বইয়ের নামঃ আবদুল্লাহ
লেখকঃ কাজী ইমদাদুল হক
বইয়ের ধরণঃ সামাজিক উপন্যাস
প্রকাশনাঃ অ্যাডর্ন পাবলিকেশন
প্রথম প্রকাশঃ ১৯৩৩
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৬৪
মূল্যঃ ২২১ টাকা (১৫% ছাড়ে)
মানব জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ধর্ম। সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে মানুষের জীবনে এর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকলেও এটি অনেক সংবেদনশীল একটি ব্যাপার মানুষের কাছে। এ সংবেদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ধর্মকে কেন্দ্র করে নিজেদের আখের গোছানোর ব্যবসায় নামবার ঘটনা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বেশ প্রাচীন একটি প্রথা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত ভারত উপমহাদেশেও এমন চর্চা নতুন কিছুই নয়। বরং ধর্মভীরু মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ধর্মের নামে বিভিন্ন ব্যবসায় নামা এ অঞ্চলে বেশ শক্তপোক্ত শেকড় গেড়ে বসেছে সময়ের পরিক্রমায়। এর সাথে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি।
এরকম নানা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের গল্প নিয়ে লেখা এক উপন্যাসের নাম "আবদুল্লাহ"। তৎকালীন ভারতের সমাজ বাস্তবতার চিত্রকে উপজীব্য করে রচিত এ উপন্যাসে মূলত ধর্মীয় নানা গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের চিত্র দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশেষত বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ কালে ভারতের মুসলিম সমাজের প্রকৃত চিত্র এ উপন্যাসে দারুণভাবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি উক্ত সময়ে প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে যেসব সচেতন মানুষেরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এসব সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে আজীবন প্রাণপণ লড়াই করেছেন, তাদের গল্প নিয়েই এ উপন্যাসের গল্প। এছাড়া, তৎকালীন জমিদার ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের জীবনযাত্রা ও জীবন দর্শন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মেলে এ উপন্যাসে। এক কথায়, সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও তার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া একদল মানুষের লড়াইয়ের গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে এ উপন্যাসের গল্প। রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যমতে, তৎকালীন সময়ের মুসলমান সমাজের ভেতরের গল্প জানতে হলে এ উপন্যাসটি পড়বার কোনো বিকল্প নেই।
উপন্যাসের গল্পের সূচনা হয় উক্ত উপন্যাসের নায়ক আবদুল্লাহর পিতা ওলিউল্লাহর মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে। এ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাদের পরিবারে নেমে আসে ভয়াবহ রকমের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুনিয়া থেকে বিদায় নিলে, পড়ালেখার খরচ এখন কীরূপে জুটবে, সে চিন্তায় অস্থির সময় কাটে তার। শুরু হয় নতুন এক জীবন সংগ্রাম। ধর্মকেন্দ্রিক আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা থাকলেও সে পথে হাঁটবার রুচি হয়না তার। এ নিয়ে তার শ্বশুরকুলের লোকেদের খোঁচা উঠতে-বসতে হজম করতে হয় তাকে। এ সংক্রান্ত কথা উঠলেই তার ইংরেজি শিক্ষা তথা ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রচলিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া নিয়ে সর্বদা খোঁটা দেওয়া হতে থাকে। উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে সহায়তা করা দূরে থাকুক; কীভাবে তাকে এ পথ থেকে নিবৃত্ত করা যায়, সে চেষ্টার যেন অন্ত নেই তাদের। তখনকার দিনে পুরো সমাজের চিত্র বলতে গেলে এরকমই ছিল। অন্যদিকে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মুসলিম সমাজের এ অনগ্রসরতাকে কাজে লাগিয়ে তরতর করে উঠে যায় সফলতার শীর্ষচূড়ায়। এমতাবস্থায়, সামান্য স্কুলমাস্টার আবদুল্লাহ উক্ত সমাজব্যবস্থায় প্রচলিত নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। পদে পদে বাধার সম্মুখীন হলেও একসময় সে জয়ী হয় এ লড়াইয়ে। আর এ জয়ের গল্পকে নিয়ে এগিয়ে যায় উপন্যাসের গল্প। কীভাবে আসে সে পরম আকাঙ্ক্ষিত বিজয়? প্রিয় পাঠক! জানতে চান সে কথা? তবে অনতিবিলম্বে পড়ে ফেলুন দারুণ সুখপাঠ্য ও শিক্ষণীয় এ উপন্যাস।
এবার আসি চরিত্র বিশ্লেষণে। উপন্যাসের নাম ও উপর্যুক্ত আলোচনা পড়ে এতক্ষণে প্রিয় পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, কে এ উপন্���াসের নায়ক! তবুও বলি, কেন্দ্রীয় চরিত্র নির্ভর এ সামাজিক তথা চিরায়ত উপন্যাসে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে দরিদ্র স্কুলমাস্টার আবদুল্লাহ। অর্থনৈতিক দিক থেকে সে দরিদ্র হলেও ন্যায়নীতি ও নিষ্ঠার দিক থেকে সে অটল। সমাজের প্রচলিত নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার ব্যাপারে সে বদ্ধপরিকর। এ কাজে কোনো প্রকার শাসানি বা চোখরাঙানি মানতে নারাজ সে। তৎকালীন সমাজের কর্তাব্যক্তিদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এক অকুতোভয় বিজয়ী বীরের নাম আবদুল্লাহ। বাংলার ইতিহাসে এ নামে কোনো দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার অস্তিত্ব না থাকলেও আবদুল্লাহ চরিত্রটি যেন হয়ে উঠেছে নব্য ও আধুনিক সমাজের হার না মানা এক যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি। কেননা, উক্ত চরিত্রের মধ্য দিয়ে ন্যায়বান ও নিষ্ঠাবান এক আধুনিক তরুণকে উপস্থাপন করা হয়েছে তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষাপটে। এ ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়েছে, তৎকালীন সময়ে Bengal Renaissance বা বাঙালি নবজাগরণ নামে সমাজ সংস্কারের যে নব জোয়ারের সূচনা হয়, এ উপন্যাস যেন তার দর্পণস্বরূপ। উল্লেখ্য যে, উক্ত নবজাগরণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বেশিরভাগই সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও কিছু মুসলিম নেতাও এতে যুক্ত ছিলেন। আবদুল্লাহ নিজেও যেন তাদের-ই প্রতিচ্ছবি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রাখা সৈয়দ আব্দুল খালেককে। সম্পর্কের বিচারে আবদুল্লাহর শ্বশরমশাই এ লোকটি মুসলমান সমাজে সৈয়দ সাহেব নামেই অত্যধিক পরিচিত। সৈয়দ বংশের উত্তরাধিকারী হবার সুবাদে সমাজে বেশ দাপট রয়েছে তার। এ দাপট তাকে একরকম ধর্মান্ধে পরিণত করে। বংশ মর্যাদার গৌরবে অনেক ক্ষেত্রে তার বুদ্ধিবিবেচনা হ্রাস পেয়ে বসে। যুক্তিতর্কের ধার না ধেড়ে তিনি সর্বদা বংশ মর্যাদার বিচারে ব্যস্ত রাখেন নিজেকে। মুখে তার সদা ইসলামের বাণী ফুটলেও আশরাফ-আতরাফের নামে মানুষের মাঝে বিভাজন সৃষ্টিতেই যেন তার যত আনন্দ! অথচ ইসলামে স্পষ্টভাবে বংশ মর্যাদার ভিত্তিতে কারো ক্ষেত্রে বিভাজন বা বৈষম্য সৃষ্টির ব্যাপারে নিষেধ করা আছে। এমন ধর্মের নামে আরো অনেক কুসংস্কারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত একজন মানুষ সৈয়দ সাহেব। সার্বিক বিচারে, তিনি তার জামাতা আবদুল্লাহর পুরোপুরি বিপরীত স্বভাবের একজন মানুষ। এ চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রচলিত সমাজের একজন রক্ষণশীল, গোঁড়া স্বভাবের মানুষকে উপস্থাপন করা হয়েছে। বস্তুত তৎকালীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম সমাজে এমন স্বভাবের লোকের দেখা অহরহ মিলত। ধর্মকে এরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতেন। পুরো সমাজ যেন এদের করাতলে ছিল। গুটিকয়েক লোক পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে এরা পুতুল নাচের পুতুলের মত করে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখনো খুঁজলে যে সমাজে এহেন মানুষ পাওয়া যাবেনা, তা কিন্তু নয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশ বহু বছর আগেই স্বাধীন হয়েছে......আধুনিক প্রযুক্তিতে আমরা অনেক এগিয়ে গিয়েছি। কিন্তু এখনো আমাদের মন থেকে এখনো ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের ভূত পুরোপুরি দূর করতে পারিনি। ধর্মকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কালের নানা উগ্রবাদী হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিবেচনা করলে এ সত্যতার প্রমাণ মিলবে।
উক্ত দুইটি প্রধান চরিত্র বাদেও আরো কিছু চরিত্রের উপস্থিতি এ উপন্যাসের গল্পকে এক আলাদা মহিমা দান করেছে। গল্পের তাগিদে এসব চরিত্র চিত্রণের ফলে উপন্যাসের গল্প আলাদা এক মর্যাদা লাভ করেছে। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে গল্পের মোড় ঘুরে যেতে এসব চরিত্রের ভূমিকা এককথায় অনবদ্য। এসব চরিত্রের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছেঃ হালিমা, সালেহা, আবদুল কাদের, মীর সাহেব, খান নেওয়াজ, সামাদ, রাবিয়া, হরনাথ সরকার, রঘুনাথ সরকার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এসব চরিত্র এ গল্পে মুখ্য ভূমিকা পালন না করলেও গুরুত্বের বিচারে সার্বিক দিক থেকে পিছিয়ে ছিল না কোনোভাবেই। নিজস্ব স্বকীয়তার বলে উদ্বুদ্ধ হয়ে এসব চরিত্র উক্ত উপন্যাসের গল্পকে আলাদা এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে, যা উক্ত উপন্যাসকে এক জনপ্রিয় উপন্যাস হিসেবে পরিচিতি দান করেছে।
এবার আসি ভাষারীতি ও শব্দচয়নের গল্পে। সাধুভাষায় রচিত হলেও এ উপন্যাসে শব্দচয়ন বেশ চমকপ্রদ লেগেছে আমার কাছে। ভাষারীতি সাধুভাষা হলেও কোথাও কোনো শব্দ দুর্বোধ্য মনে হয়নি আমার কাছে। এছাড়া শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চমক রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনীয় আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দের যথাযথ প্রয়োগে কোথাও কোনো অনর্থকতা বা জটিলতার সৃষ্টি হয়নি। পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এক আলাদা মাহাত্ম্য যোগ করেছে এ উপন্যাসে। এমন বিচিত্র ভাষারীতি ও শব্দচয়ন এ উপন্যাসটিকে বাংলা সাহিত্যের এক বিখ্যাত উপন্যাসে পরিণত করেছে। এমন বিচিত্রতা উপন্যাসটিকে যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের মনে বাঁচিয়ে রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
সর্বোপরি, বিভিন্ন দিকের সমন্বয়ে এক দারুণ সুখপাঠ্য উপন্যাস। পাশাপাশি, তৎকালীন মুসলিম সমাজের হালচাল জানতে এটা বেশ সহায়ক হবে বলে মনে করি আমি। এ দিক থেকে এটাকে শিক্ষণীয় উপন্যাস-ও বলা চলে। সামাজিক জীবনযাত্রার অনেক দিক জানা যাবে এতে। আশা করি, অন্য পাঠকেরাও অনেক উপকৃত হবেন এ বইটি পড়ে।
হ্যাপি রিডিং! ♥