এই শহরের বাতাসে কখনও কখনও অর্ফিয়াসের বাঁশির মতো বেজে ওঠে বিষাদের সুর। ঝুম বৃষ্টিতে মুছে যায় পুরনো পথের ধূলির আস্তরণ; একসময় মেঘ ভেঙেচুরে রোদ ওঠে। কাঠফাঁটা সেই রোদের কোন কোন ফাটলে উত্তাপ ছড়ানোর ক্ষমতা হয় না।
এই নগরের বাগানে সকল কাঁটা ধন্য করে লক্ষ গোলাপ ফোটে। হাজার মানুষের ভিড়ে একা হেঁটে বেড়ায় গভীরভাবে অচল কেউ। ফুলের সৌরভ তার শরীর ছুঁয়ে যায় না।
ক্লান্ত পথিক হেঁটে বেড়ায়। তার কোথাও যাবার তাড়া নেই। মহাবিশ্বে তার জন্য কেউ কোথাও অপেক্ষা করে নেই।
কৌশিক জামান একজন অপদার্থ। ইংরেজিতে যাকে বলে- গুড ফর নাথিং। জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে পরাজিত হতে হতে হাল ছেড়ে দেয়া একজন ব্যক্তি। কিছু মানুষ আছে না এক ভুল বার বার করে? তিনিও ঐ কিসিমের।
তাই নিজেকে বন্দী করে রেখেছেন একশ স্কয়ার ফিটের একটা রুমে। রুম ভর্তি শুধু বই আর বই। বই পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছে কিছু একটা লিখে ফেলা দরকার। এবং অখাদ্য ছাইপাঁশ কিছু আবর্জনা লিখেছেন যেগুলো প্রকাশক একরকম চাপে পড়ে ছাপিয়ে এখন আফসোস করছেন।
"নগরের যত বিষাদ" এর কাহিনি বেশ সরলরৈখিক। "বৃত্তের চারপাশে"র মতো এ গল্পেও সর্বব্যাপী বিষণ্ণতা ভর করে আছে। তবে এই বিষণ্ণতা শেষ পর্যন্ত ঘনীভূত হয়ে পাঠককে আক্রান্ত করতে পারেনা প্রথম বইয়ের মতো।কেমন আলগা আলগাভাবে শেষ হয়ে গেলো। পড়ার সময়টা ভালো কেটেছে যদিও।
(কৌশিক জামানের করা প্রচ্ছদটা হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় "বড়ই সৌন্দর্য!")
বইটি পড়ে আমার ভাল লাগেনি। যেহেতু কোন কিছু ব্যাখ্যা ছাড়া ক্লেইম করা মোটেও যুক্তিসঙ্গত ব্যাপার না, তাই কেন ভাল লাগেনি সেটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করছি। এখন আমি সেই কাজটিই করব।
লেখক বইয়ের নামের সাথে মিল রেখে এই বইতে মূলত তিনটি চরিত্রের আলাদা আলাদা বিষাদের গল্প এক করতে চেয়েছেন। তবে সেই এক করতে চাওয়া সফল হয়নি, তিনটি চরিত্রের আলাদা আলাদা বিষাদ কোনভাবেই সিংক্রোনাইজেশন হয়নি। বইটি লেখা হয়েছে প্রথম পুরুষে, গল্পকথক নিজেই এখানে মূল চরিত্র। গল্পে দেখা যায় (যদিও এটাকে ঠিক গল্প বলা যায় কিনা আমি একটু সন্দিহান) গল্পকথক তার প্রাক্তন প্রেমিকার দুঃখ ভুলতে গিয়ে নতুন একটি প্রেমে পড়ে যায়। সেই নতুন প্রেমে পড়া মেয়েটি আবার গল্পকথককে প্রেমিকসুলভ চোখে দেখে না। যতবারই গল্পকথক এই কথাটা মেয়েটিকে বলে, ততবারই মেয়েটি একই কথা বলে। সত্যি কথা বলতে, ঠিক এরকমই একটি ঘটনা দেখা যায় বলিউডের Ae Dil Hai Mushkil সিনেমাতে। এমনিতে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের ক্ষেত্রে দুটি আলাদা সত্ত্বার কাছে একই ধরণের আইডিয়া আসাটা খুব একটা ব্যাতিক্রম ব্যাপার না। এমনটা হতেই পারে। আমিও হয়তো সেটা মেনে নিতাম, কিন্তু এই বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে লেখক বইয়ের আশি শতাংশের বেশি থিম তুলে এনেছেন সেই সিনেমা থেকে। আবার এই অভিযোগটিও হয়তো আমি নিজের কাছেই অসত্য বলেই ধরে নিতাম, যদি বইটির বর্ণনা সিকিভাগও ঠিক থাকত।
আমার কাছে বইটি পড়ার সময় এটাকে একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসের বেশি কিছু মনে হয়নি। আমরা ফেসবুক স্ট্যাটাসে যেমন একের পর এক ঘটনা বলে যাই, এখানেও ঠিক তেমনটাই করা হয়েছে। লিটারারি এংগেলে এর কোন বিশেষত্ব আছে বলে আমার মনে হয়না। এমনিতে প্রথম পুরুষে লেখা বইতে একটি চরিত্রের প্রাধান্য থাকবে সেটা অস্বাভাবিক নয়। প্রথম পুরুষের জবানীতে নিজের দুঃখ, নিজের অবস্থান আর নিজের অপ্রাপ্তিকে বলার ঢঙ আমরা ইতোপূর্বেই বাংলা সাহিত্যে দেখেছি। মস্তিষ্ক হাতড়ে প্রথমেই এমন একটি বইয়ের মধ্যে মনে পড়ছে হুমায়ূন আহমেদের ‘আজকে আমি কোথাও যাব না’। আবার ডক ম্যাকলিনের ‘আমেরিকান পাই’ গানেও এমনই এক সুর আমরা দেখতে পাই। আমি যদি এসব লেখার সাথে ‘নগরের যত বিষাদ’-কে মেলাতে যাই, তাহলে বইটি ওসব লেখার ধারেকাছেও আসবে না।
বইয়ের লেখাতে যেমন দুর্বলতা আছে, তেমনি শব্দচয়নেও ভয়ংকর রকমের সমস্যা মনে হয়েছে। যেসব শব্দ খুব সহজেই বাংলায় লেখা যেত, সেগুলিও লেখা হয়েছে ইংরেজিতে যেটা বেশ দৃষ্টিকটু এবং পড়তে বিরক্তিকর লেগেছে। বইয়ের ক্যারেক্টার ডেভলপিংও ভাল হয়নি। একটা বাক্যের পর আরেকটি বাক্য বসানোটাও যথেষ্ট দক্ষ হাতে করা হয়নি। গল্প বলতে বলতে লেখকের হঠাৎ করেই পাঠককে প্রশ্ন করার ব্যাপারটা বেশ কিছু জায়গায় ভয়ংকর রকমের বিরক্তিকর লেগেছে।
বইতে তথ্যের ভুলও আছে মারাত্মকভাবে। একটি উদাহরণ দিই। একটা জায়গাতে লেখক লিখেছেন এক দিনে নাকি সর্বোচ্চ একটা অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট খাওয়া যায়। অথচ আমেরিকার ‘ন্যাশনাল হেলথ সিকিউরিটি’র ডাটাবেজ জানান দিচ্ছে একদিনে তিনটি অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট খাওয়াটাও স্বাভাবিক পর্যায়ে পড়ে। আমার কাছে মনে হয়, যারা লেখালেখি করেন তাদের একটা ব্যাপার মাথায় রাখা উচিত- তারা যেটা লিখছেন সেটা অনেক পাঠকের কাছে পৌছাবে। তাই কোনকিছু যাচাই না করে অবশ্যই সেটা দুম করে লিখে ফেলা উচিত না। তথ্যের ক্ষেত্রে একটা লাইন লিখে ফেললেও সেটাতে যেন যথেষ্ট দায়িত্বশীল আর নির্ভুলতা থাকে সেটাতে নজর দেওয়া উচিত।
এই বইটির একমাত্র ভাল লাগার দিক এর প্লট আইডিয়া। একটা মানুষের দুঃখ আর বেদনার ছাপ ফুটিয়ে তোলার যে আইডিয়াটা, সেটা নিঃসন্দেহে দারুণ। শুধু লেখার দুর্বলতার কারণে আর অনেক তাড়াহুড়ার কারণে এমন দারুণ একটি প্লট এমন বাজে একটি আকার ধারণ করেছে বলে আমার ধারণা। এমনকি বইটিতে গল্পকথকের ভাবনার প্রকাশ এত অস্বচ্ছ যে এটিকে ‘বায়োগ্রাফিক্যাল ফিকশন’ও বলা যাবেনা।
বইটিকে বলা হয়েছে 'উপন্যাসিকা'। অথচ এটি একটি ছোট গল্পের চাহিদা কিংবা স্ট্রাকচারও পূরণ করতে পারেনি। প্রথমে বলা কথাটাই আবার বলছি। ফেসবুকে মাঝেমধ্যে আমরা যেসব গল্প পড়ি, যেখানে কাঁচা হাতে একের পর এক 'কি হয়েছে' বলতে থাকে- এই বইটিকে আমার এমন লেগেছে। এমন লেখার 'জনরা' কি আমি সত্যিই জানিনা!
বিষাদ কে লেখক বৃত্তের সাথে তুলনা করেছিলেন 'বৃত্তের চারপাশে' বইটিতে। 'নগরের যত বিষাদ' পড়ে আমার মনে হলো বিষাদ শুধু বৃত্ত না, পুরো জ্যামিতিক সব আকৃতির মতো। সকলের জন্য একই আকার। সুপরিচিত। রম্বস হোক, বর্গ হোক, আয়ত হোক সবগুলোই তো আদতে চতুর্ভুজ! না? এমন। যেকারণে এই বইটির বহু কথায় মিল পেয়েছি। শুধু মিল পেলেও হতো। মানে ব্যাপারটা এমন যে, এই কথাটা আপনার বলার কথা। কিন্তু বলতে পারেননি। ওইযে ঠোঁটে আসে, মুখে আসেনা অবস্থা...কিন্তু কথাগুলো বলা হয়েছে মনকে। আর লেখক সেসব লিখে ফেলেছেন, জলবৎ তরলং ভাবে! কি মুসিবত।
লেখক কৌশিক জামান এত সহজ ভাষায়, সহজ শব্দচয়নে লেখেন, মনেহয় পাশে বসে চেয়ারে দুলতে দুলতে গল্প বলছেন। (আমি লেখককে সামনাসামনি কথা বলতে দেখিনি) যেকারণে এক বসায় এক আড্ডার মতো ছোট এই বইটা শেষ হয়ে গিয়েছে। এই গল্পে হিউমার ছিলো, অসাধারণ হতে চেয়েও হতে না পারা সাধারণ মানুষের গল্প ছিল। তবুও ঠিক মন ভরেনি। মনে হয়েছে এই গল্পটা আমাকে আগে বলেছেন লেখক, এবার শুধু একই রকম লিনিয়ার গল্পটিকেই অন্যভাবে বললেন। একরম একটা ফিলিংস আরকি। বইটি উপভোগ করেছি, তবে প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হতে আরও সুন্দর গল্প পড়ার প্রত্যাশা থাকলো।
"You cannot love someone overnight also you cannot unlove someone overnight."
এই সোনার কাঠি বা রুপার কাঠি একটা কনস্ট্যান্ট বস্তু, যেটাকে আপনি চাইলেই সরাতে কিংবা উপড়ে ফেলতে পারবেন না। তবে একটা গোপন জায়গায় রেখে দিতে পারেন! Where it remains secure and concealed.
নগরের সমস্ত বিষাদ যেন দলবেধে বারবার লেখকের অস্তিত্বে মিশে যায়। গোল এক গর্তে ঘুরতে ঘুরতে লাগামহীন ভাবে সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। কিসের তাড়নায় আবার ও সেই একই বিষন্নতায় ছুটে চলা? এর উত্তর আমার জানা নেই, স্বয়ং লেখকেরও নেই!
"নগরের যত বিষাদ" খুব বেশি একটা মনে ধরেনি। আরো পুষ্ট লেখা আশা করে���িলাম যে! আর কিসের যেন অভাব ছিলো একটা!
হরহামেশাই দেখা যায় কাউকে ভালোবাসলে সে সেইম এনার্জি আপনাকে ব্যাক করছে না, দিনের পর দিন আপনি কষ্ট পেয়েই যাচ্ছেন। যেন কষ্ট পাওয়াটা একটা শখ! প্রতিদিন এমন একটা সার্কেলে ঘুরছেন যেখান থেকে আপনি চাইলেও বেরিয়ে আসতে পারছেন না। হয়তো লেখকও এমনই এক অঅসহায়ত্বের কথা বলতে চেয়েছেন!
এমনটা কোনো সমাধানও নয়। আর নিজের ভালনারিবিলিটিও যেখানে সেখানে প্রকাশ করতে নেই; একটা সময় দেখবেন আপনার নিজেকে খুব তুচ্ছ লাগছে, নিজের প্রতি মায়া হবে, ভালোবাসা জিনিসটাকেই ঘৃণা করতে শুরু করবেন তখন! আর যে মানুষের অস্তিত্ব, স্পর্শ সোনার হরিণ এর মত তা না পাওয়া-ই তো ভালো। সব পেলে যে নষ্ট জীবন!
ভাবুন, এক পৃথিবী লোক আপনার পাশে, অথচ আপনি কাঁদছেন সেই মানুষটাকে পাওয়ার জন্যে, যে কিনা আপনার হয়ে থাকতে চায়না, থাকতে চায়নি কোনোদিন। অদ্ভুত, তাইনা? ঠিক তাই। হয়তো প্রকৃতি সত্যিই এতটা নিষ্ঠুর! হয়তো আমরাও ঠিক এতটাই নিষ্ঠুর।
তাল পাতার সেপাই-এর মধ্যরাতে গান টা শুনেছেন? "দ্বন্দ গুলো পুড়িয়ে কালো রাতে, ভাবছি যদি ফিরতে আমার সাথে..."-এই লাইন টার সাথে মিলে যায় খুব করে গল্পটা। যেদিন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে গেলাম, প্রকাশক সহ সবাই বলাবলি করছিলেন যে কিভাবে এক কাপ চা সাথে নিয়ে বসলে, চা খেতে খেতেই বই শেষ হয়ে যাবে। আমি আসলে "চা-মানুষ" না হওয়ায় ব্যাপারটা হয়ে ওঠেনি। বইটির 'বেটা' রিডার ছিলাম, এবার দ্বিতীয়বারের মতন যখন বইটি নিয়ে বসেছিলাম, হাতে ছিলো "এক কাপ চা" এর বদলে "এক মগ কফি"।
গল্পটি পুরোটাই ফার্স্ট পারসোন-এ লিখা, যেটা পাঠককে মূল চরিত্রের সাথে মিশে যেতে দেয় খুব সহজেই। যাইহোক, গল্পের ভেতর যাই এবার...
গল্পের শুরুতেই, গল্পের মূল চরিত্রের গাড় কিছু কষ্টের ছাপ পেয়ে যাবেন। তার আশে-পাশের প্রকৃতি, তার ভাল না থাকা, তার মন খারাপ আর তার সাথে আবহাওয়ার সামঞ্জস্যটা খুবই সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। মৃদু হাওয়া আর রোদ-ছায়ার খেলা থেকে শু্রু করে বজ্রপাত সহ বৃষ্টি, সব ধরণের ভালো এবং খারাপ লাগার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন তিনি।
গল্প এগুতে থাকলে দেখা যায় মূল চরিত্রের প্রচন্ড ডিপ্রেশন গুলোকে শুধু নিজের "এক্সিসটেন্স" দিয়ে একজন কি করে তাকে সারিয়ে তুলছিলেন, কি করে সব জিরো থেকে হান্ড্রেড এ উঠিয়ে আবার মাইনাসে নিয়ে আসা যায়, সেটারই অভিজ্ঞতা হচ্ছিলো যেন।
গল্পে যে প্রেম কিংবা "প্রেম" এর মতন কিছু একটা দেখানো হয়েছে, সেটাকে ঠিক এক তরফা প্রেম বললেও ভুল হবে। সেখানে ছিলো আবেগ, ভালবাসা, প্রেমে পড়া একজন প্রায় মাঝ বয়সী মানুষের কিশোর-তূল্য আচরণ, যে পানিতে চোখ জ্বালা করে, সে পানিতেই বারবার মুখ ধুতে চাইবার আকুতি, একটু যত্ন পাবার লোভ, একটু নিজেকে শোনাতে চাইবার তীব্র বাসনা।
অন্যদিকে, একটি বন্ধুত্ব। যেখানে চাইবার কিচ্ছুটি নেই। স্বার্থ, মোহ, কোনোকিছুই ছাড়া একজন আরেকজনের প্রতি যত্ন, সম্মান, সব ছিলো। হয়তোবা সত্যিকারের বন্ধুত্ব-ও ঠিক তাই! শুধু পাশে থাকা।
থাক, আর বেশি কিছু বলে বইটি পড়বার আগেই কারো মন খারাপের ভার না নিই। তার জন্যে লেখক নিজেই আছেন।
তবে শেষ করছি "মাতাল কবি" চার্লস বুকোস্কির লিখা দুটি লাইন দিয়ে, "...A Love like that was a serious illness, an illness from which you never entirely recover.."
কৌশিক জামানের দ্বিতীয় মৌলিক বই "নগরের যত বিষাদ" প্রকাশক পেন্ডুলাম প্রকাশনী। বইয়ের মুদ্রিত মূল্যঃ দুইশত টাকা। পারসোনাল রেটিংঃ এই অংশটি ভয়াবহ। বই আমি দশে রেট করবো কিভাবে? আমি যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, বইটি পড়ার পর আমার যে মন খারাপ বেড়ে গ্যাছে, well, the writer owes me a 'mug' of coffee I assume! তবুও হম্বিতম্বি করে যেহেতু "বুক রিভিউ" করতে বসেছি, রেটিং দিলাম দশে সাড়ে আট!
বইটির প্রচ্ছদ এবং অলংকরণ অসম্ভব সুন্দর। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে এমন।
লেখকের সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো তার লেখনী। এত সহজ এবং চমৎকার। উত্তম পুরুষে লেখা বইটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রের বিষাদময় কাব্য বইয়ে গদ্য হিসাবে প্রকাশ পেয়েছে।
বইটি ভালো লেগেছে তবে 'বৃত্তের চারপাশে' থেকে বেশি নয়। এর কারণ হতে পারে 'সময়'। আমার মনে হয় মানুষ প্রাপ্ত বয়সের তুলনায় সদ্য তরুণ বয়সের নিরবিচ্ছিন্ন আবেগকে সহজ ভাবে নিতে পারে। 'বৃত্তের চারপাশে' এইজন্যই হয়তো বেশি ভালো লেগেছে।
"আমি সব দুঃখ কষ্ট ধামাচাপা দিয়ে শুধু স্বপ্ন পুঁজি করে বেঁচে আছি, পৃথিবীর পথে, এই নগরের পথে নিরন্তর হেঁটে চলেছি। যেন চলতে থাকলেই সবকিছু থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু এখনো আমি রাতে দুঃস্বপ্ন দেখি। অপেক্ষা করি কেউ একজন এসে দুঃস্বপ্ন থেকে উদ্ধার করবে। করে না। কেউ তো আমাকে উদ্ধার করার ঠিকাদারি নেয়নি, তাই না? সবকিছুর মত দুঃস্বপ্নও একসময় শেষ হয়, আমি বিছানায় উঠে বসে ঘেমে নেয়ে হাঁপাতে থাকি। দু চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে শরীরের ঘামের সাথে মিশে গেলে এই দুঃসহ গরমেও আমার কিছুটা শীতল অনুভূতি হয়। কিছু বলতে পারি না। মহাবিশ্বের সব অন্ধকার একত্রিত হয়ে জমাট বেঁধে থাকে আমার গলার কাছে। বিছানার পাশে রাখা পানি দিয়ে সব গিলে ফেলার চেষ্টা করি, কখনো সফল হই না।... আমি শুধু জানি একদিন এই কষ্টটা আর আগের মতো জোরালো হবে না। কষ্ট থাকবে কষ্টের মতো কিন্তু সময় একদিন সব মলিন করে দেবে। সেই একদিনের অপেক্ষায় আমি দিন গুনতে থাকি।" - কৌশিক জামান, নগরের যত বিষাদ
লেখক খুব সোজাসাপ্টা কথা লিখেন, খুব সরল ভাষায়। কিন্তু গল্পগুলো খুব সরল না, আবার খুব কঠিনও না। জীবনের মতোই মিশ্র অনুভূতির মিশেল। ছোট্ট একটা বই খুব আহামরি কাহিনীর আশা নিয়ে বসলে কিছুটা হতাশ হতে হবে, কিন্তু লেখনী বরাবরের মতোই উপভোগ্য। বড় এক মগ চা/কফি নিয়ে বসলে চুমুক দিতে দিতেই বই শেষ হয়ে যাবে। চায়ের তৃপ্তি আর বইয়ের বিষণ্ণতা উভয়ই গ্রাস করবে আপনাকে।
বই : নগরের যত বিষাদ লেখক : কৌশিক জামান প্রকাশনা : পেন্ডুলাম বুকস - Pendulum Books
"A love like that was a serious illness, an illness from which you never entirely recover. "
শহরের এক সাজানো গোছানো কফিশপে বসে বইটা শেষ করি। বই শেষ করে আমার খুব একা মনে হচ্ছিল নিজেকে। দিনশেষে আমি ভীষণ একা। আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে না,কিন্তু আমি কি অপেক্ষা করি কারো জন্য?
বিষাদের রঙ নীল, সেই নীল প্রচ্ছদে আটকে আছে জীবনের কিছু মিশ্র অনুভূতি। আহামরি কাহিনী নয়, কিন্তু অজানা বিষাদ গ্রাস করে নিবে, মনে দীর্ঘ শ্বাস জমা হবে। এই বই নিয়ে আমি রিভিউ দিব না, তবে পড়ার পরের অনুভূতি বলি...
বইটিতে উত্তম পুরুষের জীবনের এক অধ্যায়ের কথা বলা হয়েছে, কিছু সূক্ষ্ম অনুভূতির আঁচে পাঠক বইটি এক বসায় শেষ করে ফেলবে। এই বইটির লেখাগুলোকে পাঠক হিসেবে আমার সত্য বলে মানতে ইচ্ছে করছে। বইয়ের ফ্ল্যাপের কথাগুলোও ভারী, একদম মনে ধরে। চট করেই বইটা পড়ার আগ্রহ হয়। জানি না কেন এই বইয়ের কিছু কিছু অংশ আমাকে অনেক ভুগিয়েছে, হয়তো লেখার অক���ষরগুলো জীবনের গল্পের সাথে মিলে গিয়েছিল।
লেখক কৌশিক জামান বরাবরই খুব সহজ ভাবে লেখেন, কিন্তু এই সহজ লেখা মনে ঝড় তুলে দেয়। বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের দিন প্রকাশক বলেছিলেন "চায়ের কাপ হাতে এই বই পড়ে শেষ করে ফেলা যাবে। চা আর বই দুটোই পাঠকে সস্তি দেবে।আসলেই ঠিক তাই....
বই পড়তে পড়তে চোখ ছলছল করতে থাকা কোন কাজের কথা না। এই বইটা শেষ করার পর চারপাশটা ��সম্ভব গুমোট, ভারী ঠেকতেছিল। লেখক যেন বৃত্তের চারপাশের বিষাদ এর পরিধি আরো ব্যপ্ত করলেন! এই বইটা যে এতো বেশি রিলেটেবল হবে তা ধারণাও করি নি। লেখকের পরবর্তী লেখার জন্য অবশ্যই মুখিয়ে থাকবো!
উত্তম পুরুষে বয়ানকারি গল্পকথক তাঁর সাথে রুনা এবং অরুনিমার ইন্ট্যারেকশন নিয়ে এ নভেলা এগিয়ে গেছে। প্রাক্তনের কাছে ভালো মতো কষ্ট পাওয়া আমাদের তিনটা চরিত্রই। এর মাঝে চলতে থাকে তাদের মনুষ্যসুলভ অদ্ভুত অনেকটা প্রেমের মতো কিন্তু প্রেম নয় টাইপ অভিযাত্রা।
কৌশিক জামানের লেখনির সাথে আমার সম্ভবত 'গল্পরথ' এবং 'গল্পতরু' গল্প সংকলনের থ্রু দিয়ে দেখা-পরিচয় ঘটেছে। সহজ ভাষায়, স্ববিরোধি মানবজাতির সম্পর্কের নানামুখি ট্রিকি দিকগুলি দেখিয়েছেন কৌশিক।
পরিসরে অল্প এ উপন্যাসিকা পড়ার সময় খারাপ লাগছিলো না। কিছু কিছু বিষয় নিয়ে লেখক আলাপ পেড়েছেন যা হয়তো অনেক অনেক বিষাদগ্রস্ত জীবনের সাথে কমন পড়ে যেতে পারে। রুনার প্রতি আমাদের নামহীন মূল চরিত্রের হোপলেস রোমান্টিকের মতো রাজ্যের পাগলামি, আবার অরুনিমার সাথে প্লেটোনিক এক বুঝাপড়া, সেই সাথে ক্রমাগত অসহায় কিছু মানুষের আবেগের কাছে আত্মসমর্পন করার পরে আবার এক ধরণের নিরাবেগ হয়ে যাওয়া বিষয়গুলি আসলে বাস্তব জীবনেও অনেকটা প্রাসঙ্গিকই।
তবে 'নগরের যত বিষাদ' এর সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো কৌশিক জামানের লিখালিখি বিষাদ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় নি। বিভিন্ন মানুষের উল্টাপাল্টা আচরণ, অবিন্যস্ত কথাবার্তা ঠিক লেগেছে তবে কৌশিক এ নভেলায় লিখেছেন খুব সরলরৈখিক এক গল্প।
প্রচ্ছদ এক কথায় চমৎকার হয়েছে। ওয়াসি আহমেদের ফ্ল্যাপে লিখা কবিতা পছন্দ হয়েছে। তবে শুধুমাত্র সংলাপ নির্ভরতা, প্রোটাগনিস্টের প্রেম কিংবা মোহের জোয়ারে ক্রমাগত ডুবে যেতে থাকাটা কৌশিক জামান বিষাদ আকারে ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি যা উক্ত নভেলাকে শেষ পর্যন্ত সার্থক হতে দেয় নি।
নগরের মত বিষাদে নগরও ছোটখাটো এক চরিত্র হতে পারতো।
বই রিভিউ
নাম : নগরের যত বিষাদ লেখক : কৌশিক জামান প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২২ প্রকাশক : পেন্ডুলাম পাবলিশার্স পশ্চিমবঙ্গ পরিবেশক : ইতিকথা পাবলিকেশন প্রচ্ছদ : কৌশিক জামান জনরা : রোমান্টিক রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
আহা! কী নিদারুণ একটা বই পড়লাম। বিষাদে কেন্দে দিয়েছি পড়া শেষে।
গল্পের নায়ক একজন লেখক৷ ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা অবস্থায় জোম্বির মত জীবনযাপন করছিল সে। আমাদের হাইলি ইন্ট্রোভার্ট লেখক যিনি মানুষের চেহারা, নাম মনে রাখতে পারেন না। যার সাথে কখনো কথা হয় নাই, দেখা হয় নাই এমন ফেবু ফ্রেন্ড রুনাকে এক অনুষ্ঠানে দেখে আমাদের সেই নায়কের ঘজিনি ব্রেন নিকোলা টেসলা হয়ে যায় এবং উনি ব্রেনের ঝাকিতে ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের পুন মেরে রুনাকে হাই মারাতে যান। পরিচয়ের কিছুদিনের ভিত্রেই রুনার প্রেমে খাবি খেতে থাকেন উনি। ঠিক করেন যেভাবেই হোক রুনাকে ওনার জীবনে চাইই চাই।
এদিকে রুনার একজন এক্স আছে, যে রুনাকে ছেড়ে চলে গিয়ে আবার ব্যাক করছে তার জীবনে। সেই এক্সের সাথে সেক্সের স্বপ্নে বিভোর থাকা রুনাকে "আমি ভালো নাই, তোমার প্রেমের ঝড়ো হাওয়ায় উড়ছি। হাম্পিং, স্যরি বাম্পিং হচ্ছে খুব" বলে নিজের সেক্সের স্বপ্ন বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লেগে থাকে নায়ক সাহেব।
আরেকদিকে অরুনিমা নামের লেখিকা আমাদের নায়কের সাথে বন্ধুত্ব পাতায়। তিনি লেখককে শিক্ষা দেন, গাঁজা আসল রাজা। গাঁজার নেশায় নেশায়িত হয়ে দু:খ, কষ্ট, বিষাদের বিষাক্ত নখর ভোতা হয়ে যায়।
কিন্তু আমাদের নায়কের দরকার বিষাদ। তাই রুনার "নো মিনস নো" শুনলেও না শোনার ভং ধরে পোক করতেই থাকে। তার পোককে উপেক্ষা করে মেইন নায়ক হবার বাসনাকে বাপ্পারাজে পরিনত করে রুনা তার এক্সের সাথে বাসর সাজায়। হয়তো এজন্যই হাজারো ছেলের স্বপ্নদোষে দুষ্ট পরিমনির সংসার বারবার ভেঙে যায়।
গল্পের এখানেই শেষ না। নারীদের উত্যক্তকারী নায়কের প্রেম উপেক্ষা করায় রুনার সংসার ভেঙ্গে যায়। কিন্তু ক্যান্সার আর অভিমানে নায়ক রুনাকে উপেক্ষা করে রিক্সায় চড়ে নগরে ঘুরতে থাকে।
❌❌❌ স্পয়লার এলার্ট ❌❌❌ (দিছি এইটাই বেশি, আগে পরের হিসাব করে লাভ নাই)
ব্যক্তিগত মতামত: উত্যক্ত করার অপরাধে থাপড়ানো উচিত ছিল ব্যাটাকে। আমি ছেলে হয়েও সহ্য করতে পারি নাই। রুনা লক্ষী মেয়ে।
মনে হলো এত্ত এত্ত বইয়ের মাঝে রিল্যাক্স হওয়ার জন্য এমন একটা বই ম্যান্ডেটরি। অনেক সময় ধরে গলা শুকায় গেলে পানি খেলে যেমন লাগে অমন ভাবে এই বইটা তৃষ্ঞা মিটালো।লিখা সুন্দর তবে বইটা আরেকটু বড় হলে ভালো হতো। প্রোডাকশন কোয়ালিটি জোস।কিউট একটা বই🌸
Kousik's real life inspired novelettes are my only reads in the "romance" genre in the last few years. This one tackles an unrequited love, along with the underlying theme of depression. It makes a good read for a lazy afternoon with a bittersweet ending. There was definitely more finesse in the storytelling than the first book. I don't agree that companionship is the cure to our depression, even though they always come intertwined in Kousik's personal writings. I also don't think it's possible to make someone love you or expect to do so because everyone has a will of their own; certainly age has made me pragmatic. But I love the simple, relatable language that he writes in, and I found myself reflecting on the philosophical undernotes within the story while reading.
একুশে বইমেলায় 'বইঘর' স্টল থেকে স্পিন ঘুরিয়ে একটি ইবুক ফ্রী পেলাম। App এর বেশিরভাগ বই সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। তো বইয়ের নামই ভরসা। তো নাম দেখেই বইটা নির্বাচন করি। তবে পড়তে গিয়ে শুরুতে মনে হচ্ছিল সেই পুরোনো ২০১৪/১৫ সালের ফেসবুক গল্পের মতো অবস্থা। লেখক ফেসবুকে গল্প লিখেন। সেখান থেকে এক মেয়ে যোগাযোগ করে। তারপর চ্যাটিং, প্রেম-চিঠি। গল্প অনেকটা সেই রকমই ছিল। শেষটা অনেক দ্রুত পার করা হয়েছে। তবে কিছুটা বিষাদ যে আমাকে ছুয়ে যায় নি। তা অস্বীকার করব না।