ইতিহাসের বইয়ের রিভিউ দেয়া কঠিন। তারপর সেটা যদি নিজের দেশের ইতিহাস হয়। নিজের উপর ধিক্কার জন্মায় এইজন্য যে, নিজের দেশের ইতিহাস খুব বিস্তারিত কিছুই জানি না, পাঠ্যপুস্তকে যতটুকু পড়েছি ততটুকুই।
(ওরে নরাধম, নিজের বাপের সন্ধান না করিয়া, অপরের বাপের খবরে তোর কাজ কি!)
বাংলাদেশের ইসলাম-পূর্ব যুগের ইতিহাস আলোচনায় আজকাল কাউকে আগ্রহী দেখা যায় না। তাদের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস বখতিয়ার খীলজী থেকে শুরু। প্রাক-মুসলিম বাংলার ইতিহাস জানতে এই বইটা পড়া আবশ্যকই শুধু নয়, অনেকক্ষেত্রে একমাত্র একটা রিডেবল ইতিহাস।
আমি ইতিহাস বিলাসী। আমার মত যারা ইতিহাসকে চলতে ফিরতে দেখতে পান, হাজার দুহাজার বছর আগের সময়কে দেখতে পান, তারা এই বই পড়ে আবেগী হতে বাধ্য। সাধুভাষায় লেখা বইটা ২০২৩ অনুপাতে একদম সহজবোধ্য না হলেও, অন্যান্য বইয়ের তুলনায় সহজবোধ্য ও সহজপাচ্য।
বইটা ৪ খন্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম খন্ড।
রমেশচন্দ্র এই বইটায় একদম পুরো একাডেমিক ইতিহাস ও আর্কিওলজি ফলো করেছেন। কোন শোনা কথা, অলৌকিক বিবরণকে পুরো সত্যি ধরে নেননি। এটা অনেক বড় দৃঢ়তা এই অর্থে যে, যেকোন জাতিই তার জন্মকালের ধূসর সময়কে একটা মিথিক্যাল রূপ দেবার চেষ্টা করে। গুপ্তযুগ পূর্ববর্তী বাঙালীদের ইতিহাসও নানা গল্পকথায় মোড়ানো। রমেশচন্দ্র সেসব উল্লেখ করলেও তাকে ঐতিহাসিক সত্য ধরে নেন নাই।মোটামুটি বঙ্গের উদ্ভব থেকে সেন-রাজগণ পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং ডিটেলড ভিউ এখানে পাঠক পাবেন।
হিন্দুধর্মের জাতপাত নিয়ে কথা আছে বিস্তর৷ এক্ষেত্রে রমেশচন্দ্রের নিরপেক্ষতা অবাক করার মত। অন্য যে কেউ এইসব ইতিহাসকে নিজের মত চালাতে পারত, কিন্তু স্যার তা করেননি। এমনকি ইতিহাসে যেমন বঙ্গবাসীকে অসভ্য কিন্তু বীররূপে দেখানো হয়েছে, তার উল্লেখও আছে।বাংলাদেশের সংস্কৃতির উদ্ভব নিয়েও কথা আছে।
ভাষা, আচার আচরণ, পোশাক আশাকের উৎপত্তি নিয়েও কিছু সংক্ষিপ্ত বিবরণ আছে, যা পর্যাপ্ত না হলেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রচুর রেফারেন্স গ্রন্থ, পুঁথির উল্লেখ আছে, তবে অধিক জানতে গেলে ওসব ধরলে যে সাগরে পড়তে হবে তা বলাই বাহুল্য। কোন পুঁথির কতটা সত্য, কতটা কল্পনা, সেটা নিয়েও বিস্তর মন্তব্য আছে৷ এমনকি পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক লেখকগণের আলোচনা সহ।বাংলাদেশ ও ভারতের কোথায় কোথায় কত ঐতিহাসিক নিদর্শন, শিলালিপি, সীলমোহর আছে, তাদের লেখনীর কতটা বিশ্বাসযোগ্য এসব নিয়েও স্যার যুক্তিগ্রাহ্য মতামত দিয়েছেন।(যেগুলি বাংলার ইতিহাসের সাথে সঙ্গত)
২০২৩ এ এসে উপলব্ধি করতে পারি, ইতিহাস একটা মারাত্মক অস্ত্র। এটা আপনার যুক্তি-বুদ্ধি ও ভাবনার প্যাটার্ন ফর্মেশনে বিরাট ভূমিকা রাখে। তাই ইতিহাসকে বহুকাল আগে থেকেই প্রোপাগাণ্ডার হাতিয়ার হিসাবে ধরা হয়৷ এবং সত্যিকার নিরপেক্ষ ইতিহাসের চেয়ে দুর্লভ জিনিস কমই আছে।নিরপেক্ষ ইতিহাস যতই ড্রাই হোক, আর যতই আপনার ফিলিংসকে হার্ট করুক, তার মূল্য অপরিসীম। এই অসাধারণ কাজটি রমেশচন্দ্র এই বইতে করে দেখিয়েছেন। যারা নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চান সংস্কারমুক্ত মনে, অবশ্যই বইটা পড়ুন।
বইটাকে চারতারা দেবার কারণ এর আপাত নীরসতা, তবে সেটা আমার বয়সের দোষ, বইটির দুর্বলতা নয়৷ এই বই আমার মত অপগণ্ডের জন্য লেখা নয়, যারা লেখনীর সরসতা অপেক্ষা লেখনীর গুরুত্বকে বেশি মর্যাদা দেন, তাদের জন্য।