নারায়ণ সান্যাল এর লেখার একটা স্পেশাল ব্যাপার আছে। উনি নন-ফিকশনের তথ্যগুলোকে ফিকশনের মধ্যে ব্লেন্ড করে এত চমৎকার ভাবে লেখেন, তথ্যের কচকচানি জানতে না চাওয়া মানুষও গল্প পড়তে পড়তে কখন যে মাথার মধ্যে এত তথ্য নিয়ে ফেলে, সেটা সে টেরই পায় না। 'গজমুক্তা' বইটাও একই রকম। ফরাসি কনস্যুলেটের এক্স চাকুরীজীবী এক ভদ্রলোক জাঁ ক্যুভিয়ে, হাতি নিয়ে নারায়ণ সান্যালকে একটা গল্প শোনাতে চান। কিংবদন্তি গজমুক্তার গল্প, যেটার ব্যাপারে জানতে পেরে বেশ আগ্রহী হয়ে উনি ছুটে গিয়েছিলেন আসামের গৌড়পুরে, লালচাঁদ বরগোঁহাই এর কাছে। বলা হয়, জমিদার পরিবার হলেও তাদের সাথে জড়িয়ে ছিলো হাতি; ওই সময়ে তিনি এবং তার বড় ভাই ওঙ্কারনাথ বরগোঁহাই ছিলেন ভারতের হাতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মাঝে অন্যতম। ছোটজন প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান রাখেন আর যত রকমের থিওরিটিক্যাল জ্ঞান আছে তা রাখেন বড় জন। সভ্যজগত থেকে দূরে অরণ্যাবাসে লালচাঁদজীকে না পেলেও (জাঁ ক্যুভিয়ের আসার খবর পাওয়ার আগে তিনি বেশ কিছুদিনের জন্যে চলে যান গহীন অরণ্যে) পেয়ে যান তার কন্যা কুহু দেবী, হাতি বিষয়ক চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া ওঙ্কারনাথ আর অসমীয়া ভাষী মাহুত (হাতি চালক, রক্ষক) গণেশ ঠাকুরকে। ব্যস, এরপর শুরু হয়ে যায় গল্পটা।
এক মাসেরও বেশি সময় ঐ অরণ্যালয়ে থেকে ক্যুভিয়ে হাতি বিষয়ে জানতে পারেন একদম গোঁড়া থেকে। লক্ষ বছর আগে বিবর্তনের কোন ধারা পেরিয়ে হাতি আজকে এই বর্তমানে এসে পৌঁছেছে, হাতির প্রকারভেদ কতগুলো, কিভাবে অতিকায় ম্যামথের সৃষ্টি হয়েছে এবং কিভাবে তার বিলুপ্ত হয়েছে, তা বেশ সুন্দর করে চিত্রিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রাণী হিসেবে বন্য হাতি কতটা বুদ্ধিমান, নিজেদেরকে কিভাবে রক্ষা করে তারা, সন্তানসম্ভবা হবে পড়লে কিভাবে দলবদ্ধ হাতি দলছুট হয়, মানুষের সাথে হাতির সম্পর্ক, হাতি ধরার যত রকম কায়দা কানুন এবং তা যে কতটা বিপদ সংকুল এসব নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলাপ হয়েছে এই বইতে। এর পাশাপাশি উঠে এসেছে, হাতি পরিচর্যাকারী মাহুত এর কথা। হাতি ধরতে গিয়ে তারা যে ঝুঁকিটা নেয়, এটাকে প্রাচীন স্পেনের গ্ল্যাডিয়েটরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তবে ওখানে থাকে একটা হিংস্র প্রাণী, তার বিরুদ্ধে যে মানুষটি যুদ্ধে নামে তিনি থাকেন অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত। কিন্তু মাহুতরা খালি হাতে মোকাবেলা করে এক পাল বন্য হাতির, যেখানে হাতির সংখ্যা থাকে ৫০-৭০টি এবং কখনো ১০০টির বেশিও। অতি ক্ষুদ্র কোন ভুলও এখানে হতে পারে প্রাণনাশী। শুধু হাতির সাথে সংগ্রামই নয়, বইতে উঠে এসেছে এই লো-পেইড গোষ্ঠীর জীবন সংগ্রাম আর সামাজিক রীতি নীতির গল্প। আর উঠে এসেছে বেশ কিছু মিষ্টি প্রেমের গল্প৷ বড়ামাঈ হাতির সাথে লালচাঁদজীর প্রেমের গল্প, পুন্ডরীকের সাথে সারিনের প্রেমের গল্প আর এক মানব-মানবীর প্রেমের গল্প। আর সবশেষে সেই কিংবদন্তী গজমুক্তার গল্প।
বইতে এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম যে মনে হয়েছে, আসলেই কি আমি এখন ২ কোটি মানুষের এই দমবন্ধ করা শহরে আছি? নাকি আছি গহীন কোন অরণ্যে, হাতির পিঠে বসে। কখনো চমৎকৃত হয়েছি, দাঁত যে নন-কন্ডাক্টর সেটার বিষয়ে হাতির জ্ঞান দেখে। কখনো না চোখের কোন ভিজে গেছে হাতির কষ্টে। প্রভুকে বাঁচাতে না পারার কষ্টে তার ব্যথিত হওয়া আমাকেও স্পর্শ করে গেছে। ৩ দিন লেগেছে ১৯০ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে, কারণ বইয়ে থাকা বিভিন্ন তথ্য ঠেলে দিচ্ছিলো আরো জানার অনন্ত পথে। বইটা পড়াকালীন সময়েই আমার কয়েকবার মনে হয়েছে, সকল বন্ধন ছিন্ন করে এই অরণ্যাবাসে ১ মাস কাটিয়ে না আসলে আমি বোধহয় আফসোসেই মারা যাবো। তারপর সে ইচ্ছাকে চাপা দিয়ে আবারো বইয়ে ডুবে গেছি৷ এখব বই শেষ করার পরে, বুঝতে পারছি এ ইচ্ছাকে কীভাবে চাপা দেবো।
শুরুতেই বলেছিলাম, নারায়ণ সান্যালের লেখার স্পেশালিটি হচ্ছে, নন-ফিকশনকে ফিকশনের সাথে দারুণ ব্লেন্ডিং৷ এতটাই চমৎকার যে বোঝাও যায় না, ফিকশনে কোন অংশটুকু আসলেই বাস্তব৷ তাই সে দায় থেকে, আমি যতটুকু পারি জানিয়ে দিচ্ছি। তবে এর ক্রেডিট আবিদের। ও না জানালে, এটুকু হয়তো এড়িয়ে যেতাম।
হাতি নিয়ে যত তথ্য আছে তা তো বাস্তব (বিজ্ঞানসম্মত) এর পাশাপাশি লালচাঁদ বড়গোঁহাই চরিত্রটিও বাস্তব। তার আসল নাম প্রকৃতীশ বড়ুয়া, ওয়াইল্ডফোরামে যাকে সবাই 'লালজী' নামে চেনে। আসামের গৌরীপুর রাজবাড়ীর এই পুরুষ জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালের ১লা মে। ৭ বছর ১০ মাস বয়সে একটু প্যাডি বার্ড শিকারের মধ্য দিয়ে তার শিকারী জীবনের সূত্রপাত। ১২ বছর বয়সে শিকার করেছেম বাঘ। তার শিকারের ঝুলিতে আছে ৩৪১ টি বাঘ, ১০০র বেশি লেপার্ড। আর ১০০৯ টি হাতি শিকারে তিনি নিজেকে কিংবদন্তীতে পরিণত করেছেন। হত্যা নয়, শিকার। বুনো হাতিকে পোষ মানানোতে তিনি ছিলেন গডগিফটেড প্রতিভার অধিকারী। লোকে বলতে, হাতির ভাষা বুঝতেন তিনি। তার এই গুনটি পেয়েছে তার ছোট কন্যা পার্বতী বড়ুয়া। ফাঁদ দিয়ে হাতি শিকারী একমাত্র নারী হিসেবে তাকে ডাকা হয়, কুইন অফ এলিফ্যান্ট। লালজী মারা যান, ১৯৮৮ সালের ২রা এপ্রিল। শেষ জীবনে লিখে গিয়েছিলেন 'হাবিজাবি' নামে ৪২০ পাতার একটা বই, যেটাতে পাওয়া যাবে; তার শিকারের ইতিহাস, হাতি চেনার কৌশল, হাতির খাবার, হাতির নানা রোগের ভেষজ ওষুধ, মাহুতের কর্তব্য, শিকারের ১৮ দফা শর্ত বা নীতি এবং হাতিশিক্ষার দুর্লভ গান। বাংলা, হিন্দি ও অসমিয়া ভাষায় লেখা গানগুলো লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এই গান গেয়েই মাহুতরা হাতিদের শিক্ষা দিতেন। অপ্রকাশিত এই বইটা রয়েছে প্রকৃতীশ বড়ুয়ার আসামের বাসস্থান 'হাওয়ামহল' এ।