Abu Ishaque (Abu Bashar Mohammad Ishaque; Bangla: আবু ইসহাক) was a renowned modern Bangladeshi author and a famous novelist. Ishaque is often categorized with those who wrote the least and showed the best. Three novels - one of which is a detective novel, two collections of short stories and the voluminous Samokalin Bangla Bhashar Obhidhan. He comes forth as a major novelist in contemporary literature with the publication of সূর্য দীঘল বাড়ি [Surya-Dighal Bari, that means A Cursed House] written at the age of only twenty one and till now its mighty presence is felt by readers of Bangla fiction. This was the first successful novel in Bangladeshi literature.
Literary awards: Bangla Academy Literary Award (1963) Ekushey Padak (1997) Independence Day Award (2004)
আবু ইসহাক জালবন্দী মানুষের গল্প লিখেছেন, লিখেছেন শহর ও গ্রামের গল্প। গ্রাম বা শহর কোনোটির প্রতিই লেখকের বিন্দুমাত্র নস্টালজিয়া নেই। তিনি সবকিছুকে তার স্বরূপে দেখতে চেয়েছেন। কখনো বাইরের পৃথিবীর সৌন্দর্য অচেতন দাদি, কখনো চাকরি বাঁচানোর জন্য পকেট উজাড় করে কোট কেনা কেরানী, কখনো ভূমিহীন নির্যাতিত কৃষক, কখনো গ্রামবাসীর হাসিঠাট্টার শিকার বোম্বাই হাজি, কখনো অসহায় চোখে মানুষের পতন দেখা পাখি তার গল্পের মুখ্য চরিত্র। লেখক কৌতুকপূর্ণ চোখে আমাদের ভণ্ডামি, শঠতা,কূপমণ্ডূকতা, অনাচার দ্যাখেন। তার চরিত্ররা পীড়িত ও পিপাসার্ত, মুক্তির জন্য। সমাজ, ধর্ম, প্রথার জালে আটকানো এসব মানুষ আসলে আমরাই। গ্রন্থিত গল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে দাদির নদীদর্শন, বনমানুষ, প্রতিবিম্ব ও মহাপতঙ্গ।সব গল্প সমানভাবে উপাদেয় না হলেও বইটিকে অবশ্যপাঠ্য বলে মনে করি।
আবু ইসহাক কেনো এতদিন পড়িনি তার জন্য আফসোস হচ্ছে। উনার ম্যাগনাম ওপাস ' সূর্য দীঘল বাড়ি' এখনো পড়িনি।পাঠক হিসেবে নিজের অবস্থান নিয়ে বেশ শংকিত। আবু ইসহাক রচনাবলী অবশ্যপাঠ্য বলে মনে হচ্ছে।
উক্ত 'শ্রেষ্ঠ গল্প' সংকলন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত। কোন এক কারনে তাদের বেশিরভাগ শ্রেষ্ঠ গল্প নাম্নী সংকলনগুলোতে শ্রেষ্ঠ গল্পগুলো ই থাকেনা। এইটা ব্যতিক্রম হলো, বোধহয় আহমেদ মোস্তফা কামাল সম্পাদনা করেছেন বলে। উনার ভূমিকা বা পর্যালোচনা বরাবরেই মতোই মননশীল ছিলো।
আবু ইসহাকের দৃষ্টিকে আহমেদ কামাল বলেছেন ডুবুরির কৌতুকপূর্ণ চোখ, তিনি তা যথাযথ বলেছেন। আবু ইসহাকের গল্পে আমাদের জীবন যাপনের ভ্রান্তি,কুসংস্কার,কপটতা সুক্ষ্মভাবে উঠে এসেছে হাস্যরসাত্মকভাবে। সমসাময়িক সমাজের অসঙ্গতি কৌতুকাবহের সাথে গল্পে তিনি তুলে এনেছেন কিন্তু যা কৌতুকময় তা ই শেষে হয়ে দাড়ায় বিষন্ন করুণ। আবু ইসহাকের গল্পের পরিধি বেশ বিস্তৃত; তিনি তথাকথিত ছেঁড়া গেঞ্জির উপর দামী কোট পড়া নাগরিক সুশীলদের দুস্থ অবস্থা উন্মোচন যেমন করেছেন তেমনি গ্রামীন সমাজে বিদ্যমান রক্তচোষা জোঁকদের ও তিনি গল্পে চিহ্নিত করেছেন।' মহাপতঙ্গ' গল্পে যেভাবে যুদ্ধবাজ মানুষের সীমাহীন মূর্খতা এক চড়ুইদম্পতির দৃষ্টিকোণে দেখিয়েছেন তাতেই মানুষের অমানুষিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আবু ইসহাকের শ্লেষ,ক্ষোভ কিংবা ব্যঙ্গোক্তি বোঝা যায়। আবু ইসহাকের গল্প দারুণ উপভোগ্য একইসাথে উপলব্ধিকারী ও বটে..
গ্রামের মানুষের সাদাসিধা একটা রূপ আমাদের সামনে তুলা ধরা হয়। সেদিন আমার এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, যে গ্রামের মানুষ কি আসলেই এতটা সরল। ওদের মধ্যে কি কোন কুটিলতা নাই।
গ্রামের মানুষ কুটিল কিনা জানি না তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্রী রকমের গোঁয়ার এবং বোকা। গ্রাম্য পলিটিক্সের চেয়ে বাজে জিনিস হয়ত বঙ্গদেশে কম ই আছে। আবু ইসহাক গ্রামের মানুষগুলোর সেই কলুষিতা টাকে তুলে এনেছেন। তুলে এনেছেন সমাজের অত্যাচারিত একটি শ্রেণীকে সকলের সামনে। নিজস্ব ঢঙে আসর এর মতন করে এক একটি গল্প বলে গিয়েছেন। বইয়ের শুরুতে আহমদ মোস্তফা কামাল এর ভূমিকা পড়ে যা জানলাম। লেখক সারাজীবনে দুটি গল্পগ্রন্থ, দুটি উপন্যাস, একটি রহস্যোপন্যাস ও একটি স্মৃতিকথা বৈকি কিছুই লিখেন নি। আবু ইসহাক হয়ত ভেবেছিলেন, তিনি হয়ত আরোও বেশি লিখলে সমাজের বিরূপ চিত্র গুলো আমাদের সামনে ফুটে এসে বার বার পীড়া দিত। সেই থেকে রক্ষার উদ্দ্যেশেই হয়ত এত কম লিখা। আমার গল্পগুলো পড়ে কেন যেন সীমাহীনের ক্রোধের সঞ্চার হচ্ছিল। গল্পকারের সার্থকতাই তাতে। অনুভূতিটাকে পাঠকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। খুব ই সুন্দর একটি বই। হাইলি রেকমেন্ডেড।
সুন্দর এই বইটি আমাকে হারুন ভাই জন্মদিনের উপহার হিসেবে দিয়েছেন। এই অতীব সুন্দর বইয়ের জন্য ধন্যবাদ ভাই।
আমাদের ভুলভ্রান্তিময় জীবনে জ্যোতিষরূপী অবতারের মতো বিচ্ছিন্ন এক জগতের গল্প বলেছেন আবু ইসহাক। কোন এক অজ্ঞাত কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকা ক্রোধ, প্রতিশ্রুতিহীন শ্বাপদের অত্যাচার এবং স্তব্ধতা থেকে কোলাহলের দিকে যাত্রা ক্রমশ বেদনা হয়ে ফিরে ফিরে এসেছে ইসহাকের গল্পে। সহজ করে বলা গল্পের আড়ালে ইসহাক হেসেছেন বাঁকা হাসি, কখনও রূপকের আড়ালে দেখিয়েছেন পি সি সরকারের মতো জাদু আবার কখনও বিপ্লবের ইঙ্গিত দিয়ে ইসহাক আমাদের প্রচলিত বাস্তবতার মুখে করেছেন চপেটাঘাত।
ঘুপচি গলির সুখ আবিষ্কারের জন্য তাই আমাদের শিখে নিতে হয় কিছু মন্ত্র, আপোষ আর ছাপোষা শব্দ দুটো হঠাৎ নিষ্ঠুরতা হয়ে উঠে আসে মনে, অসংখ্য হানিফের দিকে তখন আমাদের দৃষ্টি, রাগ হয় তবু দোষ দিতে পারি না। যেমন দোষ দিতে পারিনা আমাদের প্রিয় দাদীকেও, যার প্রথম নদী দর্শনের স্মৃতি অসংখ্য নদীর বুকে গল্পের মতো ছড়িয়ে গেছে বহুকাল আগে, গল্পের শেষে আমরা ভালোবেসে ফেলি দাদীকে যেমন ভালোবেসে ফেলি তাঁর গোঁড়ামিকেও। নাগরিক জীবনের হাওয়া যখন এসে লাগে চোখেমুখে, তখন ইসহাক এক অদ্ভুত সাস্পেন্স তৈরি করে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে বাধ্য করেন বনমানুষের দিকে, গল্পের বর্ণনায় আমাদের তখন হয়তো মনে পড়ে যায় সাদার হোসেন মান্টোর কথা, আমাদের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় একটা ঠাণ্ডা স্রোত। অন্য দিকে রূপকের আড়ালে দেহরক্ষীদের বেষ্টনী এড়িয়ে হারেমে ঢুঁকে পড়ে অনিয়ম। টুইস্টের সাথে টুইস্টের ট্রাম-ট্রাম খেলায় শেষ পর্যন্ত জিতে যায় স্বাধীনতা, আমাদের ভালো লাগে, স্বস্তি আসে মনে। রাজনীতি, অর্থনীতির অনেক পথ পেরিয়ে যখন ইসহাক ফিরে আসেন চিরায়ত প্রেমে তখন ব্যর্থ প্রেমের জাবর কাটতে কাটতে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে নুরজাহান, ভেসে যাচ্ছে উতুঙ্গু কোন স্রোতে। এই স্রোত নুরজাহানকে হয়তো মুক্তিই দেয় তবু খারাপ লাগে, খারাপ লাগে। আমরা অপেক্ষা নতুন কোন সূর্যোদয়ের, আমরা অপেক্ষা করি ওসমানের মতো, সে'ই ওসমান যে কালজয়ী হয়ে বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে, সে'ই ওসমান, যে জোঁকের কামড় সহ্য করতে করতে একদিন প্রতিবাদী হয়ে উঠে, আমরা জানতে পারি, অ্যাটাক ইজ দ্যা বেস্ট ডিফেন্স। ইসহাক আমাদের বলেন, বাঘের শরীরে হনুমানের রক্ত দেখতে কেমন, ইসহাকের 'প্রতিবিম্ব'এ মনে পড়ে যায় গোগোলের 'ওভারকোট'এর কথা, পরিচিত সংকট তবুও মায়া হয় বাবা হারানো সে'ই শিশুটির জন্য। ঠিক দুধ বিক্রেতা রুস্তমের মতো যাকে আমি দেখতে পাই গলায় গামছা পেঁচিয়ে ঝুলে আছে কদম গাছের ডালে। তবু নিন্দা করে মানুষ, মরা মানুষেরও শত্রু থাকে আবিষ্কার করে বোম্বাই হাজি।
আবু ইসহাকের 'শ্রেষ্ঠ গল্প' পড়ে হলো এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। স্টোরি টেলিং এতো স্মুথ, পাঠককে খুব সহজে�� টেনে নিয়ে যায় স্রোতের অনুকূলে। এক শব্দে আবু ইসহাকের ভাষাকে বলা যায় আভিজাত্যহীন কিন্তু রসগোল্লার মতো মিষ্টি। চরিত্র নির্মাণ ও বিষয়বস্তু নির্বাচনেও আবু ইসহাক নিঃসন্দেহে মাস্টার। ভূমিকা ও পর্যালোচনার জন্য কথাসাহিত্যিক আহমেদ মোস্তফা কামালকে বিশেষ ধন্যবাদ, কামাল ভাইয়ের সম্পাদনা আমাকে চিরকালই মুগ্ধ করেছে, আগামীতেও করবে আশা করি। আমি আবু ইসহাক আগে থরোলি পড়িনি, এ আমার ব্যর্থতা, এই স্বীকারোক্তি দেয়ার সাথে সাথে এ কথাও বলে রাখতে চাই, বাংলা সাহিত্যে আবু ইসহাক অবশ্যপাঠ্য।
আবু ইসহাকের গল্প যেন একটুকরো বাঁকা হাসি। সময়ের আর প্রথার সুকঠিন বর্ম পরা কোনো এক গ্লাডিয়েটরের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আবু ইসহাক যেন সম্বল করেছেন তার গল্পকেই। সংস্কার আর শোষণের মুখপাত্র সেই গ্লাডিয়েটরকেও প্রায়শই খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে তার গল্প।
স্বল্পপ্রজ আবু ইসহাকের গল্পগ্রন্থ মাত্র একজোড়া। কিন্তু বড় বহুমুখী তার গল্পের ফলা। শ্রেষ্ঠ গল্প বইতেই পরিচয় পাওয়া যায় সেটার।
বনমানুষ বা প্রতিবিম্ব গল্পে নগর জীবনকে হুল ফুটিয়েছেন যেমন, হারেম বা মহাপতঙ্গ গল্পে তেমনই দেখিয়েছেন রুপকের যাদু। গ্রাম বাংলার শোষণকে যেমন দেখিয়েছেন জোঁক নামের কালজয়ী গল্পে, দাদির নদীদর্শন বা বোম্বাই হাজির মতো গল্পে অন্ধ প্রথাকে আঘাত করতেও পিছিয়ে থাকেন নি তিনি।
আবু ইসহাক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান একজন কথাসাহিত্যিক । মাত্র দুটি উপন্যাস, দুটি গল্পগ্রন্থ, একটি রহস্যোপন্যাস আর একটি স্মৃতিকথা লিখেই তিনি স্থায়ী আসন গড়েছেন বাংলা সাহিত্যে। তাঁর লেখা সূর্য দীঘল বাড়ি উপন্যাস বা জোঁক গল্প যে বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ততম তালিকাতেও স্থান পাবে তা বলাই বাহূল্য।
বর্তমান সংকলনে স্থান পেয়েছে লেখকের দুই গল্পগ্রন্থ থেকে বাছাই করা সেরা বারোটি গল্প।মূলত গ্রামীণজীবন, সেখানকার প্রথা, সংস্কার, শোষণ, বঞ্চনার কথা লিখলেও গল্পগুলোতে পাশাপাশি উঠে এসেছে নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব, লোক-দেখানো আভিজাত্যের। আর এসবই তাঁর নিজের চোখে দেখা তাইতো কোনো কিছু তাঁকে চাপিয়ে দিতে হয় নি, কেবল বর্ণনা করে গেছেন নিজের দেখা জগৎটাকে।
উত্তম পুরুষে বর্ণিত ‘বনমানুষ’ গল্পটার কথাই ধরা যাক। দেশভাগের কিছু সময় পরের কলকাতার চিত্র বর্ণিত হয়েছে গল্পটিতে। কথক নতুন গড়ে ওঠা সংসারের চাহিদা মেটাতে বনবিভাগের চাকুরি ছেড়ে যোগ দেয় উচ্চ বেতনের শহুরে অফিসে। কিন্তু চাকুরির প্রথম দিনেই সে দেখতে পায় শহরের বিভৎস রূপটি। সবাইকে তার কেমন যেন বিভ্রান্ত, লোভী আর মেকি মনে হতে থাকে। সে গাড়িতে চড়তে পারে না ভীড়ের কারণে, বন্ধুর সাথে প্রাণখুলে কথা বলতে পারে না অফিসের গোলামী রাখতে হবে বলে, গায়ে লোহার শার্ট পড়ার চিন্তা করতে বাধ্য হয় দাঙ্গার লোকদের হাত থেকে বাঁচতে, নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করতে বাধ্য হয় ঝকঝকে পোশাক পড়তে। কিন্তু সে যে গ্রামের মাটির সন্তান। তাইতো এসব তাঁর সহ্য হয় না আর শেষমেশ তো বলেই ফেলে “ মানুষ তার মনুষ্যত্ব নিয়ে শহরে থাক। আমি বনে গিয়ে আবার বনমানুষ হব। “ তখন যে কাউকেই স্বপ্নালু হয়ে যেতে হয় গ্রামের জীবনের জন্য আর ভাবতে বাধ্য হতে হয়, আরেহ! আমরাও তো কথকের মতই শহুরে জীবনে ব্রীতশ্রদ্ধ কিন্তু পেটের ধান্দায় আমরা আবদ্ধ বলেই হয়তো আমরা ওর মতো বনমানুষ হতে পারি না।
‘মহাপ্রতঙ্গ' আরেকটা অসাধারণ গল্প। এক জোড়া চড়ুইয়ের বয়ানেই লেখক সমালোচনা করেছেন পুরো মানবজাতিকে। চড়ুই নিজে পাখি হওয়ায় মানুষ তার কাছে নাম পায় দো-পেয়ে দৈত্য আর আকৃতিগত মিলের জন্য বিমান মহাপ্রতঙ্গ। চড়ুইরা যখন বন্যা বা খরার সময় খাদ্যের জন্য ব্যাকুল তখন তারা খাবার পায় মহাপ্রতঙ্গের কাছ থেকে, প্রাণভরে দোয়া করে দো-পেয়ে দৈত্যদের কেননা তারা বুঝতে পারে দো-পেয়ে দৈত্যরা চাইলেই সুন্তর হতে পারে পৃথিবী। কিন্তু তাদের এই ভুল একদিন তাদের ভাঙ্গে যখন তারা দেখে তাদের নিস্তরঙ্গ সুন্দর জীবনে মহাপ্রতঙ্গের ফেলা ‘ডিম’ ধ্বংস ডেকে আনে। যখন তারা এই বলে সান্ত্বনা নিতে চায় যে গর্ভবতী মহাপ্রতঙ্গ হয়তো নিজের অক্ষমতার জন্যই ডিমটা ফেলেছে ঠিক তখনই তারা মহাবিস্ময়ে আবিষ্কার করে যে মহাপ্রতঙ্গ নয়, তার ভেতরে থাকা দো-পেয়ে দৈত্যরাই ওসব প্রাণনাশকারী ‘ডিম’ ফেলছে। তাইতো তারা ছিঃ ছিঃ করে ওঠে ঐ দো-পেয়ে দৈত্যদের জন্য যারা ডিম্ববতী মহাপ্রতঙ্গের পেটে চড়ে উড়ে বেড়ায় আর অশান্তি ডেকে আনে। কি অসাধারণভাবেই না লেখক এখানে চড়ুইয়ের জবাবে যুদ্ধের সমালোচনা করে মানুষকে শান্তির জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন!
এছাড়া ‘দাদীর নদীদর্শন', ‘শয়তানের ঝাড়ু' আর ‘বোম্বাই হাজি' গল্পে ধর্মীয় কুসংস্কার, ‘উত্তরণ’ গল্পে মানবিকবোধের উন্মোচন, ‘বর্ণচোর’, ‘প্রতিবিম্ব’ গল্পে নাগরিক জীবনের সমস্যা, ‘জোঁক’ গল্পে শোষণের চিত্র তুলে ধরেছেন অতি দক্ষতার সাথে। সহজ-সরল বর্ণনাভঙ্গি, পরিমিত হাস্যরসের ব্যবহার আর উপমার ব্যবহারে তাই গল্পগুলো হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত।
আবু ইসহাক সাহেবের লেখায় কেমন জানি ভ্রুকুঞ্চন থাকে। পড়তে গেলে মনে হয়,
এহহে! এইভাবে বইলা দিলো?
লোকটি যেভাবে গ্রামীণ জীবন কাছ থেকে দেখছেন, তেমনি শহুরে অসাড়তা উপভোগও করেছেন এন্তার। তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর স্বল্প কিন্তু প্রকৃষ্ট লেখাগুলোর মাঝে। কলম ধরেছেন গ্রামীন জনপদের খুব কাছের গল্প নিয়ে, সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে, কুসংস্কার নিয়ে, ধর্মের গোঁড়ামি নিয়ে, আচার-আচরনের বৃথা আস্ফালন, চাটুকারিতা নিয়ে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই আহমাদ মুস্তফা কামালের সম্পাদনার গল্পগুলোতে উনার লেখার পরিধি যেমন ধরা হয়েছে, তেমনি রাখা হয়েছে বৈচিত্র্য। শ্রেষ্ঠ গল্প হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব রাখতে সমর্থ এই সমগ্র।
দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত এক পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি মজার ছলে দেখিয়েছেন ঘুপচি গলির সুখে। ধর্মীয় গোঁড়ামি আর কুসংস্কারের চমৎকার রম্যদর্শন আছে দাদির নদীদর্শন, আবর্ত, বোম্বাই হাজি আর শয়তানের ঝাড়ু গল্পে। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও মানুষ কি পরিমাণ অন্ধ বিশ্বাসে চালিত হতো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ দাদি, মোড়ল, হাজী আর মোহনপুরের জনগণ। আবার গ্রামীন সমাজের অতি উত্তম পরিবেশন আছে আবর্ত আর জোঁকে। গ্রামীন সমাজের সম্পদ-নারী লালসা উঠে এসেছে দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। আবার নাগরিক জীবনের কিছু খন্ডচিত্রের দেখা পাই বনমানুষ, প্রতিবিম্ব আর বর্ণচোর গল্পে। শহুরে জীবনের বাস্তবতা কৌতুকময় বর্ণনা বনমানুষের মাধ্যমে এবং চাকরিজীবনের হঠকারিতা ও নিদারুণ অন্তঃসার শূন্যতার দেখা মিলে প্রতিবিম্ব গল্পে। আবার প্রতীকি লেখার সিদ্ধহস্ত ইসহাক সাহেবের মুন্সীয়ানার খোঁজ নিতে পড়তে হবে জোঁক, মহাপতঙ্গ আর দাদির নদীদর্শন। আরেকটি নিভৃত গল্প হল উত্তরণ যেখানে সাধারণ এক গোয়ালার জীবনের আদর্শিক পরাজয় ও উত্থান আমরা দেখি দুটি ঘটনার মাধ্যমে। একটিতে হয় মতিভ্রম, আরেকটিতে আসে অনুশোচনা। হারেম গল্পটিতে আছে ইংরেজ শাসনামলে এক মুসলিম দেওয়ান গোত্রীয় ভোগবিলাসিতার কুৎসিত বর্ণনা। স্বেচ্ছাচারিতার সাথে হঠকারিতা মিশলে কি তৈরি হয় তার নিদর্শন মেলে এখানে।
গল্পগুলো পড়ে মোটেও হতাশ হতে হয় না। আদর্শ ছোটগল্পের চমক খুব কম থাকলেও বিষয়বস্তুর নির্বাচন ও পরিবেশনায় তাঁর গল্পগুলো হয়ে উঠে অতুল একেকটা রত্ন। আর সেই রত্ন দিয়ে গাঁথা উত্তম মালা এই বইখানি।
এই বইতে গল্প আছে ১২টি।সব গল্প ছাপিয়ে গেছে জোঁক ও মহাপতঙ্গ।এই দুটি গল্পের আবেদন বিশ্বসাহিত্যের দরবারে কখনোই ফুরাবে না। একসময় এই দুটি গল্প পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত ছিল।আফসোস,আজ আর নেই। জোঁক গল্পে রক্ত চুষে খাওয়া জোঁকরূপি শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে দেখা যায় কৃষকদের। আবার মহাপতঙ্গ গল্পে চড়ুইয়ের চোখে মানুষ নামক শ্রেষ্ঠ(!) আদমের কৃতকর্ম দেখানো হয়েছে। অন্যান্য সব গল্পে দেখা যায় মানব মনের মনস্তাত্ত্বিক উত্থান-পতন, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখকের অবস্থান ,গ্রামকেন্দ্রিক আবহতে যাপিত জীবন। প্রতিটি গল্পে লেখকের বিদ্রুপ, সূক্ষ্ম কৌতুক লক্ষ্যণীয়। আরেকটি বিষয় দেখা যায়, প্রতিটি গল্প বলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের সময়ের পটভূমিতে।
জাল পড়ার পর এই বইটি কিনে ফেলেছিলাম। পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে আজকে সুযোগ হল পড়ার। তাই পড়ে ফেললাম। বিশেষ ভাবে যেভাবে উপমা ও সমাজকে কলমের মাধ্যমে তুলে এনেছেন। সেটা অসাধারণ।
সাহিত্যের মধ্য দিয়ে লেখকেরা সামাজিক নানান বিষয়বস্তুকে অকপটে সমালোচনা করে আসছেন বহু কাল থেকে। আবু ইসহাকের প্রতিটি গল্পে সাহিত্যিক সৌন্দর্য ও সামাজিক বাস্তবতার চরম মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। একদিকে গাঁয়ের মানুষের বুলিতে তাদের আবহমান জীবনধারা, অন্যদিকে শহুরে মানুষের দশটা-পাঁচটা করে চলতে থাকা দুরন্ত দিন - সবই উঠে এসেছে লেখকের হাতেগোনা কয়েকটি গল্পে।
মাথার ওপর রোদ নিয়ে খেটে খাওয়া গ্রামীণ মানুষের আর্তনাদ, কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ জীবন - এগুলো যেমন একদিকে পাঠককে ভাবায়, অন্যদিকে নাগরিক জীবনে পোশাক দেখে মানুষকে যাচাই করার প্রবণতা, সংসারের অভাব-অনটন কে তুচ্ছ করে "প্রেস্টিজ" কে প্রাধান্য দেওয়া - এসব আবু ইসহাকের কলমের দ্বারা শহুরে পাঠকের মস্তিষ্কে খোঁচা দেয়।
জোঁক ও মহাপতঙ্গ গল্প দুটিতে রূপকের ব্যবহার, গল্পের শেষে পাঠককে আবেশিত করে রাখে বহুক্ষণ। বিশ্বসাহিত্যের দরবারে মহাপতঙ্গ গল্পটির স্থান বেশ উঁচু একথা স্বীকার করে নেওয়া যায় সহজেই।
অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছিল বাংলা সাহিত্যে এ ধরনের মৌলিক ও সুন্দর গল্প পড়তে পেরে।
আবু ইসহাকের গল্পে সবচেয়ে বেশী যে বিষয়টা চোখে লাগে সেইটা তার উইট। অদ্ভূত রসালো বর্ণনা তিনি দিতে পারেন স্থানে স্থানে। তার গদ্যরীতিটাও পাঠকের জন্যে সুবিধাজনক। জোঁক আর মহাপতঙ্গ এই দুই গল্প তো আমরা স্কুলেই পড়েছি, মহাপতঙ্গ গল্পটা খুব প্রিয় ছিল আমার। এর বাইরে এই বইতে যে কয়টা গল্প আছে, সেগুলার বেশিরভাগ ভাল্লাগে নাই। ঘুপচি গলির সুখ, দাদীর নদীদর্শন, হারেম, উত্তরণ, শয়তানের ঝাড়ু নিতান্ত দুর্বল মনে হইছে। গল্পগুলায় তার উইট আছে, সুন্দর বর্ণনা আছে, কিন্তু ধরেও রাখতে পারে না, গল্পটা শেষ করে ভালমন্দ অনুভূতিও জাগে না। বোম্বাই হাজি, বনমানুষ মোটামুটি ভাল। বনমানুষে তেমন এক্সট্রা কিছু না ঘটায়ে মোটামুটি ভাললাগা একটা গল্প দিছেন লেখক, তবে আবার সুযোগ দিলে আমি পড়ব না আর কী। অত আহামরিও কিছু লাগে নাই। আবর্ত গল্পটার সম্ভাবনা ছিল, শেষটা আরেকটু জমানো যাইত। এদিক দিয়ে বর্ণচোর ভাল্লাগার কথা ছিল, কিন্তু আসিফের এন্ট্রিতেই সাসপেন্সটা খুল্লামখুল্লা হয়ে যায়। এই জায়গায় ব্যর্থতা থাকলেও গল্পটা পড়ে ভাল্লাগছে।
কিন্তু এই বইতে আসলে একটা গল্পের জন্যে বারবার কেবল সেই গল্পটার জন্যেই বইটা খোলা যায়। "প্রতিবিম্ব"। সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে সেরা ছোটগল্পের লিস্ট করলে এই গল্পটারে কেউ বাদ দিতে পারবে না। উইট, বর্ণনা, ঘটনা সব মিলায়ে গল্পটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার মত, আবার ভাবাচ্ছেও। টাইপিস্টের চাকরি করা একটা লোক, অফিসের বড়কর্তাদের ফ্যাশানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চায়, তা নাহলে প্রমোশন হবে না, সুনজরে থাকবে না। ফলে ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে তিন টাকায় স্যুট কিনে সে। আবু ইসহাক এর উইট এইসব জায়গায় ঝলমল করে উঠে। কেবল একটা চিঠি ঢুকিয়ে গল্পটাকে তিনি ধুম করে মহান করে তুললেন, এইটা দারুণ মুন্সিয়ানা। প্রতিবিম্ব গল্প লেখার জন্যে ইসহাক সাহেবকে আমরা গল্পের ক্ষেত্রে মনে রাখব, তা বাদ দিলে, এই শ্রেষ্ঠ গল্প পড়ে যা মনে হয়েছে, তিনি দুর্বল গল্পকার।
সম্ভবত, জোর জবরদস্তি কুসংস্কার টুসংস্কার নিয়া ডিল না করাই উচিত ছিল তার। শহরের মধ্যবিত্ত জীবন দেখার চোখটাই তার ইউনিক লাগছে আমার কাছে। এমন পটভূমিতে তিনি আরো বেশী লিখতে পারতেন। তিন তারকা বইটারে, প্রতিবিম্ব না থাকলে এক কি দুই তারকা দিতাম।
১০৩ পেজের এই ছোট বইটিতে ১২ টি গল্প আছে। যার প্রতিটি অসাধারণ সব বার্তা বহন করে। মধ্যবিত্তের ব্যাপারগুলো এড়িয়ে গেলেও তার গল্পে গ্রামীণ জীবন, ধর্মীয় কুসংস্কার, নিম্নশ্রেণি জীবন তীব্র ভাবে ফুটে উঠেছে। সাথে আছে 'ঘুপচি গলির সুখ', 'উত্তরণের' মত মনস্তাত্ত্বিক ছোট গল্পও। বেশি কিছু গল্প যেমন 'জোঁক', 'বর্ণচোর', 'মহাপতঙ্গ' এগুলোতে প্রতীকের ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত কুশলতার সাথে৷ ছোট গল্প যাদের প্রিয় কিন্তু এখনো পড়া হয়নি আবু ইসহাকের গল্প, তারা পড়ে দেখতে পারেন৷ 😍