Jibanananda Das (bn: জীবনানন্দ দাশ) is probably the most popular Bengali poet. He is considered one of the precursors who introduced modernist poetry to Bengali Literature, at a period when it was influenced by Rabindranath Tagore's Romantic poetry. During the later half of the twentieth century, Jibanananda Das emerged as the most popular poet of modern Bengali literature. Popularity apart, Jibanananda Das had distinguished himself as an extraordinary poet presenting a paradigm hitherto unknown. It is a fact that his unfamiliar poetic diction, choice of words and thematic preferences took time to reach the heart of the readers. Towards the later half of the twentieth century the poetry of Jibanananda has become the defining essence of modernism in twentieth century Bengali poetry.
গুডরিডস্ বিভিন্ন জনরার বইয়ের মৌসুম ঘোষণা করে, তখন পাঠকদের ঔ জনরার বিভিন্ন ক্লাসিক ও জনপ্রিয় বইয়ের সাজেশন দেয়া হয়। কত রকমের মৌসুম আছে: সাইন্স ফিকশন অ্যান্ড ফ্যান্টাসি উইক, থ্রিলার অ্যান্ড মিসটেরি উইক, ইয়ং অ্যাডাল্ট উইক,..., ইত্যাদি ইত্যাদি। সামনে আসছে হ্যালোইন, তাই গুডরিডসে এখন চলছে হরর জনরার মৌসুম। হোমপেজে চিকন করে দেখা যাচ্ছে একটা ভৌতিক ছবি।
কথা হচ্ছে, কথা তা না; আমরা বাঙালিদের জন্য কি কোন গুডরিডস্ সিজন আছে? নেই, কিন্তু হতে পারতো। এই যেমন মুক্তিযুদ্ধ সপ্তাহ, দেশভাগ সপ্তাহ, স্বাধীনতা সপ্তাহ, সুকুমার হিউমার সপ্তাহ, জসীমউদ্দিন পল্লীবাংলা সপ্তাহ, সুনীলের ভ্রমণ আর ইতিহাস সপ্তাহ, সত্যজিৎ সাসপেন্স সপ্তাহ, রবীন্দ্রনাথ বাদল দিনের প্রথম কদমফুল সপ্তাহ, কম্বলমুড়ি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প মাস, রবীন্দ্রনাথ 'একাই একশো' সপ্তাহ, শরৎচন্দ্র উইক ফর ক্রাইবেবিজ, মে দিবস উপলক্ষে নজরুল-মানিক ওয়ার্কিং ক্লাস সপ্তাহ, স্ট্রেস কমানোর জন্য হুমায়ূন আহমেদ সপ্তাহ, ......................................... (ডটগুলোর মানে "আরও অনেকরকম সপ্তাহ বলতে পারতাম"- এমনটা না, ডটগুলোর মানে আমার জ্ঞানের দৌড় শেষ)। যাইহোক, সব কথার এক কথা- জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে চারটা মাস: কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ; অর্থাৎ দুইটা ঋতু: হেমন্ত ও শীত। জীবনানন্দের কবিতায় এই দুইটা ঋতুর রূপ-রস-গন্ধ-বিষাদ একাকার হয়ে গেছে। তাঁর কবিতা বুকে করে বাংলা কবিতার পাঠকরা এই চারটা মাস ঘুমাতেই পারে। ঘুমানের ফাঁকে ফাঁকে পড়তে পারে কবিতা। সিলিং ফ্যান বন্ধ করে দিয়ে, জানালা খুলে দিয়ে, ঝিঁঝি পোকার গানে বিভোর হয়ে কার্তিকের তেইশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রাতে না ফেরার দেশে হারিয়ে যাওয়া মধুর মানুষদের স্মরণ করে তারা বেদনায় আকুল হতে পারে। হেমন্ত রাতের মেঘমুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে তারা বলে উঠতে পারে- নক্ষত্রেরা চুরি করে নিয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর।
বসেছি মহাপৃথিবী নিয়ে কিছু লিখবো বলে। শুরু করেছিলাম গত মাঘ মাসে। ফাল্গুন চলে আসলে জীবনানন্দের কবিতাসংগ্রহ বুকশেলফে তুলে রেখেছিলাম। ইচ্ছা ছিল কার্তিক আসলে আবার শুরু করবো। আশ্বিনেই শুরু করে দিয়েছি। ঠিক করেছি এখন থেকে প্রতিবছর চার মাস জীবনানন্দের কবিতা পড়বো।
মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থে আমার প্রিয়তম কবিতা 'বলিল অশ্বত্থ সেই'। একটা পরিবার বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও। হয়তো দেশ ছেড়ে, অথবা এক গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও। বিদায়ী সেই পরিবারের প্রতি ব্যাকুল ভালোবাসা জানাচ্ছে প্রতিবেশি একটা অশ্বত্থ গাছ, তাদের থেকে যেতে করছে অনুনয়। এতদিন পাশাপাশি ছিলে, আহা, ছিলে কত কাছে; ম্লান খোড়ো ঘরগুলো-আজও তো দাঁড়ায়ে তারা আছে; এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন্ দিকে কোন্ পথে ফের তোমরা যেতেছ চলে পাই নাকো টের!
আমার দেশভাগের কথাই মনে হয়েছে। গ্রাম ছেড়ে যারা শহরে যায় তারাও তো কোনদিন ছুটিছাটায় বাপ-দাদার ভিটে দেখতে আসে। কিন্তু এই কবিতায় আছে শিকড় উৎপাটনের সূর, দেশভাগের মত। ঔ পরিবারের কর্তা হয়তো মৃত্যুশয্যায় সেই খড়ের বাড়ির কথা ভাববে, শেষবারের মত বসতে চাইবে প্রিয় অশ্বত্থ গাছটার ছায়ায়। এ এক অদ্ভুত মায়াময় কবিতা।
আরেকটা কবিতা আছে মহাপৃথিবীতে - 'ফুটপাথে', এর সাথে ঔ অশ্বত্থ গাছটার কথাগুলো যুক্ত করে সুন্দর মালা গেঁথে ফেলা যায়। ফুটপাথ বলতে এখানে কলকাতা শহরের ফুটপাথ। কবি হাঁটছেন। গভীর রাত। লোহালক্কড়, ইট আর কনক্রিটে মোড়া শহরে তাঁর জীবন হাঁপিয়ে উঠেছে। কবি ভাবছেন তাঁর বাড়ির কথা, গ্রামের কথা: এই ঠান্ডা বাতাসের মুখে এই কলকাতার শহরে এই গভীর রাতে কোনো নীল শিরার বাসাকে কাঁপতে দেখবে না তুমি; জলপাইয়ের পল্লবে ঘুম ভেঙে গেল বলে কোনো ঘুঘু তার কোমল নীলাভ ভাঙা ঘুমের আস্বাদ তোমাকে জানাতে আসবে না। হলুদ পেপের পাতাকে একটা আচমকা পাখি বলে ভুল হবে না তোমার, সৃষ্টিকে গহন কুয়াশা বলে বুঝতে পেরে চোখ নিবিড় হয়ে উঠবে না তোমার!
মহাপৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা আট বছর আগের একদিন। কবিতাটা ডিপ্রেশনে আক্রান্ত এক ভদ্রলোকের আত্মহত্যা নিয়ে, তাই বোধহয় প্রকৃতির যেসব উপাদান আমাদের জীবনের মায়ার জড়িয়ে ফেলে, সেসবের কথা লেখা। পাঠকপ্রিয় কিছু পঙক্তি এই কবিতায় আছে। যেমন "যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের - মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা"- এই লাইনটা কত কোটিবার প্রেমিক-প্রেমিকারা একে অপরকে শুনিয়েছে? অথবা আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার। অথবা ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে? চমৎকার!- ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!’ ইঁদুর ধরার ব্যাপারটা বেশ কৌতুকের সৃষ্টি করে। এর'ম মজার ব্যাপার আরও আছে, চারদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা- কথাটা পড়লেই মনে হয় ফুটো মশারির কথা, হাসি চলে আসে। ডিপ্রেশনকে ফ্যাশনেবল বানিয়েছে যারা, সেই রোমান্টিকদেরও প্রিয় কবিতা আট বছর আগের একদিন। "মরিবার হলো তার সাধ", "লাশকাটা ঘর", এই লাইনগুলো প্রবল গাম্ভীর্যের সাথে তারা উচ্চারণ করে।
'স্থবির-যৌবন' কবিতার শুরুটা বেশ, শেষটাও। ভাষার একটা জাঁকজমক আছে। মনে হয় "সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণী"দের উদ্দেশ্য করে লেখা; চৌধুরীদের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে যাদের হাসির শব্দ শোনা যায়, আমাদের দিকে যারা ফিরেও তাকায়না। আঙুর ফল টক, তাদের প্রতি আমাদেরও কিছু বলার থাকে। তারপর একদিন উজ্জ্বল মৃত্যুর দূত এসে কহিবে: তোমারে চাই-তোমারেই, নারী; এই সব সোনা রুপা মসলিন যুবাদের ছাড়ি চলে যেতে হবে দূর আবিষ্কারে ভেসে। 'আবিষ্কার'- এ ভেসে চলে যাওয়া! মনে হয় 'আবিষ্কার' সত্যিই কোন উড়ন্ত বাহনের নাম। শব্দ নিয়ে কবিদের এই খেলাটা ভালো লাগে।
খুব স্বল্পদৈর্ঘ্যের গ্রন্থ মহাপৃথিবী। আমি যেটা পড়ছি (সমগ্র) সেখানে মাত্র ২৬ পৃষ্ঠা জায়গা দখল করেছে। কিন্তু মনে রেখাপাত করার মত হাজারটা পঙক্তি এখানে আছে। ফিগারেটিভলি বলছি। আবার যখন পড়বো (যদি ভাগ্য সহায় হয়), তখন হয়তো নতুন কোন অর্থ খুঁজে পাবো। এইজন্য চেনা কবিতার কাছে নতুন করে পরিচিত হবার জন্য বারবার ফিরে আসতে হয়/হবে।
সারাবাংলায় হেমন্ত শুরু হয়ে গেছে। ধানক্ষেত এখনও সবুজ আছে। ধান সোনালি হলে, পাতা হলুদ হলে, বাতাস আরও শাদা হলে, রাত আরও নীলাভ হলে, জীবনানন্দের প্রতি আমাদের টান আরও বাড়বে। জীবনের, মরণের, হেমন্তের এ-এক আশ্চর্য নিয়ম
সেই চিরচেনা জীবনানন্দ- রূপক, চিত্রকল্প, পরাবাস্তবতার মিশেল। এই বইয়ের সবগুলো কবিতার মধ্যে মনে হয় 'আট বছর আগের একদিন' কবিতাই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এই বইতে শব, সুবিনয় মুস্তফী, অনুপম ত্রিবেদী কবিতার মতো কবিতা থাকা সত্ত্বেও কেন যে এই আত্নহত্যার ঘটনার কবিতা সুপরিচিত তা অবশ্য এবার খুব ভাল করে বুঝতে পেরেছি। পঞ্চমীর চাঁদ ডুবেছে বলেই কি কেউ শুধু শুধু মরতে যায়?
এই ক'দিনে এই একটা কবিতা কতবার শুনেছি তার হিসেব নেই।
এই শীর্ণকায় বইটিকে কি বাংলা ভাষায় রচিত শ্রেষ্ঠতম কাব্যগ্রন্থ বলা যেতে পারে? বাংলায় সকলেই না হলেও, অনেকেই কবি। নামকরা, এমনকি দুনিয়া-কাঁপানো কাব্যগ্রন্থ���র কোনো অভাব নেই এই ভাষায়৷ এমনকি নির্জনতম, শুদ্ধতম কবির লেখা "বনলতা সেন" বা "র্যপসী বাংলা"-ই পাঠকের কাছে অনেক বেশি প্রিয় বলে দাবি করা চলে। কিন্তু আমার নিতান্ত দুর্বল ও বেরসিক পাঠক-সত্তা এই বইটিতে একেবারে ডুবে গেল... যেভাবে নদীতে ডুবে যায় চাঁদ।
মেরেকেটে খানচল্লিশেক কবিতা আছে এখানে৷ অথচ তাদের প্রত্যেকটা প্রাণ ও অপ্রাণের বিপুল উচ্ছ্বাসে ফুটছে৷ আবার, এরই প্রতিটি লাইনে আছে মৃত্যু ও বিস্মৃতির ক্রূর উল্লাস। আছে কবিতাকে ভেঙেচুরে তার হৃদয়কে স্পর্শ করার আকুলতা। জানি না একে আপনারা শ্রেষ্ঠতম বলবেন কি না। তবে এমন কিছু যে লাখেও একটা হয় না— এটা বোধহয় অস্বীকার করাই যাবে না, তাই না? এর দু'মলাটের মাঝে সত্যিই এক অন্য, 'মহা' পৃথিবী আছে। আমি বা আপনি আমাদের ঘোলাটে চোখে তাকে দেখি না। কিন্তু তাতে সে মিথ্যে হয়ে যায় না। তাকেই দেখার চোখ হতে পারে এই বইটা। হতে পারে সেখানে যাওয়ার দরজাও! তাই... বইটা প্লিজ পড়ুন। ব্যস!
"অন্ধকার থেকে খুঁজে কখন আমার হাত একবার কোলে তুলে নিয়ে গালে রেখে দিলো তার: ‘রোগা হ’য়ে গেছ এত- চাপা প’ড়ে গেছ যে হারিয়ে পৃথিবীর ভিড়ে তুমি-’ ব’লে সে খিন্ন হাত ছেড়ে দিলো ধীরে; শান্ত মুখে- সময়ের মুখপাত্রীর মতো সেই অপূর্ব শরীরে নদী নেই- হৃদয়ে কামনা ব্যথা শেষ হ’য়ে গেছে কবে তার; নক্ষত্রেরা চুরি করে নিয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর।"
এই বই ২০১৯-এও পড়ছিলাম, মনে নাই। এখন দেখলাম গুডরিডসে এড করতে গিয়ে।
"তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে, পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন, মানুষ রবে না আর রবে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখন; সেই সুখ আর আমি বসে সেই স্বপ্নের ভিতরে।"
"অনেক নক্ষত্রে ভরে গেছে সন্ধ্যার আকাশ– এই রাতের আকাশ; এইখানে ফাল্গুনের ছায়া মাখা ঘাসে শুয়ে আছি; এখন মরণ ভাল,– শরীরে লাগিয়া রবে এই সব ঘাস; অনেক নক্ষত্র রবে চিরকাল যেন কাছাকাছি। কে যেন উঠিল হেঁচে,– হামিদের মরখুটে কানা ঘোড়া বুঝি! সারা দিন গাড়ি টানা হল ঢের,– ছুটি পেয়ে জ্যোৎস্নায় নিজ মনে খেয়ে যায় ঘাস; যেন কোনো ব্যথা নাই পৃথিবীতে,– আমি কেন তবে মৃত্যু খুঁজি? ‘কেন মৃত্যু খোঁজো তুমি?’– চাপা ঠোঁটে বলে কৌতুকী আকাশ।”
পড়ার সময় মনে হয়েছে পৃথিবীর পাশে অন্যকোনো পৃথিবীতে প্রবেশ করেছি যেন! যেখানে বসেই কবিতাগুলো পড়ছিলাম না কেন, যতক্ষণ পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিল ঐ পৃথিবীতে প্রবেশ করেছি এবং উপভোগ করছি.....
Surrealism at its best. While reading I was teleported to those locations and sceneries. The poems I liked most are: Niralok, Bolilo Ashwatta Shei, Footpath ey, Ehader e Kaaney, Porichayak, Aath Bochor Agey Ekdin, Hothat Mrito, Ghash and Journal: 1346.
“.......আর এক বিপন্ন বিষ্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে; আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত - ক্লান্ত করে; লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই; তাই লাশকাটা ঘরে চিৎ হ'য়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে।' জীবনানন্দ দাশ, নামহীন এক মানুষের আত্মহনন এর কাহিনী বলে গেছেন এই কবিতায়। প্রকৃতি যখন রঙিন সাজে সেজে উঠেছে, যখন পঞ্চমীর চাঁদ ডুবে গিয়েছিল তখনই সেই নামহীন মানুষটির হৃদয়ে মরবার আকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল। গৌতম বুদ্ধ যেমন বোধি বৃক্ষের নিচে বসে কঠিন তপস্যায় নিয়োজিত হয়ে নবজীবন লাভ করেছিলেন। নামহীন সেই মানুষটিও তেমনি অশ্বথ গাছের তলায় মৃত্যু তপস্যায় নিয়োজিত হয়ে মহাপৃথিবীর সঙ্গে মিশে যেতে চেয়েছেন।
প্রতিটি কবিতা যেনো ঘোরে রেখেছে। কিছু কবিতা যেনো সেই সময়ে ভ্রমণ করিয়েছে। অতীত, ভবিষ্যৎ সবখানে এই মহাঘোরে। জীবনানন্দের পর্যবেক্ষণকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। আলাদা করে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। এমনিতেই মনে আসে। কিছু কাব্যাংশের সাথে যেনো মিশে একাকার হয়ে গেছি, হয়ে আছি, হয়ে থাকতে চাই – এই মহাপৃথ��বীতে৷
মহাপৃথিবী: একটি বাংলার কাব্যচেতনায় মগ্ন পাঠপ্রতিক্রিয়া
হেমন্ত থেকে শীত—আর জীবনানন্দ:
গুডরিডস যদি আমাদের বাংলা সাহিত্য নিয়ে কোনও বিশেষ পাঠ-ঋতু ঘোষণা করতো, তাহলে 'হেমন্ত-শীতের জীবনানন্দ সপ্তাহ' অবশ্যই থাকতো। জীবনের বিষণ্ণতা আর পৃথিবীর ধূসর সৌন্দর্য নিয়ে যে কবি একা বসে থেকেছেন চুপ করে—তাঁকে পড়ার ঋতু আলাদা হওয়া উচিত। সেই ঋতুর উপযোগী পাঠগ্রন্থ হতে পারে মহাপৃথিবী—একটি ক্ষীণকায় অথচ গভীর দার্শনিক অনুভবে পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ।
প্রকাশ ও প্রেক্ষাপট
১৯৪৪ সালে প্রকাশিত মহাপৃথিবী ছিল জীবনানন্দ দাশের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। যুদ্ধকালীন পৃথিবী, আত্মগত বিষণ্ণতা, সভ্যতার সংকট, নগর-প্রকৃতি দ্বৈততা—এইসব গূঢ় বিষয়ে এক নিঃশব্দ অভিসার। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্করণে কবিতার সংখ্যা বেড়েছে, উৎসর্গ পাল্টেছে, ব্যাখ্যাগুলোও গা-ছমছমে ইতিহাস হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি বিষয় একই আছে: এটি এমন এক গ্রন্থ, যা পাঠককে এক নতুন সত্তার দিকে ঠেলে দেয়।
'মহাপৃথিবী' শব্দটির তাৎপর্য
পৃথিবী নয়, মহা পৃথিবী। যেন এক সুপারনোভা, আমাদের জাগতিক সত্তাকে ছাপিয়ে যাওয়া এক মহাকাব্যিক সময় ও চেতনার বাস্তবতা। এটি স্থানিক ও কালিক গভীরতার কাব্য, যেখানে ব্যক্তি, ইতিহাস, স্মৃতি, পুনর্জন্ম ও নশ্বরতা একাকার হয়ে যায়।
কবিতাগুলোর সুর
এই কাব্যগ্রন্থে প্রতিটি কবিতাই যেন একেকটি রাতের মতো—আলো-ছায়ার খেলা, বিষণ্ণতা ও স্মৃতির ঢেউ।
বলিল অশ্বত্থ সেই কবিতায় দেশভাগের ছায়া পড়ে—কোনও এক পরিবার চলে যাচ্ছে তাদের শেকড় ছেড়ে, আর সেই পরিবারের প্রতি বিদায় জানায় প্রতিবেশী অশ্বত্থ গাছ। অদ্ভুত মায়াময় এক ভাষা:
"এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন্ দিকে কোন্ পথে ফের / তোমরা যেতেছ চলে পাই নাকো টের!"
ফুটপাথে কবিতায় রাতের কলকাতায় হাঁটছেন ক্লান্ত কবি—নগরের ধুলো, কনক্রিট, নিঃসঙ্গতা আর হারানো গ্রামের প্রতি দুর্বলতা—এইসব মিলে সৃষ্টি করে এক মেট্রো-বিরক্তি।
আট বছর আগের একদিন—নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত ও কোট-বহুল কবিতা। প্রেম, বিষণ্ণতা, আত্মহননের ইচ্ছা, মৃত্যুচিন্তা, নস্টালজিয়া—সব মিলিয়ে যেন বাংলা কবিতার নিজস্ব 'আবসার থিয়েটার'।
একটু আলাদা করে বলি এইটা নিয়ে? আমার অন্যতম প্রিয় এই কবিতা।
আট বছর আগের একদিন—নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত, পাঠক-প্রিয় এবং কোট-বহুল কবিতাগুলোর একটি। এটি যেন এক ‘আবসার থিয়েটার’—যেখানে প্রেম, বিষণ্ণতা, আত্মহননের ইচ্ছা, মৃত্যুচিন্তা, আর নস্টালজিয়ার জটিল নকশা মঞ্চস্থ হয় নিঃশব্দ আলোর নিচে। এই কবিতার প্রতিটি স্তবক যেন একজন ক্লান্ত, আত্মসংশয়ী চরিত্রের একক অভিনয়—যিনি তাঁর জীবনের মঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন।
প্রেমের বিফলতা ও আত্মনাশের ইচ্ছা নিয়ে লেখা এই কবিতার মধ্যে আমরা পাই এক অনন্য ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি, এক নিঃসঙ্গ চিৎকার—যা গভীর রাতে শোনা যায়, কিন্তু কেউ উত্তর দেয় না। জীবনানন্দ এখানে ব্যক্তিগত বেদনার মধ্য দিয়ে এক সর্বজনীন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করেছেন।
এই কবিতাটি তুলনীয় বিশ্বসাহিত্যের অনেক কালজয়ী কবিতার সঙ্গে:
প্রতিস্মৃতি ও আত্মদহন: তুলনামূলক পাঠ
১) “Aubade” – Philip Larkin: প্রতিদিন ভোরে মৃত্যুভয় নিয়ে জেগে ওঠা এক আধুনিক মানুষের কবিতা। জীবনানন্দের “আমি ক্লান্ত, আমি আর লিখিতে পারি না…” আর লারকিনের “I work all day, and get half-drunk at night” যেন একে অপরের দুর্দান্ত প্রতিবিম্ব—দুজনেই ‘meaninglessness’ কে কবিতা বানাতে জানতেন।
২) “The Love Song of J. Alfred Prufrock” – T.S. Eliot: প্রুফ্রক যেমন তাঁর নিজস্ব একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা আর অসমাপ্ততার ভাষা খুঁজে ফিরছেন—ঠিক তেমনি জীবনানন্দের নায়কও আট বছর আগের একদিনে আটকে থাকা এক আত্মচেতনার ভিতর ডুব দিয়ে যাচ্ছেন।
৩) “La Belle Dame sans Merci” – John Keats: কিটসের নাইট এবং জীবনানন্দের “মরিবার হলো তার সাধ”—উভয়ের মধ্যেই প্রেম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী ধূসর অঞ্চলটি রূপ পেয়েছে এক ঘোর লাগা সৌন্দর্যে।
৪) “Because I could not stop for Death” – Emily Dickinson: ডিকিনসনের মৃত্যুচিন্তা যেখানে রূপকথার মতো শান্ত, জীবনানন্দের মৃত্যু সেখানে নাগাল পেতে না চাওয়া এক নীরব আকুতি—“চমৎকার! ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!”
এই কবিতায় আত্মহত্যার ইচ্ছেটা একেবারেই নাটকীয় নয়—বরং ক্লান্তিকর, ক্লান্তিকেই রূপ দেয় কবিতা। মশারির ‘ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা’ অথবা ‘ইঁদুর ধরার’ মত র্যান্ডম উপমা যেন আত্মঘাতী চিন্তার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্মম দৈনন্দিনতা, যা বাংলা কবিতায় বিরল।
‘আট বছর আগের একদিন’ তাই শুধু একটি কবিতা নয়—এটি বাংলা কবিতার নিজস্ব ‘দ্য ওয়েইস্টল্যান্ড’—যেখানে ব্যক্তি, প্রেম, মৃত্যু এবং সময়—সব একসাথে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে কথা বলে।
"আমি ক্লান্ত, আমি আর লিখিতে পারি না"—এই লাইনটি শুধু আত্মস্বীকৃতি নয়, এটি এক ক্লান্ত মননের দলিল। এক কবি যে নিজের সৃষ্টির ভেতরেই নিজের দিকচিহ্ন হারিয়ে ফেলেন।
আধুনিক কাব্যের সাথে সংলাপ
জীবনানন্দের এই কাব্যগ্রন্থের ভাবনারা যেন T.S. Eliot-এর The Waste Land, Dylan Thomas-এর Fern Hill, W.B. Yeats-এর The Second Coming, Emily Dickinson-এর Because I could not stop for Death বা Philip Larkin-এর Aubade-এর মতো ইংরেজি আধুনিক কবিতার সাথেও এক গভীর আলাপ করে। সময়, মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্ব, স্মৃতি—এই চিরন্তন ও ছিন্নভিন্ন অভিজ্ঞতাগুলি দুই ভাষাতেই অভিন্ন অনুভব সৃষ্টি করে।
শেষে যেটুকু বলার থাকে:
কাব্যগ্রন্থটির নামই যেমন অতিপার্থিব, তেমনি এর পঙক্তিগুলিও ছায়ায় আচ্ছন্ন, যেন ধুলোয় ঢাকা কোনও স্মৃতি। এটি পাঠকের কাছে সহজে ধরা দেয় না, কিন্তু একবার যদি ধরা দেয়, তাহলে তাড়িয়ে দেওয়াও যায় না। এটি সেই বই, যাকে ঘরে রাখলে বই নয়, ঘরে এক 'মহাপৃথিবী' বসে থাকে। আপনার হৃদয়েও সে তৈরি করতে পারে এক নতুন মহাবিশ্ব।
পড়ুন, পুনর্পাঠ করুন, ভালোবাসুন। কারণ জীবনানন্দ দাশের মতো কবি আমাদের বাংলা ভাষায় একটাই জন্মান।
'মহাপৃথিবী' যদিও 'বনলতা সেন' এর পর প্রকাশিত, তবুও ‘মহাপৃথিবী’র কবিতাসমূহ ‘বনলতা সেন' কাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণে ‘মহাপৃথিবীর থেকে গৃহীত আঠারোটি কবিতা সংকলিত হয়েছে। মনে হয়, বনলতা সেন' ও 'মহাপৃথিবীর’ কাব্যপরিমণ্ডলের মধ্যে কবি কোনো বিষমতা খুঁজে পাননি। 'বনলতা সেন'-এ লৌকিক জগতের সীমাতিক্রামী যে শুদ্ধতর জগতের ধারণা প্রতিবিম্বিত হতে দেখা যায়, ‘মহাপৃথিবী’ বোধ হয় তার-ই সম্প্রসারিত রূপ। ‘বনলতা সেন' কাব্যের বনলতা সেন, হাওয়ার রাত, নগ্ন নির্জন হাত, শেফালিকা, সুদর্শনা, সুরঞ্জনা ইত্যাদি কবিতায় কবির যে মনোনীত প্রেক্ষিত এবং যা পরিচিত পৃথিবীর, তার-ই দ্বিতীয় ভূবন 'মহাপৃথিবী'তে রূপায়িত। মহাপৃথিবী পরিকল্পনার মূলে থাকে পূর্ববর্তী কাব্যের সমস্ত সূত্রের সমন্বিত রূপ। মহাপৃথিবী কবির নির্মিত দ্বিতীয় জগৎ যেখানে- "কোথ��ও উদ্যম নাই, কোথাও আবেগ নাই, চিন্তা স্বপ্ন ভুলে গিয়ে শান্তি আমি পাবো? রাতের নক্ষত্র তুমি বলো দেখি কোন পথে যাবো?" চিরন্তনতার প্রতীক নক্ষত্রকে এই প্রশ্ন করার পর নক্ষত্র কবিকে বলেছে-‘তোমারি নিজের ঘরে চলে যাও।' অর্থাৎ শাশ্বতের প্রতি বিশ্বাস কবিকে শিল্প- সচেতন করে তুলতে চাইছে।
‘মহাপৃথিবী’র সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় কবিতা সম্ভবত ‘আট বছর আগের একদিন’ । জীবনানন্দ এ পর্বে যে বিশুদ্ধ শিল্পজগতের ধারণায় অভিস্নাত হতে চাইছেন, সম্ভবত উক্ত কবিতার নায়ক সেই জগতের স্বপ্নে অভ্যস্ত। কেননা, এই কবিতায় নায়ক যে মৃত্যুবরণ করেছেন, তা দুঃখবাদীর মৃত্যু নয়। জীবনে যন্ত্রণাদায়ক বলে নায়ক মৃত্যুবরণ করেননি, তিনি ভিন্ন এ রূপলোক নির্মাণ করতে চান বলে অভিনব ইতিহাস বিবৃত করেন। 'আট বছর আগের একদিন' কবিতার নায়কের জীবন 'হাড়-হাতাতের গ্লানির জীবন, নয়, এ নায়কের জীবন নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয়���ি, মন আর মননের মধুর আস্বাদ বধু তাঁকে দিয়েছেন। তবু তাঁর মৃত্যু বরণের সাধ হয় কেননা, 'আরো এক বিপন্ন বিস্ময়' তাঁর ‘অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে। আসলে এখানে শিল্পী-জীবনের সুস্থ যন্ত্রণাবোধের আর্তির প্রকাশ। এ কবিতার বক্তব্য পলায়নী মনোবৃত্তির বক্তব্য নয়; ব্যক্তি-জীবন আর সমাজ-জীবন কবির কাছে নতুন তাৎপর্য নিয়ে উপস্থিত বলেই কবি শিল্পজগতের মহৎ আকাঙ্ক্ষাকে এখানে রূপায়িত করতে চাইলেন। ‘আট বছর আগের একদিন' কবিতাটি আসলে কবির শিল্পীসত্তার অভিপ্রকাশের কবিতা ।
আসলে 'বনলতা সেন' কাব্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমি এত বেশি বেশি বকেছি যে এখানে আর বেশি কিছু বলার নেই। এই নিয়ে বছর শেষ হলো আমার জীবনানন্দের কবিতা পড়ে। বাকি রইলো, 'সাতটি তারার তিমির' ব্যস্ততার কারণে বাতিঘরে যেতে পারছি না। আর বাতিঘরের স্টকেও বইটি নেই। ব্যস্ততা কমলে সরাসরি প্রকাশনী থেকে বই নিয়ে আবার পড়তে পারব। বেশ কিছুদিন কবিতা নিয়ে, জীবনানন্দ কে নিয়ে বেশ ছিলাম। জীবনানন্দ আমার সাথে সেই না জানা, না বোঝা কাল হতেই আছেন। এবার অন্য কবিদের লেখা পড়ব। তার একটা বিখ্যাত লাইন বলে লেখাটি শেষ করব, ' প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, হয় নাকি?' জীবনানন্দ আমার সাথে সবসময় আছেন/থাকবেন।
কাছের মানুষদের খোঁজখবর করুন। আপনাদের থেকে যারা কোনো না কোনো ভাবে পিছিয়ে আছে,একা আছে তাদের সাথে থাকুন। জীবনানন্দ কে কেউ কাছে টেনে নেয় নি। কিন্তু আপনি নেন। আপনি কাউকে দূরে সরিয়ে রাখলে সে জীবনানন্দ হবে না বরং মানুষটি কষ্ট পাবে। লেখাটি যারা পড়েছেন আমার ভালোবাসা জানবেন। ধন্যবাদ।
“হে মৃত্যু, তুমি আমাকে ছেড়ে চলছ ব’লে আমি খুব গভীর খুশি? কিন্তু আরো খানিকটা চেয়েছিলাম; চারি দিকে তুমি হাড়ের পাহাড় বানিয়ে রেখেছে;– যে ঘোড়ায় চ’ড়ে আমি অতীত ঋষিদের সঙ্গে আকাশে নক্ষত্রে উড়ে যাব এই খানে মৃতবৎসা’ মাতাল, ভিখারি ও কুকুরদের ভিড়ে কোথায় তাকে রেখে দিলে তুমি?”
ইতিহাসের টানাপোড়ন,সারিয়ালিজম আর মনস্তাত্ত্বিক ভাংচুরের মিশ্রনে ভরপুর “মহাপৃথিবী” গ্রন্থটি। জীবনানন্দ দাশের অন্যতম সেরা গ্রন্থ।