Jump to ratings and reviews
Rate this book

জুলফিকার আলী ভুট্টো : দক্ষিণ এশিয়ার কুলীন রাজনীতির এক অধ্যায়

Rate this book
দক্ষিণ এশিয়ার আলোচিত চরিত্র পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টোর রাজনৈতিক জীবন মাত্র দুই দশকের, কিন্তু নিজ দেশের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আজও বিতর্ক চলছে। তাঁর ফাঁসি হওয়ার চার দশক পরও তাঁকে নিয়ে আলোচনা থামেনি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক উসকানিদাতা কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় মানচিত্রের ভাঙাগড়ার অংশীদার হিসেবে শুধু নয়, উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদ ও কুলীন রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবেও তিনি আলোচিত। কিন্তু তিনি বা তাঁর মতো কুলীন রাজনীতিবিদদের কাছে কী পেল এ অঞ্চলের মানুষ? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে ভুট্টোর জীবন, রাজনীতি ও সময়ের পূর্ণাঙ্গ পুনঃপাঠের ভেতর দিয়ে। ব্যক্তি ভুট্টোর মনস্তাত্ত্বিক সংকট থেকে রাজনীতিবিদ ভুট্টোর ভূরাজনৈতিক ভূমিকার বিস্তারিত তদন্ত এ বই।

328 pages, Hardcover

First published January 1, 2023

8 people are currently reading
59 people want to read

About the author

Altaf Parvez

20 books39 followers
আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
9 (50%)
4 stars
6 (33%)
3 stars
3 (16%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 8 of 8 reviews
Profile Image for Ashik.
221 reviews42 followers
August 14, 2025
পাকিস্তান তথা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অঙ্গনে জুলফিকার আলী ভুট্টো গুরুত্বপূর্ণ এক নাম। ভূস্বামী থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা ভুট্টো একা হাতেই পাকিস্তানের রাজনীতি ও ভবিষ্যত অনেকখানি বদলে দিয়েছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব ও অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা আধুনিক মানসিকতা, দুই ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য জোরালোভাবে পাশাপাশি ছিল ভুট্টোর চরিত্রে। সেজন্য বোধহয় তিনি যেমন খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেক, তেমনি রাজনীতির খেলায় বিচক্ষণতার পরিচয়ও দিয়েছেন ঢের। ক্ষমতার সিড়ি ধরে উপরে উঠতে গিয়ে ভুট্টো যেসব কৌশল, কূটচালের দারস্থ হয়েছিলেন, যাদের হাতে রেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন, দেখা যায় তাদের হাতেই এবং তার ব্যবহৃত কৌশলেই ক্ষমতা থেকে ছিটকে গেলেন ভুট্টো!
এ এক নির্মম ট্রাজেডি!
এবং পাকিস্তানের ইতিহাস জুড়ে এমন ট্রাজেডির সংখ্যা অনেক।


যেকোনো শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদের জীবন নিয়ে গবেষণা করতে গেলে আলোচনা শুধু তাকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তার সমসাময়িক অনেক নেতৃবৃন্দের আলাপও চলে আসে যেমন এ গ্রন্থে অনেকবার এসেছে ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবের নাম।
জীবনীগ্রন্থ, বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জীবনী নিয়ে কাজ করা বেশ দুরূহ কাজ। নিরেপক্ষ থাকাটা অনেকসময় হয়ে ওঠে না, ব্যক্তিগত ভক্তি বা বিদ্বেষ ফুটে ওঠে লেখায়৷ তবে এক্ষেত্রে বেশ ভালোভাবে উতরে গেছেন আলতাফ পারভেজ।
ভুট্টোর রাজনৈতিক জীবন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাঙাচোরা, উথাল-পাতাল রাজনীতি জানার জন্য এ বইটা যথেষ্ট গুরুত্বের দাবী রাখে।
Profile Image for Shadin Pranto.
1,484 reviews566 followers
March 3, 2024
নির্মোহভাবে জীবনীগ্রন্থ রচনা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কারণ উচ্ছ্বাস অথবা বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে লিখতে বসলে লেখা প্রভাবিত হয়ে যায়। আলতাফ পারভেজ এক্ষেত্রে ধন্যবাদ পেতেই পারেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির আলোচিত-সমালোচিত চরিত্র জুলফিকার আলী ভুট্টোকে নিয়ে তিন শ পাতার বই সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ থেকে লেখার চেষ্টা করেছেন। আর, ইদানীং পড়াশোনা না করেই লেখক হওয়ার বাসনা মহামারির আকার ধারণ করেছে। সেই বিবেচনায় আলতাফ পারভেজ একদম ব্যতিক্রমী লেখক। তার মেহনত ও মেধার স্বাক্ষর বইয়ের পাতায় পাতায় মেলে।



সিন্ধুর জমিদার পরিবারের সন্তান ভুট্টো। তার মা হিন্দু ছিলেন। পরবর্তীতে মুসলিম হন এবং ভুট্টোর পিতা শাহনেওয়াজ ভুট্টোর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার লজ্জাজনক পরাজয়ের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। মায়ের ধর্মীয় পরিচয় ও পিতার রাজনৈতিক পরাজয় - এই দুইটি ঘটনা আমৃত্যু তাড়িত করেছিল ভুট্টোকে। তিনি মসনদের মোহে আকণ্ঠ ডুবে ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে সবকিছু সইতে পারতেন। কিন্তু পরাজয় ও অন্যের সমালোচনাকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতা তার কখনোই তৈরি হয়নি। যা তার মননে যে কোনো পরিস্থিতিতে অজেয় ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকার মানসিকতা গভীরভাবে সৃষ্টি করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, আক্রমণ হচ্ছে প্রতিরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়। ক্ষমতার প্রতি অসম্ভব মোহ, প্রতিনিয়ত প্রতিপক্ষ তৈরি ও পরিস্থিতি বুঝে রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান বদল - এগুলো ছিল ভুট্টোর চরিত্রের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য। নিজেকে তিনি সব সময় অন্যের চাইতে বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী ভাবতেন। তার এই অতিচালাক মনোভাব ভুট্টোকে নিয়ে গেছে ক্ষমতার গদি থেকে ফাঁসির দড়িতে।

আলতাফ পারভেজকে আমার 'আন্ডাররেটেড' লেখক মনে হয়। তিনি মহিউদ্দিন আহমদের তুলনায় ঢের বেশি পরিশ্রমী। অথচ আলোচনার পাদপ্রদীপে সেভাবে থাকেন না। ভুট্টোর জীবনকাহিনির সাথে শুধু পাকিস্তান নয় ; জড়িত আজকের বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী ভারত। মনোযোগ দিয়ে পড়ুন ভুট্টোর জীবনীগ্রন্থ। তার কর্মকাণ্ডের সাথে এদেশের একাধিক শাসকের মিল খুঁজে পাবেন এবং অবাক হয়ে আবিষ্কার করবেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শেখে না। তাই হয়তো বারবার ফিরে ফিরে আসে ইতিহাস। কখনো বিয়োগান্ত ঘটনা হিসেবে। আবার কখনো প্রহসনরূপে!
Profile Image for Sharmin Sultana  Shamoly.
89 reviews23 followers
April 12, 2023
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তান আমলে দুই পাকিস্তানের রাজনীতি বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব, ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ ভুট্টো, জীবনী সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের জন্য অবশ্য পাঠ্য বই।
Profile Image for Sanowar Hossain.
282 reviews25 followers
January 15, 2026
জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও সময়ের ব্যবধানে শাসকগোষ্ঠীর ভুল সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার রাজনীতির কারণে এই তত্ত্বের ব্যর্থতা জনগণের সামনে ধরা দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সাহিত্যে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড ও তাদের রাজনৈতিক কর্মধারা যতখানি আলোচিত হয়; পশ্চিম পাকিস্তানের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উপর মুষ্টিমেয় ব্যক্তিবর্গের অন্যায় শাসন ঠিক ততখানি কম আলোচিত। পাকিস্তানের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত চরিত্র জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আমরা সাধারণত ১৯৭০-৭১ সালের প্রেক্ষাপটেই জানতে পারি। অথচ তিনি কেবল ১৯৭০-৭১ সালেই নয়, তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়েও পাকিস্তানের রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রে সক্রিয় ছিলেন। তাই ভুট্টো আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছেন।

অবিভক্ত ভারতের বোম্বে প্রেসিডেন্সির সিন্ধুর লারকানায় জুলফিকার আলী ভুট্টো একটি সামন্ত ভূস্বামী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভুট্টো গোত্র তৎকালীন সমাজে কুলীন হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয় নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তার বাবা বোম্বে চলে গিয়েছিলেন। বাবার সেই রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও গ্লানি পরবর্তী জীবনে ভুট্টোর ব্যক্তিত্বে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মা ছিল ধর্মান্তরিত মুসলিম। ফলে তার চিন্তা চেতনায় ধর্মীয় আভিজাত্যের দিক থেকে হীনমন্যতা কাজ করতো। অথচ তিনি ছিলেন অহংকারী ও দৃঢ়চেতা একজন রাজনীতিক, যিনি যেকোনো মূল্যে নিজের লক্ষ্য অর্জনে আগ্রহী ছিলেন। অথচ এই অর্জনসমূহ ভুট্টোর রাজনৈতিক জীবনে দ্বিমুখী কর্মকান্ডের পরিচয় বহন করে।

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তানের দুই অংশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রায়ে গঠিত সরকারকে সামরিক শাসকরা বেশিদিন টিকতে দেয়নি। ইস্কান্দার মির্জার সামরিক আইন জারি এবং পরবর্তীতে আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবসান ঘটে। এই সময় পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভুট্টো একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ভুট্টোর পিতার সাথে ইস্কান্দার মির্জা ও আইয়ুব খানের পূর্ব সম্পর্কের জেরে ভুট্টো খুব সহজেই ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন।

ভুট্টো ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক, যিনি প্রয়োজনে কাউকে ক্ষমতার শীর্ষে তুলে আবার সেখান থেকে সরিয়ে দিতেও দ্বিধা করতেন না। আই��়ুব খানের আমলে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে তিনি আইয়ুব খানের পক্ষে সক্রিয় প্রচারণা চালান। কিন্তু নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকে অনেক বিশ্লেষক ভুট্টোর প্ররোচনার ফল বলে মনে করেন। পরবর্তীতে আবার তাকেই আমরা আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যতম মুখ হিসেবে দেখতে পাই। ১৯৬৬ সালে আওয়ামীলীগের ছয় দফা দাবিকে ভুট্টো বিচ্ছিন্নতাবাদ হিসেবে আখ্যা দেন, অথচ ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান যে কার্যত অরক্ষিত ছিল; সে বিষয়টি তিনি উপেক্ষা করেন। এই সময়ে আইয়ুবের সামরিক শাসনের বিরোধিতার মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক পথ নির্ধারণ করে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) গঠন করেন।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির মূল আদর্শ ছিল ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’। বাস্তবে দেখা যায়, ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে দলটি পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চলে ব্যাপক সমর্থন পেলেও দরিদ্র ও বঞ্চিত বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। অথচ সিন্ধু ও পাঞ্জাব ছিল সামন্ত প্রভুদের এলাকা। দল গঠনে তিনি যে দুইজন ব্যক্তিদের উপর বেশি নির্ভরশীল ছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের। অথচ পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দেখা যায় পূর্ব পাকিস্তানের কোনো আসনে পিপিপি প্রার্থী নেই। ব্যক্তিগত জীবনে ভুট্টো ছিলেন কর্তৃত্বপরায়ণ ও বিতর্কিত চরিত্রের অধিকারী, যা তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করেছে।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছয় দফা যেমন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল, ভুট্টোর তেমন সুসংহত কর্মসূচি ছিল না। তিনি মূলত পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যক্তিগত প্রভাব ও দলীয় সংগঠনের মাধ্যমে জয়লাভ করেন। তবে পশ্চিম পাকিস্তানের সবগুলো প্রদেশে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেনি। এমনকি ভুট্টো যে ছয়টি আসনে নির্বাচন করেন, তার একটিতে হারতেও হয় তাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেছনে ভুট্টোর নেতিবাচক ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ভুট্টোর উসকানিতে অধিবেশন স্থগিত করা হয় এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পূর্ব পাকিস্তানে আসতে হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যাকে অস্বীকার করে গেছেন বারবার। কারন স্বীকার করলেই বিচারের প্রশ্ন সামনে চলে আসবে; যা ভুট্টো চান নি।

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের পূর্বে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার সময় ভুট্টো খসড়া প্রস্তাব ছিঁড়ে ফেলে বেরিয়ে যান, যা মূলত তার ব্যক্তিত্ব ও ক্ষমতালিপ্সার বহিঃপ্রকাশ ছিল। অথচ ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণকে তিনি অপমানজনক বলে মনে করেননি। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, ক্ষমতার প্রশ্নে তিনি দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকেও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। ফলশ্রুতিতে ইয়াহিয়া খানের হাতে ভুট্টোর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর ভিন্ন পথ ছিল না। অন্যদিকে ভুট্টো দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে এতটাই বদ্ধপরিকর ছিলেন যে দেশের অর্ধেক অংশের বিনিময়েও সেই দাবিতে অনড়।

মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি বাহিনীর অপরাধের বিচার না হওয়ার পেছনেও ভুট্টোর ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের ব্যবহার করে তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা মূলত পশ্চিম পাকিস্তানেরই লাভ নিশ্চিত করে। এই চুক্তিতে পাকিস্তান ছিল পরাজিত পক্ষ। অথচ চুক্তির ফলাফল দেখলে পাকিস্তানকে বিজয়ী পক্ষ বলেই ভ্রম হয়। এই ক্ষেত্রে ভারতের নমনীয়তা এবং মুসলিম দেশগুলোর কাছে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের ছাড় দেওয়াই প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভুট্টোর উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে সংবিধান প্রণয়ন, সিমলা চুক্তি ও যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তন এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সূচনা। তবে একইসাথে তার শাসনামলে বিরোধী দল দমন, অপশাসন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ফলে দেশে ও বিদেশে বহু শত্রু সৃষ্টি হয়। এমনকি সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে তাদের রোষানলে পড়েন। ১৯৭৭ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর সৃষ্ট আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান জিয়াউল হক ক্ষমতা দখল করেন এবং ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করে শেষ পর্যন্ত হত্যা মামলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। অথচ জিয়াউল হককে ভুট্টো নিয়োগ দিয়েছিলেন টিক্কা খানের অসম্মতি উপেক্ষা করে। অথচ জিয়াউল হক বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অনুরোধ উপেক্ষা করেই ভুট্টোর ফাঁসি কার্যকর করেন। কারন তিনি ভুট্টোর জনপ্রিয়তায় ভীত ছিলেন। ভুট্টো শুধু বিরোধী দল নয় বরং নিজ দলের মধ্যেও বিরোধী মতকে কঠোরভাবে দমন করেছেন। আমরা দেখতে পাই পিপিপির প্রতিষ্ঠাকালীন দুই তাত্ত্বিক জালালুদ্দিন আব্দুর রহিম এবং ড. মুবাশ্বির হাসান বিরোধী মত উপস্থাপন করায় প্রথমে দল থেকে বহিষ্কৃত এবং পরবর্তীতে পুলিশের দ্বারা লাঞ্ছিত হন। পাকিস্তানের আত্মসমর্পনের ৪ দিন পরই ভুট্টোর পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার যে প্রক্রিয়া সেখানে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থদের সমর্থন ছিল। অথচ ক্ষমতা গ্রহণ করেই তাদের পদচ্যুত করা হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে কিছু আশ্চর্য মিল দেখা যায়। উভয়েই পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে নিজ অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তবে উভয়ের শাসনামলেই গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়, যার সুযোগ নিয়ে সামরিক শক্তি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। আমরা দেখেছি উভয়েরই রাজনৈতিক সহযোগী যারাই বিরোধী মত লালন করেছে তাদের দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে যারা এদের আশেপাশে ছিলেন, পতনের সময় তাদেরই কুশীলব হিসেবে দেখা যায়। উভয় ব্যক্তিই ক্ষমতায় থাকাকালীন নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতার মেয়াদ বৃদ্ধি করেছিলেন। তবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত জনগণের বিপরীতে যাওয়া শুরু হলে জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় এবং ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। তবে তাদের কিছুই করার ছিল না। অবশেষে ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়। তবে এই দুই রাজনীতিকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অমিল হলো একজন ছিল একাত্তরের গণহত্যার পক্ষে এবং অন্যজন তার বিপরীত প্রান্তে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ হয়েও পাকিস্তানে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যর্থ হন। এর ফলশ্রুতিতে তার মৃত্যুর পরও পাকিস্তানের রাজনীতি দীর্ঘদিন অস্থির থাকে। জিয়াউল হকের শাসনামলে স্ত্রী নুসরাত ভুট্টো এবং কন্যা বেনজীর ভুট্টো পিপিপির হাল ধরেন। ভুট্টোর দুই পুত্র এবং কন্যা রাজনীতির মাঠেই নিহত হয়েছেন। বেনজির ভুট্টো দু’দফা প্রধানমন্ত্রী হলেও পাকিস্তান পিপলস পার্টি ধীরে ধীরে প্রভাব হারায়। বর্তমানে দলটি পাকিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে, যা ভুট্টোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উত্তরাধিকারের সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।

ভুট্টোর সাথে আমাদের পরিচয় হয় একাডেমিক বইতে পাকিস্তান ভাঙনের চূড়ান্ত সময়ের ইতিহাস পাঠকালে। তবে তিনি যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যত নির্মাণের কুশীলবদের অন্যতম ছিলেন তা পাঠ করা হয় না। পাকিস্তানের প্রথম ও দ্বিতীয় সামরিক শাসনের সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন। ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে তিনি যেমন সামরিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন, তেমনই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বেলুচিস্তানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। অথচ তাকে আমরা চিনি একজন গণতান্ত্রিক রাজনীতিক হিসেবেই।
আলতাফ পারভেজের লেখায় দক্ষিণ এশিয়ার কুলীন এক সমাজের রাজনীতির পাঠ উঠে এসেছে। বইটি ভুট্টোকেন্দ্রিক হলেও প্রাসঙ্গিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকবদলের সন্ধান পাওয়া যায়। বইটিতে দীর্ঘ এক সময়ের ঘটনাবলী এবং বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। বইটির নেতিবাচক দিক বলতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘটনার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। এছাড়া শেষদিকে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে যবনিকাপাত ঘটেছে বলে মনে হয়েছে। নির্মোহভাবে কোনো রাজনীতিকের জীবনী রচনা জটিল এক কাজ এবং সেটা সুলেখক আলতাফ পারভেজ সফলতার সাথেই সমাপ্ত করেছেন বলে মনে করি। হ্যাপি রিডিং।
Profile Image for Wreet Sarker.
51 reviews49 followers
October 17, 2024
অস্বীকার করবো না, ভুট্টোর সম্বন্ধে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব নিয়েই বইটা পড়া শুরু করি। বইটা শেষ করার পর যে তার সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা ইতিবাচক হয়ে গেছে তাও না। তবে বাংলাদেশের এবং তদুপরি পাকিস্তানের ইতিহাসের এক আলোচিত নেতাকে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ হলো এই বইয়ের মাধ্যমে। বইটা পড়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো একাত্তর পূর্ব ও পরবর্তী পাকিস্তানের অবস্থা পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা।

ভুট্টোর উত্থান আইয়ুব ও ইস্কান্দার মির্জার হাত ধরে। পারিবারিক সূত্রে ভুট্টোর বাবা শাহনওয়াজ খানের সাথে তাদের খাতির ছিলো। লারকানায় ভুট্টদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন ইস্কান্দার মির্জা। পরে আইয়ুব ও নিয়মিত মুখ হন এখানে।

ভুট্টো ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে যাওয়ার জন্য আইয়ুব ও ইয়াহিয়া দুজনকেই ব্যবহার করেছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছেন আইয়ুব খানের সহায়তাতেই। পরে এই আইয়ুবকেই উষ্কে দিয়েছেন ৬৫ তে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। যুদ্ধে পাকিস্তানের নৈতিক পরাজয় হলে এই দায় সম্পূর্ণ আইয়ুবের উপর চাপিয়ে নিজের ইমেজ পরিষ্কার করেছেন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিলো ভুট্টার বিতর্কিত ভূমিকা। গোপনে অপারেশন সার্চলাইটের মদদ দিয়েছেন। ২৬শে মার্চ ভোরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শুরুটা দেখে সকালে পাকিস্তান পৌঁছে বলেছেন - 'খোদার কৃপা, পাকিস্তান রক্ষা পেলো'।

যুদ্ধের একদম শেষ পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিষদে তাঁর আলোচিত ভাষণ মূলত ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মন জয় করা। ৪৬৭৮ শব্দ ও ২৮৮ বাক্যের এই ভাষণের শব্দচয়ন ও গাঁথুনি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি পাকিস্তানের শ্রোতাদের কাছে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। ভাষণে 'পাকিস্তান' শব্দটির চেয়েও 'আমি' শব্দটি বেশি এসেছে। পাকিস্তান শব্দটি এসেছে ৫৫ বার কিন্তু আমি শব্দটি এসেছে ৮৮ বার।

৭১ পরবর্তী পাকিস্তানের অবস্থাও জানা যায় - ভুট্টোর সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, শিল্প ও কৃষি সংস্কার, বিখ্যাত ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে যাওয়া, কৃষি জমি উদ্ধার। তবে ভূমি সংস্কারে তিনি সামরিক কর্মকর্তাদের ছাড় দেন। ছাড়ের কারণ হিসেবে বলেন তারা এই ভূমির নিরাপত্তাদাতা! ৭৩ এ পাকিস্তানে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এর পরই বেলুচিস্তান ও পাখতুনিস্তান এর পৃথক হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। বেলুচদের নিয়ন্ত্রণ করতে ভুট্টো বেলুচিস্তানে পাঠান ৭১ এ বাংলাদেশে গণহত্যায় নেতৃত্বদানকারী টিক্কা খানকে আর পাখতুনদের নিয়ন্ত্রণ করতে আফগান ইসলামপন্থীদের পাকিস্তানে গোপন আস্তানা তৈরিতে সাহায্যের হাত বাড়ান। এই 'প্রকল্পের' মধ্য দিয়ে তৈরি মুজাহিদীনরাই ১৯৭৯ সালে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে নেমেছিলো যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। এক অর্থে তালেবান শাসকদের প্রাথমিক বীজ পাখতুন জনপদে ভুট্টোর হাতেই রোপিত।

সংবিধান সংশোধন এর মাধ্যমে সংঘ গঠনের অধিকার নিয়ন্ত্রণ, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা খর্ব, মানুষকে আটকে বিভিন্ন বাহিনীকে অধিক ক্ষমতা দেওয়া এবং রাজনৈতিক বন্দীদের জামিন দেওয়ার অধিকার হাইকোর্ট থেকে কেড়ে নেওয়া ছিলো তাঁর আরও কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। সংবিধানের অনেক গুলো সংশোধনীর মাধ্যমে প্রায় তিরিশটি অনুচ্ছেদ কাটাছেঁড়া করেও ভুট্টো তাঁর রাজনৈতিক করুণ পরিণতি ঠেকাতে পারেননি।

সেনাবাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করতে ভুট্টো গঠন করেছিলেন এফএসএফ(ফেডেরাল সিকিউরিটি ফোর্স)। এটা ছিলো অনেকটা ভুট্টোর পেটোয়া বাহিনীর মতো। এই বাহিনী ভুট্টো মূলত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বন্দী ও দমনপীড়নে ব্যবহার করতেন।

১৯৭২ এর সিমলা চুক্তিতে অংশ নেওয়া পাকিস্তান ছিলো পরাজিত পক্ষের। কিন্তু সিমলা চুক্তির ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় চুক্তির লাভবান পক্ষ তারাই। অপরদিকে চুক্তিতে না থেকেও বাহ্যত ক্ষতি হয় বাংলাদেশের। সিমলা চুক্তিতে পাকিস্তানকে ছাড় দেওয়ার পক্ষে ভারতের চিন্তা এই ছিলো যে, চুক্তির ফলে ভুট্টোকে শান্ত করা যাবে এবং ভারতের পশ্চিম অংশেও শান্তি আসবে(সামরিক শক্তির বদলে গণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় থাকবে)। ভুট্টোর বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান এর শন্কা কমানোর জন্যও এই ছাড় দেওয়া যৌক্তিক মনে করেছিলো ভারত। কিন্তু এই ছাড় দেওয়ার ফলস্বরূপ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের ছেড়ে দেওয়া হয় যাদের আর বিচার করা সম্ভব হয়নি। ভুট্টোর জন্য ছিলো এটা বিশাল এক জয় যা সম্ভব হয়েছিলো ভারতের নমনীয়তার কারণেই।

ব্যক্তি ভুট্টো একজন চরম অহংকারী, আত্মশ্লাঘায় ভোগা মানুষ ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দল পিপিপি কে সাংগঠনিক ভাবে শক্তিশালী না করে নিজের ইমেজ বৃদ্ধিতেই সচেষ্ট ছিলেন তিনি। আর দলকে পরিচালনায় নিজের ইমেজকেই বেশি ব্যবহার করেছেন। কর্তৃত্ববাদী মনোভাব ছিলো তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর ভাষায় - 'আমিই পিপলস পার্টি'।

৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথক হওয়া পাকিস্তানের অবস্থা ৭৯ সাল অবধি কেমন ছিলো তা জানার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস বইটি।
Profile Image for Rifat Rohan.
17 reviews
April 6, 2024
একটি অসাধারণ রাজনৈতিক জীবনী। লেখক ভুট্টোর চরিত্রকে অত্যন্ত নির্মোহ ভাবে তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে। থেকেছেন চরম নিরপেক্ষ।

একজন চতুর ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদের জীবনে ঘটে যাওয়া সকল উত্থান পতনের সাথে সাথে চিত্রায়িত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক চিত্র। পারিবারিক আবর্তে রাজনৈতিক দল গুলোর আদর্শিক দৈন্যতা।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো একজন অন্যতম চরিত্র। খুব সম্ভবত জিন্নাহ্'র চাইতেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক শাসকদের থেকে ক্ষমতা বের করেছেন তারপর নিজেই হয়ে উঠেছেন একজন 'বেসামরিক সেনা প্রশাসক'। নিজের ক্ষমতায়নের জন্য তিনি দেশকে দুই ভাগ করতেও রাজি ছিলেন।

আবার নিজদলের উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ���ড়াও হয়েছেন নিজ সহযোগীদের উপর। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। যিনি সমগ্র পাকিস্তানের শ্রমজীবী মানুষকে তার প্রতি মুগ্ধতায় জড়াতে পেরেছেন। কখনো তিনি নিজেকে করেছেন একজন মাওলানার সমতুল্য। কখনো করেছেন একজন সমাজতান্ত্রিক নায়ক।

চতুর এই রাজনীতিবিদ ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত। ৭১ পরবর্তী পরাজিত পাকিস্তানিদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে তিনি যে গেম খেলেছেন, তাতে মুজিব-ইন্দিরা-ভুট্টো চক্রে তিনিই জয়ী।

সেই সাথে পাকিস্তানকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেই একটি পারমানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করার বাসনা সত্যি সাহসী পদক্ষেপ বলা যায়। যে বাসনা তার মৃত্যু কে ত্বরান্বিত করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে বের হয়ে সোভিয়েতের সাথে বিভিন্ন চুক্তি তার রাজনৈতিক সৃজনশীলতার প্রমাণ। সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সাথে তার বন্ধুত্ব তার অভিজাত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

তবে ভুট্টো শেষের দিকে রাজনৈতিক বন্ধুহীনতার কারনেই হোক কিংবা নিজের অস্থিরতার কারনেই হোক নিজেকে শেষ রক্ষা করতে পারেননি। তবে এখানে বিশ্বাসঘাতকদের ও অনেক দায় আছে।

লেখক আলতাফ পারভেজ এর এই বইটিই আমার প্রথম পড়া। এই বইটি পড়েই আমি তার ভক্ত হয়ে গেছি। সত্যি বলতে লেখককে নিয়ে আলোচনা কমই হয়। যতটা তাঁর সমসাময়িক অন্যদের নিয়ে হয়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এই মূহুর্তে ইতিহাস নিয়ে যারা লেখেন তাদের মধ্যে তিনি সর্বাগ্রে।
Profile Image for Neela.
83 reviews57 followers
March 5, 2023
২০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাস পর বিখ্যাত ইটালিয়ান সাংবাদিক ওরিয়ানা ফাল্লাচি কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, "আমি নারীদের সম্মান করি, নারীদের সম্মান ও সুরক্ষা দেয়া নবী (সা:) এর গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা। আমি যদি জানতাম বা নিশ্চিত হতে পারতাম যে আমাদের সৈনিকেরা সত্যি সত্যি বাংলাদেশে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংস আচরণ করেছে তাহলে আমি ঐ সৈনিকদের অবশ্যই সাজা দিতাম"।
আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ১৯৭০ এর নির্বাচনে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের পরে ভুট্টোর পিপলস পার্টিই সবেচেয়ে বেশী ভোট পেয়েছিলো, ৩৮% ভোট পেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় ভুট্টোর দল। ৭০ এর নির্বাচনের পূর্বে দীর্ঘসময় পাকিস্তানের শাসনযন্ত্রে মন্ত্রী ও স্পীকারের দায়িত্ব পালন করে, আইয়ুব খানের সরকারে সাথে দীর্ঘ ৮ বছর কাজ করে, ইয়াহিয়া সরকারের প্রিয়ভাজন হওয়া সত্ত্বেও ভুট্টো না কি জানতেন না ইয়াহিয়ার সেনারা বাংলাদেশে কী নির্মম সহিংসতা করেছিলো!
এক সামন্ত ভূ-স্বামী পরিবার থেকে উঠে এসে পাকিস্তানের কুলীন রাজনীতিতে দারুণ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলো ভুট্টো ও তার পরবর্তী প্রজন্ম। কিভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর আছে এই বইতে। ভুট্টোর পারিবারিক ইতিহাস, শিক্ষা, পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে জায়গা করে নেয়া, ভুট্টোর জীবনে প্রেম ভালোবাসা, নারী ঘটিত স্ক্যান্ডাল, তাঁর স্ত্রী নুসরাত ভুট্টো ও কন্যা বেনজীর ভুট্টোর নানা বিষয় নিয়ে এই বইয়ে আলোচনা হয়েছে।
দীর্ঘ ৮ বছর আইয়ুবের সামরিক শাসনের ছায়াতলে থেকে কিভাবে তিলে তিলে সে আলাদা রাজনৈতিক দল গঠন করে ফেললো, এই বিষয়ে ভুট্টোর বুদ্ধিমত্তা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার (বাংলাদেশের সাথে তাঁর রাজনৈতিক ইতিহাস যাই থাকুক না কেন)।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে আগ্রহীদের জন্য এটি দারুন সুখপাঠ্য একটি বই হবে বলে আমার বিশ্বাস। লেখক এই বই লিখতে গিয়ে যে কঠিন গবেষণা করেছেন তাও নি:সন্দেহে প্রশংসনীয়।
Displaying 1 - 8 of 8 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.