান, সৃষ্টি করেন, সৃষ্ট জগত ধ্বংস হয়, পুনরায় নতুন কিছু নির্মাণ করেন। মানুষের হাসিতে আকাঙ্ক্ষা এখানে ফেনা হয়ে ভেসে ওঠে। এখানেই অনাথের স্বপ্ন আর রসস্থ জগৎ, আবার এখানে স্বপ্ন খানখান ভেঙে যায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর মানুষের কুটিলতায়। নিয়তি-নির্দিষ্ট অনাথ তখন অসহায়। ঈশ্বরীতলার নীল স্বপ্নের আবরণ ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে সংসারের স্থূল অভাবী চেহারা। গ্রাস করে অনাথের প্রিয় যা-কিছু সব। নিস্পৃহ ঔদাসীন্যে তা মেনেও নেয় অনাথ। অনাথের মনে হয় — 'আসলে শেষ অব্দি থাকে কি? থাকে তো এই মানুষটা। এই আমি। আমার দেখা। আমার তেষ্টা। আমার কষ্ট। আমার সুখ।"
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্মিত চরিত্রগুলোতে কাজ করে এক অপরাজেয় মানসিকতা। অত্যন্ত বিপর্যস্ত সময়েও হার না মানার মানসিকতা। তাই 'কুবেরের বিষয় আশয়' এর কুবের, "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা' অনাথকে আমার ভিন্ন কেউ মনে হয় না। উদাসীন এক বিশ্বজগতে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও মানবিক মর্যাদা রাখার জন্য শেষপর্যন্ত তারা চিন্তা-কল্পনা- আদর্শের জন্যে যুদ্ধ করে যায়। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এই যাত্রা।

এই বই পড়তে গিয়ে মার্কেজের পাশাপাশি আর যার লেখার কথা আমার বারবার মনে হয়েছে তিনি লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার। লিটল হাউস সিরিজের অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার নস্টালজিক করে তুলেছে।

মহৎ সৌন্দর্যের একটা আগ্রাসন আছে। উপসংহার টেনে দিয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় লেখার সমাপ্তি টেনে দিলেও ঈশ্বরীতলার রূপোকথার এই স্বপ্নের ভারে একটা সময় ভেঙে পড়ার আওয়াজের ঘোর আমাকে ছাড়তে চায় না। গালিবের কথার পাগলামি ধার করে বলতে ইচ্ছা করে,
"নহ্ গুল-এ নগহ্ হুঁ, নহ্ পরহ-এ সাজ, মৈঁ হুঁ অপনি শিকস্ত-কী আবাজ—
রাগিণীর আলাপ নই, সেতারের তার নই;
আমি কেবল একটি আওয়াজ, পরাজয়ে ভেঙে পড়ার আওয়াজ।"
Profile Image for Rubell.
189 reviews23 followers
July 9, 2024
আপাদমস্তক শহুরে হলেও কিছু মানুষ গ্রামের জীবনের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করেন। গ্রামের ঘরবাড়িগুলিতে সূর্যের আলো প্রবেশে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না ঘিঞ্জি অট্টালিকার ভীড়, সেখানে ইমারতের সারি চাঁদকে আড়াল করে না, ভোরবেলা মোরগের ডাক শোনা যায়, শীতের সময় খেজুরগাছে হাঁড়ি পাতা যায়- এইসব চিন্তা তাদের মাথায় ঘোরে; অথবা যাদের মনে হয়, একটাই তো জীবন- মৃত্যুর আগেই যদি প্রকৃতির সাথে, মাটির সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাহলে ভালো হয় না?
আর তিরিশ-চল্লিশের মাঝামাঝি বয়সীদের তো পরবর্তী প্রজন্ম সম্পর্কিত একটা বিশেষ চিন্তা ভারাক্রান্ত করে- পায়ের তলায় নরম সবুজ ঘাস স্পর্শ করার আনন্দ ওরা পাবে না?

মধ্যবিত্ত শহুরে ভাবুকদের মাঝে এইসব ভাবনা ভাবার মানুষ আছে, কিন্তু শহর ছেড়ে গ্রামের সুনসান ফাঁকা মাঠের মধ্যে বাড়ি করে বসবাসের সাহস কজনের আছে? অনাথবন্ধু বসুর আছে। যদিও ঈশ্বরীতলা এমন অজপাড়াগাঁ নয়, শহর থেকে খুব দূরেও নয়, সেখানকার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো।
যাহোক, শেষপর্যন্ত জীবনানন্দীয় নির্জনতা উপভোগের আকাঙ্ক্ষায় অনাথবন্ধু তার স্ত্রী কন্যাদের নিয়ে ঈশ্বরীতলায় ঘর বাঁধলেন। তার দুই শিশুকন্যা পেল বনের পাখির স্বাধীনতা, শামসুর রাহমান যেমন লিখেছেন, স্বাধীনতা তুমি/রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাতার- সেইরূপ উচ্ছ্বসিত স্বাধীনতা।

তারপর শুরু হয় ঈশ্বরীতলার আসল রুপোকথা। ভোরবেলা হরিতকী গাছে পাখির কলকাকলি, সবুজ ধানক্ষেতে হাওয়ার খেলা, বটগাছতলায় বিশ্রাম, বাঁশ বাগানের মাথার ওপর অ্যাসথেটিক চাঁদ, রাতের নক্ষত্রভরা আকাশে বিরাজ করা মহাজাগতিক নির্জনতা - এসব তো আবহমান গ্রামবাংলার জীবনের অ্যাপে��াইজার, মিলের মেইন কোর্স হচ্ছে মানুষের জীবন সংগ্রাম; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর টিকে থাকার সংগ্রাম, অভাবের দিনে দুই বস্তা ধান ধার নিয়ে ফসল উঠলে সুদসমেত তিন বস্তা ধান শোধ করার সংগ্রাম, বন্যা-খরা অথবা পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করার সংগ্রাম। সুপাত্রে বোনের বিয়ে দিয়ে ভাইয়ের দায়মুক্ত হবার পরীক্ষা।
দূষিত বিষাক্ত ভিলেজ পলিটিক্স, প্রেম, ব্যর্থ প্রেম, কেলেংকারী, চুরি-ডাকাতি, জেল-জরিমানা- গ্রামের মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে এইসব পেশা-পরিবার-রাজনীতি সম্পর্কিত পার্থিব উপাদানগুলিই মানুষের মনের স্��াস্থ্যকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থনৈতিক গুরুত্বে প্রজাপতির চোখধাঁধানো রঙিন পাখাকে সবসময় ম্লান করে দেয় মাজরা পোকার মথের ধূসর পাখা।

পাঠক হিসেবে ঈশ্বরীতলার রূপোকথা শহুরে ফ্লেভার মেশানো গ্রামীণ জীবনের পাঠশালার একটা গাইডবুক। আমরা ঈশ্বরীতলায় অনাথবন্ধুর সাথে ছিলাম। অনাথবন্ধু এবং তার স্ত্রী শান্তা আমাদের অন্যতম প্রিয় ফিকশনাল কাপল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। তাদের কন্যাদের শিশু থেকে কিশোরী, কিশোরী থেকে তরুণী হতে দেখি আমরা; শিশুদের চোখের সামনে মানুষ হতে দেখা সীমার মাঝে অসীমের অনুভূতি জাগায়, প্রকৃতির স্বাভাবিক এই ব্যাপারটাও কেমন বিস্ময় জাগানিয়া ঠেকে, আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি হয়, বয়সের ধাপে ধাপে তাদের জীবন আবিষ্কারের উচ্ছ্বাস আমাদের আনন্দিত করে। অনাথবন্ধু পরিবারের পোষা কুকুর বাঘার প্রতিও আমাদের মমতা জন্মায়। আর তাদের গরু উমা আর বাছুর কানাই - যারা জীবনে গরু পুষেছেন বা পোষেন তারা সবাই জানেন এই অবলা প্রাণীটা একটা ভালোবাসা!

একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঈশ্বরীতলার জীবনপ্রবাহ লেখক আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন। কত বিচিত্র সব চরিত্রের মানুষের দেখা মিলেছে ঈশ্বরীতলায়- সমব্যথী মানুষ, সংকীর্ণ মানুষ, ভাবুক মানুষ, জীবনে বড় হবার স্বপ্ন দেখা মানুষ, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা মানুষ, নিষ্পাপ মানুষ, লোভী মানুষ, উদার মানুষ, হিংস্র মানুষ,..., রিনির মত কোমল হৃদয়ের মানুষ- এক পৃথিবী সমান বেদনা যেন এই সুন্দরীর মনের দখল নিয়েছে!
আবার মহম্মদ বাজিকরের মত আধ্যাত্মিক মানুষের উপস্থিতি ঈশ্বরীতলায় যোগ করেছে রহস্য; এমন মিথিকাল মানুষের দেখা পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। তার কাছ থেকে নদী তৈরির আদ্যেপান্ত জানা দরকার।

ঈশ্বরীতলার রূপোকথা পাঠ একটা তীব্র ঝাঁকুনি দেয়, একটা প্রোফাউন্ড অনুভূতি জাগায়। কালজয়ী কোন উপন্যাস পাঠের ক্ষেত্রে এমন অনুভূতি হয়। এখানে জীবনকে গভীরভাবে অনুভবের আনন্দ আছে, সজীব নিঃশ্বাসের তৃপ্তি আছে, আর আছে গভীর বেদনা।

Dr. Suess এর একটা কোটেশন উল্লেখ করার ইচ্ছা হয়,
Don't cry because it's over. Smile because it happened.



[হারুন ভাই প্রথম বইটা পড়ার সাজেশন দিয়েছেন। অরূপ ভাইও সাজেস্ট করেছেন। এই দুজনের সাথে পরিচয়ের সুবাদে বহু ভালো ভালো বইয়ের সাথে পরিচিত হতে পারছি। এই দুজন আমার কাছে একটা ব্লেসিং। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।]
Profile Image for Shadin Pranto.
1,479 reviews561 followers
April 14, 2023
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে পরিচয় তাঁর আত্মজীবনী পড়তে গিয়ে। বাংলায় লেখা এত অপকট আত্মকথা আমি এখনও পড়িনি। সেই শ্যামলবাবুর ম্যাগনাম ওপাস 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা' পড়ব পড়ব করেও পড়া হচ্ছিল না। আজ পড়লাম এবং বেদনামিশ্রিত আনন্দের অনুভূতি হলো৷ সেইসাথে আফসোস আগে কেন পড়িনি অনাথবাবুর গল্প, ঈশ্বরীতলার কল্পকথা!


এই উপন্যাসের শুরুতে একটি সূচনা লিখেছেন শ্যামলবাবু। 'আমার লেখা' শিরোনামে সেই ভূমিকাটুকু পড়লে বোঝা যায় কত শক্তিশালী লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। সেই ভূমিকার পহেলা লাইন,

' কবে যে প্রথম অপমানিত হয়ে মনে মনে চুপ করে যেতে শিখেছিলাম তা আজ আর মনে নেই। '

এক নিশ্বাসে এই কথাগুলো পড়ে হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। এভাবেও বুঝি বলা যায়! মার্কেজের 'নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ' উপন্যাসের প্রথম লাইন স্মরণ হয়ে গেল।

এই 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'র মূল চরিত্র অনাথ বসু। তিনি কলকাতায় চাকরি করেন। স্ত্রী,দুই মেয়ে এবং বাড়িভর্তি নানান গৃহপালিত পশুকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে থাকেন ঈশ্বরীতলা গাঁয়ে।

একটি মধ্যবিত্ত সুখী গৃহস্থের প্রতিকৃতি অনাথবাবুর পরিবার। গৃহকর্তা অনাথবাবু অদ্ভুত রকমের ভাবুক মানুষ। সেই অনাথবাবুর সাথে পরিচয় হলো মহম্মদ বাজিকরের। বদলে গেলেন অনাথবাবু। গাঁয়ের চাষীদের নিয়ে  তিনশ বিঘা জমিনে ধান চাষের প্রকল্পে নামলেন তিনি।

এই প্রকল্প পালটে দিল অনাথবাবু এবং তার পরিবারকে। সেই বদলের কথা জানতে পড়ুন 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'।

পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের অনেক লেখাই আনন্দ দেয়। তবে, অনেকসময় মিল পাই না। যে নৈকট্য হুমায়ূন আহমেদের মধ্যবিত্তদের হাসি-কান্না নিয়ে রচিত উপন্যাসগুলো পড়ে অনুভব করি, সেই ধরনের নৈকট্য 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা' পড়ে অনুভূত হলো৷ অনাথবাবুর পোষা প্রাণিকূলের মনুষ্যবাচক নামের কারণে কাহিনি ধরতে কষ্ট হচ্ছিল। তবে একবার বুঝতে পারার পর তরতরিয়ে পড়ে গিয়েছি।
Profile Image for Shuhan Rizwan.
Author 7 books1,108 followers
October 23, 2021
গভীর রাতে চরম উত্তেজনার কোনো টাইব্রেকার অথবা শেষ ওভার দেখা হলে পরদিন সকাল ঘুম ভাঙার পরেও সেটার আবেশ থেকে যায়। কিংবা অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে দুর্দান্ত কোনো সিনেমা দেখে বাইরের আলোর জগতে ফিরে আসার পরেও অনেকক্ষণ মনে হয় যেন সিনেমার ভেতরেই আছি।

মহৎ কোনো সাহিত্য পড়বার পর ঠিক তেমনটাই ঘটে, তবে সেটার প্রভাব আরেকটু দীর্ঘস্থায়ী হয়। কারণ মহৎ সাহিত্য মানেই লেখকেরা এমন কিছু লেখেন, এমন ভেতরের কিছু; করোটির কোথাও সেটা একটা স্থায়ী বদল ঘটিয়ে দেয়। অক্ষরগুলো আমাদের ভেতরে কোথাও বসে যায়, অথবা আমরা নিজেরা হয়ে যাই লেখাটার অংশ। পাঠকের তাই শুধু নিজের বলতে কোনো ঠিকানা থাকে না। শেহেরজাদীর গালিচা থেকে এলিসের আয়না, ইস্তানবুল থেকে নার্নিয়া, অথবা কাৎলাহার বিল, সুখী নীলগঞ্জ, তেলেনাপোতা কিংবা জলেশ্বরী; সে নাগরিক হয়ে পড়ে আরো অনেক জনপদের।

অপূর্ব এই উপন্যাস তাই চিরকালের জন্য পাঠককে ঈশ্বরীতলায় এক টুকরো জায়গা করে দিলো।
Profile Image for Akash.
446 reviews149 followers
March 19, 2023
মহৎ কিছু সাহিত্য আড়ালে থাকে। তবে যখন হঠাৎ করে পাঠকের সামনে চলে আসে তখন পাঠকের জীবনে পড়া সেরা বই হয়। যে বইটার রেশ শেষ হবার নয়। যে বইটা শুধু একবার নয়, বারবার পড়তে হয়। আর যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, তোমার প্রিয় উপন্যাস কোনটা? তখন উত্তরে সেই বইটার নাম প্রথমে চলে আসে।

'আরণ্যক,' পুতুলনাচের ইতিকথা'র সাথে 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা' আমার বাংলাসাহিত্যের প্রিয় ত্র‍য়ী বইয়ে স্থান পেল।

পৃথিবী আবিষ্কারের নেশায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পৃথিবীর স্বরূপ চেনা অনাথবন্ধু আমার প্রিয় চরিত্র হয়ে থাকবে।

বইটা যারা পড়েননি তাদের সাথে ঈশ্বরীতলার জগৎটাকে একটু পরিচয় করিয়ে দেয়ার লোভে অনাথবন্ধুর একদিনের ডায়েরি বই থেকে সরাসরি তুলে দিলাম।

"অনাথবন্ধু লিখল-
আমার গৃহপালিত পশুদের মধ্যে পাতিহাসগুলিকেই আদৌ কোনো যত্ন করি না। উহারা উপেক্ষিত। সন্তানদের মধ্যেও লিলির উপর কোনো যত্ন নেওয়া হইতেছে না। লিলিও উপেক্ষিত। উহার মনে নিশ্চয় এই ভাবনাটি গাঁথিয়া বসিয়াছে।

আমি একদা ছিলাম এক নম্বরের শহুরে। সেই আমি ঈশ্বরীতলায় উঠিয়া আসিয়া পাড়াগাঁ, আধা-গঞ্জ এলাকার রস শুষিয়া নিতে শিখিতেছি। জীবন এখানে প্রত্যক্ষ। এখানেই চাঁদকে দেখিতে শিখিলাম। সূর্যকে চিনিতেছি।নির্জনতা বসিয়া বসিয়া অনুভব করার জিনিস। মানুষের হাসিতে আকাঙ্খা ফেনা হইয়া ভাসিয়া ওঠে। আমার সুবিধা,
আমার স্ত্রী সেকথা জানে না।

মহাভারতের পর যে মহাকাব্যের পাতা উলটাইয়া ভিতরে প্রবেশ করিলাম –তাহার নাম ঈশ্বরীতলা। এখানকার বাতাসে নুন আছে। প্রখর সূর্য অল্��দিনে তামাটে করিয়া দেয়। খেজুর নামক একটি রুক্ষ গাছের ভিতর দিয়া আমি ঈশ্বরীতলার পাতালের রস খাইতে শিখিতেছি।

বাঘা প্রভুভক্ত। উমা কৃতজ্ঞ। শুক্লা নম্র। লেগহর্নগুলি চপল। অরুণ বরুণ আমারই মতো বাতাসে আলোর গন্ধ পায়। শান্তা শান্ত, থমথম করিতেছে। এত পুরস্ত। এত ভরস্ত। কখনও কখনও মনে হয় বুঝিবা ও অন্য কোনো বৃত্তের বিষাক্ত কুঁড়ি।

কলম তুলে অনাথ ক্যানেলের ওপারে তাকাল।"

মহৎ সাহিত্যসৃষ্টি অবশ্যপাঠ্য 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'র স্বাদ নিজে আস্বাদন করে অপরকেও এই অমৃতের সন্ধান দিয়ে নিজেকে ধন্য করুন।

(২০ মার্চ, ২০২৩)
Profile Image for Farzana Raisa.
533 reviews239 followers
November 19, 2021
শুরুতেই বিশেষ দ্রষ্টব্য, গুডরিডসে বইটার নামে ভুল আছে। রূপোকথা হবে নট রূপকথা। এক মিনিট! রূপকথা মানে তো জানি কিন্তু রূপোকথা শব্দটার অর্থ কি?

আচ্ছা! আসল ব্যাপারে আসি। শহরের ভিড় পছন্দ হচ্ছে না বলে অনাথবন্ধু সিদ্ধান্ত নিলেন ফাঁকার মাঝে থাকবেন। গ্রামের খোলা প্রান্তর থাকবে চারদিকে, চরাচর মাতাল করা জ্যোৎস্না উঠলে হাঁ করে জ্যোৎস্না খাবেন, কখনও খাবেন শরতের নীলচে আকাশ, শীতের শিশির... যে ভাবা সেই কাজ, বাঁধের কাছে বাড়ি করে স্ত্রী-কন্যাদ্বয়কে সাথে নিয়ে সংসার পাতলেন। ধীরে ধীরে সেই সংসারে 'জন' বাড়তে লাগলো.. এই যেমন ছাগী শুক্লা, তার নাতি-পুতি, একগাদা লেগহর্ণ মুরগী, টানা টানা চোখের গাভীন উমা, তার দুষ্টু বাচ্চা কানাই, বেড়াল বজ্জাত, অনেক বেশি প্রভুভক্ত আর নবাব নবাব স্টাইলের বাঘা, বিউগল বাজিয়ে রাজরাজাদের মতো ভঙ্গীমায় চলাফেরা করতে থাকা রাজহাঁস অরুণ-বরুণ। আর কতো লাগে? বইটার কন্টেন্ট খুবই বিচিত্র। কলেজে চুটিয়ে রাজনীতি করা অনাথবন্ধু এখন পুরোপুরি সংসারী, মহম্মদ বাজিকরের প্ররোচনায় পড়ে মাথায় পোকা ঢুকে কিছু একটা করতে হবে... নেমে পড়ে বিশাল কর্মযজ্ঞে। আসলে উত্থান-পতন নিয়েই মানুষের জীবন। যখন মনে হয় এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল, আসলে হয়তো তা হয় না। হয়তো বা সেটা আরেকটা কিছুর শুরু।
ছবি যেমন রঙ তুলির আঁচড়ে একটু একটু করে ফুটে উঠে, লেখক ঠিক তেমনটি করে ঈশ্বরীতলাকে এঁকেছেন। কোম্পানি বাঁধের ধারে অনাথ বাবুর বাড়ি, মরে যাওয়া বিদ্যেধরী নদী, বাঁওরের কাছে জংলা মতোন বটতলার ধারে মহম্মদ বাজিকরের আস্তানা, যাত্রাপাগল ওরফে পাগলা জগাই, ভোট পাগলা দক্ষিণা মজুমদার, ডাকাত সন্তোষ টাকি.. বিচিত্র সব মানুষ আর বিচিত্র মানুষের জীবনাচরণ। এ যেন আরেক জগৎ। আচ্ছা, জাদুবাস্তবতা কি একেই বলে?


বইয়ের প্রধান চরিত্র অনাথ বাবু নাকি ঈশ্বরীতলা বিতর্কের বিষয়। অনাথবাবুকে কেন্দ্র করে পুরো ইশ্বরীতলার ছবি যেভাবে লেখক এঁকেছেন, বর্ণনা করেছেন (শুরু থেকে চলমান...) সেখান থেকেই হয়তো বা বইটার এই অদ্ভুত নামের উৎপত্তি। উৎপত্তি বা শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ যাই হোক না কেন মাথা না ঘামিয়ে বইটা পড়ে ফেলা দরকার। প্রচন্ডরকমের আন্ডাররেটেড একটা বই। ভাগ্যিস! বিসিএসের প্রশ্ন যারা করে ওদের চোখে এখনও বইটা পড়েনি। নয়তো পিএসসি ইদানিং যা শুরু করসে হুটহাট আন্ডাররেটেড বইকে ভাইরাল করে দেয়। :3 ভালো! ভালো! এক দিক দিয়ে দরকার আছে। কিছুটা তো প্রচার হোক...
Profile Image for Akhi Asma.
232 reviews463 followers
October 17, 2022
"দয়াল, দেখাও কত রঙিন ছবি
ছবির আশায় হারাইলাম সবই
দয়াল বানাও কত মায়ার ছবি
ছবির নেশায় ছাড়লাম সবই।"


বইটা শেষ করে আমার ঘোরগাড়ী'র এই লাইনগুলোই মনে পড়লো। রূপোকথা মানেই কি রূপকথা? কিন্তু আমার মনে হলো আসলেই যেনো কোন রূপকথা পড়লাম। উমা, কানাই, বাঘা, অরুণ-বরুণ, শুক্লা, টুকু, লিলি, শান্তা, অনাথবাবু, মদন-বদন, বলাই, রিনি, বিকাশ- সবাই যেন একটা রূপকথার-ই অংশ। আহা, কি মায়া বইটায়!

মনেহয় যেন অনাথবন্ধু গাইছেন-
"আমি হাবলায়, নদীর এপারে
ঘুমের ঘোরে দেখি তারে
ছবির মত ডাকে আমারে।"


ঠিক যেন ঈশ্বরীতলা অনাথবন্ধুকে ডাকছেন!
Profile Image for Ratika Khandoker.
306 reviews34 followers
March 7, 2022
" সকাল সকাল খেতে বসে অনাথ বলল,'আমরা আর কোনও দিন কিছু পুষব না' "

অনাথবাবুর এই কথাটির পিছের কষ্ট সেই বুঝবে,যে কখনো কোনো প্রিয় চার পেয়ে(বা দু'পেয়ে) বন্ধুকে হারিয়েছে।এই যেমন আমি বুঝি।সে কষ্টের তীব্রতা এত বেশি যে,এক লাইন ও তা নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছা করে না।বলব ও না তাই।
অনেক অনেক ভালো কিছু পড়লে,চেঁচিয়ে সবাইকে জানান দিতে ইচ্ছা করে,সবাইকে বলতে ইচ্ছা করে- এই বই না পড়লে তোমার জীবন বৃথা!
আবার একিসাথে কেন যেন মনে হয়,নাহ কাউকে বলবো না,একান্ত আপন করে রাখবো বইখানা।ঠিক কুড়িয়ে পাওয়া গুপ্তধনের মত।
ঈশ্বরীতলার রূপোকথা বইটি ঠিক এমনই এক গুপ্তধন।ঈশ্বরীতলা জায়গাটিও যেন এক খণ্ড স্বর্গ।মানুষের ভীড়-শহুরে যান্ত্রিকতা ছাপিয়ে কি অদ্ভুত সবুজ-নিবিড় ঈশ্বরীতলা।আর এই জায়গাটির সৌন্দর্য পূর্ণরূপে আস্বাদন করছিলেন অনাথবন্ধু এবং তাঁর পরিবার।পরিবারটি তাঁর বেশ বড়।স্ত্রী,দুই কন্যা ছাড়াও রয়েছে ছাগী শুক্লা ও তার পরিবার,লেগহর্ন পরিবার বর্গ,রাজহাঁস অরুণ-বরুণ,এক পাল পাতিহাঁস,গাই উমা,কুকুর বাঘা,আর বেড়াল বজ্জাত। এদের সক্কলকে নিয়ে একখানা ফ্যামিলি ফটোও তোলা হল একদিন।
কিন্তু জীবন কি আর ছবির মত একরকম থাকে? বা ছবির সকলেই কি আজীবন থাকে? ঈশ্বরীতলায় অনাথের জীবন যাত্রার স্বাদ তো আরো লোকে পেতে চায়।
পুরাতনকে সরিয়ে নতুনকে নিয়েই ঈশ্বরীতলা তার রূপোকথা বুনতে থাকে।
Profile Image for Adham Alif.
335 reviews81 followers
September 19, 2023
দুর্দান্ত! দুর্দান্ত!! দুর্দান্ত!!!
ঈশ্বরীতলার গল্প কিংবা অনাথবাবুর গল্প যাই বলি না কেন একেবারে আচ্ছন্ন করে রাখল আমায়।
Profile Image for Yeasin Reza.
512 reviews87 followers
September 6, 2022
মাত্রই শেষ করা উপন্যাস কিংবা যাপিত অন্য এক জীবনের রেশ থেকে বের হতে পারছিনা। ঈশ্বরতলার ভূগোল, ইতিহাস সেইসাথে ঈশ্বরীতলার মানুষের সুখ দুঃখের সাথে এত জুড়ে গিয়েছিলাম যে আমার মনে ঈশ্বরতলার স্থান হয়ে গেলো। ঈশ্বরতলার প্রকৃতি এবং মানুষের সাথে অনাথবাবুর যে ঘনিষ্ঠ সংলগ্নতা ও দার্শনিক মনোবৃত্তি তা খুব গভীর। লেখক এতটা মায়া নিয়ে ঈশ্বরীতলার বর্ণনা করেছেন যে অনাথবাবুর মত ঈশ্বরীতলার প্রতি আমার নিজেরও গভীর টান সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে।


শ্যামলবাবুর সাথে প্রথম পরিচয় হলো স্মরণীয়ভাবে। সেটি কখনোই ভুলবার মতোন নয়। এত মায়া নিয়ে পৃথিবীর দিতে তাকানো কিংবা আরেকটি পৃথিবী তৈরী করা শ্যামলবাবুর পক্ষেই শুধু সম্ভব। এই উপন্যাসখানি আজীবন আমার প্রিয় হয়ে থাকবে।সম্ভব হলে কিছুদির পর আবার ঈশ্বরীতলায় ফিরে আসবো।ইস, সেবার যদি শেষটা পাল্টে যেতো!
Profile Image for Anik Chowdhury.
176 reviews35 followers
September 25, 2022
"আমি রোগে মুগ্ধ হ’য়ে দৃশ্য দেখি, দেখি জানালায়
আকাশের লালা ঝরে বাতাসের আশ্রয়ে-আশ্রয়ে।
আমি মুগ্ধ; উড়ে গেছো; ফিরে এসো, ফিরে এসো, চাকা,
রথ হ’য়ে, জয় হ’য়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো।
আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন
সুর হ’য়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।"
-বিনয় মজুমদার

লেখা বোধহয় এমনই হওয়া উচিৎ। পাঠকের অন্তরাত্মা ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই। এক জীবনে কী অনাথবন্ধু বসুর মতো জীবনও পাওয়া সম্ভব? উত্থান এবং পতনের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার মতো রূঢ় বাস্তবতাও ছুঁয়ে দিয়ে যাবে। ছোট্ট ঘরের দাওয়ায় বসে রূপকথার মতো ঈশ্বরীতলার স্বাদ আস্বাদন কী আর চাইলেই করা যায়? নদী, গাছ, আকাশ এবং বাতাসের কাছাকাছি যাওয়ার যে আকাঙ্খা মানুষ আজন্ম নিজের মাঝে লালন করে তার প্রকাশ হল "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা"। জীবনের ছন্দ আছে, জীবন এখানে হাসে। রঙিন স্বপ্নগুলো পেঁয়াজের খোসার মতো বাতাস কেটে কেটে বিদ্যোধরী'র পাড়ে এসে উড়ে পড়ে। তারপর আবার বাতাস সেই খোসাকে নিজেই উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে বিদ্যোধরীর জলে ভাসায়।
স্বপ্নে মানুষ চিরন্তন একটি জীবন কাটাতে চায়। নিজের বুকের মাঝে গড়ে ওঠে আস্ত একটি গল্প। যে গল্প আবর্তিত হয় মানুষটাকে ঘিরে। এখানে সে তার অধরা স্বপ্নের সুরের লয়ের সাথে ভেসে যায় দূরের আকাশে। তেমনই একটি গাঁ ঈশ্বরীতলা আর সেখানে নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ অনাথবন্ধুর সাথি আকাশ, বাতাস, পৃথিবী আর তার গৃহপালিত পশুগুলো। তাদের সবার মনের কথা বুঝতে পারে। তারাও বোঝে তাকে। তাই নিয়ে সুখের জীবন। সুখ সাগর কী সবসময় সমানতালে বয়ে যায়? ঢেউ কী ওঠে না? ঝঞ্জাট এসে কী এফোঁড়ওফোঁড় করে না নায়ের পালকে? ঈশ্বরীতলায় নৌকো ভেরানো যাক এবার।

কিছু বই প্রথম পাতা থেকে ভালো লাগতে শুরু করে। তেমন একটি বই "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা"। ভূমিকা থেকেই আগ্রহ জাগানিয়া। ভূমিকটাও অনেক ফুরফুরে।
কল্পনার জগতকে কী সুন্দর ভাবে পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরতে হয় তা শ্যামল বাবুর লেখা না পড়লে জানতাম না। মুগ্ধ হয়ে পড়তে হয়। প্রকৃতির বর্ণনাগুলো কত সহজ ভাবেই না দিয়ে গেলেন। মনে হয় সেখানে অনাথবন্ধু বসু নেই, আছি আমি। এভাবে লেখকের তৈরি করা স্রোত পাঠককে ভাসাবে, আর পাঠক ভাসবে লেখকের তৈরি করা সেই জগতে। নতুন এক সেতুবন্ধন হবে। চেনা জানা সবকিছু সমর্পিত করে পাঠক সেই সেতু পার করে অপর পারে যাবে। তারপরে ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'য় হারিয়ে যাবে পাঠক।
Profile Image for Sharika.
358 reviews96 followers
January 26, 2024
শীতের দুপুরের নরম রোদ, বাড়ির ছাদে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে মন দিয়ে পড়ে চলেছি একটা বই - যার নাম "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা"। অজান্তে যেন বর্তমানের স্থান-কাল পার হয়ে চলে গিয়েছি ঈশ্বরীতলায়। যেখানে সবকিছু পাওয়া যায়, পাওয়া যায় না শুধু মিঠেপাতার পান।

আমার চারদিকে কাঁচা হলুদ রোদ, ক্ষণে ক্ষণে মাঘ মাসের ঠাণ্ডা হাওয়া - কিন্তু আমি দেখছি ফাগুনের জ্যোৎস্না। পঞ্চাননতলার বুনো তেঁতুলগাছ, একা দাঁড়িয়ে থাকা উমাপতি সাইকেল স্টোর্স পেরিয়ে স্টেশনবাজার, আলুরচপের দোকান। রাস্তা জুড়ে বিশাল বিশাল খিরিশগাছের ছায়া, তার মধ্যে অনাথবন্ধু বসুর আলো ঝলমলে বাড়ি।

চেনা শহর থেকে একঝটকায় আমাকে যেন টান দিয়ে নিয়ে গেলো অচেনা এক কল্পনার জগতে। কিংবা যেন কল্পনা নয়, এ জগতের চেয়ে ওটাই বেশি সত্য - বেশি মধুর, কাছের। সেই বর্ণিল জগতের মেঝেতে মাদুর পেতে পা ছড়িয়ে বসে দেখতে থাকলাম অনাথবন্ধুর পরিবারের জীবনগল্প।

বাচ্চাকাচ্চা-পশুপাখিতে ভরপুর অনাথের 'চিড়িয়াখানা'-সম বাড়ি। সারাক্ষণ হইহই রইরই লেগে রয়েছে। অফিসে দিনমান কাজ করে এসে পশুপাখিদের সাথে আলাপে ব্যস্ত হয় সে। কিছুটা পাগলাটে গোছের লোক, এদিক-ওদিক ঠকে চলেছে, সকলের মন রক্ষা করছে। এককালের শহুরে মানুষটি ঈশ্বরীতলার ছোঁয়া পেয়ে বদলে গেছে আগাগোড়া - যে বদল আমরা সকলেই হয়তো মনে ছোট্ট একটি আকাঙ্ক্ষা হিসেবে পোষণ করি। কোনো জটিল ভাবনা নেই, হৃদয়টাকে খুলে দিয়ে প্রকৃতির রস আস্বাদন করা।

জীবননির্ভর-প্রকৃতিনির্ভর লেখা আমার বড় প্রিয়। যতো পড়ি আঁশ যেন মেটে না। মনে হয় আঁজলা ভরে জল খাওয়ার মতো নিজেকে পূর্ণ করে ফেলি এই অনুভূতিতে। যেমন করে সবকিছু ভুলে গিয়ে একসময় পড়েছিলাম বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক', মাহমুদুল হকের 'অনুর পাঠশালা' সেভাবে আরেকবার আমি আর জীবন-প্রকৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গেলাম।

অসাধারণ একটা বই। আজীবন মনে রাখার মতো, বারবার স্মৃতিচারণ করতে ফিরে আসার মতো।
Profile Image for Akash Saha.
156 reviews26 followers
November 24, 2022
অন্যরকম এক মুগ্ধতায় আবিষ্ট করলো বইটি।
Profile Image for Shotabdi.
820 reviews202 followers
January 20, 2024
গ্রামীণ জীবনের অপার্থিব সুন্দর রূপটি টেনেছিল কলকাতার কলেজের বিএ পাস অনাথবন্ধু বসুকে৷ তাই ঈশ্বরীতলায় এসে সে সৃজন করতে চেয়েছিল নিজস্ব রূপকথা৷ শান্তা, অনাথবন্ধুর স্ত্রী তার ইচ্ছাতে মিলিয়েছিল তাল৷ তাই ঈশ্বরীতলার মতো গ্রামে তাদের একটা বাড়ি হয়েছিল, সে বাড়িতে ওরা ছাড়াও ছিল তাদের দুই মেয়ে টুকু আর লিলি, সাহায্যকারী বলাই, কতক হাঁস-মুরগি আর কুকুর বাঘা। উপন্যাসের শুরুতেই নতুন চরিত্র হিসেবে গরু উমা আর তার বাছুর কানাইয়ের ও অন্তর্ভুক্তি৷
জল-হাওয়ায় মাখামাখি হয়ে নির্ঝঞ্ঝাট কাটছিল বেশ জীবন তাদের। প্রজাপতি, সবুজ ঘাস আর তাড়ির নেশা যেন পাঠককেও আচ্ছন্ন করতে শুরু করেছিল। কিন্তু কখনো জীবন রূপকথা হয় না পুরোপুরি। তাই অনাথবন্ধুর জীবনটাও রূপকথা থেকে নেমে এসে দাঁড়াতে বাধ্য হয় বাস্তবের কঠিন জমিতে।
লরা ইঙ্গলসের আত্মজৈবনিক লেখাগুলোতে জীবন গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রাম আর অপূর্ব প্রাকৃতিক নৈসর্গ হাত ধরাধরি করে পাঠককে মোহিত করে৷ ঈশ্বরীতলার শুরুর অংশটুকু থেকে চাষবাস পর্যন্ত পড়তে পড়তে আমার সেই গল্পগুলোর কথা মনে আসছিল।
মাজরা পোকার আক্রমণে যখন ধান নষ্ট হয়ে গেল অনাথের, আমরা পাঠক হয়ে আশা করি আবার ঘুরে দাঁড়াবে তার পরিবার। কিন্তু গ্রাম্য রাজনীতি আর ব্যাংকের সুদ যে কত বাস্তব তা পুনর্বার অনুভব করতে বাধ্য হতে হয়। বুঝতে হয় জীবনটা এমনই, কোন নিরবিচ্ছিন্ন প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তির খেলা নয় তা।
তাই একসময়ে ঈশ্বরীতলায় মুখে মুখে ফেরা নাম অনাথবন্ধুকে দিন পেরুলে লোকে ভুলে যায়। বাঘা হারিয়ে যায়, উমা বদলে যায়। বদলে যায় বাড়ির মালিকানা, মায় উপন্যাসের প্রধান চরিত্রেরাও যেন স্থান বদলের সাথে সাথে গুরুত্ব হারাতে থাকে।
কত অজস্র দামি জহরত যে লুকিয়ে আছে বাংলা সাহিত্যে! খোঁজ জানে কজন? বিশ্বসাহিত্যের পৃথিবীতে বাংলা যে কত বড় স্থান রাখার দাবিদার তা সর্বভুক পাঠকের বাইরে আন্দাজ করতে পারবেন খুব কম মানুষ৷
এই জীবনমুখী সুগভীর দর্শনসমৃদ্ধ বইটি কত সহজে লিখেছেন লেখক, কত মমতায় ঘেরা চেনা অক্ষরই বইয়ের রাজ্যকে করে তুলেছে রূপকথা, পাঠকেরাও কেন জানেন না তা? এমন বই পড়লে অন্তত কয়েকজন পাঠককে জানানো উচিত মনে করি।
ভালো বই বেঁচে থাকবে চিরকালই। কিন্তু আলোতে এসে রোদ পোহাক তারা, অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে তলকুঠুরিতে ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকার জন্য তাদের জন্ম হয়নি।
Profile Image for DEHAN.
277 reviews81 followers
July 11, 2020
অনাথবন্ধু বসু কলকাতার শহুরে জীবন যাপন ছেড়ে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলো কোন গ্রামের দিকে গিয়ে সংসার করবে ।তখন দুই মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে এসে ঘর বাধলো এই ঈশ্বরীতলায় । গ্রামের এক কোনায় ছবির মতো একটি বাড়ি তুলে সেখানে শুরু হলো অনাথবন্ধুর নতুন জীবন । অনাথ খুব ই আশ্চর্য এক মানুষ । জগতে যেন থেকেও সে নেই , সবার খুব চেনা হলেও যেন তাকে মাঝেমধ্যে একেবারেই চেনা যায় না । তো সেই অনাথ ঠিক করলো সংসার আরো বড় করবে। এভাবেই ছোটখাটো বাড়িটাতে আস্তে আস্তে সদস্যের সংখ্যা বাড়তে লাগলো । যোগ হলো একটি কুকুর ,কতগুলো হাঁস , একটি গাইগরু , কয়েকটি ছাগল । এ গাঁয়ের সবচাইতে রহস্যময় এবং সুখী মানুষ এই অনাথবাবুকে সকলে পছন্দ করে এবং চোখ বুজে ভরসা করে । কিন্তু অবস্থা কি সবসময় সবার একরকম যায় ? এই প্রভাব , সুখ শান্তি , সংসার এগুলো ধরে রাখতে পারবে কি অনাথবন্ধু ?
এই বছরে পড়া শ্রেষ্ঠ বই এখন পর্যন্ত ‘’বারো ঘর এক উঠোন’’ । শ্রেষ্ঠর তালিকায় এবার যুক্ত হলো এই ঈশ্বরীতলার রূপকথা । উপন্যাসটি পড়ার পর পাঠক এমন এক বিষাদে প্রবেশ করতে বাধ্য হবে যে, মনে হয় চারদিকে শুধু লোকসান আর লোকসান । যেন কিছুই নিজের নয় । যেকোন সময় মালিকানা পরিবর্তন হয়ে যাবে । নিজের উপর নিজের সন্দেহ আসে ; আমি সত্যিই আমার আশেপাশের জগতের একটা স্থায়ী অংশ তো ! আমার মনে আছে এরকম একটা অনুভূতি আমার এর আগে হয়েছিলো যখন বিভূতিভূষণ এর অনুবর্তন পড়েছিলাম ।
ইন্টারেস্টিং ব্��াপার কি জানেন ? গুডরিডসে দেখলাম এরকম একটা প্রথম শ্রেণীর অন্যরকম চমৎকার উপন্যাস মাত্র তিনজন পড়ছে । অনেকেই জানে না ঈশ্বরীতলার রূপকথা সম্পর্কে । অবশ্য সবার না জানলেও চলবে …ঈশ্বরীতলার মানুষদের জীবন যেমন চলছে তেমনি চলতে থাকবে ।
Profile Image for Ashkin Ayub.
464 reviews229 followers
September 18, 2022
সম্পাদকের ভাষায় গ্রামীণ অশ্লীল শব্দ বাদ দিতে হবে, আরো বিস্তর কাটাকুটি। লেখক মহাদয় পান্ডুলিপি ফেরত নিয়ে নেন। সমরেশ বসুর অনুরোধে আরেক সম্পাদক কোন কাটাকুটি ছাড়াই লেখাটা প্রকাশ করেন, লেখার নাম - ঈশ্বরীতলার রূপোকথা।

বিদ্যেধরী নদীর কাছের এক গ্রাম ঈশ্বরীতলা। খুব একটা পাড়াগাঁও না আবার পুরোপুরি মফস্বল শহরও না। স্টেশন, ব্যাংক, বাজার, সিনেমা হল, অপেরা, আলুর চপের দোকান কি নেই? কলকাতার খুব কাছের হয়েও একেবারে জগতবিচ্ছিন্ন, মফস্বল শহর আর গাঁয়ের সুবিধা-অসুবিধা, তার নানা রঙের মানুষ, কখনো সবাক জীবকুল কখনো সচল প্রকৃতি মিলিয়ে ঈশ্বরীতলা।

অনেকটা ঝোঁকের মাথায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই উপন্যাস পড়তে শুরু করেছি। উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্র অনাথবন্ধু বসু নাকি খোদ ঈশ্বরীতলা সেটা নিয়ে বেশ একটা বাহাস করা যেতে পারে। সে আলাপ আরেকদিনের তুলে রাখি। কলকাতায় চাকুরি করা অনাথবন্ধু নিরিবিলি থাকার জন্য ঈশ্বরীতলায় বাড়ি করেন। কাহিনি পড়তে গিয়ে ঈশ্বরীতলা নামের এক জাদুবাস্তবতার জগতে ঢুকে পড়বেন। মোটা দাগে উপন্যাসটির গোটা কাহিনী ঘোরতর বাস্তব, কিন্তু তার সাথে মিশে আছে জাদু। বোরহেসের তর্জমায় আমরা জাদুবাস্তবতাকে চিনি, কিন্তু ঈশ্বরীতলার প্রতিটি চরিত্র ভীষণভাবে জীবন্ত, একে অপরের সাথে যুক্ত, যেন অন্য এক বাস্তবতা।

এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে অনেকে বিরক্ত হতে পারেন, ঘুমিয়েও যেতে পারেন – তাতে বিশেষ কোন ক্ষতি নেই, বরং চোখের আরাম হবে। কিন্তু বই পড়তে গিয়ে হয়ত মনের অজান্তে ঈশ্বরীতলার মানুষগুলোর সাথে অদ্ভুতভাবে কখন মিশে যাবেন কিছুই টের পাবেন না। গ্রামীণ জীবন, অবক্ষয়, ভালোবাসা, ত্যাগ, ঘৃণা, হিংসা, সুখ আর ব্যর্থতার উপাখ্যানই হয়ত ঈশ্বরীতলার রূপোকথা, কিন্তু এইরকম বই একজন লেখক একবারই লিখতে পারেন জীবনে। লেখকের বাকি লেখাগুলো পড়ে ফেলার অপেক্ষায় থাকবো।

Profile Image for Momin আহমেদ .
112 reviews49 followers
March 10, 2025
মফস্বলে আমার বেড়ে ওঠা। জীবনের নানাসময়ে বহুবার শুনেছি এক স্বপ্নের কথা। গ্রামে গিয়ে বাড়ি করে থাকার কথা। বাড়ির সামনে নিজের হাতে চাষ করা শাকসবজি, পুকুরে চাষ করা মাছ ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঈশ্বরীতলার রূপোকথা এই স্বপ্নেরই এক সিমুলেশন। গল্প যতই এগিয়ে যায় স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন মনে হতে থাকে। সকল রোমান্টিকতা চুরমার করে বই শেষ করে মনে হয় আবার বাস্তবতায় ফিরে আসার গল্প।
এই গল্প অনন্য কোনো গল্প নয়। পড়ার সময় মনে হতে পারে এসব ঘটনা খুবই সাধারণ। লেখক তো তার মানবজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েই গল্প লেখেন। আর সেইসব লেখককেই সফল মনে হয় যারা জীবনের অতিসাধারণ গল্পকে অনন্যসাধারণ করে তুলে ধরতে পারে।
Profile Image for Muntasir Al Anam.
59 reviews23 followers
August 15, 2023
এই বইয়ের আবেশ থেকে কখনো বের হতে পারব না।
Profile Image for Shishir.
188 reviews40 followers
July 17, 2025
কী বলবো, একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখে উঠলাম যেন ! স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনাও অনুভূত হোল। অদ্ভুত সুন্দর একটা বই - মাস্ট রিড।
Profile Image for Joy Joyonto.
12 reviews
Read
June 12, 2025
একটু আগে রেডিও বলেছে, বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ সরতে সরতে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছে। অনাথ বাবু তার পুরো পরিবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘরে পানি প্রবেশ করতে পারে। ওদিকে উমা ডাকছে। বাড়ির পাশে শুকনো খালটা ভরে গেছে পানিতে; উমা ডেকে বলছে অনাথবাবু আমাকে তোমাদের কাছে নিয়ে যাও।

সহজ-সরল একটা জীবনের প্রত্যাশা আমাদের মধ্যে খুব কম লোকের থাকে। সে কম লোকের একজন অনাথবাবু। শহর থেকে দূরে ঈশ্বরীতলায় বসিয়েছিলেন নিজের নিরালয়। কোম্পানি বাঁধে ভাঙ্গা রাস্তাটা গাড়ি চলাচলের জন্য উপযুক্ত হয়েছে। ঘরের সামনের জমিতে চাষের ধান গুলো তে দুধ আসতে শুরু করেছে। সেই সাথে পোকামাকড়ও; অনাথবাবু চাকরিজীবী মানুষ তবে বাজিগরের কথায় সকল চাষীদের নিয়ে মেতেছিলেন একটা জীবন-মৃত্যুর খেলায়। জীবন যে জুয়াখেলার মতো; একসময় মনে হবে সব জিতে নেওয়া শেষ তবে পরক্ষণে বুঝতে পারবে কিছুই জেতা হয়নি। জেতা বাকি। জীবনের জুয়া যাকে একবার পেয়ে বসে। তার আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয় না। জিততে জিততে হঠাৎ হারার স্বাদ ভুলে যাওয়া ব্যক্তিকে জীবন আবারও আগের জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
সোজা বাংলায় বলতে গেলে, দিয়েও দেখবো আবার নিয়েও দেখবো। যাক সাগরে চলছে আপাতত নিম্নচাপ, ঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে যেতে হবে ক্যাম্পে। অনাথবাবুর কী অবস্থা যাওয়ার পথে দেখে যেতে হবে। এইবার বোধহয় তার আর ফসল ঘরে তোলা হবে না। সন্তোষটাকির সাথে রিনি কে দেখা যাচ্ছে গাছতলায় ভিজতে। টুকু আর বিকাশ একসাথে কচুপাতা মাথায় দিয়ে দূরের বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে। বাজিগর সাপটাকে ঝুড়িতে রেখে গেছে ঔষধ তুলতে। অনাথবাবুর কলকাতা যাওয়ার যাত্রাটা ভালো হবে কিনা কর জানি! জীবন যা নেই তা আর ফিরিয়ে দেয় কি আদৌ!
যাই, আবার যেতে হবে বংশী কাপালীর কাছে; সে বোধহয় ওষ্ট কে আজকাল একটু বেশিই চোখে হারাচ্ছে।
পথে যেতে যেতে শান্তা বৌদির হাতে এককাপ চা খেয়ে যাবো। লিলি বোধহয় বাঘা কে নিয়ে ব্যস্ত। মদন-বদন জাল দিচ্ছে ডুবে যাওয়া পুকুরে।
পরিবর্তন কত দ্রুত আসে। অবশেষে পরিবর্তন সংসারের নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।




এই বই নিয়ে আমি কী রিভিউ লিখবো নিজেও বুঝে উঠতে পারিনি৷ এমন বই নিয়ে রিভিউ লেখা যাই না। আমি শুধু আমার ভালো লাগা গুলো বলে গেছি
Profile Image for Nipu.
65 reviews3 followers
March 30, 2023
কিছু বই শেষ করার পর এক ধরনের বিশাদ ঘিরে থাকে, তাই হচ্ছে এখন! জীবন হয়তো খুবই অদ্ভুত, উত্থান, পতন খুবই স্বাভাবিক নিয়মে চলে, তবুও মনে হয় শেষটা এমন না হলেও পারতো।
Profile Image for Samiur Rashid Abir.
218 reviews43 followers
July 25, 2022
এই বইখানা কেনার সময়ে বেশ দ্বিধায় ছিলাম কিনব কিনা। কাউন্টারে "যাব কি যাব না" এরকম অবস্থা। তখন হারুন ভাই বললেন, এতদূর চলেই আসছেন যেহেতু কিনেই ফেলেন। পরে কিনে ফেললাম সাহস করে।

আমাদের সকলের জীবনেই হয়ত শহুরে একঘেয়ে যান্ত্রিকতায় বিরক্ত হয়ে গ্রামে গিয়ে বসবাস কর‍তে ইচ্ছে হয়েছে। ছবির মতন গ্রামে খোলামেলা জায়গায় সুন্দর একটা বাড়ি, তার পাশে বিশাল মাঠ, পুকুর কত কি! শান্তির জীবনের চিত্র কল্পনা করলে আমার আজও এই ছবিই মনে ভাসে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ঠিক সেই ছবিটি খুব সুন্দর করে এঁকেছেন। টুকু, লিলি, শান্তা, মদন, বদন, বলাই, উমা, কানাই, অরুণ বরুণ, বাঘা সবাই যেন আমারও আপনজন হয়ে গিয়েছিল। অনেক সুন্দর একটা বই। ঈশ্বরীতলার শান্তিপূর্ণ জীবন ঘুরপাক খাক আমাদের সকলের জীবনে।
Profile Image for Jahangir.
Author 2 books34 followers
September 22, 2018
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘ঈশ্বরীতলার রূপোকথা’র যে সংস্করণটি আমি পড়েছি সেটি মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে ১৩৮৩ সালে প্রকাশিত। উপন্যাসের শুরুতে ‘আমার লেখা’ নামে ১৪ পৃষ্ঠার এক আত্মকথন আছে। যারা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী ‘জীবন রহস্য’ পড়েছেন তারা বুঝতে পারবেন এই আত্মকথনটি ঐ আত্মজীবনীর অংশবিশেষ মাত্র। উপন্যাসের শুরুতে এটি দেবার চিন্তা লেখকের মস্তিষ্কজাত নাকি প্রকাশকের বুদ্ধিজাত সেটি জানি না, তবে কাজটি ভালো হয়নি। শ্যামলের উপন্যাস ‘কুবেরের বিষয় আশয়’, ‘সরমা ও নীলকান্ত’, ‘চন্দনেশ্বরের মাচানতলায়’, ‘পাপের বেতন পরমায়ু’ ইত্যাদির অনেকগুলোতে কখনো ছায়া হয়ে, কখনো রেখাচিত্র হয়ে, আবার কখনো মাংসের ভেতরে হাড়ের কাঠামো হয়ে তাঁর নিজের জীবন প্রবলভাবে এসেছে। একই ব্যাপার ‘ঈশ্বরীতলার রূপোকথা’র ক্ষেত্রেও সত্য। যারা শ্যামলের জীবনের কথা জানেন তাদের পক্ষে এই উপন্যাসের অনাথবন্ধু বসুকে চিনতে মুহূর্ত সময় লাগবে না। তাই উপন্যাসের শুরুতে এই আত্মকথন পাঠকের করোটিতে একটা অদরকারী কীট ঢুকিয়ে দেয়। সেই কীটের পদচারণা ও দংশনকে উপেক্ষা করে পাঠক যদি অগ্রসর হন তাহলে তিনি একটু একটু করে ঈশ্বরীতলা নামের এক জাদুবাস্তবতার জগতে ঢুকে পড়বেন। মোটা দাগে উপন্যাসটির গোটা কাহিনী ঘোরতর বাস্তব, কিন্তু তার সাথে পরতে পরতে সূক্ষ্মভাবে মিশে আছে জাদু। ঈশ্বরীতলার আকাশ-বাতাস-পুকুর-বাওড়-হাঁস-মুরগী-কুকুর-বেড়াল-গরু-বৃক্ষ-ফসল-বাড়ি সবই জীবন্ত-কম্যুনিকেটিভ-মায়াময়। সেই মায়ার জগত বাস্তবের দুনিয়ায় সবার অনুভবযোগ্য নয় যেমন এই উপন্যাস বা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখালেখি সবার জন্য সহজপাচ্য নয়। বস্তুবাদ, ভোগবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে যাদের এলার্জি আছে তারা শ্যামল না পড়ে অ্যান্টিহিস্টামিন নিতে পারেন।
এই উপন্যাসের ঈশ্বরীতলা বিদ্যেধরী নদীর মরা বাঁকের বাওড়ের কাছের এক গাঁ যেখান থেকে ইলেকট্রিক ট্রেনে কলকাতা ডে’লি প্যাসেঞ্জারি করা যায়। ঈশ্বরীতলায় যেমন রেলস্টেশন-স্টেশনবাজার-ধানেরগোলা-ব্যাংকবাড়ি-গম ভাঙানোর কল-আলুর চপের দোকান-সিনেমা হল-পঞ্চানন অপেরা আছে তেমনি আছে অবারিত ফসলের মাঠ, মাছের ভেড়ি, পয়স্তি চর, জলভরা বাওড়, কোম্পানির বাঁধ, ইরিগেশন ক্যানেল, ঘন জঙ্গল, পঞ্চাননতলার জাগ্রত থান। এখানে ভেড়ির মালিক অক্রুর বিক্রম মজুমদার, জনতার লোক রিটায়ার্ড ম্যাজিস্ট্রেট দক্ষিণা চক্রবর্তী, আপস্টার্ট বংশী চন্দ্র কাপালি’র সাথে জেলখাটা ডাকাত সন্তোষ টাকি, জুতোর দোকানদার যাত্রাপাগল জগাই, মৎস্যশিকারী-কাম-দিনমজুর মদন-বদন, অপার্থিব জগতের মানুষ মহম্মদ বাজিকরও আছেন। কলকাতার খুব কাছে হয়েও একেবারে জগতবিচ্ছিন্ন, মফস্বল শহর আর গাঁয়ের সুবিধা-অসুবিধা, তার নানা রঙের মানুষ, কখনো সবাক জীবকুল কখনো সচল প্রকৃতি মিলিয়ে ঈশ্বরীতলা যা তার কিছু কিছু দেখা মেলে শ্যামলের অন্য লেখাগুলোতেও — কোথাও কোটালপাহাড় নামে, কোথাও কদমপুর নামে, কোথাও অন্য কোন নামে। এমন ধারা স্থানের দেখা মেলে মার্কেজের ‘মাকোন্দো’তে, আযেন্দের ‘কর্দিলেরা’য় বা নারায়ণের ‘মালগুড়ি’তে। এগুলোর একটির বহিরঙ্গের সাথে আরেকটির মিল নেই, তবে এগুলোর প্রত্যেকটির সাথে প্রত্যেকটির কোথায় মিল আছে সেটা জাদুবাস্তবতার পাঠকেরা জানেন।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কি অনাথবন্ধু বসু নাকি ঈশ্বরীতলা স্বয়ং সেটা নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে, তবে তা অহেতুক। অনাথবন্ধু গ্রাজুয়েশন করা, ছাত্রজীবনে রাজনীতি-ডিবেট-প্রেম করা, কলকাতায় চাকুরিকরা একজন মানুষ যিনি নিরিবিলি থাকার জন্য ঈশ্বরীতলায় বাড়ি করেন। তার সেই বাড়িতে তিনি তার স্ত্রী শান্তা, দুই কন্যা টুকু ও লিলি, গৃহকর্মী বলাই, উমা নামের গাভী, কানাই নামের বাছুর, বজ্জাত নামের বেড়াল, বাঘা নামের কুকুর, অরুণ-বরুণ নামের রাজহাঁস, আটটা পাতিহাঁস, এগারোটা ছাগল যার বেশিরভাগ শুক্লা নামের এক ছাগীর সন্তানসন্ততি আর একান্নটা সাদা লেগহর্ন মুরগি নিয়ে বাস করেন। অনাথ সকালে কাঁকড়াভাজা সহযোগে গেলাসের পর গেলাস হাঁড়িবাঁধা তাড়ি খান, কখনো কন্যা টুকুকেও তার ভাগ দেন। টাটকা মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে অফিসে যান, সেখানে একজনে তিনজনের কাজ করেন আবার অল্প সময়েই অফিস থেকে বের হয়ে যান। অনাথ নিয়মত অফিস কামাই করেন যেমন তার কন্যারা নিয়মিত স্কুল কামাই করে। ইচ্ছে হলে তিনি কাজ ফেলে দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমান। অবসরে তিনি ডায়েরিতে নিজের ভাবনা লিখে রাখেন, নিরালায় তিনি কুকুর-বেড়াল-গরু-ছাগল সবার সাথে তাদের ভাষায় কথা বলেন, তৃষ্ণা মেটাতে আকাশ অথবা জ্যোৎস্না পান করেন, মহম্মদ বাজীকরের অপার্থিব জগতের আলোয় নিঃশ্বাস নেন। অনাথ একই সাথে ঘোরতর সংসারী ও উদাস সংসারবিবাগী, একই সাথে চরম বৈষয়িক ও হাতখোলা। অনাথের চরিত্রের সাথে, জীবনযাপনের সাথে পাঠক কখনো নিজের অংশকে কখনো নিজের স্বপ্নের খণ্ডকে আবিষ্কার করতে পারবেন। তাই অনাথ পাঠকের কাছে মোটেও অজানা কেউ নন্‌, বরং নিজের খুব চেনা, নিজের ভেতরের খুব একান্ত একটি চরিত্র। মার্কেজের বুয়েন্দিয়ারা যেমন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রবাহিত হন, ক্যানভাস সংক্ষিপ্ত হওয়ায় শ্যামলের অনাথবন্ধু বসু এক জন্মেই এক জীবন থেকে অন্য জীবনে প্রবাহিত হন। বার বার পরাজিত হতে হতে ঘুরে দাঁড়ান, সৃষ্টি করেন > সৃষ্ট জগত ধ্বংস হয় > পুনরায় নতুন কিছু নির্মাণ করেন। প্রতিবার নিজের পরিচয় আর অবস্থান পরিবর্তন করেন। সাধারণ গল্পে নাগরিকায়িত মানুষ পরাজিত হলে বিনাগরিকায়িত হন, এখানে অনাথ বিনাগরিক জীবনে পরাজিত হয়ে নাগরিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করে জীব���প্রবাহ অব্যাহত রাখেন।

এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র অনাথের কার্যক্রম বিশেষত কলকাতার মতো মহানগরের বাঁধানো জীবন ছেড়ে ঈশ্বরীতলাতে থানা গাড়ার ব্যাপারটি গড়পড়তা বাঙালীর তুলনায় একটু খাপছাড়া মনে হতে পারে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের চম্পাহাটি পর্ব’তে দশজন সাধারণ বাঙালীর চেয়ে তাঁর যে স্বতন্ত্রতা দেখিয়েছেন সেটি বিবেচনায় নিলে অনাথকে আর খাপছাড়া মনে হবে না। শ্যামলের এই স্বতন্ত্রতা অনেককে স্বস্তি দেয়নি, অনেককে ঈর্ষান্বিত করেছে — যেমনটা অনাথের জীবনেও ঘটেছে। শ্যামল ঘোরতর অস্তিত্ত্ববাদী একজন লেখক। জীবনের রঙ-রূপ-রস তিনি নিজে যেমন উপভোগ করেছেন তেমন তাঁর চরিত্ররাও করেছে। কোন প্রকার ইনহিবিশন, পিউরিটান ভাবনা তাঁর লেখার প্রবাহকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেয়নি। তাঁর এই সাবলীল আচরণের সাহস যাদের ছিল না তাদের কেউ ‘রাম’, ‘রাম’ বলে সরে পড়েছে; কেউ না পেরে গালি দিয়েছে; কেউ কেউ কিছু জানেনা এমনভাব করে থেকেছে — এবং এই সকল পক্ষ তাঁকে ঈর্ষা করে গেছে যেমন অনাথও অন্যদের মাৎসর্যের তাপে দগ্ধ হয়েছেন।

ঈশ্বরীতলার রূপোকথা অনাথবন্ধুর জীবনের সাথে সাথে আরও অনেকগুলো চরিত্রকে খুব কাছে থেকে দেখায়, নির্মাণ করে, পরিণতিতে নিয়ে যায়। তাই উপন্যাস হিসেবে এটি যত কম ফর্মারই হোক না কেন এর ক্যানভাসের ব্যপ্তি ঈশ্বরীতলার ফসলের মাঠ অথবা এর আকাশের মতো বিশাল। এখানে কমেডি আছে, রোমান্স আছে, ট্র্যাজেডি আছে। এখানে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার সতেরজন পুত্রের মতো অনাথের পশুপাখিরা প্রাণ হারায় মাঠের ফসলেরা ধুয়ে যায়, আবার মেলকিয়াদেসের মতো মহম্মদ বাজিকর মৃত্যুর জগত থেকে ফিরে আসেন। এখানে পিয়েত্রো ক্রেসপির প্রতি আমারান্তা বুয়েন্দিয়া অথবা রেবেকা উযোয়ার ভালোবাসার মতো ভীরু প্রেম যেমন আছে, তেমন জোয়াকিন আন্দিয়েতা আর এলিযা সমার্সের বাঁধভাঙা অসম প্রেমের মতো প্রেম আছে। স্তালিনের যৌথখামারের স্বপ্ন ভেঙে পড়ে ভ্রান্ত নীতির কারণে আর এখানে অনাথের অনাবাদী জমি চাষের যৌথ প্রচেষ্টা মার খায় নোনা জলে, জলের অভাবে, মাজরা পোকার আক্রমণে, অকাল প্লাবনে। এই যৌথ প্রচেষ্টার শুরুটা কি এক Epiphany, নাকি অনাথের চিন্তা মহম্মদের বাক্যে মূর্ত হয়ে আসে! মহম্মদ কি আসলেই ভিন্ন কেউ নাকি অনাথের এক অবতার যে সময়ের ভিন্নতায় বা মাত্রার ভিন্নতায় বাস না করে একই সময়ে একই স্থানে সমান্তরালে বিচরণ করে! সে ভাবনা পাঠকের, ডেলফির মন্দিরের অমোঘ বাণীর মতো শ্যামল শুধু তার বর্ণনা করে যান।

বাংলা সাহিত্যের অত্যাবশকীয় উপাদান ‘প্রেম’। শ্যামলের রচনাগুলোতে প্রেম মূলত প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তমনস্কদের প্রেম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা বৈবাহিক সম্পর্কের তোয়াক্কা না করে বা সামাজিক রীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। কিশোর-কিশোরীর প্রেম বা পরিবারের সবাইকে মানিয়ে সদ্য যুবক-যুবতী তাদের প্রেম-বিবাহকে প্রতিষ্ঠিত করছে শ্যামলের লেখা এমন গল্প খুব বেশি নেই। শ্যামলের নায়ক-নায়িকারা মূলত বিবাহিত/বিবাহিতা, এবং পরকীয়াতে রত। এমন সৃষ্টিছাড়া লেখকের লেখা ঘরে ঢুকলে যারা গোবর-গঙ্গাজল ছিটান তারা শ্যামলকে নিরাপদে এড়িয়ে যান। এই উপন্যাসে অবশ্য প্রেম নিয়ে শ্যামল অমন খেলা খেলেননি। সুতপা বসু আর বিকাশ মজুমদারের প্রেম সাধারণ বাঙালী জীবনের আর দশটা প্রেমের গল্পের মতো এগিয়েছে। এমনকি সেখানে সিনেমাটিক অ্যাকশনও আছে। রিনি মজুমদারের সাথে সন্তোষ টাকির প্রেমটা বরং সাহসী। তবে সেটাও সাধারণ বাঙালী জীবনের ব্যতিক্রম নয়। এই জুটির পরিণতিটি স্বাভাবিক, তবে ঠিক শ্যামলীয় নয়।

এই উপন্যাসের সম্ভাব্য রচনাকালের সময়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রগতির ভেকধারীদের হাতে বাম হঠকারীরা কচুকাটা হচ্ছে এবং স্বঘোষিত স্তালিনপন্থীরা আস্তে আস্তে ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময়কালে গোষ্ঠীবিশেষের রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো থেকে কর্তৃত্বকাঠামোতে মাইগ্রেশনের যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল ঈশ্বরীতলাতে তার রেশ দেখা যায়। তাছাড়া বাস্তবে কর্তৃত্ববাদী স্বঘোষিত স্তালিনপন্থীরা ভ্রান্ত পরিকল্পনার যে অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে এক সময় ক্ষমতায় এসেছিল, এবং চার দশকে যে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছিল ঈশ্বরীতলার অনাথও তেমন এক বেহিসেবী স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে জড়ো করেছিলেন এবং এক সময় সে স্বপ্ন চরমভাবে ভঙ্গ হয়। একটা পার্থক্য অবশ্য এখানে আছে, বাস্তবের দুনিয়ায় কর্তৃত্ববাদীরা কোথাও নিজেদের ভুল বা দোষ স্বীকার করেনি অথবা তার দায় নেবার হিম্মত দেখায়নি। অনাথ অবশ্য তাদের মতো নপুংসক নন্‌, তিনি যাবতীয় দায় নিজে চুকেছেন — নিজের সর্বস্ব দিয়ে চুকেছেন। ভবিষ্যতদ্রষ্টা সাহিত্যিক মানুষকে বহুকাল আগে তার কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, মানুষরূপী অমানুষ রাজনীতিবিদরা সেই কর্তব্যের পথে না হেঁটে নিজেরা ধ্বংস হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির অকপট চিত্র, ভোটের রাজনীতির কুৎসিত চেহারা, বিপ্লবের ব্যর্থ প্রচেষ্টা, সামন্তবাদের অবশেষকে ছাপিয়ে পুঁজিবাদের উত্থান, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের উত্থান, মূল্যবোধের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানবিক ভালোবাসার গল্প, জয়পরাজয়ের গল্প, ইতিহাসের অস্পষ্ট নোট এমন অনেক কিছুকে ধারণকরা এই রূপোকথা নিয়ে আরও বলতে গেলে গোটা উপন্যাসটিকেই বর্ণনা করতে হবে। বিশেষত কেউ যদি এখান থেকে উদ্ধৃতিযোগ্য অংশ তুলে ধরতে চান তাহলে তাকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা টাইপ করে যেতে হবে।

বাংলা সাহিত্যের গদ্যকারদের মধ্যে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় না জনপ্রিয়, না আলোচিত। একজন গদ্যকার ঠিক কী কী কারণে জনপ্রিয় হন সেটা বলা মুশকিল। কখনো কোন লেখক জনপ্রিয় হয়ে যাবার পর তার লেখা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে অনেক কিছু হয়তো প্রমাণ করা যেতে পারে, তবে জনপ্রিয় লেখক হতে পারার ফরমুলা কেউ বলতে পারবেন না। বাংলা ভাষায় লেখা বিশ্বমানের লেখা যেমন জনপ্রিয় হয়েছে তেমন ছাপানো ভূষিমালের ত্রিশটির বেশি সংস্করণ বের হবার ইতিহাসও সবার জানা আছে। শ্যামল জনপ্রিয় না-ই হতে পারেন, তাঁর জনপ্রিয় হবার দরকারও নেই। ঈশ্বরীতলার রূপোকথা পড়তে গিয়ে অনেকেই হাই তুলবেন, খেই হারাবেন, বিরক্ত হবেন, পড়া বন্ধ করে দেবেন — তাতে শ্যামল বা ঈশ্বরীতলার কিছু যাবে আসবে না। বাংলা সাহিত্যে যারা বিশ্বমানের কাজের নিদর্শন খুঁজতে চান তারা শ্যামল অথবা ঈশ্বরীতলাকে ঠিকই খুঁজে নেবেন।
Profile Image for Imran.
68 reviews17 followers
July 13, 2025
"আসলে শেষ অব্দি থাকে কি? থাকে তো এই মানুষটা। এই আমি। আমার দেখা। আমার তেষ্টা। আমার কষ্ট। আমার সুখ।"

একপ্রকার ঘোরের ভেতর কাটলো দু'দিন। ব্যস্ততার মাঝে সময় বের করে অল্প-অল্প করে পড়েছি পাছে দ্রুত শেষ হয়ে যায়, তবুও খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেলো! এত সূক্ষ্ম জীবনবোধ আর শৈল্পিক অভিনবত্ব ঈশ্বরীতলার রূপোকথা'কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শেষটায় যে কারো মন খারাপ হতে বাধ্য।

মহৎ কিছু নিয়ে লিখতে গেলে চিন্তাভাবনা সব এলোমেলো হয়ে যায়, হাত অসাড় হয়ে আসে। এরপরও জোর করে যা কিছু লেখা চলে, তা শূন্য ও অর্বুদ গুণনের মতোই নিষ্ফলা প্রতিপন্ন হয়— শেষটায় সে-ই শূন্য ঝুলি ধরে থাকা।
Profile Image for Omar Faruk.
263 reviews17 followers
March 23, 2023
কিছু ক্ষেত্রে বার বার মনে হয়েছে, একই গল্প দুইবার লেখা হয়েছে। একটার নাম "ঈশ্বরীতলার রূপোকথা" আরেকটা "কুবেরের বিষয় আশয়"। একটা আগে পড়া হয��েছে বলে মূল গল্প কোনদিকে এগিয়ে যাবে সেটা স্পষ্ট আন্দাজ করা যাচ্ছিলো।
Profile Image for ANGSHUMAN.
229 reviews7 followers
October 4, 2021
ঠিক যেন রূপকথার গল্পের মতোই। অনাথবাবুর ঈশ্বরীতলার জীবন যাপন এর খন্ডচিত্র। সেখানকার মানুষজনের রোজনামচা আয়নার মতো ফুটে উঠেছে এই কাহিনীতে। মানুষের পাশাপাশি জীবজন্তুরাও প্রাণবন্ত,প্রতিটি ঘটনা মনে দাগ কেটে যায়। গ্রাম্য জীবনের উত্থান পতনের অন্যতম জীবন্ত দলিল এই বই।
Profile Image for Saleha .
17 reviews1 follower
February 22, 2025
অনাথবাবুর সুদিন ফেরার আশায় শেষ পর্যন্ত পড়ে গেলাম। কিন্তু তা আর হলো কই!শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরীতলা ছাড়তেই হলো অনাথবন্ধু বসুকে।কলকাতার অনাথবন্ধু বসু একটু ফাঁকায় থাকার আশায় ঈশ্বরীতলায় সংসার পেতে বসেছিলেন।সেই সংসারে মানুষের পাশাপাশি গরু -ছাগল থেকে শুরু করে হাঁস- মুরগী, কুকুর সবই ছিল। তারপর দেখা দিল মহম্মদ বাজিকর।তার বুদ্ধিতে কিছু সৃষ্টি করার আনন্দ অনাথবাবুর সংসারে মস্তবড় দুঃখ হয়ে ধরা দিল।ফাঁকায় থাকা অনাথবাবু একদিন পরিবারকে না জানিয়েই অকস্মাৎ আবার কলকাতায় ফিরে গেলেন।পেছনে পড়ে রইলো ঈশ্বরীতলা, কোম্পানি বাঁধ, বিদ্যেধরীর বাওড় আর অনাথবন্ধুর সাধের বাড়ি।
Profile Image for সারস্বত .
237 reviews136 followers
December 5, 2025
"কবে যে প্রথম অপমানিত হয়ে মনে মনে চুপ করে যেতে শিখেছিলাম এখন আর মনে নেই।"

কিংবা

"জীবনটাকে চুরুট করে পোড়ালে আগুনের মাথায় দেড় ইঞ্চি লম্বা ছাই লেখার অনুপান করা যায় কি? জানি না।"

অসম্ভব সংবেদনশীল এবং অন্তর্মুখী এই লাইনদু'টি 'ঈশ্বরীতলার রূপোকথা' উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র অনাথবন্ধু বসুর নয়। ভূমিকায় উল্লিখিত স্বয়ং লেখকের। অনাথবাবুর জীবন বরং একটা সরলরেখা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল। এভারেজ শৈশব, কলকাতার পড়াশোনা, ভাল চাকুরী, আটপৌরে ভরাট পরিবার। লেখকের মত সে দেশভাগ দেখে নি। স্নাতকে ফোর্থ ইয়ারে এসে ডিসকলেজিয়েট হয় নি। ইস্পাত কারখানার তীব্র আঁচে কাজ করতে হয় নি। কিন্তু লেখক শ্যামল গাঙ্গুলি আর তার চরিত্র অনাথবন্ধু বসু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ঈশ্বরীতলা মৌজায় এসে।

কলকাতার কোলাহলপূর্ণ জীবন থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি ট্রেন ধরে ঘন্টাখানেক গেলেই ঈশ্বরীতলার মৌজা। কোম্পানির বাঁধের সাথে লাগোয়া জমিতে বাড়ি করে উঠে গেলেন অনাথবাবু। সাথে স্ত্রী শান্তা আর দু'কন্যা টুকু আর লিলি। তারপর একে একে বলাই এলো, বাঘা (কুকুর) এলো, বজ্জাত (বেড়াল) এলো, অরুণ-বরুণ (রাজহাঁস) এলো, শুক্লা (ছাগল) এলো, উমা (গাভী) এলো আরও এলো কয়েকটা পাতিহাঁস আর লেগহর্ন মুরগী। অদূরে বিদ্যাধরী হাওড়। একদা ছিল প্রমত্তা নদী নৌকা ডুবিয়ে মানুষ মেরে স্রোতে স্রোতে খিলখিল করে হেঁসে উঠতো। এখন নিজেও মরে গেছে। শুধু কয়েক মাইল ধরে হাওড়ে জল রেখে গেছে। স্মৃতির স্মারক।

ঈশ্বরীতলার রূপোকথা গড়িয়ে চলেছিল অনাথবন্ধুর হাতঘড়ির গর্ভে। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে। কিন্তু একদিন সে হাতঘড়ি হাতবদল করলো। রূপকথার গল্পটা ফুরিয়ে এলো। জমির সাথে পুরুষের সম্পর্ক আদিম প্রবৃত্তির। অনাথবন্ধুর রক্তে সুপ্ত সেই প্রবৃত্তির প্রবল উচ্ছ্বাস একদিন জাগিয়ে তুললো মহম্মদ বাজিকর। আর ঠিক এই একটি বিন্দুতে এসে লেখক আর চরিত্র মিলেমিশে একাকার নয় শুধু এক হয়ে উঠলো।

বইটি অনেকদিন ধরে কেউ পড়লে মনে হতে পারে কত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল আবার দু এক বসায় পড়লে মনে হতে পারে অনেকদিন ধরে যেন পড়ে চলেছি। ভাষা যে হৃদয়ানুভূতি প্রকাশের ব্যর্থ মাপকাঠি একথা সত্য কিন্তু ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রচেষ্টা যে অনুভূতির দ্বার খুলে দেয়, প্রসারিত করে সেটাই পাঠকের পরম প্রাপ্তি। বজ্জাত কিংবা বাঘার ইন্দ্রিয়স্পর্শী মৃত্যু বর্ণনা ছাড়াও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ে এই রূপকথা সামগ্রিকভাবেও মনের ভেতর সেই অনুভূতির সম্প্রসারণে চমৎকারভাবে সফল।
Profile Image for Kripasindhu  Joy.
547 reviews
May 30, 2024
আমাদের জীবনটা অনেকটাই অনাথবন্ধু বসুর মতো। কোনো কাজ করতে গিয়ে বা করার সময় ভেবে রাখি ভবিষ্যতে কী ফল আসবে। তবে যা চিন্তা করা হয় তা অধিকাংশ সময়েই ঘটে না। জীবন এমনই। আমাদের চিন্তা দিয়ে যাকে ধরে রাখা যায় না। মনমতো ফল না পেয়ে আমরা অন্ধকার বারান্দায় চুপ করে বসে থাকি অনাথের মতো। আবার নতুন করে সব শুরু করা। জীবন সুন্দর।
Displaying 1 - 30 of 44 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.