অশোককুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৫৫, কলকাতায়।লেখাপড়া কলকাতার স্কুল-কলেজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. বি. এ। পেশা জনসংযোগ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অতিথি অধ্যাপক।প্রথম প্রবন্ধ ১৯৮১-তে সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর পরে প্রধানত দেশ-আনন্দবাজারে অপ্রকাশিত তথ্যনির্ভর প্রবন্ধ লিখেছেন। পুস্তক সমালোচনা করেছেন। সাম্প্রতিককালে ‘গণশক্তি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে কিছু প্রবন্ধ।রবীন্দ্রনাথ এবং প্রাক্ স্বাধীনতাপর্বের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বিষয়ে তথ্য-সংগ্রহে আগ্রহী।রবীন্দ্রনাথের আঁকা প্রথম ছবিটি খুঁজে বের করে লিখেছিলেন ‘রবির সর্বপ্রথমোদ্যম’। ১৯৮৯ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে সেই ছবিগুলির আলোকচিত্র বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে স্থান পেয়েছে। ভারতে কমিউনিজমের উদ্ভব এবং তার বিকাশ সংক্রান্ত কিছু গােপন ব্রিটিশ নথি নিয়ে সম্পাদনা করেছেন একটি ইংরেজি বই—‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড কমিউনিজ্ম্, সিক্রেট ব্রিটিশ ডকুমেন্ট্স্’।লেখা ছাড়া আরও দুটি বিশেষ শখ: কবিতা আবৃত্তি, পুরনো ডায়েরি, চিঠি পড়া।
সত্যিকার দেশপ্রেম আর মানুষকে ভালবাসার মানবিক গুণ জগতজুড়ে খুব কম মানুষেরই ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই গুণাগুণের পরীক্ষা দিতে গিয়ে যারা জীবনকে নস্যি ভেবেছেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে জুতোর তলায় পিষেছেন তারাই ছিলেন একাধারে প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমী।
বঙ্গভঙ্গ, বয়কট আর বোমার আন্দোলনে বাঙালি তখন জেগে উঠেছে। এইসময় থেকেই দেখা গেল একদল তরুণদের যারা সশস্ত্র মাধ্যমে ভারতকে স্বাধীনতা উপহার দিবে। সশস্ত্র আন্দোলনের এই তরুণদের এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি উল্লাসকর দত্ত। একজন সত্যিকারের অগ্নিপুরুষ। দেশকে তীব্রভাবে ভালোবাসার মূল্য দিতে হয়েছিলো তাকে। বোমা বানানোর অপরাধে প্রথমে যেতে হয় কুখ্যাত আন্দামান সেলুলার জেল। পরে, মাদ্রাজের মানসিক স্বাস্থ্যনিবাসে। দীর্ঘদিন কারাবাসের পর দেশে ফিরে উল্লাসকর দেখলেন তার প্রাণপ্রিয় ভারতবর্ষ খণ্ডিত। কৈশোরের ভালোবাসা হারিয়ে গেছে। সযত্নে লালন করা স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। এইসময় আবার খুঁজে পেলেন হারানো ভালোবাসাকে। এরকম আরো নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ উল্লাসকর দত্তের জীবন।
ইতিহাস জানতে কেউ উপন্যাস পড়ে না ঠিক, তবে হয়তো এই উপন্যাসটি ইতিহাসবিহীন আম-বাঙালির জন্য অসাধারণ ইতিহাস শিক্ষা হবে।
Book 3: “আগ্নিপুরুশ” লেখক অশোককুমার মুখোপাধ্যায়, (আনন্দ পাবলিশার্স, মুল্যঃ ৭৫ টাকা, ১৮৩ পৃষ্ঠা, ৭ দিন, রেটিং ৬/৫) স্বাধীনতা সংগ্রামী উল্লাসকর দত্তের(পালু) জীবনের উপর আধারিত এই উপন্যাস । উল্লাসকর দত্তের লেখা “আমার কারাজীবন” বই এবং আর অনান্যা বই ঘাটিয়ে দীর্ঘ ৩/৪ বছরের শ্রমে উপান্যাসটি রচিত। বইটি লেখকের প্রথম বই। তারপর ও লেখক যেন এক জাদু ছড়িয়ে রেখেছেন পাতায় পাতায়। উপন্যাসটি নির্ঘাত একটি “page-turner”। সবসময় হাসিঠাট্টা করা, প্রাণবন্ত, কলেজ পড়ুয়া পালু কিভাবে হয়ে উঠলো পরাধিন ভারতের প্রথম পিকরিক অ্যাসিড বোমা প্রস্তুতকারক, কিভাবে দেশকে ভালবাসার মুল্য দিতে হল তাঁকে, প্রথমে যেতে হল আন্দামান জেল তারপর মাদ্রাজের মানসিক স্বাস্থ্যনিবাসে, হারাতে হল প্রেমিকাকে, এই সব নিয়েই মুল কাহিনি। যদিও এটা উল্লাসকরকে কেন্দ্র করে লেখা তবুও এখানে অরবিন্দ, রবিন্দ্রানাথ, বিপিন পাল, ক্ষুদিরাম, বিবেকানান্দ, ভুপেন্দ্রানাথ, বারিন্দ্রকুমার, হেমচন্দ্র এর মতো মহান ব্যেক্তিত্ত্বেরা কেন্দ্র হয়ে উঠেন অনেক অংশগুলতে। এইসব নামী ব্যেক্তত্বকে উপন্যাসের সাধারন চরিত্র হিসাবে প্রকাশ করানো, ঘটনাচক্রে এদের “ character development” দেখিয়ে, তাঁহাদের ভেতরের অন্ধকার এবং আলো দুইয়ের সন্ধান দিয়ে, এক এক ধাপে তাঁদের ব্যেক্ততিত্ব স্থাপন করতে লেখক নিজের পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।এবং এইখানেই উপন্যাসটির সার্থকতা। উপন্যাসের শুরুতে উল্লাসের কলকাতা ছাড়া, উল্লাসের hallucination এর দৃশ্য, উল্লাশ-লীলার ছাদের দৃশ্য, আন্দামান জেলে উল্লাসের আত্মহত্যার চেষ্টা এবং ডঃ মারে এবং উল্লাসের কথপকথনের দৃশ্য যেন মনে দাগ কেটে যায়, গভির দাগ (এই রকম দৃশ্যে পুরো উপন্যাসটি ঠাসা) যদিও বইটি “fiction” genre অধিনে তবুও উপন্যাসটির শুরুতে লেখক বলেছেন : “ এই উপন্যাস রচনার সময় যতদূর সম্ভভ তৈথ্যনিষ্ঠ থেকেছি...” “... উপান্যাসে কল্পনা থাকবেই, এই গ্রন্থেও আছে। কিন্তু সেই কল্পনারও একটা বাস্তব ভিত্তি আছে। এমনই কল্পানা যা যুক্তি দিয়ে বিচার করলে মনে হবে, হ্যাঁ, এমনটা সম্ভব।“
পুরো উপন্যাসটি যেন এক চলচিত্রের মতো ভেসে যায়, পাঠক যেন time-travel করে পৌঁছে যায় পরাধীন ভারতের বাংলায়, উল্লাশকরের মুরারিপুকুরে দলের সাথে যেন আন্দামানের জেলে খাটে। তৈথ্যের সাথে কল্পনা মিশানো এক অপুর্ব উপন্যাসদ। এ মাস্ট রিড...