Jump to ratings and reviews
Rate this book

হরপ্পান বাণিজ্য ও বাণিজ্যযুদ্ধ

Rate this book
সিন্ধু সভ্যতা আর মেসোপটেমিয়ার মাঝে হল পারস্য। যা আজকের ইরান। দুই বিখ্যাত সভ্যতার মাঝে এই দেশ জুড়ে বহু প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে আধুনিক যুগে, যার খবর আমরা বিশেষ রাখি না। টেপে শিয়ালক, টেপে হিসার ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্র দিয়ে একসময় স্থলপথে বাণিজ্য হত দুই সভ্যতার মধ্যে। মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব সিন্ধু সভ্যতার দামী রত্ন ও পাথর পাওয়া গিয়েছে তার আদানপ্রদান হত ইরানের এই খোরাসান পথ দিয়ে। এই বাণিজ্যের আধিপত্য দখল করার জন্য দীর্ঘ যুদ্ধ হয়েছিল খৃষ্ট পূর্ব ৩০০০ এর পরবর্তী সময়ে। একসময়ে হরপ্পানদের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়. শহর-এ-শোকতা জাতীয় শহরের পত্তন হয় এই সময়ে। হরপ্পান বহু শহর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
কয়েকশো বছর বাদে হরপ্পানরা নিজেদের গুছিয়ে নেয়। আবিষ্কার করে জলপথে পারস্য উপসাগর দিয়ে বাণিজ্যের সম্ভাবনা। দখল নেয় উত্তর আফগানিস্তানের খনি। তৈরি হয় শর্তুগাই এর মতন খনিশহর এবং অন্তিম আঘাতে ইরানের পূর্বদিকে গড়ে ওঠা কেন্দ্র গুলিতে প্রবল আক্রমণ চালায় তারা। ল্যাপিস ল্যাজুলি, কর্ণেলিয়ন, স্টিয়াটাইটের বাজার দখল করার কয়েকশো বছর ধরে চলা যুদ্ধ হয়েছিল ইতিহাসের প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধ।
ইরানের প্রতি ক্ষেত্র গুলির বিবরণ সহ সেদিনের উথালপাতাল ইতিহাস নিয়ে আমাদের এই পুস্তক। সিন্ধু সভ্যতার সমাজের নানা ঘাত প্রতিঘাতের কথাও জানা যাবে এই বই পাঠে।

192 pages, Hardcover

Published August 14, 2022

20 people want to read

About the author

Rajat Pal

21 books6 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
2 (40%)
4 stars
3 (60%)
3 stars
0 (0%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 2 of 2 reviews
Profile Image for Riju Ganguly.
Author 39 books1,869 followers
August 21, 2022
"It is the maxim of every prudent master of a family never to attempt to make at home what it will cost him to make more than buy... If a foreign country can supply us with a commodity cheaper than we ourselves can make it, better buy it of them with some part of the produce of our own industry employed in a way in which we have some advantage..." (Adam Smith, 'Wealth of Nations', 1776)
"A free people ought not only to be armed, but disciplined... Their safety and interest require that they should promote such manufacturers s tend to render them independent of others for essential, particularly military supplies." (George Washington, address to Congress on 8th January 1790)
অষ্টাদশ শতাব্দীর এই দু'টি কথা দিয়ে বাণিজ্য এবং বাণিজ্য-যুদ্ধ— দুইয়েরই কারণ তথা চালিকা-শক্তিটিকে বুঝে নেওয়া যায়। প্রশ্ন হল, এর আগে কি এই ভাবনাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি? এরা কি একান্তভাবেই আধুনিক উদ্ভাবন, বা আবিষ্কার?
একেবারেই নয়! ইতিহাসের পাতায় একাধিক রাষ্ট্র, সমাজ, নিদেনপক্ষে জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃক্রিয়ার যে-সব নিদর্শন নথিবদ্ধ হয়েছে, তাতে এমন আদান-প্রদান ও সংঘাতের নিদর্শন আছে অজস্র।
আর প্রাগিতিহাসে?
আছে— তবে তাকে খুঁজে নিতে হয়, বুঝে নিতে হয়।
সেই লক্ষ্যেই প্রত্নতাত্ত্বিক, দলিলভিত্তিক, পুরাকথা-অনুসারী, এমনকি জিনগত উপাদানের ভিত্তিতে লেখক হরপ্পান সভ্যতাকে সমসাময়িক নানা সভ্যতা ও সংস্কৃতির পটভূমিতে দেখেছেন। তাদের সঙ্গে হরপ্পার বাণিজ্যিক সম্পর্কটি যথাসম্ভব যৌক্তিক আকারে তুলে ধরেছেন তিনি। তার সূচনায় ও অন্তে, একপ্রকার অনিবার্যভাবে, তিনি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন বেশ কিছু ধ্বংস ও হত্যালীলার— যাদের একমাত্র মোটিভ হয়ে পারে বাণিজ্য-যুদ্ধ।
বইটি শুরু হয়েছে 'ভূমিকা' দিয়ে, যাতে একেবারে হাল আমলের কোলটান এবং কঙ্গোযুদ্ধের বিবরণ দিয়ে পাঠকদের সামনে বাণিজ্য-যুদ্ধের সেই রূপটি তুলে ধরেছেন— যাতে শেয়ার-বাজারের উত্থান পতনের বদলে অস্ত্রের ব্যবহারটিই দেখা যায়। এই উদাহরণটি দিয়ে তিনি প্রবেশ করেছেন মূল আলোচনায়। সেখানে এই ক'টি অধ্যায়ে আলোচনা বিন্যস্ত হয়েছে~
১) সিন্ধু-সভ্যতার বৃত্তের বাইরে কিছু কথা;
২) বেদ ও বেদের সমাজ;
৩) পণি ও অন্যদের পশ্চিমে গমন;
৪) মেসোপটেমিয়ার কথা (২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত);
৫) মেসোপটেমিয়া ও ভারত-যোগ;
৬) ইরান ও সিন্ধু-সভ্যতা;
৭) গ্রেয় খোরাসান পথ;
৮) টেপে শিয়ালক এবং সুসা যাওয়ার দু'টি বাণিজ্যপথ;
৯) কয়েকটি প্রাসঙ্গিক কথা;
১০) কিছু অ-সেমিটিক সংস্কৃতির কথা;
১১) অসুরদের কথা;
১২) সিন্ধু-সিভ্যতায় আক্রমণ;
১৩) জরাথ্রুষ্ট, আবেস্তা ও আনুষঙ্গিক ইতিহাস;
১৪) ইরানের উপকথার রাজা ও ইতিহাসের অন্বেষণ;
১৫) মরহষি, এলাম ও ইরানের কথা;
১৬) অন্তিম যুদ্ধ;
১৭) আমাদের কথা।
বইয়ের শেষে আছে গ্রন্থ ও প্রবন্ধ তালিকা।
বইটির ভালো দিক কী-কী?
প্রথমত, এই বিষয়টি আমাদের ইতিহাসে পড়ানোই হয় না। বাংলা তো দূরস্থান, ইংরেজিতেও এই নিয়ে কোনো সহজপাচ্য, এমনকি দুষ্পাচ্য বই সুলভ নয়। বিভিন্ন সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র ও জার্নালে ছড়িয়ে আছে এই নিয়ে নানা অভিমত ও তথ্য, কিন্তু এমনভাবে একটিই বই আকারে... উঁহু, কিচ্ছু নেই।
দ্বিতীয়ত, আলোচনাটিকে আক্ষরিক অর্থে একটি মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি আকার দিতে সক্ষম হয়েছেন লেখক। ভূগোল ও ইতিহাস, পুরাকথা ও প্রত্নতত্ত্ব, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় ভাবনা তথা দর্শন— এদের সবার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া জুড়ে একাধিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তন, সমন্বয় ও সংঘাতের ছবিটি।
তৃতীয়ত, অজস্র মানচিত্রের সাহায্যে লেখাটিকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। ফলে শুষ্কং কাষ্ঠং তথ্য ও তত্ত্বের সঙ্গে ভূগোলকে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি আমরাও।
চতুর্থত, মেসোপটেমিয়া সম্বন্ধে কিছু জানা থাকলেও ইরানের ইতিহাস বিষয়ে আমাদের অজ্ঞই বলা চলে। অথচ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বিচারে ওই দেশটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। সেই শূন্যস্থান অনেকাংশে পূরণ করেছেন লেখক।
বইটির খারাপ দিক কী?
বইটির বর্ণ-বিন্যাস যত ভালো, অধ্যায়গত বিন্যাস ততটাই খারাপ। লেখক একটি সম্ভাব্য কালানুক্রম অনুযায়ী বইটিকে সাজিয়েছেন। অথচ আগে ভূগোল, তারপর প্রত্নতত্ত্ব, তারপর পুরাকথা ও অন্যান্য লিখিত উপাদানের বিশ্লেষণ, শেষে সিদ্ধান্ত— এইভাবে প্রতিপাদ্যকে পেশ করা হলে আমাদের পক্ষে লেখকের যুক্তিক্রম এবং বক্তব্য অনুসরণ ও আত্মস্থ করা সহজতর হত।
এই ব্যক্তিগত অনুযোগটি সরিয়ে রেখেই পাঠকদের বলব বইটিকে সংগ্রহ ও পাঠ করতে। ভারতের ইতিহাসের এই অনালোচিত এবং অনালোকিত, অথচ অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি নিয়ে এমন তথ্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ শুধু বিরল নয়, অভূতপূর্বই বলা চলে।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,334 reviews412 followers
March 27, 2022
“Trade and markets are the twin engines that lead to the creation and growth of not only the empires, but also the great civilizations from the times immemorial. Having firm faith in the growth of markets for economic development, one should investigate whether trade and markets played a major role in the ancient times, too. And what better archetype could we have chosen than almost the ten millennia old lost ancient Indian civilization of Harappa or the Indus Valley?

“Modern bourgeois society with its relations of production, of exchange, and of property, a society that has conjured up such gigantic means of production and of exchange, is like the sorcerer, who is no longer able to control the powers of the nether world whom he has called up by his spells.” [Karl Marx, The Communist Manifesto]

যেসব তথ্যের সূত্র ধরে ইতিহাস রচনা সম্ভব, আমাদের এই উপমহাদেশে, তার প্রাচীনতম সংকলন রয়েছে ধর্মে। প্রভু আর অধীনের সনাতন সম্পর্কের সব বিশিষ্ট মুহূর্তই ধর্মে রয়েছে গ্রথিত -- গ্রথিত রয়েছে কর্তৃত্ব, সহযোগিতা আর প্রতিরোধের নিয়মে। এমন নিয়মের মূলে আছে কিছু ক্ষমতার বিধান; ইতিহাসে তার উচ্চারণ স্পষ্ট।
দীর্ঘদিন ধরে ফিরে ফিরে আসে এসব নিয়ম, শক্ত হয় তাদের ভিত, সার্বজনীন চেহারা পায় তারা। নিজেদের প্রারম্ভিক কর্মকে ছাপিয়ে উত্তরকালের সাংস্কৃতিক পর্যায়ে তারা আর শুধু স্মৃতিচিহ্ন মাত্র নয়, বিশেষ ভাবে কার্যকর উপাদানও বটে। ফলে, ক্ষমতার প্রতি উচ্চবর্গ এবং নিম্নবর্গের যে মনোভাব, তার এক পুঞ্জিভূত তথ্যসমগ্র গড়ে ওঠে।
তার প্রকাশ আমরা দেখি কখনও পৌরাণিক কাহিনীতে, কখনও বা আচার-অনুষ্ঠানে, আবার কখনো রীতিনীতিতে অথবা বিশ্বাসের জগতে পূর্বোক্ত উপকরণসমূহের বিচিত্র যোগাযোগের বিভিন্ন বিন্যাসে।

যে আকারে এই তথ্য আমাদের নাগালে আসে, তাতে এর অধ্যয়ন সহজ থাকেনা, কারণ লিখিত ভাষ্যের স্বচ্ছতা এই সমগ্রে অনুপস্থিত, মৌখিক লোককথার পরম্পরাতেই তার প্রধান অবলম্বন। ইতিহাস কখনোই মানুষের ধ্যান ধারণার উপর নির্ভরশীল নয়। ইতিহাস চিন্তার অজস্র শাখা প্রশাখা রয়েছে। তারা প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র, অথচ সেই সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ইতিহাস আদতেই মানবসমাজের সংস্থান-বিবর্তনের প্রতিবিম্ব। সমাজ কোনও মুহূর্তে এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে নেই। ইতিহাসের নিয়ম মেনে নিয়ে সমাজে এগিয়ে যাচ্ছে -- দ্বান্দ্বিকতায় দীর্ণ হচ্ছে প্রতিমুহূর্তে, পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে, ফের সংঘাতে পিষ্ট হচ্ছে, পরক্ষণে নতুন সত্তার নির্ভরে এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সমান্তরাল পরিবর্তন ঘটছে সমাজের একেবারে মূলে -- যে মানুষের সমস্যা নিয়ে আমাদের সমাজ, সেই সমষ্টির গভীরে।

সামাজিক মানুষের পারস্পরিক বিনিময়-সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে, কারণ এখানেও সংঘাত ঘটছে। বিজ্ঞানীদের মতে আমরা এমন প্রভূত নক্ষত্র আকাশে দেখতে পাই, যেগুলো বহুকাল আগে, হয়তো কয়েক লক্ষ বছর আগে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে বা নিভে গেছে। কিন্তু আমরা এখনো তাদেরকে রাতের আকাশে দেখতে পাই, কারণ সেগুলোর কোনও কোনওটা থেকে পৃথিবীতে আলো পৌঁছ���তে অনেক লক্ষ বছর লাগে। সুতরাং সে আলো নেভার খবর জানতে পৃথিবীতে দীর্ঘকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

ভারতবর্ষ বা দক্ষিণ এশিয়ায় বহিরাগত যাযাবর আর্য আক্রমণ তত্ত্ব ঠিক তেমনই এক মৃত তত্ত্ব মাত্র, যা বহুকাল যাবৎ সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ফলে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি হারিয়েছে। তথাপি এখনও সেই মৃত তত্ত্ব পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়। তা এখনও হয়ে আছে ইতিহাস রচনায় ভিত্তি। ব��স্ময়কর হলেও এটা সত্য যে এই খবর প্রচুর সাধারণ শিক্ষিতদের জানা নেই।

রজত পাল মহাশয়ের এই বইয়ে দ্বিমুখী আলোচনা সংঘটিত হয়েছে:
১) আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে সম্পূর্ণরূপে, বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার মাধ্যমে খারিজ করা এবং
২) উপরোক্ত সন্দর্ভেই একটি অত্যন্ত স্বল্পালোচিত প্রসঙ্গ, যথা সমকালীন অন্যান্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রসমূহ - আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, মেসোপটেমিয়া, উপসাগরীয় (গালফ) অঞ্চলের সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার সাবলীল যোগাযোগ এবং বাণিজ্যের আধিপত্য দখল করার জন্যে খ্রীষ্ঠপূর্ব ৩০০০ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের কার্যকারণ বর্ণনা।

সর্বমোট সতেরোটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই বই :
১) সিন্ধুসভ্যতার বৃত্তের বাইরে কিছু কথা
২) বেদ ও বেদের সমাজ
৩) পণি ও অন্যদের পশ্চিমে গমন
৪) মেসোপটেমিয়ার কথা (২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত)
৫) মেসোপটেমিয়া ও ভারত যোগ
৬) ইরান ও সিন্ধু সভ্যতা
৭) গ্রেট খোরাসান পথ
৮) টেপে শিয়ালক এবং সুসা যাওয়ার দুটি বাণিজ্যপথ
৯) কয়েকটি প্রাসঙ্গিক কথা
১০) কিছু অ-সেমিটিক সংস্কৃতির কথা
১১) অসুরদের কথা
১২) সিন্ধুসভ্যতায় আক্রমণ
১৩) জরাথ্রুস্ট্র , আবেস্তা ও আনুসঙ্গিক ইতিহাস
১৪) ইরানের উপকথার রাজা ও ইতিহাঁসের অন্বেষণ
১৫) মরহষি, এলাম ও ইরানের কথা
১৬) অন্তিম যুদ্ধ
১৭) আমাদের কথা

পুরানগুলিতে দেব দানবের (অথবা দেবতা-অসুর) চিরকালীন বিবাদের কাহিনী কার না জানা? আর কাহিনী তো একটি নয় -- বহুযুগ ধরে উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে বহু যুদ্ধ হয়েছে। কখনও অসুরেরা জিতেছে বা সুবিধাজনক অবস্থানে গেছে, কখনও বা দেবতারা অসুরদের বহুদূর দেশে তাড়িয়ে দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে কারণ হলো স্বর্গভূমি বা দেবলোকের অধিকার নিয়ে। কখনও কখনও দেবভূমি থেকে দেবতারাও বিতাড়িত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন পুরাণের কাহিনীগুলির মধ্য থেকে বিবাদের একেবারে যে মূলকারণ, তা কিন্তু সম্পদের অধিকার নিয়ে, যা সমুদ্রমন্থনের কাহিনীতে রূপকাকারে বিবৃত। 'অমৃত' হল মহামূল্যবান ভোগ্য ও ভোজ্য সম্পদ।

তার ভাগ পেল না অসুরেরা। একই মর্ত্যের সন্তান -- দেব ও অসুর। তাদের পিতা এক -- মহর্ষি কশ্যপ। অতএব অমৃতে অসুরদেরও সমান অধিকার। কিন্তু দেবতাদের বঞ্চনায় (তঞ্চকতায় বলা যথার্থ) তারা পেল না। এই রূপক কাহিনী বিশ্লেষণ করলে যে সরল কাহিনীটি বেরিয়ে আসে তা হল: পৃথিবীতে চিরদিন একদল মানুষের বুদ্ধি বেশি আর একদলের মোটাবুদ্ধি, কিন্তু শারীরিক শক্তি বেশি। দুই শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব নিত্য।

আবার দুয়ের স্থিতাবস্থা ও সহাবস্থানও নিত্য ব্যাপার। উদাহরণস্বরূপ -- মুষ্টিমেয় ইংরেজ বুদ্ধিবলে আমাদের দেশকে অধিকার করেছিল এবং আমাদের দাসত্বের বন্ধনে দু'শ বছর বেঁধে রেখেছিল মোটামুটি একটা সহাবস্থান হয়েছিল। আদান-প্রদানও হয়েছে দুই তরফে। কিন্তু দ্বন্দ্বটা ছিল। সেই দ্বন্দ্ব একসময় তীব্রতর হল। আমরা আবার তাদের এদেশ থেকে বিতাড়িত করলাম। এখন সেই দ্বন্দ্ব আর নেই। দুয়ের মধ্যে একটা ভাগাভাগি হয়ে গেছে।

এটি দৃষ্টান্তমূলক মাত্র। এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমরা দেব-দানব বিবাদের আসল তত্ত্বটি বুঝে নিতে পারি। দেবতারা নিজের অধিকারে সন্তুষ্ট ছিল না; দেবতাদের বুদ্ধি বেশি। কখনও বুদ্ধি জিতেছে, কখনও শক্তি। কখনও বা বিপরীত। স্বর্গভূমিও হয়তো একদা অসুরদের ছিল। ক্ষমতার এই ভরকেন্দ্র দেবতারা দখল করে। সেখানে নিজেদের দুর্গনগরী গড়ে তোলে। ইন্দ্র দেবতাদের সেনাপতি। ইন্দ্র বহুবার বিতাড়িত হয়েছেন। অবশেষে মহাসুর বৃত্র নিহত হওয়ার পর, স্বর্গ দেবতাদের স্থায়ী বাসভূমি হল। অসুর গোষ্ঠী বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের শেষ গোষ্ঠী ছিল নিবাতকবচ দৈত্য গোষ্ঠী। সংখ্যায় তিন কোটি তারা পাতাল নিবাসী। অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলে রাখা ভালো যে দেবতারা তাদের বশে আনতে পারেনি।

Primitive accumulation, নামান্তরে previous accumulation বা original accumulation তত্ত্ব প্রসঙ্গে ক্যাপিটালের প্রথম ভলিউমের একত্রিশ নম্বর চ্যাপ্টার স্মরণ করুন পাঠক। স্মরণ করুন ইংরেজদের অ্যান্টি জ্যাকোবাঁ যুদ্ধ অথবা আফিম যুদ্ধ। আমাদের পূর্বতন বাংলারও যোগ ছিল তাতে। পটনার ফ্যাক্টরি-তে তৈরি হত আফিমের দলা, যার নাম ‘বেঙ্গল মাড’। বাংলায় জন্ম নয় বটে, তবে তার ব্যবসা-বাণিজ্য সবই আলিপুরের অক্শন হাউস-এ। এখান থেকেই আফিম কিনে সাহেবরা পাড়ি দিত চিনে। জাহাজ খালাস করে কিনে নিত সাংহাই-এর দোকানিরা। তার পর ডিঙি নৌকো চড়ে আফিম পৌঁছে যেত চিনের ঘরে ঘরে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে গোটা জাতটাকে নেশাখোর বানিয়ে ফেলেছিল ইংরেজরা। এমনই এই ব্যবসা, যার মন্ত্র একটাই আফিম খাও আর ব্রিটিশ কোম্পানিদের লাভ বাড়াও। শুধু ব্যবসায়ী নয়, আফিমের রঙিন দুনিয়ায় ভিড় জমিয়েছিল আরও অনেকে নেশাখোর, জাহাজের কাপ্তান ও খালাসি, বিবিধ ষড়যন্ত্রী, পাদরি, কেরানি, বিপ্লবী, বারবনিতা, প্রেমিক ও খুনি।
চীন-সম্রাট ইংরেজদের এই বেআইনী আফিম-বাণিজ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে চীনের সাথে ব্রিটেইনের যুদ্ধ বাঁধে, যা ইতিহাসে 'Opium War' বা 'আফিম-যুদ্ধ' নামে সমধিক পরিচিত। চীনের সাথে ব্রিটেইনের দু'-দু'বার আফিম-যুদ্ধ হয়। প্রথম আফিম-যুদ্ধ ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ পর্যন্ত চলে। আর, দ্বিতীয় আফিম-যুদ্ধ চলে ১৮৬৫ থেকে ১৮৬০ পর্যন্ত।

উভয় যুদ্ধে ব্রিটিশ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী বাংলায় প্রতিষ্ঠিত তাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বিজয় লাভ করে। দ্বিতীয় আফিম-যুদ্ধে ব্রিটেইনের সাথে ফ্রান্সও যোগদান করে, এবং রাশিয়া ও আমেরিকাও নানাভাবে চীনের বিরুদ্ধে ব্রিটেইন ও ফ্রান্সকে সহযোগিতা করে। ট্রেড ওয়ার বা বাণিজ্যযুদ্ধের অন্যতম সার্থক নিদর্শন এই যুদ্ধ।

কোনো একটি সভ্যতার সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য দরকার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও পথ-ঘাটের উন্নয়ন। আর এই অগ্রগতি আসে আভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে। ঐতিহ্যময়ী সিন্ধু সভ্যতাকেও সেই দূর অতীতে দেশ-বিদেশের সঙ্গে সংযুক্ত বাণিজ্যিক আদান-প্রদান এই সভ্য তার আর্থিক দিকটি পুষ্ট করেছিল।
এই সভ্যতার বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপ আলোচনা করার আগে তিনটি বিষয় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, যেমন ---

১) বাণিজ্য পথের ঠিকানা,
২) পণ্যজ দ্রব্য এবং
৩) অর্থনৈতিক বিনিময় মাধ্যম।

অর্থনৈতিক বিনিময় মাধ্যমের সঙ্গে সমান্তরালে আসে চাহিদা। কেননা, চাহিদা অনুসারেই পণ্যম দ্রব্যের প্রকারভেদ হয়। যেহেতু প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যটতা ছিল বিলাসবহুল জীবনের উপকরণ নিয়ে এক উন্নত মানের নাগরিক সভ্যকতা, তাই এখানে জীবনযাত্রার উপযোগী জিনিসপত্রাদি ছাড়াও বিলাসবহুল আভিজাত্যের প্রতীক বিভিন্ন শৌখিন জিনিসেরও দেখা পাওয়া স্বাভাবিক। হরপ্পান পর্যায়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল কৃষি ও পশুপালন এবং বৃহত্তর সিন্ধু-সরস্বতী উপত্যকার ভিতর এবং বাইরের কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্যের সংগ্রহ ও বিনিময়। প্রত্নতাত্বিকভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, এখানে হরপ্পান পর্যায়ে প্রচুর গবাদিপশু পালন হত। দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরু থেকে গৃহপালিত উট, ঘোড়া এবং গাধা থাকার কথা জানা গেছে। বছরে দুইবার ফসল উৎপাদন হত। দানাদার শস্যের মধ্যে পাঁচ জাতের গম, তিন জাতের ছয় সারি-বিশিষ্ট যব, বিভিন্ন ধরনের কলাই (field peas, chick peas) মসুর, তিসি, বদরী ফল (jujube) এবং সর্ষে। খেজুর, তুলো এবং আঙ্গুরও চাষ করা হত। ধান উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া গেছে লোথাল, রংপুর ও পিরকে।

চোলিস্তান অঞ্চলে ও বনওয়ালীতে যেসব পোড়ামাটির লাঙ্গল পাওয়া গেছে, সেগুলো আজকের ব্যবহৃত লাঙ্গলের খুব কাছাকাছি। তামা, টিন, সোনা, রূপা, চুনাপাথর, অ্যালাব্যাসটার, গ্রানাইট পাথর, মার্বেল পাথর, স্লেট পাথর, জিপসাম, বিটুমিন লাপিস লাজুলি, কার্নেলিয়ান, এবং অন্যান্য পাথরের মধ্যে জেড পাথর, নী��কান্তমণি ও অ্যামাজনাইট পাথর সিন্ধু সভ্যতায় পাওয়া গেছে। এসবের অনেকগুলোরই উৎস বৃহত্তর সিন্ধু সরস্বতী উপত্যাকার বাইরে, এবং কিছু ক্ষেত্রে অনেক দূরে। এসব কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য এখানকার অধিবাসীদের আফগানিস্তান, বালুচিস্তান, মধ্য এশিয়া, উত্তর-পূর্ব ইরান ও দক্ষিণ ভারতের সাথে বাণিজ্য করতে হত। এছাড়া এখানকার নগর-শহরগুলোর কারখানায় তৈরি বিভিন্ন ধরনের ধাতু, পাথর ও খেলনা মেসোপটেমীয় সভ্যতার নগরগুলিতে যেত। সমুদ্রপথে পূর্ব আরব সহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার বাণিজ্য গড়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সম্ভবত: দক্ষিণ ভারত কিংবা আফগানিস্তান থেকে সিন্ধু সভ‍্যতায় তামা আসতো। টিন সম্পর্কে সঠিক কথা বলার সমস্যা রয়েছে। কারণ, ভারত ও বেলুচিস্তানে টিনের পরিমাণ অত্যন্ত কম। টিনের সঙ্গে তামা মিশিয়ে তৈরি করা হতো ব্রোঞ্জ। এটি সুপরিচিত ছিল আফগানিস্তানে।
সোনা ব‍্যবহৃত হতো মালার গুটি, মাথার মুকুটসহ অন‍্যান‍্য অলংকার তৈরিতে। সোণা পাওয়া যেতো ভারতের বড়ো বড়ো নদীতে এবং মহীশূরে। এছাড়াও কান্দাহার, আফগানিস্তান ও পারস্যে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু জায়গায় সোণা পাওয়া যেতো। আজমীর, আফগানিস্তান, পারস্য ও দক্ষিণ ভারতে পাওয়া যেতো রুপো। এছাড়াও সিন্ধু সভ‍্যতার নাগরিকরা ব‍্যবহার করতেন ল‍্যাপিস ল‍্যাজুলী ও নীলকান্ত মণির মতো রত্ন।

সিন্ধু সভ‍্যতার বহির্বাণিজ‍্য সম্পর্কে বলা যায়, মধ্য এশিয়া, উত্তর-পূর্ব পারস্য, মেসোপটেমিয়া, মিশর, সুমের, ঊর প্রভৃতি দেশের সঙ্গে এই সভ‍্যতার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। হরপ্পার শীলমোহর থেকে হরপ্পীয় বাণিজ্য জাহাজের পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে, মহেঞ্জোদড়োর টেরাকোটা ও মাটির পাত্রের মাথা থেকেও এই বাণিজ্য-পোতের পরিচয় মেলে। পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় পথ আমাদের হরপ্পা বণিকদের বাণিজ্য যাত্রার কথা মনে করিয়ে দেয়। করাচির পশ্চিমে ম‍্যাকরাণ উপকূল পর্যন্ত প্রসারিত ছিল এই বাণিজ্যিক জলপথ। বলা হয়, লোথাল ছিল একটি জাহাজ ঘাঁটি। এই প্রসঙ্গে আমরা সুমের ও আক্কাদের কীলকাকৃতি প্রমাণের (Cuneiform Documents) উল্লেখ করতে পারি, যেখানে "দিলমুন" ( Dilmun) বা "তেলমুন" (Telmun) নামে একটি দেশের নাম উল্লেখ আছে। একটি অর্থে এটি বোঝায় "উদিত সূর্যের দেশ ( Where the Sun Rises"), যা সুমেরের কিছুটা পূর্বে অবস্থিত। ২৪৫০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে দিলমুন মার্কা জাহাজ তৈরির কাঠ আসতো লাগোসের ঊর-নানসিতে। এছাড়াও অন‍্যান‍্য প্রমাণ থেকে জানা যায়, খ্রিস্ট পূর্ব বিংশ শতকে সমুদ্রচারী নাবিকেরা সোণা, রুপো, তামা, ল‍্যাপিস ল‍্যাজুলীর টুকরো, মালা তৈরির জন্য পাথরের গুটি, হাতির দাঁতের চিরুনি, অলংকার, চোখের কাজল, কাঠ ও মুক্তো বয়ে আনতেন ঊর অঞ্চলে।

পণ্ডিতরা দিলমুনকে সাধারণভাবে বাহারিনের দ্বীপের সঙ্গে চিহ্নিত করেছেন। আবার ঐতিহাসিক Samuel Noah Kramer (মনে করেন, দিলমুন ছিল সিন্ধুর একটি জায়গা। ঐতিহাসিক এম. ই. এল্. মাল্লোয়ান (S.N. Mallowan) এই দিলমুন জায়গাটিকে বাহারিন হিসেবেই ধরেছেন। সিন্ধু সভ্যতার আদি হরপ্পান থেকে পরিণত হরপ্পান পর্যায়ে আসার পর দেখা যায় যে, বালুচিস্তানের মাকরান থেকে গুজরাট পর্যন্ত সমুদ্র উপকূলব্যাপী এর বসতিসমূহ বিস্তার লাভ করেছে। এটি হরপ্পান পর্যায়ে সমুদ্র বাণিজ্য ওপর গুরুত্ব দান ও তুলনামূলক নির্ভরশীলতা বোঝায়। George F. Dales, Jonathan Mark Kenoyer, এবং Leslie Alcock, তাঁদের বই 'Excavations at Mohenjo Daro, Pakistan: The Pottery, with an Account of the Pottery from the 195 Excavations of Sir Mortimer Wheeler--এ এমন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন যে সিন্ধু সভ্যতার কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যের উপর মেসোপটেমিয়ার তৎকালীন আক্কাদীয় সভ্যতা এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল যে, হরপ্পান সভ্যতার ক্ষয় শুরু হলে সেখানেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে এবং সিন্ধু সভ্যতা থেকে সেখানে পণ্য রপ্তানী বন্ধ হয়ে গেলে আক্কাদীয় সভ্যতার পতন হয়।

একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, মেসোপটেমিয়ার সিন্ধু সভ্যতার বেশকিছু পরিমাণ seal ও অন্যান্য জিনিসপত্র পাওয়া গেলেও বিপরীতভাবে এখানে মেসোপটেমিয়ার সামান্য কয়েকটি seal পাওয়া গেছে। এ থেকে মেসোপটেমিয়া ও সিন্ধু সভ্যতার বাণিজ্য সিন্ধু বণিকদের প্রাধান্য পণ্য রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ বোঝা যায়। সিন্ধু সভ্যতা আর মেসোপটেমিয়ার মাঝে হলো পারস্য, যা আজকের ইরান। দুই বিখ্যাত সভ্যতার মাঝে, এই দেশ জুড়ে বহু প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে আধুনিক যুগে, যার খবর আমরা বিশেষ রাখি না। টেপে শিয়ালক , টেপে হিসার ইত্যাদি ক্ষেত্র দিয়ে একসময়ে স্থলপথে বাণিজ্য হতো দুই সভ্যতার মধ্যে। মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যে সব সিন্ধু সভ্যতার দামি রত্ন ও পাথর পাওয়া গিয়েছে তার আদানপ্রদান হতো ইরানের এই খোরাসান পথ থেকে। এই বাণিজ্যের আধিপত্য দখল করার জন্যে যুদ্ধ হয়েছিল কৃষ্ট পূর্ব ৩০০০ পরবর্তী সময়ে। একসময়ে হারোপনদের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। শহর ও সকতা জাতীয় শহরের পত্তন হয় এই সময়ে। হরপ্পান বহু শহর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
কয়েকশো বছর বাদে হরূপানরা নিজেদের গুছিয়ে নেয়, আবিষ্কার করে জলপথে পারস্য উপসাগর দিয়ে বাণিজ্যের সম্ভবনা , দখল নেয় উত্তর আফগানিস্থান এর খনি , তৈরি হয় সার্তুগাই এর মতন খনিশহর , এবং অন্তিম আঘাতে ইরানের পূর্ব দিকে গড়ে ওঠা কেন্দ্র গুলিতে প্রবল আক্রমণ চালায়ে তারা।

লাপিস লাজুলি কর্ণেলিয়ন সিতীয়ত্বের বাজার দখল করায়ে কয়েকশো বছর ধরে চলা যুদ্ধ হয়েছিল ইতিহাসের প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধ। সেদিনের ল্যাপিস ল্যাজুলি, কর্ণেলিয়ন, জ্যাপসার জাতীয় নানা দামী পাথর দিয়ে তৈরি মূল্যবান গহনা ও নানা দ্রব্য সহ হাতির দাঁত, কাঠ, নানা বিচিত্র পশু পাখি নিয়ে মেলুহানদের জাহাজ চালাত একচেটিয়া বাণিজ্য।এখন হরপ্পা বলতে কেবল হরপ্পা শহরকে নয়, সেদিনের নানা ভারতীয় (উপমহাদেশের) শহরকে বোঝাত, বিশেষত যাদের আমরা সিন্ধু সভ্যতার সাথে সম্পর্কিত মনে করি। এসব মূল্যবান পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহে এরা বিশেষ পারদর্শী হয়েছিল বলে ক্রমে সম্পদশালী নগর স্থাপন করে ফেলতে পেরেছিল। এই তথাকথিত সিন্ধু সভ্যতার আদিরূপ যতটুকু আমাদের সামনে এসেছে তাতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও ভারতের হরিয়ানায় ৭০০০ খৃ পূর্ব থেকে মানুষজন গুছিয়ে বসবাস শুরু করেছে। ৫০০০ খৃ পূর্ব নাগাদ এরকম কেন্দ্র বেশ কয়েকটি।

নাগরিক যুগের পূর্বে এমন অনেক অঞ্চল ছিল, সমগ্র ইতিহাস জুড়ে যারা পৃথিবীর প্রধান সড়ক পথ হয়ে উঠেছিল -- কান্দাহার থেকে (আফগানিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি কেন্দ্র এবং এটি নিজেই স্থলপথের প্রধান হয়ে ওঠে) চামন ছুঁয়ে যাওয়া পথ এবং Quetta অববাহিকার দিকে খোজাক গিরিপথ, তারপর আরো এগিয়ে পূর্ব-দক্ষিণে অবাধে বোলান গিরিপথের মধ্যে দিয়ে, নেমে যায় বালুচিস্তান এবং সিন্ধের মধ্যকার কাচ্চি সমতল ভূমিতে।

পরবর্তীকালে আমরা দেখি যে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম খুঁজে পাওয়া কৃষিনির্ভর বসতি, মেহেরগড় যে কাচ্চির সমতলে অবস্থিত ছিল, সেটি কোনো সমাপতন নয়।
এখানে এমন সমস্ত উদ্ভিদ এবং পশু গৃহস্থালীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে প্রমাণ মেলে, যারা বালুচিস্তান বা আফগানিস্তানের উচ্চভূমি কিংবা আরো পশ্চিম অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। এর পরবর্তীকালের ইতিহাসে, Quetta ও কান্দাহারের নিকটবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের চিহ্ন রয়েছে মেহেরগড়ে। কান্দাহারের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে সেস্তানের (Sistan) মধ্যে প্রবাহিত হেলমন্দ নদীর (Helmand River) স্থলভাগের অভ্যন্তরস্থ ব-দ্বীপের নিকটে Shahr-i Sokhta অবস্থিত।

আফগানিস্তানের পার্বত্যপ্রদেশ, যাকে বলা হয় 'এশিয়ার চৌমাথা', সেখানে কৃষিযোগ্য ভূমির কয়েকটি দীর্ঘ বিস্তার রয়েছে। তাদেরই একটিতে আমরা কান্দাহারের নিকটে দেখতে পাই শীতকালে ভেড়া আর ছাগল-পালকেরা পাহাড় থ���কে কান্দাহারের দিকে আরো দক্ষিনে পূর্বে আর উত্তরে চলে যায়। দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে হেলমন্দ নদীর উচ্চ প্রবাহের দিকেও যায় তারা হত্যা ঘটনাচক্রে অসংখ্য গবাদিপশুর প্রতিমূর্তি প্রস্তুত করেছিল। সেস্তান অঞ্চলে ছিল পপলার, চিরহরিৎ ঝাউ (Tamarisk) এবং অ্যাশ গাছ।
মেহেরগড় এবং প্রাক হরপ্পান যুগের Quetta-র সঙ্গে Shahr-i Sokhta এবং মাণ্ডিগাকের(Mundigak)যোগসুত্র ছিল। কিন্তু পরিণত হরপ্পা সভ্যতার অঞ্চলগুলির সঙ্গে এদের কারোরই যোগাযোগ ছিল না।

বিপরীতক্রমে কান্দাহার বা সেস্তান অঞ্চলে না আছে কোনো হরপ্পান সামগ্রী, আর না আছে প্রভাব। পশ্চিমের পার্বত্য সীমানা হরপ্পা সভ্যতার রাজনৈতিক অঞ্চলকে কড়া প্রহরায় রেখেছিল, এই তত্ত্বের স্বপক্ষে এটা একটা জোরালো যুক্তি হতে পারে।

সিন্ধু উপত্যকা এবং তুর্কমেনিয়া (মধ্য এশিয়া) এই দুটি অঞ্চলের সভ্যতা সমসাময়িক ছিল। এদের মধ্যে আদান-প্রদানের অনেক সংকেত চিহ্ন রয়েছে। আক্ষরিক অর্থে কেবলমাত্র বাণিজ্যের মধ্যেই এই চিহ্নগুলি ছড়িয়ে নেই। হরপ্পা সভ্যতার অঞ্চলে ব্রোঞ্জের পিন পাওয়া গেছে, যাদের মাথাগুলো পশুর আকার নিয়েছে। পাওয়া গেছে লম্বা গলাবিশিষ্ট ব্রোঞ্জের সুরাপাত্র। এই দুটি সামগ্রীই প্রবলভাবে মধ্য এশীয়। হরপ্পার একটি শিলমোহরে খোদিত আছে একটি রাজকীয় ঈগল। এটিও মধ্য এশিয়ায় সঙ্গে যোগসূত্রের একটি চিহ্ন।

সুতো গোটানোর সময় উপস্থিত, পাঠক। কী প্রাপ্তি হলো বইটি থেকে ?

১) রজত বাবুর এই বই আর্য ও সিন্ধু সভ্যতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ঋগ্বেদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ওপর আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করলেও প্রাসঙ্গিকভাবে ইতিহাসের আরো অনেকগুলি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে। ভারতবর্ষে আর্য আক্রমণের তত্ত্বের যৌক্তিকতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে ঋগ্বেদের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিয়ে ইতিহাসের চরম বিকৃতি ঘটানো হতে পারে।

২) ভারতবর্ষে বহিরাগত, যাযাবর আর্য আক্রমণ তত্ত্ব একটি মিথ বা অতিকথা মাত্র, যা রচনা করেছেন মূলত পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা এবং যাতে সুর মিলিয়েছেন উপমহাদেশে তাদের অন্ধ অনুগামীর দল। সব myth বা পুরাণকথার মত আর্য আক্রমণ তত্ত্বের পিছনেও ঘটনার অভিঘাত রয়েছে মাত্র। কিন্তু সেটাকে সম্পূর্ণ উল্টোভাবে এবং ভ্রান্তভাবে উপস্থিত করা হয়েছে, যেমনটা মিথে ঘটতে পারে। রজতবাবু প্রমান করছেন যে আক্রমণ বা অভিগমন হলে সেটা ইউরোপে হয়েছিল ভারতবর্ষ থেকেই।

৩) কিন্তু সেটা প্রকৃতপক্ষে কোন পশুচারি অথবা যাযাবর উপজাতিদের দ্বারা নয়, বরং সিন্ধু সভ্যতার সুসভ্য অভিগামীদের দ্বারা। এবং এই আক্রমণ / প্রতি-আক্রমণকে হুন-মঙ্গোল-গথ-ভিসিগথ গত গদ ইত্যাদি বর্বর উপজাতি গুলির আক্রমণের মত বলা যাবে না তারা ইউরোপে সভ্যতা ধ্বংস করেন নি বরং নির্মাণ করেছেন প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল একটা সভ্য জনগোষ্ঠীর নতুন দেশে অভিগমন ও অভিবাসন।

৪) এক অনন্যসাধারণ ভায়োলেন্স-কাউন্টার ভায়োলেন্স paradigm এঁকেছেন রজত বাবু। তাঁর ভাষ্যেই পড়ুন, পাঠক -- "হরপ্পান বসতিগুলি একসাথে আক্রান্ত হয়নি। প্রথমে নৌসারো, পরে কোট দিজি, আমরি এবং পরের দিকে গুমলা, বালাকোট। পরপর ঢেউয়ের মতন আক্রমণ এসেছিল সম্ভবত। আক্রান্ত হয়ে পালিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু বসতি, সম্ভবত চোলিস্তানের বসতিগুলি আক্রমণের আশঙ্কায় পরিত্যক্ত হয়েছিল। পিছিয়ে যেতে যেতে একসময় ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এলো।...."

৬) ২৬০০ খৃ পূর্ব'র পর থেকে বেশ কয়েকটি জায়গায় যে নাগরিক সভ্যতার বিকাশ হয়েছিল তার অনেকগুলি আমরা এখন খুঁজে পেয়েছি। কালিবঙ্গান, রাখিগঢ়ি, ধোলোভিরা যুক্ত হয়েছে বড় নাগরিক কেন্দ্ররূপে হরপ্পা, মহেঞ্জোদড়োর সাথে। এখন কথা হল, এই মানুষগুলো কি ২৩৪০ খৃ পূর্বতে প্রথম আক্কাদীয় রাজা সার্গনের সময়ে পণ্য নিয়ে গিয়েছিল? নাকি আরো আগে থেকে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা ?

৭) প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে হরপ্পান দ্রব্য মেসোপটেমিয়ার মাটিতে (কিস, সুসা ইত্যাদি নগরে) পাওয়া যাচ্ছে আরও বহু আগে থেকে। কিভাবে পৌঁছচ্ছিল সেসব পণ্য? কোন পথেই বা যাচ্ছিল ?

প্রত্যেকটি ক্ষেত্রের বিবরণ সহ সেদিনের উথালপাথাল ইতিহাস নিয়ে রজত পালের এই বই।
Displaying 1 - 2 of 2 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.