রামায়ণ-মহাভারতে মারণাস্ত্রের যে বিপুল সম্ভার আমরা দেখেছি, আজ এতকাল পরে সেই বিচিত্র ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রগুলির কয়েকটির আবার আবির্ভাব ঘটেছে এক অদ্ভুত মায়াপৃথিবীর যুদ্ধবিদ্যার শিক্ষালয়ে। সেখানে এসে উপস্থিত হল গল্পের কিশোর নায়ক অভী, আর সেই মায়াঅস্ত্রবিদ্যার জগতে পৌঁছে সে জানতে পারল এই অস্ত্রগুলোর একটাকে ব্যবহার করে ফিরে আসতে চাইছে এক অমিত শক্তিশালী হিংস্র রাক্ষস। আরও ভয়ংকর কথা, এই জগতেই আবির্ভূত হতে চলেছে এক অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীর প্রলয়যোদ্ধা, যার আগমনে ধ্বংস হয়ে যাবে সমগ্র মানবসভ্যতা।
এই ‘প্রলয়যোদ্ধা’র ঘটনা যেখানে শেষ, সেখান থেকেই শুরু অভীর দ্বিতীয় পর্বের অভিযান – ‘প্রলয়বহ্নি’। এবার তার কাহিনীর বিস্তার মাল্যপর্বতের ওপারে রাক্ষসদের দেশে। সেখানে তার সঙ্গে মরণপণ সংগ্রামে নামতে চলেছে এক অদ্ভুত মুখোশধারী ঘাতক, যার হাতের মধ্যে জ্বলজ্বল করে প্রচন্ড শক্তিশালী মায়ামণি বজ্রমানিক, আর রাক্ষসপ্রাসাদ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় এমন একটা বাচ্চা ছেলে, যাকে ভয় পায় না এমন কোনো রাক্ষস নেই। এখানেরই পাহাড়ের কোলে এক দুর্গম গুহায় লুকিয়ে আছে অভীর হারানো রহস্য উদ্ধারের চাবিকাঠি, কিন্তু সে গুহা পাহারা দেয় মায়াজগতের হিংস্রতম সাপ – মহাসর্পিণী। এই বইতে অভীর জন্য অপেক্ষা করে আছে নরকের আগুন আর প্রলয়ের ইঙ্গিতবাহী এক জগৎধ্বংসী ষড়যন্ত্র।
সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের জন্ম মেদিনীপুর শহরে ১৯৮৫ সালে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। পেশায় স্কুলশিক্ষক। নেশায় পাঠক। দুঃসাহসে লেখক। লেখেন মূলত কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখালিখি করছেন দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গল্প-সংকলনে। বাংলায় তাঁর ফ্যান্টাসি-অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস ‘প্রলয়যোদ্ধা’ ইতিমধ্যেই পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকার একাধিক স্পেকুলেটিভ সংকলন ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু গল্প। হলিউডে অনুষ্ঠিত কল্পসাহিত্য প্রতিযোগিতা এল. রন হাবার্ডের নামাঙ্কিত ‘রাইটার্স অব দ্য ফিউচার’-এ একমাত্র ভারতীয় হিসাবে পরপর তিন বছর পেয়েছেন ‘অনারেবল মেনশন’-এর সম্মান। ভালোবাসেন বেড়াল, ব্যাটম্যান, সুকুমার রায় এবং নলেন গুড়ের সন্দেশ।
ট্রিলজির দ্বিতীয় খণ্ড প্রায়শই প্রাপ্যের তুলনায় কম গুরুত্ব পায়। কখনও পাঠক কাহিনির শেষে পৌঁছোনোর লক্ষ্যে রূদ্ধশ্বাসে পাতা ওল্টান। আবার কখনও লেখক নিজেই উদ্যোগী হন ঝটপট শেষ কথাটি বলার জন্য। সৌভাগ্যক্রমে 'প্রলয়' সিরিজের দ্বিতীয় খণ্ডে তেমন কিছু ঘটেনি। লেখক প্রথম খণ্ডেই সযত্নে যে গতি ও ছন্দটি বেঁধেছিলেন, সেটিই বজায় থেকেছে এই খণ্ডেও। ফলে চরিত্রচিত্রণের নৈপুণ্য, প্লটের জটিলতা বৃদ্ধি সত্বেও সবক'টি সূত্রকে একসঙ্গে গাঁথার চেষ্টা, সর্বোপরি ধূসর চরিত্রদের অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে এক বিশাল ক্লাইম্যাক্সকে ক্রমে মিশিয়ে দেওয়া— এগুলো সফল ও সার্থকভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছেন তিনি। পাঠকও ঈষৎ মন্থর গতি, সুললিত গদ্য, আর কাহিনির নিজস্ব রাজনীতির সমন্বয়টি পুরোদস্তুর উপভোগ করেছেন। সুমুদ্রিত, সু-অলংকৃত বইটি রেখেই ইচ্ছে হচ্ছে তৃতীয় খণ্ডটিতে ঝাঁপানোর। তবে একটু ধৈর্য ধরা যাক। প্রলয়ের জন্য তো একটু অপেক্ষা করাই যায়, তাই না?