নয়ের দশকের শেষভাগ, সহস্রাব্দের শুরু । ঠিক এরকম সময়ে ছোটো এক মফস্বল শহর অলীকপুরের মানুষদের মনেও লেগেছিল ওয়াই টু কের আঁচ । বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলাচ্ছিল, জীবনশৈলী বদলাচ্ছিল, বদলে যাচ্ছিল সামাজিক মূল্যবোধ । রাজনৈতিক পটভূমিও বদলাচ্ছিল চুপিসারে । তবু পুরোনো সহস্রাব্দের মায়াটুকু তখনও সস্নেহে ঘিরে ছিল অলীকপুরকে । তখনও ল্যান্ডফোন, লাল ডাকবাক্স, অডিয়ো ক্যাসেট, আর্চিস গ্যালারিতে মজে ছিল একটা গোটা তরুণ প্রজন্ম । পাড়ার মানুষ ছিল আত্মার আত্মীয় । সমাজমাধ্যমহীন জীবনে প্রেম আসত নিভৃতে । তখনও দ্বিধা থরোথরো আবেগ ছিল, প্রেমে ছিল নীরবতা । জীবনের গতি তখনও আজকের মতো এত দ্রুত হয়ে যায়নি । আর ঠিক সেই সময় দিয়ে বড়ো হয়ে উঠছিল দুটি মেয়ে, রুম্পি ও দেবযানী । কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নিজেদের বদলে যেতে দেখছিল ধীরে ধীরে । রুম্পির বয়ানে বয়ে চলা এই কাহিনি সেই সম্পর্কের কথা বলে, সেই সময়ের এই কাহিনি শোনায় । অলীকপুরের এই কাহিনি আসলে সেই সম্পর্কের; বন্ধুত্ব, নির্ভরতা, বিশ্বাসের ভাঙা-গড়ার । আর ! এ এক মিঠে প্রেমের গল্প । দুই দশকেরও বেশি সময় পুরোনো সময়কে ছোটো ছোটো ফ্রেমের কোলাজ গেঁথে তোলা হয়েছে সযত্নে । রম্য গদ্যের ছলে বুনে যাওয়া বারোটি পর্বের এক আশ্চর্য জার্নাল 'অলীকপুর ক্রনিকলস'....
সোমজা দাসের জন্ম উত্তরবঙ্গের জেলাশহর কোচবিহারে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা সেই শৈশব থেকে। জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন এবং কলকাতায় একটি বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মজীবন শুরু করেন। লেখকের এখন অবধি প্রকাশিত একক বইগুলি হল ‘এক কুড়ি পাঁচ গল্প’, ‘টাপুরদির গোয়েন্দাগিরি’, ‘কৃষ্ণগহ্বর’ ও ‘নিকষিত হেম’, ‘কাল-কূট’ ও ‘মৃতেরা কোথাও নেই’। আনন্দবাজার এছাড়াও পত্রিকা, আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, বর্তমান পত্রিকা, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, গৃহশোভা ও আরও অনেক পত্রপত্রিকা ও গল্প সংকলনে লিখেছেন এবং লিখছেন। লেখালেখি ছাড়াও প্রচুর পড়তে ভালোবাসেন তিনি। নিজেকে তিনি লেখকের চাইতে মগ্ন পাঠক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।
ভাবুন একদিন ঘরদোর পরিষ্কার করতে গিয়ে এক সেট ক্যাসেট খুঁজে পেলেন। পুরোনো দিনের গানের ক্যাসেট। এমন সব আদ্যিকালের দলিল যাদের অস্তিত্বের কথা একেবারে ভুলে মেরে দিয়েছিলেন। বা হয়তো এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ট্রান্সফারের সময় সেই যে মক্কেলেরা খোয়া গেসলো, হাজার চিরুনি তল্লাশিতেও হদিশ পাওয়া যায়নি আর। আন্টিল নাও।
আপনি তো মহা-খুশি। প্রফুল্ল-চিত্তে ধুলো-মাখা টেপ রেকর্ডারের ক্লান্ত অন্তরালে ক্যাসেটদ্বয় নিক্ষেপ করলেন সবেগে। এবং ফলাফল হলো বিপরীত। শ-এ শূন্য। মোক্ষম একখানি হার্টব্রেকের দোরগোড়ায় দাড়িয়ে আপনি শুনলেন যে ভূতের কেত্তন ন্যায় অশরীরী সঙ্গীতের দাপুটে, গান তো দুরস্ত, দুটো লাইনও বাইরে বেরোতে গিয়ে উঠোনে হোঁচট খেয়ে কাদা। আমার এই বই পড়ার অভিজ্ঞতাও কতকটা একই রকম। 'আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু, হায়-' মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, আমার সমস্ত এক্সপেক্টেশনেরা কোন এক লোকাল স্টেশনে ট্রেন ধরে পগার পার!
তবে বইটিকে নিয়ে খুব বেশি ঋণাত্মক মন্তব্য করতে ইচ্ছে করছে না আজ। ফাইনাল প্রোডাক্টের মান যেরমই হোক, লেখিকা নিজ-জীবনের অনেকখানি আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে অলীকপুরের এই ছবিটি এঁকেছেন। এই স্মৃতিকথার ওজন ঠিক ব্যক্তিগত ভালো লাগায় মাপা অনুচিত। স্রেফ লেখনশৈলীর কথা বাদ দিলে, বইতে ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের বেশ কটা ভালো অলংকরণ পাবেন। আর পাবেন অমন সুন্দর প্রচ্ছদটি। দেখতেই তো পাচ্ছেন। কেমন মিষ্টি গ্রিটিং কার্ডের মতন কভার-আর্ট। সুবিনয় দাশের নোবেল আটকায় কে?
তাই পরিবেশনায় অরণ্যমন যথাযথ। কটা বানান ভুল পেলাম বটে তবে ওটুকু অদেখা করাই যায়। বইটির ধরণ অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যাকেটে ধরতে যাওয়া বৃথা। কতকটা স্লাইস-অফ্-লাইফ ঘরানার স্মৃতিচারণা। বিচ্ছিন্ন চ্যাপ্টারে নস্টালজিয়ার সুবাস। ছেঁড়াছেঁড়া রম্য গদ্যে একটা গোটা উপন্যাস-সম ওয়েল পেন্টিং আঁকবার চেষ্টা। এই চেষ্টাটুকুর জন্যেই কুড়িয়ে বাড়িয়ে নম্বর দেওয়া যায়। কিছু গল্প সত্যিই মন ছুয়ে যায়। তবে ওগুলো আদ্যোপান্ত এক্সেপশন। রসায়ন পড়েননি? এক্সেপশনই নিয়ম।
আমি অবশ্য লেখিকার কলমের সাথে পূর্ব-পরিচিত ছিলাম না। খাপ খাওয়াতে অসুবিধে হলো বেশ। বিশেষত বইয়ের ফার্স্ট হাফে, যেখানে ওনার গল্প বলার ধরন বেজায় অবিন্যস্ত। স্মৃতির স্রোতে হাবুডুবু খেয়ে, এক গল্পের মাঝেই আরেক প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছেন ক্রমাগত। আবার গল্পের পর গল্প অধরা রেখে পুরোনো কাহিনীতে ফিরে গিয়েছেন বেশ কয়েকবার। এই ফড়িংবৃত্তির জন্য ক্রমাগত ক্ষমাও চেয়ে গিয়েছেন বই জুড়ে।
তাও যদি বুঝতাম সব ঘটনাতেই আসর জমানোর মেরিট রয়েছে। সবটাই, ফিফটি-ফিফটি। কোনোটা পড়ে হাসি পায় তো কোনোটায় বিরক্তি। চোখে লাগে একটা প্রচ্ছন্ন টোনাল শিফ্ট, যার ফলে তাল কেটে যায় বারংবার। একটি ফিল-গুড মেমোয়ার হিসেবে শুরু হয়েও বইটি একটি (মেলোড্রামাটিক) উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়ে শেষ হয়। এই কি ন্যারেটিভ গুছিয়ে ওঠার মাশুল? বলা দায়। কিন্তু এরূপ আইডেন্টিটি ক্রাইসিস শেষ কবে কোন বইতে পেয়েছি মনে পড়ে না...
সে যাই হোক, হয়তো আমারই দোষ। মন কেমনের বিকেলের এসব বইয়ের প্রতি মন টানে। এ জিনিস যে আমায় একশো-ভাগ সন্তুষ্ট করলো না এখানে বুঝি আমারই খামতি। উচ্চাশার দাম চুকোই আপাতত। লেখিকা উত্তরের মানুষ। কোচবিহারের আদি বাসিন্দা। আমার শহরে থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলেন কলেজ জীবনে। তাই কোথাও গিয়ে অলীকপুর নামক এই নাম না জানা বসতিটির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে মন চায়। যতই হোক, দিনশেষে, এই লাগামহীন স্বপ্ন-দেখাটা হিটস্ ক্লোজ টু হোম। সাবেকি কষ্ট পাওয়াটাও। পুরোদস্তুর।
সোমজা দাসের লেখা গোয়েন্দা গল্পগুলো নিয়ে ভালো ভালো কথা শুনে আসছি। সে জিনিস নাহয় ভবিষ্যতে পড়ে দেখবো'খন। আপাতত আসি।
সুবিনয় দাশের টুন-ধর্মী প্রচ্ছদ। চকচকে আর্টপ্লেটে ইনার কভার। পরিষ্কার মুদ্রণ, তবে ভূমিকা আর প্রথম দু'পাতার ছাপা একেবারে পাতা ফুঁড়ে বেরোনোয় অন্যদিকের লেখা পড়তে সমস্যা হয়েছে। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের একেবারে বস্-লেভেলের অলংকরণ। সহজ, সাবলীল লেখনীতে মফস্বলের প্রেম, পাড়া, ঝগড়া, ঝামেলা, টিন-এজ, রাজনীতি, প্রেম। পড়তে শুরু করলে প্রথম থেকে শুরু করে দ্বাদশ অধ্যায় অবধি দিব্যি পড়ে ফেলা যায়। 'সামাজিক' লেখাজোখার অভাব যাঁদের সাহিত্যবিমুখ করে তুলছে, তাঁরা এটি পড়ে দেখতে পারেন। আনন্দ পাবেন বলেই আমার ধারণা।
অলীকপুর ক্রনিকলস লিখেছেন সোমজা দাস। কোচবিহারের বাসিন্দা জলপাইগুড়ি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা সোমজা দেবী সম্প্রতি রহস্য রোমাঞ্চ গোয়েন্দা ইত্যাদি ঘরানায় বই লিখে বেশ পরিচিতি লাভ করেছেন। টুকটাক পত্রিকায় কয়েকটা লেখা পড়লেও আমি যদিও তাঁর আগের কোন বই পড়িনি।
অলীকপুর ক্রনিকলস একটা বন্ধুত্বের গল্প। মূল চরিত্র দুজন। লেখক রুমপি আর তার স্কুলের বন্ধু দেবযানী। গল্প শুরু হয় 1999 এর এপ্রিল মাসে এক বিয়েবাড়ি থেকে। 1999 এর এপ্রিল বা বৈশাখ থেকে 2000 সালের চৈত্র বা মার্চ/এপ্রিল পর্যন্ত। অলীকপুর ছোট শহর। সবাই প্রায় সবাইকে চেনে। সেখানে পাড়ার ছেলে মেয়ের মধ্যে প্রেম যে কী দুরূহ ব্যাপার সেটা আন্দাজ করা কঠিন না। এই এক বছরের গল্প বারোটা এপিসোডে ভাগ করা। বাংলা মাস অনুযায়ী একেকটা ঘটনার উল্লেখ।
বৈশাখ শুরু হয়েছিল বিয়ে বিভ্রাট দিয়ে। জৈষ্ঠ্য মানেই আবার নজরুল জয়ন্তী প্লাস জামাই ষষ্ঠী। পালিয়ে বিয়ে করা আরেক দম্পতির কী দশা পড়লে হাসতে হাসতে চোখে জল এসে যাবে। আষাঢ় মানেই বৃষ্টি। উত্তরবঙ্গের বৃষ্টি মানেই বন্যা। তার সঙ্গে এসেছে ছাতা ব্যবসায়ী সহদেব জ্যাঠা আর তার বন্ধু লাটু জ্যাঠার কথা।
শ্রাবণে বর্ষার মধ্যে প্রেম বিরহে নতুন চরিত্রের উদ্ভব হল। আসতে আসতে আসছে দো ফুল এক মালির গল্প। ওদিকে পড়তে পড়তে হালকা স্মরণজিৎ ফীলও লাগছে। ভাদ্র মানেই জন্মাষ্টমী আর অশ্বিন মানেই পুজো, কার্তিক হল দীপাবলি তাই গল্প নিজের মতো এগিয়েছে। অঘ্রাণ মাসে ওই শহরে রাসের মেলা হয়। কিন্তু হালকা করে রাজনীতি ঢোকাতে গিয়ে এখানটায় ঘেঁটে ফেলেছেন কিছুটা।
মাঘ ফাল্গুন চৈত্র হল গল্প মোড়ানোর পালা। বা বলা ভালো চিকেনরোলের কাগজ ছাড়াতে শেষ পর্যায়ে এসে গেছি, এখন দেখার শেষে একটা চিকেনের টুকরো পাওয়া যায় নাকি শুধুই শসা পেঁয়াজ কুচি। নাহ আর বলব না, তাহলে পুরো গল্পটাই বলা হয়ে যাবে।
পুরো লেখাটা আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে, বিশেষ করে শহরটাকে চিনি বলে আরো ভালো লাগসে বলা যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দের ঘটনাগুলো ঘোর বাস্তব। গল্পের প্রয়োজনেই নাম পদবি বদল হয়েছে। আরেকটু সময় দিয়ে যদি এক বছরের জায়গায় দু বছরের গল্প লিখতেন লেখক চব্বিশটা এপিসোডে। সত্যি বলছি আরো খোলতাই আর মাখো মাখো ব্যাপার হত। ম্যাডাম তো আই টি তে ছিলেন/ আছেন লিখেছেন। আশা করব এরপর জলপাইগুড়ি আর সেক্টর ফাইভ নিয়ে দুটো ফাটাফাটি উপন্যাস নামিয়ে দেবেন।
সুবিনয় দাশের প্রচ্ছদ এত ভালো লাগসে কী বলব। উনিশ কুড়ি মনে পড়িয়ে দেয়। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলঙ্করণ নিয়ে আর কী বলি। ব��াবরের মতোই দুর্দান্ত। অরণ্যমন থেকে প্রকাশিত হার্ড বাউন্ড বইয়ের দাম 225 টাকা। আমি 30% ছাড়ে কিনেছিলাম। লেখক অন্য ধারার লেখায় এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, তিনি যাতে আরো এরকম লেখা লেখেন তাই আমি চাই আমার মতো অন্যরকম লেখা খুঁজে চলা পাঠক বইটা কিনুন আর পড়ে ফেলুন।
অলীকপুর আসলে আমাদের মত ৯০' এর মেয়েদের আত্মজীবনী মনে হয়! দেবযানী রুম্পি এর জীবন আদতেই সেই ফেলে আসা সময়কে আবার ছুঁয়ে দেখতে সাহায্য করে! যে সময় প্রেম অপ্রেম, ছেড়ে আসা, ছেড়ে যাওয়া সবই ছিল, আর ছিল গ্রিটিংস কার্ড—অনুভূতিরা লেখায় ফুটে উঠত যেখানে। এই বই অনুভূতির রোলার কোস্টার রাইড যদি কিছু হয় তবে এই বই তাই! উপরি পাওনা হিসেবে বইয়ের সুন্দর প্রচ্ছদ আর প্রতি পার্ট এর শুরুতে এবং মাঝে বিভিন্ন পংক্তি!
আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে জন্মেছি বা বড় হয়েছি, আমাদের জীবন জুড়ে এখন শুধুই নস্টালজিয়া। তারের এন্টেনা, ঝিকঝিকে সাদা কালো টিভি থেকে আমাজন ফায়ারফক্স, Kodak Kb10 থেকে 4k অ্যাকশন ক্যামেরা - আমাদের চলার পথের হিসেব এই একটুকু।পিছন ফিরে দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয়, সেসব বোধহয় অন্য কোনো জন্মের কথা। এজীবনে এরকম কিছু ছিল না। আর আমাদের এই নস্টালজিয়া মাঝে মধ্যে উসকে দেয় কিছু বই। যেমন স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর লেখা। ঠিক সেই রকম অনুভূতির ছোঁয়া পাওয়া গেল সোমজা দাসের 'অলীকপুর ক্রনিকলস' থেকেও। আমি যদিও তাঁর আগের কোন বই পড়িনি।মূলত ইনস্টাগ্রামে কয়েকটি বুক রিভিউ দেখে এই বছরের বইমেলা থেকে বইটি কিনি। আর সত্যি কথা বলতে ছিমছাম এই গল্পটি আমার ভালো লেগেছে।
অলীকপুর ক্রনিকলস মূলত বন্ধুত্বের গল্প। সেই সঙ্গে তাতে জুড়েছে প্রেমের গল্প। যা তখন ল্যান্ডফোন, চিঠি লেখা, আর্চিজের কার্ড, টিউশানে এক ঝলক দেখার উপর নির্ভর ছিল। ঠিকানাবিহীন এইকাহিনীর মূল চরিত্র দুজন। লেখক রুম্পি আর তার স্কুলের বন্ধু দেবযানী।রুম্পির বয়ানেই, ডায়রিতে দিনলিপি লেখার মত করে এই বই লেখা হয়েছে। গল্প শুরু হয়েছে ১৯৯৯ সালের বৈশাখ মাসের এক বিয়েবাড়ি থেকে।আর শেষ হয়েছে ২০০০ সালের বৈশাখ মাসে। এ ই এক বছরের গল্প বারোটা এপিসোডে ভাগ করা। বাংলা মাস অনুযায়ী একেকটা ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।
গল্প শুরু হয় বৈশাখ মাসের এক বিয়ে বিভ্রাট দিয়ে। জৈষ্ঠ্য মাসের কাহিনীতে উঠে এসেছে নজরুল জয়ন্তী ও সেই সঙ্গে জামাই ষষ্ঠীর কিছু মজার কথা। আষাঢ় মানেই বৃষ্টি। আর বৃষ্টির সঙ্গে ওতঃপ্ৰোত ভাবে জড়িয়ে থাকা কিছু প্রেম। শ্রাবণের বারিধারার মধ্যে এল নতুন প্রেম।সাধাসিধে চলতে থাকা গল্পে এল নতুন টুইস্ট।
এরপর ভাদ্র মাস। আর ভাদ্র মানেই জন্মাষ্টমী। অলীকপুরে হত নাম সংকৃতন, বসতো মেলা। সেই মেলায় ঘটে যাওয়া এক ঘটনা পাঠকের মন খারাপ করিয়ে দেবে।কিন্তু তার রেশ কাটার আগেই চলে আসবে অশ্বিন মাস। আর অশ্বিন মাস মানেই দুর্গাপুজো। নতুন জামা, ঠাকুর দেখা, বিসর্জন আর বিষাদ। আর সেই বিষাদ খানিকটা হলেও কাটিয়ে দেয় কালী পুজো। আর সেই অধ্যায়ে ফিরে এসেছে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্বের গল্প। এর পরের মাস গুলোতে গল্পের মোড় ঘুরে গেছে। অলিকপুরের মানুষের জীবনে লেগেছে রাজনীতির ছোঁয়া। এসেছে 'আমরা - ওরা'। ছোট খাটো নেতাদের চোখ রাঙানো। 'দেখে নেয়া' র হুমকি। এসেছে ক্রিসমাসের কেকের গন্ধ, পাটিসাপটার স্বাদ, ২০০০ সাল অর্থাৎ নতুন সহস্রাব্দ। আর তারপর শুধু চরিত্র গুলোর শেষ কিভাবে টানেন লেখিকা তার অপেক্ষা করা।
সত্যি বলতে অনুভূতি নির্ভর এ গল্প আহামরি কিছু নয়। কিন্তু মন খারাপের সময় এই বই হাতের কাছে থাকলে টেনে নেওয়াই যায়।আমার এই বইটি ভালো লাগার অন্যতম কারণ হল সুবিনয় দাশের প্রচ্ছদ ও ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলঙ্করণ। এই দুটি মূলত 'উনিশ কুড়ি'- কে মনে করিয়ে দেয়। আর ভালো লেগেছে প্রতিটি অধ্যায়ের উপর লেখা বিভিন্ন কবিদের দু - চারটে লাইন। যা লেখিকার কবিতা প্রেমকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
আমরা যারা নয়ের দশক থেকে হেঁটে হেঁটে ওয়াই টু কে তে প্রবেশ করেছি তাদের কাছে সেই সময়ের স্মৃতির রেশ আজও মনের কোণে লেগে আছে। সেইসব না ভোলা সকালসন্ধেরাতের ছোটবড় স্মৃতির ভেলায় ভাসতে ভাসতে পড়ে ফেললাম প্রিয় লেখিকা সোমজা দাসের লেখা - অলীকপুর ক্রনিকলস।
লেখিকার থ্রিলার ধর্মী লেখার সাথে পরিচয় থাকলেও রম্য গদ্যের ছলে বুনে যাওয়া বারোটি পর্বের এই লেখাটি পড়ে এককথায় মুগ্ধ হয়ে গেছি। ফিরে গেছি ফেলে আসা সেইসব সাদাকালো দিনগুলোতে যখন আমাদের জীবনে ছিল না কোনও জটিলতা, ছিল না কোনও কৃত্রিমতা। সবকিছুই ঘটত স্বাভাবিক ছন্দে। আজকের মেকি দুনিয়ার থেকে শত যোজন দূরে সে ছিল এক মায়ার জগত। ছিল প্রেম, ছিল বন্ধুত্ব, ছিল মজার ছলে সামাজিক মূল্যবোধের পাঠ। আজকের মোবাইল কেন্দ্রিক 'দেখানো সর্বস্ব' জীবনের গতিপথ থেকে সেদিনের দৃশ্যপট অনেকটাই ছিল আলাদা। ল্যান্ডফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দ, স্কুলে যাতায়াতের পথে নিরিবিলিতে প্রেম পত্রের আদান প্রদান, অডিও ক্যাসেট বাজিয়ে গান শোনা বা শোনানো, লাল ডাকবাক্স, বিয়েবাড়ির মজার গল্পগাছা - সব মিলিয়ে সে ছিল এক মায়াময় সময়। আর এই সময়টাকেই নিজের লেখনীতে তুলে ধরেছেন লেখিকা।
ধীরে ধীরে ওয়াই টু কে এল। একটু একটু করে বদল হতে থাকল মানুষের মন মানসিকতা, সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনের প্রতি তাদের চাহিদা কিংবা সময়ের সাথে আবেগের মেলবন্ধনের মধ্যবর্তী রসায়ন। রুম্পি আর দেবযানীর জীবনও বদলে যাওয়া সময়ের স্রোতের টানে এগিয়ে চলে দিক বদল করতে করতে।
অলীকপুর ক্রনিকলস শুধু একটা গদ্যমালা নয় তার থেকে আরও বেশি কিছু। লেখিকা নিজের কলমে যে সময়টাকে ধরতে চেয়েছেন, তাতে তিনি যে সফল হয়েছেন সেটা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়াই যায়। এখানে একদিকে যেমন আছে ভালবাসা, বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, নির্ভরতার কথা ঠিক তেমনি অন্য দিকে আছে বিশ্বাসভঙ্গ, হেরে যাওয়ার পানসে হয়ে যাওয়া স্মৃতিকথা। আসলে এই বই আমাদের সবার ফেলে আসা অতীত, ছেড়ে চলে যাওয়া সময়ের কথা বলে। ছোট ছোট পর্বের কোলাজের মধ্যে দিয়ে লেখিকা একটা দশকে সুন্দর করে একটা সুতোয় গেঁথেছেন।
ভাল লেগেছে - ☘️ গদ্যের সরল রৈখিক গতি। ☘️ গল্প বলার স্টাইল। ☘️ গান, কবিতা, কোটিশনের প্রাসঙ্গিক ব্যবহার। ☘️ ছোট ছোট গল্পের মোড়কে সেই সময়ের আবেগকে ধরার অনেস্ট চেষ্টা।
পরিশেষে কয়েকটি কথা না বললেই নয়, বইয়ের সামগ্রিক প্রোডাকশন কোয়ালিটি খুবই ভাল হলেও বেশ কিছু জায়গায় প্রিন্টিংত্রুটি চোখে পড়েছে। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য মহাশয়ের আঁকা প্রচ্ছদটি আমার বেশ ভাল ও প্রাসঙ্গিক লেগেছে। এমন একটি বই পাঠকদের উপহার দেবার জন্য অরণ্যমন প্রকাশনীকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম।
অসাধারন। বিংশ শতাব্দীর শেষ আর একবিংশ শতাব্দীর শুরু। আমরা ক্রমশ একটা ভিন্ন জগতে প্রবেশ করতে চলেছি। আগামী এক দশকের মধ্যে আমাদের চারপাশ, আমাদের অভ্যাস আমূল বদলে যেতে চলেছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে কি ওয়াই টু কে আমাদের গ্রাস করবে? না তা হলো না। সময় এগিয়ে চললো গড়গড়িয়ে আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে। সেই পরিবর্তনশীল সময়ের গল্প এটা। মূল পাত্র পাত্রী গুলো আমাদের খুব চেনা। একদম পাশের বাড়ির লোক। কিন্তু জগৎটা যেন অলীক একটা পৃথিবী। এইরকম অলীক জগৎ যদি আবার আমরা পেতে পারতাম। কিন্তু হয় সেই সময়ও নেই আর সেই বয়সও নেই।