প্রবহমান সময় কারাে কারাে জীবনে কখনও কখনও থমকে যায়। এই যাওয়াটা কোনাে সত্য নয়, অনুভবের সত্য মাত্র। যদিও এ উপন্যাসের মানুষেরা সজীব, তবু মনে হয় এক অবিশ্বাস্য স্তব্ধ সময় নেমে এসেছে এইসব মানুষের জীবনে। এ উপন্যাসে সেই জীবনের কথা আছে, যে জীবন যাপিত হচ্ছে আপন নিয়মে। এখানে নানা অনুভূতির কথা আছে, যে অনুভব মানুষকে দীপ্র করে। এখানে যুক্তির কথা আছে, যে যুক্তি মানুষকে দর্শনের গভীরতায় ডুবিয়ে দেয়, এখানে মানুষের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের কথা আছে, যা মানুষকে উজ্জ্বল করে। তােলে, এখানে রহস্যের কথা আছে, যে রহস্য কোনােদিন মানুষের কাছে উন্মােচিত হয় না— জীবনের এই টানাপােড়েনের কোনাে শেষ নেই। এমনই টানাপােড়েনের অজস্র অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে হেঁটে যায় কেউ কেউ। লেখক তাদের চিত্রিত করেন নিজেকেই ভেঙেচুরে নিয়ে। শিল্পের এই নির্মাণ জীবনের বিপরীতে ভিন্ন জীবন। এই উপন্যাস সেই জীবনের কথা বলে। এ উপন্যাস তৈরি হয়েছে প্রথাভাঙা আঙ্গিকে। স্তব্ধ সময়কে নায়ক করে এগিয়েছে এবং এগুতে এগুতে সেই সময়ের গণ্ডি উৎরে পৌছেছে একস্থানে, যেখানে লেখক এবং পাঠক মুখােমুখি দাঁড়ায়।
Selina Hossain (Bangla: সেলিনা হোসেন) is a famous novelist in Bangladesh. She was honored with Bangla Academy Award in 1980. she was the director of Bangla Academy from 1997 to 2004.
সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৯৪৭) বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বি এ অনার্স পাশ করলেন ১৯৬৭ সালে। এম এ পাশ করেন ১৯৬৮ সালে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমীর গবেষণা সহকারী হিসেবে। তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমীর প্রথম মহিলা পরিচালক হন। ২০০৪ সালের ১৪ জুন চাকুরি থেকে অবসর নেন।
গল্প ও উপন্যাসে সিদ্ধহস্ত। এ পর্যন্ত ৭টি গল্প সংকলন, ২০টি উপন্যাস, ৫টি শিশুতোষ গল্প, ৫টি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু বই। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক স্বর্ণপদক (১৯৬৯); বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮০); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১); কমর মুশতরী স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৭); ফিলিপস্ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮); অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪)। তাঁর গল্প উপন্যাস ইংরেজি, রুশ, মেলে এবং কানাড়ী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
আমি মাত্র খেয়াল করলাম এই বইটা আমি শেল্ফে এড করিনি!! ক্লাস ৬ এ থাকতে এক ক্লাসমেট থেকে ধার করে বইটা পড়েছিলাম,পাইলট হওয়ার স্বপ্ন শুরু হতে হতে শেষ হয়ে যায়। কল্পনা করতাম আমার আম্মুও যদি আমাকে এমন ভালোবাসতো। আম্মুকেও বইটা পড়তে দিয়ে বলেছিলাম,"সব আদর শুধু ভাইকেই করলে, আমাকে করোনা কেন?" আমার আম্মু এই বইটা পড়ে একদিন আমাকে বললো," তোমাকে আমি কি পরিমাণ ভালোবাসি এটা তুমি নিজেও কল্পনা করতে পারবেনা।" সময় যায়,আম্মুর সাথে সম্পর্ক টক ঝাল মিষ্টির মতো যায়। যখন অন্য মেয়েদেরকে দেখি আম্মুর সাথে মজা মজা খুনসুটি করতে,আমি ফিরে দেখি আম্মুর সাথে সারাজীবন ঝগড়াই করে এলাম। আজ হঠাৎ আমার ব্যাগ গুছাতে গিয়ে নিজের অজান্তে উনি চোখের পানি ফেলে বললো,"মেয়েদেরকে বেশি জ্বালাবিনা"। সেলিনা হোসেনের এই লারা বইটা মূলত আমাদের মা-মেয়েকে কিছুটা কাছে এনেছিল। খুব ইচ্ছা আম্মুকে আবার বইটা দিয়ে বলবো, " সারাজীবন শুধু দুইটা ছেলেকেই আদর করলে,আমাকে করো না কেন??" বিঃদ্রঃ এই বই পড়ে আমার আম্মুর প্রথম কথা ছিল,কিরে তুইতো পুরা লারার মত!! ভালোবাসি তোমাকে আম্মু। এবার আর ধার করেনা,নিজের টাকায় তোমাকে এই বই উপহার দিব
একটা অসম্ভব কষ্ট নিয়ে বইটা পড়ে শেষ করলাম। সেলিনা হোসেনের বেশিরভাগ লেখাই আমার ভালো লাগে না। আরোপিত মনে হয়। কিন্তু এই লেখাতো নিছক কোনো গল্প নয়, উনার জীবন থেকে নেওয়া এ আখ্যান। আমরা তো প্রত্যেকেই জীবদ্দশায় কখনও না কখনও লারার মতো থাকি, কিন্তু লারার সার্থকতা এই যে উনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত "লারা" ই ছিলেন। কাহিনীর যে দিকটা আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লেগেছে তা হলো অতিনাটকীয়তা নেই। সেলিনা হোসেনের লেখকসত্ত্বা আর মাতৃসত্ত্বা যে পুরোই আলাদা তা খুব চমৎকারভাবে বোঝা গেছে। পড়তে পড়তে সব যেন চোখের সামনে ভাসছিল। অনেক অনেক দিন পর অনেক অন্যরকম একটা বই পড়লাম। আহা লারা! আহা সেলিনা হোসেন!
ব্যক্তি লারাকে নিয়ে আমার মুগ্দ্ধতা অনেক। ছিলেন অনেক, অনেক দিক থেকে অ-নেক বেশি শার্প আর দুঃসাহসী একজন মেয়ে, নেমেছিলেন প্রথাগত পেশায় প্রতিষ্ঠিত হবার প্রলোভন এড়িয়ে বৈমানিক হবার যুদ্ধে, দূর্ভাগ্যক্রমে মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় হারিয়ে যান স্বপ্নপূরণের সীমানার খুব কাছটায় দাঁড়িয়ে।
ফারিয়া লারা, জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের মেধাবী কন্যাদ্বয়ের কনিষ্ঠাজন, ঢাবি অঙ্গনের অতি পরিচিত, তুমুল জনপ্রিয়, ঝকঝকে চোখের সেই তরুণীটি। মেধায়, প্রজ্ঞায় কেউ যাকে হারাতে পারে নি, হারিয়েছে নিয়তি। এয়ার পারাবতের মেরামতবিহীন, ত্রুটিপূর্ণ প্রশিক্ষণ বিমানটির দগ্ধাবশেষের ছাইভষ্মের মাঝে মিশে হারিয়ে গেছেন লারা।
কিন্তু আত্মজাকে নিয়ে স্মৃতিচারণের যে ভঙ্গি মা'র, তাতে পাঠক হিসেবে ঠিক একাত্মতাটা আসে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে যেটা সবচেয়ে বেশি খুঁজি, পড়ায় আরাম, সেলিনা হোসেনের লেখার স্টাইল-ই তার সঙ্গে যায় না আসলে। অগত্যা রিভিউর দৈন্য দশাও ঘোচে না আর, শেষমেশ।
পড়তে গিয়ে অনেক লাইন মনে হয়েছে ইনফো গুঁজে দেওয়া। কর্ণেল তাহের যে লেখিকার মায়ের মামাত ভাই, কিঞ্চিৎ অপ্রাসঙ্গিকভাবেই সেলিনা সেটা জানিয়েছেন স্বপ্ন দেখার ছুতোয়। ওভারঅল রেটিঙে চার দাগানো বাল্যপাঠের খাতিরে, একটু মুশকিলে পড়েই।
অবশ্য শেষ পাতাটায়, যেখানে মায়ের সামনে মেয়ের দগ্দ্ধ মৃতদেহের ছবি.. চোখ ভিজে যায়। ওটা আটকানো অসম্ভব!
বইটা লারাকে নিয়ে। লারা এবং তার মায়ের দর্শন নিয়ে। লেখিকা সেলিনা হোসেন স্বয়ং এখানে লারার মা এবং লারা তাঁর মেয়ে। মেঝো মেয়ে। এটাকে ঠিক আত্মজীবনী বলা যাবেনা তবে আত্মজীবনী ই। লারার আত্মজীবনী। যেন মায়ের কলমে মেয়ের আত্মজীবনী। আবার তাও ঠিক বলা যাবে না। এটা সম্পর্কের বই। মা-মেয়ের সম্পর্কের সাতকাহন বর্ণনা করা হয়েছে এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে। সম্পর্কের গভীরতা নির্ণয় করা হয়েছে নিপুণভাবে। দুয়েক পাতা উল্টালেই পাঠক লেখার মনিমুক্তো গুলো খুঁজে পাবেন। শব্দের সাথে শব্দের গাঁথুনিতে ঠাস বুনট গল্পে হারিয়ে যাবেন নিমেষেই। লেখার শুরুটা হয় মায়ের জবানীতেই। গল্প বলতে বলতে মা তাঁর খোলস বদলে এক সময় লারায় রূপান্তরিত হন। তখন লারা তার নিজের মতো করে গল্প বলতে থাকে।গল্প না ঠিক । তার সময়কার সমাজের কথা বলে। তার চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারনার কথা বলে। তার আত্ম প্রত্যয়ের কথ বলে। এবং তা খুব যুক্তি সহকারে। আশির দশক আর নব্বইএর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স পড়ার সময়টাকে সে কিভাবে নিজের বানিয়ে নেয় তার দৃঢ় বর্ণনা পাওয়া যায় প্রায় পুরোটা লেখা জুড়ে। পারিপার্শ্বিকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কিভাবে একজন মেয়ের চরিত্র ছাপিয়ে একজন পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠার অবিরাম সাধনায় লারা মেয়েটি একেকটা ধাপ পার হয় তা সত্যিই রোমাঞ্চকর। তার পাইলট হয়ে উঠা। কিংবা বিমানে দেশের প্রথম নারী ইন্সট্রাক্টর হওয়ার জন্য তার যে অদম্য লড়াই সেটা খুব সহজেই পাঠককে সবচেয়ে শক্তিশালী নারীর প্রতিরূপ অঙ্কন করতে বাধ্য করবে। আবার এক সময় মা তার নিজের জবানীতে বলতে থাকেন তার সন্তানদের সম্পর্কে নিজের ভাবনার কথা, নিজের দায়িত্বের কথা। এইভাবেই পর্যায়ক্রমে মা মেয়ের মুখনিঃসৃত শব্দগুলো পাঠক মস্তিষ্কে এক অদ্ভুত ঘোর লাগা জগতের অবতারণা করবে নিঃসন্দেহে। পড়তে পড়তে মনে হল যেন মায়ের আলতো কলমের খোঁচায় মেয়ের জীবনের স্বরূপ বইয়ের প্রতি পৃষ্ঠায় জীবন্ত হয়ে উঠছে আমার সামনে। আবার এক ই ভাবে মেয়ের ইজেলে তুলির সূক্ষ্ম ছোঁয়ায় মায়ের জীবনের স্বরূপ চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠছে বারবার, এমন ই মোহাবিষ্ট করে রাখার মতো লেখার ধরণ । এইখানে লেখিকা সবচেয়ে দুঃসাহসী কাজটা করেছেন মেয়ের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দিয়ে। যখন মেয়ের জবানীতে মেয়েরই মনের কথা গুলো নিজে বলে যাচ্ছেন তখন কিন্তু তিনি নিজেই নিজের সামনে দাঁড়িয়ে যান। ফলে সন্তানদের প্রতি দায়িত্বে অবহেলার কথা মনে জায়গা করতে পারে না। শাসন করতে গিয়ে সন্তানদের অধিকার টুকুর কথা লেখিকার সেই স্বত্বা কখনো ভুলে যেতে পারেন না। যেটার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই লারার কিংবা বড় মেয়ে মুনার পর্যায়ক্রমিক সাফল্যের মাঝে। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর দুইটা সন্তান থাকার পরেও যেন এক অমোঘ, যৌক্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দ্বিতীয় স্বামী লেখিকাকে গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে এই নতুন সম্পর্কের পরিণতি যে যথার্থই ছিল তা পাঠক স্পষ্ট দেখতে পায় যা আমাদের জীবন সম্পর্কে এক নতুন উপলব্ধি এনে দেয়। আমরা নতুন করে দেখতে পারি সম্পর্কগুলোর স্বরূপ। আবার যখন লেখিকা নিজের তিন সন্তান জন্মদানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন নিজের মেয়েদের কাছে, তখন আমরা পৌছে যাই এক না পৌঁছুতে পারা জগতে। এইটা আমাদের জন্যে এক বাড়তি পাওয়া।কিংবা যখন লেখিকা নিজের স্বামীর,মায়ের কিংবা অনুজের মৃত্যুর বর্ণনা দেন ঠিক মৃত্যু শ��ল্পীর মতো,আমাদের পরিচিত জগত একটু না কেঁপে উঠে পারে না। মা-মেয়ের সাবলীল সম্পর্ক। লারার সূক্ষ্ম জীবনবোধ। পরিবারের এক সদস্যার সাথে আরেকজনের সম্পর্কের বোঝাপড়া (বিশেষ করে লারা ও মুনার কথোপকথন)__ এইসব আমাদের যোগাবে যথেষ্ট চিন্তার খোরাক। আবার যখন দেখি সামান্য আপোষের প্রশ্নে রাজি না হয়ে লারা তার ই বাছাই করা জবনসঙ্গীর সাথে অবলীলায় বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয় নৈতিকতার স্খলন রোধ করবে বলে তখন এক অসামান্য শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠে লারার প্রতি। মেঝো মেয়ের “লারা” নামকরণের পেছনেও আছে এক মজার কাহিনী। আরও কিছু ছোট ছোট ঘটনা, দুর্ঘটনা বইটাকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত, গতিশীল যেগুলো আমাদের ঋদ্ধ করবে যাপিত জীবনের নানান পর্যায়ে। বইটা পড়তে পড়তে জানতে ইচ্ছে হচ্ছিলো এখন এই ৪৫-৪৬ বছর বয়সে লারা কেমন আছে? দেখতেই বা কেমন এখন? মাথার চুল গুলো কি সফেদ নাকি ধূসর? কিংবা কখনো কখনো মনে হয়েছে লারার মতো মেয়ে থাকলে সকল মা বাবাই বর্তে যেতেন। বইটা শেষ করার খানিক আগেই জানতে পারলাম কেনইবা লেখিকা তাঁর আরও দুইজন সন্তান থাকতে কেবল লারাকে নিয়েই লিখলেন আলাদা করে।
মানুষ সেই শৈশব থেকেই দু-চোখ বুনে অজস্র স্বপ্নের-জাল। রঙিন প্রজাপতির মতো সেই স্বপ্ন! লারাও দেখেছিলো, তার সেই চপলতাময় দু-চোখে।আকাশের বুকে রঙিন স্বপ্নই নিয়ে গেছিলো ওড়াওড়ি করতে। কিন্তু নিয়তি তাকে করেছে অনন্তকালে যাত্রী। মানুষ নিয়তির কাছে বড়ই অসহায়।
লারা হচ্ছে সেলিনা হোসেনের মেজ মেয়ে। সে ছিলো পাইলট। এক বিমান দূর্ঘটনায় সে মারা যায়। লারা এবং সেলিনা হোসেনের সম্পর্কটা মা-মেয়ের সম্পর্কের চেয়েও বেশি ছিলো বন্ধুত্বের। লারা ছিলো প্রজ্ঞায়, মেধাবীয় এবং চঞ্চলতায় অতুলনীয়া। বইয়ে লারার সংলাপগুলো পড়ে লারাকে আমার ভীষণ ভালো লেগে গেছিলো। প্রবাহমান সময় হঠাৎ কারো জীবনে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু এই দাঁড়ানো সাময়িক। এই বইয়ে সেলিনা হোসেন, তাই বুঝিয়ে দিয়েছেন। মা-মেয়ের সম্পর্ক এই লেখাকে দিয়েছে অনন্য ব্যঞ্জনা। সেই আলোচনায় কি ছিলো না তাই-ই ভাববার বিষয়। এখানেই দেখলাম লেখক সেলিনা হোসেন আর মাতৃসত্ত্বায় পুরোপুরি আলাদা সেলিনা হোসেনকে। একজন নারী লেখকই বোধহয় পারেন, মাতৃ অনুভূতির পূঙ্খানুপুঙ্খ বণর্না করতে।সেলিনা হোসেন লারার জন্মের আগের সময়ের এবং পরের সময় গুলোর দারুণ সব বর্ণনা দাঁড় করিয়েছিলেন এই লেখায়, যা আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করেছে।
সেলিনা হোসেন অনেক লেখাই পড়তে গিয়ে, বিভিন্ন সময় বিরক্ত হয়েছি। মনে হয়েছে ছলযুক্ত লেখা। কিন্তু 'লারা'র বেলায় কিন্তু তা ঘটেনি। বই শেষ করে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেছিলো। ভীষণ রকমের একটা দুঃখবোধ কাজ করছিলো।এই বইয়ে সেলিনা হোসেনকে এক অন্য লেখক হিসেবে আবিষ্কার করলাম। তবে সেলিনা হোসেন যেদিকটা সবসময়ই সমালোচনা যোগ্য, তা হলো তার ভাষার ব্যবহার। তা খানিকটা এখানেও ছিলো। বইটার সবচেয়ে যে বিষয়টা ভালো লেগেছে, তা হলো ছলহীনতা। কোনো রকম নাটকীয়তাই এখানে দেখতে পাইনি। অকপটেই বলে গেছেন সমস্ত ঘটনা। লারার সঙ্গে মা সেলিনা হোসেনের ঝাঁপি ঝাঁপি স্মৃতিকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন লেখক সেলিনা হোসেন।
"লারা"। সেলিনা হোসেনের বিখ্যাত বইয়ের তালিকায় এই বইটি হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না । অথচ কী অদ্ভুত সুন্দর এই বইটি। বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাতায় ফুঁটে উঠেছে মা-মেয়ের ভালোবাসার, বুন্ধুত্বের গল্প। দুই প্রজন্মের দুটি মানুষের সময়, মূল্যবোধ আর দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ কে উতরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
এ গল্পের প্রধান চরিত্র লারা। তাকে ভালো না লেগে উপায় নেই! প্রাণোচ্ছ্বল, স্বাধীনচেতা এই কিশোরীর জীবনের লক্ষ্যই হলো সকল চ্যালেঞ্জকে মুখোমুখি গ্রহণ করা। জীবনের প্রতিটি ধাপে সেই গতানুগতিক " মেয়েদের জন্য নয়" চিন্তাধারাকে উতরে যেতে চায় লারা। তাইতো স্বপ্ন দেখে পাইলট হওয়ার। নীল আকাশে মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যেতে চায়। সঙ্গী করে নিতে চায় মেঘদের। দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত উড়ে যেতে চায় ওর লিটল ওয়ান্ডার বিমান টাকে নিয়ে।
কিন্তু জীবন নামক গোলকধাঁধায় কখন যে কে কোন এক কানা গলিতে এসে পৌছুবে, তা কী কেউ আগে থেকে বলতে পারে! তাই হয়তো সবার অলক্ষ্যে, অজান্তেই একদিন আকাশের বুকে মিশে যায় লারা। সঙ্গী হয় নক্ষত্রদের, মেঘেদের। কেবল রয়ে যায় পুড়ে যাওয়া লিটল ওয়ান্ডারের ছিন্নভিন্ন টিনের বাক্স আর লারার সেই আধপোড়া ডায়েরি। যেখানে লেখা ছিলো 'Lose in the sky like a diamond'. আকাশে হীরের দ্যূতির মতো হারিয়ে যেতে চাই।
মৃত্যু সহজ বিষয় নয়, কিন্তু তাকে মেনে নেয়া আরও কঠিন। মৃত্যু মানেই যে ফুরয়ে যাওয়া... কিছু স্বপ্ন... একটি জীবন।
Another childhood favourite. I used to want to be like Lara when I grow up. To me, she was just so special...so free spirited, so beautiful. The way Lara dies breaks my heart, but I am glad Selina Hossain wrote this book, and introduced us all to her beautiful Lara.
This entire review has been hidden because of spoilers.
Found it so mesmerizing..mother daughter relationship described so beautifully..and most importantly this book made me laugh, cry and at the same time amazed..
ঠিকঠাক রিভিউ না লিখতে লিখতে মাথায় ঢুকে গেছে যে এ কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু, একে কাজ হিসেবে দেখতে হবে কেন? লিখি। পেছনে ফিরে বইটি পড়ে নিজের ভাবনায় ফিরে যাবার সুযোগটা তো অন্তত নিজেকে দেওয়া দরকার। নিজের কাছে কৈফিয়ত পেশ করে নিজেকে বুঝিয়ে লিখতে শুরু করলাম!
গতমাসে বুকক্লাবের বই ছিল এটি। সেলিনা হোসেনের লেখা সত্যি বলতে টানে না তেমন। তাই, আমি জানি যে এই বই হয়তো কখনোই শখ করে নিজ থেকে পড়া হতো না। আর, যে কারনেই পড়া হল, হল দেখে কৃতজ্ঞ। পড়ে শেষ করে মনে হয়েছে এই বই না পড়া মানে জীবনের একটা অধ্যায় না চিনে বসে থাকা। আর সেই জরুরী অধ্যায়টুকুর আস্বাদ নেবার ভাগ্য করে এসে আমি কৃতজ্ঞ। পাঠক না হলে লারাকে না জেনেই কোন একদিন মরে যেতাম! তাকে জেনে এই এতোদিন কেন জানার চেষ্টাও করি নি, সেটা ভেবে কষ্ট হয়।
‘লারা’ উপন্যাস হিসেবে কতোটা সার্থক, তা বলতে পারব না। এই বই আমার শুরুর তুলনায় শেষে পৌঁছে বেশি ভালো লেগেছে। শেষটা এতো নিখুঁত না হলে ৫ তারা দিতে মন চাইতো না। ব্যক্তি লারাকে জানার ধৈর্য না থাকলে শুরুতেই পড়ার ইচ্ছা চলে যেতে পারে। চেনা একজন এই অভিজ্ঞতা শেয়ার করায় নিশ্চিত হয়েই বললাম। পড়ে যেতে থাকায় লারাকে নিয়ে তার মায়ের ছোটখাটো স্মৃতিগুলো লেখনী পেরিয়ে আমার মনকে প্রসন্ন করে তুলছিল। তাই মনে হয়েছে যে, ‘আচ্ছা থাক, পড়তে থাকি’। কি হবে জানা সত্ত্বেও লারার বাসায় আসা, মরিচ ডলে পান্তা খাওয়া, মায়ের সাথে সহজ অথচ দৃঢ় কথোপকথন, ভাইবোনদের সাথে তার খুনসুটি, তার রবীন্দ্রসংগীত প্রীতি, তার বেঁচে থাকার মধ্যে আকাশে ওড়ার স্বপ্নের প্রাধান্য, এসব কিছু যেন তার শেষটি আরো বাঙ্ময় করে তোলে। মনে মনে আফসোস হয় যে লারার মতো আমার একটা মেয়ে নাই! তার পরিণতির বর্ণনা মনে করিয়ে দেয় যে কেন ‘লারা’ রা জন্মাচ্ছে না তেমন আর। বা জন্মালেও তাদেরকে হয়তো ‘ঠিক’ করে ফেলা হয়। পড়া শেষ করে আশেপাশের তেজী ও সুন্দর অনেক মানুষের পরিবর্তন লারা বেঁচে থাকলে তাদের মতোই হয়ে যেতো কিনা তা নিয়ে চিন্তায় ফেলে দেয়।
লেখিকা একেকবার মায়ের খোলস পাল্টে লারা হয়েছেন। এই ব্যাপারটা লারাকে আরো নিবিড়ভাবে চেনার বদলে আমাকে কেমন বারবার হোঁচট খাইয়েছে। অভিনব এই পথটি তিনি মসৃনভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন বলে মনে করি না। বরং, মনে হয়েছে লারা হয়েও তিনি তার নিজের মধ্যেই থেকেছেন। শুধুশুধুই এই চেষ্টাটা পড়ার গতিকে একটু টলোমলো করে দেয়।
অকপটে নিজের এবং তাঁর মেয়ের সম্পর্কের পাশাপাশি চিরাচরিত ‘মেয়েদের কি করা উচিৎ বা উচিৎ না’ এর মধ্যে আটকে থাকা সেসময়ের সমাজটি নিয়েও ধারনা দেন লেখিকা এখানে। খুব যে তা পাল্টেছে এমন মনে হয় না। বরং, মায়েরাই যেন আরো সেকেলে হয়ে গেছে আজকাল, এটাই মনে হয়। তাও এই ‘সেকেলে’ হওয়া মানে বইয়ের এই মায়ের তুলনায় অনেক অনেক পিছিয়ে পড়া এক চিন্তায় বাঁধা পড়া কারোর কথাই মনে হয়। দেরী করে বাসায় আসা নিয়ে লারা যেমন করে তার মাকে ঠিক বেঠিকের রকমটা লিঙ্গেভেদে যে ভিন্ন তা বলতে পারে বা মা যেমন তা বুঝে একটি বিন্দুতে দুজন মিলিত হয়, এই বোঝাপড়া এখনো আশেপাশে এতোই বিরল যে উপন্যাসের জগতটাকে ধরাছোঁয়ার বাইরের কিছু মনে হয়।
লারা তার মাকে শেখায় যে মা হিসেবে তার কাজ এই বেশি বোঝা সমাজের খুব ‘যোগ্য’ করে তাকে না তোলা। মায়ের সাথে লারা তার পেশাগত জীবনের মতোই একদম সৎ। তাদের নিত্যদিনের ভাবের আদান-প্রদানের ধরন পাঠকদের নিজের মায়ের সাথে সম্পর্কের ধরন মনে করিয়ে দিতে বাধ্য। আমিও পড়তে পড়তে মেপেছি কতোটা মিল এবং পার্থক্য আছে এই সম্পর্কের সাথে আমার ও আমার মায়ের সম্পর্কের! এড়াতে পারি নি এটা, এড়ানো মনে হয় যায় না এই বই পড়ার সময়ে।
শেষ অংশে মেয়েকে হারিয়ে মায়ের বিলাপ মেশানো কথাগুলো কাঁদিয়ে ছাড়ে। মনে হচ্ছিল জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হয়েছে মায়ের মনরূপী এই শহর, সবটুকু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে তার আবেগমথিত মনের এবং তা থেকে উৎসারিত তার নানা রকম অযৌক্তিক ও যৌক্তিক কাজের বর্ণনায় এসে পৌঁছেছি যখন, তখন আর বইটি শেষ না করে উঠতে পারি নাই।
নটে গাছ মুড়িয়ে দেই এই বলে যে লারা মনকে হাহাকারে ভরিয়ে দিলেও কেমন একটা আশার সঞ্চার করে। মনে হয়, উড়তে বাঁধা নেই। ক্ষণজন্মা হলেও লারা যেন বাঁচার মতো বেঁচেছে। মৃত্যুকালেও তো সে উড়ছিল। আর তাকে তার মৃত্যুর পরও বাঁচিয়ে রেখেছে তার মা এবং সেই মায়ের অপত্য স্নেহ ও ভালোবাসা।
সেলিনা হোসেন এরকম হৃদয় নিংড়ে আর কিছু লিখেছেন কিনা বা পারবেন কিনা লিখতে জানা নেই। যাকে পৃথিবীতে এনেছিলেন, সেই মানুষটাও আসলে এতো বেশি চমৎকার ছিল যে তাকে নিয়ে লেখার কারনেই উপন্যাসটা যেন আরো প্রাণ পেয়েছে। তাঁর সব লেখা যেহেতু পড়ি নি, তাই বলতে পারছি না এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ কিনা, কিন্তু, নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ।