ছোট ছোট পরিচ্ছেদে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের আলোকিত সময়গুলো নিয়ে রচিত একটি বই। যেখানে উঠে এসেছে সমাজের প্রতি বিদ্যাসাগরের প্রধান, অপ্রধান, আলোচিত, অল্প আলোচিত সকল প্রয়াস।
'বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে, সদরে করেছে রিপোর্ট, বিধবাদের হবে বিয়ে।'
বিধবা বিবাহ প্রচলনের পরে দুইবাংলার গাড়োয়ানরা মুখে মুখে চলতি পথ এই ভাওয়াইয়া গানে মুখরিত করতো। এই গানের জনপ্রিয়তা থেকে বোঝা যায় বিধবা বিবাহের আন্দোলনের ঢেউ গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের জীবনকেও স্পর্শ করেছিল। সাধারণ মানুষের মুখে মুখেও ফিরতো রূপনারায়ণ পক্ষী রচিত এই গানটি।
বিদ্যাসাগর বিবাহ প্রচলনের পরে নিজের পুত্র নারায়ণের সাথে এক বিবধা কন্যা ভবসুন্দরী দেবীকে বিবাহ দিয়েছিলেন। এই তথ্য মোটামুটি অনেকেই জানেন। কিন্তু বিদ্যাসাগরকে জানতে এই বিয়ে নিয়ে যেই তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো এই ভবসুন্দরী দেবী ছিলেন স্বামীর সংসার করা ষোড়শী বিধবা।
শ্রীশচন্দ্রের প্রথম বিধবা বিবাহের মধ্যে বিধবা বিবাহের সফল প্রচলন শুরু হলেও বিধবা হিসাবে সাধারণত স্বামীর ঘর করেনি অল্প বয়সী বিধবাদের বিয়ে করতে প্রার্থীরা আগ্রহ প্রকাশ করতো। কিন্তু স্বামীর ঘর করা তথাকথিত দেহের শুচিতা নষ্ট হওয়া মেয়েদের ব্যাপারে আগ্রহী প্রার্থী পাওয়া যেত কম বা যেতই না। বিদ্যাসাগর তথাকথিত নারীর শারিরীক পবিত্রতা (Virginity) গ্রাহ্য করতেন না। তিনি উনিশ শতকের সেই রক্ষণশীলতার যুগে নিজের পুত্র নারায়ণকে ভবসুন্দরী দেবীর সাথে বিবাহ দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এমন প্রগতিশীলতার কারণেই মধুসূদন বিদ্যাসাগর সম্পর্কে যথার্থ বলেছে, The first among us.
পড়ে শেষ করলাম চৌধুরী মুফাদ আহমদের প্রথম গ্রন্থ 'বিদ্যাসাগরকথা'। বইটির সেরা দিক হলো। এই বইটি পড়তে আপনাকে খুব বেশি ধৈর্য্যপরীক্ষা দিতে হবে না। প্রথমত লেখনশৈলীর জন্য আর দ্বিতীয়ত এর পরিচ্ছদ ভাগের পদ্ধতির জন্য। বইটকে ৬৯ টি পরিচ্ছেদে ভাগ করেছেন লেখক। তারপরেও বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা মাত্র ২০৮ ( পরিশিষ্ট আর তথ্যসূত্র ব্যতিরেকে)। প্রতি পরিচ্ছিদ গড়ে দু থেকে আড়াই পেজে সমাপ্ত। আর প্রতিটি পরিচ্ছদে আপনি বিদ্যাসাগর এবং উনিশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সম্পর্কে জানতে পারবেন।
বইটি সেই অর্থে বিদ্যাসাগরের জীবনী নয় তবে যারা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে চান তথা বিদ্যাসাগরচর্চা করতে চান তাদের জন্য বইটি হতে পারে সেই জগতে প্রবেশের একটি উত্তম চাবি। অন্যদিকে যেদিকে যারা বিদ্যাসাগর সম্পর্ক অল্প পরিশ্রমে নিজেকে তথ্যের সাগর হিসাবে উপস্থাপন করতে চান তারাও পড়ে উপকৃত হবেন।
বিদ্যাসাগর যদি একটি বিশাল মহীরূহ হনে হবে বিধবা বিবাহ প্রচলন আন্দোলন তার একটি বলিষ্ঠ শাখামাত্র। বিদ্যাসাগর পূর্ণাঙ্গ যৌবনে আসবার পর থেকে মৃত্যু অবধি বাঙালি সমাজের জন্য যে অবদান রেখেছেন সেখানে শুধু বিধবা বিবাহ নিয়ে তাঁর মূল্যায়ণ অবিচারের সামিল।
বাংলার বর্ণমালাকে বিরামচিহ্ন দিয়ে একটি আধুনিকে রূপে প্রকাশ করেনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। শিশুদের জন্য বর্ণ পরিচয় গ্রন্থের কথা আর নতুন করে বলার নেই। নারীশিক্ষা সূচনা আর প্রসারের জন্য বিদ্যাসাগর ৩৪ টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য আন্দোলন করেন। বহুবিবাহ রোধে আন্দোলন করেন। চার্বাক দর্শনকে আলোর মুখে নিয়ে আসেন। নিজের পরিচালনা দক্ষতায় অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন। এ ছাড়াও আরও অনেক বিস্তৃত বিদ্যাসাগর কর্মজীবন।
এই বইটির পাতায় পাতায় বিদ্যাসাগরকে আবিষ্কার করা যায় নতুনভাবে। তবে লেখক বিদ্যাসাগরের সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করে তাঁকে দেবতার পর্যায়ে তোলার চেষ্টা করেননি। মানুষ হিসাবে বিদ্যাসাগরের সীমাবদ্ধতা ছিল এবং তিনি অনেক সময় সেগুলো পেরিয়ে যেতে পারেন নি। যেমন বিদ্যাসাগরের পিতামহী দুর্গাদেবীর অন্তর্জলী যাত্রায় বাঁধা দেওয়ায় ব্যর্থতা।
মোটের উপর যারা বিদ্যাসাগরকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জাগরণের প্রতিভূ মনে করেন না, যারা প্রগতিশীলতাকে সকল সম্প্রদায় এবং গোষ্ঠীর উপর স্থান দেয় তাদের ভাল লাগবে বইটি। আর বইটি পড়লে জানা যাবে রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপে আধুনিক, উদার, অসাম্প্রদায়িক একাকী বিদ্যাসাগরকথা।