'দলিল' আবহমানকালের ইতিহাস, সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি সংস্কৃতি পুরাতত্ত্ব উপনিবেশিক সামন্তবাদ এবং আবহমান কালের দলিল হয়ে জীবনধারায় গতিশীল। ‘দলিল’ উপন্যাসে আমরা দেখি জীবন কতো জটিল, কতো রহস্যঘেরা মানুষের মানবিকতা, কেউ কারো নয়, সবাই নিজের নিজের ধান্ধায় দিশেহারা, প্রেম যেন মরিচিকা, মানব-মানবী তাদের বিচিত্র সম্পর্কের বেড়াজালে আটকে গেলেও কোথায় যেন একটা ক্ষত, কোথায় একটা বিন্দু তাদের প্রতিনিয়ত অপরাধরোধের মধ্যে তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে, চারদিকের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলীর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে ‘দলিল’ উপন্যাসের মানব-মানবীরা, পারিবারিক জীবনের এই সমীকরণ কোথায় যে ঠেলে দিচ্ছে তাও কেউ অনুধাবণ করতে পাচ্ছে না অথবা সবই চোখের সামনে ঘটছে কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করার প্রয়োজন মনে করছে না। জন্ম-মৃত্যু লোভ-হিংসা অর্থ-ভৈবব বিষয়-সম্পত্তি সবই কেমন মানবিকতাকে ছাপিয়ে প্রবহমান জীবনের বাঁকে ছুটছে,মানুষগুলো তারপরও নষ্ট সময়ের ক্ষতের মধ্যে বসে খাজুরে আলাপে নিমগ্ন, জটিল জীবন ও সময় এখানে বারংবার মুখ টিপে হাসছে, বহমান ও চলমান নদীর মতো ছুটছে কোথায় জীবন রেশের ঘোড়া তা যেন রহস্যময়। ‘দলিল’ জীবন ঘনিষ্ঠ এক উপন্যাস, প্রবহমান সময় ও সমাজ অর্ন্তগত জীবনের রুপকল্প। কাঠামোতে চেতনাপ্রবাহ কল্পনা ও স্বপ্নকে আশ্রয় করে কখনো গল্পের মেজাজে, কখনো কিছুটা ব্যক্তিগত প্রবন্ধের আঙ্গিকে, কিছুটা হয়তো বা জীবনধর্মী কবিতার ছেঁড়া-ছেঁড়া অঅকুতি মিশিয়ে এগিয়ে গেছে, তবুও এর অন্তঃপ্রকৃতি, এর সমগ্র অবয়বে এক শ্রেণীর মানুষের যে মানব-মানবী বিপন্নতায় কাতর, যে মানুষের অর্ন্তরিত চেতনায় রয়েছে শোধন আর বঞ্চনার হাহাকার, তাদেরই জীবনলেখ্য। দীর্ঘকাল যাবৎ উপন্যাস লিখছেন শওকত আলী, ব্যক্তিহৃদয়ের নিভৃতি অন্তপুরে দৃষ্টি নিবন্ধ করতে যেমন তিনি পারঙ্গম, তেমনি সমাজ বাস্তবতার নানান আবর্ত সমূহকেও গভীরভাবে পরখ করতে সদাআগ্রহী, একই সঙ্গে তিনি হৃদয় সচেতন সমাজ সচেতন ও ইতিহাস সচেতন ঔপন্যাসিক।
Shawkat Ali (Bangla: শওকত আলী) is a major contemporary writer of Bangladesh, and has been contributing to Bangla fiction for the last four decades. Both in novels and short stories he has established his place with much glory. His fiction touches every sphere of life of mass people of Bangladesh. He prefers to deal with history, specially the liberation war in 1971. He was honored with Bangla Academy Award in 1968 and Ekushey Padak in 1990.
আপনি যদি একজন মধ্যবিত্ত সামাজিক মানুষ হয়ে থাকেন তাহলে আপনি চাকুরী করে টাকা জমাবেন পরিবার নিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বাস করার মতো বাড়ি বানিয়ে থাকার জন্য । এইটা খুবই বাস্তব এবং যুক্তিযুক্ত একটা সিদ্ধান্ত । একজন প্রকৃতস্থ মানুষ তার সারাজীবন ধরে স্থায়ী আশ্রয় খুঁজে । আমাদের উপন্যাসের প্রৌর নায়ক রায়হান এই ব্যাপারে ব্যতিক্রম নন , তবে এই বাড়ি বানানোর জন্য জমি কিনতে গিয়ে তিনি মহান ফ্যাসাদে পড়েছে । ফ্যাসাদের নামটি হলো গিয়ে পরকিয়া…পরকিয়া…পরকিয়া ( সম্পর্কের না-বোধক গুরত্ব বুঝানোর জন্য দুইবার বেশি লেখা হইলো ) রায়হান সাহেব পেশায় একজন সাংবাদিক , ঘরে সুন্দরী এবং আদর্শ স্ত্রী ও সন্তান থাকা স্বত্বেও হার্টের প্রবলেম নিয়ে পঞ্চাশ বছর বয়সে পরস্ত্রীর সাথে সম্পর্কে জড়াইয়া সে নিজেই একটা ‘’নড়বড়ে কিন্তু চাইলে এই বয়সেও সম্ভব’’ টাইপ সংবাদ বানায় ফেললো । সংবাদ টি আরো ঝাকানাকা হইলো যখন তিনি জানতে পারলেন ঐ পরস্ত্রী ঠিক করেছেন সে তার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে রায়হানের কাছে চলে আসবে । হার্টের ব্যারাম ওয়ালা আশিক ই তার পছন্দ । রায়হান বুঝতে পারে না একটা বিশেষ কর্মের মাঝখানে যে লোক তার বুকে হাত দিয়ে বলে ‘’ নিঃশ্বাস নিতে পারতেছি না , হাসপাতালে যাওয়া দরকার ‘’ তার মধ্যে ভদ্রমহিলাটি কি দেখেছে ! তা সে যাই দেখুক রায়হান এখন সরিষা ক্ষেত ছাড়া কিছুই দেখতেছে না । রায়হানের স্ত্রী বীথি আদর্শ গৃহিণী , আদর্শ জননী কিন্তু জঘন্য কন্যা । পিতামাতার অবাধ্য হয়ে প্রেমিকের সাথে পালায় যাওয়া মানসিকতার মেয়ে আর যাই হোক কন্যা হিসেবে নিশ্চয় আদর্শ নয় । আমরার সাংবাদিক যে তার সুখের সংসারের বারোটা বাজাইয়া আরেক জায়গায় গিয়া সানাই বাজায় সে সম্পর্কে সে অবগত নয় । জমি কেনা হচ্ছে , নিজেদের বাড়ি হবে এই আনন্দেই বীথি সারাদিন আনন্দিত থাকে । বড়ছেলে রঞ্জু মেডিকেলে পড়ে । ক্লাস ফ্লাস হয় না । আন্দোলন টান্দোলন লেগেই আছে । ডাক্তারের ভ্যাকান্ট পোস্ট পাঁচশো কিন্তু বেকার ডাক্তারের সংখ্যা তিন হাজার । চাকুরী নাই । অবস্থাটা এমন যেন এরশাদের আমলে এম বি বি এস পাশ করা কাউকে এখন কি করছো জিজ্ঞাস করলেই সে উদাস হয়ে জবাব দিতো – ‘’দেশে রোগীর চাইতে ডাক্তার বেশি হয়ে গেছে তো এই জন্য চিকিৎসা বাদ দিয়ে একটা কলেজে বায়োলজি পড়ানো শুরু করছি । অপারেশন থিয়েটারে মানুষ কাটার কথা… ভাগ্যের দোষে ল্যাবে ব্যাঙ কাটতেছি ‘’ যাই হোক এই স্ট্রাইকের মধ্যেই তার এক সহপাঠিনীর ভাই রাজনৈতিক কোন্দলে যেদিন ইহকাল ত্যাগ করলো সেদিন রঞ্জু মেয়েটিকে মানসিক ভাবে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তার উপর কিছুটা দুর্বলতা অনুভব করে । ঐখান থেকেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হয়। ঘনিষ্ঠতার ফলাফল স্বরূপ এখন মাঝেমধ্যেই মেয়েটি হুমকি দেয় পরীক্ষা শেষেই মেয়েটিকে বিয়ে করে তার বাসায় তুলতে হবে । মেজছেলে মঞ্জু ভার্সিটিতে পড়ে । সেইখানে তার সাথে পরিচয় হয় রায়হানের ই এক বন্ধু কন্যা রাখির সাথে । কয়েক পৃষ্ঠার ব্যাবধানে রাখি আর মঞ্জুর প্রেম হয়ে যায়। বাস্তব জীবনে প্রেমে পড়তে মাসের পর মাস লেগে যায় কখনো বছর ও …উপন্যাসে লাগে দুই পৃষ্ঠা নাইলে চাইর পৃষ্ঠা । হয়তো এজন্যই প্রেমপূর্ণ মানসিকতার মানুষরা উপন্যাসের চরিত্রের সাথে নিজেরে কল্পনা করতে ভালোবাসে । উপন্যাসের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সেই সময় ক্ষমতায় এরশাদ ছিলো । সে পরিকল্পনা করে বাংলাদেশ কে পুরোপুরি ইসলামিক রাষ্ট্র বানানোর । একটা গুজব উঠে যে দেশ থেকে হিন্দুদের ও তাড়ায় দেওয়া হইতে পারে । এরকম কিছু হইলে রাখি কোথায় যাবে তাই নিয়ে দুজন ই চিন্তিত । ছোট ছেলে টুকু ইস্কুলের কিছু বেপরোয়া ছেলেদের সাথে মিশে গোল্লায় যাওয়ার পথে । ইস্কুল ব্যাগে একদিন ট্যাবলেট পাওয়া গেলো । একটা ওলটপালট সময়ের ওলটপালট মানুষদের গল্প হলো দলিল । তাছাড়া এখানে তখনকার সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা আর এরশাদের লিডারশীপের সুযোগ নিয়ে ছাত্রদের অবাধ সন্ত্রাসীয় কর্মকান্ড তুলে ধরা হয়েছে । উপন্যাসের মূল আকর্ষণ কিছু হলেই চরিত্রদের বিবেকের সাথে কথোপকথনের অংশ টা । প্রত্যেকটা চরিত্র নিজেদেরকে নিজেরাই ধিক্কার দিতে পছন্দ করে । কেউ হয়তো স্ত্রীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে করতেই নিজের বিবেক কে বলতেছে ‘’ছিঃ এটা তুই কেমনে করছ ! ‘’ আবার কেউ বাপ অসুস্থ দেখে ডাক্তার কে খবর দিতে গিয়ে রাস্তায় মারামারি দেখতে দেখতে বিবেক কে বলতেছে “ছিঃ তোমার বাবা অসুস্থ আর তুমি কিনা রাস্তায় দাঁড়াইয়া রগড় দেখতেছো’’ উপন্যাসের এই একটা জায়গায় বারবার বিরক্তি লাগার কারণে কখনো মনে হয়েছে এর নাম দেওয়া উচিৎ ছিলো দলিল এবং বিবেকের সাথে কথোপকথন … ছিঃ ও অন্যান্য
দীর্ঘ একটি উপন্যাস, পড়ে শেষ করতে সময় লাগে। গতি মাঝে মাঝে ঝিমিয়ে যায় বলে সেই সময় রাবারের মতো লম্বা হয়।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের শেষ কয়েকটা বছর আশ্রয় করে লেখা। ওই সময়ে বলবার মতো ঘটনার কী আর অভাব! নূর হোসেন বা মিলনের মতো স্ফুলিঙ্গ যেমন আসে রাজনীতির বর্ণনায়, দুই গণতান্ত্রিক দলের বহু সস্তা লুম্পেনও আসে তেমনই। বন্যা আসে, মাদকের নীরব একটা বিস্তারও ঝিমায় না।
সব মিলে ব্যক্তির সংশয়ের চেয়ে কালই বড় হয়ে দাঁড়ায় প্রায়শই। এই লেখাগুলো দরকার সেকারণেই।
হালের তোতলা কলমগুলো থেকে জোছনাবিলাসী লেখার বাইরে এরকম কিছু বের হলে ভালোই লাগবে। বের হতেই হবে, সেই দিব্যি অবশ্য কেউ কাউকে দেয় না। দেয়ার দরকারও নেই।
অন্য অনেকের মত আমার বই পড়া শুরু পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিকদের বই পড়ে। অবশ্য তার আগে শরৎ-বঙ্কিম পড়েছি। দেশের লেখকদের সম্পর্কে তেমন জানাশোনা ছিল না। কেননা আশেপাশে যাদের পড়তে দেখতাম, তারাও এই-ই পড়তো। সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দুর ঢাউস বইগুলো পড়তাম, আর হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবালের পাতলা পাতলা বইগুলো দেখে ভাবতাম, দেশের লেখকরা কি বড় পরিসরে কিছু লিখতে পারে না?
শওকত আলীর সম্পর্কে তখনই একটু আধটু জানতে পারি। 'প্রদোষে প্রাকৃত জন' পড়ি তারও অনেক পরে, গত বছর। এবার পড়লাম লেখকের বই, 'দলিল'।
কাহিনী সংক্ষেপ বয়ান করবো না। শুধু বলি, এই বইয়ের পটভূমি, এরশাদের শাসনামল। কিন্তু বইয়ে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, ঊণসত্তর, এমনকি সাতচল্লিশ। সাংবাদিক রায়হান আলীর জমি কেনা থেকে গল্প ছড়িয়ে গেছে মাটির উপরে। আছে সেই সময়ের রাজনীতি, সমাজ, মানুষের কথা। সুনীল-সমরেশদের মত প্রচুর চরিত্র আর লম্বা সময়ের কথা বলেননি লেখক। কিন্তু রায়হানের পরিবারকে কেন্দ্রে রেখে দেখিয়েছেন আর সবার গল্পটা ভিন্ন নয়।
বইটা সংগ্রামের কথা বলে। বলে, ক্ষমতার আসনে যারা বসে থাকা মানুষদের চেহারা বদলালেও রূপ একই থাকে। আর সাধারন মানুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেবল সংগ্রাম করে যায়।
ঢাকা তখনও আজকের হৈ হৈ রৈ রৈ করে উঠা মহানগরী হয়ে উঠেনি। তবে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে উঠছে। মূল শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায় আবার খুব বেশি দূরেও নয় এমনই একটা শহরতলী টাইপ জায়গা ফুলবাড়িয়ায় জমি কিনতে যায় কেন্দ্রীয় চরিত্র সাংবাদিক রায়হান, স���্গে থাকে দালাল মুনশি। রায়হানের এই নিজস্ব ঠাঁই খোঁজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় আমাদের গল্প 'দলিল'। রায়হানের পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গোটা কাহিনী। যতোটুকু না পারিবারিক, তারচেয়ে বেশি ইতিহাস আশ্রিত রাজনৈতিক উপন্যাস। পটভূমি স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনকাল, বলা ভালো ৯০ এ এরশাদের পতনের আগে উত্তাল সময়ের গল্প। কেন্দ্রীয় চরিত্র রায়হান আর মেডিকেলে পড়ুয়া বড়পুত্র, রঞ্জু আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেজোপুত্র, মঞ্জুর কল্যাণে বইয়ে উঠে এসেছে তখনকার প্রায় প্রতিদিনকার দিনলিপি।
দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিক, কিন্তু মানুষজনের মনে স্বস্তি আসেনি। একে তো স্বৈরশাসক ক্ষমতায়, চতুর্দিকে বেড়ে গেছে অরাজকতা। রাস্তাঘাটে দাপট বেড়েছে সরকার দলীয় ক্যাডারদের। ঢাকা মেডিকেল আর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রায় প্রতিদিন লেগে রয়েছে মিছিল-মিটিং, হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ইত্যাদি। এসব রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েই জায়গা কেনা উপলক্ষে বিভিন্ন জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে থাকে পরিবারটি। তাদের পারিবারিক নানান সমস্যার সাথে সাথে সেই অস্থির সময়টার (সামাজিক, রাজনৈতিক) ছোট থেকে বড় খুঁটিনাটি সব বিষয় তুলে ধরেছেন শওকত আলী তার সুবৃহৎ উপন্যাস 'দলিল'-এ। আক্ষরিক অর্থেই সেটা এক প্রকার দলিলই বলা চলে।
সবসময় হা-পিত্যেশ করে এসেছি পাশের দেশের সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দুরা কেমন ঢাউস বই লিখে ফেলেন আমাদের দেশে তেমন কই? একাত্তর নিয়ে মোটামুটি লেখালেখি চোখে পড়লেও পঁচাত্তর পরবর্তী সময়টা থেকে নব্বই-এর দশক নিয়ে হিস্টোরিক্যাল ফিকশন কিংবা রাজনৈতিক উপন্যাস খুব একটা চোখে পড়ে না। শুনেছিলাম আনিসুল হকের নাকি একটা বই আছে। খুঁজে বের করে পড়েছিলামও -_- অমূল্য কিছু সময় নষ্ট করার পাশাপাশি রাজনৈতিক উপন্যাসের নামে সস্তাদরের প্রেমকাহিনী গেলানোর জন্য ব্যাটাকে আমি কোনদিনও ক্ষমা করব না। যাকগে! দলিলে ফিরে যাই। বইয়ে চমৎকারভাবে সে সময়ের ঢাকার বিবরণ তুলে ধরেছেন। না, রাজনৈতিক অবস্থার কথা বলছি না, শহর হিসেবে ঢাকা। যেসব জায়গায় এখন বিশাল বিশাল বিল্ডিং সেসব জায়গায় ধানক্ষেত, মাটির কাঁচা রাস্তা। কী অবস্থা। তবে সময়ের সাথে সাথে বদল ঘটেছে আরও অনেক কিছুর। কিন্তু বইয়ের শেষ দিকে মিছিল করার সময়ে রায়হানের একটা চিন্তায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে। আসলে শাসক গোষ্ঠী সবসময় শাসকগোষ্ঠী-ই। :/ সেটা স্বৈরশাসকের বেশে থাকুক আর রাজা কিংবা গণতান্ত্রিক যাই হোক না কেন। আমজনতা অধিকাংশ সময় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁতে দাঁত চাপা দিয়েই জীবন পার করে দেয়। আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে যায় রাজপথে বিদ্রোহ করতে করতেই...
বইটা আমি তিনশ পেজ পড়ার পরেও শেষ করতে পারিনি। শওকত আলীর আরো কিছু পড়ার ইচ্ছা ছিল। এই বই এ সেই আগ্রহে পানি ঢেলে দিয়েছে। বই বড় হয়েছে। কিন্তু খুব বেশি ভেতরে যান নি। উনার এই বই পড়ে আমি একটু হতাশ। অন্য বই পড়তে পারছি না।
পাঁচ শ' পাতার লম্বা উপন্যাস, শেষ ক'রতে সময় লাগলো। 'ওয়ারিশ' উপন্যাসের সাংবাদিক রায়হান আলী 'দলিল' উপন্যাসেরও মূল পাত্র (Prncipal Protagonist)। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের আশির দশকই এর মূল সময় কাল, তবে অতীত উঠে এসেছে বারবার। এটাকে একটা গুরত্বপূর্ণ Historical Fiction বললে অত্যূক্তি হবে না। এখানে যেমন আছে রাজনীতিতে উত্তাল বাইরের জগত তেমনি আছে পাত্র-পাত্রীদের নিজস্ব জীবন, সে জীবনগুলোর চাওয়া-পাওয়া, প্রেম, সংসার, কাম, ক্রোধ, স্বার্থপরতা ইত্যাদি। নির্দিষ্ট ন্যারেটর নেই, শওকত আলী কিছুটা Stream of Consciousness প্রয়োগ ক'রেছেন। তবে উপনাসের শেষে যেয়ে এরশাদের পতন ঘটলেও, চরিত্রগুলোর জীবনের একটা মোটামুটি রফা হ'লেও, একটা হতাশা রয়ে গেছে- সমাজের বৃহদাংশ Lumpen জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের যে শেষ নেই, আর মুৎসুদ্দিদের, পুঁজিপতিদের দৌরাত্ম্য যে রয়েই যাবে, সে রকম একটা হতাশাবাদ আঁচ করা যায়, আপাতত সংগ্রামই জীবনের মূল উপজীব্য তাই যেন লেখকের কট্টর বামপন্থী লেখনীতে ফুটে উঠেছে।
উপন্যাসের ব্যাপক এডিটিং দরকার- ধারাবাহিকতায় সমস্যা আছে যদিও লেখক নিজে এটাকে রিভাইজ ক'রেছেন ব'লে বইটার শুরুতে জানান দেওয়া হ'য়েছে কিন্তু সে কাজটা আরো মনোযোগ দিয়ে করা দরকার। বাঙলা অ্যাকাডেমি এক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতের পাঠকরা উপকৃত হবেন।
একটি পরিবারের চোখে নব্বইয়ের সৈরাচার বিরোধী আন্দোলন দেখেছি উপন্যাসটিতে। পারিবারিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়ন সমান্তরালভাবে এগিয়েছে সুন্দরভাবে। ব্যক্তি কখন যেন জাতীয় চরিত্র হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে উপভোগ্য একটি বই।