কলকাতা শহর থেকে বহুদূরে জলঙ্গী নদীর পাড়ে শ্মশান সংলগ্ন এক অনাথ আশ্রম । চূর্ণী, সোহম আর মল্লার গিয়ে হাজির হয় তমসাময়ের সেই অনাথ আশ্রমে । শান্ত নিরিবিলি সেই আশ্রমে রাত নামলেই এক অপার্থিব পরিবেশ ! কালো হয়ে ওঠে জলঙ্গীর জল, শ্মশানের দিক থেকে অপার্থিব উল্লাসে ডেকে ওঠে শিয়ালের দল, আশ্রমের মাথার ওপর দিয়ে ডানা ঝাপটাতে-ঝাপটাতে উড়ে যায় বাদুড়ের দল, ঘন কুয়াশায় অদৃশ্য হয়ে যায় চরাচর! ঠিক সেইসময় কারা যেন হেঁটে চলে জলঙ্গীর অন্ধকারে । কী সেই অন্ধকারের রহস্য ? কলকাতার শ্মশানগুলোতেও ইদানীং মধ্য রাতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে এক রহস্যময় আগন্তুককে । চিতাকাঠ থেকে কী যেন খুঁজে ফেরে সে । দ্বারকেশ্বরের তট থেকে জলঙ্গীর পাড় হয়ে কলকাতা শহর, এক অদৃশ্য অপার্থিব ঘটনা যেন সবার অলক্ষ্যে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তিন বন্ধুকে । তারপর ?...হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তর লেখা ভয়াল অন্ধকারের কাহিনি—জলঙ্গীর অন্ধকারে ।
ভূত অতিপ্রাকৃতিক গল্প উপন্যাস এ এখন বাংলা বইয়ের বাজার ভোরে গেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু কিশোর পাঠক দের কথা মাথায় রেখে লেখা হয়। সেই তুলনায় প্রাপ্তবয়স্কহ পাঠক দের জন্য ভালো ভৌতিক উপন্যাস কম লেখা হয়। যদিও ইংরেজি সাহিত্যে স্টিফেন কিং প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক দের জন্য ভৌতিক উপন্যাস লিখে কিংবদন্তিদের স্থান গ্রহণ করে নিয়েছে। জলঙ্গীর অন্ধকারে উপন্যাস টি এই শুন্য স্থান তা অনেক খানি পূর্ণ করতে পেরেছে। জলঙ্গি নদীর পারে এক অনাথ আশ্রম ,তার সংলগ্ন শ্মশান, শ্মশানএর অন্ধকার , তন্ত্র সব কিছু নিয়ে লেখক এক ভয়াল, গা ছমে ছম ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছেন ,মধ্যরাতে পাড়ার সময় বেশ ভয়ে লেগেছিলো বলতে আপত্তি নেই। এই উপন্যাস এ একটা unique কনসেপ্ট নিয়ে বলা আছে , যেটা নিয়ে আমি অনেক English Webseries দেখলেও কোনোদিন বাংলা বইতে পড়ি নি, কি সেটা জানতে হলে পড়তে হবে এই দ্রুতগামী সুখপাঠ্য ভৌতিক উপন্যাস।
কুলকুণ্ডলিনী শক্তি বা শিবশক্তিই হল ‘মদ’ আর শিবই হলেন ‘মাংস’ আর স্বয়ং ভৈরবই হলেন সেগুলোর ভোক্তা। শিব ও শক্তি যখন মিলিত হন তখন যে আনন্দের উৎপত্তি হয় সেটার নামই হল ‘মোক্ষ’। সেই আনন্দই ব্রহ্ম, সেই আনন্দই মোক্ষ। ‘সাংখ্যদর্শনের’ মত তন্ত্রও সেই একই কথা বলেছে। প্রকৃতি ও পুরুষ; শক্তি ও জড় - এই দুয়ের মিলনে হল বিশ্বসৃষ্টি। শক্তি ও জড়ের এই মিলনজাত আনন্দই হল ‘ব্রহ্ম’। এই আনন্দের মধ্যে মানুষ জন্মেছে, আর তারই মধ্যে বেঁচেও রয়েছে এবং সেই আনন্দ সাগরেই মানুষ লয়ও পাবে। উপনিষদের কথাও তাই। 🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂
১৯৭৭ সাল। কোলকাতার হাতিবাগানের তান্ত্রিকাচার্য মনসারাম ভট্টাচার্য্য জ্যোতিঃশাস্ত্রী ওভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তীব্র সমালোচনা করেছিলেন অন্যান্য আচারভুক্ত বিভিন্ন তান্ত্রিক বা তন্ত্র-সাধকদের ক্রিয়াকলাপের। ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘ওরা ব্যভিচারী। ভূত-প্রেত-পিশাচের দল।’
সব শুনে হো হো করে হেসেছিলেন কালীঘাটের কালী মন্দিরের কাছে আস্তানা নেওয়া রামপুরহাটের কালীকৃষ্ণ বাবা। বলেছিলেন, “ঠিকই তো, আমরা স্বয়ং শিবের সাক্ষাৎ ভূতপ্রেত তো বটেই! শ্মশানে-মশানে ঘুরি, আর ওই পঞ্চতত্ত্বই বলুন আর পঞ্চমকারই বলুন, আমরা ওতেই শক্তিসাধনা করি। আমরাও অভীষ্টে পৌঁছুই, আমরাও সিদ্ধিলাভ করি।” 🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂
সাহিত্যিক হিমাদ্রি কিশোরের জলঙ্গীর অন্ধকারে উপন্যাসটি সম্পর্কে বিশ্লেষিত আলোচনা শুরু করতে হলে উপরোক্ত লেখাগুলির বিস্তারিত জ্ঞান থাকা অবশ্য প্রয়োজন, কারণ নাহলে আপাত পাঠকের দৃষ্টিতে এই উপন্যাসের কাহিনী আপনাদের কাছে নিছক কাল্পনিক কাহিনী হয়েই থেকে যাবে। মৃতদেহ নিয়ে তন্ত্রসাধনা আমাদের দেশে বহু প্রাচীন কাল থেকে হয়ে আসছে... আর শুধু আমাদের দেশই বা কেন বলি? সূদুর আফ্রিকা বহু আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামসহ তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে আজও এই সাধনা বিদ্যমান। 🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂 গল্পের মূল বিষয়বস্তু আবর্তিত হয়েছে কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে কৃষ্ণনগর ছাড়িয়ে মুর্শিদাবাদ লাগোয়া জলঙ্গী নদী তীরবর্তী একটি অনাথ আশ্রমকে ঘিরে... সেই আশ্রম পরিচালনা করেন তমসাময় শাস্ত্রী নামে একজন তন্ত্রসাধক এবং তাঁর সহকারী বুনো... সেই আশ্রমে নিজেদের উপার্জিত কিছু অর্থ সাহায্য স্বরূপ তুলে দেওয়ার জন্য একদিন উপস্থিত হন কলকাতায় বসবাসকারী তিন বন্ধু... সোহম, মল্লার এবং চুর্নী... যেহেতু নিজেরাও তারা অনাথ তাই এই আশ্রমের অনাথ শিশুদের কিছু সাহায্য করে ওদের একটা সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তোলার জন্যই তাদের এই পদক্ষেপ... বাচ্চাগুলোকে একদিন একটু ভালো খাবার খেতে দেবে বলে তারা কাছেই গঞ্জে যায় মাংস কেনার উদ্দেশ্যে... সেখানে তাদের পরিচয় হয় নদী বিশেষজ্ঞ খাস্তগীরের সঙ্গে... কে ইনি??? কেনই বা তিনি মল্লারদের ক্রমাগত ফলো করে চলেন শহর পর্যন্ত??? আর এই আশ্রম থেকে ফেরার পর সোহম মল্লার এবং চুর্নীর জীবনটাই বা এমন এলোমেলো হয়ে গেলো কেন?? খবরের কাগজে হঠাৎই যে অজ্ঞাতনামা মানুষটিকে শ্মশানে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়... কি তার পরিচয়?? সেই কি পৌঁছে দেবে মল্লারদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তরের দিকে?? তমসাময় শাস্ত্রীর "নবজীবন আশ্রম" আপনাদের এই সমস্ত প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তরপত্র নিয়ে অপেক্ষা করছে অধীর আগ্রহে... সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই তাহলে পৌঁছে যান ঐ আশ্রমে... কথা দিলাম এই উপন্যাস আপনাকে ভূত, প্রেত ছাড়াও বাস্তব পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে শরীরময় হিমশীতল বাতাস অনুভব করতে বাধ্য করবে।
পড়ুন সমৃদ্ধ হন মুগ্ধ হয়ে বাকিদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন।