ছোটবেলা থেকেই দাদু-দিদার মুখে ডাকাতদের নানা কাহিনী শুনেছি। আর সত্যি বলতে ঐ সময়তে যত তাদের লুঠপাট, অত্যাচারের কাহিনী শুনতাম তত ভয় পেতাম। কিন্তু কখনও আলাদা করে তাদের সম্পর্কে পড়ার সুযোগ হয়নি। আজ অবশেষে সেই সুযোগ হলো। এই আখ্যান বিশ্বনাথ বাউরি ওরফে বাংলার নামকরা ডাকাত বিশে বাগদির। যে ছিল ধনীর ত্রাস আর গরীবের ত্রাতা। জমিদার, বানিয়া, ইংরেজদের কাছে সে বিশে ডাকাত, কিন্তু গরীব মানুষগুলোর কাছে সে রাজা বিশ্বনাথ, তাদের ভগবান। এককথায় বাংলার রবীনহুড ছিল সে।
নদীয়ার স্বরূপগঞ্জ গাড়ভাতছালার বাগদিপাড়ায় জন্ম হয় বিশ্বনাথ বাউরির। ঠাকুরদা কানাই বাগদি ছিল শিমুলের জমিদারবাড়ির লেঠেল সর্দার। কিন্তু তার ছেলে অর্থাৎ বিশুর বাবা নিরাপদ বাউরি বেছে নিয়েছিল হরিনাম কীর্তন। সে চেয়েছিল বিশুও সেই পথেই যাক। কিন্তু নিয়তি যে অন্য কিছু লিখে রেখেছিল তার জন্য।
ঘরের কোণে দাঁড় করিয়ে রাখা ঠাকুরদা কাণাই বাগদির লাঠিটা বড্ড টানতো বিশুকে। বেশিদিন উপেক্ষা করতে পারলো না সেই অমোঘ টানকে সে। ধীরে ধীরে বিশ্বনাথ বাউরি হয়ে উঠল বিশে বাগদি। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, হুগলী, কলকাতা সহ গোটা বাংলায় ছড়িয়ে পড়লো তার ত্রাস। কিন্তু ধনীর ত্রাস ছিল সে কেবল,গরীবদের কাছে সে তো মসীহা। ধনীদের থেকে লুঠ করা সম্পত্তির অর্ধেক সে বিলিয়ে দিত বাংলার গরীব দুঃখী মানুষদের মধ্যে, তাছাড়াও বিপদে-আপদে সবসময় পাশে থাকা তো ছিলই। কিন্তু তার এই গরীবদের মসীহা হওয়াটাকে মেনে নিতে পারেনি অনেকে, ফলে শত্রুও তৈরি হয়েছিল অনেক। আর এরাই তাকে বিপদে ফেলার সমস্ত কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। এরপর এই জল কতদূর আর কীভাবে গড়ায় তারজন্য অবশ্যই বইটা পড়তে হবে একবার।
ডাকাত চরিত্রকে নিয়ে লেখা এই প্রথম পড়লাম। এতদিনের ধারণা সম্পূর্ণ বদলে গেল। বিশুর চরিত্রের বৈচিত্র্যতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কারোর সামনে মাথা নত না করা বিশুর অর্জুন সিংহের মতো তার কথায় 'সাচ্চা মরদ' জমিদারের সামনে মাথা নত করা, তার প্রতি ভ্রাতৃত্বতা, বিজয়া-দুর্গার প্রতি দায়িত্ববোধ, আবার দরিদ্রদের প্রতি উদারতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, প্রতিশোধস্পৃহা, হিংস্রতা তার চরিত্রের এই বৈচিত্র্যতা তাকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
দুর্গা, অর্জুন সিংহের চরিত্র যেমন কাহিনীতে ছাপ ফেলেছে, ঠিক তেমনই আরেকটি অনবদ্য চরিত্র হলো জঙ্গলগিরি ভৈরব চৌরঙ্গীবাবা। মা কালীর পুজারী এই জঙ্গলগিরি যখন মাকে বলে ওঠে, "যতদিন না সে জবাব আমি পাই ততদিন আমি ফিরব না তোর এই পোড়া বঙ্গালে।", শিহরিত হয়ে গিয়েছিলাম এই অংশটায়। জঙ্গল যে বাংলাকে ত্যাগ করলো কি দারুণভাবে ফুটে উঠেছে এখানে।
চরিত্রগুলোর বৈচিত্র্যতা যেমন লেখক দারুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনই তার ভাষা, শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস এক কথায় অসাধারণ। সত্যি বলতে এই আখ্যানমালা এতটাই টানটান আকর্ষণীয় যে একবার পড়া শুরু করলে এরপর কী হবে তা জানার আগ্রহে শেষ না করে ছাড়া যায় না। বইটাতে খারাপ লাগার কোনো জায়গা নেই আমার কাছে অন্তত। খুব ভালো লেগেছে বইটা। সবশেষে পাঠকদের বলবো, একবার পড়ে দেখবেন বইটা। আশা করি ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।